সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্যাবস্থা আনয়নের প্রচেষ্টার অন্যতম অগ্রদূত শহীদুল্লা কায়সার। বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক হিসেবে তিনি শ্রমিক-জনতার দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য সক্রিয় সংগ্রামের ওপর গুরুত্ব দিতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন এবং ৩ জুন গ্রেফতার হয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করে মুক্তি পান। তাঁর রচিত উপন্যাসে উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বাঙালি জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সংগ্রামী চেতনা।
শহীদুল্লা কায়সার ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭ সালে ফেনীর তাঁর প্রকৃত নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান তাঁর ভাই এবং অভিনেত্রী শমী কায়সার তাঁর মেয়ে।
তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ সালে 'গণতান্ত্রিক যুবলীগ' গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
১৯৪৯ সালে 'সাপ্তাহিক ইত্তেফাক' পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সালে 'দৈনিক সংবাদ' এর সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। এতে দেশপ্রেমিক ছদ্মনামে 'রাজনৈতিক পরিক্রমা' ও বিশ্বকর্মা ছদ্মনামে 'বিচিত্র কথা' শিরোনামে উপসম্পাদকীয় লিখতেন।
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর সদস্যগণ তাঁকে ঢাকার কায়েতটুলির বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তাঁর উপন্যাসঃ
'সারেং বৌ' (১৯৬২): এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। এতে সমুদ্র উপকূলবর্তী জনপদের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কদম সারেং জাহাজের নাবিক। সৎ ও সরল বলে সহকর্মীদের মতো বাড়ি-গাড়ি করতে পারেননি, কিন্তু অভাব-অনটনের মধ্যেও ছিলো সুখের সংসার। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মাদক পাচারের অপরাধে জেলে যেতে হয়। দীর্ঘদিন কদম সারেং নিখোঁজ থাকায় যুবতী স্ত্রী নবিতুন ডুবে যায় দারিদ্র্যের করালগ্রাসের অন্তরালে এবং নিপতিত হয় লোলুপ সমাজপতিদের শিকারের কবলে। কিন্তু আদর্শনিষ্ঠ নবিতুন সব কিছু পরাজিত করে। প্রবল ঝড়ের পর সারেং ফিরে আসলে পিপাসিত কদম সারেংকে ধর্মীয় বিধি লংঘন করে নবিতুন নিজের দুগ্ধ পান করিয়ে সুস্থ করে তোলে। 'সারেং বৌ' উপন্যাসে সব সংস্কার তুচ্ছ করে মানবতাবোধকে জয়ী করা হয়েছে। উপন্যাসটির জন্য তিনি 'আদমজী পুরস্কার' (১৯৬২), 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার' (১৯৬২) লাভ করেন।
চরিত্র: কদম সারেং, নবিতুন।
'সংশপ্তক' (১৯৬৫): এর অর্থ- নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: হুরমতি, লেকু, রমজান।
তাঁর অন্যান্য রচনাঃ
স্মৃতিকথা : 'রাজবন্দীর রোজনামচা' (১৯৬২)।
ভ্রমণকাহিনি : 'পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ' (১৯৬৬)।