# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে- সবচেয়ে সুন্দর করুণ:
সেখানে সবুজ ডাঙা ভ'রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল;
সেখানে গাছের নাম কাঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল;
সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগিছে অরুণ;
সেখানে বারুণী থাকে গঙ্গাসাগরের বুকে- সেখানে বরুণ
কর্ণফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল;
সেইখানে শঙ্খচিল পানের বনের মতো হাওয়ায় চঞ্চল,
সেখানে লক্ষ্মীপেঁচা ধানের গন্ধের মতো অস্ফুট তরুণ;
সেখানে লেবুর শাখা নুয়ে থাকে অন্ধকারে ঘাসের উপর;
সুদর্শন উড়ে যায় ঘরে তার অন্ধকার সন্ধ্যার বাতাসে;
জসীমউদ্দিন পল্লিকবি হিসেবে সমাধিক পরিচিত । তাঁর নকসী কাথার মাঠ' কাব্যটি-(২১)- হয়েছে । তাঁর জনপ্রিয় ও অধিক সমাদৃত গ্রন্থ – (২২)- । সাহিত্য কৃতির স্বীকৃতি হিসেবে – (২৩) — তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি প্রদান করে । তাঁর 'কবর' কবিতটি স্কুল পাঠ্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় তাঁর - (২৪)।
বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতেরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের শাসক ও ধর্মমতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কেউ কেউ যুগবিভাগ করেছেন। বলে এই মতানৈক্য প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রাচীন ও আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস রচনার গৌরব পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্নের প্রাপ্য। ১৮৭৩ সালে তিনি "বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাব' গ্রন্থে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও উনিশ শতকের সাহিত্য সম্বন্ধে ধারাবাহিক আলোচনা করেন। তাঁর ইতিহাস তিনটি অংশে বিভক্ত হয়েছিল :
১. আদ্যকাল অর্থাৎ প্রাক-চৈতন্য পর্ব। এই অংশে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস ও কৃত্তিবাসের আলোচনা আছে,
২. মধ্যকাল অর্থাৎ চৈতন্যযুগ থেকে ভারতচন্দ্রের পূর্ব পর্যন্ত,
৩. ইদানীন্তন কাল – ভারতচন্দ্র থেকে রামগতি ন্যায়রত্নের সমকালীন কবি সাহিত্যিকদের বিবরণ রয়েছে।
১৮৯৬ সালে প্রকাশিত 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' গ্রন্থে ড. দীনেশচন্দ্র সেন বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরেন এবং সেখানে বিভিন্ন সাহিত্যসৃষ্টির বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে বাংলা সাহিত্যকে কয়েকটি যুগে বিভক্ত করেন।
ড. দীনেশচন্দ্র সেন যুগবিভাগ করেছেন এ ভাবে :
ক. হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ (৮০০ থেকে ১২০০ সাল), খ. গৌড়ীয় যুগ বা শ্রীচৈতন্য পূর্ব যুগ,
গ. শ্রীচৈতন্য সাহিত্য বা নবদ্বীপের প্রথম যুগ,
ঘ. সংস্কার যুগ এবং ঙ. কৃষ্ণচন্দ্রীয় যুগ অথবা নবদ্বীপের দ্বিতীয় যুগ।
ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সামনে তথ্যের অভাব ও গবেষণার অপূর্ণতা বিদ্যমান ছিল। বলে তিনি যুগ লক্ষণ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেন নি। প্রাচীন যুগকে তিনি যে অর্থে হিন্দু-বৌদ্ধযুগ বলে চিহ্নিত করেছেন তা একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ দিয়ে প্রমাণিত হয়। না। কোন সঠিক সূত্র প্রয়োগে তিনি যুগবিভাগ করেন নি; কোথাও ধর্ম, কোথাও শাসক তাঁর যুগবিভাগে আদর্শ হয়েছে বলে তা সুষ্ঠু হতে পারে নি ।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের যে যুগবিভাগ করেছেন তা হল : ক. প্রাচীন বা মুসলমানপূর্ব যুগ (৯৫০-১২০০ সাল),
খ. তুর্কি বিজয়ের যুগ (১২০০-১৩০০),
গ. আদি মধ্যযুগ বা প্রাকচৈতন্য যুগ (১৩০০-১৫০০),
ঘ. অন্ত্য মধ্যযুগ (১৫০০-১৮০০), চৈতন্য যুগ বা বৈষ্ণবসাহিত্য যুগ (১৫০০- ১৭০০) ও নবাবি আমল (১৭০০-১৮০০) এবং
ড. আধুনিক বা ইংরেজি যুগ (১৮০০ সাল থেকে)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রাম
রাবণ
শিব
বিষ্ণু
বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক ইতিহাসকে তিন যুগে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম যুগের নাম প্রাচীন যুগ। তবে কেউ কেউ আরও কয়টি নামে এ যুগকে অভিহিত করেছেন। সে নামগুলো হল : আদ্যকাল, গীতিকবিতার যুগ, হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ, আদি যুগ, প্রাক-তুর্কি যুগ, গৌড় যুগ ইত্যাদি। তবে প্রাচীন যুগ নামটির ব্যবহার ব্যাপক ও যথার্থ যুক্তিসঙ্গত ।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদের প্রায় সমসাময়িক কালে বাংলাদেশে যে সব সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রত্যক্ষ উপকরণ নয়। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদগুলো সম্পর্কে ১৯০৭ সালের আগে কোন তথ্যই জানা ছিল। না। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত Sanskrit Buddhist Literature in Nepal গ্রন্থে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র সর্বপ্রথম নেপালের বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন
বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে প্রাচীন ও নব্য প্রস্তরযুগ এবং তাম্রযুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে বলে ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেছেন। এ সকল যুগে বাংলার পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলেই মানুষ বাস করত এবং ক্রমে তারা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান বাঙালি জনগোষ্ঠী বহুকাল ধরে নানা জাতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এর মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলমান অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দু ভাগে ভাগ করা যায় : ক. প্রাক-আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠী এবং খ. আর্য নরগোষ্ঠী। এদেশে আর্যদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত অনার্যদেরই বসতি ছিল । এই প্রাক-আর্য নরগোষ্ঠী বাঙালি জীবনের মেরুদণ্ড। আর্যদের আগমনে সে জীবন উৎকর্ষমণ্ডিত হয়ে ওঠে।
বৈদিক যুগে আর্যদের সঙ্গে বাংলাদেশবাসীর কোন সম্পর্ক ছিল না। বৈদিক গ্রন্থাদিতে বাংলার নরনারীকে অনার্য ও অসভ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলার আদিম অধিবাসী আর্যজাতি থেকে উদ্ভূত হয় নি। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়—এই চার শাখায় বিভক্ত ছিল ।
নিগ্রোদের মত দেহগঠনযুক্ত এক আদিম জাতির এ দেশে বসবাসের কথা অনুমান করা হয়। কালের পরিবর্তনে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত। অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক গোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে গবেষকগণের ধারণা। কেউ কেউ তাদের 'নিষাদ জাতি' বলেন। প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে আসাম হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে অস্ট্রিক জাতি নেগ্রিটোদের উৎখাত করে । এরাই কোল ভীল সাঁওতাল মুণ্ডা প্রভৃতি উপজাতির পূর্বপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত। বাঙালির রক্তে এদের প্রভাব আছে। বাংলা ভাষার শব্দে ও বাঙালি জীবনের সংস্কৃতিতে এরা প্রভাব বিস্তার করেছে। অস্ট্রিক জাতির সমকালে বা কিছু পরে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি এদেশে আসে এবং সভ্যতায় উন্নততর বলে তারা অস্ট্রিক জাতিকে গ্রাস করে। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রণেই সৃষ্টি হয়েছে আর্যপূর্ব বাঙালি জনগোষ্ঠী। এদের রক্তধারা বর্তমান বাঙালি জাতির মধ্যে প্রবহমান।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলাদেশের অধিবাসীরা প্রথম থেকেই বাংলা ভাষায় কথা বলত না। বাংলা প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। তাই প্রাক- আর্য যুগের অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে তা সংশ্লিষ্ট নয়। তবে সেসব ভাষার শব্দসম্ভার রয়েছে বাংলা ভাষায়। অনার্যদের তাড়িয়ে আর্যরা এ দেশে বসবাস শুরু করলে তাদেরই আর্যভাষা বিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।
বাঙালি জাতি যেমন সঙ্কর জনসমষ্টি, বাংলা ভাষাও তেমনি সঙ্কর ভাষা। বর্তমান বাংলা ভাষা প্রচলনের আগে গৌড় ও পুণ্ড্রের লোকেরা অসুর ভাষাভাষী ছিল বলে অষ্টম শতকে রচিত 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' নামক সংস্কৃত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এই অসুর ভাষাভাষী লোকেরা ছিল সমগ্র প্রাচীন বঙ্গের লোক। অসুর ভাষাই অস্ট্রিক বুলি । ড. মুহম্মদ এনামুল হক মন্তব্য করেছেন, ‘বর্তমান বাংলা ভাষা প্রচলিত হইবার পূর্বে আমাদের দেশে যে এই অসুর ভাষা বা অস্ট্রিক বুলি প্রচলিত ছিল, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।' অস্ট্রিক বুলির কিছু শব্দ ও বাকরীতি এখনও বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়।
বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মনে করেছেন, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে এই মূল ভাষার অস্তিত্ব ছিল । আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেসব প্রাচীন শাখার সৃষ্টি হয়, তার অন্যতম হল আর্য শাখা। এ থেকেই ভারতীয় আর্য ভাষার সৃষ্টি। এর কাল ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ভারতীয় আর্য ভাষার তিনটি স্তর :
ক. প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা (বৈদিক-সংস্কৃত), খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ
শতাব্দী পর্যন্ত। খ. মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা (পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ), খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় দশম শতক পর্যন্ত ।
গ. নব্য ভারতীয় আর্যভাষা (বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, আসামি ইত্যাদি) খ্রিস্টীয় দশম
শতক থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত ।
ভারতীয় আর্যভাষার এই স্তরবিভাগ থেকে দেখা যায় যে, প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার স্তরে বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। জনতার প্রভাবে এ ভাষা পরিবর্তিত হয়ে মধ্যভারতীয় আর্যভাষার স্তরে আসে। প্রথম পর্যায়ে পালি এবং পরে প্রাকৃত ভাষা নামে তা চিহ্নিত হয়। অঞ্চলভেদে প্রাকৃত ভাষা কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়। এর একটি ছিল মাগধি প্রাকৃত। এ ভাষার প্রাচ্যতর রূপ গৌড়ী প্রাকৃত । তা থেকে গৌড়ী অপভ্রংশের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। এই পর্যায়ের অন্যান্য ভাষা হল মৈথিলি, মাগধি, ভোজপুরিয়া, আসামি ও উড়িয়া। বাংলা ভাষার জন্মকাল কেউ কেউ দশম শতক বলে নির্ণয় করেছেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী। কম পক্ষে হাজার বছরের পুরানো বাংলা ভাষা উৎপত্তির পর থেকে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে আদি মধ্য ও আধুনিক—এই তিন যুগের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করা যায়। আদি বা প্রাচীন যুগের বাংলা ভাষার কাল দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময়ের প্রধান নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা থেকে তখন পর্যন্ত তার পূর্ববর্তী অপভ্রংশের প্রভাব দূর হয়ে যায় নি, এমন কি প্রাকৃতের প্রভাবও তাতে বর্তমান ছিল। তবে এখানেই বাংলা ভাষা তার স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা লিপি ব্রাহ্মী লিপি থেকে উৎপন্ন। শুধু বাংলা নয় সকল ভারতীয় লিপিই এই ব্রাহ্মী লিপি থেকে জন্মলাভ করেছে। ব্রাহ্মী লিপি ভারতের মৌলিক লিপি। সিংহলি, ব্রহ্মী, শ্যামী, যবদ্বীপী ও তিব্বতি লিপির উৎসও ব্রাহ্মী লিপি। সম্রাট অশোকের অনুশাসন সুগঠিত ব্রাহ্মী লিপিতেই উৎকীর্ণ। ব্রাহ্মী লিপির সমসাময়িক কালে উত্তর- পশ্চিম ভারতে খরোষ্ঠী লিপির প্রচলন ছিল। পরে ব্রাহ্মী লিপি সে স্থান অধিকার করে।
অষ্টম শতাব্দীতে ব্রাহ্মী লিপি থেকে পশ্চিমা লিপি, মধ্যভারতীয় লিপি ও পূর্বী লিপি—এই তিনটি শাখার সৃষ্টি হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভব হয়েছে মধ্যভারতীয় ও পূর্বী লিপির এবং দক্ষিণী ব্রাহ্মী লিপি থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের নাগরী লিপির উদ্ভব হয়েছে। পূর্বী লিপি থেকেই বাংলার জন্ম। নাগরী লিপি বাংলা অক্ষরের চেয়ে পুরানো নয়। উত্তর-পশ্চিমা লিপি ষষ্ঠ শতক থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লিপিকে স্থানচ্যুত করে। তবে সপ্তম শতকে উত্তর-পূর্ব ভারতে পূর্বী লিপি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নাগরী লিপি পূর্বভারতে কিছুকাল প্রাধান্য বজায় রেখেছিল, কিন্তু পূর্ব-ভারতে পূর্বী লিপি অক্ষত থাকে এবং একাদশ-দ্বাদশ শতকের মধ্যেই এই পূর্বী লিপি থেকে বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে।
সেন যুগে বাংলা লিপির গঠনকার্য শুরু হলেও পাঠান যুগে তার মোটামুটি আকার লাভ করে। ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ে হাতে লেখা হয়েছে বলে বাংলা লিপি নানা পরিবর্তনের মাধ্যमে হয়েছে। ছাপাখানার প্রভাবে পরবর্তীকালে বাংলা লিপির তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে। নি। উড়িয়া, মৈথিলি ও আসামি লিপির ওপর বাংলা লিপির প্রভাব বিদ্যমান। আমি ও বাংলা অক্ষরের মধ্যে গুটিকয়েক অক্ষর ছাড়া কোন পার্থক্য নেই। বাংলা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হলেও, বাংলা লিপির কোন ব্যবধান সৃষ্টি হয় নি ।
শব্দসম্ভার
বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় :
১. তৎসম, ২. অর্ধতৎসম, ৩, তদ্ভব, ৪. দেশি ও ৫. বিদেশি শব্দ।
১. তৎসম শব্দ : যেসব শব্দ পরিবর্তন ছাড়াই সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে। সেগুলো তৎসম শব্দ। যেমন: চন্দ্র, সূর্য, হস্ত, পদ ইত্যাদি। ২. অর্ধতৎসম শব্দ : যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে কিছুটা বিকৃত হয়ে বাংলায় এসেছে
সেগুলো অর্ধতৎসম শব্দ। যেমন : গিন্নি, পিরীত, অঘ্রান, গেরাম ইত্যাদি । ৩. তদ্ভব শব্দ : যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে সেগুলো তদ্ভব শব্দ। যেমন : হাত, পা, ছাতা, পাখা ইত্যাদি ।
৪. দেশি শব্দ : যেসব শব্দ এদেশের আদিম অধিবাসী অনার্যদের ভাষা থেকে
বাংলায় এসেছে সেগুলো দেশি শব্দ। যেমন : ঢেঁকি, ডোঙা, খড়, চুলা ইত্যাদি। ৫. বিদেশি শব্দ : যেসব শব্দ বিদেশি ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে সেগুলো বিদেশি শব্দ। যেমন : কলম, চেয়ার, চিনি, বেগম ইত্যাদি।
বাংলা বর্ণমালা গড়ে উঠেছে এগারটি স্বরবর্ণ এবং ঊনচল্লিশটি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে। সাকুল্যে এই পঞ্চাশটি বর্ণের সাহায্যে সৃষ্টি হয়েছে সোয়া লক্ষের মত শব্দের—যার পঞ্চাশ হাজার তৎসম শব্দ, আড়াই হাজার আরবি-ফারসি, শ চারেক তুর্কি, হাজার খানেক ইংরেজি, দেড় শ পর্তুগিজ-ফরাসি, আর কিছু শব্দ বিদেশি, বাদবাকি শব্দ তত্ত্বৰ ও দেশি ।
উপসংহারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় বলা যায়, 'বাংলাদেশের ইতিহাস খণ্ডতার ইতিহাস। পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গ, রাঢ় বরেন্দ্রের ভাগ কেবল ভূগোলের ভাগ নয়; অন্তরের ভাগও ছিল তার সঙ্গে জড়িয়ে, সমাজের মিলও ছিল না। তবু এর মধ্যে এক ঐক্যের ধারা চলে এসেছে সে ভাষার ঐক্য নিয়ে। আমাদের যে বাঙালি বলা হয়েছে তার সংজ্ঞা হচ্ছে, আমরা বাংলা বলে থাকি।'
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল- | |
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে | ৬৫০-১২০০ খ্রি. |
| ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে | ৯৫০-১২০০ খ্রি. |
| ড. সুকুমার সেনের মতে | ৯০০-১৩৫০ খ্রি. |
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।

চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা- | |
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে | ২৩ জন |
| ড. সুকুমার সেনের মতে | ২৪ জন |
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
চর্যাপদের যে পদ পদ পাওয়া যায়নিঃ
২৩ নং অর্ধেক, ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদ।
যেসব পদ পাওয়া যায়নি সেগুলোর রচয়িতাঃ
২৩- ভুসুকুপা, ২৪- কাহ্নপা, ২৫- তান্তীপা, ৪৮- কুকুরীপা।
চর্যাপদের প্রথম পদের রচয়িতাঃ
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
চর্যাপদের অনুবাদক | ||
ভাষা | অনুবাদক | অনূদিত নাম |
| তিব্বতি | কীর্তিচন্দ্র | - |
| হিন্দি | রাহুল সাংকৃত্যায়ন | দোহাকোষ (১৯৫৭) |
| ইংরেজি | হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ | মিস্টিক পোয়েট্রি অব বাংলাদেশ (২০১৭) |
| সংস্কৃত | প্রবোধচন্দ্র বাগচী | - |

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময় মধ্যযুগ বলে চিহ্নিত। এর মধ্যে ১২০০ থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত দেড় শ বছরকে কেউ কেউ অন্ধকার যুগ বা তামস যুগ বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশে তুর্কি বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমান শাসনামলের সূত্রপাতের পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি হয় নি অনুমান করে এ রকম সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলার সেন বংশের শাসক অশীতিপর বৃদ্ধ লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া বিনা বাধায় জয় করে এদেশে মুসলমান শাসনের সূত্রপাত করেন। ১৩৪২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ গৌড়ের সিংহাসন দখল করে দিল্লির শাসনমুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর পুত্র সেকান্দর শাহের আমলে বড়ু চণ্ডীদাসের আবির্ভাব হয়। বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আনুমানিক ১২০০ সাল থেকে চৌদ্দ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কাল সৃজনহীন ঊষরতায় আচ্ছন্ন বলে মনে হয় ।
বলা হয়ে থাকে, ক্ষমতালোভী বিদেশাগত মুসলমান আক্রমণকারীরা বিবেচনাহীন সংগ্রাম শাসন আর শোষণের মাধ্যমে দেশে এক অস্বস্তিকর আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছিল। চারুজ্ঞান বিবর্জিত জঙ্গীবাদী বস্তুবাদী শাসকদের অত্যাচারে সাহিত্য সৃষ্টি করার মত সুকুমার বৃত্তির চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘর্ষের ফলে বাঙালির বহির্জীবনে ও অন্তর্জীবনে ভীতি বিহ্বলতার সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলমান শাসনের সূত্রপাত এদেশের জন্য কোন কল্যাণ বহন করে এনেছিল কিনা তা সর্বাগ্রে পর্যালোচনা করে বিতর্কের অবতারণা করা উচিত ছিল।
প্রকৃত পক্ষে বাংলা সাহিত্যবর্জিত তথাকথিত অন্ধকার যুগের জন্য তুর্কিবিজয় ও তার ধ্বংসলীলাকে দায়ী করা বিভ্রান্তিকর। এ সময়ের যে সব সাহিত্য নিদর্শন মিলেছে এবং এ সময়ের রাজনৈতিক অবস্থার যে সব তথ্য লাভ করা গেছে তাতে অন্ধকার যুগের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না। অন্ধকার যুগের দেড় শ বছর মুসলমান শাসকেরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন এ কথা সত্য নয়। ইলিয়াস শাহি আমলের পূর্ব পর্যন্ত খিলজি বলবন ও মামলুক বংশের যে পঁচিশ জন শাসক বাংলাদেশ শাসন করেছিলেন তাঁদের কারও কারও রাজত্বে সাকুল্যে পনের-বিশ বৎসর মাত্র দেশে অশান্তি ছিল, অন্যদের বেলায় শান্ত পরিবেশ বিদ্যমান ছিল বলে ইতিহাস সমর্থন করে। তৎকালীন যুদ্ধবিগ্রহ দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে অথবা অন্তর্বিরোধে ঘটেছে বলে তা ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে নি। ফলে তাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার কোনও কারণ ঘটে নি। বরং এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামি শিক্ষাদীক্ষা, ধর্মকর্ম, আচারব্যবহার, আহারবিহার প্রভৃতির প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশবাসীর মধ্যে ইসলামি পরিবেশ গড়ে উঠছিল ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সর্বজনস্বীকৃত খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত মধ্যযুগের প্রথম কাব্য 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। এটির রচয়িতা মধ্যযুগের আদি বা প্রথম কবি বড়ু চণ্ডীদাস। হাতে লেখা পুঁথিখানির প্রথমে দুটি পাতা, মাঝখানে কয়েকটি পাতা ও শেষের পাতাটি নেই। পুঁথিখানিতে গ্রন্থের নাম, রচনাকাল ও পুঁথি-নকলের দিনক্ষণ কিছুই উল্লেখ নেই। এজন্য কবির পরিচয়, গ্রন্থনাম ও রচনাকাল অংশ পাওয়া যায়নি। তবে পুঁথির সাথে একটি চিরকূট পাওয়া গিয়েছে, তাতে 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব' বলে একটা কথা লিখিত আছে। 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' নামটি রাখেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ।
১৯০৯ সালে (১৩১৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাকিল্যা (কালিয়া) গ্রামের শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশীয় দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় নামক এক ব্রাহ্মণের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচার ওপর থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পুঁথিশালার অধ্যক্ষ বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এটি উদ্ধার করেন। বসন্তরঞ্জন রায়ের উপাধি- 'বিদ্বদ্বল্লভ'।
'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের রচনাকাল- | |
| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহরর মতে | ১৪০০ সালে |
| গোপাল হালদারের মতে | ১৪৫০-১৫০০ সালের মধ্যে |
বসন্তরঞ্জন রায় ১৯১৬ সালে (১৩২৩ ব.) 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' থেকে এটি প্রকাশ করেন। বর্তমানে এটি ২৪৩/১, আচার্য প্রফুল্ল রায় (কলকাতা) রোডের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পুঁথিশালায় সংরক্ষিত আছে। এ কাব্যের মুখবন্ধ লেখেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী এবং লিপিকাল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে খণ্ড ও চরিত্রঃ
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে ১৩ টি খণ্ড। যথা: ১. জন্ম খণ্ড, ২. তাম্বুল খণ্ড, ৩. দান খণ্ড, ৪. নৌকা খণ্ড, ৫. ভার খণ্ড, ৬. ছত্র খণ্ড ৭. বৃন্দাবন খণ্ড, ৮. কালিয়দমন খণ্ড, ৯. যমুনা খণ্ড, ১০. হার খণ্ড, ১১. বাণ খণ্ড, ১২. বংশী খণ্ড, ১৩. বিরহ খণ্ড।
চরিত্র: রাধা (জীবাত্মা বা প্রাণিকুল), কৃষ্ণ (পরমাত্মা বা ঈশ্বর) ও বড়ায়ি (রাধাকৃষ্ণের প্রেমের দূতি)।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের অপর নাম 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ'। 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' নামটি রাখেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ।
'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপেঃ
জন্ম খণ্ড: কৃষ্ণ ও রাধা উভয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্ত্যে মানবরূপে জন্ম নিয়েছে। কৃষ্ণ পাপী কংস রাজাকে বধ করার জন্য দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। জন্মের পরেই বাসুদেব গোপনে কৃষ্ণকে অনেক দুরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের কাছে রেখে আসে। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় রাধা আরেক গোপ সাগর গোয়ালার স্ত্রী পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয়। দৈব নির্দেশেই বালিকা বয়সে নপুংসক আইহন বা আয়ান গোপের সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণ করতে গেলে রাধাকে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়ির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
তাম্বুল খণ্ড: অন্য গোপ বালিকাদের সাথে রাধা মথুরাতে দই- দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়িও যায় তার সাথে। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং রাধার রূপের বর্ণনা দিয়ে কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করে, এমন রূপসীকে দেখেছে কিনা? রাধার রূপের বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ পূর্বরাগ অনুভব করে। সে বড়ায়িকে বুঝিয়ে রাধার জন্য পান ও ফুলের উপহারসহ প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু বিবাহিতা রাধা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
দান খণ্ড: কৃষ্ণ দই-দুধ বিক্রির জন্য মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে। তার দাবী নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, অন্যথায় রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে। রাধা কোনভাবেই এ প্রস্তাবে রাজি হয় না। এদিকে তার হাতে কড়িও নেই। রাধা নিজের রূপ কমাবার জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইলো; কৃষ্ণের হাত থেকে বাচাঁর জন্য বনে দৌড় দিল। কৃষ্ণ পিছু ছাড়বার পাত্র নয়। অবশেষে কৃষ্ণের ইচ্ছায় কর্ম হয়।
নৌকা খণ্ড: পরবর্তীতে রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে। কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকাতে রাধাকে তুলে সে মাঝ নদীতে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভ করে। নদীতীর উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে যে, নৌকা ডুবে গিয়েছে, কৃষ্ণ তার জীবন বাঁচিয়েছে, কৃষ্ণ না থাকলে সে ডুবে মারা যেত।
ভার খণ্ড: শরৎকালে শুকনো পথঘাট, তাই হেঁটেই মথুরাতে গিয়ে দুধ-দই বিক্রি করা যায়। কিন্তু রাধা আর বাড়ির বাইরে আসে না। আগের ঘটনাগুলো সে শাশুড়ি বা স্বামীকেও ভয়ে ও লজ্জায় খুলে বলেনি। রাধা অদর্শনে কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কি হবে, রাধা দই-দুধ বেঁচে কটি পয়সা তো আনতে পারে। শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। কিন্ত প্রচণ্ড রোদে কোমল শরীরে দুধ-দই বহন করতে গিয়ে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এসময় কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরি করতে আসে। পরে ভার বহন অর্থাৎ মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে। রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সে কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। তাই কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত আসে।
ছত্র খণ্ড: দুধ-দই বেচে মথুরা থেকে এবার ফেরার পালা। কৃষ্ণ তার প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে, 'এখনো প্রচণ্ড রোদ। তুমি আমাদের মাথায় ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। পরে দেখা যাবে।' কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবু আশা নিয়েই কৃষ্ণ ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তার আশা পূর্ণ করেনি রাধা।
বৃন্দাবন খণ্ড: রাধার বিরুদ্ধ আচরণ কৃষ্ণের ভাবান্তর ঘটায়। সে অন্য পথ অবলম্বন করে। কৃষ্ণ কটু বাক্য না বলে, দান বা শুল্ক আদায়ের নামে বিড়ম্বনা না করে, বরং বৃন্দাবনকে অপূর্ব শোভায় সাজিয়ে তুলে। রাধা ও গোপীরা সেই শোভা দর্শন করে কৃষ্ণের উপর রাগ ভুলে যায়। কৃষ্ণ সব গোপীকে দেখা দেয়। পরে রাধার সঙ্গে তার দর্শন ও মিলন হয়।
কালিয়দমন খণ্ড: বৃন্দাবনের উপর দিয়ে যমুনা নদী প্রবাহিত। এ যমুনায় কালিয়নাগ বাস করে। কালিয়নাগের বিষে যমুনার জল বিষাক্ত। কৃষ্ণ কালিয়নাগকে তাড়াতে নদীর জলে ঝাঁপ দেয়। দৈব ইচ্ছায় ও কৃষ্ণের বীরত্বে কালিয়নাগ পরাস্ত হয় এবং দক্ষিণ সাগরে বসবাস করতে যায়। কালিয়নাগের সঙ্গে কৃষ্ণ যখন জলযুদ্ধে লিপ্ত তখন রাধার বিশেষ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়।
যমুনা খণ্ড: রাধা ও গোপীরা যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর ওঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। কিন্তু কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখিরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদীতীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে।
হার খণ্ড: রাধা কৃষ্ণের চালাকি বুঝতে পারে। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যে বলে মাকে। কৃষ্ণ বলে, 'আমি হার চুরি করব কেন, রাধাতো পাড়ার সম্পর্কে আমার মামি।' বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারানোতে যাতে রাগান্বিত না হয় সেজন্য বলে যে, 'বনের কাঁঠায় রাধার গজমতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।'
বাণ খণ্ড: কৃষ্ণ রাধার উপর ক্রুদ্ধ হয় মায়ের কাছে নালিশ করার জন্য। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়। বড়ায়ি বুদ্ধি দিলো, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতো কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্ছিত ও পতিত হয়। এরপর কৃষ্ণ রাধাকে চৈতন্য ফিরিয়ে দেয়। রাধা কৃষ্ণ প্রেমে কাতর হয় এবং কৃষ্ণকে খুঁজে ফেরে।
বংশী খণ্ড: কৃষ্ণ রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে বাঁশিতে সুর তোলে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লির মতো পুড়তে থাকে, রাত্রে ঘুম আসে না। ভোর বেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্ছা যায়। বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারারাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শিয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাঁশি চুরি করো, তবেই সকল সমস্যার সমাধান হবে। বড়াইয়ের বুদ্ধি শুনে রাধা তাই করে। কিন্তু কৃষ্ণ বুদ্ধিমান, তাই বাঁশি চোর কে তা বুঝতে তার কষ্ট হয় না। রাধা কৃষ্ণকে বলে, বড়ায়িকে স্বাক্ষী রেখে কৃষ্ণের কথা দিতে হবে যে, 'সে কখনো রাধার কথার অবাধ্য হবে না এবং রাধাকে ত্যাগ করে যাবে না, তবেই বাঁশির সন্ধান মিলতে পারে।' কৃষ্ণ কথা দিয়ে বাঁশি ফিরে পায়।
বিরহ খণ্ড: তারপর কৃষ্ণ রাধার উপর উদাসীনতা প্রকাশ করে। মধুমাস সমাগত, তাই রাধা বিরহ অনুভব করে। রাধা বড়ায়িকে বলে, কৃষ্ণকে এনে দিতে। দুধ-দই বিক্রির ছল করে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খোঁজার জন্য বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে, 'তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছো, ভার বহন করিয়েছো, মায়ের কাছে আমার নামে বিচার দিয়েছো, তাই তোমার উপর আমার মন উঠে গেছে।' রাধা বলে, 'তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা কর। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তির্যক দৃষ্টি হলেও তুমি আমার দিকে তাঁকাও।' কৃষ্ণ বলে, 'বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি।' অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধাকৃষ্ণের মিলন হয়। রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ নিদ্রিতা রাধাকে রেখে কংস বধ করার জন্য মথুরাতে চলে য়ায়। ঘুম থেকে উঠে কৃষ্ণকে না দেখে রাধা আবার বিরহকাতর হয়ে পড়ে। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি কৃষ্ণের সন্ধানে যায় এবং মধুরাতে কৃষ্ণকে পেয়ে অনুরোধ করে, 'রাধা তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তুমি উন্মাদিনীকে বাঁচাও।' কিন্তু কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যেতে চায় না এবং রাধাকে গ্রহণ করতেও চায় না। কৃষ্ণ বলে, 'আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু কটুকথা সহ্য করতে পারি না। রাধা আমাকে কটুকথা বলেছে।' ('শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্য এখানেই ছিন্ন। পরবর্তী পৃষ্ঠা পাওয়া যায়নি। তাই এ গ্রন্থের সমাপ্তি কেমন তা জানা যায় না।)
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম গৌরব বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য। রাধা- কৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে এই অমর কবিতাবলির সৃষ্টি এবং বাংলাদেশে শ্রীচৈতন্যদের প্রচারিত বৈষ্ণব মতবাদের সম্প্রসারণে এর ব্যাপক বিকাশ। জয়দেব-বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাস থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বৈষ্ণব গীতিকবিতার ধারা প্রবাহিত হলেও প্রকৃতপক্ষে ষোল-সতের শতকে এই সৃষ্টিসম্ভার প্রাচুর্য ও উৎকর্ষপূর্ণ ছিল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফসল বৈষ্ণব পদাবলি ।
পদাবলি সাহিত্য বৈষ্ণবতত্ত্বের রসভাষ্য। বৈষ্ণব পদাবলি বৈষ্ণবসমাজে মহাজন পদাবলি এবং বৈষ্ণব পদকর্তাগণ মহাজন নামে পরিচিত। বৈষ্ণবমতে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক বিদ্যমান। এই প্রেম সম্পর্ককে বৈষ্ণব মতাবলম্বীগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার রূপকের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছেন। রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের রূপাশ্রয়ে ভক্ত ও ভগবানের নিত্যবিরহ ও নিত্যমিলনের অপরূপ আধ্যাত্মিক লীলা কীর্তিত হয়েছে। বৈষ্ণবদের উপাস্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর আনন্দময় তথা প্রেমময় প্রকাশ ঘটেছে রাধার মাধ্যমে । রাধা মানবী নয়, শ্রীকৃষ্ণরূপ পূর্ণ ভগবৎ-তত্ত্বের অংশ। ভগবানের লীলা চলে। তাঁর স্বরূপভূতা শক্তি রাধার সঙ্গে। বৈষ্ণবেরা ভগবান ও ভক্তের সম্পর্কের স্বরূপ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণকে পরামাত্মা বা ভগবান এবং রাধাকে জীবাত্মা বা সৃষ্টির রূপক মনে করে তাঁদের বিচিত্র প্রেমলীলার মধ্যেই ধর্মীয় তাৎপর্য উপলব্ধি করেছেন। ফলে “এক প্রাচীন গোপজাতির লোকগাথার নায়ক প্রেমিক কৃষ্ণ এবং মহাভারতের নায়ক অবতার কৃষ্ণ কালে লোকস্মৃতিতে অভিন্ন হয়ে উঠেন। গোপী-প্রধানা রাধার সঙ্গে তাঁর প্রণয়ই জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রণয়লীলার রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে ধর্ম-দর্শনের ও সাধন-ভজনের অবলম্বন হয়েছে।' নীলরতন সেন মন্তব্য করেছেন, 'পদাবলির কাহিনি, তথ্য উপকরণ এবং ভক্তি-ভাবাশ্রিত সৌন্দর্য চিত্রায়ণে বৈষ্ণব কবিরা উপনিষদ, হালের গাথাসপ্তশতী, আভীর ও অন্যান্য জাতির মৌলিক প্রেমগাথা, ভাগবতসহ বিবিধ পুরাণ, বাৎসায়নের কামসূত্র, অমরুশতক, আনন্দবর্ধনের ধ্বন্যালোক, কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়, সদুক্তিকর্ণামৃত, সুভাষিতাবলী, সূক্তিমুক্তাবলী প্রভৃতি প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণ, লোকধর্ম ও
