সমন্বয়সাধনের নীতিমালা (৯.৪)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

11

Principles of Coordination

সমন্বয়সাধন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একজন নির্বাহী তার অধীনস্থ কর্মীদের দলীয় প্রচেষ্টাকে সুসংহত করে। সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ এবং ব্যক্তির কাজের মধ্যে ঐক্য ও ভারসাম্য আনা হয়। সুষ্ঠু সমন্বয়ের অভাবে কার্যক্ষেত্রে ছন্দপতন ও চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনও বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যবস্থাপনার সব পর্যায় সমন্বয়সাধনের কাজের সাথে জড়িত। ব্যবস্থাপকীয় এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সুষ্ঠুভাবে করার লক্ষ্যে কিছু নীতি বা আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। এতে দক্ষভাবে কাজ করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জন সহজ হয়। আর নীতি হলো এমন দিকনির্দেশনা, যা পালনে প্রতিষ্ঠান আইনত বাধ্য নয়। তবে এগুলো লক্ষ্য অর্জনকে সহজ করে তোলে। সমন্বয়ের নীতি বা আদর্শসমূহ নিচে বর্ণনা করা হলো-

সমন্বয়সাধনের নীতিমালা
  • লক্ষ্যের ঐক্যের নীতি
  • শুরুতেই সমন্বয়ের নীতি
  • ব্যক্তিগত/ প্রত্যক্ষ যোগাযোগের নীতি
  • নমনীয়তার নীতি
  • অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের নীতি
  • আদেশের ঐক্যের নীতি
  • দলগত প্রচেষ্টার নীতি
  • সমঝোতার নীতি
  • নিরবচ্ছিন্নতার নীতি
  • ভারসাম্যের নীতি
  • তত্ত্বাবধান পরিসরের নীতি
  • অবিচ্ছেদ্যতার/সুসংহতকরণের নীতি
  • কর্তৃত্বের নীতি
  • ব্যাপকতার নীতি
  • উৎপাদনের উপকরণের নীতি

