হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্ব (৭.৯)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

15

Motivation Theory of Herzberg

অধ্যাপক ফ্রেডারিক আরভিং হার্জবার্গ (Frederick Irving Herzberg) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ ১৯৫৯ সালে প্রেষণা সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। এটি হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Herzberg's Two Factors Theory) নামে পরিচিত। এ তত্ত্ব প্রবর্তনের লক্ষ্যে হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীগণ যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের কয়লাখনি এলাকায় একটি গবেষণা কাজ পরিচালনা করেন। এ গবেষণায় ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন হিসাবরক্ষক ও প্রকৌশলীর মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি ও উৎপাদনশীলতার সম্পর্কের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এ সাক্ষাৎকারে দু'টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। প্রথম প্রশ্নটি ছিল, 'আপনার কাজে কখন আপনি সম্পূর্ণভাবে স্বস্তি অনুভব করেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন কি?' দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল, 'আপনার কাজে আপনি কখন অস্বস্তি অনুভব করেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন কি?'

এতে দেখা যায়, দু'ধরনের উপাদান কর্মীদের মধ্যে কাজের প্রতি সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে প্রেষণামূলক (Motivational factors) এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান (Hygiene or Maintenance factors) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এজন্য এ তত্ত্বকে প্রেষণার দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Two Factors Theory) বলা হয়।
উল্লিখিত প্রশ্ন দু'টির উত্তর বিশ্লেষণ করে হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীরা মানুষের চাহিদাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এ দু'ধরনের উপাদানগুলো হলো-

ক. রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদান (Hygiene or Maintenance factors)
প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদান হলো কাজের সাথে সম্পৃক্ত আবশ্যকীয় উপাদান, যেগুলোর অনুপস্থিতি কর্মীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা যোগায় না। রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো হলো-

১. প্রতিষ্ঠানের নীতি ও প্রশাসন (Company policy and administration);

২. সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান (Perfect supervision);

৩. তত্ত্বাবধায়কের সাথে সম্পর্ক (Interpersonal relationship with supervisor);

৪. বেতন (Salary);

৫. কার্যপরিবেশ (Working environment);

৬. সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক (Relationship with peers and colleagues);

৭. ব্যক্তিগত জীবন (Personal life);

৮. অধস্তনদের সাথে সম্পর্ক (Relationship with subordinates);

৯. পদমর্যাদা (Status);

১০. নিরাপত্তা (Security) এবং

১১. আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা (Fringe benefits) ।

খ. প্রেষণা দানকারী উপাদান (Motivational factors or Satisfiers)

প্রতিষ্ঠানে যেসব উপাদানের উপস্থিতি কর্মীদের কাজ সম্পাদনে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করে, তাকে প্রেষণা দানকারী উপাদান বলে। এসব উপাদান কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। প্রেষণা দানকারী উপাদানগুলো উচ্চ স্তরের অভাব পূরণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এগুলো কাজকে কর্মীর কাছে আকর্ষণীয় ও পুরস্কারযোগ্য করে তোলে। প্রেষণা দানকারী উপাদানের উপস্থিতি কর্মীকে সন্তুষ্ট করে। তবে এগুলোর অনুপস্থিতিতে তারা অসন্তুষ্ট হয় না। বরং তারা নিরপেক্ষ থাকে এবং স্বাভাবিক গতিতে কাজ করে যায়। এ উপাদানগুলো হলো-

১. সাফল্য অর্জন (Achievement);

২. স্বীকৃতি (Recognition);

৩. দায়িত্ব (Responsibility);

৪. প্রতিযোগিতামূলক কাজ (Challenging work);

৫. ব্যক্তিক উন্নয়ন (Personal growth) এবং

৬. অগ্রগতি (Advancement) ।

হার্জবার্গের তত্ত্ব মতে, রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো অনুপস্থিতি কর্মীদের মাঝে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে এবং এগুলোর উপস্থিতি তাদেরকে নিরপেক্ষ অবস্থায় রাখে। অর্থাৎ, এগুলোর উপস্থিতির ফলে কর্মীরা অনুপ্রাণিত হয় না। এটি চিত্রের মাধ্যমে দেখানো যায়-

হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্বের সমালোচনা (Criticism of Herzberg's Motivation Theory) হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্ব সম্পর্কে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ নিম্নোক্তভাবে সমালোচনা করেছেন –

  • এটি নিতান্তই পদ্ধতিনির্ভর তত্ত্ব, যা বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য।
  • এ গবেষণায় শুধু উচ্চ স্তরের কর্মীদের প্রেষণা প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে। তাই এটি নিম্ন স্তরের কর্মীদের সব ক্ষেত্রে ও পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়।
  • এ তত্ত্বে, প্রেষণার উপাদানগুলো সঠিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। ফলে বেতন, কর্মপরিবেশ, পদমর্যাদা প্রভৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে, এগুলো যেকোনো স্তরের কর্মীদের প্রণোদিত করে থাকে।
  • এ তত্ত্বে, প্রেষণার উপাদানগুলো সঠিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। ফলে বেতন, কর্মপরিবেশ, পদমর্যাদা প্রভৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে, এগুলো যেকোনো স্তরের কর্মীদের প্রণোদিত করে থাকে।

অতএব, সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো পরস্পরবিরোধী নয় বরং এগুলো একটি অপরটির পরিপূরক। হার্জবার্গের পরামর্শ হলো- প্রতিষ্ঠানে প্রথমে রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানে সমাবেশ ঘটাতে হবে, যাতে কর্মীদের মনে কোনো অসন্তুষ্টি না থাকে। এরপর তাদের প্রেষণা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রেষণা দানকারী উপাদানে ব্যবস্থা করতে হবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...