প্রেমগীতিকে আশ্রয় করে ভারতের পূর্বাচার্যদের অনুসৃত পথেই অগ্রসর হয়েছেন। চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) যুগান্তকারী আবির্ভাবের পূর্বেই রাধাকৃষ্ণ প্রেম- লীলার মাধুর্য পদাবলিগানের উপজীব্য হয়েছিল। কিন্তু চৈতন্যদেবের প্রভাবে যে নব্য মানবীয় প্রেমভক্তিধারার বিকাশ ঘটে তা অবলম্বনেই বিপুল ঐশ্বর্যময় পদাবলি। সাহিত্যের সার্থকতর রূপায়ণ সম্ভবপর হয়। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে কৃষ্ণলীলা। বিষয়ক গানে ভক্তিরসের রং লাগলেও তা থেকে আদিরসের ক্লেদ দূর হয়ে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ভক্তহৃদয়ের প্রতিফলন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছিল। পৌরাণিক, লৌকিক ও পৌরাণিক-লৌকিক সংমিশ্রিত দেব-দেবীর লীলামাহাত্ম্য, পূজা প্রচার ও ভক্তকাহিনি প্রভৃতি অবলম্বনে রচিত সম্প্রদায়গত প্রচারধর্মী ও আখ্যানমূলক কাব্য হলো মঙ্গলকাব্য। বিভিন্ন দেবদেবীর গুণগান এবং পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি মঙ্গলকাব্যের উপজীব্য। তবে 'মঙ্গল' কথাটি থাকলেও 'চৈতন্যমঙ্গল', 'গোবিন্দমঙ্গল' প্রভৃতি মঙ্গলকাব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; এগুলো বৈষ্ণব সাহিত্যের অংশ। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে, প্রায় ৬২ জন কবি মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন।
মঙ্গলকাব্য
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্যই মঙ্গলকাব্য। এটি রচনার মূল কারণ স্বপ্নদেবী কর্তৃক আদেশ লাভ। 'মঙ্গল' শব্দের অর্থ কল্যাণ। যে কাব্যে দেবতার আরাধনা বা মাহাত্ম্য-কীর্তন করা হয়; যে কাব্য শ্রবণ করলেও মঙ্গল হয় বা ঘরে রাখলেও মঙ্গল হয় অথবা ৮ দিনে অর্থাৎ এক মঙ্গলবার শুরু হতো এবং পরবর্তী মঙ্গলবার শেষ হতো, তাকেই বলা হয় মঙ্গলকাব্য। মূলত, লৌকিক দেব-দেবী নিয়ে রচিত কাব্যই মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যের মূল উপজীব্য: দেব-দেবীর গুণগান। এতে স্ত্রী দেবতাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কাব্যগুলোর নামকরণ করা হত যে দেবতার পূজা প্রচারের জন্য কাব্যটি রচিত সে দেবতার নামানুসারে।
মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনি
চম্পক নগরের অধীশ্বর বণিক চাঁদ সওদাগর। জগতপিতা শিবের মহাভক্ত। চাঁদ জগতপিতা শিবের থেকে মহাজ্ঞান লাভ করেছেন। মানুষের পূজা ব্যতীত দেবত্ব অর্জন সম্ভব নয়, তাই মনসা চাঁদের কাছে পূজা চাইলেন। শিবভিন্ন অপর কাউকে পূজা করতে চাঁদ প্রত্যাখ্যান করলেন। এমনকি পত্নী সনকার মনসার ঘটে হেঁতালদণ্ড দিয়ে আঘাত করেন। পরিণামে মনসা কৌশলে চাঁদের মহাজ্ঞান হরণ করেন এবং ছয়পুত্রকে বিষ দিয়ে হত্যা করেন। তারপর সমুদ্রপথে চাঁদের বাণিজ্যতরী সপ্তডিঙা মধুকর ডুবিয়ে চাঁদকে সর্বস্বান্ত করেন। চাঁদ কোনোক্রমে প্রাণরক্ষা করেন। মনসা ছলনা করে স্বর্গের নর্তকদম্পতি অনিরুদ্ধ-ঊষাকে মর্ত্যে পাঠালেন। অনিরুদ্ধ চাঁদের ঘরে জন্ম নেয় লখিন্দর রূপে, আর উজানী শহরে সাধুবণিকের ঘরে বেহুলারূপে ঊষা জন্ম নেয়। বহুকাল পরে সহায় সম্বলহীন চাঁদ চম্পক নগরে পাগল বেশে আসে। অবশেষে পিতা পুত্রের মিলন ঘটল। বেহুলার সাথে লখিন্দরের বিবাহ স্থির হল। মনসা বৃদ্ধা বেশে এসে ছল করে বেহুলাকে শাপ দিল, 'বিভা রাতে খাইবা ভাতার'। সাতালি পর্বতে লোহার বাসরঘর বানানো হল। ছিদ্র পথে কালনাগিনী ঢুকে লখিন্দরকে দংশন করল। বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে কলার ভেলায় ভেসে পাড়ি দিল। বহু বিপদ অতিক্রম করে অবশেষে নেতো ধোবানির সাহায্যে দেবপুরে পৌছে নাচের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট করল। তখন দেবতাদের আদেশে মনসা সব ফিরিয়ে দিল। বেঁচে উঠলো লখিন্দর, ভেসে উঠলো চৌদ্দ ডিঙা। চাঁদ পাগলের মত ছুটে আসলো বেহুলার কাছে। এসে শুনলো যে তাকে মনসার পূজা করতে হবে। কিন্তু এ শর্ত চাঁদ প্রত্যাখান করলো। বেহুলা গিয়ে কেঁদে পড়ল চাঁদের পায়ে এবং চাঁদ বেহুলার অশ্রুর কাছে পরাজিত হল। চাঁদ হেলাভরে মুখ ফিরিয়ে বাঁ হাতে একটি ফুল ছুড়ে দিল। মনসা এতেই খুশি। মর্ত্যবাসের মেয়াদ ফুরালে বেহুলা-লখিন্দর আবার ইন্দ্রসভায় স্থান পেল। আর পৃথিবীতে প্রচারিত হলো মনসার পূজা।
মঙ্গলকাব্যের সাধারণ লক্ষণ / বৈশিষ্ট্যগুলো
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্যই মঙ্গলকাব্য। নিম্নে এর সাধারণ লক্ষণ /বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো।
১. প্রায় সব কবি স্বপ্নে দেবতার নির্দেশ পেয়ে কাব্য রচনা করেছেন।
২. প্রথমেই সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশের বন্দনা।
৩. কাব্যের অধিকাংশ ঘটনা সাধারণ নয়, অসাধারণ।
৪. মঙ্গলকাব্যের নায়ক-নায়িকারা সবাই শাপভ্রষ্ট দেবতা, শাপান্তে স্বর্গে ফিরে যান।
৫. মর্ত্যে পূজা প্রচারের সময় দেবতাদের আচরণ মানুষের মতো।
মঙ্গলকাব্যর প্রকারভেদঃ
মঙ্গলকাব্য প্রধানত ২ প্রকার। যথা:
ক. পৌরাণিক শ্রেণি:
'গৌরীমঙ্গল', 'ভবানীমঙ্গল', 'দুর্গামঙ্গল', 'অন্নদামঙ্গল', 'কমলামঙ্গল', 'গঙ্গামঙ্গল', 'চণ্ডিকামঙ্গল'।
খ. লৌকিক শ্রেণি:
'শিবমঙ্গল' (শিবায়ন), 'মনসামঙ্গল', 'চণ্ডীমঙ্গল', 'কালিকামঙ্গল' (বিদ্যাসুন্দর), 'শীতলামঙ্গল', 'রায়মঙ্গল', 'ষষ্ঠীমঙ্গল', 'সারদামঙ্গল', 'সূর্যমঙ্গল'।
মঙ্গলকাব্যের প্রধান শাখা
মঙ্গলকাব্যে প্রধান শাখা ৪টি। যথা:
ক. মনসামঙ্গল
খ. চণ্ডীমঙ্গল
গ. অন্নদামঙ্গল
ঘ. ধর্মমঙ্গল।
মঙ্গলকাব্যের অংশ
মঙ্গলকাব্যের অংশ ৪টি। যথা:
ক. বন্দনা
খ. আত্মপরিচয় ও গ্রন্থ উৎপত্তির কারণ
গ. দেবখণ্ড
ঘ. নরখণ্ড।
Notes:
- আদি মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গল। এটি মনসা দেবীর কাহিনি নিয়ে রচিত। এর অপর নাম 'পদ্মপুরাণ'।
- মঙ্গলকাব্যের / মনসামঙ্গলের আদি কবি কানাহরি দত্ত।
- সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসার অপর নাম কেতকী ও পদ্মাবতী। অস্ট্রিক সমাজের লৌকিক ভয়ভীতি থেকেই এ দেবীর উদ্ভব।
- সাপের অধিষ্ঠাত্রী মনসা দেবীর কাহিনি নিয়ে মনসামঙ্গল কাব্য রচিত। এ কাব্য মোট ৮ দিনে পরিবেশন করা হতো। শেষ দিনে পরিবেশন করা অংশকে বলা হয় 'অষ্টামঙ্গল'। নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ এ কাব্যকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।
- মনসামঙ্গল কাব্যের প্রতিনিধিস্থানীয় ও শ্রেষ্ঠ কবি হলেন বিজয়গুপ্ত। বরিশাল জেলার ফতেহাবাদের ফুল্লশ্রী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম সুস্পষ্ট সন-তারিখযুক্ত মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্যগ্রন্থের একটি অংশের নাম 'পদ্মপুরাণ'। শ্রাবণ মাসের মনসাপঞ্চমীতে স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের শাসনামলে ১৪৯৪ সালে তিনি কাব্য রচনায় প্রবৃত্ত হন।
- মনসামঙ্গলের জনপ্রিয়তার জন্য বিভিন্ন কবির রচিত কাব্য থেকে বিভিন্ন অংশ সংকলিত করে যে পদসংকলন রচনা করা হয়েছিল তাই বাংলা সাহিত্যে বাইশ কবির মনসামঙ্গল বা বাইশা নামে পরিচিত।
- 'বারোমাসী' বা 'বারোমাস্যা' শব্দের অর্থ পুরো এক বছরের বিবরণ। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের লৌকিক কাহিনি বর্ণনায় নায়ক-নায়িকাদের বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ প্রদানের রীতি দেখা যায়, একেই 'বারোমাসী' বা 'বারোমাস্যা' বলে।
- বিপন্ন নায়ক-নায়িকা চৌত্রিশ অক্ষরে ইষ্টদেবতার যে স্তব রচনা করে, তাকে বলে 'চৌতিশা'। ব্যঞ্জনবর্ণ ('ক' থেকে 'হ') পদের আদিতে প্রয়োগ করে 'চৌতিশা' রচিত হতো।
- মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যান্য কবি / রচয়িতা:
- নারায়ণ দেব: কিশোরগঞ্জ জেলার বোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পনের শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়। তার রচিত গ্রন্থের নাম 'পদ্মপুরাণ'।
- দ্বিজ বংশীদাস: মনসামঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম কবি দ্বিজ বংশীদাস বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর পিতা। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার পাতোয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- ক্ষেমানন্দ: এ ধারার অন্যতম জনপ্রিয় কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। কেতকাদাস তার উপাধি। তার কাব্যে মুকুন্দরাম ও রামায়ণের কাহিনির প্রভাব সুস্পষ্ট।
- 'মনসামঙ্গল' কাব্যের ৩ জন কবি হলেন: কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই।
চণ্ডীমঙ্গল
- চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি মানিক দত্ত।
- চণ্ডীমঙ্গলের প্রধান কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তিনি ষোল শতকের কবি ছিলেন। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'শ্রী শ্রী চণ্ডীমঙ্গল'। তাঁকে দুঃখ বর্ণনার কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ জমিদার রঘুনাথ রায় 'কবিকঙ্কন' উপাধি প্রদান করেন। মুকুন্দরামের জনপ্রিয় কাহিনিকাব্য 'কালকেতু উপাখ্যান'।
- চণ্ডীদেবীর কাহিনি এটি দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রথমটি আখেটিক বা ব্যাধ কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনি এবং দ্বিতীয়টি বণিক বা ধনপতি সওদাগরের কাহিনি।
- চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের দ্বিজ মাধবকে 'স্বভাব কবি' বলা হয়। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'সারদামঙ্গল' (১৫৭৯)।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের 'কালকেতু-ফুল্লরা' খণ্ডের কাহিনি
কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনি:
দেবীর অনুরোধে শিব তার ভক্ত নীলাম্বরকে শাপ দিয়ে মর্ত্যলোকে পাঠান। নীলাম্বর কালকেতু হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। কালকেতুর যৌবনপ্রাপ্তির পর তার পিতা ধর্মকেতু ফুল্লরার সাথে বিবাহ দেন। ব্যাধ কালকেতুর অতি দরিদ্র কিন্তু সুখী সংসার। এদিকে কালকেতুর শিকারে প্রায় নির্মূল কলিঙ্গের বনের পশুদের আবেদনে কাতর হয়ে দেবী স্বর্ণগোধিকা রূপে কালকেতুর শিকারে যাবার পথে প্রকট রূপ ধারণ করেন। কালকেতু শিকারে যাবার সময় অমঙ্গলজনক গোধিকা দেখার পর কোন শিকার না পেয়ে ক্রুব্ধ হয়ে গোধিকাটিকে ধনুকের ছিলায় বেঁধে ঘরে নিয়ে আসেন। কালকেতু গোধিকাকে ঘরে বেঁধে পত্নীর উদ্দেশ্যে হাটে রওনা হন। হাটে ফুল্লরার সাথে দেখা হলে তাকে গোধিকার ছাল ছাড়িয়ে শিক পোড়া করতে নির্দেশ দেন। ফুল্লরা ঘরে ফিরলে, দেবী এক সুন্দরী যুবতীর রূপে ফুল্লরাকে দেখা দিলেন। ফুল্লরার প্রশ্নের উত্তরে দেবী জানালেন যে, তার স্বামী ব্যাধ কালকেতু তাকে এখানে এনেছেন এবং তিনি এ গৃহেই কিছুদিন বসবাস করতে চান। দেবীকে তাড়াতে ফুল্লরা নিজের বারমাসের দুঃখ কাহিনি বিবৃত করলেন, তবুও দেবী অটল। শেষ পর্যন্ত ফুল্লরা ছুটলেন হাটে, স্বামীর সন্ধানে। উভয়ে গৃহে ফেরার পর দেবীকে বুঝিয়ে বললেও উল্টো দেবী বলে, সে কালকেতুকে ধন-দৌলত দিয়ে গুজরাটের রাজা করতে চায়। একথা শুনে কালকেতু ক্ষিপ্ত হয়ে দেবীকে তির (শর) মারতে চাইলেও পরে সে শর্ত দেয় যে, যদি সে আশ্বিন মাসে যেরূপে চণ্ডী আবির্ভূত হয় এবং মানুষ তাকে পূজা করে, সেরূপ ধারণ করলে তবেই কালকেতু দেবীকে বিশ্বাস করবে। অতঃপর চণ্ডী সেই রূপ ধারণ করে। এরূপ দেখে কালকেতু ও ফুল্লরা মূর্ছা যায়। দেবীর কৃপায় তাদের মূর্ছা ভাঙলে তারা সব বিশ্বাস করে। দেবীর অনুগ্রহে কালকেতু ধনী হয়ে পশু শিকার ত্যাগ করে। বনের পশুরাও নিশ্চিন্তে বসবাস করতে লাগল। দেবীর আশীর্বাদে কালকেতু ৭ ঘড়া ধনলাভ করে বন কেটে গুজরাট নগর পত্তন করেন। গুজরাট নগরে নবাগতদের মধ্যে ভাঁড়ুদত্ত নামে ছিল এক প্রতারক। প্রথমে কালকেতু তাকে বিশ্বাস করলেও প্রজাদের প্রতি অত্যাচার করায় তাকে তাড়িয়ে দেন। ভাঁড়ুদত্ত কলিঙ্গের রাজার কাছে গিয়ে তাকে কালকেতুর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। কলিঙ্গের সেনাপতি গুজরাট আক্রমণ করে কালকেতুকে বন্দী করেন। কিন্তু দেবীর কৃপায় কালকেতু মুক্তি পান এবং কাল পূর্ণ হলে ফুল্লরাসহ স্বর্গে ফিরে যান।
অন্নদামঙ্গল
অন্নদামঙ্গল ধারার প্রধান কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাগরিক কবি এবং মঙ্গলযুগের শেষ কবি। তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে 'অন্নদামঙ্গল' (১৭৫২-৫৩) কাব্য রচনা করেন। 'সত্য পীরের পাঁচালী' (১৭৩৭-৩৮) তাঁর রচিত অন্যতম গ্রন্থ। ১৭৬০ সালে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে। 'রায়গুণাকর' ভারতচন্দ্রের উপাধি।
অন্নদামঙ্গল কাব্য টি খণ্ড। যথা:
১. শিবনারায়ণ অন্নদামঙ্গল,
২. বিদ্যাসুন্দর কালিকামঙ্গল,
৩. মানসিংহ-ভবানন্দ অন্নদামঙ্গল। [এ তিনটি খণ্ডেই দেবী অনুদার বন্দনা আছে।]
'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপেঃ
নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ৩টি খণ্ডে 'অন্নদামঙ্গল' কাব্য রচনা করেন। প্রথম খণ্ডের উপাখ্যানে সতীর দেহত্যাগ ও উমারূপে জন্মগ্রহণ, শিবের সঙ্গে বিয়ে ও ঘরকন্না, অন্নপূর্ণা মূর্তিধারণ, কাশী প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি পৌরাণিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এরপরে বসুন্ধর ও নলকুবেরের হরিহোড় ও ভবানন্দ মজুমদাররূপে মর্ত্যে আগমন, দেবীর হরিহোড়ের গৃহে প্রবেশ এবং শেষে হরিহোড়ের গৃহ পরিত্যাগ করে ভবানন্দের গৃহে গমন পর্যন্ত প্রথম খণ্ডের কাহিনি বিদ্যমান। দ্বিতীয় খণ্ড বিদ্যাসুন্দরের কাহিনি। বর্ধমানের রাজা বীরসিংহের সুন্দরী কন্যা বিদ্যা ও কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দর এর প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
তৃতীয় খণ্ডের কাহিনি মানসিংহের যশোর গমন, দেবীর অনুগ্রহে ভবানন্দ মজুমদারের সাহায্যে রাজা প্রতাপাদিত্যের পরাজয় এবং ভবানন্দের দিল্লি গমন। ভবানন্দ সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে দেবীর প্রশংসা করলে বাদশাহ হিন্দু ধর্মও দেবী সম্পর্কে কটূক্তি করেন এবং ভবানন্দকে বন্দি করেন। পরে দেবীর কৃপায় সম্রাট জাহাঙ্গীর বাধ্য হয়ে ভবানন্দকে মুক্তি দিয়ে 'রাজা' উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ভবানন্দ কিছুকাল রাজত্ব করে পরলোকগমন করেন। এ খন্ডে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর জাহাঙ্গীর, মানসিংহ ও ভবানন্দসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
ধর্মমঙ্গল
ধর্মমঙ্গল কাব্যে ধর্মঠাকুরের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে । ধর্মঠাকুর নামে কোনো এক পুরুষ দেবতার পূজা হিন্দু সমাজের নিচু স্তরের লোকদের বিশেষত ডোম সমাজে প্রচলিত ছিলো। ধর্মঠাকুর প্রধানত দাতা, নিঃসন্তান নারীকে সন্তান দান করেন, অনাবৃষ্টি হলে ফসল দেন, কুন্ঠ রোগীকে রোগ থেকে মুক্ত করেন। ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করে যে কাব্যধারা রচিত হয় তাই ধর্মমঙ্গল কাব্য।
ধর্মমঙ্গল কাব্যের আদি কবি ময়ূরভট্ট। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'হাকন্দপুরাণ'। এ কাব্যের আরও দুজন প্রখ্যাত কবি হলেন- রূপরাম চক্রবর্তী ও ঘনরাম চক্রবর্তী। ঘনরাম চক্রবর্তী অষ্টাদশ শতকের মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠকবি। তাঁর রচিত কাব্যের নাম ‘শ্রী ধর্মমঙ্গল’ ।
ধর্মমঙ্গল কাব্য ২টি পালায় বিভক্ত ।
যথা:
১. রাজা হরিশচন্দ্রের কাহিনি,
২. লাউসেনের কাহিনি।
কালিকামঙ্গল
কালিকামঙ্গল কাব্যে দেবী কালীর স্তুতি করা হয়েছে । এ কাব্য 'বিদ্যাসুন্দর' নামেও অভিহিত যা সাবিরিদ খান কর্তৃক রচিত। সাবিরিদ খান কর্তৃক রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ 'রসুল বিজয়'। প্রকৃতপক্ষে এটি মঙ্গলকাব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। দেবী কালীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা এর মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। রাজকুমার 'সুন্দর' ও বীরসিংহের অপরূপা কন্যা 'বিদ্যা'র গুপ্ত প্রণয়কাহিনি এ কাব্যের প্রধান উপজীব্য। এগার শতকের কাশ্মীরের বিখ্যাত সংস্কৃত কবি বিলহন এর কাব্য 'চৌরপঞ্চাশিকা' অবলম্বনে কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচিত।
কালিকামঙ্গল কাব্যের আদি কবি কবি কঙ্ক। সাবিরিদ খান ও রামপ্রসাদ সেন এ কাব্যের বিখ্যাত কবি। রামপ্রসাদ সেন শ্যামাসংগীত রচনায় পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর উপাধি 'কবিরঞ্জন'।
শিবমঙ্গল কাব্য
কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনে বৈদিক দেবতা রুদ্র শিবের রূপ ধারণ করে। বাঙালি হিন্দুদের জীবনে শিব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাঙালির সুখ-দুঃখ ভরা সংসারের কথা স্থান পেয়েছে শিবমঙ্গল কাব্যে। পৌরাণিক ও লৌকিক উপাদান মিশ্রিত হয়ে শিবমঙ্গল বা শিবায়ন কাব্য রচিত।
- শিবমঙ্গল কাব্যের প্রথম কবি রামকৃষ্ণ রায়।
- এ ধারার প্রথম কাব্য দ্বিজ রতিদেব রচিত 'মৃগলুব্ধ' (১৬৭৪)।
- এ ধারার শ্রেষ্ঠ কাহিনি রচয়িতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য। তার রচিত কাব্যের নাম 'শিবকীর্তন'।
- এ ধারার অন্যান্য কবি- দ্বিজ কালিদাস, দ্বিজ মণিরাম প্রমুখ।
অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত পঙ্ক্তি:
→ ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
→ ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’
→ ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।’
→ ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ! ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।’
→ 'হাভাতে যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়।' (চণ্ডীমঙ্গল)
কাব্যের নাম | রচয়িতাগণ | প্রধান চরিত্র |
| মনসামঙ্গল | কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ | চাঁদ সওদাগর, বেহুলা (পুত্রবধূ), লখিন্দর (পুত্র), মনসা (সাপের দেবী), সনকা। |
| চণ্ডীমঙ্গল | মানিক দত্ত, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, দ্বিজ মাধব (স্বভাবকবি), মুক্তারাম সেন | ফুল্লরা, কালকেতু, ধনপতি, ভাঁড়ুদত্ত (ষড়যন্ত্রকারী), মুরারি শীল (ঠগ)। |
| অন্নদামঙ্গল | ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর | ঈশ্বরী পাটনী, হিরামালিনী। |
| ধর্মমঙ্গল | ময়ূরভট্ট, রূপরাম চক্রবর্তী, ঘনরাম চক্রবর্তী, শ্যাম পণ্ডিত | হরিশচন্দ্র, লাউসেন। |
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের গতানুগতিক ধারায় জীবনী সাহিত্য এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। শ্রীচৈতন্যদেব ও তাঁর কতিপয় শিষ্যের জীবনকাহিনি অবলম্বনে। এই জীবনী সাহিত্যের সৃষ্টি। তবে এর মধ্যে চৈতন্য জীবনীই প্রধান। চৈতন্যদের জীবিতকালেই কারও কারও কাছে অবতাররূপে পূজিত হন। তাঁর শেষজীবন দিব্যোন্মাদ রূপে অতিবাহিত হয়েছে বলে তাঁর পক্ষে ধর্মমত প্রচার করা সম্ভব হয় নি। তাঁর শিষ্যরা এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ধর্মপ্রচার করতে গিয়ে তাঁরা শ্রীচৈতন্যের জীবনকাহিনি আলোচনা করতেন। চৈতন্যের জীবদ্দশায়ই সংস্কৃত শ্লোকে, কাব্যে ও নাটকে এবং বাংলা গানে ও কাব্যে তাঁর চরিতকথা স্থান পেয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর জীবনী সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রাচুর্য এসে বাংলা সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য এনেছে। বৈষ্ণব জীবনী সাহিত্যেই রক্ত-মাংসের মানুষ সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে একক প্রসঙ্গ হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। চৈতন্য-জীবনী গ্রন্থগুলোর সমবেত উপাদান থেকে শ্রীচৈতন্যের নরলীলার দেশ-কাল-চিহ্নিত বিশেষিত স্বভাবের একটি নির্ভরযোগ্য মোটামুটি কাঠামো আবিষ্কার করা সম্ভব ।
আধুনিক জীবনী সাহিত্যের সঙ্গে মধ্যযুগের জীবনী সাহিত্যের পার্থক্য সম্পর্কে অধ্যাপক আহমদ কবির মন্তব্য করেছেন, ‘একালের জীবনীগ্রন্থ বলতে আমরা যা বুঝি, বৈষ্ণব চরিতকাব্যগুলো সেরকম নয়। জীবনচরিতে বাস্তব মানুষের জীবনালেখ্য, কর্ম, কীর্তি ও আদর্শের পরিচয় থাকে, আর থাকে তাঁর দেশকালের ছবি। যে-মানুষ তাঁর কর্ম ও আদর্শের প্রেরণায় বহু মানুষকে প্রভাবিত করেছেন, সে মানুষেরই জীবনী রচিত হয়। ভক্ত ও অনুরাগীরাই এ-জীবনী লিখে থাকেন। এভাবে জীবনী রচিত হয়েছে ধর্মগুরু, দার্শনিক, লেখক, কবি, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ত্যাগী মানবদরদী কীর্তিধন্যদের। এঁরা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব— এঁদের গুণমাহাত্ম্য ও মহিমা অপরকে প্রভাবিত করে। অবশ্য ব্যক্তি দোষেগুণে মানুষ। শুধু গুণের আদরে ব্যক্তিকে ভূষিত করলে ব্যক্তির পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। ভক্তের লেখায় ব্যক্তির দোষ সাধারণত পরিত্যাজ্য। তবু একালের জীবনীগ্রন্থ অনেকাংশে বস্তুনিষ্ঠ। সন্দেহ নেই যে, একালে মানুষের ভক্তিনিষ্ঠাও অনেক কমেছে এবং মানুষ ক্রমশ বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী হয়ে উঠেছে। তাছাড়া খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনসম্পর্কিত তথ্যাদি ও বিবরণ পাওয়ার সুবিধাও হয়েছে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের খবর, ব্যক্তিগত ডায়েরি, আত্মজীবনী, ঘনিষ্ঠজনের স্মৃতিকথা, ক্যাসেট, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ভিডিও চিত্র ফিল্ম ইত্যাদি একজন লোকমান্য ব্যক্তির জীবনী-প্রণয়নে সহায়তাদান করে। এভাবে গড়ে ওঠে একটি তথ্যনিষ্ঠ সত্য জীবনকাহিনি। একালের জীবনচরিত রক্তমাংসের বাস্তব মানুষেরই বাস্তব জীবনালেখ্য।
ধর্মীয় বিষয় অবলম্বনে সাহিত্যসৃষ্টি মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্য। চৈতন্য জীবনী সাহিত্যও এই বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত নয়। কারণ চৈতন্যদেবকে অনেকেই অবতার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন এবং তাঁকে অবলম্বন করে রচিত কাব্য ভক্তিকাব্য হয়ে পড়েছে। ভক্তেরা চৈতন্যদেবকে মানুষরূপে কল্পনা করেন নি, করেছেন নররূপী নারায়ণরূপে। ফলে জীবনীগ্রন্থ হয়েছে দেব-অবতারের মঙ্গলপাঁচালী। তবে কৃষ্ণলীলার আদলে নরনারায়ণের জীবনলীলা বর্ণনা কালে কবিরা নিজেদের দেশ-কাল-পরিবেশ উপেক্ষা করতে পারেন নি। ড. আহমদ শরীফের মতে, জীবনী সাহিত্য 'ষোল শতকের শাস্ত্রিক সামাজিক ভৌগোলিক অবস্থা ও সাম্প্রদায়িক, প্রশাসনিক, নৈতিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের সংবাদ-চিত্র বহন করেছে। চরিতাখ্যানগুলির সর্বাধিক গুরুত্ব এখানেই।' জীবনী কাব্যগুলো যে সামাজিক ইতিহাস হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তাতে কোন সন্দেহ নেই।
চৈতন্য জীবনের কাহিনিতে কবিরা অলৌকিকতা আরোপ করেছেন। তবু চৈতন্য ও তাঁর শিষ্যরা বাস্তব মানুষ ছিলেন এবং এ ধরনের বাস্তব কাহিনি নিয়ে সাহিত্যসৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম। এ পর্যন্ত রচিত বাংলা সাহিত্যের বিষয় ছিল পৌরাণিক গল্প, দেবতার মাহাত্ম্যকাহিনি ও রাধাকৃষ্ণ লীলাবিষয়ক পদাবলি। কিন্তু জীবনী সাহিত্যে সমকালীন ইতিহাস প্রতিফলিত হয়েছে। বাস্তব মানুষের জীবনকাহিনি সাহিত্যের উপজীব্য হয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। চৈতন্য জীবনী সাহিত্য সম্পর্কে ড. অসিতকুমার বন্ধ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, ইহাতে একজন মহাপুরুষের ভাবজীবনের গভীর ব্যাকুলতা, তাঁহার সর্বত্যাগী পার্ষদগণের পূত জীবনকথা, ভক্তিদর্শন ও বৈষ্ণবতত্ত্বের নিগূঢ় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, বৈষ্ণবসমাজ ও বৈষ্ণবসমাজের বাহিরে বৃহত্তর বাঙালি হিন্দুসমাজ, হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক প্রভৃতি বিবিধ তথ্য সবিস্তারে বর্ণিত হইয়াছে বলিয়াই এই জীবনীকাব্যগুলি শুধু জীবনী মাত্র হয় নাই, – ইহাতে গৌড় বিশেষত নবদ্বীপ, শান্তিপুর, খড়দহ, নীলাচল ও ব্রজমণ্ডলের বৈষ্ণব সমাজের ইতিহাস, বিকাশ, পরিণতি প্রভৃতি ব্যাপারে ঐতিহাসিক তথ্যের যে প্রকার বাহুল্য দেখা যায়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে তাহার মূল্য বিশেষভাবে স্বীকার করিতে হইবে। মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিবৃত্ত আলোচনা করিতে গেলে চৈতন্য-জীবনীকাব্যগুলির সাহায্য অপরিহার্য।
সকল সাহিত্যের পরিপুষ্টিসাধনে অনুবাদমূলক সাহিত্যকর্মের বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় না। সমৃদ্ধতর নানা ভাষা থেকে বিচিত্র নতুন ভাব ও তথ্য সঞ্চয় করে নিজ নিজ ভাষার বহন ও সহন ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলাই অনুবাদ সাহিত্যের প্রাথমিক প্রবণতা। ভাষার মান বাড়ানোর জন্য ভাষার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয়, আর তাতে সহায়তা করে অনুবাদকর্ম। উন্নত সাহিত্য থেকে ঋণ গ্রহণ করা কখনও অযৌক্তিক বিবেচিত হয় নি। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষার সীমিত শব্দাবলিতে কোন বিশেষ ধ্যানধারণা তত্ত্ব-তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। উন্নত ও সমৃদ্ধ ভাষা-সাহিত্যের সান্নিধ্যে এলে বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিশব্দ তৈরি করা সম্ভব হয়, অন্য ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দও গ্রহণ করা যায়। অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের বক্তব্য আয়ত্তে আসে। ভাষা ও সাহিত্যের যথার্থ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ ও সম্পদশাহী ভাষায় উৎকর্ষপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টির অনুবাদ একটি আবশ্যিক উপাদান । নতুন বিকাশমান ভাষার পক্ষে অনুবাদ 'আত্মোন্নতি সাধনের এক অপরিহার্য পন্থা ।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে অনুবাদ সাহিত্যের চর্চা হয়েছিল এবং পরিণামে এ সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধনে অনুবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবশ্যস্বীকার্য। সত্যিকার সার্থক সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে সৃষ্টি করার বিস্তর বাধা থাকলেও ভাষা সাহিত্যের গঠনযুগে অনুবাদের বিশেষ প্রয়োজন অনুভূত হয়। তাই ড. দীনেশ সেন। মন্তব্য করেছেন, “ভাষার ভিত্তি দৃঢ় করিতে প্রথমত অনুবাদ গ্রন্থেরই আবশ্যক।' অনুবাদমূলক সাহিত্যসৃষ্টি ভিত্তি করেই মুখের ভাষা সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত হয়ে থাকে । আবার এ ধরনের রচনা সাহিত্যকে সম্প্রসারিত হতে সাহায্য করে। শ্রেষ্ঠ ভাষা থেকে সাহিত্যিক অনুবাদের মাধ্যমে নতুন ভাষা কেবল সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার ও দক্ষ প্রকাশরীতিই আয়ত্ত করে না, শ্রেষ্ঠতর ভাবকল্পনার সঙ্গেও পরিচিত ও অন্বিত হতে পারে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনুবাদ শাখার ভূমিকা থেকে এ কথার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করা যায় ।
জ্ঞানবিজ্ঞানের বিষয়ের বেলায় শুদ্ধ অনুবাদ অভিপ্রেত। কিন্তু সাহিত্যের অনুবাদ শিল্পসম্মত হওয়া আবশ্যিক বলেই তা আক্ষরিক হলে চলে না। ভিন্ন ভাষার শব্দ সম্পদের পরিমাণ, প্রকাশক্ষমতা ও বাগভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন ভাষায় ব্যক্ত কথায় সংকোচন, প্রসারণ, বর্জন ও সংযোজন আবশ্যিক হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে অনুবাদের ধারাটি সমৃদ্ধি লাভ করে তাতে সৃজনশীল লেখকের প্রতিভা কাজ করেছিল। সে কারণে মধ্যযুগের এই অনুবাদকর্ম সাহিত্য হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলাদেশে মুসলমান আগমনের ফল ছিল দু ধরনের—প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। তের শতকের মুসলমান শাসনের সূত্রপাতের পরিপ্রেক্ষিতে অবহেলিত বাংলা সাহিত্য তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় যে প্রাণচাঞ্চল্য লাভ করেছিল তা হল পরোক্ষ ফল। আবার মুসলমান কবিরা পনের-ষোল শতকে রোমান্টিক প্রণয়কাব্য রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যক্ষ অবদান সৃষ্টিতে সক্ষম হন। বাংলা সাহিত্যে মুসলমান শাসকগণের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় যে নবজীবনের সূচনা হয়েছিল সে সম্পর্কে ড. মুহম্মদ এনামুল হক মন্তব্য করেছেন, “বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে বাংলার মুসলমানদের যতখানি হাত রহিয়াছে, হিন্দুদের ততখানি নহে। এদেশের হিন্দুগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্মদাতা বটে; কিন্তু তাহার আশৈশব লালন পালন ও রক্ষাকর্তা বাংলার মুসলমান। স্বীকার করি, মুসলমান না হইলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মনোরম বনফুলের ন্যায় পল্লীর কৃষককণ্ঠেই ফুটিয়া উঠিত ও বিলীন হইত, কিন্তু তাহা জগতকে মুগ্ধ করিবার জন্য উপবনের মুখ দেখিতে পাইত না, বা ভদ্র সমাজে সমাদৃত হইত না।' পরোক্ষ এই প্রভাবের সঙ্গে মধ্যযুগে মুসলমান কবিগণ মানবিক গুণসম্পন্ন রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান রচনা করে প্রত্যক্ষভাবে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি সাধনে অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মুসলমান কবিগণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান এই রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান বা প্রণয়কাহিনি। এই শ্রেণির কাব্য মধ্যযুগের সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান জুড়ে আছে। ফারসি বা হিন্দি সাহিত্যের উৎস থেকে উপকরণ নিয়ে রচিত অনুবাদমূলক প্রণয় কাব্যগুলোতে প্রথমবারের মত মানবীয় বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। মধ্যযুগের কাব্যের ইতিহাসে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর আধিপত্য ছিল, কোথাও কোথাও লৌকিক ও সামাজিক জীবনের ছায়াপাত ঘটলেও দেবদেবীর কাহিনির প্রাধান্যে তাতে মানবীয় অনুভূতির প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। এই শ্রেণির কাব্যে মানব-মানবীর প্রেমকাহিনি রূপায়িত হয়ে গতানুগতিক সাহিত্যের ধারায় ব্যতিক্রমের সৃষ্টি করেছে। মুসলমান কবিগণ হিন্দুধর্মাচারের পরিবেশের বাইরে থেকে মানবিক কাব্য রচনায় অভিনবত্ব দেখান। রোমান্টিক কবিরা তাঁদের কাব্যে ঐশ্বর্যবান, প্রেমশীল, সৌন্দর্যপূজারী, জীবনপিপাসু মানুষের ছবি এঁকেছেন। ড. সুকুমার সেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে মন্তব্য করেছেন, 'রোমান্টিক কাহিনি কাব্যে পুরানো মুসলমান কবিদের সর্বদাই একচ্ছত্রতা ছিল। মুসলমানদের ধর্মীয় আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে দেবদেবীর কল্পনার কোন অবকাশ ছিল না। তাই বাংলা সাহিত্যের ধর্মীয় পরিবেশের বাইরে থেকে এই কবিরা স্বতন্ত্র কাব্যধারার প্রবর্তন করেন। ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন এসব কাব্যে নতুন ভাব, বিষয় ও রসের যোগান দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সাহিত্যের গতানুগতিক ঐতিহ্যের বাইরে নতুন ভাবনা চিন্তা ও রসমাধুর্যের পরিচয় এ কাব্যধারায় ছিল স্পষ্ট। ধর্মের গণ্ডির বাইরে এই শ্রেণির জীবনরসাশ্রিত প্রণয়োপাখ্যান রচিত হয়েছিল বলে তাতে এক নতুনতর ঐতিহ্যের সৃষ্টি হয় ।
রোমান্টিক প্রণয়কাব্যগুলোতে স্থান পেয়েছে বিষয়বস্তু হিসেবে মানবীয় প্রণয়কাহিনি। এই প্রণয়কাহিনি মর্ত্যের মানুষের। ড. ওয়াকিল আহমদ মন্তব্য করেছেন, 'মানুষের প্রেমকথা নিয়েই প্রণয়কাব্যের ধারা, কবিগণ মধুকরী বৃত্তি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য থেকে সুধারস সংগ্রহ করে প্রেমকাব্যের মৌচাক সাজিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তা অভিনব ও অনাস্বাদিতপূর্ব। মুসলমান কবিরাই এ কৃতিত্বের অধিকারী।”
প্রণয়কাব্যগুলোর বিকাশ ঘটেছিল বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের পরিসরে। মুসলমান কবিগণের সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে ছিল হিন্দুপুরাণ পরিপুষ্ট পাঁচালি। এই একঘেঁয়ে ধর্মগীতির ধারা তাঁদের কাছে প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে নি। বরং প্রণয়কাব্য রচনায় মূল্যবান অবদান রেখে তাঁরা বাংলা কাব্যে সঞ্চার করে গেছেন এক অনাস্বাদিত রস। মঙ্গলকাব্যের কাহিনি গ্রথিত হয়েছে দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রণয়কাব্যের লক্ষ্য ছিল শিল্পসৃষ্টি ও রসসঞ্চার। রোমান্টিক কথা ও কাহিনির অসাধারণ ভাঙার আরবি-ফারসি সাহিত্যের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় বাংলা সাহিত্যে এই ধারার সৃষ্টি। আর এতে আছে জীবনের বাস্তব পরিবেশের চেয়ে ইরানের যুদ্ধামোদী রাজদরবার ও নাগর সমাজের মানসাভ্যাসের প্রতিফলন।' প্রণয়কাব্যগুলোতে উপাদান হিসেবে স্থান পেয়েছে 'মানবপ্রেম, রূপ-সৌন্দর্য, যুদ্ধ ও অভিযাত্রা, অলৌকিকতা ও আধ্যাত্মিকতা।