চিত্র: সমন্বয়সাধনের নীতিমালা।

  • লক্ষ্যের ঐক্যের নীতি' (Principle of unity of goals): প্রতিষ্ঠানের মূল অভিপ্রায়কে লক্ষ্য বলে। আর লক্ষ্য
    অর্জনের ধাপ বা মাইলফলককে উদ্দেশ্য বলে। সমন্বয়সাধনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো লক্ষ্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা। সঠিক সমন্বয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তিক প্রচেষ্টা, বিভাগীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে ব্যক্তিক ও বিভাগীয় উদ্দেশ্যের ঐক্য তৈরি হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
  • শুরুতেই সমন্বয়ের নীতি (Coordination in early stage): এ নীতির অর্থ হলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ,
    পরিকল্পনা তৈরি ও কাজের শুরুতেই সমন্বয়ের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা। আর শুরুতেই সমন্বয় নিশ্চিত করতে না পারলে মাঝপথে বা অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় বিভিন্ন বিভাগ, উপবিভাগ ও কর্মপ্রচেষ্টার মধ্যে সমন্বয়সাধন করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। তাই শুরুতে কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হলে প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগ ও উপবিভাগের সাথে যোগাযোগ এবং সম্পদ ও কর্মীদের প্রচেষ্টার সাথে সমন্বয় বিধান করতে হবে।
  • ব্যক্তিগত/প্রত্যক্ষ যোগাযোগের নীতি (Principle of personal/direct communication): নির্বাহীরা ব্যক্তিগতভাবে কর্মীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করতে পারেন। তারা অধস্তনদের সাথে সরাসরি আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে কর্মীদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুবিধা-অসুবিধা প্রভৃতি ব্যাপার বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। এভাবে প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগ-উপবিভাগ বা শাখার কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রত্যক্ষ সংযোগ সমন্বয় প্রক্রিয়াকে সহজ করে।
  • নমনীয়তার নীতি (Principle of flexibility): পরিবর্তনশীল ব্যবসায় জগতে প্রায়ই বিভিন্ন সংযোজন, বিয়োজন,
    সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন প্রভৃতি প্রয়োজন হয়। সমন্বয় প্রক্রিয়াকেও পরিবর্তনের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। আর এজন্য প্রতিনিয়ত হালনাগাদ তথ্যাদির বিনিময় করতে হবে। নমনীয়তার নীতি অনুসরণের ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়। যেমনঃ জরুরি প্রয়োজনে কর্মীদের ওভারটাইমের ব্যবস্থা করা।।
  • অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের নীতি (Principle of informal relation): অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক সমন্বয় প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি কার্যকর করে। বাস্তবে বেশি আনুষ্ঠানিকতা ও ধরা-বাধা রীতি-নীতি, কাজকে বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করে। অপরদিকে নির্বাহী ও অধস্তনদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে যেকোনো জটিল কাজও দ্রুত করা যায়। তাই ব্যবস্থাপনাকে প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে আন্তঃবিভাগীয় যোগাযোগ বেড়ে থাকে।
  • আদেশের ঐক্যের নীতি (Principle of unity of command): আদেশের ধারা একক উৎস থেকে অব্যাহত
    থাকলে তা পালনে কর্মীদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হয় না। তাই কর্মীদের কাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একজন কর্মীকে শুধু একজন নির্বাহীর কাছ থেকেই আদেশ পেতে হবে। অর্থাৎ, দ্বৈত অধীনতা পরিহার করতে হবে। আর একান্ত প্রয়োজনে কর্মীকে একাধিক নির্বাহী আদেশ দিলেও তাতে অবশ্যই সামঞ্জস্য থাকতে হবে। এতে সুষ্ঠু সমন্বয়ের সাথে শৃঙ্খলাও নিশ্চিত হবে।
  • দলগত প্রচেষ্টার নীতি (Principle of group effort): একক প্রচেষ্টার চেয়ে দলগত প্রচেষ্টা অনেক বেশি কার্যকর হয়। দলীয় প্রচেস্টাকে সমন্বিত করা গেলে যেকোনো জটিল কাজ সহজেই করা যায়। কর্মীদের একক কর্মপ্রচেষ্টার ফল অপেক্ষা যৌথপ্রচেষ্টার ফলাফল বেশি হয়, যা সিনার্জি (Synergy) প্রভাব নামে পরিচিত। তাই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সমন্বয়ের মাধ্যমে দলীয় প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে হবে।
  • সমঝোতার নীতি (Principle of understanding): প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তির মধ্যে সুস্পর্ক,
    সহযোগিতা ও মিলেমিশে চলার নীতিকে সমঝোতার নীতি বলে। সমঝোতার মাধ্যমে দলবদ্ধতা, গতিশীলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সহযোগিতা তৈরি হয়। কর্মীদের মতানৈক্যও দূর হয়। এতে যেকোনো জটিল ও কঠিন কাজ সহজে করা যায়।
  • নিরবচ্ছিন্নতার নীতি (Principle of continuity): ব্যবস্থাপকীয় প্রতিটি কাজ পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিক ও বিরামহীনভাবে করাকে নিরবচ্ছিন্নতার নীতি বলে। এরূপ প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপকীয় কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিরাম গতিতে করতে হবে। কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকলে তার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে হবে। বিভাগ-উপবিভাগ ও কাজের মধ্যে সমন্বয়হীনতা যাতে না হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে।
  • ভারসাম্যের নীতি (Principle of balance): প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ ও উপবিভাগে বণ্টিত কাজের মধ্যে সমতা বজায় রাখার নীতি হলো ভারসাম্যের নীতি। কোনো বিভাগে সামর্থ্যের তুলনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দিলে, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত জনবলও নিয়োগ দিতে হবে। আর কোথাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জনবল থাকলে তা অন্য জায়গায় ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে। এভাবে কাজ ও কর্মীর মধ্যে সমতা বজায় রাখা উচিত। এতে আন্তঃবিভাগীয় শৃঙ্খলা রক্ষাও নিশ্চিত হয়।
  • তত্ত্বাবধান পরিসরের নীতি (Principle of span of supervision): একজন নির্বাহীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যত
    সংখ্যক কর্মী নিয়োজিত থাকে, তাকে তত্ত্বাবধান পরিসর বলা হয়। আর এর ওপর সমন্বয়ের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে। নির্বাহীর তত্ত্বাবধান পরিসর কাম্যমাত্রার হলে তিনি অধীনস্থ কর্মীদের কাজ সহজেই তদারকি করতে পারবেন। এছাড়া কাজে সমন্বয়সাধনও সহজ হবে। অন্যথায় নির্বাহী কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন ও সুষ্ঠু সমন্বয়ে বাধা তৈরি হবে। তাই কার্যকর সমন্বয়ের জন্য কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর নিশ্চিত করতে হবে।
  • অবিচ্ছেদ্যতার/সুসংহতকরণের নীতি (Principle of integration): সংগঠনের বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য ও দৃঢ় সম্বন্ধ বা সংযোগ স্থাপনের নীতিকে সুসংহতকরণের নীতি বলে। প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি একটি অপরটির সাথে সম্বন্ধযুক্ত থাকে। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কাজগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত বা সাজাতে হয়, যাতে পাশাপাশি থেকে প্রত্যেকেই কাজ করতে পারে। আর পারস্পরিক সমন্বয়ে কাজ অনেক দ্রুত ও সহজ হয়। কোনোরূপ সমস্যা বা পরিবর্তন দ্রুত অন্যকে জানিয়ে কার্যক্ষেত্রে নিজেরাই সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়।
  • কর্তৃত্বের নীতি (Principle of authority): আদেশ দেওয়ার বৈধ ক্ষমতাকে কর্তৃত্ব বলে। সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য
    নির্বাহীদের দায়িত্বের সাথে প্রয়োজনীয় মাত্রায় কর্তৃত্বও দিতে হয়। এতে তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন। নির্বাহীকে যথাযথ কর্তৃত্ব ও তা অধীনস্থ কর্মীদের ওপর প্রয়োগের অধিকার দিতে হয়। এতে তারা কাজে অবহেলা করার সুযোগ পায় না। নির্বাহীও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারেন।
  • ব্যাপকতার নীতি (Principle of Pervasiveness): প্রতিষ্ঠানের কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর সব মনোযোগ না দিয়ে সর্বত্র সমন্বয় ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এজন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব কর্মী ও বিভাগের কাজকে সমন্বয়ের আওতাভুক্ত করতে হবে। এছাড়া খেয়াল রাখতে হবে কোনো বিষয়ই যেন বাইরে না থাকে।
  • উৎপাদনের উপকরণের নীতি (Principle of factors of production): ব্যবস্থাপকীয় সব কাজ সুষ্ঠুভাবে করলেও কার্যকর সমন্বয় সম্ভব নয় যদি উৎপাদনের উপকরণ যথাযথ না হয়। তাই ব্যবস্থাপনাকে যথাসময়ে যথেষ্ট পরিমাণে মানসম্মত উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সমন্বয়ের সম্ভাব্য সব কৌশল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে যায়।

উপসংহারে বলা যায়, প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা নির্ভর করে। আর এ সাফল্যের পূর্বশর্ত হলো সমন্বয়। এ সমন্বয়কে কার্যকর করার জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে উল্লিখিত নীতি বা আদর্শ যথাযথভারে পালনের দিকে গুরুত্ব দিতে করতে হবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...