বাংলার মুসলমান কবিগণের মধ্যে প্রাচীনতম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর চৌদ্দ শতকের শেষে বা পনের শতকের প্রথমে 'ইউসুফ জোলেখা' কাব্য রচনা করার মাধ্যমে এই ধারার প্রবর্তন করেন। তারপর অসংখ্য কবির হাতে এই কাব্যের বিকাশ ঘটে এবং আঠার শতক পর্যন্ত তা সম্প্রসারিত হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে মুসলমান কবিগণের স্বতন্ত্র অবদান ব্যাপকতা ও ঔজ্জ্বল্যে বাংলা সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা সাহিত্যকে আরবি ফারসি হিন্দি সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগ সাধন করে যে নতুন ঐতিহ্যের প্রবর্তন করা হয় তার তুলনা নেই। পরবর্তী পর্যায়ে দোভাষী পুঁথির মধ্যে এই ধরনের বিষয় স্থান পেলেও তাতে কোন ঔজ্জ্বল্য পরিলক্ষিত হয় না।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের যে বিকাশ সাধিত হয়েছিল তা এদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাঙালি মুসলমান কবিরা ধর্মসংস্কারমুক্ত মানবীয় প্রণয়কাহিনি অবলম্বনে কাব্যধারার প্রথম প্রবর্তন করে এ পর্যায়ের সাহিত্যসাধনাকে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী করেছেন। ধর্মীয় ভাবভাবনায় সমাচ্ছন্ন কাব্যজগতের পাশাপাশি মুক্ত মানবজীবনের আলেখ্য অঙ্কনের মাধ্যমে মুসলমান কবিগণ সূচনা করেছেন স্বতন্ত্র ধারার। সুদূর আরাকানে বিজাতীয় ও ভিন্ন ভাষাভাষী রাজার অনুগ্রহ লাভ করে বঙ্গভাষাভাষী যে সকল প্রতিভাশালী কবির আবির্ভাব ঘটেছিল তাঁরা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অবদানে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছেন এবং মধ্যযুগের ধর্মনির্ভর সাহিত্যের পাশে মানবীয় প্রণয়কাহিনি স্থান দিয়ে অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। আরাকান রাজসভার মুসলমান কবিগণকর্তৃক সৃষ্ট কাব্যরসাস্বাদনের নতুন ধারাটি বাংলা সাহিত্যের মূল প্রবাহ থেকে স্বতন্ত্র এবং ভৌগোলিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও তা সর্বজনীন বাংলা সাহিত্যের অভ্যুদয় ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় প্রভাব বিস্তার করেছিল।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিগণের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বিষয়টি পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে আসতে বিলম্বিত হয়েছে। মুসলমান কবিরা ইসলামি বিষয় অবলম্বনে কাব্যরচনা করায় বৃহত্তর হিন্দুসমাজ তার প্রতি সমাদর দেখায় নি। ফলে হিন্দুসমাজে এসব কবির নাম অজানা ছিল। উনিশ শতকের শেষ দিকে ড. দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখের উদ্যোগে হাতে লেখা পুঁথি সংগ্রহের ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু হলেও মুসলমান কবিদের রচনা উপেক্ষিত থেকেছে। পরবর্তী কালে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মুসলমান কবিগণের পুঁথি আবিষ্কার করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের বিস্ময়কর অবদানের বিশাল ভাণ্ডার উদ্ঘাটন করেন। বাংলাদেশের গবেষকগণের ঐকান্তিক চেষ্টায় মধ্যযুগের মুসলমান কবিগণ স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে আরাকানের মুসলিম সংস্কৃতি বাংলাদেশের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র হয়ে পড়লেও তার মানবিক চেতনাসমৃদ্ধ নতুন সাহিত্যসৃষ্টি যে স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম প্রকাশ হিসেবে দেখা। দিয়েছিল তা বাংলাদেশের গবেষকগণের ঐকান্তিকতায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বাইরে বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) অন্তর্ভুক্ত মগের মুল্লুক আরাকানে বাংলা কাব্যচর্চার বিকাশ বিশেষ কৌতূহলের ব্যাপার বলে মনে হতে পারে। আরাকানকে বাংলা সাহিত্যে 'রোসাং' বা 'রোসাঙ্গ' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বার্মার উত্তর-পশ্চিম সীমায় এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণে সমুদ্রের তীরে এর অবস্থান ছিল। আরাকানবাসীরা তাদের দেশকে 'রখইঙ্গ' নামে অভিহিত করত। কথাটি সংস্কৃত 'রক্ষ' থেকে উৎপন্ন বলে মনে করা হয়। আরাকানি ভাষায় 'রখইঙ্গ' শব্দের অর্থ দৈত্য বা রাক্ষস এবং সে কারণে দেশকে বলে 'রখইঙ্গ তঙ্গী' বা রাক্ষসভূমি। 'রখইঙ্গ' থেকেই 'রোসাঙ্গ' শব্দের উৎপত্তি। আইন-ই-আকবরিতে এদেশ 'আখরত্ব' নামে অভিহিত হয়েছে। ড. মুহম্মদ এনামুল হক 'রখইং' শব্দের ইংরেজি অপভ্রংশ 'আরাকান' বলে উল্লেখ করেছেন। আরাকানের অধিবাসীরা সাধারণভাবে বাংলাদেশে 'মগ' নামে পরিচিত। এই 'মগ' বা "মঘ শব্দটি ‘মগধ' শব্দজাত এবং শব্দটি আরাকানি ও বৌদ্ধ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ মুসলমান অধিকারে আসার পূর্বে আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটে। খ্রিস্টীয় আট-নয় শতকে আরাকানরাজ মহাতৈং চন্দয় (৭৮৮-৮১০) এর রাজত্বকালে যে সকল আরবিয় বণিক স্থায়ীভাবে সে দেশে বসবাস শুরু করে তাদের মাধ্যমেই সেখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার হয়। একই সময় থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ফলে ধর্মীয় বন্ধনের মাধ্যমে এই দুই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ইতিহাসের সাক্ষ্যে প্রমাণ মিলে যে, আরাকানরাজারা দেশধর্মের প্রভাবের ঊর্ধ্বে একটি সর্বজনীন সংস্কৃতির অধিকারী হয়েছিলেন এবং সেখানে ছিল মুসলমানদের ব্যাপক প্রভাব। মেঃৎ-চৌ-মৌন-এর আমলে ১৪৩০ থেকে ১৪৩৪ সাল পর্যন্ত রোসাঙ্গ গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন মহম্মদ শাহর করদরাজ্য রূপে বিদ্যমান ছিল।
‘বার্মার মূল ভূখণ্ড ও আরাকানের মধ্যেকার দুরতিক্রম্য পর্বতই আরাকানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীন সত্তার এবং সমুদ্রসান্নিধ্য তার সমৃদ্ধির কারণ।' আরাকান রাজ নরমিখলা বার্মারাজার ভয়ে ১৪৩৩ সালে চট্টগ্রামের রামু বা টেকনাফের শত মাইলের মধ্যে অবস্থিত 'মোহ' নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন। সে সময় থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত তিন শ বছর ম্রোহঙ আরাকানের রাজধানী ছিল। এই ম্রোহঙ শব্দ থেকেই রোসাঙ্গ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
রোসাঙ্গের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। এই সময় থেকে তাঁরা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সঙ্গে এক একটি মুসলমানি নাম ব্যবহার করতেন। তাঁদের প্রচলিত মুদ্রার একপীঠে ফারসি অক্ষরে কলেমা ও মুসলমানি নাম লেখার রীতিও প্রচলিত হয়েছিল। যে সব ইসলামি নাম তাঁরা ব্যবহার করেছেন সেগুলো হল : কলিমা শাহ্, সুলতান, সিকান্দর শাহ্, সলীম শাহ্, হুসেন শাহ প্রভৃতি। ১৪৩৪ থেকে ১৬৪৫ সাল পর্যন্ত দুই শতাধিক বৎসর ধরে আরাকান রাজগণ মুসলমানদের ব্যাপক প্রভাব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এই সময়ের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. মুহম্মদ এনামুল হক মুসলিম বাঙ্গলা সাহিত্য' গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, 'এই শত বৎসর ধরিয়া বঙ্গের (মোগল-পাঠান) মুসলিম রাজশক্তির সহিত স্বাধীন আরাকান রাজগণের মোটেই সদ্ভাব ছিল না, অথচ তাঁহারা দেশে মুসলিম রীতি ও আচার মানিয়া আসিতেছিলেন। ইহার কারণ খুঁজিতে গেলে মনে হয়, আরাকানি মঘসভ্যতা, রাষ্ট্রনীতি ও আচারব্যবহার হইতে বঙ্গের মুসলিম সভ্যতা রাষ্ট্রনীতি ও আচারব্যবহার অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত ছিল বলিয়া আরাকানি রাজগণ বঙ্গের মুসলিম প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে পারেন নাই।
আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সময় বাঙালি মুসলমান কবিরা ধর্মসংস্কারের বাইরে মানবীয় প্রেমকাহিনি নিয়ে নতুন কাব্যধারার সূচনা করেন। আরাকানে বিজাতীয় রাজাদের অনুগ্রহে বাংলা ভাষাভাষী কবিরা তাদের সাহিত্যিক অবদান দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
মধ্যে মধ্যযুগের মুসলমান কবিদের অবদান নিয়ে গবেষণা বিলম্বিত হয়েছে, কারণ হিন্দু সমাজ তাদের প্রতি সমাদর দেখায়নি। উনিশ শতকের শেষদিকে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মাধ্যমে কবিদের পুঁথি সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হলেও মুসলমান কবিদের রচনা উপেক্ষিত ছিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পরে মুসলমান কবিদের উল্লেখযোগ্য অবদান আবিষ্কার করেন।
আরাকান স্থানটি বাংলাদেশ থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও এর সাহিত্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব ফেলে। আরাকানকে 'রোসাং' বা 'রোসাঙ্গ' নামে উল্লেখ করা হয়, এবং এটি বাংলার পূর্বে মগের অঙ্গভুক্ত ছিল। আরাকানে মুসলমানদের আগমন খ্রিস্টীয় আট-নয় শতকে ঘটে।
আরাকান রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলমানি নাম ব্যবহার করতেন এবং এই সময়ের ঘটনায় ইসলামি সম্পৃক্ততা ছিল। আরাকনের রাজধানী ম্রোহঙ ত্রিশ বছর ধরে আরাকানের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে।
- বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে 'রোসাঙ্গ' বলা হয় । সপ্তদশ শতকে এ অঞ্চল বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক প্রসারে বিশেষ অবদান রাখে।
- আরাকান রাজসভার আদি কবি ও প্রথম বাঙালি কবি দৌলত কাজী।
- আরাকান রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল।
বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় আরাকান রাজসভার ভূমিকা
শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে দেব-দেবীর মাহাত্ম্য কীর্তনে যখন মুখরিত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তখন বার্মার অন্তর্ভুক্ত 'মগের মুল্লুক'-এ আরাকানের বৌদ্ধ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম কবিদের কাব্য সাধনার আসরে ধ্বনিত হয়েছিল আরেক নবসুরের আলাপন, ফুটে উঠেছিল দেব-দেবীবিহীন বলিষ্ঠ লৌকিক প্রেমকাহিনি। এ চিত্র একান্তভাবেই মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ মানবজীবনের প্রতীক। মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিম সীমায় এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণে সমুদ্রের তীরে আরাকানের অবস্থান। আরাকানকে বাংলা সাহিত্যে 'রোসাঙ্গ' নামে অভিহিত করা হয়। বাংলায় মোগল-পাঠান সংঘর্ষের ফলে অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলমান আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আরাকান রাজসভার উচ্চ পদগুলোয় অধিষ্ঠিত হয়। কারণ, আরাকানের নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতির চেয়ে মুসলিম সংস্কৃতি অতি উঁচু মানের ছিল। মধ্যযুগে ধর্মসংস্কারমুক্ত ঐহিক কাব্যকথার প্রবর্তন করেন মুসলমান কবিগণ এবং তা আরাকান রাজসভাকে কেন্দ্র করে রূপায়িত হয়ে উঠে। আরাকান রাজা শ্রী সুধর্মার সমর সচিব আশরাফ খানের তত্ত্বাবধানে দৌলত কাজী 'সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী' কাব্য রচনা করেন। কোরেশী মাগন ঠাকুর নিজে 'চন্দ্রাবতী' কাব্য রচনা করেন এবং তাঁর সহায়তায় আলাওল 'পদ্মাবতী', সৈয়দ মুহম্মদের নির্দেশে 'হপ্তপয়কর', নবরাজ মজলিসের আদেশে 'সিকান্দরনামা', সৈয়দ মুসার আদেশে 'সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল' কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি সাধনে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও কবি মরদনের 'নসীরানামা' ও আবদুল করীম খন্দকার 'দুল্লা মজলিস' কাব্য রচনা করেন, যা বাংলা কাব্যসম্ভারকে সমৃদ্ধ করে। একান্ত মানবিক প্রেমাবেদন-ঘনিষ্ঠ এসব কাব্য অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্য- | |
সাহিত্যিক | সাহিত্যকর্ম |
| দৌলত কাজী | 'লোরচন্দ্রাণী ও সতীময়না' (১৬৫৯) |
| আলাওল | 'পদ্মাবতী', 'হপ্তপয়কর', ‘তোহফা’ (নীতিকাব্য), 'সিকান্দরনামা', 'সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল' |
| কোরেশী মাগন ঠাকুর | ‘চন্দ্রাবতী’ |
| মরদন | 'নসীরানামা' |
| আবদুল করিম খন্দকার | 'দুল্লা মজলিস', 'নূরনামা |
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে 'মর্সিয়া সাহিত্য' নামে এক ধরনের শোককাব্য বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এমন কি তার বিয়োগাত্মক ভাবধারার প্রভাবে আধুনিক যুগের পরিধিতেও তা ভিন্ন আঙ্গিকে এসে উপনীত হয়েছে। শোক বিষয়ক ঘটনা অবলম্বনে সাহিত্যসৃষ্টি বিশ্ব সাহিত্যের প্রাচীন রীতি হিসেবে বিবেচিত। 'মর্সিয়া' কথাটি আরবি, এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। আরবি সাহিত্যে মর্সিয়ার উদ্ভব নানা ধরনের শোকাবহ ঘটনা থেকে হলেও পরে তা কারবালা প্রান্তরে নিহত ইমাম হোসেন ও অন্যান্য শহীদকে উপজীব্য করে লেখা কবিতা মর্সিয়া নামে আখ্যাত হয়। আরবি সাহিত্য থেকে মর্সিয়া কাব্য ফারসি সাহিত্যে স্থান পায়। ভারতে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশে ফারসি ভাষায় মর্সিয়া প্রচলিত হয় এবং পরে উর্দু ভাষাতেও তার প্রসার ঘটে। এসব আদর্শ অনুসরণ করে বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের প্রচলন হয়। ভারতে বিভিন্ন ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের প্রচলনের পিছনে পারস্য দেশীয় বণিক, দরবেশ, পণ্ডিত, কবি প্রমুখের অনুপ্রেরণা বিশেষ ভাবে কাজ করেছে।
এসব কাব্যের কোন কোনটি যুদ্ধ কাব্য হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। যুদ্ধের কাহিনি নিয়ে কোন কোনটি পরিণতিতে চরম বিয়োগাত্মক রূপ গ্রহণ করেছে। শেষে কাব্য হয়ে উঠেছে মর্সিয়া বা শোক কাব্য। কোথাও কোথাও যুদ্ধকাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে জঙ্গনামা। কারবালার বিষাদময় কাহিনিতে যুদ্ধের ঘটনা যত প্রাধান্য পেয়েছে তার চেয়ে বেশি পেয়েছে শোকের অনুভূতি। এ প্রসঙ্গে ড. গোলাম সাকলায়েন মন্তব্য করেছেন, ‘জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাহিনি-সংবলিত কাব্যগুলি মুসলিম কবিসৃষ্ট সাহিত্যধারার মধ্যে নানাকারণে বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারে। কারবালা-যুদ্ধভিত্তিক কাব্যনির্মাণ সেকালের কবিদের কাছে ফ্যাশান হিসাবে গণ্য হতো এবং সেটা প্রলোভনের ব্যাপারও ছিল। তার কারণ সুস্পষ্ট। মুহরম মাস এলেই বাংলার গ্রামে-গঞ্জে মুসলমানদের মন বেদনাকরুণ পুথিপাঠের আসর বসাতো আর সেইজন্য কবিরাও কারবালার করুণ কাহিনি নিয়ে শহীদে কারবালা, জঙ্গনামা, হানিফার লড়াই ইত্যাদি কাব্য লেখার তাগিদ বোধ করতেন।'
মর্সিয়া কাব্য বা শোক কাব্যের পটভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, 'যুদ্ধ কাব্যের মধ্যে কারবালাযুদ্ধ কাব্যই ষোল-সতের শতক থেকে বাংলার মুসলিম সমাজে বিশেষ জনপ্রিয় হতে থাকে। তার কারণ দাক্ষিণাত্যের বাহমনিরাজ্যে- বিজাপুরে-বিদরে-বেরারে-গোলকুণ্ডায়-আহমদনগরে ইরানি বংশজ শিয়ারাই সুলতান ও শাসকগোষ্ঠী ছিলেন। শিয়ারা কারবালা যুদ্ধকে স্মরণ করা অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় পার্বণ বলেই জানে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের শিয়াদের ও ইরানি শিয়াদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সে সূত্রে ষোল শতক থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে 'মাতুল হোসেন' (হোসেন নিধন) কাব্য রচিত হতে থাকে, তারপর শিয়া সাক্ষাতী-শাসিত ইরানে আশ্রিত হুমায়ুনের দিল্লি প্রত্যাবর্তনের পরে দরবারসূত্রে ইরানের ও ইরানীয় প্রভাব প্রবল ও সর্বব্যাপী হতে থাকে। আবার আঠার শতকে সাফাতী রাজত্বের অবসানে ভারতে বাংলায় আশ্রিত শিয়া ইরানিদের প্রভাবে মুহররম তাজিয়াদি সহ একটি জনপ্রিয় জাতীয় পার্বণের মর্যাদায় স্থায়ী প্রতিষ্ঠা পায়।
মোগল আমলে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে শিয়া শাসক ও আমীর ওমরাগণ শাসনকার্য উপলক্ষে এসে বসবাস করতেন। মুসলমানদের মধ্যে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা মর্সিয়া সাহিত্য বিকাশের প্রেরণা দান করেন। তৎকালীন শিয়া শাসকরা কবিগণকে উৎসাহ প্রদান করতেন। অনেক কবি মুর্শিদাবাদের নবাবের মনোরঞ্জনের জন্য মর্সিয়া রচনায় আত্মনিয়োগ করতেন।
মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি সম্পর্কে ড. আহমদ শরীফ মন্তব্য করেছেন, 'যদিও ইমাম হাসান-হোসেনের প্রতি সমকালে হযরত আলীর ভক্ত-অনুগতদের ছাড়া আর কারও তেমন সমর্থন সহানুভূতি ছিল না, তবু কালক্রমে আল্লাহর বান্দা ও রসুলের নাতি বলেই মুসলিম মাত্রই হাসান-হোসেনের ভক্ত-সমর্থক এবং মুয়াবিয়া-এজিদের নিন্দুক হয়ে ওঠে। যেহেতু পরবর্তী কালে মুসলিমমাত্রই রসুলের আত্মীয় বলে তাঁর হতভাগ্য দৌহিত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে, অর্থাৎ পরাজিত পক্ষের সমর্থক হয়ে যায়, যেহেতু নায়ক বিজয়গৌরব হীন, সেহেতু তার প্রধান রস করুণ হতেই হয়—শোকের বা কান্নার আধার বলেই এ বিলাপ-প্রধান সাহিত্যের নাম 'মর্সিয়া সাহিত্য বা শোক সাহিত্য।'
মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি কারবালার বিষাদময় কাহিনি ভিত্তি করে হলেও তার মধ্যে অন্যান্য শোক ও বীরত্বের কাহিনির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফাগণের বিজয় অভিযানের বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনিও এই শ্রেণির কাব্যে স্থান পেয়েছে। 'জঙ্গনামা' নামে বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের কাব্য রচিত হয়েছে। মর্সিয়া সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. গোলাম সাকলায়েন তাঁর 'বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য' গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, 'এই কাব্যগুলির মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান তাঁহাদের প্রাণের কথা প্রতিধ্বনিত হইতে শুনিলেন ও তাঁহারা ইহার মারফত অতীত ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে শিখিলেন। বাংলা মর্সিয়া কাব্যগুলি প্রধানত অনুবাদ সাহিত্য হিসাবেই গড়িয়া উঠে। বাঙালি কবিগণ যদিও মূলত ফারসি ও উর্দু কাব্যগুলির ভাবকল্পনা ও ছায়া আশ্রয় করিয়া তাহাদের কাব্যাদি রচনা করিয়াছিলেন তথাপি এগুলির মধ্যে তাঁহাদের মৌলিকতার যথেষ্ট পরিচয় বিদ্যমান। ফলে এই কাব্যগুলি এক প্রকার অভিনব সৃষ্টি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সুদূর আরব পারস্যের মানুষের কাহিনি কাব্যাকারে লিপিবদ্ধ করিতে গিয়া কবিগণ যে বাগভঙ্গি ও পরিকল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা অনেক ক্ষেত্রে অবাস্তব ও উদ্ভট হইয়াছে। ইহাতে মনে হয়, বাঙালি কবিগণ মাটির প্রভাব অতিক্রম করিতে পারেন নাই।'
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে 'মর্সিয়া সাহিত্য' শোককাব্যের একটি জনপ্রিয় শাখা। আরবি শব্দ 'মর্সিয়া' অর্থ শোক প্রকাশ করা, যা আরবি সাহিত্যে উদ্ভব লাভ করে কারবালার যুদ্ধ ও শহীদ ইমাম হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে। ফারসি সাহিত্য ও পরে উর্দুতে এর প্রসার ঘটলে, বাংলা ভাষায়ও মর্সিয়া সাহিত্যের জন্ম হয়।
শোক ও যুদ্ধ কাহিনির ভিত্তিতে লেখা এসব কবিতা বাংলায় বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ষোল ও সতেরো শতকে। ড. গোলাম সাকলায়েন মন্তব্য করেছেন যে, মর্সিয়া সাহিত্য মুসলিম কবিদের সৃষ্টি ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। তা ছাড়া ড. আহমদ শরীফ মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি ও এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
- মর্সিয়া সাহিত্যের উৎস: কারবালার কাহিনির প্রভাব।
- শোক ও বিয়োগাত্মক কাহিনির অনুপ্রবেশ।
- বাঙালি কবিরা ফারসি ও উর্দু কাব্যের ছায়ায় তাদের কাব্য রচনা করেছেন।
- মাসকুলিন ভাবনা ও সমাজের প্রতি অধিকৃত আবেগ খুঁজে পাওয়া গেছে।
মর্সিয়া সাহিত্য বাংলা মুসলমানদের মধ্যে নানা ধরনের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সাহিত্যের শৈলীতে এক ধরনের মৌলিকতা প্রতিফলিত করে।
'লোকসাহিত্য' বলতে জনসাধারণের মুখে মুখে প্রচলিত গাথাকাহিনী, গান, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। সাধারণত কোন সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর অলিখিত সাহিত্যই লোকসাহিত্য। 'ডাক ও খনার বচন' কে লোকসহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

চন্দ্রকুমার দে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও লেখক। অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে বেশিদুর পড়ালেখা করতে পারেননি। ফলে নামমাত্র বেতনে চাকরি করেছেন বিভিন্ন জায়গায়। অবশেষে কেদারনাথের মাধ্যমে চন্দ্রকুমার দে দীনেশচন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করেন এবং মাসিক সত্তর টাকা বেতনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসাহিত্য সংগ্রাহক পদে নিযুক্ত হন। চন্দ্রকুমার দে সারা বাংলা ঘুরে ঘুরে লোকসাহিত্য ও লোকসংগীত সংগ্রহ শুরু করেন। পরবর্তীতে এসকল সংগৃহীত সাহিত্য দীনেশচন্দ্রের সম্পাদনায় 'মৈমনসিংহ গীতিকা' ও 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' নামে প্রকাশিত হয়। ফলে চন্দ্রকুমার দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন এবং লোকসাহিত্য প্রেমীর হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন একাধারে ছিলেন শিক্ষাবিদ, গবেষক, লোকসাহিত্য বিশারদ ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার। দেশের সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমতা থাকার কারণে তিনি দেশের অতীতের সাহিত্যকে জনসমক্ষে আনতে ব্যাপক প্রয়াস চালান। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্য বিলুপ্তি থেকে উদ্ধার এবং এ সাহিত্য বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে গ্রন্থ প্রণয়নে তিনি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় সংগৃহীত এ লোকসাহিত্য 'মৈমনসিংহ গীতিকা' ও 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' নামে প্রকাশিত হয়। ফলে তিনি সর্বত্র প্রভূত প্রশংসা অর্জন করেন এবং লোকসাহিত্যপ্রেমীর হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ছড়া মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ঝংকারময় পদ্য। এটি সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এটি সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। যিনি ছড়া লেখেন তাকে ছড়াকার বলা হয়। ‘ছেলেভুলানো ছড়া’, ‘ঘুম পাড়ানি ছড়া’ ইত্যাদি ছড়া দীর্ঘকাল যাবৎ প্রচলিত। প্রাচীনকাল থেকে ইংরেজি ভাষায় ননসেন্স রাইম প্রচলিত রয়েছে কারণ ছড়ার প্রধান দাবি ধ্বনিময়তা ও সুরঝংকার, অর্থময়তা নয়।
লোকগীতি: লোকসমাজের মুখে মুখে যে গীত চলে এসেছে। এতে কোন কাহিনী থাকে না। বিশেষ বিশেষ ভাব অবলম্বনে এই শ্রেণীর গান রচিত।
- হারামণি: বিখ্যাত প্রাচীন লোকগীতি সংকলন। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন ছিলেন এর প্রধান সম্পাদক।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গীতিকা: এক শ্রেণীর আখ্যানমূলক লোকগীতি সাহিত্যে গীতিকা' নামে পরিচিত। ইংরেজিতে তাকে বলা হয় ব্যালাড। Ballad শব্দটি ফরাসি Ballet বা নৃত্য শব্দ থেকে এসেছে।
ইউরোপে প্রাচীনকালে নাচের সাথে যে কবিতা গীত হত তাকেই Ballad বা গীতিকা বলা হত। বাংলাদেশ থেকে সংগৃহিত লোকগীতিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে ।
ক) নাথ গীতিকা
খ) মৈমনসিংহ গীতিকা
গ) পূর্ববঙ্গ গীতিকা
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ক) নাথ গীতিকা: স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন রংপুর জেলার মুসলমান কৃষকদের কাছ হতে সংগ্রহ করে 'মানিকচন্দ্র রাজার গান' নামে প্রকাশ করেন।
খ) মৈমনসিংহ গীতিকা: বৃহত্তর ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বাংশে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর, বিল, নদ-নদী পণ্ডাবিত ভাটি অঞ্চলে যে গীতিকা বিকশিত হয়েছিল তা 'মৈমনসিংহ গীতিকা' নামে পরিচিত। ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন গীতিকাগুলো সংগ্রহ করে 'মৈমনসিংহ গীতিকা' নামে প্রকাশ করেন। 'ময়মনসিংহ গীতিকা' বিশ্বের ২৩ টি ভাষায় অনূদিত হয়।
উল্লেখযোগ্য গীতিকার মধ্য রয়েছে:
ক. 'মহুয়া' পালা: মৈয়মনসিংহ গীতিকার শ্রেষ্ঠ পালা। এটি একটি প্রণয় আখ্যান। রচয়িতা দ্বিজ কানাই।
খ. দেওয়ানা মদিনা: রচয়িতা মনসুর বয়াতি।
গ. কাজল রেখা
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গ) পূর্ববঙ্গ গীতিকা: পূর্ববঙ্গ গীতিকা নামে পরিচিত গীতিকাগুলো কিছু পূর্ব ময়মনসিংহ থেকে এবং অবশিষ্ট গীতিকা নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সংগৃহিত। ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন গীতিকাগুলো সংগ্রহ করে 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' নামে প্রকাশ করেন।
উল্লেখযোগ্য গীতিকার মধ্য রয়েছে: নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোরা, কমল সওদাগর।
ডাক ও খনার বচন প্রাচীন যুগের সৃষ্টি হলেও মধ্যযুগের শুরুতে এগুলো সমৃদ্ধি লাভ করে। একসময়ে বাংলাদেশে ডাক ও খনার বচন ব্যাপক প্রচলিত ছিল।
ক) ডাকের বচন: বৌদ্ধদের জ্ঞানপুরুষ ডাক। এ বৌদ্ধ সমাজেই ডাকের বচনের উৎপত্তি হয়েছিল। কৃষক ও কৃষাণীরা এগুলো মুখস্থ রাখতেন। ডাক কোন একক ব্যক্তি বিশেষের নাম নাও হতে পারে। হয়ত একাধিক ব্যক্তি কালক্রমে বিশেষ জ্ঞানের যে পদগুলো রচনা করেছেন তাকেই ডাকের বচন বলা হয়। ডাকের বচন 'ডাকের কথা' বা 'ডাক পুরুষের কথা' নামেও পরিচিত। এতে জ্যোতিষ, ক্ষেত্রতত্ত্ব ও মানব চরিত্রের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যেমন:
- ঘরে আখা বাইরে রাঁধে, অল্প কেশ ফুলাইয়া বাঁধে।
খ) খনার বচন: কৃষি ও আবহাওয়ার কথা প্রাধান্য পেয়েছে।
খনা: খনার বচন প্রধানত কৃষিভিত্তিক। খনার বচন ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ সমাজে যেমন ডাকের বচনের উৎপত্তি হয়েছিল, তেমনি হিন্দু সমাজে খনার বচনের সৃষ্টি হয়েছিল। এ বচনগুলি জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী বাঙালি নারীর রচিত বলে ধরে নেয়া হয়। খনার বচনগুলির মাধ্যমে প্রধানত কৃষি, আবহাওয়া, সমাজের পরিচয় সম্পর্কে বহুবিধ ধারণা পাওয়া যায়। যেমন:
- কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস।
- একে তো নাচুনি বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি।
- কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।
- আলো হাওয়া বেধ না, রোগ ভোগে মরো না।
- উনা ভাতে দুনা বল, অতি ভাতে রসাতল।
- আউশ ধানে চাষ লাগে তিন মাস।
- আগে খাবে মায়ে, তবে পাবে পোয়ে।
- গাছে গাছে আগুন জ্বলে, বৃষ্টি হবে খনায় বলে।
- তেলা মাথায় ঢালো তেল, শুকনো মাথায় ভাঙ্গ বেল।
- দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।
- ভাত দেবার মুরোদ নাই, কিল দেবার গোসাঁই।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গদ্যের মাধ্যমে কাহিনি বর্ণিত হলে তাকে লোককথা বা লোককাহিনি বলে। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Folklore. কাহিনিগুলো কাব্যে রূপায়িত হলে 'গীতিকা' এবং গদ্যে বর্ণিত হলে তা 'কথা' নামে পরিচয় লাভ করে। ড. আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতে, লোককথা ৩ প্রকার। যথা:
১. রূপকথা
২. উপকথা
৩. ব্রতকথা।
রূপকথাঃ
নানা অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য কাহিনি নিয়ে রচিত সাহিত্যই রূপকথা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Fairy Tales. বাস্তব রাজ্যের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো অপুত্রক রাজার দৈব বলে পুত্রলাভ, ভাগ্যান্বেষণে রাজপুত্রের দেশান্তরে গমন এবং বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন, পরিণামে রাজকন্যা ও অর্ধেক রাজ্য লাভ করে সুখে কালযাপন- এ ধরণের কাহিনি কাঠামোর উপর রূপকথার ভিত্তি ও প্রকাশ। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সংগৃহীত রূপকথার নাম 'ঠাকুরমার ঝুলি' (১৯০৭), 'ঠাকুরদাদার ঝুলি' (১৯০৯), 'ঠানদিদির থলে' (১৯০৯), 'দাদামশায়ের থলে' (১৯১৩), 'কিশোরদের মন' (১৯৩৩)। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর রূপকথা সংগ্রহের নাম 'টুনটুনির বই' (১৯৬৪)।
উপকথা
পশু-পাখির কাহিনি অবলম্বনে রচিত সাহিত্যই উপকথা। কৌতুক সৃষ্টি এবং নীতি প্রচারের জন্য এগুলোর সৃষ্টি। এতে মানব চরিত্রের মতই পশুপাখির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে বক্তব্য পরিবেশিত হয়েছে। ইংরেজির ঈশপের গল্প, সংস্কৃতে পঞ্চতন্ত্র ও হিতোপদেশ এরূপ নীতিকথার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
ব্রতকথা
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেয়েলি ব্রতের সাথে সম্পর্কিত কাহিনি অবলম্বনে ব্রতকথা নামে এক ধরনের লোককথার বিকাশ ঘটেছে। এসব কাহিনিতে যে ধর্মবোধের কথা বলা হয়েছে তাতে মেয়েদের জাগতিক কল্যাণ নিহিত।
কবিগান দুই পক্ষের বিতর্কের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হত। দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতাই এর বৈশিষ্ট্য। কবিওয়ালারা মূলত ছিলেন গায়ক, তাঁরা অর্থের বিনিময়ে জনমনোরঞ্জন করতেন।
কবিওয়ালাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন:
- গোঁজলা গুঁই: তিনি কবিগানের আদিগুরু বলে পরিচিত।
- ভবানী বেনে, ভোলা ময়রা, হরুঠাকুর, কেষ্টা মুচি, এন্টনি ফিরিঙ্গি, রামবসু, রাসু-নৃসিংহ, নিতাইবৈরাগী, শ্রীধর কথক, নীলমণি পাটনী, বলরাম বৈষ্ণব, রামসুন্দর স্যাকরা নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রিক, আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখে কলকাতার হিন্দু সমাজে 'কবিওয়ালা' এবং মুসলিম সমাজে 'শায়ের' এর উদ্ভব ঘটে। ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকে ১৮৬০ সালে আধুনিকতার যথার্থ বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই ১০০ বছর বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষপূর্ণ কোনো নিদর্শন বিদ্যমান নেই।
আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের প্রথমার্ধে।
কয়েকজন কবিয়ালের নামঃ
গোজলা গুই (কবিগানের আদি কবি), ভবানী বেনে, ভোলা ময়রা, হরু ঠাকুর, কেষ্টা মুচি, এন্টনি ফিরিঙ্গী, রামবসু, নিতাই বৈরাগী, নিধু বাবু।
শায়ের
শায়ের আরবি শব্দ এবং এর অর্থ কবি। মুসলমান সমাজে মিশ্র (দোভাষী) ভাষারীতির পুঁথি রচয়িতাদের শায়ের বলা হতো। উল্লেখযোগ্য শায়েরগণ হলেন- ফকির গরীবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা, মোহাম্মদ দানেশ, মালে মুহম্মদ, আব্দুর রহিম, আয়েজুদ্দিন।
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আরবি-ফারসি শব্দমিশ্রিত এক ধরনের বিশেষ ভাষারীতিতে যে সব কাব্য রচিত হয়েছিল তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'পুঁথি সাহিত্য' নামে চিহ্নিত। কলকাতার সস্তা ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত হয়ে এই ধারার কাব্য দেশময় প্রচারিত হয়েছিল বলে 'বটতলার পুঁথি' নামেও একে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চলেছে। কেউ কেউ এই শ্রেণীর কাব্যকে আরবি-ফারসি শব্দের প্রাচুর্যপূর্ণ ব্যবহারের জন্য 'দোভাষী পুঁথি' নামে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এতে মাত্র দুটি ভাষার শব্দ নয়, বাংলা-হিন্দি-তুর্কি ভাষার শব্দের সংমিশ্রণও এতে ঘটেছে।
শায়েরদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন:
- কবি কৃষ্ণরাম দাস: এই ধারায় প্রথম কাব্য রচনা করেন। 'রায়মঙ্গল' তাঁর কাব্যের নাম।
- ফকির গরীবুল্লাহ: পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় কবি ছিলেন ফকির গরীবুল্লাহ। মিশ্র ভাষারীতিতে তাঁর রচিত কাব্যগুলো হচ্ছে: 'আমীর হামজা' (প্রথম অংশ), 'জঙ্গনামা',
'ইউসুফ-জোলেখা', 'সোনাভান', 'সত্যপীরের পুঁথি'। - সৈয়দ হামজা: মিশ্র ভাষারীতিতে তাঁর রচিত কাব্যগুলো হচ্ছে: 'আমীর হামজা' (২য় অংশ), 'জৈগুনের পুথি', 'হাতেম তাই'। তার 'মধুমালতী' কাব্যটি পুঁথি সাহিত্যের ধারার অনুসারী নয়, কবি সম্ভবত ফারসি কাব্য থেকে বঙ্গানুবাদ করে এ কাব্যের রূপ দেন।
- মালে মুহম্মদ, মুহম্মদ খাতের, আব্দুর রহিম নামও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
পুঁথি সাহিত্য ও কবিগানের সমসাময়িক বিভিন্ন গানের পরিচয় মেলে তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্য:
কবিগানের সমসাময়িককালে কলকাতা ও শহরতলীতে টপ্পাগান নামে রাগ-রাগিনীসংযুক্ত এক ধরনের ওস্তাদি গানের প্রচলন ঘটেছিল। হিন্দু টপ্পাগান এর আদর্শ। বাংলা টপ্পাগানের জনক ছিলেন নিধু বাবু বা রামনিধি গুপ্ত। টপ্পা থেকেই আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার সূত্রপাত বলে অনেকের ধারণা।
বাংলা টপ্পা গানের জনক রামনিধি গুপ্ত।
তাঁর বিখ্যাত গান-'নানান দেশের নানান ভাষা বিনে স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা'
পুঁথি সাহিত্য ও কবিগানের সমসাময়িক বিভিন্ন কবিতা ও গানের পরিচয় মেলে তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্য:
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে পাচালী গান এদেশে জনপ্রিয় হয়েছিল। পাচালী রচয়িতাদের মধ্য শক্তিশালী কবি ছিলেন দাশরথি রায়।
বাউল গান 'বাউল' শব্দটি এসেছে বাউর' শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে বাতুল অথবা পাগল। বাউলরা কখনো রীতিবন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চান না। তারা সংসারত্যাগী মুক্ত পুরুষ। বাউলদের সাধনাই হচ্ছে সঙ্গীতচর্চা। ‘UNESCO’ বাউল গানকে ২৫ নভেম্বর, ২০০৫ সালে ‘A Masterpiece of the Oral and Intangible Heritage Humanity' বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মানবতার বাহক লালন শাহ্ বাউল সাধক ও বাউল কবি হিসেবে খ্যাত। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালাভ না করলেও নিজের সাধনায় হিন্দু- মুসলমান শাস্ত্র সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি মুক্ত এক সর্বজনীন ভাবরসে ঋদ্ধ বলে তাঁর রচিত গান বাংলায় হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ।
লালন শাহ্ অক্টোবর, ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে (১ কার্তিক, ১১৭৯) ঝিনাইদহের হরিশপুর গ্রামে / কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির ভাঁড়ারা গ্রামে এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।
কথিত আছে যে, তিনি কোন এক সময় এক বাউল দলের সঙ্গী হয়ে গঙ্গাস্নানে যান। পথিমধ্যে বসন্ত রোগাক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাঁকে নদীর তীরে ফেলে যান। সিরাজ শাহ নামক জনৈক বাউল সাধক তাঁকে কুড়িয়ে নেন এবং তার কাছে লালিত-পালিত হন ।
- লালন সাঁই এর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল লালনচন্দ্র কর।
- লালনের একমাত্র যে স্কেচটি প্রচলিত সেটি অঙ্কন করেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
- সিরাজ শাহের মৃত্যুর পর তিনি কুষ্টিয়ার ছেউরিয়া গ্রামে আখড়া স্থাপন করেন।
- তিনি আধ্যাত্মিক ও মরমি রসব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ বাউল সংগীতের জন্য বিখ্যাত ।
- লালনকে বিশ্বসমাজে পরিচিত করণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।রবীন্দ্রনাথ লালনের ২৯৮টি গান সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করেন। এর মধ্যে ২০টি গান তিনি ‘প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশ করেন
- তিনি ১৭ অক্টোবর, ১৮৯০ সালে (বাংলা- ১লা কার্তিক, ১২৯৭) মারা যান ।
কিছু বিখ্যাত বাউ্ল গানঃ
১. খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়...
২. মিলন হবে কত দিনে...
৩. আমি অপার হয়ে বসে আছি...
৪. সময় গেলে সাধন হবে না...
৫. সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে...
৬. কেউ মালা কেউ তসবি গলায়...
৭. আপন ঘরে বোঝাই সোনা পরে করে লেনা দেনা...
মধ্যযুগের পরিধি ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বিবেচনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে এই যুগের সর্বশেষ কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা কাব্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের অবসান ঘটে। ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকে ১৮৬০ সালে আধুনিকতার যথার্থ বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই একশ' বছর বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষপূর্ণ কোন নিদর্শন বিদ্যমান নেই। মধ্যযুগের শেষ আর আধুনিক যুগের শুরুর এই সময়টুকুকে 'অবক্ষয় যুগ' বলা হয়েছে। কারও কারও মতে এই সময়টা 'যুগ সন্ধিক্ষণ' নামে আখ্যাত হওয়া উচিত। 'অবক্ষয় যুগ' তথা যুগসন্ধিক্ষণের ফসল হিসাবে হিন্দুদের মধ্যে কবিগান ও মুসলমানদের মধ্যে পুঁথি সাহিত্যের উদ্ভব ঘটে। হিন্দু সমাজে কবিগানের রচয়িতাদের কবিওয়ালা এবং মুসলমান সমাজে মিশ্র ভাষারীতির পুঁথি রচয়িতাদের শায়ের বলা হত।

আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রিক, আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখে কলকাতার হিন্দু সমাজে 'কবিওয়ালা' এবং মুসলিম সমাজে 'শায়ের' এর উদ্ভব ঘটে। ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকে ১৮৬০ সালে আধুনিকতার যথার্থ বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই ১০০ বছর বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষপূর্ণ কোনো নিদর্শন বিদ্যমান নেই।
১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের তিরোধানের মাধ্যমে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং ১৮৬০ সালে মাইকেলের সদর্প আগমনের মাধ্যমে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে। এ ১০০ বছর সাহিত্য জগতে চলছিল বন্ধ্যাকাল, ফলে এ সময়টুকুকে বলে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'যুগ সন্ধিক্ষণ'।
যুগ সন্ধিক্ষণের কবি/ অবক্ষয় যুগের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মুসলমান শাসনের সূত্রপাতে দেশে রাজনৈতিক অরাজকতার অনুমান করে কোন কোন পণ্ডিত অন্ধকার যুগ চিহ্নিত করেছেন। এ ধরনের ইতিহাসকারেরা বিজাতীয় বিরূপতা নিয়ে মনে করেছেন, 'দেড় শ দু শ কিংবা আড়াই শ বছর ধরে হত্যাকাণ্ড ও অত্যাচার চালানো হয় কাফেরদের ওপর। তাদের জীবন-জীবিকা এবং ধর্ম-সংস্কৃতির ওপর চলে বেপরোয়া ও নির্মম হামলা। উচ্চবিত্ত ও অভিজাতদের মধ্যে অনেকেই মরল, কিছু পালিয়ে বাঁচল, আর যারা এর পরেও মাটি কামড়ে টিকে রইল, তারা ত্রাসের মধ্যেই দিনরজনী গুণে গুণে রইল। কাজেই, ধন জন ও প্রাণের নিরাপত্তা যেখানে অনুপস্থিত, যেখানে প্রাণ নিয়ে সর্বক্ষণ টানাটানি, সেখানে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বিলাস অসম্ভব । ফলে সাহিত্য-সংস্কৃতির উন্মেষ-বিকাশের কথাই ওঠে না।' ড. সুকুমার সেনের মতে, “মুসলমান অভিযানে দেশের আক্রান্ত অংশে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল। গোপাল হালদারের মতে, তখন 'বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি তুর্ক আঘাতে ও সংঘাতে, ধ্বংসে ও অরাজকতায় মূর্ছিত অবসন্ন হয়েছিল। খুব সম্ভব, সে সময়ে কেউ কিছু সৃষ্টি করবার মত প্রেরণা পায় নি।' কেউ মনে করেন এ সময়ে 'বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বারম্বার হরণকারী বৈদেশিক তুর্কিদের নির্মম অভিযান প্রবল ঝড়ের মত বয়ে যায় এবং প্রচণ্ড সংঘাতে তৎকালীন বাংলার শিক্ষা সাহিত্য সভ্যতা সমস্তই বিনষ্ট ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, 'শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার দ্বারা মুসলমানেরা অমানুষিক বর্বরতার মাধ্যমে বঙ্গসংস্কৃতির ক্ষেত্রে তামসযুগের সৃষ্টি করে।' তিনি মনে করেন, 'বর্বর শক্তির নির্মম আঘাতে বাঙালি চৈতন্য' হারিয়েছিল এবং পাঠান, খিলজি, বলবন, মামলুক, হাবশি সুলতানদের চণ্ডনীতি, ইসলামি ধর্মান্ধতা ও রক্তাক্ত সংঘর্ষে বাঙালি হিন্দুসম্প্রদায় কূর্মবৃত্তি অবলম্বন করে কোন প্রকারে আত্মরক্ষা করছিল।' তিনি আরও লিখেছেন, 'তুর্কি রাজত্বের আশি বছরের মধ্যে বাংলার হিন্দুসমাজে প্রাণহীন অখণ্ড জড়তা ও নাম-পরিচয়হীন সন্ত্রাস বিরাজ করিতেছিল ।...কারণ সেমীয় জাতির মজ্জাগত জাতিদ্বেষণা ও ধর্মীয় অনুদারতা।...১৩শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই বাংলাদেশ মুসলমান শাসনকর্তা, সেনাবাহিনী ও পীর ফকির গাজীর উৎপাতে উৎসন্নে যাইতে বসিয়াছিল। শাসনকর্তৃগণ পরাভূত হিন্দুকে কখনও নির্বিচারে হত্যা করিয়া, কখনও বা বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিয়া এদেশে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে আরম্ভ করেন। ... হিন্দুকে হয় স্বধর্মত্যাগ, না হয় প্রাণত্যাগ, ইহার যে কোন একটি বাছিয়া লইতে হইত।' ভূদেব চৌধুরীর মতে, *বাংলার মাটিতে রাজ্যলিপ্সা, জিঘাংসা, যুদ্ধ, হত্যা, আততায়ীর হস্তে মৃত্যু— নারকীয়তার যেন আর সীমা ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর প্রজাসাধারণের জীবনের উৎপীড়ন, লুণ্ঠন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মহানির সম্ভাবনা উত্তরোত্তর উৎকট হয়ে উঠেছে। স্বভাবতই জীবনের এই বিপর্যয় লগ্নে কোন সৃজনকর্ম সম্ভব হয় নি।' ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছেন, 'শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার দ্বারা বাংলা ও তাহার চতুষ্পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলামের অর্ধচন্দ্রখচিত পতাকা প্রোথিত হইল। খ্রিঃ ১৩শ হইতে ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত—প্রায় দুই শত বছর ধরিয়া এই অমানুষিক বর্বরতা রাষ্ট্রকে অধিকার করিয়াছিল; এই যুগ বঙ্গসংস্কৃতির তামসযুগ, য়ুরোপের মধ্যযুগ The Dark Age-এর সহিত সমতুলিত হইতে পারে।' এ সব পণ্ডিত মুসলমান শাসকদের অরাজকতাকেই অন্ধকার যুগ সৃষ্টির কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের শুরু প্রায় সুনিশ্চিতভাবেই ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ধরা হয়। এ যুগ নানা দিক থেকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ, সমৃদ্ধি হওয়ার যুগ; বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সুবিখ্যাত ও সমাদৃত হওয়ার যুগ।
আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের শুরুতে রাষ্ট্রিক, আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া সাহিত্যে দৃশ্যমান হয় এবং বাংলা সাহিত্যে নতুন রাগিণীর সূচনা ঘটে। পাশ্চাত্য শিক্ষা, সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতির সংস্পর্শে এসে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল আধুনিক যুগে। এ যুগের প্রতিভূ হলো গদ্য সাহিত্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিষয় ছিল ধর্ম অথবা রাজবন্দনা আর আঙ্গিকে ছিল কেবলই কবিতা। কিন্তু আধুনিক যুগে গদ্যের বিকাশের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যের নব নব শাখা বিস্তৃত হলো। এ সময়ে মানবতাবোধ, যুক্তিবাদ, সমাজসচেতনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, গদ্যের প্রতিষ্ঠা স্বদেশপ্রেম, রোমান্টিক দৃষ্টি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য সাহিত্যে মূর্ত হয়ে উঠে।
আধুনিক যুগের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য আত্মত্মচেতনা, জাতীয়তাবোধ ও মানবতার জয়জয়কার।
সাহিত্যে আধুনিক যুগ শুরু হয় ১৮০১- বর্তমান। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক যুগ শুরু হয় ১৮৬০ সালের দিকে মাইকেল মধুসূদনের আবির্ভাবের মাধ্যমে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা সাহিত্যে গদ্যের সূচনা হয় উনিশ শতকে। ড. সুকুমার সেন বাংলা গদ্য সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ কালকে ৪ ভাগে ভাগ করেছেন। যথা:
স্তর | সময়কাল |
| প্রথম | সূচনা - ষোড়শ শতাব্দী থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত। |
| দ্বিতীয় | উন্মেষ - ১৮০০ (শ্রীরামপুর মিশন) থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত। |
| তৃতীয় | অভ্যূদয় - ১৮৪৭ (বিদ্যাসাগর) থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত। |
| চতুর্থ | পরিণতি - ১৮৬৫ (বঙ্কিমচন্দ্র) থেকে বর্তমান ....... |
বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রাথমিক নিদর্শন
১৫৫৫ সালে আসামের রাজাকে কোচবিহারের রাজার একটি পত্রকে প্রাথমিক নিদর্শন ধরা হয়।
বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রাথমিক প্রচেষ্টা
১৭৪৩ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে প্রকাশিত ঢাকার ভূষনার জমিদারপুত্র দোম অ্যান্টনিও রচিত 'ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ'। এটি বাঙালির লেখা প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।
বাংলা কথ্য ভাষার আদি গ্রন্থ
মনোএল দা আসসুম্পসাঁওয়ের রোমান লিপিতে লেখা 'কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ'। তাঁর রচিত অন্য বইটি হলো 'ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগোল্লা ই পোরতুগিজ' (১৭৪৩)।
বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গদ্যগ্রন্থ
১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে মুদ্রিত মথি রচিত 'মিশন সমাচার'।
শ্রীরামপুর মিশন ভারতে খ্রিষ্টানদের নিজস্ব প্রথম প্রচার সংঘ। ১৭৯৩ সালে উইলিয়াম কেরী খিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আসেন। তিনি উইলিয়াম ওয়ার্ড ও জোশুয়া মার্শম্যানের সহায়তায় ডেনমার্কের শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুরে ১০ জানুয়ারি, ১৮০০ সালে 'শ্রীরামপুর মিশন' প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ বছরের মার্চ মাসে শ্রীরামপুর মিশনের প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮০৮ সালে মিশনের মালিকানা ডেনিশদের হাত থেকে ইংরেজদের হাতে চলে যায়। শ্রীরামপুর মিশন থেকে পরবর্তীতে 'রামায়ণ', 'মহাভারত' সহ একাধিক পুস্তক প্রকাশিত হয়। ১৮১৮ সালে এ মিশন থেকে 'দিকদর্শন' ও ‘সমাচার দর্পন’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৪৫ সালে শ্রীরামপুর মিশন বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু এ প্রেস ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
১৭৭৭ সালে জেমস হিকি নামের একজন ভাগ্যান্বেষী প্রথম কাঠের প্রেস তৈরি করে বাংলায় মুদ্রণ ব্যবসা চালু করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস এর অনুরোধে ব্রাসি হ্যালহেড বাংলা ব্যাকরণের বই লিখার পর ছাপার যন্ত্র বা বাংলা মুদ্রণ হরফ না থাকায় হেস্টিংস তাঁর অধীনস্ত কর্মচারী চার্লস্ উইলকিন্সকে হরফ তৈরির নির্দেশ দেন। উইলকিন্স পরে পঞ্চানন কর্মকারের সহায়তায় বাংলা মুদ্রণ হরফ তৈরি করেন। ইংরেজরা ছাপাখানা তৈরি করেছিলেন প্রথমত ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা শেখানোর বই ও অভিধান প্রকাশ এবং দ্বিতীয়ত বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশের জন্য।
- ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৪৯৮ সালে গোয়ায় (এটি ছিলো পর্তুগিজ ভাষার মুদ্রণযন্ত্র)।
- ১৭৭৮ সালে চার্লস্ উইলকিন্স হুগলিতে প্রথম বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি নিজেই বাংলা অক্ষরের নকশা তৈরি করেন বলে তাঁকে বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক বলা হয়।
- বাংলা অক্ষর খোদাই করেন পঞ্চানন কর্মকার।
- ১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরী জোশুয়া মার্সম্যানের সহযোগিতায় শ্রীরামপুর মিশনে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করেন।
- শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয়:
- গ্রন্থ: 'রামায়ণ', 'মহাভারত' ইত্যাদি।
- পত্রিকা: 'দিকদর্শন', 'সমাচার দর্পণ' প্রভৃতি।
- বাংলাদেশে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪৭ সালে রংপুরে 'বার্তাবহ যন্ত্র' নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ঢাকায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলা প্রেস’- ১৮৬০ সালে । এখান থেকেই দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' প্রকাশিত হয়।
বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলায় কর্মরত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ অফিসারদের দেশিয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে লর্ড ওয়েলেক্সি কর্তৃক ৪ মে, ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বাংলা বিভাগ চালু হয় ২৪ নভেম্বর, ১৮০১ সালে। বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন শ্রীরামপুর মিশনের পাদ্রি এবং বাইবেলের অনুবাদক বাংলায় অভিজ্ঞ উইলিয়াম কেরী। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে এ কলেজের গুরুত্ব হ্রাস পায়। রাজা রামমোহন রায়ের সাহিত্যিক প্রভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের মহিমা ধীরে ধীরে বিলীয়মান হয় এবং ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসির সময়ে কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়।
- বাংলায় কর্মরত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ অফিসারদের দেশিয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে লর্ড ওয়েলেস্স্সি কর্তৃক ৪ মে, ১৮০০ সালে কলকাতার লালবাজারে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বাংলা বিভাগ চালু হয় ১৮০১ সালে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কমপ্লেক্সের নামকরণ করা হয়েছে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামে। আর এ কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে এর নাম হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ চালুর মূল উদ্দেশ্য
বাংলায় কর্মরত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ অফিসারদের বাংলা শিক্ষা দেয়া।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বন্ধ হয় ১৮৫৪ সালে ।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন শ্রীরামপুর মিশনের পাদ্রী ও বাইবেলের অনুবাদক উইলিয়াম কেরী। বাংলা গদ্য বিকাশের যুগে ১৮০১-১৮১৫ সাল পর্যন্ত মোট ৮ জন লেখক ১৩টি বাংলা গদ্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এ ৮ জনের অধিকাংশই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকাঃ
বাংলায় কর্মরত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ অফিসারদের দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে লর্ড ওয়েলেট্সি কর্তৃক ৪ মে, ১৮০০ সালে কলকাতার লালবাজারে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বাংলা বিভাগ চালু হয় ১৮০১ সালে। কলেজটি ইংরেজদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে চালু হলেও উপজাত হিসেবে বাংলা গদ্য বিকাশে এটি ব্যাপক অবদান রেখেছিল। এ কলেজের বাংলা বিভাগে নিযুক্ত পণ্ডিতগণের মাধ্যমে মূলত বাংলা গদ্যসাহিত্য চর্চার পথ সুগম হয়। বিশৃঙ্খল গদ্যের রূপ ও রীতিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, গদ্যের প্রচলিত রূপ দলিল-দস্তাবেজ, চিঠিপত্র, বৈষ্ণব ও সহজিয়া সাধকদের ধর্মীয় পুস্তিকা থেকে গদ্যকে সাহিত্যের মানদণ্ডে উৎকর্ষ সাধন করা এবং পুস্তক আকারে তা রূপদান করা প্রভৃতি কার্যক্রম এ কলেজের পণ্ডিতদের মাধ্যমে সূত্রপাত ঘটে। কলেজটিতে বাংলা বিভাগ চালুর পর পাঠ্যপুস্তকের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে উইলিয়াম কেরীসহ মোট ৮জন লেখক ১৩টি বাংলা গদ্যপুস্তক রচনা করেন, যার মাধ্যমে বাংলা গদ্য সাহিত্যের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের পথ উন্মুক্ত হয়। কেরী বাংলা ভাষার কথ্যরীতির প্রথম নিদর্শন 'কথোপকথন' রচনা করেন। একাধিক মানুষের মুখের সাধারণ কথা বা কথোপকথন এ গ্রন্থের উপজীব্য। তিনি 'ইতিহাসমালা' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা বাংলা ভাষার প্রথম গল্পগ্রন্থ। রামরাম বসু রচিত রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ও লিপিমালা; মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত বত্রিশ সিংহাসন, হিতোপদেশ, রাজাবলী, বেদান্তচন্দ্রিকা, প্রবোধচন্দ্রিকা; হরপ্রসাদ রায় রচিত পুরুষ পরীক্ষা; গোলকনাথ শর্মা রচিত হিতোপদেশ; চণ্ডীচরণ মুনশি রচিত তোতা ইতিহাস প্রভৃতি গদ্যগ্রন্থ বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উইলিয়াম কেরীর গ্রন্থ রচনাঃ
- 'কথোপকথন' (১৮০১): এটি বাংলা ভাষার কথ্যরীতির প্রথম নিদর্শন, যা ৩১টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। গ্রন্থটি শতভাগ মৌলিক নয়। এটি দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) গ্রন্থ।
- 'ইতিহাসমালা' (১৮১২): এটি বাংলা ভাষার প্রথম গল্পগ্রন্থ। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ১৫০টি গল্প সংগ্রহের পর তা অনুবাদ করে এ গ্রন্থে সংকলিত করা হয়েছে।
- 'এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ' (১৮০১)।
কেরী সাহেবের মুন্সি বলা হতো রামরাম বসু কে । কারণ, তিনি ১৭৯৩-১৭৯৬ পর্যন্ত উইলিয়াম কেরীকে বাংলা শেখান।
রামরাম বসুর সাহিত্যকর্মসমূহ
- 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' (১৮০১): এটি বাঙালির লেখা বাংলা অক্ষরে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। বাংলা গদ্যে প্রথম জীবনচরিত।
- 'লিপিমালা' (১৮০২): প্রথম বাংলা পত্রসাহিত্য। এটি ৪০টি লিপি বা চিঠির সংকলন।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের রচনাবলি | |
রচয়িতা | সাহিত্যকর্ম |
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার [ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের মধ্যে তিনি বেশি পুস্তক রচনাকারী] | 'বত্রিশ সিংহাসন' (১৮০২), 'হিতোপদেশ' (১৮০৮), 'রাজাবলী' (১৮০৮), 'বেদান্তচন্দ্রিকা' (১৮১৭), 'প্রবোধচন্দ্রিকা' (১৮৩৩)। (প্রথম ৪টি গ্রন্থ সংস্কৃত থেকে অনূদিত। তবে অনুবাদে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করেছেন)। |
| রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় | 'মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং (১৮০৫) |
| তারিণীচরণ মিত্র | 'ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট' (১৮০৩): এটি অনূদিত গ্রন্থ। |
| চণ্ডীচরণ মুনশী | 'তোতা ইতিহাস' (১৮০৫): এটি ফারসি 'তোতা কাহিনী'র হিন্দুস্থানী অনুবাদ 'তোতা কহানী অবলম্বনে রচিত। |
| হরপ্রসাদ রায় | 'পুরুষ পরীক্ষা' (১৮১৫): এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত বিদ্যাপতির 'পুরুষপরীক্ষা' গ্রন্থের অনুবাদ। |
| গোলকনাথ শর্মা | 'হিতোপদেশ' (১৮০২): এটি সংস্কৃত 'হিতোপদেশ' গল্পের বই থেকে অনূদিত গ্রন্থ। |
বাংলা সাহিত্যের বিকাশে যেসব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় এবং ডেভিড হেয়ারের সহায়তায় ২০ জানুয়ারি, ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার 'হিন্দু কলেজ' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের সন্তানেরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের যথার্থ সুযোগ লাভ করে। এ কলেজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রবর্তন করা। ১৫ এপ্রিল, ১৮৫৫ সালে হিন্দু কলেজের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং এর স্থলাভিষিক্ত হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ। ১৫ জুন, ১৮৫৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের যাত্রা শুরু হয়। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক এবং 'ইয়ংবেঙ্গল' আন্দোলনের প্রবক্তা।
- হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৭ সালে।
ইয়ংবেঙ্গল
ইয়ংবেঙ্গল আত্মপ্রকাশ করে ১৮৩১ সালে। যুক্তি ও মানবাধিকারের দীপ্ত বাণীর শপথে ইংরেজি ভাবধারাপুষ্ট বাঙালি যুবক। 'আস্তিকতা হোক, নাস্তিকতা হোক, কোন জিনিসকে পূর্ব থেকে গ্রহণ না করা; জিজ্ঞাসা ও বিচার'- এ মন্ত্রে যারা উজ্জীবিত ছিল তারাই ইয়ংবেঙ্গল। ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত ইয়ংবেঙ্গল ছাত্রগোষ্ঠী সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় ইউরোপীয় ভাবচিন্তাকে আত্মস্থ করেছিলেন। ছাত্র হিসেবে সকলেই ছিলেন প্রতিভাবান, ইংরেজি শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহী এবং ধর্মীয় গোড়ামীর ব্যাপারে অত্যন্ত সমালোচনামুখর। বিবিধ সংবাদপত্র পরিচালনা, পুস্তিকা রচনা, শিক্ষা বিস্তার, বিতর্ক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারে তারা ছিলেন তৎপর।
ইয়ংবেঙ্গলের মুখপত্র / পত্রিকা- | |
পত্রিকা | সম্পাদক |
| এনকোয়ার | কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় |
| 'জ্ঞানান্বেষণ' | 'জ্ঞানান্বেষণ' |
- ইয়ংবেঙ্গলের প্রতিষ্ঠাতা/ মন্ত্রগুরু: হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৮২৬ সালে এ কলেজে যোগ দেন। ২৩ এপ্রিল, ১৮৩১ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ডিরোজিওকে পদত্যাগ করতে পত্র দেন এবং ২৫ এপ্রিল, ১৮৩১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। ডিরোজিও ২৬ ডিসেম্বর, ১৮৩১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়ংবেঙ্গলের সদস্য:
কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র, তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রমুখ। এরা সবাই ছিলেন মুক্তচিন্তা দ্বারা উজ্জীবিত। হিন্দু সমাজে বিদ্যমান সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো এদেরকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। প্রাচীন ও ক্ষয়িষ্ণু প্রথা তথা ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক শৃঙ্খলমুক্তির উল্লেখযোগ্য প্রয়াস হিসেবে ইয়ংবেঙ্গলের সদস্যগণ গো-মাংস ভক্ষণ ও মদ্যপানে আনন্দবোধ করতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত হিন্দু কলেজের ছাত্র থাকাবস্থায় ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারকে পদানত করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সমাজের ধর্মান্ধতা ও গোড়ামী দূর করার জন্য কলম ধরেন। পরবর্তীতে ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠীর সদস্যরা ডিরোজিওর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হলে তিনি নব্য ইয়ংবেঙ্গলদের অনাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতাকে কটাক্ষ করে ১৮৫৯ সালে রচনা করেন বিখ্যাত প্রহসন 'একেই কি বলে সভ্যতা'।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে পরিপূর্ণ সহযোগিতার জন্য এদেশীয় হিন্দুরা জীবনের বিবিধ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যক্ষেত্রেও সুযোগ্য স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাহিত্যের যে বিচিত্র বিকাশ হয়েছে তা প্রধানত হিন্দু সাহিত্যিকদের প্রচেষ্টার ফল।
আবদুল লতিফ 'মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি' নামে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে একটি সাহিত্য সমিতি গঠন করেন। মুসলমানেরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, স্বাধীন চিন্তাধারার বিকাশ ও স্বকীয় অবস্থার পর্যালোচনার মাধ্যমে জাতীয় জীবনের উন্নতি সাধন করুক--এই ছিল সমিতির উদ্দেশ্য। এই সমস্ত প্রচেষ্টার ফলেই দেখা যায়, মুসলমানেরা বাংলা সাহিত্যের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রকাশে একান্তই তৎপর হয়ে ওঠে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়।
বাঙালি মধ্যবিত্তের সাহিত্যচর্চা ও সাধনার পীঠভূমি 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৫ সালে। সেখানে মুসলমানদের গুরুত্ব উপেক্ষিত হওয়ায় ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ মোজাম্মেল হক, কাজী ইমদাদুল হক, মওলানা আকরাম খাঁ, কমরেড মুজাফফর আহমেদ প্রমুখ। এই সমিতির পত্রিকা ছিল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা। এই সমিতির অফিস ছিল কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব' স্লোগানকে ধারণ করে চিন্তাচর্চা ও জ্ঞানের জন্য আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি এবং আবহমানকালের চিন্তা ও জ্ঞানের সাথে সংযোগ সাধনের লক্ষ্যে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি 'ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ' প্রতিষ্ঠিত হয়।
Key Notes:
- ১৯১১ সালে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমাজ' প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কিন্তু এতে মুসলমানদের গুরুত্ব উপেক্ষিত হওয়ায় ১৯২৬ সালে ঢাকায় 'ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ' প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর মাধ্যমে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সুত্রপাত হয় ।
- 'ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর প্রধান লেখক কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মুহম্মদ আব্দুর রশীদ, আবুল ফজল প্রমুখ।
- ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ সংগঠনের মুখপত্রের নাম শিখা। এটি ১৯২৭ সালে আবুল হোসেনের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের অধীনে নিবন্ধিত একটি অরাজনৈতিক, বেসরকারি ও অলাভজনক সংস্থা বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। এটি এশিয়ার মানুষ ও প্রকৃতি বিষয়ে গবেষণার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮৪ সালে কলকাতায়। ভারত বিভাগের পর ৩ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে এর নামকরণ হয় 'পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি'। স্বাধীনতার পর নামকরণ হয় 'বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি'।
- এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন স্যার উইলিয়াম জোন্স।
- বাংলাপিডিয়া প্রকাশিত হয় ১৪ খণ্ডে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।
- বাংলাপিডিয়া'র প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম।
- বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি'র প্রতিষ্ঠাকালীন
- সভাপতি ছিলেন : আবদুল হামিদ (১৯৫২-৫৩)।
- সাধারণ সম্পাদক ছিলেন: ড. আহমদ হাসান দানী (১৯৫২-৫৩)।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি'র বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক হারুন অর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক: অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান ।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য:
অতীতকাল হতে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, দর্শন, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ের গবেষণামূলক জ্ঞান উপস্থাপন করা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং এদেশের মুসলিম মধ্যবিত্তের জাগরণ ও আত্মপরিচয় বিকাশের প্রেরণায় বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ শতকের প্রথমদিকে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ সূচিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর। এ অবস্থা অতিক্রম করার প্রয়াসে লেখক-পণ্ডিত-গবেষকদের দৃষ্টি পড়ে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি। ১৯২৫ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার প্রস্তাব করেন। বিভাগোত্তরকালে ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির অভিভাষণে শহীদুল্লাহ একটি একাডেমি গড়ার কথা বলেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণা ও চর্চার কেন্দ্ররূপে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি আরও জোরালো হয়। অবশেষে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসে (স্থাপিত-১৯০৬) বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় যা উদ্বোধন করেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার।
Key Notes:
- বাংলা ভাষা বিষয়ক বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। এটি ৪টি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এটিকে বলা হয় 'জাতির মননের প্রতীক'।
- বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ সালে। বাংলা একাডেমি শব্দের বানান 'একাডেমী' থেকে 'একাডেমি'তে রূপান্তরিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সালে।
- 'The Bengali Academy Act-1957' আইনে বাংলা একাডেমি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পায় ।
- বাংলা একাডেমি ভবনের পুরাতন নাম বর্ধমান হাউস।
- বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬০ সাল থেকে 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার' চালু করা হয়।
- বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ৬টি।
- বাংলা একাডেমি'র বানান অভিধানের সম্পাদক জামিল চৌধুরী।
বাংলা একাডেমি'র পত্রিকার নাম | পত্রিকার বিষয় | বাংলা একাডেমি'র প্রথম ও বর্তমান... | |
| বাংলা একাডেমি পত্রিকা (ত্রৈমাসিক) | গবেষণামূলক | প্রথম সভাপতি | মওলানা আকরম খাঁ |
| উত্তরাধিকার (মাসিক) | সৃজনশীল সাহিত্য | প্রথম পরিচালক | ড. মুহাম্মদ এনামুল হক |
| ধান শালিকের দেশ (ত্রৈমাসিক) | কিশোর সাহিত্য | প্রথম মহাপরিচালক | ড. মযহারুল ইসলাম |
| বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকা (ষাণ্মাষিক) | বিজ্ঞান বিষয়ক | প্রথম মহিলা মহাপরিচালক | ড. নীলিমা ইব্রাহিম |
| বার্তা (মাসিক) | মুখপত্র | বর্তমান সভাপতি | আবুল কাসেম ফজলুল হক |
| বাংলা একাডেমি জার্নাল (ষাণ্মাষিক) | - | বর্তমান মহাপরিচালক | মোহাম্মদ আজম |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক ইতিহাসকে তিন যুগে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম যুগের নাম প্রাচীন যুগ। তবে কেউ কেউ আরও কয়টি নামে এ যুগকে অভিহিত করেছেন। সে নামগুলো হল : আদ্যকাল, গীতিকবিতার যুগ, হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ, আদি যুগ, প্রাক-তুর্কি যুগ, গৌড় যুগ ইত্যাদি। তবে প্রাচীন যুগ নামটির ব্যবহার ব্যাপক ও যথার্থ যুক্তিসঙ্গত ।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদের প্রায় সমসাময়িক কালে বাংলাদেশে যে সব সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রত্যক্ষ উপকরণ নয়। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদগুলো সম্পর্কে ১৯০৭ সালের আগে কোন তথ্যই জানা ছিল। না। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত Sanskrit Buddhist Literature in Nepal গ্রন্থে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র সর্বপ্রথম নেপালের বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
পৃথিবীর প্রথম সংবাদপত্র ১৫৬০ সালে জার্মান থেকে প্রকাশিত হয়। ১৭০২ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয় বিশ্বের প্রথম দৈনিক পত্রিকা। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সরকার ১৭৯৫ সালে পত্র-পত্রিকায় প্রথম সেন্সর প্রথা চালু করে।
Key Notes:
- ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের নামঃ জেমস্ অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত 'বেঙ্গল গেজেট' (১৭৮০)। এটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়।
- বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত 'দিগদর্শন' (১৮১৮)।
- বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত 'সমাচার দর্পণ' (১৮১৮)। এটি সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়।
- বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'বাঙ্গাল গেজেট' (১৮১৮)।
- বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত 'সংবাদ প্রভাকর'। সাপ্তাহিক হিসেরে ১৮৩১ সালে এবং দৈনিক হিসেবে ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হয়।
- মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা শেখ আলিমুল্লাহ সম্পাদিত 'সমাচার সভারাজেন্দ্র' (১৮৩১)
- বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র গুরুচরণ রায় সম্পাদিত 'রংপুর বার্তাবহ' (১৮৪৭)।
- ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত 'ঢাকা প্রকাশ' (১৮৬১)।
সাময়িকী/সংবাদপত্র | প্রকাশকাল | সম্পাদক | টীকাভাষ্য |
| বেঙ্গল গেজেট | ১৭৮০ | জেমস অগাস্টাস হিকি | ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র (ইংরেজিতে)। |
| দিগদর্শন | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান | বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র। |
| সমাচার দর্পণ | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান | বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র (সাপ্তাহিক)। |
| বাঙ্গাল গেজেট | ১৮১৮ | গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য | বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| সম্বাদ কৌমুদী | ১৮২১ | রাজা রামমোহন রায় | সামাজিক কুসংস্কার অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশিত হত। |
| ব্রাহ্মণসেবধি | ১৮২১ | ||
| পশ্বাবলী | ১৮২২ | বেভারেন্ড লঙ | - |
| সমাচার চন্দ্রিকা | ১৮২২ | ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় | - |
| বঙ্গদূত | ১৮২৯ | নীলমণি হালদার | - |
| সংবাদ প্রভাকর (সাপ্তাহিক) | ১৮৩১ | ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত | বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। |
| সংবাদ প্রভাকর (দৈনিক) | ১৮৩৯ | ||
| সমাচার সভারাজেন্দ্র | ১৮৩১ | শেখ আলিমুল্লাহ | মুসলমান কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। |
| জ্ঞানান্বেষণ | ১৮৩১ | দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় | 'ইয়ংবেঙ্গল' গোষ্ঠীর মুখপত্র। |
| তত্ত্ববোধিনী | ১৮৪৩ | অক্ষয়কুমার দত্ত | তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র। |
| রংপুর বার্তাবহ | ১৮৪৭ | গুরুচরণ রায় | বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| ঢাকা প্রকাশ | ১৮৬১ | কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার | ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র। |
| গ্রামবার্তা প্রকাশিকা | ১৮৬৩ | কাঙাল হরিনাথ | কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র। |
| বঙ্গদর্শন | ১৮৭২ | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | বাংলা গদ্যের বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। |
| ভারতী | ১৮৭৭ | দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর | - |
| সুধাকর | ১৮৮৯ | শেখ আব্দুর রহিম | মুসলমানদের মহিমা, তত্ত্ব, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় এতে আলোচিত হতো |
| মিহির | ১৮৯২ | ||
| হাফেজ | ১৮৯৭ | ||
| কোহিনুর | ১৮৯৮ | মো: ইয়াকুব আলী চৌধুরী | কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র। |
| সবুজপত্র | ১৯১৪ | প্রমথ চৌধুরী | বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতি প্রচলনে অবদান রাখে। |
| সওগাত | ১৯১৮ | মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন | ১৯২৬ সালে এটি সওগাত নবপর্যায় নামে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৫২ সাল থেকে পত্রিকাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। |
| মোসলেম ভারত | ১৯২০ | মোজাম্মেল হক | কাজী নজরুলের কাব্য খ্যাতিতে এটি অবদান রাখে। |
| আঙ্গুর | ১৯২০ | ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ | কিশোর পত্রিকা। |
| ধূমকেতু | ১৯২২ | কাজী নজরুল ইসলাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ পত্রিকায় অভিনন্দন বাণী পাঠিয়েছেন। |
| লাঙল | ১৯২৫ | - | |
| নবযুগ | ১৯৪১ | ১৯২০ সালে মুজাফফর আহমদ সহযোগে প্রথম প্রকাশিত। | |
| কল্লোল | ১৯২৩ | দীনেশরঞ্জন দাশ | এ পত্রিকাকে ঘিরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক বলয় তৈরি হয়েছিল। |
| কালিকলম | ১৯২৬ | প্রেমেন্দ্র মিত্র | কলকাতা থেকে প্রকাশিত সচিত্র মাসিক পত্রিকা। |
| মাসিক মোহাম্মদী | ১৯২৭ | মো: আকরম খাঁ | - |
| শিখা | ১৯২৭ | আবুল হোসেন | 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের মুখপত্র রূপে প্রকাশিত। |
| পূর্বাশা | ১৯৩২ | সঞ্জয় ভট্টাচার্য | - |
| কবিতা | ১৯৩৫ | বুদ্ধদেব বসু | ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। |
| দৈনিক আজাদ | ১৯৩৬ | মো: আকরম খাঁ | কলকাতা থেকে প্রকাশিত। |
| চতুরঙ্গ | ১৯৩৯ | হুমায়ুন কবির | ঢাকা থেকে প্রকাশিত। |
| ক্রান্তি | ১৯৪০ | রণেশ দাশগুপ্ত | ঢাকা থেকে প্রকাশিত। |
| বেগম (সাপ্তাহিক) | ১৯৪৭ | সুফিয়া কামাল (প্রথম), নুরজাহান বেগম | মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। |
| সমকাল | ১৯৫৭ | সিকান্দার আবু জাফর | তৎকালীন সময়ের ঢাকার প্রভাবশালী পত্রিকা। |
| কন্ঠস্বর | ১৯৬৫ | আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ | - |
| কালবেলা | ১৯৬৫ | জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত | - |
| স্বদেশ | ১৯৬৯ | আহমদ ছফা | - |
| শিলালিপি | ১৯৬৯ | সেলিনা পারভীন | - |
| শিল্পকলা | ১৯৭০ | আবদুল মান্নান সৈয়দ | - |
| কণ্ঠস্বর | - | আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ | - |
| উত্তরাধিকার | ১৯৭৩ | এটি বাংলা একাডেমি'র সৃষ্টিশীল সাহিত্যপত্র। ১৯৭৩ সালে মাসিক পত্রিকা হিসেবে চালু হলেও ১৯৮৩ সালে ত্রৈমাসিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। ২০০৯ সালে আবার মাসিক পত্রিকা হিসেবে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। পরে আবারও ত্রৈমাসিকে রূপান্তরিত হয়। | |
| ধানশালিকের দেশ | ১৯৭৩ | এটি কিশোরদের জন্য প্রকাশিত বাংলা একাডেমি'র ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। | |
| লোকায়ত | ১৯৯০ | ১৯৯০ সালে হুগলি জেলার শ্রীরামপুর স্টেশনের ডাউন প্লাটফর্মের হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা 'লোকায়ত'র শুরু। ১৯৯২ সালে মুদ্রিত আকারে আত্মপ্রকাশ। | |
| নারীশক্তি | - | ডা. লুৎফর রহমান | নারী সমাজের প্রগতির লক্ষ্যে প্রকাশিত। |
| ইত্তেফাক | - | তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) | - |
| সাহিত্য পত্রিকা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
| ভাষা সাহিত্যপত্র | জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
| সাহিত্যিকী | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা বিভাগ)। | ||
আধুনিক যুগের সূচনায় পত্র-পত্রিকার ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিলো পত্র-পত্রিকা। আধুনিক যুগের প্রতিভূ হলো গদ্য সাহিত্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিষয় ছিল ধর্ম অথবা রাজবন্দনা আর আঙ্গিকে ছিল কেবলই কবিতা। আর গদ্যের বিকাশের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা ঘটে। শ্রীরামপুরের খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকগণ ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ বাংলা গদ্যের উন্নতিকল্পে প্রভূত পরিশ্রম করে ভূমিকর্ষণ করেছিলেন। সেই কর্ষিত ভূমিতে ফসল ফলানোর উপযোগী আলো-হাওয়া ও জলসিঞ্চনের ব্যবস্থা করেছিল পত্র-পত্রিকাগুলো। এসব সাময়িকপত্র যদি যথাসময়ে গদ্যভাষার বাহন না হয়ে উঠতো, তাহলে বাংলা গদ্য সাহিত্য এতো দ্রুত সমৃদ্ধি লাভ করতো না এবং আধুনিক যুগের সূচনা আরও প্রলম্বিত হতো। তাই গদ্যরীতি গঠনে ও গদ্যসাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে পত্র-পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য। বিভিন্ন পত্রিকাগোষ্ঠীকে অবলম্বন করেই সেকালে প্রতিভাবান সাহিত্যিকেরা জাতীয় সাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে বাংলা সাহিত্যে নতুন রাগিণীর সূচনা ঘটান, যা আধুনিক যুগের সূচনাকে ত্বরান্বিত করে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা মাসিকপত্র হিসেবে মিশনারিদের পক্ষ থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'দিকদর্শন' প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় ব্যবহৃত গদ্যভাষা খুব স্বচ্ছন্দ না হলেও সহজবোধ্য ছিলো, যা গদ্য সাহিত্য বিকাশে ভূমিকা রাখে। ১৮১৮ সালের মে মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় 'সমাচার দর্পণ' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার লেখার ভাষায় সারল্য, তথ্যবোধ ও মাত্রাজ্ঞান বিদ্যমান ছিল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নববাবু বিলাস' ও 'নববিবি বিলাস', প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা 'বাবু-বৃত্তান্ত' এর সূচনা এ পত্রিকাতেই। ড. সুকুমার সেন বলেন, 'সাধারণ বাঙ্গালী পাঠক খবরের কাগজের রস এই প্রথম আস্বাদন করিল এবং তাহাতে বাঙ্গালা গদ্যের ঘরোয়া পরিচয়ের সুযোগ লাভ করিল। ………. এই সাময়িকপত্রের মধ্যে অনুশীলিত হইয়াই বাংলা গদ্যের জড়তামুক্তি ঘটিয়াছিল।' রাজা রামমোহন রায়ের সম্পাদনায় ১৮২১ সালে প্রকাশিত হয় 'সম্বাদ কৌমুদী' ও 'ব্রাহ্মণসেবধি' পত্রিকা। এ পত্রিকায় রামমোহন রায় ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ লেখালেখি করতেন, যা বাংলা গদ্যসাহিত্য বিকাশের পথ খানিকটা অগ্রসর হয়। বাংলা গদ্য সাহিত্যকে শিশু থেকে যৌবনপ্রাপ্ত করার বিশেষ সহযোগী হিসেবে 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকা ১৮৩১ সালে প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৮৩৯ সালে দৈনিকরূপে প্রকাশিত হয়। দীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ মূলত এ পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয়। এ পত্রিকা দীর্ঘকাল পাঠকের কাছে নানা ধরনের সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সাহিত্যরস পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে এসেছিল, যা গদ্যসাহিত্য পরিপূর্ণ বিকাশের পথে সবেগে ধাবিত হয়। এছাড়াও ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর 'জ্ঞানান্বেষণ', অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত 'তত্ত্ববোধিনী', প্যারীচাঁদ মিত্রের 'মাসিক পত্রিকা', রাজেন্দ্রলাল মিত্রের 'বিবিধার্থ সংগ্রহ' প্রভৃতি পত্রিকা বাংলা গদ্যের বিকাশের পথকে মসৃণ করে এবং এর ফলে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনাপর্বের সগৌরবে উন্মেষ ঘটে। পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন', দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত 'ভারতী' এবং সর্বশেষ প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত 'সবুজপত্র' পত্রিকা বাংলা গদ্যরীতির বিকাশের মাধ্যমে আধুনিক যুগের পূর্ণতা দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বঙ্গদর্শন উনিশ শতাব্দীতে প্রকাশিত একটি বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িকপত্র। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্থপতি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রচনার মান, বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও রুচির দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পত্রিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের মান এবং অনুশাসন এই পত্রিকার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো।
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। বিশুদ্ধ সাহিত্য রস পরিবেশনের উদ্দেশ্য নিয়ে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু করেছিল। বঙ্কিম এর যাবতীয় চিন্তাভাবনা এই পত্রিকার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের বেশকিছু উপন্যাস এই পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী প্রভৃতি উপন্যাস এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর লেখক গোষ্ঠীতে ছিলেন চন্দ্রনাথ বসু, রামপ্রসাদ সেন, অক্ষয় চন্দ্র সরকার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ।
১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ, ১২ এপ্রিল) তারিখে মাসিক বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সে সময়ে অবিভক্ত বাংলায় কোনো উন্নত মানের সাময়িকপত্র ছিল না। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১২৮২ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস অবধি এর সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রধান উপন্যাসগুলি এবং বহু প্রবন্ধ এখানে প্রকাশিত হত। ১২৮৩ বঙ্গাব্দে এর প্রকাশ স্থগিত থাকে। ১২৮৪ বঙ্গাব্দ থেকে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ১২৯০ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত ৪টি সংখ্যার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৩০৮ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩১২ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন নবপর্যায়ে ৫ বৎসর প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চোখের বালি" উপন্যাস এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
১৯২৩ সালে আধুনিক লেখকদের সাহিত্যিক মুখপত্র হিসেবে কলকাতা থেকে মাসিক 'কল্লোল' প্রকাশিত হয়। দীনেশরঞ্জন দাশ ছিলেন এর সম্পাদক। এটি রবীন্দ্র-রোমান্টিক সাহিত্যের বিরুদ্ধধারা হিসেবে আধুনিক সাহিত্যের সূচনা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ পত্রিকার লেখকগণ বয়সে তরুণ, সৃষ্টিতে কূলপ্লাবী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেতনা, ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব এ তরুণ লেখকদের লেখনিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ছিলেন এ পত্রিকার নিয়মিত লেখক।
১৯৫৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকানদার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' সমকালীন সময়ের প্রভাবশালী পত্রিকা। তৎকালীন পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের বীজতলা নির্মাণে 'সমকাল' পত্রিকার ভূমিকা অপরিসীম। ষাটের দশকের সকল সাহিত্যিক এ পত্রিকার লিখতেন। এ পত্রিকার হাত ধরেই অনেক সাহিত্যিক খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন বা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা।
১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বঙ্গদূত পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৯ই মে শনিবার। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন নীলমণি হালদার। কিছুদিন পর, নীলরত্ন অবসর গ্রহণ করেন। ফলে নতুন সম্পাদক পরিচালক হন ভোলানাথ সেন। ভোলানাথের মৃত্যুর পর মহেশচন্দ্র সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এর কিছু সংখ্যা প্রকাশের পর, পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তবে শেষ সংখ্যা কবে প্রকাশিত হয়েছিল, তা জানা যায় নি।
সূত্র :
বাংলা সাময়িক সাহিত্য (১৮১৮-১৮৬৭)। শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ্বভারতী। ১৯৬৪।
বাংলা সাহিত্যের প্রধান শাখাসমূহকে মূলত পদ্য (কবিতা) ও গদ্য—এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যা সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়েছে। প্রধান শাখাগুলোর মধ্যে কবিতা (চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী), উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, এবং ভ্রমণকাহিনী অন্যতম। এছাড়া জীবনী সাহিত্য, রম্যরচনা, ও অনুবাদ সাহিত্যও বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ শাখা।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা কাব্য। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা কাব্যের সূচনা ঘটে। বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক সমৃদ্ধ ধারা গীতিকবিতা। উনিশ শতকের গীতিকাব্য ধারার অন্যতম কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। বাংলা গীতিকবিতার পূর্ণবিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে।
বাংলা কবিতার 'পঞ্চপাণ্ডব' :
বাংলা সাহিত্যে 'কল্লোল' যুগের ত্রিশের দশকের ৫ জন কবি জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও অমিয় চক্রবর্তীকে একত্রে 'পঞ্চপাণ্ডব' বলা হয়। এঁরা সবাই রবীন্দ্রসাহিত্য প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে আধুনিক কবিতা রচনা করে বাংলা সাহিত্যে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন বলে এঁদেরকে 'পঞ্চপাণ্ডব' বলা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেতনা, ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব এঁদের মনস্তত্ত্বে ভীষণভাবে গ্রোথিত হয়েছিল। তাঁরা বয়সে তরুণ হলেও সৃষ্টিতে ছিলেন কূলপ্লাবী; আধুনিক বাংলা সাহিত্য রচনায় প্রাজ্ঞ। তাঁরা সবাই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন। অপরদিকে, আধুনিকতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা ও অশ্লীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে- এই অভিযোগে 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কল্লোল বিরোধী আরেকটি সাহিত্য বলয় সৃষ্টি হয়। এদের নেতৃত্বে ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, নীরদ চৌধুরী প্রমুখ।

Ode : Ode অর্থ গাথা বা গান বা স্তোত্র বা প্রাচীন গ্রিক কবিতা যা গ্রিক সাহিত্য হতে উদ্ভূত। প্রাচীনকালে গ্রীসে রঙ্গমঞ্চে কোরাসে বিভিন্ন সুরে নানা অঙ্গভঙ্গি দ্বারা সংগীত ও নাচের মাধ্যমে যে গান গাওয়া হতো তাকে Ode বলা হতো। বর্তমানকালে প্রশস্তিমূলক গীতিকবিতায় কোন গম্ভীর বিষয়বস্তু বা উপাদানের মাধ্যমে কবির মনের অনুভূতির ভাবমূর্তির প্রকাশকে স্তোত্র কবিতা নামে আখ্যায়িত করা হয়।
Key Notes:
- আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম কাব্য রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মিনী উপাখ্যান' (১৮৫৮)।
- আধুনিক বাংলা গীতিকাব্যের প্রথম ও প্রধান কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী।
- বাংলা কাব্যে আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
- বাংলা সাহিত্যে প্রথম বিদ্রোহী প্রধান কাব্য 'অগ্নিবীণা' (১৯২২)।
- বাংলা সাহিত্যের প্রথম জীবনীকাব্য 'শ্রী চৈতন্য ভাগবত'।
- বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ধারা কবিতা। কবিতা দুই প্রকার। যথা:
১. তন্ময় কবিতা,
২. মন্ময় কবিতা। - বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের প্রথম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।
- বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। মধ্যযুগের কবি চন্দ্রাবতী ছিলেন কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের এবং তাঁর পিতার নাম দ্বিজ বংশীদাস।
- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি স্বর্ণকুমারী দেবী।
- বাংলা কবিতার ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
- বাংলা কবিতায় মুক্তক ছন্দের প্রবর্তক কাজী নজরুল ইসলাম।
- বাংলা সাহিত্যের ছান্দসিক কবি আবদুল কাদির।
- টি.এস এলিয়টের ইংরেজি কবিতা প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর মাধ্যমে বাঙালি কবিদের আধুনিক কবিতার সাথে পরিচয় ঘটে।
- বাংলা কাব্যে প্রথম প্রচুর পরিমাণ আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহার করেন মোহিতলাল মজুমদার এবং পরবর্তীতে কাজী নজরুল ইসলাম।
বিখ্যাত কাব্য ও কবিতা
কবি | কাব্য | ||
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | 'কবি-কাহিনী' (১৮৭৮): প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, যা অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত। 'বনফুল', 'কড়ি ও কোমল', 'সোনার তরী', 'চিত্রা', 'ক্ষণিকা', 'নৈবেদ্য', 'খেয়া', 'গীতাঞ্জলি', 'বলাকা', 'পূরবী', 'শেষলেখা', 'মানসী', 'চৈতালি', 'কল্পনা', 'পত্রপূট', 'সেঁজুতি', 'আকাশ প্রদীপ', 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি', 'পুনশ্চ'। | ||
| কাজী নজরুল ইসলাম | 'অগ্নিবীণা' (সেপ্টেম্বর, ১৯২২): প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। 'সন্ধ্যা', 'বিষের বাঁশি', 'প্রলয়শিখা', 'দোলনচাঁপা', 'সঞ্চিতা', 'মরুভাস্কর', 'চিত্তনামা', 'সিন্ধু হিন্দোল', 'চন্দ্রবিন্দু', 'ঝিঙেফুল', 'সাতভাই চম্পা', 'সর্বহারা', 'সাম্যবাদী', 'ভাঙার গান', 'ঝড়', 'ফণিমনসা', 'জিঞ্জির', 'ছায়ানট', 'পূবের হাওয়া', 'চক্রবাক'। | ||
| শহীদ কাদরী | 'উত্তরাধিকার', 'তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা'। | ||
| বিষ্ণু দে | 'উর্বশী ও আর্টেমিস', 'চোরাবালি', 'সাত ভাই চম্পা'। | ||
| দাউদ হায়দার | 'জন্মই আমার আজন্ম পাপ', 'নারকীয় ভুবনের কবিতা', 'আমি ভাল আছি তুমি' | ||
| নবীনচন্দ্র সেন | 'পলাশীর যুদ্ধ' | হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় | 'চিন্তাতরঙ্গিণী' |
| সমর সেন | 'কয়েকটি কবিতা' | রামেন্দ্রসুন্দরী ত্রিবেদী | 'জিজ্ঞাসা |
| আবদুল কাদির | 'দিলরুবা', 'উত্তর বসন্ত'। | সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার | ‘মহিলা’ |
| দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর | 'স্বপ্নপ্রয়াণ' | বিলহন (কাশ্মিরী কবি | 'চৌরপঞ্চাশিকা' (বিষয়: অবৈধ প্রণয়) |
কবি | কবিতা | কবি | কবিতা |
| রামনিধি গুপ্ত | স্বদেশী ভাষা | আবুল হোসেন | পোস্টার |
| হরিশ্চন্দ্র মিত্র | স্বদেশী ভাষা | হুমায়ূন কবির | মেঘনায় ঢল |
| আবদুল কাদির | জয়যাত্রা | ||
| শেখ ফজলল করিম | গায়ের ডাক, স্বর্গ ও নরক | ||
| কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার | মিতব্যয়িতা, সমব্যথি | ||
| কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার | পারিব না | ||
| রজনীকান্ত সেন | স্বাধীনতার সুখ | ||
| রজনীকান্ত সেন | এই অক্ষরে |
কবি | কাব্য | কবিতা |
| মোহিতলাল মজুমদার | 'স্বপন পসারী', 'হেমন্ত গোধূলি'। | বেদুঈন |
| গোবিন্দচন্দ্র দাস | 'প্রেম ও ফুল', 'মগের মুলুক'। | জন্মভূমি |
| যতীন্দ্রমোহন বাগচী | 'অপরাজিতা', 'নীহারিকা', 'মহাভারতী', 'জাগরণী'। | কাজলা দিদি, অন্ধবধূ |
| যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তে | 'মরীচিকা', 'মরুমায়া', 'মরুশিখা', 'সায়ম', 'ত্রিযামা'। | নবান্ন, ডাক হরকরা |
| বন্দে আলী মিয়া | 'ময়নামতির চর' | আমাদের গ্রাম |
| অক্ষয়কুমার বড়াল | 'প্রদীপ', 'এষা', 'শঙ্খ', 'ভুল', 'কনকাঞ্জলি'। | মানব-বন্দনা |
| সুকুমার রায় | 'আবোল-তাবোল', 'হ-য-ব-র-ল', 'খাই খাই'। | শ্রাবণে, ছায়াবাজি |
| কালিদাস রায় | 'পর্ণপুট', 'কিশলয়', 'বল্লরী', 'ঋতুমঙ্গল', 'রসকদম্ব'। | বাবুরের মহত্ত্ব |
| রফিক আজাদ | 'অসম্ভবের পায়ে', 'চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া', 'সশস্ত্র সুন্দর' | চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া |
| আবু হেনা মোস্তফা কামাল | 'আপন যৌবন বৈরী', 'যেহেতু জন্মান্ধ', 'আক্রান্ত গজল'। | ছবি |
| মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান | 'দুর্লভ দিন', 'শঙ্কিত আলোকে', 'প্রতনু প্রত্যাশা'। | শহীদ স্মরণে, ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে- সবচেয়ে সুন্দর করুণ:
সেখানে সবুজ ডাঙা ভ'রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল;
সেখানে গাছের নাম কাঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল;
সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগিছে অরুণ;
সেখানে বারুণী থাকে গঙ্গাসাগরের বুকে- সেখানে বরুণ
কর্ণফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল;
সেইখানে শঙ্খচিল পানের বনের মতো হাওয়ায় চঞ্চল,
সেখানে লক্ষ্মীপেঁচা ধানের গন্ধের মতো অস্ফুট তরুণ;
সেখানে লেবুর শাখা নুয়ে থাকে অন্ধকারে ঘাসের উপর;
সুদর্শন উড়ে যায় ঘরে তার অন্ধকার সন্ধ্যার বাতাসে;
এলিজি
ওড
সনেট
এলিগিরি
সনেট ইটালিয়ান শব্দ। এর বাংলা অর্থ- চতুর্দশপদী কবিতা। একটি মাত্র ভাব বা অনুভূতি যখন ১৪ অক্ষরের চতুর্দশ পঙ্ক্তিতে (কখনো কখনো ১৮ অক্ষরও ব্যবহৃত হয়) বিশেষ ছন্দরীতিতে প্রকাশ পায়, তাকেই সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা বলে । সনেটের দুটি অংশ। যথাঃ
ক. অষ্টক : প্রথম ৮ চরণকে অষ্টক বলে।
খ. ষটক : শেষ ৬ চরণকে ঘটক বলে।
বাংলা সাহিত্যে সনেটের প্রচলন ঘটান মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
কবিতার পক্তির শেষে মিলহীন ছন্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ। বলে। অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতায় চরণের অন্ত্যমিল থাকে। না। এ ছন্দ পয়ারের অপর রূপ। প্রতি পঙ্ক্তিতে ১৪ অক্ষর থাকে, যা ৮+৬ পর্বে বিভক্ত। একে প্রবাহমান অক্ষরবৃত্ত ছন্দও বলে। উদাহরণ-
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর চূড়ামণি
বীর বাহু চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি
কোন বীরবরে রবি সেনাপতি পদে,
পাঠাইলা, রণে পুনঃ রক্ষাকুলনিধি
রাঘবারি।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত
বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রচলন ঘটান মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ব্যক্তির চিন্তা যখন সুসংহত গদ্য কাঠামো পায় এবং বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা তা প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে প্রবন্ধ বলে। প্রবন্ধের সূচনা হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
Key Notes:
- কোনো বিষয়ের ওপর বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনাই প্রবন্ধ।
- বাংলা প্রবন্ধধারার প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়।
- কথ্যরীতিতে প্রথম প্রবন্ধ রচয়িতা প্যারীচাঁদ মিত্র।
- প্রথম সমাজসংস্কারমূলক প্রবন্ধ রচয়িতা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
- বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে প্রথম জীবনচরিত রামরাম বসুর 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' (১৮০১)। এই বাঙালির লেখা, বাংলা অক্ষরে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।
বিখ্যাত প্রবন্ধ
প্রাবন্ধিক | প্রবন্ধ |
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | 'কমলাকান্তের দপ্তর', 'সাম্য', 'লোকরহস্য', 'কৃষ্ণচরিত', 'বিজ্ঞানরহস্য', 'মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত। |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | 'বিবিধপ্রসঙ্গ' (১৮৮৩): প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ। 'কালান্তর', 'পঞ্চভূত', 'বিচিত্রপ্রবন্ধ', 'সাহিত্য', 'মানুষের ধর্ম', 'সভ্যতার সংকট'। |
| কাজী নজরুল ইসলাম | 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' (১৯১৯): প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। 'রাজবন্দীর জবানবন্দী', 'যুগবাণী', 'রুদ্রমঙ্গল', 'দুর্দিনের যাত্রী' |
| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | 'নারীর মূল্য', 'তরুণের বিদ্রোহ'। |
| মুহম্মদ আবদুল হাই | 'ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব', 'সাহিত্য ও সংস্কৃতি', 'ভাষা ও সাহিত্য' |
| ড. মুহম্মদ এনামুল হক | 'আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য': এটি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সহযোগে রচিত। 'মনীষা মঞ্জুষা' |
| আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ | 'পদ্মাবতী', 'সত্যনারায়ণের পুঁথি', 'গোরক্ষ বিজয়' |
| আব্দুল্লাহ আল মুতী | 'সাগরের রহস্যপুরী', 'এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে', 'রহস্যের শেষ নেই', 'আবিষ্কারের নেশায়'। |
| বদরুদ্দীন উমর | 'সংস্কৃতির সংকট', 'সাম্প্রদায়িকতা', 'সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা'। |
| মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ | 'নয়া জাতির স্রষ্টা হজরত মোহম্মদ', 'পারস্য প্রতিভা'। |
| ড. আহমদ শরীফ | 'বিচিত চিন্তা', 'সাহিত্য সংস্কৃতি চিন্তা', 'স্বদেশ অন্বেষা', 'যুগ যন্ত্রণা', 'কালিক ভাবনা', 'বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য', 'স্বদেশ চিন্তা', 'বিশ শতকের বাঙালি', 'সংস্কৃতি'। |
| বিনয় ঘোষ | 'বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ', 'শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজ', 'কালপেঁচার নকশা', 'পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি', 'সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র', 'কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত', 'নববাবু চরিত্র'। |
| কালী প্রসন্ন ঘোষ | 'প্রভাত চিন্তা', 'নিভৃত চিন্তা', 'নিশীথ চিন্তা'। |
| গোপাল হালদার | 'সংস্কৃতির রূপান্তর', 'বাঙালির সংস্কৃতির রূপ'। |
| কামরুল হাসান | 'আমাদের লোককৃষ্টি' (আমাদের লোকশিল্প) |
| লুৎফর রহমান | 'মহৎ জীবন', 'মানব জীবন', 'উন্নত জীবন' (উদ্যম ও পরিশ্রম)। |
| আবদুস সাত্তার | 'অরণ্য জনপদে', 'অরণ্য সংস্কৃতি' |
| মোতাহের হোসেন চৌধুরী | 'সংস্কৃতি কথা', 'সভ্যতা'। |
| আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | 'সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু' |
| গুলবদন বেগম | 'হুমায়ুন নামা' |
| জগদীশচন্দ্র বসু | 'অব্যক্ত' |
| ড. আনিসুজ্জামান | ‘স্বরূপের সন্ধানে’ |
| আকবর আলী খান | 'পরার্থপরতার অর্থনীতি' |
| ড. মুহম্মদ ইউনুস | ‘দারিদ্র্যহীন বিশ্বের অভিমুখে’ |
| খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন | 'যুগস্রষ্টা নজরুল' |
| যতীন সরকার | 'সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা' |
| নীরদচন্দ্র চৌধুরী | 'আত্মঘাতী বাঙালী' |
| আনিসুজ্জামান | 'কাল নিরবধি' (আত্মজীবনী) |
| নীহাররঞ্জন রায় | 'বাঙ্গালীর ইতিহাস' |
| আবদুল হক | 'চেতনার অ্যালবাম' |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রচয়িতা | ভ্রমণকাহিনি |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | 'য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র', 'জাপান যাত্রী', 'জাভা যাত্রীর পত্র', 'রাশিয়ার চিঠি' |
| জসীমউদ্দীন | 'চলে মুসাফির', 'হলদে পরীর দেশ', 'যে দেশে মানুষ বড়' |
| জসীমউদ্দীন | 'সাত সাঁতার': এটি আমেরিকার ভ্রমণকাহিনি। |
| ফজল শামসুজ্জামান | 'অন্য পৃথিবী': এটি অস্ট্রেলিয়ার ভ্রমণকাহিনি। |
| ইব্রাহীম খাঁ | 'ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র', 'নয়া চীনে এক চক্কর' |
| সৈয়দ মুজতবা আলী | 'দেশে-বিদেশে', 'জলে ডাঙায়' |
| অন্নদাশঙ্কর রায় | ‘পথে-প্রবাসে’ |
| আ.ন.ম বজলুর রশীদ | 'দ্বিতীয় পৃথিবীতে', 'পথ ও পৃথিবী' |
| ইসমাইল হোসেন সিরাজী | 'তুরস্ক ভ্রমণ' |
| ড. মুহম্মদ এনামুল হক | 'বুলগেরিয়া ভ্রমণ' |
| এস ওয়াজেদ আলী | 'মোটরযোগে রাঁচী সফর' |
| বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় | 'দৃষ্টিপাত' |
| নির্মলেন্দু গুণ | 'গীনসবার্গের তীরে', 'ভলগার তীরে' |
| খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস | ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ |
| মুহম্মদ আবদুল হাই | 'বিলেতে সাড়ে সাত'শ দিন' |
| বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | 'অভিযাত্রিক' |
| রাহুল সাংকৃত্যায়ন | 'ভল্লা থেকে গঙ্গা' |
| শহীদুল্লা কায়সার | 'পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ' |
| সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় | 'পালামৌ' |
| সানাউল হক | 'বন্দর থেকে বন্দরে' |
| তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় | 'মস্কোতে কয়েক দিন' |
রম্যরচনা | |
| ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় |
|
| সৈয়দ মুজতবা আলী |
|
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
|
| আবুল মনসুর আহমেদ |
|
| তাজাকলম | চেনা মানুষের ইতিকথা |
| নূরুল মোমেন | বহুরূপা |
| কাজী দীন মোহাম্মদ | গোলকচন্দ্রের আত্মকথা |
| মুহাম্মদ আব্দুল হাই | তোষামদ ও রাজনীতির ভাষা |
ছোটগল্প সাহিত্যতত্ত্বের একটি পারিভাষিক শব্দ। ছোটগল্প মানে ছোট গল্প নয়, এ এক অনন্য সাহিত্যকর্ম। বিন্দুর মধ্যে যেমন সিন্ধুর কলতান নিয়ে আসা সহজ কোনো ব্যাপার নয়, তেমনই ক্ষুদ্র কোনো কাহিনিতে মানবজীবনের রূপ ও রহস্যের দ্বার উন্মোচন কষ্টসাধ্য। তারপরও অনন্য কথাশিল্পীরা এই কর্মটি করে পাঠককে অভিভূত করে থাকেন। খণ্ড কাহিনির মধ্যে তাঁরা জীবনের অখণ্ডকে যথার্থভাবে বাণীবদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য:
বাংলা ছোটগল্পের সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আনন্দময় বৈচিত্র্যে ভরা ছোটগল্প সৃষ্টি তাঁকে বিখ্যাত সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বজনীন খ্যাতি ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে। বাংলার নির্জন প্রান্তর, নদীর তীর, উন্মুক্ত আকাশ, বালুচর, অবারিত মাঠ, ছায়া-সুনিবিড় গ্রামে সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন, অভাবক্লিষ্ট অথচ শান্ত, সহিষ্ণু গ্রামবাসী ইত্যাদি বিষয় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি 'সোনার তরী' কাব্যের 'বর্ষাযাপন' কবিতায় ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়েও হইল না শেষ।
১. চরিত্র ও ঘটনা: ছোটগল্পের চরিত্রের সংখ্যা সীমিত এবং একটি বা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্পের কাহিনি আবর্তিত হয়।
২. একক অনুভূতি: গল্পের পরিসমাপ্তিতে পাঠকের মনে একটি নির্দিষ্ট অনুভূতি তৈরি হয়, যা ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৩. সংক্ষিপ্ত ও বাহুল্যবর্জিত: ছোটগল্প যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত ও বাহুল্যবর্জিত হয়। কারণ, এতে বিন্দুর মধ্যে অবস্থান করে সিন্ধু, যা ছোটগল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৪. নাটকীয়তা: ছোটগল্পের শুরু ও শেষের মধ্যে নাটকীয়তা বিদ্যমান থাকে।
৫. অতৃপ্তি: অনেকক্ষেত্রে ছোটগল্প পড়া শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে অতৃপ্তি থেকে যায়। অর্থাৎ পাঠক আরও কিছু প্রত্যাশা করে, যা ছোটগল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৬. নির্দিষ্ট দিক: ছোটগল্পে মানুষের জীবনের সামগ্রিক দিককে উপেক্ষা করে একটি বিশেষ দিক অর্থাৎ জীবনের খণ্ডাংশের বর্ণনা বিদ্যমান থাকে।
৭. উপ-কাহিনি বর্জিত: ছোটগল্পের মধ্যে শাখাকাহিনি বা উপকাহিনি সর্বদা বর্জন করা হয়।
Key Notes:
- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফসল ছোটগল্প।
- ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য: স্বল্প ভাষায় ও স্বল্প পরিসরে জীবনের খণ্ডাংশের বর্ণনা, প্রারম্ভে ও পরিসমাপ্তিতে নাটকীয়তা।
- ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর হাতেই ছোটগল্পের উৎকর্ষ সাধিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ছোটগল্প
ছোটগল্পকার | ছোটগল্প |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | প্রেম সম্পর্কিত গল্প: 'শেষকথা', 'মধ্যবর্তিনী', 'সমাপ্তি', 'নষ্টনীড়', 'একরাত্রি'। সমাজ সম্পর্কিত গল্প: 'ছুটি', 'হৈমন্তী', 'পোস্ট-মাস্টার', 'দেনা-পাওনা', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'কাবুলিওয়ালা'। অতিপ্রাকৃত গল্প: 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'কঙ্কাল', 'নিশীথে', 'জীবিত ও মৃত'। |
| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | 'মন্দির': প্রথম প্রকাশিত গল্প। 'মহেশ', 'মেজদিদি', 'মামলার ফল', 'বিলাসী'। |
| কাজী নজরুল ইসলাম | 'বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী' (১৯১৯): প্রথম প্রকাশিত রচনা / গল্প। 'রিক্তের বেদন', 'শিউলিমালা', 'পদ্মগোখরা'। |
| মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | 'অতসী মামী' (১৩৩৫): প্রথম প্রকাশিত গল্প। 'প্রাগৈতিহাসিক', 'সরীসৃপ', 'সমুদ্রের স্বাদ', 'বৌ', 'আজকাল পরশুর গল্প', 'ছোট বকুলপুরের যাত্রী', 'ফেরিওয়ালা'। |
| দক্ষিণারঞ্জন মিত্র | ' ঠাকুরমার ঝুলি', 'ঠাকুরদাদার ঝুলি', 'ঠানদিদির থলে', 'দাদা মহাশয়ের থলে', 'সাত ভাই চম্পা'। (এসকল গল্পে রূপকথা-ব্রতকথা স্থান পেয়েছে)। |
| শওকত ওসমান | 'জন্ম যদি তব বঙ্গে': এটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক। 'ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী', 'পিঁজরাপোল', 'প্রস্তর ফলক'। |
| হাসান আজিজুল হক | 'আমরা অপেক্ষা করছি', 'নামহীন গোত্রহীন', 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ', 'শীতের অরণ্য', 'জীবন ঘষে আগুন'। |
| প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় | 'দেশী ও বিলাতী', 'গল্পাঞ্জলি', 'ষোড়শী', 'গল্পবীথি'। |
| তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় | 'রসকলি', 'ডাকহরকরা' |
| তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় | 'জিবরাইলের ডানা', 'একই সমতলে' |
| রাজশেখর বসু | 'গড্ডলিকা' |
| সুবোধ ঘোষ | 'ফসিল', 'অযান্ত্রিক' |
| সরদার জয়েনউদ্দিন | 'বেলা ব্যানার্জির প্রেম' |
| বনফুল | 'মিনু', 'নিমগাছ', 'তাজমহল' |
| লীলা মজুমদার | ‘পাখি’ |
| আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন | 'নিষিদ্ধশহর', 'নারিন্দালন', 'ওম শান্তি' |
| সোমেন চন্দ | 'ইঁদুর' |
| শাহরিয়ার কবির | 'একাত্তরের যীশু' |
| প্রেমেন্দ্র মিত্র | 'মহানগর', 'পুতুল ও প্রতিমা'। |
| শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় | 'রেজিং রিপোর্ট' |
| হালিমা খাতুন | 'আষাঢ়ের এক রাতে' |
| খান মোহাম্মদ ফারাবী | 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ছন্দ কাব্যের গতিসৌন্দর্য সৃষ্টির প্রধান উপাদান। হাজার বছরের বাংলা কাব্যে কবিরা আবেগ, ভাব ও নান্দনিকতা প্রকাশের জন্য নানা ছন্দ নির্মাণ ও বিকাশ ঘটিয়েছেন। ভারতবর্ষে ছন্দচর্চার সূচনা বৈদিক যুগে; বাল্মীকির অনুষ্টুপ্ ছন্দকে আদি ছন্দ বলা হয়। সংস্কৃত ছন্দের ধারাই পরবর্তীকালে বাংলা ছন্দের ভিত্তি গড়ে তোলে, যদিও বাংলা ছন্দের বিকাশে কবিদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলা কাব্যের ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার— মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত। চর্যাপদ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই তিন ছন্দই বাংলা কাব্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ছন্দ। এটি মাত্রার উপর নির্ভরশীল এবং চর্যাপদে এর প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। বৈষ্ণব পদাবলিতে এর পরিণত ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহার লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে অক্ষরবৃত্তের প্রভাব থেকে মুক্ত করে এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেন—এটাই তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান।
স্বরবৃত্ত ছন্দ বাংলা ভাষার ধ্বনিগত স্বভাবের সঙ্গে সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ। এটি শ্বাসাঘাতপ্রধান, দ্রুত ও প্রাণবন্ত। লোকগান, বাউল, পাঁচালি, শ্যামাসঙ্গীত ও আধুনিক ছড়ায় এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ধামালি ছন্দকে স্বরবৃত্তের প্রাচীন রূপ হিসেবে ধরা হয়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বাংলা কাব্যের প্রধান ও সর্বাধিক ব্যবহৃত ছন্দ। এটি তানপ্রধান ও গদ্যঘনিষ্ঠ। মধ্যযুগে পয়ার ছন্দের মাধ্যমে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়, বিশেষত রামায়ণ, মহাভারত ও মঙ্গলকাব্যে। পয়ার ছন্দের বিভিন্ন রূপ—মহাপয়ার, ভঙ্গপয়ার, তরল পয়ার ইত্যাদি—ক্রমে বিকশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মাধ্যমে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে আধুনিক গতি আনেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ছন্দের আধুনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের সৃষ্টিশীল পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা ছন্দ আরও বিজ্ঞানসম্মত, প্রাণবন্ত ও ভাবপ্রকাশে সক্ষম হয়ে উঠেছে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। অবিভক্ত বাংলার অংশ হিসেবে ১৯১৩ সালে 'মীর কাশিম' নির্মাণের মাধ্যমে এই অঞ্চলে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পূর্বে, পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা কেন্দ্রিক 'ঢালিউড' নামে একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠে। 'জাগো হুয়া সাবের', 'সুতরাং', 'নয়নতারা' 'বেহুলা', 'লাল সালু' 'কসাই' , 'মৃত্যুক্ষুধা' , 'জীবন থেকে জীবনে' , 'চাষীর মেয়ে'-এর মতো অসাধারণ সৃষ্টি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। স্বাধীনতার পর, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নতুন দিগন্ত স্পর্শ করে। 'সূর্য দীঘল বাড়ি', 'জীবনঢুলী', 'গেরিলা' 'যোদ্ধা' 'মাটির ময়না' 'চন্দ্রগ্রহণ' , 'হাজার বছর ধরে' , 'নোয়াখালীর মাঝি' , 'আমার বউ' , 'অন্যরকম ভালোবাসা' , 'চোখের বালি' , 'নীল আকাশের চাঁদনী' এর মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। বর্তমানে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও, 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার', 'ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব', 'চ্যানেল আই সেরা সিনেমা পুরস্কার', 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি' 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি' 'বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশন' 'বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিষদ'-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এর অগ্রগতি ও উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।
চলচ্চিত্র তথ্যকণিকা
- সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় : ১৮৯৫ সালে
- সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন : লুমিয়ার ব্রাদার্স (যুক্তরাষ্ট্র)
- উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনক : হীরালাল সেন
- প্রথম মুসলমান বাঙালী চলচ্চিত্রকার : কাজী নজরুল ইসলাম
- বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনক : আবদুল জব্বার খান
- বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার : জহির রায়হান
- উপমহাদেশের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র : ১৯০৩ সালে নির্মিত 'আলী বাবা চল্লিশ চোর' । পরিচালক - হীরালাল সেন
- উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র : ১৯৩১ সালে নির্মিত 'জামাই ষষ্ঠী' । পরিচালক- অমরেন্দ্রনাথ চৌধুরী
- বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র : ১৯৫৬ সালে নির্মিত 'মুখ ও মুখোশ' । পরিচালক-আবদুল জব্বার খান এবং এর সংগীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস।
- কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র : 'মাটির ময়না' । পরিচালক- তারেক মাসুদ
- অষ্কার পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র : 'মাটির ময়না' (২০০২ সালে)
- আন্তর্জাতিক পুরষ্কারপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : 'আগামী’ । পরিচালক- মোরশেদুল ইসলাম
- ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 'সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড' হয় : 'শঙ্খনীল কারাগার' । পরিচালক-হুমায়ূন আহমদ
- ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র : 'ভেজা বিড়াল' পরিচালক - শহীদুল ইসলাম খোকন
- বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবের নাম : ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব, ১৯৩২ সালে
- বাংলাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র উৎসব হয় : ১৯৮১ সালে (ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব)
- বাংলাদেশে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব হয় : ১৯৮৮ সালে
- বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল : পিকচার হাউস
- কাজী নজরুল ইসলাম কোন ছবিতে অভিনয় করেছিলেন : ধ্রুব
- তারেক মাসুদ নির্মিত স্বল্পদের্ঘ্য চলচ্চিত্র : আদম সুরত
- বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র : বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য মনোনীত করা হয়। ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার শ্যাম বনেগালকে। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি
- রেহেনা মরিয়ম নূর : ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র রেহানা মরিয়ম নূর। এর পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। এটি একজন সহকারী অধ্যাপকের জীবন সংগ্রামের গল্প। ২০২১ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 'আঁ সাতে রিগা' বিভাগে এই সিনেমাটি মনোনয়ন পেয়েছিল।
- বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটি : গাজীপুরে অবস্থিত।
'ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক | সাল |
|---|---|---|
| জীবন থেকে নেয়া | জহির রায়হান | ১৯৭০ |
| বাঙলা ( আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওংকার’ অবলম্বনে নির্মিত ) | শহীদুল ইসলাম খোকন | ২০০৬ |
| ফাগুন হাওয়ায় | তৌকির আহমেদ | ২০১৯ |
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক | সাল |
|---|---|---|
| ওরা ১১ জন | চাষী নজরুল ইসলাম | ১৯৭২ |
| সংগ্রাম | চাষী নজরুল ইসলাম | ১৯৭৩ |
| হাঙ্গর নদী গ্রেনেড | চাষী নজরুল ইসলাম | ১৯৯৭ |
| ধ্রুবতারা | চাষী নজরুল ইসলাম | ২০০৬ |
| বাঘা বাঙালি | আনন্দ | ১৯৭২ |
| কার হাসি কে হাসে | আনন্দ | ১৯৭৪ |
| আবার তোরা মানুষ হ | খান আতাউর রহমান | ১৯৭৩ |
| এখনও অনেক রাত | খান আতাউর রহমান | ১৯৯৭ |
| ধীরে বহে মেঘনা | আলমগীর কবির | ১৯৭৩ |
| রূপালী সৈকত | আলমগীর কবির | |
| নদীর নাম মধুমতি | তানভীর মোকাম্মেল | ১৯৯০ |
| রাবেয়া | তানভীর মোকাম্মেল | ২০০৮ |
| আগুনের পরশমণি | হুমায়ূন আহমদ | ১৯৯৫ |
| শ্যামল ছায়া | হুমায়ূন আহমদ | ২০০৪ |
| রক্তাক্ত বাংলা | মমতাজ আলী | ১৯৭২ |
| অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী | সুভাষদত্ত | ১৯৭২ |
| জয়বাংলা | ফখরুল আলম | ১৯৭২ |
| আলোর মিছিল | মিতা | ১৯৭৪ |
| বাংলার ২৪ বছর | মোহাম্মদ আলী | ১৯৭৪ |
| মেঘের অনেক রং | হারুনুর রশিদ | ১৯৭৬ |
| কলমীলতা | শহীদুল হক খান | ১৯৮১ |
| বাঁধনহারা | এ.জে. মিন্টু | ১৯৮১ |
| চিৎকার | মতিন রহমান | ১৯৮১ |
| মাটির ময়না | তারেক মাসুদ | ২০০২ |
| খেলাঘর | মোরশেদুল ইসলাম | ২০০৬ |
| জয়যাত্রা | তৌকির আহমেদ | ২০০৪ |
| মেহেরজান | রুবাইয়াত হোসেন | ২০১০ |
| খন্ডগল্প | বদরুল আলম সৌদ | ২০১১ |
| আমার বন্ধু রাশেদ | মোরশেদুল ইসলাম | ২০১১ |
| গেরিলা | নাসিরউদ্দীন ইউসুফ | ২০১১ |
| পিতা | মাসুদ আখন্দ | ২০১২ |
| আত্মদান | শাহজাহান চৌধুরী | ২০১২ |
| কারিগর | আনোয়ার সাদাত | ২০১২ |
| খন্ডগল্প ৭১ | বদরুল অনাম সৌদ | ২০১২ |
| জীবনঢুলী | তানভীর মোকাম্মেল | ২০১৩ |
| ৭১ এর গেরিলা | মিজানুর রহমান শামীম | ২০১৩ |
| মেঘমাল্লার | জাহিদুর রহিম অঞ্জন | ২০১৪ |
| অনুক্রোম | গোলাম মোস্তফা শিমুল | ২০১৪ |
| হৃদয়ে ৭১ | সাদেক সিদ্দিকী | ২০১৪ |
| ৭১ এর মা জননী | শাহ আলম কিরণ | ২০১৪ |
| যুদ্ধশিশু | মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত | ২০১৪ |
| ৭১ এর সংগ্রাম | মনসুর আলী | ২০১৫ |
| একাত্তরের ক্ষুদিরাম | এান্নান হীরা | ২০১৫ |
| এইতো প্রেম | সোহেল আরমান | ২০১৫ |
| শোভনের স্বাধীনতা | মানিক মানবিক | ২০১৫ |
| অনিল বাগচীর একদিন | মোরশেদুল ইসলাম | ২০১৫ |
| লাল-সবুজের সুর | মুশফিকুর রহমান গুলজার | ২০১৬ |
| ভুবন মাঝি | ফকরুল আরেফিন খান | ২০১৬ |
| পোস্টমাস্টার ৭১ | আরিফ খান | ২০১৮ |
⮚ 'ওরা ১১ জন' ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত (চাষী নজরুল ইসলামের) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতার ডাক দেন, এ ছবির গল্পে সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু অংশ দেখানো হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক |
|---|---|
| হুলিয়া | তানভীর মোকাম্মেল |
| স্মৃতি-৭১ | তানভীর মোকাম্মেল |
| জীবনঢুলী | তানভীর মোকাম্মেল |
| আগামী | মোরশেদুল ইসলাম |
| সূচনা | মোরশেদুল ইসলাম |
| প্রত্যাবর্তন | মোস্তফা কামাল |
| ধূসর যাত্রা | আবু সাইয়িদ |
| আবর্তন | আবু সাইয়িদ |
| একাত্তরের যীশু | নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু (১৯৯৩) |
| চাক্কি | এনায়েত করিম বাবুল |
| দূরন্ত | খান আখতার হোসেন |
| বখাটে | হাবিবুল ইসলাম হাবিব |
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক | |
|---|---|---|
| স্টপ জেনোসাইড (Stop Genocide) | জহির রায়হান | |
| এ স্টেট ইজ বর্ন | জহির রায়হান | |
| লিবারেশন ফাইটার্স | আলমগীর কবির | |
| একসাগর রক্তের বিনিময়ে | আলমগীর কবির | |
| মুক্তির গান | তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ (১৯৯৫) | |
| মুক্তির কথা | তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ (১৯৯৯) | |
| নাইন মানথ টু ফ্রীডম | এস সুকুদেব | |
| ইনোসেন্ট মিলিয়নস | বাবুল চৌধুরী | |
| রিফিউজি-৭১ | বিনয় রায় |
অন্যান্য বিখ্যাত চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক |
|---|---|
| স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'চাকা' | মোরশেদুল ইসলাম |
| শিশুতোষ চলচ্চিত্র 'দীপু নাম্বার টু' | মোরশেদুল ইসলাম |
| সূর্য দীঘল বাড়ি | শেখ নিয়ামত শাকের |
| পদ্মা নদীর মাঝি | গৌতম ঘোষ |
| পলাশী হতে ধানমন্ডি | আব্দুল গাফফার চৌধুরী |
| স্কুলিং | তৌকির আহমেদ |
অস্কারে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র
| চলচ্চিত্র | পরিচালক | যততম | সাল |
|---|---|---|---|
| মাটির ময়না | তারেক মাসুদ | ৭৫তম | ২০০২ |
| শ্যামল ছায়া | হুমায়ূন আহমদ | ৭৮তম | ২০০৫ |
| নিরন্তর | আবু সায়ীদ | ৭৯তম | ২০০৬ |
| স্বপ্নডানায় | গোলাম রাব্বানী বিপ্লব | ৮০তম | ২০০৭ |
| আহা | এনামুল করিম নির্ঝর | ৮১তম | ২০০৮ |
| বৃত্তের বাইরে | গোলাম রাব্বানী বিপ্লব | ৮২তম | ২০০৯ |
| থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার | মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী | ৮৩তম | ২০১০ |
| ঘেটুপুত্র কমলা | হুমায়ূন আহমদ | ৮৫তম | ২০১২ |
| টেলিভিশন | মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী | ৮৬তম | ২০১৩ |
| জোনাকির আলো | খালিদ মাহমুদ (মিঠু) | ৮৭তম | ২০১৪ |
| জালালের গল্প | আবু শাহেদ ইমন | ৮৮তম | ২০১৫ |
| অজ্ঞাতনামা | তৌকির আহমেদ | ৮৯তম | ২০১৬ |
| খাঁচা | আকরাম খান | ৯০তম | ২০১৭ |
| ডুব | মোস্তফা সরয়ার ফারুকী | ৯১ তম | ২০১৮ |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভাষা আন্দোলনভিত্তিক রচনা
রচয়িতা | রচনার নাম |
| জহির রায়হান | 'আরেক ফাল্গুন' (১৯৬৯): ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম উপন্যাস। 'একুশের গল্প' (ছোটগল্প), 'Let there be Light' (চলচ্চিত্র) |
| হাসান হাফিজুর রহমান | 'একুশে ফেব্রুয়ারি': বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে ১৯৫৩ সালে সাহিত্য সংকলনটি রচিত হয়। |
| মাহবুব উল আলম চৌধুরী | 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' (কবিতা): ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম কবিতা। |
| মুনীর চৌধুরী | 'কবর' (নাটক) |
| শওকত ওসমান | 'আর্তনাদ' (উপন্যাস), 'মৌন নয়' (ছোটগল্প) |
| আলাউদ্দিন আল আজাদ | 'স্মৃতিস্তম্ভ' (কবিতা) |
| আবদুল গাফফার চৌধুরী | আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি .. (একুশের গান) |
| আবদুল লতিফ | ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়... (গান) |
| রাবেয়া খাতুন | 'প্রথম বধ্যভূমি' (ছোটগল্প) |
| আবুবকর সিদ্দিক | লখার একুশে (ছোটগল্প) |
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ / রচনা / সাহিত্যকর্ম
উপন্যাস
|
নাটক
|
প্রবন্ধ
|
সম্পাদিত গ্রন্থ
|
স্মৃতিকথা
|
গল্প
|
কবিতা
|
পত্রসংকলন
|
অন্যান্য গ্রন্থ
|
চলচ্চিত্র
প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ও পরিচালক
|
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও পরিচালক
|
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও পরিচালক
|
একাত্তর নামক সকল গ্রন্থ একসাথে দেওয়া হল কনফিউশন দূর করার জন্য
|
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ও সৃজনশীল কাজের একটি তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি বিভিন্ন লেখকের উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও চলচ্চিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। মূল লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- আনোয়ার পাশা - "রাইফেল রোটি আওরাত"
- সৈয়দ শামসুল হক - "নিষিদ্ধ লোবান", "নীলদংশন"
- শওকত ওসমান - "দুই সৈনিক", "জলাঙ্গী"
- হুমায়ূন আহম্মেদ - "শ্যামল ছায়া", "১৯৭১"
- আল মাহমুদ - "উপমহাদেশ"
- মাহমুদুল হক - "জীবন আমার বোন"
- জাহানারা ইমাম - "একাত্তরের দিনগুলি"
- সেলিনা হোসেন - "আমি বীরাঙ্গনা বলছি"
এছাড়াও বিভিন্ন চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে:
- জহির রায়হান - "Stop Genocide (1971)"
- এরপর - অন্যান্য পরিচালক এবং চলচ্চিত্রের নাম, যেমন "ওরা ১১ জন", "হাঙ্গর নদী গ্রেনেড"
এই সমস্ত কাজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শোষণ, ত্যাগ ও সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরে এবং দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে সুরক্ষা করে।
বিখ্যাত চরিত্র
গ্রন্থকার | গ্রন্থ | চরিত্র |
| মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | চণ্ডীমঙ্গল | ফুল্লরা, ভাঁড়ুদত্ত, ধনপতি সওদাগর, লহনা, খুল্লনা |
| মাইকেল মধুসূদন দত্ত | বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ | ভক্তপ্রসাদ বাবু |
| প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় | ফুলের মূল্য | ম্যাগী |
| বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | পথের পাঁচালী | অপু, দুর্গা |
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | কমলাকান্তের দপ্তর | কমলাকান্ত, নসীরাম বাবু, প্রসন্ন গোয়ালিনী, ভীষ্মদেব খোশনবীশ |
| আলাওল | পদ্মাবতী | পদ্মাবতী |
| ভারতচন্দ্র | অন্নদামঙ্গল | ঈশ্বরী পাটনী |
| দ্বিজ কানাই | মহুয়া পালা | নদের চাঁদ, মহুয়া |
| দীনবন্ধু মিত্র | নীলদর্পণ | নবীন মাধব, তোরাপ |
| সধবার একাদশী | নিমচাঁদ, কেনারাম | |
| মীর মশাররফ হোসেন | বিষাদ-সিন্ধু | ইমাম হোসেন, এজিদ |
| মুনির চৌধুরী | রক্তাক্ত প্রান্তর | জোহরা, ইব্রাহীম কার্দি |
| জহির রায়হান | হাজার বছর ধরে | টুনি, মন্তু |
| একুশের গল্প | তপু, রেণু | |
| নজীবর রহমান | আনোয়ারা | আনোয়ারা |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ছুটি | ফটিক |
| কাবুলিওয়ালা | রহমত, মিনি | |
| শাস্তি | চন্দরা | |
| পোস্টমাস্টার | রতন | |
| সমাপ্তি | মৃন্ময়ী | |
| হৈমন্তী | হৈমন্তী, অপু, গৌরীশঙ্কর | |
| নষ্টনীড় | চারুলতা, ভূপতি | |
| খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন | রাইচরণ | |
| একরাত্রি | সুরবালা (নায়িকা) | |
| জীবিত ও মৃত | কাদম্বিনী | |
| বিসর্জন | জয়সিংহ, রঘুপতি, অপর্ণা | |
| ডাকঘর | অমল | |
| গোরা | গোরা, ললিতা, বিনয় | |
| শেষের কবিতা | অমিত, লাবণ্য, শোভনলাল | |
| মালঞ্চ | আদিত্য, নীরজা, সরলা | |
| চোখের বালি | মহেন্দ্র, বিনোদিনী | |
| যোগাযোগ | মধুসূদন, কুমুদিনী | |
| দুইবোন | শর্মিলা, ঊর্মিলা | |
| ঘরে-বাইরে | নিখিলেশ, বিমলা | |
| চতুরঙ্গ | শচীশ, দামিনী, শ্রীবিলাস | |
| চার অধ্যায় | অতিন, এলা, ইন্দ্রনাথ | |
| রক্তকরবী | রঞ্জন, নন্দিনী | |
| রবিবার | অভীক, বিভা | |
| কানাহরি দত্ত | মনসামঙ্গল | চাঁদ সওদাগর, বেহুলা, লখিন্দর |
| বড়ু চণ্ডীদাস | শ্রীকৃষ্ণকীর্তন | রাধা, কৃষ্ণ, বড়ায়ি |
| প্যারীচাঁদ মিত্র | আলালের ঘরের দুলাল | ঠকচাচা |
| কালীপ্রসন্ন সিংহ | হুতোম প্যাঁচার নকশা | দনুবানু |
| মাইকেল মধুসূদন দত্ত | মেঘনাদবধ কাব্য | মেঘনাদ, প্রমীলা, রাবণ |
| কৃষ্ণকুমারী | ভিমসিং, বিলাসবতী | |
| মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | পদ্মানদীর মাঝি | কুবের, মালা, কপিলা, হোসেন মিয়া |
| পুতুলনাচের ইতিকথা | শশী, কুসুম | |
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | দুর্গেশনন্দিনী | আয়েশা, তিলোত্তমা |
| কপালকুণ্ডলা | কপালকুণ্ডলা, নবকুমার | |
| বিষবৃক্ষ | কুন্দনন্দিনী, নগেন্দ্রনাথ | |
| কৃষ্ণকান্তের উইল | রোহিণী, গোবিন্দলাল | |
| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | মহেশ | গফুর, আমিনা |
| মেজদিদি | হেমাঙ্গিনী, কেষ্ট, কাদম্বিনী | |
| বড় দিদি | মাধবী, সুরেন্দ্রনাথ | |
| দত্তা | নরেন, বিজয়া | |
| শ্রীকান্ত | শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, অভয়া, ইন্দ্রনাথ | |
| গৃহদাহ | সুরেশ, অচলা, মহিম | |
| চরিত্রহীন | সতীশ, সাবিত্রী, দিবাকর, কিরণময়ী | |
| পথের দাবী | সব্যসাচী | |
| দেবদাস | দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী | |
| পল্লীসমাজ | রমা, রমেশ | |
| দেনা-পাওনা | জীবানন্দ, ষোড়শী | |
| সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ | লালসালু | মজিদ, জমিলা, আমেনা, রহিমা |
| চাঁদের অমাবস্যা | আরেফ আলী (নায়ক), কাদের | |
| অমৃতলাল বসু | বিবাহ বিভ্রাট | নন্দলাল |
| আবু ইসহাক | সূর্য দীঘল বাড়ী | জয়গুন, হাসু, মায়মুন |
| শহীদুল্লা কায়সার | সারেং বৌ | কদম সারেং, নবিতুন |
| সংশপ্তক | হুরমতি, লেকু, রমজান, আনোয়ার | |
| শওকত ওসমান | ক্রীতদাসের হাসি | তাতারি, হারুন অর রশিদ |
| কাজী নজরুল ইসলাম | বাঁধনহারা | নুরুল হুদা, মাহবুবা, রাবেয়া |
| কুহেলিকা | জাহাঙ্গীর, হারুন, প্রমথ | |
| মৃত্যুক্ষুধা | কুর্শি, প্যাকালে, মেজো বউ |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বিখ্যাত সাহিত্যিকদের উপাধি
নাম | উপাধি |
| ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা | বিদ্যাসাগর, বাংলা গদ্যের জনক, বিরাম/যতি চিহ্নের প্রবর্তক। |
| জীবনানন্দ দাশ | তিমির হননের কবি, নির্জনতার কবি, রূপসী বাংলার কবি, প্রকৃতির কবি। |
| বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | সাহিত্য সম্রাট, বাংলার ওয়াল্টার স্কট, বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক। |
| বিহারীলাল চক্রবর্তী | বাংলা গীতিকবিতার জনক, ভোরের পাখি (রবীন্দ্রনাথ তাঁকে এ উপাধি দেন)। |
| মাইকেল মধুসূদন দত্ত | বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক, সনেটের প্রবর্তক, অমিত্রাক্ষরের প্রবর্তক, দত্তকুলোদ্ভব কবি। |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | বিশ্বকবি (ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় তাঁকে এ উপাধি দেন), কবিগুরু, বাংলা ছোটগল্পের জনক। |
| সুফিয়া কামাল | জননী সাহসিকা, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি। |
| কাজী নজরুল ইসলাম | বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি |
| রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন | নারী জাগরণের অগ্রদূত |
| আবদুল করিম | সাহিত্য বিশারদ |
| সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী | স্বপ্নাতুর কবি |
| গোলাম মোস্তফা | কাব্য সুধাকর |
| গোবিন্দচন্দ্র দাস | স্বভাব কবি |
| জসীমউদ্দীন | পল্লীকবি |
| জাহানারা ইমাম | শহিদ জননী |
| মুহম্মদ শহীদুল্লাহ | ভাষাতত্ত্ববিদ |
| নজিবর রহমান | সাহিত্যরত্ন |
| নূরন্নেছা খাতুন | সাহিত্য সরস্বতী |
| প্যারীচাঁদ মিত্র | বাংলা উপন্যাসের প্রতিষ্ঠাতা |
| প্রমথ চৌধুরী | চলিত রীতির প্রবর্তক |
| সমর সেন | আধুনিক যুগের নাগরিক কবি |
| সুধীন্দ্রনাথ দত্ত | ক্লাসিক কবি |
| ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত | যুগসন্ধিক্ষণের কবি |
| সুকান্ত ভট্টাচার্য | কিশোর কবি |
| সুভাষ মুখোপাধ্যায় | পদাতিক কবি |
| অনন্ত বড়ু | বড়ু চণ্ডীদাস |
| আবদুল কাদির | ছান্দসিক কবি |
| দিলওয়ার | গণমানুষের কবি |
| কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় | দাদা মশাই |
| মধুসূদন মজুমদার | দৃষ্টিহীন |
| হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় | বাংলার মিল্টন (শেষ জীবনে অন্ধ হন) |
| বিদ্যাপতি | মিথিলার কোকিল, কবিকণ্ঠহার |
| বিষ্ণু দে | মার্কসবাদী কবি |
| ভারতচন্দ্র | রায়গুণাকর, প্রথম নাগরিক কবি |
| মালাধর বসু | গুণরাজ খান |
| মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | কবিকঙ্কন |
| মুকুন্দদাস | চারণকবি |
| মোজাম্মেল হক | শান্তিপুরের কবি |
| যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত | দুঃখবাদী কবি |
| রামনারায়ণ | তর্করত্ন |
| আলাওল | মহাকবি |
| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | অপরাজেয় কথাশিল্পী |
| শামসুর রাহমান | নাগরিক কবি |
| ফররুখ আহমদ | ইসলামী রেনেসাঁর কবি |
| হাসন রাজা | মরমি কবি |
| হাবিবুর রহমান | শিশু সাহিত্যিক |
| সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত | ছন্দের জাদুকর |
| বাহরাম খান | দৌলত উজির |
| অমৃতলাল বসু | রসরাজ |
| আবদুল হক | কলম সৈনিক |
| পঞ্চানন কর্মকার | মল্লিক |
| মোহিতলাল মজুমদার | সত্যসুন্দর দাস |
| শহিদুল জহির | ডিমান্ডিং লেখক |
সাহিত্যিকদের প্রকৃত নাম ও ছদ্মনাম
প্রকৃত নাম | ছদ্মনাম | প্রকৃত নাম | ছদ্মনাম |
| আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ | শহীদুল্লা কায়সার | আবুল কালাম শামসুদ্দীন | শামসুদ্দীন আবুল কালাম |
| অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত | নীহারিকা দেবী | অমৃতলাল বন্দ্যোপাধ্যায় | অমিয়া দেবী |
| আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | মঞ্জু (ডাকনাম) | আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ | জহির রায়হান |
| আবু জাফর শামসুদ্দিন | অল্পদর্শী | ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় | পঞ্চানন |
| আরজ আলী | আরজ আলী মাতুব্বর | আলাউদ্দিন আল আজাদ | বাদশা (ডাকনাম) |
| কাজী নজরুল ইসলাম | দুখু মিয়া, নুরু | মনোয়ারা বেগম মনি | সেলিনা পারভীন |
| কামদারঞ্জন রায় | উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য |
| প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | জয়েনউদ্দিন বিশ্বাস | সরদার জয়েনউদ্দিন |
| মুহম্মদ কাজেম আল কুরায়শী | কায়কোবাদ | মাইকেল মধুসূদন দত্ত | Timothy Penpoem |
| মীর মশাররফ হোসেন | গাজী মিয়াঁ, উদাসীন পথিক | কাজী নজরুল ইসলাম | ধূমকেতু |
| বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় | বনফুল | এম. ওবায়দুল্লাহ | আসকার ইবনে শাইখ |
| বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | কৃচিতপ্রৌঢ় | আবদুল মান্নান সৈয়দ | অশোক সৈয়দ |
| অখিল নিয়োগী | স্বপনবুড়ো | অহিদুর রেজা | হাসন রাজা |
| আবুল হোসেন মিয়া | আবুল হাসান | অজিত দত্ত | রৈবতক |
| অন্নদাশঙ্কর রায় | লীলাময় রায় | অমিতাভ চৌধুরী | নিরপেক্ষ |
| গন্ধর্ব নারায়ণ | দীনবন্ধু মিত্র | আবুল ফজল | শমসের উল আজাদ |
| কানাই শেখ | পাগলা কানাই | কামিনি রায় | জনৈক বঙ্গমহিলা |
| নীহাররঞ্জন গুপ্ত | বানভট্ট | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | নীললোহিত |
| গৌরকিশোর ঘোষ | রূপদর্শী | প্রেমেন্দ্র মিত্র | কৃত্তিবাস ভদ্র |
| মইনুদ্দিন আহমেদ | সেলিম আল দীন | জীবনানন্দ দাশ | শ্রী, কালপুরুষ |
| প্যারীচাঁদ মিত্র | টেকচাঁদ ঠাকুর | সুকুমার রায় | উহ্যমান পণ্ডিত |
| রামমোহন রায় | শিবপ্রসাদ রায় | প্রমথ চৌধুরী | বীরবল |
| সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত | অশীতিপর শর্মা | হরিনাথ মজুমদার | কাঙাল হরিনাথ |
| সৈয়দ আলী আহসান | চেনাকণ্ঠ | রোকনুজ্জামান | দাদাভাই |
| সৈয়দ মুজতবা আলী | মুসাফির, সত্যপীর | সমরেশ বসু | কালকূট |
| রাজশেখর বসু | পরশুরাম | মহাশ্বেতা দেবী | সুমিত্রা দেবী |
| দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর | বঙ্গের রঙ্গ দর্শক | মনিরুজ্জামান | হায়াৎ মাহমুদ |
| নীলিমা রায় চৌধুরী | নীলিমা ইব্রাহিম | কালীপ্রসন্ন সিংহ | হুতোম প্যাঁচা |
| বিমল ঘোষ | মৌমাছি | চারুচন্দ্র চক্রবর্তী | জরাসন্ধ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ভানুসিংহ ঠাকুর | জসীমউদ্দীন | তুজাম্বর আলি |
| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | অনিলা দেবী | নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | সুনন্দ |
| স্বামী কালিকানন্দ | অবধূত | শেখ আজিজুর রহমান | শওকত ওসমান |
| সতীনাথ ভাদুড়ী | চিত্রগুপ্ত | ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত | ভ্রমণকারী বন্ধু |
| বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় | যাযাবর | সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ | আবু শরিয়া |
| মধুসূদন মজুমদার | দৃষ্টিহীন |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
'রত্নবর্তী', 'রত্নাবলী' এবং 'রত্নদীপ'।
- রত্নবর্তী (উপন্যাস) : মীর মশাররফ হোসেন
- রত্নাবলী (নাটক) : রামনারায়ণ তর্করত্ন
- রত্নদীপ (উপন্যাস) : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
'মহাশ্মশান', 'মহাপতঙ্গ' এবং 'মহাভারত'।
- মহাশ্মশান (মহাকাব্য) : কায়কোবাদ
- মহাভারত (মহাকাব্য) : বেদব্যাস
- মহাপতঙ্গ (গল্পগ্রন্থ) : আবু ইসহাক
'সাম্য' এবং 'সাম্যবাদী'।
- সাম্য (প্রবন্ধ) : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- সাম্যবাদী (কাব্যগ্রন্থ) : কাজী নজরুল ইসলাম
- সাম্যবাদী (পত্রিকা) : খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন
'কৃষ্ণকান্তের উইল' ও 'বৈকুন্ঠের উইল'।
- কৃষ্ণকান্তের উইল (উপন্যাস) : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- বৈকুণ্ঠের উইল (উপন্যাস) : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
'কৃষ্ণচরিত', 'কৃষ্ণকুমারী', ‘কৃষ্ণপক্ষ’
- কৃষ্ণচরিত (প্রবন্ধ) : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- কৃষ্ণকুমারী (নাটক) : মাইকেল মধুসূদন দত্ত
- কৃষ্ণপক্ষ (গল্পগ্রন্থ) : আবদুল গাফফার চৌধুরী
- কৃষ্ণপক্ষ (উপন্যাস) : হুমায়ূন আহমেদ
'রজনী' 'শেষ রজনীর চাঁদ' (উপন্যাস)
- রজনী (উপন্যাস) : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- রজনী (উপন্যাস) : হুমায়ূন আহমেদ
- শেষ রজনীর চাঁদ' (উপন্যাস): আবদুল গাফফার চৌধুরী
'নীল-দর্পণ', 'জমীদার দর্পণ', 'নীল দংশন', এবং ‘নীললোহিত’
- নীল-দর্পণ (নাটক) : দীনবন্ধু মিত্র
- জমীদার দর্পণ (নাটক) : মীর মশাররফ হোসেন
- নীল দংশন (উপন্যাস) : সৈয়দ শামসুল হক
- নীললোহিত (গল্প) : প্রমথ চৌধুরী
'পথের পাঁচালী' ও 'পথের দাবী'।
- পথের পাঁচালী (উপন্যাস): বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- পথের দাবী (উপন্যাস) : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
'চন্দ্রনাথ' ও 'চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান'
- চন্দ্রনাথ (উপন্যাস) : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান (উপন্যাস) : আবদুল গাফফার চৌধুরী
'বিধ্বস্ত নীলিমা' ও 'অরণ্যে নীলিমা'
- বিধ্বস্ত নীলিমা (কাব্যগ্রন্থ) : শামসুর রাহমান
- অরণ্যে নীলিমা (উপন্যাস) : আহসান হাবীব
‘কবর’
- কবর (নাটক): মুনীর চৌধুরী
- কবর (কবিতা): জসীমউদ্দীন
'খোয়াবনামা', 'জঙ্গনামা', 'নূরনামা', 'সফরনামা' এবং 'সিকান্দরনামা'
- খোয়াবনামা (উপন্যাস): আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
- জঙ্গনামা (কাব্যগ্রন্থ) : দৌলত উজির বাহরাম খাননূরনামা
- (কাব্যগ্রন্থ) : আবদুল হাকিম
- সফরনামা (প্রবন্ধ) : আবুল ফজল
- সিকান্দরনামা (কাব্যগ্রন্থ): আলাওল
'অরণ্য বহ্নি', 'অরণ্য গোধূলী', 'অরণ্যে নীলিমা', ‘আরণ্যক’
- অরণ্য বহ্নি (উপন্যাস) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
- অরণ্য গোধূলী (উপন্যাস): বন্দে আলী মিয়া
- অরণ্যে নীলিমা (উপন্যাস): আহসান হাবীব
- আরণ্যক (উপন্যাস) : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
'স্পেনবিজয় কাব্য' ও 'স্পেন বিজয়ী মুসা'
- স্পেনবিজয় কাব্য (মহাকাব্য) : সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী
- স্পেন বিজয়ী মুসা (নাটক): ইব্রাহিম খলিল
'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' 'গোরক্ষ বিজয়', 'গৌরাঙ্গ বিজয়', 'রসুল বিজয়', 'ধর্ম বিজয়' এবং 'সিন্ধু বিজয়'
- শ্রীকৃষ্ণ বিজয় (নাটক): মালাধর বসু
- গোরক্ষ বিজয় (কাব্যগ্রন্থ): শেখ ফয়জুল্লাহ
- গৌরাঙ্গ বিজয় (গ্রন্থ): চূড়ামণি দাস
- রসুল বিজয় (কাব্যগ্রন্থ): সৈয়দ সুলতান
- ধর্ম বিজয় (নাটক) : রামনারায়ণ তর্করত্ন
- সিন্ধু বিজয় (নাটক) : আকবর উদ্দীন
'কাশবনের কন্যা', 'কুচবরণ কন্যা', 'ধানকন্যা'।
- কাশবনের কন্যা (উপন্যাস): শামসুদ্দীন আবুল কালাম
- কুচবরণ কন্যা (কাব্যগ্রন্থ): বন্দে আলী মিয়া
- ধানকন্যা (গল্প) : আলাউদ্দিন আল আজাদ
'ভবিষ্যতের বাঙালি', 'আত্মঘাতী বাঙালী', 'বাঙালীর ইতিহাস', 'সাবাস বাঙালী' 'বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য'
- ভবিষ্যতের বাঙালি (প্রবন্ধ): এস ওয়াজেদ আলি
- আত্মঘাতী বাঙালী (প্রবন্ধ): নীরদচন্দ্র চৌধুরী
- বাঙালীর ইতিহাস (প্রবন্ধ) নীহাররঞ্জন রায়
- সাবাস বাঙালী (প্রবন্ধ) : অমৃতলাল বসু
- বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য (প্রবন্ধ): ড. আহমদ শরীফ
'বাংলা সাহিত্যের কথা', 'বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত', ‘বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা’
- বাংলা সাহিত্যের কথা (প্রবন্ধ): ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
- বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা (প্রবন্ধ) সুকুমার সেন
- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (প্রবন্ধ): আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান
- বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা (প্রবন্ধ): গোপাল হালদার
'বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত', 'ভাষার ইতিবৃত্ত'।
- বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (প্রবন্ধ): ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
- বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (প্রবন্ধ): সুকুমার সেন
- ভাষার ইতিবৃত্ত (প্রবন্ধ): সুকুমার সেন
'বেদান্তগ্রন্থ', 'বেদান্তসার', ‘বেদান্তচন্দ্রিকা’
- বেদান্তগ্রন্থ (প্রবন্ধগ্রন্থ) রাজা রামমোহন রায়
- বেদান্তসার (প্রবন্ধগ্রন্থ) : রাজা রামমোহন রায়
- বেদান্তচন্দ্রিকা (প্রবন্ধগ্রন্থ): মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
‘মানচিত্র’
- মানচিত্র (কাব্যগ্রন্থ) : আলাউদ্দিন আল আজাদ
- মানচিত্র (নাটক) : আনিস চৌধুরী
'সিরাজদ্দৌলা'
- সিরাজদ্দৌলা (নাটক): গিরিশচন্দ্র ঘোষ
- সিরাজউদ্দৌলা (নাটক): সিকান্দার আবু জাফর
'এলেবেলে'
- এলেবেলে (নাটক) : জিয়া হায়দার
- এলেবেলে (রম্যগল্প) : হুমায়ূন আহমেদ
'সঞ্চয়িতা', 'সঞ্চিতা'
- সঞ্চয়িতা (কাব্য সংকলন): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- সঞ্চিতা (কাব্য সংকলন): কাজী নজরুল ইসলাম
‘দেনাপাওনা’
- দেনাপাওনা (ছোটগল্প): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- দেনাপাওনা (উপন্যাস): শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
'শেষ লেখা', 'শেষের কবিতা', 'শেষ প্রশ্ন', 'শেষের পরিচয়', 'শেষ বিকেলের মেয়ে' 'শেষ পাণ্ডুলিপি', 'শেষ কথা'
- শেষ লেখা (কাব্যগ্রন্থ): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- শেষের কবিতা (উপন্যাস): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- শেষ প্রশ্ন (উপন্যাস) : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- শেষের পরিচয় (উপন্যাস): শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- শেষ বিকেলের মেয়ে (উপন্যাস): জহির রায়হান
- শেষ পাণ্ডুলিপি (উপন্যাস): বুদ্ধদেব বসু
- শেষ কথা (ছোটগল্প): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'বসন্ত', ‘বসন্তকুমারী’
- বসন্ত (নাটক) : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- বসন্তকুমারী (নাটক): মীর মশাররফ হোসেন
'রক্তকরবী', ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’
- রক্তকরবী (নাটক) : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- রক্তাক্ত প্রান্তর (নাটক): মুনীর চৌধুরী
'রক্তরাগ', ‘পদ্মরাগ’
- রক্তরাগ (কাব্যগ্রন্থ) : গোলাম মোস্তফা
- পদ্মরাগ (উপন্যাস) : রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
'রাজবন্দীর জবানবন্দী', ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’
- রাজবন্দীর জবানবন্দী (প্রবন্ধ): কাজী নজরুল ইসলাম
- রাজবন্দীর রোজনামচা (স্মৃতিকথা): শহীদুল্লা কায়সার
'মরুভাস্কর'
- মরুভাস্কর (জীবনীমূলক কাব্য) কাজী নজরুল ইসলাম
- মরুভাস্কর (জীবনীগ্রন্থ) মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী
'অভিযাত্রিক'
- অভিযাত্রিক (উপন্যাস): বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- অভিযাত্রিক (কাব্য) : বেগম সুফিয়া কামাল
'একাত্তরের ডায়েরী', 'একাত্তরের দিনগুলি', 'একাত্তরের কথামালা', 'একাত্তরের বর্ণমালা', 'একাত্তরের নিশান', 'একাত্তরের বিজয় গাঁথা', 'একাত্তরের রণাঙ্গন' এবং ‘একাত্তরের যীশু’
- একাত্তরের ডায়েরী (স্মৃতিকথা) : বেগম সুফিয়া কামাল
- একাত্তরের দিনগুলি (স্মৃতিকথা) : জাহানারা ইমাম
- একাত্তরের কথামালা : বেগম সুফিয়া কামাল
- একাত্তরের বর্ণমালা : এম. আর. আখতার মুকুল
- একাত্তরের নিশান : রাবেয়া খাতুন
- একাত্তরের বিজয় গাঁথা : মেজর রফিকুল ইসলাম
- একাত্তরের রণাঙ্গন : শামসুল হুদা চৌধুরী
- একাত্তরের যীশু : শাহরিয়ার কবির
‘পদ্মাবতী’
- পদ্মাবতী (কাব্যগ্রন্থ) : আলাওল
- পদ্মাবতী (নাটক) : মাইকেল মধুসূদন দত্ত
'পদ্মানদীর মাঝি', 'পদ্মা মেঘনা যমুনা', 'পদ্মগোখরা'
- পদ্মানদীর মাঝি (উপন্যাস): মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
- পদ্মা মেঘনা যমুনা (উপন্যাস): আবু জাফর শামসুদ্দীন
- পদ্মগোখরা (গল্প): কাজী নজরুল ইসলাম
'পঞ্চতন্ত্র', 'পঞ্চনারী', ‘পঞ্চভূত’
- পঞ্চতন্ত্র (গল্পগ্রন্থ) : সৈয়দ মুজতবা আলী
- পঞ্চনারী (কাব্য) : জসীমউদ্দীন
- পঞ্চভূত (রম্যরচনা) : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'অন্নদামঙ্গল', 'চণ্ডীমঙ্গল', 'মনসামঙ্গল', 'চৈতন্যমঙ্গল', 'কৃষ্ণমঙ্গল', 'কালিকামঙ্গল', 'ঋতুমঙ্গল', 'ধর্মমঙ্গল', ‘সারদামঙ্গল’
- অন্নদামঙ্গল (কাব্য) : ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর
- চণ্ডীমঙ্গল (কাব্য) : মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
- মনসামঙ্গল (কাব্য) : কানা হরিদত্ত
- চৈতন্যমঙ্গল (জীবনীকাব্য) : লোচন দাস
- কৃষ্ণমঙ্গল (কাব্য) : শঙ্কর চক্রবর্তী
- কালিকামঙ্গল (কাব্য) : রামপ্রসাদ সেন
- ঋতুমঙ্গল (কাব্য) : কালিদাস
- ধর্মমঙ্গল (সাহিত্যকর্ম) : ঘনরাম চক্রবর্তী
- সারদামঙ্গল (কাব্য) : বিহারীলাল চক্রবর্তী
'জননী'
- জননী (উপন্যাস) : শওকত ওসমান
- জননী (উপন্যাস) : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
'কামাল পাশা', ‘আনোয়ার পাশা’
- কামাল পাশা (কবিতা): কাজী নজরুল ইসলাম
- আনোয়ার (কবিতা): কাজী নজরুল ইসলাম
- কামাল পাশা (নাটক), আনোয়ার পাশা (নাটক): ইবরাহীম খাঁ
'গীতিগুচ্ছ', 'গীতবিতান, গীতালী, গীতাঞ্জলি', ‘গল্পগুচ্ছ’
- গীতিগুচ্ছ (কাব্যগ্রন্থ) সুকান্ত ভট্টাচার্য
- গীতবিতান, গীতালী, গীতাঞ্জলি (কাব্যগ্রন্থ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- গল্পগুচ্ছ (গল্পগ্রন্থ): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'মৃত্যুক্ষুধা', 'জীবনক্ষুধা'
- মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) : কাজী নজরুল ইসলাম
- জীবনক্ষুধা (উপন্যাস) : আবুল মনসুর আহমদ
'মরুসূর্য', 'মরুচন্দ্রিকা', 'মরুদুলাল', ‘মরুমায়া, মরুশিখা’
- মরুসূর্য (কাব্যগ্রন্থ) : আ. ন.ম. বজলুর রশীদ
- মরুচন্দ্রিকা (কাব্যগ্রন্থ) কাজী কাদের নেওয়াজ
- মরুদুলাল (গদ্যগ্রন্থ) : গোলাম মোস্তফা
- মরুমায়া, মরুশিখা (প্রবন্ধ): যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
'উচ্চ জীবন, উন্নত জীবন, মহৎ জীবন, মহাজীবন, মানবজীবন'
উচ্চ জীবন, উন্নত জীবন, মহৎ জীবন, মহাজীবন, মানবজীবন (প্রবন্ধগ্রন্থ): ডা. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান
‘প্রভাত চিন্তা, নিভৃত চিন্তা, নিশীথ চিন্তা’
প্রভাত চিন্তা, নিভৃত চিন্তা, নিশীথ চিন্তা (গদ্যগ্রন্থ): কালীপ্রসন্ন ঘোষ
'সনেট সঞ্চয়ন, সনেট শতক, সনেটমালা'
সনেট সঞ্চয়ন, সনেট শতক, সনেটমালা (কাব্য): সুফী মোতাহার হোসেন
'ভাষা ও সাহিত্য', 'ভাষা ও সাহিত্য', ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’
- ভাষা ও সাহিত্য (প্রবন্ধ) : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
- ভাষা ও সাহিত্য (প্রবন্ধ) : মুহম্মদ আবদুল হাই
- বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (প্রবন্ধ): ড. দীনেশচন্দ্র সেন
'সমাজ ও সাহিত্য', 'সাহিত্য ও সংস্কৃতি', 'সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন', 'সাহিত্য সম্ভার'
- সমাজ ও সাহিত্য (প্রবন্ধ) : কাজী আব্দুল ওদুদ
- সাহিত্য ও সংস্কৃতি (প্রবন্ধ) : মুহম্মদ আবদুল হাই
- সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন (প্রবন্ধ): আবুল ফজল
- সাহিত্য সম্ভার (প্রবন্ধ): কাজী দীন মুহম্মদ
'সংস্কৃতির ভাঙা সেতু', 'সংস্কৃতির চড়াই উৎরাই', 'সংস্কৃতির রূপান্তর', 'সংস্কৃতি কথা', 'সংস্কৃতির সংকট', ‘বাঙ্গালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গ’
- সংস্কৃতির ভাঙা সেতু (প্রবন্ধ): আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
- সংস্কৃতির চড়াই উৎরাই (প্রবন্ধ): শওকত ওসমান
- সংস্কৃতির রূপান্তর (প্রবন্ধ): গোপাল হালদার
- সংস্কৃতি কথা (প্রবন্ধ) মোতাহের হোসেন চৌধুরী
- সংস্কৃতির সংকট (প্রবন্ধ): বদরুদ্দীন উমর
- বাঙ্গালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ): গোপাল হালদার
'আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ', ‘আধুনিক ভাষাতত্ত্ব’
- আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ (গবেষণাগ্রন্থ) : জগদীশচন্দ্র ঘোষ
- আধুনিক ভাষাতত্ত্ব (গবেষণাগ্রন্থ) : আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ
আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক রূপ, যেখানে লেখক নিজের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। আত্মজীবনীতে জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত সামগ্রিক জীবন (যেমন: রাসুসুন্দরী দেবীর "আমার জীবন") এবং স্মৃতিকথায় জীবনের বিশেষ কোনো অংশ বা স্মৃতির ওপর আলোকপাত করা হয়. এগুলি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ঐতিহাসিক তথ্যের মূল্যবান দলিল।
আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা-র মূল পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য:
আত্মজীবনী (Autobiography): এটি লেখকের সম্পূর্ণ জীবনের একটি সুসংগঠিত, কালানুক্রমিক বিবরণ, যা শৈশব থেকে লেখা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
স্মৃতিকথা (Memoir): এটি লেখকের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে কোনো নির্দিষ্ট সময়, পেশা বা ঘটনার ওপর ফোকাস করে লেখা হয়। এটি আত্মজীবনীর চেয়ে কম আনুষ্ঠানিক এবং বেশি আবেগময় ও প্রতিফলিত হতে পারে।
উভয়ই: নিজের লেখা জীবনের গল্প হলেও, এগুলি লেখার ধরণ এবং ব্যাপ্তির কারণে একে অপরের থেকে আলাদা।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)
বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী। তীক্ষ্ণ মননশীলতা, বাকচাতুর্যের চমৎকারিত্ব এবং বুদ্ধির অসিচালনা ছিল তাঁর ভাষাগত বিশেষত্ব। তিনি ১৮৯৯ সালে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ বাংলা প্রথম সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাংলা গদ্যে চলিত রীতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেন।
- প্রমথ চৌধুরী ৭ আগস্ট, ১৮৬৮ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রাম।
- তাকে বলা হয় বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক ও বিদ্রূপাত্মক প্রাবন্ধিক।
- প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যিক ছদ্মনাম-বীরবল।
- প্রমথ চৌধুরীর প্রথম প্রবন্ধ 'জয়দেব' ১৮৯৩ সালে 'সাধনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
- 'হালখাতা' ('ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশ- ১৯০২), এ গদ্য /প্রবন্ধ রচনায় তিনি প্রথম চলিত রীতির প্রয়োগ ঘটান।বাংলা কা
- ব্যে তিনিই প্রথম ইতালীয় সনেটের প্রবর্তন করেন।
- তিনি 'সবুজপত্র' (১৯১৪), 'বিশ্বভারতী পত্রিকা' সম্পাদনা করেন।
- তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন। উল্লেখ্য, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজ মাতার নামে এ পদক প্রবর্তন করেন।
- তিনি ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে (১৬ ভাদ্র, ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ) শান্তিনিকেতনে মারা যান।
চলিত রীতিতে রচিত তাঁর প্রথম গদ্যরচনাঃ
'হালখাতা' (১৯০২): এটি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। [বাজারের অধিকাংশ বইয়ে লেখা যে, চলিত ভাষায় রচিত প্রমথ চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ 'বীরবলের হালখাতা'। প্রকৃতপক্ষে এটি হবে 'হালখাতা'। কারণ, 'বীরবলের হালখাতা' প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে আর 'হালখাতা' গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। (সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান)]। উল্লেখ্য, চলিত ভাষায় রচিত প্রথম গ্রন্থ কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরের অপশনে 'হালখাতা' না থাকলে 'বীরবলের হালখাতা' উত্তর দিতে হবে। কারণ, অধিকাংশ প্রশ্নকর্তা বিগত সালের পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো নতুন প্রশ্নে অপশনসহ হুবহু তুলে দেয়।
প্রমথ চৌধুরী রচিত অন্যান্য সাহিত্যকর্মগুলো:
প্রবন্ধগ্রন্থ: 'তেল-নুন-লড়ি' (১৯০৬), 'বীরবলের হালখাতা' (১৯১৬), 'নানাকথা' (১৯১৯), 'আমাদের শিক্ষা' (১৯২০), 'রায়তের কথা' (১৯২৬), 'নানাচর্চা' (১৯৩২), 'আত্মকথা' (১৯৪৬), 'প্রবন্ধ সংগ্রহ' (১ম খণ্ড- ১৯৫২, ২য় খণ্ড- ১৯৫৩)।
কাব্যগ্রন্থ: 'সনেট পঞ্চাশৎ' (১৯১৩), 'পদচারণ' (১৯১৯)।
গল্পগ্রন্থ: 'চার ইয়ারি কথা' (১৯১৬), 'আহুতি' (১৯১৯), 'নীললোহিত ও গল্পসংগ্রহ' (১৯৪১)।
প্রবন্ধ: 'যৌবনে দাও রাজটীকা', 'বই পড়া', 'সাহিত্যে খেলা', 'ভাষার কথা'।
'বই পড়া' ও 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধ ২টি অবশ্যই পড়তে হবে। কারণ, এ দুটি প্রবন্ধ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে।
বিখ্যাত উক্তি
| বই পড়া | আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বাহু। |
| ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়। | |
| জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয়, এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। | |
| যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। | |
| সাহিত্যের মধ্যেই আমাদের জাত মানুষ হবে। | |
| সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। | |
| দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার মৃত্যুর হয় না। | |
| আমি লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের ওপরে স্থান দিই। লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল। |
| খেলা সাহিত্যে | যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন বাঁদরও গড়তে পারেন। |
| মন উচুতেও উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়। | |
| শিল্পরাজ্যে খেলা করবার প্রবৃত্তির ন্যায় অধিকারও বড়ো-ছোটো সকলেরই সমান আছে। | |
| এ পৃথিবীতে একমাত্র খেলার ময়দানে ব্রাহ্মণ শূদ্রের প্রভেদ নেই। | |
| যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি-পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা। | |
| গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না।। | |
| সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়। | |
| কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা। | |
| কবির নিজের মনের পরিপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি। | |
| সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়। |
| ভাষার কথা | ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, উল্টোটা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে। |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
লোককে শিক্ষা দেয়া
আনন্দ দেয়া
জ্ঞানদান করা
মনোরঞ্জন করা
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সত্য প্রকাশের দুরন্ত সাহস নিয়ে আমৃত্যু সকল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার ও প্রতিবাদী। এ জন্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি' বলা হয়। আবার একই সাথে কোমল দরদি মন নিয়ে ব্যথিত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকেছেন তিনি। এক হাতে বাঁশি আরেক হাতে রণতূর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, আর এসেই প্রচলিত শিল্পধারাসমূহকে পাল্টে দিয়ে নতুন বিষয় ও নতুন শব্দে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে করেছেন সমৃদ্ধতর।
- কাজী নজরুল ইসলাম ২৪ মে, ১৮৯৯ সালে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। (কাজী ফকির আহমেদ এর ২য় স্ত্রী জাহেদা খাতুন)। জাহেদা খাতুনের চার পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হয় বলে তার নাম রাখা হয়- দুখু মিয়া। বাল্যকালে তাঁকে 'ত্যারা ক্ষ্যাপা' ও 'নজর আলী' নামেও ডাকা হতো। সাহিত্যে তিনি 'নুরু' নামও ব্যবহার করেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতার মৃত্যু (১৯০৭) হলে তিনি চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হন।
- ১৫ ডিসেম্বর, ১৯২৯ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এ অনুষ্ঠানে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর সভাপতির ভাষণে নজরুলকে 'প্রতিভাবান বাঙালি কবি' বলে আখ্যায়িত করেন।
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে মুক্তক ছন্দের প্রবর্তক।
- বাংলা ভাষায় তিনি প্রথম ইসলামি গান ও গজল রচনা করেছেন।
- ১০ অক্টোবর, ১৯৪২ সালে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে দূরারোগ্য (পিক্স ডিজিজ) ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় এই ঋদ্ধ ও সম্ভাবনাময় জীবন আমৃত্যু নির্বাক হয়ে যায়।
- কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র রচনাবলি বাংলা একাডেমি থেকে 'নজরুল রচনাবলি' (২০০৫) নামে ১২ খণ্ডে প্রকাশিত।
- তিনি ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬ সালে (১২ ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টা ১০মিনিটে মাত্র ৭৭ বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে বিকেল ৫.৩০ ঘটিকায় সমাধিস্থ করা হয়।
নজরুল কোন দৈনিক পত্রিকার সান্ধ্য পত্রিকা 'নবযুগ' (১২ জুলাই, ১৯২০) যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন ।
এ পত্রিকা নজরুলের সাথে যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন কমরেড মুজাবপ আহমদ। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এ.কে ফজলুল হত ১৯৪২ সালে 'দৈনিক নবযুগ' পত্রিকা প্রকাশিত হলে নজরুল ইসলাম এর সম্পাদক নিযুক্ত হন।
অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা 'ধূমকেতু' (১৯২২); 'লাঙল' (১৯২৫) তিনি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত রচনাবলি | ||||
| প্রথম প্রকাশিত রচনা/গল্প | 'বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী' (১৯১৯)। এটি 'সওগাত' পত্রিকার মে-জুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। | |||
| প্রথম প্রকাশিত কবিতা | 'মুক্তি' (১৯১৯)। এটি 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। | |||
| প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ | 'অগ্নিবীণা' (সেপ্টেম্বর, ১৯২২)। কবি এ কাব্যটি বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেন।। কাব্যে মোট ১২টি কবিতা আছে। এ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' ৬ জানুয়ারি, ১৯২২ সালে (২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ; শুক্রবার) 'সাপ্তাহিক বিজলী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। 'অগ্নিবীণ কাব্যের প্রথম কবিতা 'প্রলয়োল্লাস'। | |||
| প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ | 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' (১৯১৯)। এটি 'সওগাত পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় (অক্টোবর-নভেম্বর) প্রকাশিত হয়। | |||
| প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ |
| |||
| প্রথম প্রকাশিত নাটক |
| |||
নজরুলের নিষিদ্ধ গ্রন্থঃ
সাহিত্য সমালোচক শিশির কর 'নিষিদ্ধ নজরুল' নামক গ্রন্থে ৫টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: 'যুগবাণী' (নিষিদ্ধ-২৩ নভেম্বর, ১৯২২। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ১৯৪৭), 'বিষের বাঁশি' (নিষিদ্ধ- ২২ অক্টোবর, ১৯২৪। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার-২৭ এপ্রিল, ১৯৪৫), 'ভাঙার গান' (নিষিদ্ধ- ১১ নভেম্বর, ১৯২৪), 'প্রলয়শিখা' (নিষিদ্ধ- ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩০), 'চন্দ্রবিন্দু' (নিষিদ্ধ- ১৪ অক্টোবর, ১৯৩১)।
*** গ্রন্থ হিসেবে 'অগ্নিবীণা' কাব্যটি কখনো নিষিদ্ধ হয়নি। এ কাব্যের 'রক্তাম্বরধারিণী মা' কবিতাটি নিষিদ্ধ হয়। 'ধূমকেতু' পত্রিকার পূজা (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) সংখ্যায় রাজনৈতিক কবিতা 'আনন্দময়ীর আগমনে' প্রকাশিত হলে পত্রিকার এ সংখ্যা নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুল ইসলাম গ্রেফতার হন। এ কবিতা রচনার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে (ব্রিটিশ সরকার) রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৬ জানুয়ারি, ১৯২৩
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থগুলোঃ
কাজী নজরুল ইসলামের মোট কাব্য সংখ্যা ২২টি।
‘দোলনচাঁপা’ (অক্টোবর, ১৯২৩): কাজী নজরুল ইসলাম রাজবন্দি থাকা অবস্থায় কাব্যটি প্রকাশিত হয়। এটি প্রেমের কাব্য। তাঁর স্ত্রী দুলির নামানুসারে এ কাব্যের নামকরণ করেন। এ কাব্যের প্রথম কবিতা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'। বেলাশেষে, পূবের হাওয়া, চোখের চাতক, অবেলার ডাক, পূজারিণী ইত্যাদি এ কাব্যের অন্যতম কবিতা ।
‘বিষের বাঁশি’ (আগস্ট, ১৯২৪): ২২ অক্টোবর, ১৯২৪ সালে গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল ২৭ এপ্রিল, ১৯৪৫ সালে। এটি তিনি উৎসর্গ করেন এদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রনায়িকা মিসেস এম. রহমানকে (মোসাম্মদ মাসুদা খাতুন)।
‘ভাঙার গান' (আগস্ট, ১৯২৪): এটি মেদিনীপুরবাসীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
‘ছায়ানট' (১৯২৪): এটি উৎসর্গ করেন মুজাফ্ফর আহমদ ও কুতুবউদ্দীন আহমদকে ।
‘চিত্তনামা’ (১৯২৫): দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দার্জিলিঙে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকার্ত কবি অর্ঘ্য, অকাল- সন্ধ্যা, সান্ত্বনা, রাজভিখারি নামে কয়েকটি কবিতা লেখেন। ‘ইন্দ্ৰপতন' কবিতায় কবি মহানবীর সাথে চিত্তরঞ্জনকে তুলনা করে কবিতা লেখেন ।
‘জন্মিলে তুমি মোহাম্মদের আগে হে পুরুষবর
কোরানে ঘোষিত তোমার মহিমা হতে পয়গাম্বর।'
এ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে মুসলিমরা কবির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এটির সংশোধিত রূপ প্রকাশ পায়। কাব্যটি উৎসর্গ করেন চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে। বাসন্তী দেবীকে তিনি মা বলে ডাকতেন ।
‘ঝিঙেফুল' (১৯২৬): শিশুতোষ কাব্য। এটি উৎসর্গ করেন বীর বাদলকে ।
‘সাতভাই চম্পা' (১৯২৬): শিশুতোষ কাব্য । ‘সর্বহারা' (১৯২৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার'। এটি উৎসর্গ করেন বিরজাসুন্দরী দেবীকে।
‘সিন্ধু হিন্দোল' (১৯২৭): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘দারিদ্র্য’। এটি উৎসর্গ করেন হাবীবুল্লাহ বাহার শামসুন্নাহার মাহমুদকে ।
‘সঞ্চিতা' (১৯২৮): বিভিন্ন কাব্যের বাছাইকৃত কবিতা সংকলন। এতে মোট ৭৮টি কবিতা ও গান সংকলিত হয়েছে। তিনি এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন এবং উৎসর্গপত্রে লিখেন : “ বিশ্বকবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু' ।
‘ চক্রবাক’ (১৯২৯): চট্টগ্রামে অবস্থানকালে লেখা অধিকাংশ কবিতা এতে স্থান পায়। তিনি এটি উৎসর্গ করেন তৎকালিন ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজের (বর্তমান- ঢাকা কলেজ) অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রকে।
‘ সন্ধ্যা' (১৯২৯): এ কাব্যের অন্যতম কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’ । ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য নজরুল ঢাকায় আসেন। তখন তিনি সৈয়দ আবুল হেসেনের সরকারি বাসা বর্ধমান হাউসে (বর্তমান- বাংলা একাডেমি) অবস্থানকালে এ গানটি রচনা করেন। এটি প্রথম ‘নতুনের গান' শিরোনামে ‘শিখা’ পত্রিকায় ১৯২৮ (বাংলা- ১৩৩৫) সালে প্রকাশিত হয়। এটি উৎসর্গ করেন মাদারীপুরের শান্তিসেনাদেরকে। ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ কবিতার / গানের ২১ চরণ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় ।
‘ প্রলয়শিখা' (১৯৩০): এ কাব্যের জন্য কবি ৬ মাস কারাভোগ করেন।
‘ মরুভাস্কর' (১৯৫০): এটি হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ। এটি ৪টি সর্গে ১৮টি খণ্ড-কবিতা নিয়ে রচিত।
‘শেষ সওগাত' (১৯৫৮): এ কাব্যের ভূমিকা লেখেন প্রেমেন্দ্র মিত্র ।
‘সাম্যবাদী' (ডিসেম্বর, ১৯২৫), ‘ফণি-মনসা' (১৯২৭), ‘ জিঞ্জির' '(১৯২৮), ‘পূবের হাওয়া' (১৯২৫), ‘ নির্ঝর’ (১৯৩৯), ‘নতুন চাঁদ' (১৯৩৯)।
নজরুলের উপন্যাসঃ
জরুলের উপন্যাস ৩টি ‘বাঁধনহারা' (১৯২৭): এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস। ১৯২১ সাল থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে ‘মোসলেম ভারত' পত্রিকায় ছাপা হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত এ উপন্যাসের কিছু অংশ ১৯২৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় বাদ পড়ে যায়। পরবর্তীতে তা খুঁজে পাওয়া গেলে ১৯ মে, ২০০৬ সালে দৈনিক 'প্রথম আলো' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের পত্র সংখ্যা ১৮টি। নুরুর সাথে মাহবুবার প্রণয় এবং বিয়ের উদ্যোগ অনেক এগিয়ে গেলে হঠাৎ নুরু পালিয়ে গিয়ে সৈনিক জীবন গ্রহণ করে। যদিও এর পেছনে দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালীন কোনো তাগিদ ছিলনা। অনেকের মতে, এ উপন্যাসের নুরুই নজরুল। চরিত্র: নুরুল হুদা, মাহবুবা, সাহসিকা, রাবেয়া।
‘মৃত্যুক্ষুধা' (১৯৩০) : ত্রিশাল গ্রাম ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি রচিত। এটি ১৯২৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘সওগাত' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে। (সুত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।
‘ কুহেলিকা' (১৯৩১): ১৯২৭ সাল থেকে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এটি রাজনৈতিক উপন্যাস। কারণ, নায়ক জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনকে সশস্ত্র বিপ্লবকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ উপন্যাসের বিখ্যাত উক্তি- ‘নারী কুহেলিকা, ইহারা মায়াবিনীর জাত। ইহারা সকল কল্যাণের পথে মায়াজাল পাতিয়া রাখিয়াছে। ইহারা গহন-পথের কন্টক, রাজপথের দস্যু।'
কাজী নজরুলের গল্পগ্রন্থগুলোঃ
'ব্যথার দান' (ফেব্রুয়ারি, ১৯২২): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। এতে মোট ৬টি গল্প আছে- ব্যথার দান, হেনা, অতৃপ্ত কামনা, বাদল-বরিষণে, ঘুমের ঘোরে, রাজবন্দীর চিঠি।
'রিক্তের বেদন' (১৯২৫): প্রতিটি গল্পই সমকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের গল্পসমূহ হলো: রিক্তের বেদন, বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী, মেহের-নেগার, সাঁঝের তারা, রাক্ষুসী, সালেক, স্বামীহারা, দুরন্ত পথিক। গল্পগুলোর প্রধান বিষয় প্রেম।
'শিউলিমালা' (১৯৩১): এ গ্রন্থের গল্পগুলো হলো: পদ্ম-গোখরো, জিনের বাদশা, অগ্নি-গিরি, শিউলিমালা।
নজরুলের নাট্যগ্রন্থগুলোঃ
'ঝিলিমিলি' (১৯৩০): এটি ঝিলিমিলি, সেতুবন্ধ ও শিল্পী নামের ৩টি নাটকের সংকলন এবং প্রথম নাট্যগ্রন্থ।
'আলেয়া' (গীতিনাট্য, ১৯৩১); 'পুতুলের বিয়ে' (কিশোর নাটক, ১৯৩৩); 'মধুমালা' (গীতিনাট্য, ১৯৫৯); 'ঝড়' (কিশোর কাব্যনাট্য, ১৯৬০); 'পিলে পটকা পুতুলের বিয়ে' (কিশোর কাব্যনাট্য, ১৯৬৪); 'জাগো সুন্দর' (নাটিকা)।
নজরুল রচিত প্রবন্ধগ্রন্থগুলোঃ
'রাজবন্দীর জবানবন্দী' (০৭/০১/১৯২৩): এটি তিনি জেলে বসে লেখেন। 'ধূমকেতু' পত্রিকায় 'আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা প্রকাশিত হলে তা নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। হুগলী জেলে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন শুরু করেন। এ অবস্থায় নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠান- 'Give up hunger strike, our literature claims you', কিন্তু ঠিকানা না থাকায় জেল কর্তৃপক্ষ সে চিঠি রবীন্দ্রনাথের নিকট ফেরত পাঠায়। এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বসন্ত' নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে তিনি ৩৯ দিন পর অনশন ভঙ্গ করেন। জেলে থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষ তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তা মাত্র ৪ পৃষ্ঠায় লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপন করেন, এটাকেই বলা হয় 'রাজবন্দীর জবানবন্দী'। এ প্রবন্ধে তিনি নিজেকে 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন- "শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট।” পরবর্তীতে তিনি জেল থেকে ১৫ অক্টোবর, ১৯২৩ সালে মুক্তি পান।
'যৌবনের গান': ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জে মুসলিম যুব সমাজ কাজী নজরুল ইসলামকে অভিনন্দন জানাতে গেলে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তারই পরিমার্জিত লিখিত রূপ 'যৌবনের গান'।
'যুগবাণী' (১৯২২): এ গ্রন্থের অন্তর্গত প্রবন্ধ 'ভাব ও কাজ', 'উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন'।
'রুদ্রমঙ্গল' (১৯২৭): রুদ্রমঙ্গল, আমার পথ, মোহরম, বিষ-বাণী, ক্ষুদিরামের মা, ধূমকেতুর পথ, মন্দির ও মসজিদ, হিন্দু-মুসলমান- নামে মোট ৮টি প্রবন্ধ এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ প্রবন্ধের বিখ্যাত উক্তি- 'আমার কর্ণধার আমি।
আমার পথ দেখাবে আমার সত্য।'
'দুর্দিনের যাত্রী' (১৯২৬), 'ধূমকেতু' (১৯৬১)।
নজরুলের সংগীতগ্রন্থসমূহঃ
'বুলবুল' (১ম খণ্ড-১৯২৮, ২য় খণ্ড-১৯৫২), 'চোখের চাতক' (১৯২৯), 'সন্ধ্যা' (১৯২৯), 'নজরুল গীতিকা' (১৯৩০), 'নজরুল স্বরলিপি' (১৯৩১), 'চন্দ্রবিন্দু' (১৯৩১), 'সুরসাকী' (১৯৩১), 'বনগীতি' (১৯৩১), 'জুলফিকার' (১৯৩২), 'গুলবাগিচা' (১৯৩৩), 'গানের মালা' (১৯৩৪), 'গীতি শতদল' (১৯৩৪), 'স্বরলিপি' (১৯৩৪), 'সুর-মুকুর' (১৯৩৪), 'রাঙা জবা' (শ্যামা সংগীত, ১৯৬৬)।
| মরুভাস্কর (প্রবন্ধ) | মো: ওয়াজেদ আলী |
| মরুভাস্কর (কাব্যগ্রন্থ) | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মরুশিখা (কাব্যগ্রন্থ) | যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত |
| মরুমায়া (কাব্যগ্রন্থ) | যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত |
| মরুসূর্য (কাব্যগ্রন্থ) | অ.ন.ম. বজলুর রশীদ |
| মরুচন্দ্রিকা (কাব্যগ্রন্থ) | কাজী কাদের নেওয়াজ |
| মরুকুসুম (উপন্যাস) | শাহাদৎ হোসেন |
| মরুদুলাল (গদ্যগ্রন্থ) | গোলাম মোস্তফা |
নজরুলের অনুবাদ গ্রন্থের নামঃ
'রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম': ইরানের জীবনবাদী কবি ওমর খৈয়ামের কবিতা অনুবাদ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ডিসেম্বর, ১৯৫৯ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এর ভূমিকা লেখেন।
'কাব্য আমপারা' (১৯৩৩): এ গ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলাম পবিত্র কুরআন শরীফের ৩৮টি সুরার অনুবাদ করে তা ছন্দে ছন্দে সাজিয়েছেন।
'দিওয়ানে হাফিজ' (১৯৩০), 'মক্তব সাহিত্য' (১৯৩৫)।
নজরুল পরিচালিত চলচ্চিত্রঃ
'ধূপছায়া' (১৯৩১)। নজরুল অভিনীত চলচ্চিত্র 'ধ্রুব'। কানাডায় নজরুলকে নিয়ে ফিলিপ স্পারেল 'নজরুল' নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
'আনন্দময়ীর আগমনে' (ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় ১৯২২ সালে) কবিতা প্রকাশিত হলে নজরুল গ্রেফতার হন ।
বাংলাদেশের রণসংগীতের রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম। তার রচিত "চল্ চল্ চল্, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল" বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গৃহীত।
নজরুল মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারান ১০ অক্টোবর, ১৯৪২ সালে। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে।
নজরুলকে বাংলাদেশে আনা হয় ২৪ মে, ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালের এইদিনে 'জাতীয় কবি' ঘোষণা করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামকে 'জাতীয় কবি' হিসেবে ঘোষণার গেজেট জারি করা হয় ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ সালে।
নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ সালে; মৃত্যুর ছয়মাস পূর্বে।
কাজী নজরুল ইসলাম এর পদকঃ
'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক'- ১৯৪৫ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), 'পদ্মভূষণ'- ১৯৬০ (ভারত সরকার), 'ডি.লিট'- ১৯৬৯ (রবীন্দ্রভারতী), 'ডি.লিট'- ১৯৭৪ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), 'একুশে পদক'- ১৯৭৬ (বাংলাদেশ সরকার)।
বিখ্যাত পঙক্তি
- কোন কালে একা হয়নি ক' জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়-লক্ষ্মী নারী। (নারী) - তবুও থামে না যৌবন বেগ, জীবনের উল্লাসে। (জীবন-বন্দনা)
- রমযানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ । (নজরুলগীতি)
- মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য । (বিদ্রোহী)
- আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!(বিদ্রোহী) - আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর ।
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর। (বিদ্রোহী) - আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস, আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ । (বিদ্রোহী)
- সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই । (নারী)
- গাহি সাম্যের গান, ধরণীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান। (জীবন বন্দনা)
- গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। (মানুষ)
- দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার। (কাণ্ডারী হুশিয়ার)
- কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা,
দাঁড়ী মুখে সারিগান- লা শরীক আল্লাহ । (খেয়াপারের তরণী) - দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে । (আমার কৈফিয়ৎ)
- ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান । (কাণ্ডারী হুশিয়ার) - হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ, খ্রীস্টের সম্মান কণ্টক-মুকুট শোভা। (দারিদ্র্য) - বউ কথা কও, বউ কথা কও, কও কথা অভিমানিনী,
সেধে সেধে কেঁদে কেঁদে যাবে কত যামিনী । (নজরুলগীতি) - নাচে পাপ-সিন্ধুতে তুঙ্গ তরঙ্গ! মৃত্যুর মহানিশা রুদ্র উলঙ্গ!
- নিঃশেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে, ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নিঃস্বে। (খেয়াপারের তরণী)
- বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। (নারী) - দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে । (কুলি-মজুর) - কাঁটা-কুঞ্জে বসি তুই গাঁথিবি মালিকা, দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টীকা। (দারিদ্র্য)
- চাষী ওরা, নয়কো চাষা, নয়কো ছোট লোক ।
- সাহেব কহেন, “চমৎকার! সে চমৎকার!”
মোসাহেব বলে, “চমৎকার সে হতেই হবে যে। (সাহেব ও মোসাহেব)
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বিবিসির জরিপে (২০০৪) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ২য় স্থান প্রাপ্ত নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা, সব্যসাচী লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ, গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের পথিকৃৎ। ১৯৩০ সালে জার্মানিতে আইনস্টাইনের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতে তিনি দর্শন, মানুষ ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারটি পিরালি ব্রাহ্মণ [বিধর্মীদের সংস্পর্শে এসে জাত হারানো ব্রাহ্মণরা হলেন পিরালি ব্রাহ্মণ]। (পারিবারিক উপাধি কুশারি)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ জগন্নাথ কুশারি পিরালি ব্রাহ্মণ মেয়ে বিয়ে করলে হিন্দু ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয় এবং সমাজচ্যুত করা হয়। তার ছেলে পঞ্চানন কুশারি ১৮ শতকের শুরুতে খুলনার দক্ষিণড়িতি থেকে কলকাতার গোবিন্দপুরে এসে জেলে পাড়ার পুরোহিতের কাজ করা শুরু করেন। ফলে অনেকে ঠাকুর বলে ডাকেন। এছাড়াও ইংরেজদের বাণিজ্য তরীতে দ্রব্য উঠা-নামার কাজ করলে ইংরেজরাও তাকে ঠাকুর বলে ডাকতেন। তারই উত্তর প্রজন্ম দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজনে কাছ থেকে অর্থের পাশাপাশি 'প্রিন্স' উপাধি লাভ করেন ক্রমান্বয়ে শত বছরের ব্যবধানে জেলে সম্প্রদায়ের পুরোহিত থেকে কলকাতার প্রভাবশালী পরিবারে পরিণত হয়।
ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার কালিগ্রাম নামক তিনটি জমিদারি ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুন পরিবারের। এর মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিগ্রাম জমিদারির দায়িত্ব পান। ১৩ জুন, ১৮৯১ সালে তিনি জমিদারি দেখাশোনার জন্য কালিগ্রামে প্রথম আসেন ২৭ জুলাই, ১৯৩৭ সালে তিনি শেষবার কালিগ্রামে আসেন এবং কালিগ্রাম ইউনিয়নের পতিসরে অবস্থিত তার পুত্রের নামে 'কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন' নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ মে, ১৮৬১ সালে (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয় ১৯৬১ সালে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ: প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর; পিতামহি: দিগম্বরী দেবী; পিতা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর; মাতা: সারদা দেবী। তিনি পিতা-মাতার ১৫জন সন্তানের মধ্যে ১৪তম সন্তান এবং ৮ম পুত্র। রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ফারসি কবি হাফিজ ও শেখ সাদীর অনুরাগী ছিলেন।
- তিনি ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ সালে ঠাকুরবাড়ীর অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ নাম রাখেন মৃণালিনী দেবী। স্ত্রী ভবতারিণী দেবী খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের মেয়ে।
- তিনি 'সাধনা' (১৮৯৪), 'ভারতী' (১৮৯৮), 'বঙ্গদর্শন' (১৯০১), 'তত্ত্ববোধিনী' (১৯১১) পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
- সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে তিনি বিহারীলাল চক্রবর্তীর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলি, উপনিষদ, দোঁহাবলি, লালনের বাউল গান ও রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত পদাবলির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
- তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য সংকলনের নাম 'সঞ্চয়িতা'।
- হিন্দু-মুসলমান মিলনের লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ 'রাখিবন্ধন' উৎসবের সূচনা করেন।
- ব্রিটিশ সরকার ৩ জুন, ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথকে 'নাইটহুড' বা 'স্যার' উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা বর্জন করেন।
- তিনি ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সালে (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছদ্মনাম:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট ৯টি ছদ্মনাম পাওয়া যায়। যথাঃ ভানুসিংহ ঠাকুর, অকপট চন্দ্র ভাস্কর, আন্নাকালী পাকড়াশী, ষষ্ঠীচরণ দেবশর্মা, বানীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ, শ্রীমতি কনিষ্ঠা, শ্রীমতি মধ্যমা, দিকশূন্য ভট্টাচার্য, নবীন কিশোর শর্মন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদক:
ডি. লিট- ১৯১৩ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট- ১৯৩৫ (কাশী বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট- ১৯৩৬ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট- ১৯৪০ (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপাধি:
গুরুদেব- মহাত্মা গান্ধী, কবিগুরু- ক্ষিতিমোহন সেন, বিশ্বকবি- ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়।
ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন (বোলপুরে)। পরবর্তীতে এটি ১৯২১ সালে 'বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়' এ রূপান্তরিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম প্রকাশিত রচনাবলি: | |
| প্রথম প্রকাশিত কবিতা | 'হিন্দু মেলার উপহার' (২৫/০২/১৮৭৪): তাঁর মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবিতাটি অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় [সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।] 'অভিলাষ' (১৮৭৪): এটি প্রকাশিত হয় 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় (সূত্র: বাংলাপিডিয়া)। তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। |
| প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ | 'কবি-কাহিনী' (১৮৭৮), এটি তাঁর ১৭ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যের কবিতাগুলি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। |
| প্রথম অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ | 'পৃথ্বীরাজের পরাজয়'। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাবার সাথে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানেই বীররসাত্মক এ কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যটি সম্পর্কে তাঁর 'জীবনস্মৃতি'তে বিস্তারিত পাওয়া যায়। |
| প্রথম প্রকাশিত কবিতার লাইন | মীনগণ দীন হয়ে ছিল সরোবরে / এখন তাহারা সুখে জলে ক্রীড়া করে। |
| প্রথম প্রকাশিত নাটক | 'বাল্মীকি প্রতিভা' (১৮৮১), এটি তাঁর গীতিনাট্য। অধিকাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত নাটক 'রূদ্রচণ্ড' (১৮৮১)। কিন্তু 'রূদ্রচণ্ড' নাটক নয়, নাটিকা। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেন। |
| প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস | 'বৌ-ঠাকুরাণীর হাট' (১৮৮৩), এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। উৎসর্গ করেন সৌদামিনী দেবীকে। |
| প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প | 'ভিখারিণী' (১৮৭৭) |
| প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ | 'বিবিধপ্রসঙ্গ' (১৮৮৩) |
| প্রথম প্রকাশিত রচনা সংকলন | 'চয়নিকা' (১৯০৯) |
| প্রথম সম্পাদিত পত্রিকা | 'সাধনা' (১৮৯৪) |
| সর্বশেষ প্রকাশিত ছোটগল্প | 'ল্যাবরেটরী' (১৯৪০) |
| সর্বশেষ রচিত গল্প | 'মুসলমানীর গল্প' |
বনফুল:
'বনফুল' (১৮৮০): এটি রবীন্দ্রনাথ রচিত প্রথম সম্পূর্ণ কাব্য। কিন্তু প্রকাশের দিক দিয়ে দ্বিতীয়। গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হওয়ার ৪ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে রচনা করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলি ১৮৭৬ সালেই 'জ্ঞানাঙ্কুর' ও 'প্রতিবিম্ব' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। তাই 'বনফুল'কে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলা যায় না। যদিও অনেকে এটিকে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলে থাকেন কিন্তু তা সঠিক নয়। ৮টি সর্গে বিভক্ত এ কাব্যের কবিতায় বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
- 'গীতাঞ্জলি' কাব্য ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় ।
- গীতাঞ্জলির অনুবাদ Song Offerings নামে ১৯১২ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি। তিনি ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে নোবেল পুরস্কার পান 'গীতাঞ্জলি'র ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings এর জন্য। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় এবং সাহিত্যে একমাত্র নোবেলজয়ী বাঙালি।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি হয়ে যায় শান্তি নিকেতন থেকে ২৪ মার্চ, ২০০৪ সালে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট কাব্যগ্রন্থ ৫৬টি।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট নাটক ২৯টি, কাব্যনাট্য ১৯টি।
- বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- রবীন্দ্রনাথের মোট ছোটগল্প ১১৯টি।
- রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ গ্রন্থঃ
'কালান্তর' (১৯৩৭): এটি ভারতবর্ষীয় রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন।
'পঞ্চভূত' (১৮৯৭): এ প্রবন্ধগুলি 'সাধনা' পত্রিকায় 'পঞ্চভূতের ডায়রি' নামে প্রকাশিত হতো। পত্রিকায় প্রকাশের সময় লেখকের নাম ছাপা হতো 'লেখক ভূতনাথ বাবু'।
'বিচিত্রপ্রবন্ধ' (১৯০৭): এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ 'লাইব্রেরি'। 'বিবিধ প্রসঙ্গ' (১৮৮৩), 'সাহিত্য' (১৯০৭), 'শিক্ষা' (১৯০৮), 'মানুষের ধর্ম - রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণকাহিনিঃ
'য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত ভ্রমণকাহিনি। এটি চলিত ভাষায় লিখিত।
'য়ুরোপ প্রবাসীর ডায়রি' (১৮৯১), 'জাভা যাত্রীর পর (১৯২৯), 'জাপান যাত্রী' (১৯১৯), 'রাশিয়ার চিটিং (১৯৩১), 'পারস্যে' (১৯৩৬)। - রবীন্দ্রনাথের ধ্বনিবিজ্ঞানের উপর লেখা গ্রন্থের নাম 'শব্দতত্ত্ব' (১৯০৯)।
- রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থের নাম 'বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭)। এটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন।
- রবীন্দ্রনাথের পত্র সংকলনগুলোঃ
'ছিন্নপত্র' (১৯১২): এতে মোট ১৫১টি পত্র আছে। এর প্রথম ৮টি পত্র শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে এবং ১৪৩টি স ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা।
'ভানুসিংহের পত্রাবলী': এটি রানু অধিকারীকে লেখেন।
'পথে ও পথের প্রান্তে': নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা । - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলাঃ
৭০ বছর বয়সের পর তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। তার অঙ্কিত ছবি ও স্কেচের সংখ্যা প্রায় ২০০০টি। নিজের আর ছবিগুলোকে তিনি 'শেষ বয়সের প্রিয়া' বলে আখ্যায়িত করেছেন। - রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নামঃ 'জীবনস্মৃতি' (১৯১২): এতে রবীন্দ্রনাথের বাল্যকাল থেকে পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। 'চরিত্রপূজা' (১৯০৭), 'ছেলেবেলা' (১৯৪০)।
- রবীন্দ্রনাথের সনেট জাতীয় রচনা বাংলার মাটি বাংলার জল।
- বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সমাজ ও সমকাল সচেতন প্রাবন্ধিক আবুল ফজল কথাশিল্পী হিসেবে প্রসিদ্ধ। স্বদেশপ্রীতি, অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা, সত্যনিষ্ঠা, মানবতা ও কল্যাণবোধ ইত্যাদি তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রতিপাদ্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথের গান পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী এই বক্তব্য উপস্থাপন করে পাকিস্তান সরকার ২২ জুন, ১৯৬৭ সালে রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন।
- আবুল ফজল ১ জুলাই, ১৯০৩ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি 'ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ' (১৯২৬) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং ১৯৩০ সালে এর সম্পাদক নিযুক্ত হন।
- 'ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর মুখপত্র 'শিখা'। এটি ১৯২৭ সালে আবুল হোসেনের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার স্লোগান ছিল- 'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব'। ১৯৩১ সালে তিনি 'শিখা'র ৫ম সংখ্যা সম্পাদনা করেন। তিনি ছিলেন 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের অন্যতম কর্ণধার।
- তিনি 'মুক্তবুদ্ধির চিরসজাগ প্রহরী' নামে খ্যাত।
- তিনি 'জাতির বিবেক' বলে স্বীকৃতি লাভ করেন।
- তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৭৩) এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা ছিলেন (১৯৭৫)।
- তিনি উপন্যাসে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২) ও 'রেখাচিত্র' গ্রন্থের জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬) পান।
- ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন।
- তিনি ৪ মে, ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে মারা যান।
আবুল ফজলের উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহঃ
উপন্যাস: ‘রাঙ্গা প্রভাত' (১৯৫৭): এটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘চৌচির’ (১৯৩৪), ‘প্রদীপ ও পতঙ্গ' (১৯৪০)।
গল্পগ্রন্থ : ‘মাটির পৃথিবী’ (১৯৪০), ‘মৃতের আত্মহত্যা' (১৯৭৮)।
নাটক : ‘কায়েদে আজম' (১৯৪৬), ‘প্রগতি' (১৯৪৮), ‘স্বয়ম্বরা (১৯৬৬)।
দিনলিপি: ‘রেখাচিত্র' (১৯৬৬), ‘লেখকের রোজনামচা' (১৯৬৯), ‘দুর্দিনের দিনলিপি' (১৯৭২)।
প্ৰবন্ধ: ‘বিচিত্র কথা” (১৯৪০), ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা' (১৯৬১), ‘সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন (১৯৬৫), ‘সমাজ সাহিত্য ও রাষ্ট্র' (১৯৬৮), ‘সমকালীন চিন্তা' (১৯৭০), ‘মানবতন্ত্র’ (১৯৭২), ‘সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ' (১৯৭৪), ‘শুভবুদ্ধি’ (১৯৭৪), ‘একুশ মানে মাথা নত না করা' (১৯৭৮), ‘রবীন্দ্র প্রসঙ্গ' (১৯৭৯)।
জীবনী ও স্মৃতিকথা: ‘সাংবাদিক মজিবর রহমান' (১৯৬৭), ‘শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি' (১৯৭৮)।
বিখ্যাত গল্প: চোর, বিবর্তন, প্রেম ও মৃত্যু, রহস্যময়ী প্রকৃতি ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আবদুল গাফফার চৌধুরী (১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪ – ১৯ মে ২০২২) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী গ্রন্থকার, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। তিনি ভাষা আন্দোলনের অমর গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”র রচয়িতা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের নিবন্ধিত স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক জয়বাংলার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তার জন্ম তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বাকেরগঞ্জ জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়ায় এক ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বংশে। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং ছাত্রাবস্থায়ই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। সাংবাদিকতায় তার কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক ইনসাফ দিয়ে; পরবর্তীতে দৈনিক সংবাদ, সওগাত, ইত্তেফাক, আজাদ, জেহাদ, পূর্বদেশসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় সম্পাদক ও কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় অবস্থান করে সাপ্তাহিক জয়বাংলা সম্পাদনা করেন এবং আনন্দবাজার, যুগান্তরে লেখালেখি করেন। স্বাধীনতার পর দৈনিক জনপদ প্রকাশ করেন এবং ১৯৭৪ সাল থেকে দীর্ঘ প্রবাসজীবনে থেকেও বাংলাদেশের প্রধান পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে যান। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ডানপিটে শওকত, কৃষ্ণপক্ষ, সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর, চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, বাংলাদেশ কথা কয়, আমরা বাংলাদেশী নাকি বাঙালি, ইতিহাসের রক্ত পলাশ। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০০৯), ইউনেস্কো পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০২২ সালের ১৯ মে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
বিবিসির জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ৮ম স্থান প্রাপ্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, গদ্যকার, মানবতাবাদ, কর্মবাদ ও ইহলৌকিক চিন্তা-চেতনার প্রতি আস্থাশীল একজন ক্ষণজন্মা বাঙালি। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে অর্থবহ করে তোলেন। বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার তিনিই।
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভগবতী দেবী।
- ঈশ্বরচন্দ্রের পারিবারিক উপাধি- ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ছদ্মনাম- কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য। তিনি 'ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা' নামে স্বাক্ষর করতেন।
- সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে সংস্কৃত কলেজ থেকে ১৮৩৯ সালে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি লাভ করেন।
- তিনি ২৯ ডিসেম্বর, ১৮৪১ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
- তার সম্পাদিত পত্রিকা 'সর্বশুভকরী' (১৮৫০)।
- তিনি বাংলা গদ্যে যতি বা বিরাম চিহ্নের প্রথম ব্যবহার করেন
- ২৯ জুলাই, ১৮৯১ সালে কলকাতায় মারা যান।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন । তিনি 'বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব' (১৮৫৫), 'বহুবিবাহ রহিয় হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার' (১৮৭১,৭৩) প্রভৃতি গ্রন্থের মাধ্যমে বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয়তা এবং বহুবিবাহর প্রথার অশাস্ত্রীয়তা প্রমাণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় 'বিধব বিবাহ আইন' পাশ হয় ২৬ জুলাই, ১৮৫৬ সালে। এ বছরই ৭ ডিসেম্বর প্রথম কলকাতায় বিধবা বিবাহ হয় সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সাথে কালীমতী দেবীর। তিনি এ বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। ১৮৭০ সালে তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সাথে ভবসুন্দরী দেবী নামে এক বিধবার বিবাহ দেন।
বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক গ্রন্থের নাম 'প্রভাবতী সম্ভাষণ' (১৮৬৩): এটি একটি শোঁকগাথা। বন্ধুর বালিকা কন্যা প্রভাবতীর মৃত্যুশোকে তিনি এটি রচনা করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থের নাম 'বেতালপঞ্চবিংশতি' (১৮৪৭): এটি তাঁর প্রথম মুদ্রিত এই এবং এটির প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা ঘটে। এটি হিন্দি ভাষায় লাল্লুজি রচিত 'বৈতাল পচ্চীসী' থেকে অনূদিত। এতে তিনি প্রথম যতি/বিরাম চিহ্নের সফল প্রয়োগ ঘটান।
শকুন্তলাঃ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কালিদাসের সংস্কৃত ভাষার 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম' নাটকটি অনূদিত করে রচনা করেন 'শকুন্তলা' (১৮৫৪)। এটি অনুবাদ গ্রন্থ হলেও বিদ্যাসাগর কাহিনি নির্মাণ ও ভাষা ব্যবহারে স্বাধীন মত গ্রহণ করে সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োগ করেন। চন্দ্রবংশীয় রাজা দুষ্মন্ত তপোবনে শিকারে এসে মহর্ষি বিশ্বামিত্রের কন্যা শকুন্তলার প্রণয়ী হন এবং বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজা চিহ্ন হিসেবে শকুন্তলাকে আংটি দিয়ে রাজ্যে ফিরে যান। শকুন্তলার গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, নাম রাখা হয় ভরত। রাজা রাজকার্যে ব্যস্ত থাকার কারণে শকুন্তলাকে ভুলে যান। পরবর্তীতে দৈব বাণীতে রাজা সব অবগত হয়ে বৃদ্ধ বয়সে ভরতকে রাজ্যশাসনের ভার অর্পণ করেন। গদ্যে রচিত এমন সরল কাহিনি তৎকালে ছিল বিরল, যা বাংলা গদ্যে সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে এক অসামান্য ভূমিকা পালন করে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুবাদ গ্রন্থগুলোর নামঃ
- 'জীবনচরিত' (১৮৪৯): এটি চেম্বার্সের বায়োগ্রাফির বঙ্গানুবাদ।
- 'শকুন্তলা' (১৮৫৪): এটি কালিদাসের সংস্কৃত ভাষার নাটক 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম' এর উপাখ্যান ভাগের বাংলা অনুবাদ।
- 'সীতার বনবাস' (১৮৬০): এটি ভবভূতির 'উত্তররামচরিত' নাটকের প্রথম অঙ্ক ও রামায়ণের উত্তর কাণ্ডের অনুবাদ।
- 'ভ্রান্তিবিলাস' (১৮৬৯): শেক্সপিয়রের 'Commedy of Errors' এর বাংলা রূপ।
- 'বাঙালার ইতিহাস' (১৮৭৮): গ্রন্থটি তিনি মার্সম্যানের 'History of Bengal' অবলম্বনে রচনা করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র রচিত শিশুদের জন্য পাঠ্য বই গুলোর নামঃ
- 'বর্ণপরিচয়' (১ম ও ২য় ভাগ- ১৮৫৫): এটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা লাভ করে।
- 'বোধোদয়' (১৮৫১): এটি চেম্বার্সের Rudiments of Knowledge অবলম্বনে রচিত।
- 'কথামালা' (১৮৫৬): এটি ঈশপের Fables অবলম্বনে রচিত।
- 'আখ্যানমঞ্জরী' (১৮৬৩): এ গ্রন্থের ২য় ভাগ 'প্রত্যুপকার'।
- 'ঝজুপাঠ' ১৮৫১), 'শব্দমঞ্জরী' (১৮৬৪), 'শ্লোকমঞ্জরী' (১৮৯০)।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৌলিক গ্রন্থগুলোর নামঃ
- 'আত্মচরিত' (১৮৯১): বাংলা গদ্যে প্রথম আত্মজীবনী। এতে বিদ্যাসাগরের শৈশব জীবনের কথা বিধৃত হয়েছে।
- 'সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব' (১৮৫৩): বাঙালির লেখা সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস।
- 'অতি অল্প হইল' (১৮৭৩): এটি 'কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য' ছদ্মনামে লেখেন।
- 'আবার অতি অল্প হইল' (১৮৭৩): এটি 'কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য' ছদ্মনামে লেখেন।
- 'ব্রজবিলাস' (১৮৮৫): এটি 'কবিকুল তিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য' ছদ্মনামে লেখেন।
- 'বিধবা বিবাহ ও যশোরের হিন্দু ধর্মরক্ষিণী সভা' (১৮৮৪): এটি তিনি 'কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণ' ছদ্মনামে রচনা করেন।
- 'রত্নপরীক্ষা' (১৮৮৬): এটি 'কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো সহচরস্য' ছদ্মনামে লেখেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ বিষয়ক গ্রন্থের নামঃ
'বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব' (১৮৫৫), 'বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার' (১৮৭১,৭৩)।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণ গ্রন্থের নামঃ
'সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা' (১৮৫১), 'ব্যাকরণ কৌমুদী' (১ম ভাগ ও ২য় ভাগ- ১৮৫৩, ৩য় ভাগ- ১৮৫৪, ৪র্থ ভাগ- ১৮৬২)।
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও পদার্থবিদ। শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর আয়োজিত 'কাগমারী সম্মেলন' এ সভাপতিত্ব করেন।
- কাজী মোতাহার হোসেন ৩০ জুলাই, ১৮৯৭ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস: বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বাগমারা গ্রাম।
- তিনি 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং এ সংগঠনের মুখপত্র 'শিখা' পত্রিকার ২য় ও ৩য় সংখ্যার সম্পাদক। সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
- তিনি 'বাংলা একাডেমি'র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
- তিনি ছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু।
- কাজী নজরুল ইসলাম তাকে আদর করে 'মোতিহার' নামে ডাকতেন।
- বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সনজীদা খাতুন তাঁর মেয়ে।
- ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক 'সিতারা-ই-ইমতিয়াজ', ১৯৬৬ সালে 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার', ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি, ১৯৭৯ সালে 'স্বাধীনতা পুরস্কার' লাভ করেন।
- ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে 'জাতীয় অধ্যাপক' হিসেবে সম্মানিত করে।
- তিনি ৯ অক্টোবর, ১৯৮১ সালে মারা যান।
কাজী মোতাহার হোসেন এর সাহিত্যকর্মসমূহঃ
প্রবন্ধ:
'সঞ্চয়ন' (১৯৩৭): এটি তাঁর প্রথম বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন।
'নজরুল কাব্য পরিচিতি' (১৯৫৫), 'সেই পথ লক্ষ্য করে' (১৯৫৮), 'সিম্পোজিয়াম' (১৯৬৫), ‘গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস’ (১৯৭০), 'আলোকবিজ্ঞান' (১৯৭৪), 'ভুলের মূল্য'।
কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩)
বাঙালি কবি, সমাজকর্মী ও নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায় ছিলেন ১৮৮৬ সালে সংস্কৃত ভাষায় স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা ব্যক্তিত্ব। তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে কবিতা লেখা আরম্ভ করেন। তাঁর কবিতাগুলোয় জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে।
কামিনী রায় ১২ অক্টোবর, ১৮৬৪ সালে বাসন্ডা, বাকেরগঞ্জ, বরিশালে (বর্তমানে এটি ঝালকাঠি জেলা) জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি 'জনৈক বঙ্গমহিলা' ছদ্মনামে লিখতেন।
- তিনি ১৯২৯ সালে 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ করেন।
- তিনি 'নারী শ্রম তদন্ত কমিশন' (১৯২২-২৩) এর সদস্য ছিলেন।
- তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সালে হাজারীবাগ, বিহারে মৃত্যুবরণ করেন।
কামিনী রায়ের কাব্যগ্রন্থগুলোঃ
'আলো ও ছায়া' (১৮৮৯): এটি তাঁর ১৫ বছর বয়সে রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যের ভূমিকা লেখেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'সুখ', 'পাছে লোকে কিছু বলে'। 'নির্মাল্য' (১৮৯১), 'পৌরাণিকী' (১৮৯৭), 'মাল্য ও নির্মাল্য' (১৯১৩), 'অশোক সঙ্গীত' (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), 'অম্বা' (নাট্যকাব্য, ১৯১৫), 'ঠাকুরমার চিঠি' (১৯২৪), 'দীপ ও ধূপ' (১৯২৯), 'জীবন পথে' (১৯৩০), 'একলব্য' 'দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন', 'শ্রাদ্ধিকী'।
কামিনী রায়ের কবিতাগুলোঃ
'মাতৃপূজা', 'দিন চলে যায়', 'পরার্থে', 'গুঞ্জন'। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত কবিতা: 'মহাশ্বেতা', 'পুণ্ডরীক'।
কামিনী রায়ের প্রবন্ধ গ্রন্থের নাম 'বালিকা শিক্ষার আদর্শ' (১৯১৮)।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী লেখিকা ও মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত। নারীদের কুসংস্কারমুক্ত ও শিক্ষিত করতে এবং সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
- রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- ১৮৯৭ সালে ১৬ বছর বয়সে উর্দুভাষী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বিপত্নীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তিনি রোকেয়া খাতুন এর সাথে স্বামীর নাম সাখাওয়াত হোসেন যোগ করেন এবং আর. এস হোসেন নামে লিখতেন।
- তিনি মুসলিম নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন তাই তাকে 'মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত' বলা হয়।
- ১৯০২ সালে তাঁর প্রথম গল্প 'পিপাসা' প্রকাশিত হয় 'নবপ্রভা' পত্রিকায়।
- তার নামানুসারে 'রোকেয়া হল' নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল আছে।
- ৩ মে, ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯১০ সালে কলকাতায় গমন করেন এবং নারী মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ১৬ মার্চ, ১৯১১ সালে 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' ও ১৯১৬ সালে 'আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম' (মুসলিম মহিলা সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি ৯ ডিসেম্বর, ১৯৩২ সালে মারা যান।
বেগম রোকেয়ার উপন্যাস দুটি 'পদ্মরাগ' (১৯২৪), 'Sultana's Dream'- এটি ইংরেজিতে লেখা।
সুলতানার স্বপ্নঃ
বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত 'সুলতানার স্বপ্ন' গ্রন্থটি ইংরেজি 'Sultana's Dream' শিরোনামে রচিত। এখানে মূল চরিত্র Sultana একজন অবরুদ্ধা নারী। গৃহের চতুষ্কোণ হচ্ছে তার বিচরণ ও কর্মক্ষেত্র, বাইরের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অধিকার তার ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখেন, তিনি তার বোন সারার মতো অপরিচিতা এক নারীর সাথে অন্তঃপুর ত্যাগ করে উন্মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে ফুল-বাগান দেখতে বের হয়েছেন যাকে স্বপ্নরাজ্য 'Lady Land' বলা হয়েছে। এ গ্রয়ে রোকেয়া একটি নারীবাদী স্বপ্নরাজ্য বা ইউটোপিয়ার বর্তনা দিয়েছেন। এ কল্পরাজ্যে সমাজের সকল কর্মকাণ্ডে নারীর হবেন প্রধান চালিকাশক্তি আর পুরুষরা হবেন গৃহবনী এখানে থাকবে না কোন অপরাধ, প্রচলিত থাকার 'ভালোবাসা ও সত্যের' ধর্ম।
বেগম রোকেয়ার গদ্যগ্রন্থসমূহঃ
'মতিচুর' (১ম খণ্ড- ১৯০৪, ২য় খণ্ড- ১৯২২ 'অবরোধবাসিনী' (১৯৩১)।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত প্রবন্ধ 'নিরীহ বাঙালি' 'চাষার দুক্ষু', 'অর্ধাঙ্গী'।
| পদ্মরাগ (উপন্যাস) | রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন |
| পদ্ম-গোখরো (গল্প) | কাজী নজরুল ইসলাম |
| পদ্মাবতী (নাটক) | মাইকেল মধুসূদন দত্ত |
| পদ্মাবতী (কাব্য) | আলাওল |
| পদ্মাবতী (সমালোচনামূলক) | সৈয়দ আলী আহসান |
| পদ্মানদীর মাঝি (উপন্যাস) | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় |
| পদ্মা মেঘনা যমুনা (উপন্যাস) | আবু জাফর শামসুদ্দীন |
কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০)
সমকালীন সমাজে কালীপ্রসন্ন সিংহ শিল্পসংস্কৃতির একজন মহান পৃষ্ঠপোষক, বিধবাবিবাহের একনিষ্ঠ প্রবক্তা, অনন্যসাধারণ রাজনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দীনবন্ধুর 'নীলদর্পণ' নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপার দায়ে প্রকাশক রেভারেন্ড জেমস লঙ্ নামক এক পাদ্রীকে বিচারালয়ে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ২৪ জুলাই, ১৮৬১ সালে কালীপ্রসন্ন সিংহ বিচারালয়ে উপস্থিত হয়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করে পরোক্ষভাবে এ নাটকে ব্যক্ত বক্তব্যকে সমর্থন করেন।
- কালীপ্রসন্ন সিংহ ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪০ সালে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত সিংহ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ২৪ জুলাই, ১৮৭০ সালে কলকাতায় মারা যান।
কালীপ্রসন্ন সিংহের সাহিত্যকর্মসমূহ:
'হুতোম প্যাঁচার নকশা' (১৮৬২): এটি রম্য রচনা। তাঁর রচনার রীতিকে 'হুতোমী বাংলা' বলে। এ উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র- দনুবানু।
'সংস্কৃত মহাভারতের গদ্য অনুবাদ' (১৮৬৬): এটি মহাভারতের আঠার পর্বের গদ্যাকারে অনুবাদ সম্পাদন করেন। অনুবাদটি মহারানি ভিক্টোরিয়াকে উৎসর্গ করেন।
নাটক: 'বাবু' (১৮৫৪- গ্রহসন), 'বিক্রমোবশী' (১৮৫৭-অনুবাদ নাটক) ‘সাবিত্রী সত্যবান’ (১৮৫৮), 'মালতীমাধব' (১৮৫৯- অনুবাদ নাটক)।
কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম:
'বিদ্যোৎসাহিনী সভা' (১৮৫৩) (বঙ্গভাষা অনুশীলনের জন তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেন], 'বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা' (১৮৫৫) 'বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চ' (১৮৫৬)।
মহাকবি কায়কোবাদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি। বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে তিনি মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনি নিয়ে 'মহাশ্মশান' মহাকাব্য রচনা করে দুঃসাহস দেখিয়েছেন, যা তাঁকে গৌরবময় আসনে অলংকৃত করে। তিনি বাংলা মহাকাব্য ধারার কবি হিসেবে খ্যাত।
- কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালে ঢাকার নবাবগঞ্জের আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি কায়কোবাদ। প্রকৃত নাম মুহম্মদ কাজেম আল কুরায়শী। [সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।
- তিনি বাঙালি মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম মহাকাব্য ও সনেট রচয়িতা। তাঁর কাব্য প্রতিভায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের প্রভাব ছিল।
- তিনি ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
- বাংলা কাব্য সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে 'কাব্যভূষণ', 'বিদ্যাভূষণ', 'সাহিত্যরত্ন' উপাধি প্রদান করেন।
- তিনি ২১ জুলাই, ১৯৫১ সালে ঢাকায় মারা যান।
কায়কোবাদের মহাকাব্যের নাম 'মহাশ্মশান' (১৯০৪): এটি পানিপথের ৩য় যুদ্ধের কাহিনি (১৭৬১) অবলম্বনে রচিত।
মহাশ্মশান:
কায়কোবাদের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য 'মহাশ্মশান' (১৯০৪)। [অধিকাংশ বইয়ে 'মহাশ্মশান' এর প্রকাশসাল দেওয়া হয়েছে ১৯০৫, কিন্তু এটি হবে ১৯০৪ সাল। মোহাম্মদ রওশন আলী সম্পাদিত 'কোহিনূর' পত্রিকায় মহাকাব্যটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটি পানিপথের ৩য় যুদ্ধের কাহিনি (১৭৬১) অবলম্বনে রচিত। এ মহাকাব্য ৮৭০ পৃষ্ঠায় তিন খণ্ডে মোট ৬০টি সর্গে বিভক্ত। পানিপথের এ যুদ্ধে মারাঠাদের সাথে রোহিলা-অধিপতি নজিব-উদ্-দৌলা'র শক্তি পরীক্ষা হয়। কবির দৃষ্টিতে এটি উভয়ের শক্তিক্ষয় ও ধ্বংস, এজন্য তিনি একে 'মহাশ্মশান' বলেছেন। এ কাব্যে ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক দুই ধরনের চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। প্রশিক্ষিত মুসলিম যোদ্ধা ইব্রাহীম কার্দি মুসলিম শিবিরে চাকরি না পেয়ে মারাঠা কর্তৃক চাকরি পায় এবং সমাদৃত হয়। যুদ্ধ শুরু হলে ইব্রাহীম কার্দির স্ত্রী জোহরা মন্ত্রবেগ ছদ্মনাম ধারণ করে এসে স্বামীকে মুসলিম শিবিরে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করে। ইব্রাহীম কার্দি বিশ্বাসঘাতকতা না করে মারাঠাদের জন্য যুদ্ধে জীবন দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নায়ক ইব্রাহীম কার্দির মৃত্যু কাব্যটিকে ট্র্যাজিক করে তোলে। মুনীর চৌধুরীর 'রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকের কাহিনিও পানিপথের ৩য় যুদ্ধ। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: ইব্রাহীম কার্দি, জোহরা।
কায়কোবাদের কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম:
- 'বিরহবিলাপ' (১৮৭০): এটি কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ যা মাত্র বার বছর বয়সে রচনা করেন এবং তের বছর বয়সে প্রকাশিত হয়।
- 'অশ্রুমালা (১৮৯৫): এটি গীতিকাব্য। এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'প্রার্থনা'।
- 'মহরম শরীফ' (১৯৩২): এটি মহাকাব্যোচিত বড় আকারের একটি কাহিনিকাব্য।
- 'অমিয়ধারা' (১৯২৩): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'সুখ'।
- 'কুসুমকানন' (১৮৭৩), 'শিবমন্দির' (১৯২১), 'শ্মশানভস্ম' (১৯৩৮)।
- কায়কোবাদের বিখ্যাত কবিতা 'আযান'।
কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
'প্রেমের ফুল' (১৯৭০), 'প্রেমের বাণী' (১৯৭০), 'প্রেম পারিজাত' (১৯৭০), 'মন্দাকিনী ধারা (১৯৭১), 'গওস পাকের প্রেমের কুঞ্জ' (১৯৭৯)।
জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬)
সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সমর্থক, বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এর কবি প্রতিভার প্রকাশ ঘটে ছাত্রাবস্থায়। তাঁর রচিত কাব্যগুলোতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র যে কুশলতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে তাতে আধুনিক শিল্প-চেতনার ছাপ সুস্পষ্ট। বাংলার গ্রামীণ জীবনের আবহ, সহজ-সরল প্রাকৃতিক রূপ উপযুক্ত শব্দ, উপমা ও চিত্রের মাধ্যমে তাঁর কাব্যে এক অনন্যসাধারণ মাত্রায় মূর্ত হয়ে উঠে। ষাটের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধের পদক্ষেপ নিলে তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন।
- জসীমউদ্দীন ১ জানুয়ারি, ১৯০৩ সালে ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- ফরিদপুরের গোবিন্দপুর (বর্তমান- আম্বিকাপুর)।
- প্রকৃত নাম: মোহাম্মদ জসীম উদদীন মোল্লা। ছদ্মনাম: জমীরউদ্দিন মোল্লা।
- ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর জামাতা।
- ১৯২১ সালে 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় 'মিলন গান' কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা।
- বাংলা একাডেমি ২০১৯ সাল থেকে 'কবি জসীমউদদীন সাহিত্য পুরস্কার' প্রদান করে। প্রথম এ পুরস্কার পান কবি নির্মলেন্দু গুণ।
- তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি ডি.লিট (১৯৬৯) ও একুশে পদক (১৯৭৬) পান।
- তিনি ১৩ মার্চ, ১৯৭৬ সালে মারা যান। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে ১৪ মার্চ ফরিদপুরের আম্বিকাপুরে দাদীর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
কর্মপরিধিঃ
জসীমউদ্দীনকে পল্লীকবি বলা হয় । তিনি এম.এ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ড. দীনেশচন্দ্ৰ সেনের আনুকূল্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লীগীতি সংগ্রাহক পদে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ১৯৩১-১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে চাকরি করেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে প্রচার বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টরের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কবি জসীমউদ্দীন হল' আছে।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম 'মিলন গান' (১৯২১): এটি 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'রাখালী' (১৯২৭): এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যের ১৮টি কবিতার মধ্যে অন্যতম কবিতা 'কবর'। এটি কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জসীমউদ্দীন কলেজে অধ্যয়নকালে 'কবর' কবিতা রচনা করে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। যা তাঁর ছাত্রাবস্থায় ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
'নক্সীকাঁথার মাঠ' (১৯২৯): এটি কবির শ্রেষ্ঠ কাহিনিকাব্য/গাথাকাব্য। এ গ্রন্থের প্রথম অংশে আছে চাষার ছেলে রূপাই ও পাশের গ্রামের মেয়ে সাজুর প্রথম পরিচয় থেকে অনুরাগের বিকাশ ও বিবাহ এবং কয়েক মাসের সুখময় জীবনের গল্প এবং দ্বিতীয় ভাগে তাদের বিচ্ছেদ। গ্রামীণ জীবনের মাধুর্য ও কারুণ্য, বৈচিত্র্যহীন ক্লান্তিকরতা এবং মানুষের অসহায়তা এ কাব্যের উপকরণ। ১৯২৮ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার শিলাসী গ্রামে জসীমউদ্দীন ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করতে আসলে রূপাই নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। এ ব্যক্তির বাস্তব জীবনীকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেন 'নক্সীকাঁথার মাঠ'। চরিত্র: সাজু, রুপাই। E. M Milford এটিকে Field of the Embroidery Quilt নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।
'বালুচর' (১৯৩০): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'প্রতিদান' ।
'ধানখেত' (১৯৩৩): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'যাব আমি তোমার দেশে'।
'সোজন বাদিয়ার ঘাট' (১৯৩৪): এ কাহিনিকাব্য/ গাথাকাব্যটি ইউনেস্কোর উদ্যোগে 'Gypsy Wharf (১৯৬৯) নামে অনূদিত হয়। চরিত্র: সোজন, দুলী।
'এক পয়সার বাঁশি' (১৯৫৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'আসমানী'। আসমানী একটি বাস্তব চরিত্র। ফরিদপুর সদরের ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে জসীমউদ্দীনের বড় ভাই রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে তিনি আসমানীর দেখা পান এবং সেখানেই বসে তিনি 'আসমানী' কবিতাটি রচনা করেন। ৯৭ বছর বয়সে ১৮ আগস্ট, ২০১২ সালে আসমানী মারা যান।
'সূচয়নী' (১৯৬১): এটি তাঁর নির্বাচিত কবিতার সংকলন।
'রূপবতী' (১৯৪৬), 'মা যে জননী কান্দে' (১৯৬৩), 'মাটির কান্না' (১৯৫৮), 'সকিনা' (১৯৫৯)।
তাঁর নাটকসমূহঃ
'বেদের মেয়ে' (১৯৫১): এটি গীতিনাট্য।
'পদ্মাপাড়' (১৯৫০), 'মধুমালা' (১৯৫১), ‘পল্লীবধূ’ (১৯৫৬), 'গ্রামের মায়া' (১৯৫৯), বাঁশের বাঁশি।
তাঁর ভ্রমণকাহিনিসমূহঃ
‘চলে মুসাফির' (১৯৫২), ‘‘হলদে পরীর দেশ” (১৯৬৭), ‘যে দেশে মানুষ বড়' (১৯৬৮), 'জার্মানির শহরে ও বন্দরে’ (১৯৭৬)।
জসীমউদ্দীনের অন্যান্য রচনাবলিঃ
উপন্যাস:
‘ বোবাকাহিনি ' (১৯৬৪): এ উপন্যাসে মহাজনী শোষণের কারণে গ্রামের প্রান্তিক চাষি আজহারের ভূমিহীন হওয়া, শহরের সুবিধাবাদী উকিল ও ভণ্ড ধার্মিক কর্তৃক মেধাবী বছির নিগ্রহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত। চরিত্র: বছির, আজহার, আরজান, রহিমুদ্দিন।
‘বউটুবানির ফুল’ (১৯৯০): এটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত উপন্যাস ।
শিশুতোষ গ্রন্থ: ‘হাসু' (১৯৩৮), ‘এক পয়সার বাঁশী' (১৯৪৯), ‘ডালিমকুমার' (১৯৫১)।
আত্মজীবনী : ‘জীবনকথা' (১৯৬৪)।
স্মৃতিকথা : ‘যাদের দেখেছি' (১৯৫২), ‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়' (১৯৬১)।
গল্পগ্রন্থ: ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প' (১ম খণ্ড- ১৯৬০, ২য় খণ্ড-১৯৬৪)। এ গ্রন্থটি ইউনেস্কোর উদ্যোগে ‘Folk Tales of Bangladesh' নামে অনূদিত হয়।
গানের সংকলন: ‘রঙ্গিলা নায়ের মাঝি' (১৯৩৫), ‘গাঙ্গের পাড়’ (১৯৬৪), ‘জারিগান' (১৯৬৮)।
| মধুমালা (নাটক) | মধুমালা (নাটক) |
| মধুমালা (নাটক) | কাজী নজরুল ইসলাম |
বিখ্যাত কবিতা:
‘কবর’: এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল' পত্রিকায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এ কবিতাটিতে ১১৮টি পঙ্ক্তি আছে। প্রিয়জন হারানোর মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ ‘কবর’ কবিতার মূল বিষয়।
‘আসমানী’: কবিতাটি ‘এক পয়সার বাঁশি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবির বড় ভাই রাজেন্দ্র সরকারি কলেজের অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদের শ্বশুরবাড়ি ছিল বর্তমান ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে। সেখানে কবি বেড়াতে গিয়ে আসমানীর দেখা পান এবং সেখানে বসেই তিনি ‘আসমানী' কবিতাটি রচনা করেন। ৯৭ বছর বয়সে আসমানী মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট, ২০১২ সালে ।
‘রাখাল ছেলে’ (রাখালী), ‘ নিমন্ত্রণ ' (ধানক্ষেত), ‘ মুসাফির ’ (বালুচর), ‘চাষার ছেলে’ , ‘পল্লীজননী’।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২)
প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ছিলেন ভাষাসৈনিক। তিনি প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর রচিত সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে ও সামরিক জান্তার গণহত্যার চিত্র চিত্রিত করা হয় এবং জনগণকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
- জহির রায়হান ১৯ আগস্ট, ১৯৩৫ সালে ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর প্রকৃত নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ডাকনাম- জাফর।
- শহীদুল্লা কায়সার তাঁর ভাই। চিত্রনায়িকা কোহিনুর আক্তার সুচন্দা তার স্ত্রী।
- জহির রায়হান ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন।
- ছাত্রজীবনে তিনি সাহিত্য মাসিক 'প্রবাহ' (১৯৫৬) এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক 'এক্সপ্রেস' পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনার সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও ১৯৫০ সালে 'যুগের আলো' পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন।
- ১৯৫১-৫৭ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এ সময় কমরেড মনি সিংহের দেয়া রাজনৈতিক নাম 'রায়হান' গ্রহণ করেন।
- ১৯৫৬ সালে 'জাগো হুয়া সাবেরা' ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার- ১৯৭২ (মরণোত্তর) পান।
- তিনি ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে মিরপুরে গিয়ে নিজেই নিখোঁজ হন। তাঁর লাশও পাওয়া যায়নি।
তাঁর উপন্যাসসমূহঃ
'শেষ বিকেলের মেয়ে' (১৯৬০): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এটি 'সাপ্তাহিক বিজলী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
'হাজার বছর ধরে' (১৯৬৪): আবহমান বাংলার জীবন ও জনপদ এর প্রতিপাদ্য। তিনি এ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করেন। জহির রায়হানের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার সুচন্দা এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার' লাভকরেন। চরিত্র: টুনি, মন্ত্র, মকবুল।
'আরেক ফাল্গুন' (১৯৬৯): ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ হয়ে ১৯৫৫ সালে বর্তমান শহিদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন পর্যন্ত চলমান আন্দোলন, জনতার সম্মিলন, ছাত্র/ছাত্রীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, তাদের প্রেম-প্রণয় ইত্যাদি এ উপন্যাসের মূল বিষয়। এটি ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস।
'আর কত দিন' (১৯৭০): মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ের অস্থির সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনমুখর প্রেক্ষাপটে আসন্ন যুদ্ধের একটি ভয়াবহ সম্ভাবনা, যুদ্ধকালীন বাস্তবতা, লাঞ্ছিত মানবতার আর্তি, শান্তি ও ভালোবাসার জন্য মানুষের চিরন্তন অন্বেষা এ উপন্যাসের মূল উপজীব্য। ইভা ও তপু এ উপন্যাসের শাশ্বত শান্তি ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক।
'একুশে ফেব্রুয়ারি' (১৯৯২): এটি ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস। জহির রায়হান ১৯৭০ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, সে উদ্দেশ্যকেই মূর্ত করে রচনা করেন এ উপন্যাসের কাহিনি। কিন্তু তিনি 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট যোগ করলে, পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে এটি উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়।
'তৃষ্ণা' (১৯৬২), 'বরফ গলা নদী' (১৯৬৯), 'কয়েকটি মৃত্যু' (১৯৬৫)
তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোঃ
'কখনো আসেনি' (১৯৬১): এটি তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র '
সঙ্গম' (১৯৬৪): এটি বাংলাদেশের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০): এটি ভাষা আন্দোলনভিত্তির চলচ্চিত্র। প্রথম এই চলচ্চিত্রেই জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
'কাঁচের দেয়াল' (১৯৬৩): এটি নিগার পুরস্কার লাভ করে ।
'বাহানা' (১৯৬৫): এটি ছিল উর্দু ভাষায় নির্মিত এক তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি।
'সোনার কাজল' (১৯৬২), 'বেহুলা' (১৯৬৬), 'আনোয়ারা' (১৯৬৭)।
Stop Genocideঃ
বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রামাণ্যচিত্র। এটি ১৯৭১ সালে জহির রায়হান কলকাতা থেকে তৈরি করেন।
তাঁর গল্পগ্রন্থটির নামঃ
'সূর্যগ্রহণ' (১৯৫৫)।
তাঁর রচিত গল্পসমূহঃ
'সূর্যগ্রহণ': বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত তসলিম নামক যুবকের পরিবারের মর্মবিদারক কাহিনি নিয়ে রচিত ।
'বাঁধ': গ্রামীণ পটভূমিতে পীরদের ভণ্ডামি নিয়ে রচিত।
| শেষ সপ্তক (কাব্যগ্রন্থ) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| শেষ লেখা (কাব্যগ্রন্থ) | |
| শেষের কবিতা (উপন্যাস) | |
| শেষরক্ষা (প্রহসন) | |
| শেষকথা (ছোটগল্প) | |
| শেষ প্রশ্ন (উপন্যাস) | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
| শেষের পরিচয় (উপন্যাস) | |
| শেষ বিকেলের মেয়ে (উপন্যাস) | জহির রায়হান |
শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আগামী সৈনিক 'শহিদ জননী' জাহানারা ইমাম ছিলেন একাত্তরের ঘাতক-দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সফল গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রুমী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং নির্মম নির্যাতনের ফলে মৃত্যুবরণ করেন। রুমীর শহিদ হওয়ার সূত্রেই তিনি 'শহিদ জননী'র মর্যাদায় ভূষিত হন।
- জাহানারা ইমাম (ডাকনাম: জুড় ৩ মে, ১৯২৯ সালে ভারতের পশ্চিবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বড়ঞ্চা থানার অন্তর্গত সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর স্বামী প্রখ্যাত স্থপতি শরিফুল আলম ইমামও মুক্তিযুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেন।
- তাঁর নেতৃত্বে ১৯ জানুয়ারি, ১৯৯২ সালে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট 'একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি' গঠিত হয়।
- তিনি ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২ সালে ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি'র আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
- তিনি 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার' (১৯৯১), 'স্বাধীনতা পুরস্কার' (১৯৯৭), 'রোকেয়া পদক' (১৯৯৮) লাভ করেন।
- তিনি ২৬ জুন, ১৯৯৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ডেট্রয়েট, মিশিগান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন। ৫ জুলাই, মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থগুলোঃ
'একাত্তরের দিনগুলি' (১৯৮৬): বইটি ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ডায়েরি আকারে লেখা, যার শুরু ১ মার্চ, ১৯৭১ সাল থেকে ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এ দিনলিপি বা ডায়েরিই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সালে 'একাত্তরের দিনগুলি' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকা শহরের অবস্থা ও গেরিলা তৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে।
'বীরশ্রেষ্ঠ' (১৯৮৫)।
তাঁর রচিত শিশুতোষ গ্রন্থগুলোঃ
'গজকচ্ছপ' (১৯৬৭), 'সাতটি তারার ঝিকিমিকি' (১৯৭৩), 'বিদায় দে মা ঘুরে আসি' (১৯৮৯)।
তাঁর অনুবাদ গ্রন্থগুলোঃ
'জাগ্রত ধরিত্রী' (১৯৬৮), 'নদীর তীরে ফুলের মেলা' (১৯৬৬), 'তেপান্তরের ছোট্ট শহর' (১৯৭১)।
তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থগুলোঃ
'বুকের ভিতর আগুন' (১৯৯০): মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস।
'অন্য জীবন' (১৯৮৫), 'জীবন মৃত্যু', (১৯৮৮), 'শেক্সপীয়রের ট্রাজেডি' (১৯৮৯), 'চিরায়ত সাহিত্য' (১৯৮৯), 'নাটকের অবসান' (১৯৯০), 'নিঃসঙ্গ পাইন' (১৯৯০), 'দুই মেরু' (১৯৯০), 'নয় এ মধুর খেলা' (১৯৯০), 'ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস' (১৯৯১), প্রবাসের দিনগুলি (১৯৯২), 'বাংলা উচ্চারণ অভিধান' (১৩৭৫)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)
তিরিশের দশকের তথাকথিত জনবিচ্ছিন্ন, রবীন্দ্র বলয় ছিন্নকারী ও উত্তরকালের কবিদের উপর সর্বাপেক্ষা প্রভাববিস্তারকারী কবি জীবনানন্দ দাশগুপ্ত। তাঁর রচনায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় প্রকৃতি কাব্যময় হয়ে উঠেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনের হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ ও সংশয়ের চিত্র তাঁর কবিতায় দীপ্যমান। সাধু ও চলিত ভাষার মিশেল হলো তাঁর কাব্য ভাষার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বিশ শতকের ষাটের দশকের বাঙালির জাতিসত্ত্বা আন্দোলনে ও ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নিসর্গবিষয়ক কবিতা এদেশের সংগ্রামী জনতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
- জীবনানন্দ দাশ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ সালে বরিশালের এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। (আদি নিবাস: গাঁওপাড়া গ্রাম, বিক্রমপুর)। ডাকনাম- মিলু।
- তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ (একজন মহিলা কবি)।
- ১৯১৯ সালে ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তাঁর প্রথম কবিতা 'বর্ষা আবাহন' প্রকাশিত হয়।
- তিনি ১৯৪৭ সালে 'দৈনিক স্বরাজ' পত্রিকার সাহিত বিভাগের সম্পাদক ছিলেন।
- তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি লাভ করেন।
- ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামে একটি কবিতা লেখেন। এটি 'বঙ্গবাণী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
- তিনি ১৪ অক্টোবর, ১৯৫৪ সালে বালিগঞ্জে ট্রামের দিতে পড়ে আহত হন, পরে ২২ অক্টোবর শম্ভুগঞ্জ পৃষ্ঠা হাসপাতালে মারা যান।
জীবনানন্দ দাশকে রূপসী বাংলার কবি, ধূসরতার কবি, তিমির হননের কবি, নির্জনতার কবি, চিত্ররূপময় কবি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র কবিতা পাঠ করে বলেছেন 'চিত্ররূপময় কবিতা'; বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে দাশকে 'নির্জনতম কবি' এবং অন্নদাশঙ্কর রায় 'শুদ্ধতম কবি' বলে আখ্যায়িত করেন।
জীবনানন্দ দাশের ওপর গবেষণা করেন ক্লিনটন বি. সিলি।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থগুলো:
'ঝরাপালক' (১৯২৭; বাংলা: ১৩৩৪): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্য। এ কাব্য রচনায় তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে অনুকরণ করেছেন। এ কাব্যের মাধ্যমে নামের শেষে 'দাশগুপ্ত' এর পরিবর্তে 'দাশ' ব্যবহার করেন। এ কাব্যগ্রন্থে মোট ৩৫টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত আছে।
'ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'মৃত্যুর আগে'। এটি বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়। এ কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেব বসুকে লেখা এক চিঠিতে 'চিত্ররূপময়' বলে মন্তব্য করেন। কবিতাটির সাথে W. B Yeats এর The Falling of the Leaves's কবিতার মিল আছে।
'বনলতা সেন' (১৯৪২): ৩০টি কবিতার সমন্বয়ে রচিত এ কাব্য। ভারতীয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত বিষয় যেমন বিদিশা, শ্রাবস্তী উঠে এসেছে, তেমনি বেতের ফলের মতো বা পাখির নীড়ের মতো চোখ ইত্যাদি উপমাগুলোর সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন এ কাব্যে। প্রেম ও প্রকৃতি, খণ্ড জীবন ও হতাশা, ক্লান্তি ও অবসাদ, ইতিহাসের বিশাল অনুভূতি ও বর্তমানের ছিন্নভিন্ন অস্তিত্ব, সব কিছুর সমাহার ঘটিয়েছেন তিনি এ কাব্যে। এ কাব্যের 'বনলতা সেন' কবিতাটি তিনি এডগার এলেন পোর 'টু হেলেন' কবিতার অনুকরণে রচনা করেন। এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা: আমি যদি হতাম, হায় চিল, শঙ্খমালা, শিকার, সুদর্শনা, সুরঞ্জনা, সুচেতনা প্রভৃতি।
'রূপসী বাংলা' (১৯৫৭): কবির মৃত্যুর পর এ কাব্যের পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়। তিনি এ গ্রন্থটির প্রচ্ছদে নাম রেখেছিলেন 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা'। কিন্তু ১৯৫৭ সালে প্রকাশের সময় এর নামকরণ করা হয় 'রূপসী বাংলা'। কবির ছোটবোন সুচরিতা দাশের সহায়তায় লেখার খাতা থেকে প্রেসকপি তৈরি করেছিলেন কবি ভূমেন্দ্র গুহ। ৬২টি কবিতা সম্বলিত এ কাব্যের বিষয় বাংলার গ্রাম, প্রকৃতি, নদী-নালা, পশু-পাখি, উৎসব ও অনুষ্ঠান। কবিতাগুলো সনেট আকারে লিখিত হলেও কবি তাঁর প্রিয় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এটি তাঁর স্বদেশপ্রীতি ও নিসর্গময়তার পরিচায়ক কাব্য। এ কাব্যের অন্যতম কবিতা 'এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে'। এ কাব্যের অন্তর্গত 'আবার আসিব ফিরে' কবিতা ।
'মহাপৃথিবী' (১৯৪৪), 'সাতটি তারার তিমির' (১৯৪৮), 'বেলা অবেলা কালবেলা' (১৯৬১)।
জীবনানন্দ দাশের উপন্যাসসমূহঃ
'মাল্যবান' (১৯৭৩): উপন্যাসটি কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। দাম্পত্য জীবনের নিষ্ঠুর কাহিনি, সম্পর্কের জটিলতা, পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাবোধের এক নিষ্ঠুর উপাখ্যানকে ঘিরে এ উপন্যাস রচিত।
'সুতীর্থ' (১৯৭৪), 'কল্যাণী' (১৯৯৯)। [সবকটি উপন্যাস কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত]
জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধঃ
'কবিতার কথা' (১৯৫৫): এ প্রবন্ধের বিখ্যাত উক্তি, 'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।'
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ঝরাপালক
বনফুল
পূরবী
শ্যামলী
মহাপৃথিবী
উত্তর ফাল্গুনী
ঝরাপালক
বনলতা সেন
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩)
প্রখ্যাত কবি, গীতিকার ও সুরকার এবং বিশেষভাবে নাট্যকার হিসেবে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। রবীন্দ্র যুগের হয়েও তিনি তাঁর কবিতায় নতুন আঙ্গিক ও ছন্দে এবং ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মকভাবে মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (ডি.এল রায়) নদীয়ার কৃষ্ণনগরে ১৯ জুলাই, ১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান 'পূর্ণিমা সম্মিলন' (১৯০৫) এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং 'ইভনিং ক্লাব' নামে অপর একটি সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন।
- বাংলা সাহিত্যে প্যারোডি রচনার পথিকৃৎ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।
- তিনি বাংলা সমবেত কণ্ঠসংগীতের প্রবর্তক।
- তিনি বাংলা নাটকে সার্থক দ্বন্দ্বমূলক চরিত্র সৃষ্টির প্রথম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
- তিনি ১৭ মে, ১৯১৩ সালে মারা যান।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রথম প্রকাশিত কাব্যের নাম 'আর্যগাথা' (১৮৮২): এটি তাঁর ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয়।
| মেবার পতন (নাটক) | দ্বিজেন্দ্রলাল রায় |
| মেবার রাজ (উপন্যাস) | স্বর্ণকুমারী দেবী |
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাব্যগ্রন্থগুলো:
'আর্যগাথা' (১ম ভাগ- ১৮৮২, ২য় ভাগ- ১৮৯৩)।
Lyrics of Ind (১৮৮৬): এটি ইংরেজিতে রচিত। 'মন্দ্র' (১৯০২), 'আলেখ্য' (১৯০৭), 'ত্রিবেণী' (১৯১২)।
ব্যঙ্গকবিতা: 'আষাঢ়ে' (১৮৯৯), 'হাসির গান' (১৯০০)।
ডি এল রায়ের নাটকগুলো:
ঐতিহাসিক নাটক:
'সাজাহান' (১৯০৯): সম্রাট শাজাহানের ওপর রচিত প্রথম নাটক। তিনিই প্রথম শাহজাহানকে নিয়ে নাটক লেখেন। 'ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা / তাহার মাঝে আছে দেশ এক- সকল দেশের সেরা; ও সে, স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা; / এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি / সকল দেশের রাণী সে যে-আমার জন্মভূমি।'- গানটি এ নাটকের। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঐতিহাসিক নাটক।/১৩তম বিসিএস লিখিত।
'চন্দ্রগুপ্ত' (১৯১১): গ্রিক ও ভারতীয় সম্পর্কের একটি বিশেষ মুহূর্তই এ নাটকের পটভূমি।
'প্রতাপসিংহ' (১৯০৫), 'দুর্গাদাস' (১৯০৬), 'নূরজাহান' (১৯০৮), 'মেবারপতন' (১৯০৮), 'তারাবাঈ' (১৯০৩), 'সিংহল বিজয়' (১৯১৬), 'তাপসী'।
রোমান্টিক ও পৌরাণিক নাটক: 'সীতা' (১৯০২), 'ভীষ্ম' (১৯১৪), 'সোহরাব-রুস্তম' (১৯০৮)।
কাব্যনাট্য: 'পাষাণী' (১৯০০)।
সামাজিক নাটক: 'পরপারে' (১৯১২), 'বঙ্গনারী' (১৯১৬)।
নকশা ও প্রহসন: 'কল্কি অবতার' (১৮৯৫), 'বিরহ' (১৮৯৭), 'একঘরে' (১৮৯৯), 'এ্যহস্পর্শ' (১৯০০), 'প্রায়শ্চিত্ত' (১৯০২), 'পূনর্জন্ম' (১৯১১), 'আনন্দ বিদায়' (১৯১২)।

সুকুমার রায় (৩০ অক্টোবর ১৮৮৭ – ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩)
সুকুমার রায় ছিলেন বাঙালি শিশুসাহিত্যিক, ননসেন্স ছড়ার প্রবর্তক, লেখক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার এবং সম্পাদক। তিনি জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পুত্র এবং খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পিতা।
জন্ম ও পরিবার:
কলকাতার দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ বংশীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: উপেন্দ্রকিশোর রায়, মাতা: বিধুমুখী দেবী। দুই ভাই: সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায়; তিন বোন: সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা।
শিক্ষাজীবন:
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামে, পরে কলকাতার সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় B.Sc (অনার্স) লাভ করেন। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডে মুদ্রণ ও আলোকচিত্রের উপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান।
কর্মজীবন:
উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদনা ও পারিবারিক ছাপাখানা পরিচালনা করেন।
শিশুদের জন্য ননসেন্স ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
‘ননসেন্স ক্লাব’ ও ‘Monday Club’-এর মাধ্যমে সাহিত্যকর্মের সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করেন।
ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
সাহিত্যকর্ম:
ননসেন্স ছড়া ও কবিতা:
আবোল তাবোল
পাগলা দাশু
খাই-খাই
অবাক জলপান
লক্ষ্মণের শক্তিশেল
ঝালাপালা ও অন্যান্য নাটক
হ য ব র ল
শব্দ কল্প দ্রুম
বহুরুপী
প্রবন্ধ ও অন্যান্য:
ভাষার অত্যাচার (১৯১৫)
বর্ণমালাতত্ত্ব
দেশের-বিদেশের গল্প
জীবনের হিসাব (বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই)
চলচ্চিত্তচঞ্চরী
মৃত্যু:
১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।
নির্মলেন্দু গুণ (১৯৪৫ - )
বাংলাদেশের কবিদের কবি নির্মলেন্দু গুণ। নারীপ্রেম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শ্রেণি-সংগ্রাম, স্বৈরাচার বিরোধিতা ইত্যাদি বিষয় তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু। সমাজকে তিনি তুলে এনেছেন সাহিত্যের আয়নায়।
- নির্মলেন্দু গুণ ২১ জুন, ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম-রতন / রত্ন/রতু।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২), একুশে পদক (২০০১) পান।
- নিজ গ্রাম কাশবনে 'বিদ্যানিকেতন' নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
- মেট্রিক পাশের আগেই তার প্রথম কবিতা 'নতুন কাণ্ডারী' নেত্রকোনার 'উত্তর আকাশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
নির্মলেন্দু গুণকে কবিদের কবি নামে ডাকা হয় । নির্মলেন্দু গুণ গত শতাব্দীর ষাটের দশকে কবিতা রচনা শুরু করেন। পরের দশকেই তাঁর কবিতা এতটাই প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠে যে, তরুণরা তাঁর কবিতা পড়েই কবি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন। বাংলাদেশে আর কোনো কবি অনুজ কবিদের ওপর এতোটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সত্তর দশকের অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি নির্মলেন্দু গুণ এর প্রভাবেই কবি হয়েছেন। তাই তাঁকে কবিদের কবি বলা হয়।
তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'প্রেমাংশুর রক্ত চাই' (১৯৭০): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।
'ইসক্রা' (১৯৮৪): এ কাব্যে তাঁর রাজনৈতিক কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে।
'না প্রেমিক না বিপ্লবী' (১৯৭২), 'কবিতা অমীমাংসিত রমণী' (১৯৭৩), 'দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী' (১৯৭৪), 'চৈত্রের ভালবাসা' (১৯৭৫), 'ও বন্ধু আমার' (১৯৭৫), 'আনন্দ কুসুম' (১৯৭৬), 'বাংলার মাটি বাংলার জল' (১৯৭৮), 'তাঁর আগে চাই সমাজতন্ত্র' (১৯৭৯), 'চাষাভূষার কাব্য' (১৯৮১), 'পৃথিবীজোড়া গান' (১৯৮২), 'অচল পদাবলী' (১৯৮২), 'দূর হ দুঃশাসন' (১৯৮৩), 'মুজিব-লেনিন-ইন্দিরা' (১৯৮৪), 'শান্তির ডিক্রি' (১৯৮৪), 'প্রথম দিনের সূর্য' (১৯৮৪), 'নেই কেন সেই পাখি' (১৯৮৫), 'নিরঞ্জনের পৃথিবী' (১৯৮৬), 'চিরকালের বাঁশী' (১৯৮৬), 'দুঃখ কোরো না, বাঁচো' (১৯৮৭), 'ধাবমান হরিণের দ্যুতি (১৯৯২), 'অনন্ত বরফবীথি' (১৯৯৩), 'আনন্দ উদ্যান' (১৯৯৫), 'শিয়রে বাংলাদেশ' (১৯৯৮), 'ইয়াহিয়াকাল' (১৯৯৮), 'মুঠোফোনের কাব্য' (২০০৩), 'চির অনাবৃতা হে নগ্নতমা' (২০০৫), 'নিশিকাব্য' (২০০৬), 'কামকানন' (২০০৭)।
তাঁর অন্যান্য রচনাবলিঃ
ছোটগল্প: 'আপনদলের মানুষ' (১৯৭৬), 'অন্তর্জাল' (২০০৫)।
কিশোর উপন্যাস: 'কালো মেঘ' (১৯৮২), 'বাবা যখন ছোট্ট ছিলেন' (১৯৯৭)।
আত্মজীবনীঃ
'আমার ছেলেবেলা' (১৯৮৮), 'আত্মকথা ১৯৭১ (২০০৮), 'রক্তঝরা নভেম্বর' (১৯৭৫), ‘আমার কন্ঠস্বর’ ।
ভ্রমণকাহিনি: 'ভলগার তীরে' (১৯৮৫), 'গীনসবার্গের সঙ্গে (১৯৯৪), 'আমেরিকায় জুয়াখেলার স্মৃতি' (১৯৯৬), 'শ্রমি দেশে দেশে' (২০০৪)।
কবিতা: 'হুলিয়া', 'স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো', 'আমাকে কী মাল্য দেবে দাও'।
অনুবাদ কবিতা: 'রক্ত আর ফুলগুলি' (১৯৮৩), 'রাজনৈতিক কবিতা' (১৯৮৬)।
শাহ মুহম্মদ গরীবুল্লাহ (১৬৭০-১৭৭০)
অষ্টাদশ শতাব্দীর পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীনতম লেখক ফকির গরীবুল্লাহ (শাহ মুহম্মদ গরীবুল্লাহ)।
- ফকির গরীবুল্লাহ আনুমানিক ১৬৭০ সালে হুগলীর বালিয়া পরগনার হাফিজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের আদি, শ্রেষ্ঠ ও সার্থক কবি। [উল্লেখ্য, পুঁথি সাহিত্যের আদি কবি ফকির গরীবুল্লাহ না থাকলে উত্তর হবে সৈয়দ হামজা]
- মর্সিয়া সাহিত্য ধারার প্রধান কবি।
- তিনি আনুমানিক ১৭৭০ সালে মারা যান।
ফকির গরীবুল্লাহর সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'জঙ্গনামা', 'সোনাভান', 'সত্যপীরের পুঁথি', 'ইউসুফ জোলেখা', 'আমীর হামজা' (তিনি এ কাব্যটি জীবদ্দশায় শেষ করে যেতে পারেননি। এটি শেষ করেন সৈয়দ হামজা)।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)
বাঙালি নবজাগরণের অগ্রদূত, বাংলা সাহিত্যের সার্থক ঔপন্যাসিক, বাংলা সাহিত্যধারার প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অগ্রজ। তিনি ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, ভাষা, সমাজ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ রচনা করে বাঙালি জাতিকে চিন্তা-চেতনায় ও মননশীলতায় দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার তুলনামূলক সমালোচনা ধারার পথ প্রদর্শক এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের সমন্বয় সাধনকারী হিসেবে খ্যাত।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ২৬ জুন, ১৮৩৮ সালে (১৩ আষাঢ়, ১২৪৫ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আদিনিবাস: হুগলী জেলার দেশমুখো
গ্রাম। বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মাতা দুর্গাসুন্দরী। - 'পালামৌ' ভ্রমণকাহিনির লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তাঁর ভাই।
- তিনি ১৮৪৯ সালে মাত্র এগারো বছর বয়সে পাঁচ বছর বয়সী মোহিনীদেবীকে বিয়ে করেন।
- ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম স্নাতকদের মধ্যে তিনি একজন।
- তিনি ১৮৫৮ সালে যশোরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং পরে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ৩৩ বছর চাকরি করে ১৮৯১ সালে অবসরগ্রহণ করেন। চাকরিসূত্রে খুলনায় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করে নীলকরদের অত্যাচার দমন করেছিলেন।
- তিনি ১৮৫২ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় কবিতা লিখে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
- বঙ্কিমচন্দ্রের মোট গ্রন্থের সংখ্যা ৩৪টি। তাঁর সাহিত্যিক জীবন মাত্র ২২ বছর।
- তিনি 'বঙ্গদর্শন' (১৮৭২) পত্রিকা সম্পাদনা (১৮৭২-১৮৭৬) করেন। 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার অন্যতম লেখক ছিলেন- রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
- তিনি বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮ এপ্রিল, ১৮৯৪ সালে (২৬ চৈত্র, ১৩০০ বঙ্গাব্দ) কলকাতায় মারা যান।
বঙ্কিমচন্দ্রকে যে সকল উপাধি দেয়া হয়:
তিনি সাহিত্য রসবোদ্ধাদের কাছ থেকে সাহিত্যসম্রাট, হিন্দু ধর্মানুরাগীদের কাছ থেকে ঋষি আখ্যা লাভ করেন। তিনি বাংলার স্কট এবং বাংলা উপন্যাসের জনক। ছদ্মনাম-কমলাকান্ত। নিষ্ঠার সাথে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার 'রায়বাহাদুর' (১৮৯১) এবং ১৮৯৪ সালে সি.আই.ই উপাধি প্রদান করে।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম 'ললিতা। পুরাকালিক গল্প। তথা মানস' (১৮৫৬)।
বঙ্কিমচন্দ্র রচিত প্রথম বাংলা উপন্যাসের:
'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫): এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৬২ সালে উপন্যাসটি রচনা শুরু করেন এবং ১৮৬৩ সালে খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে রচনা শেষ করেন। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে উড়িষ্যার অধিকার নিয়ে মোঘল ও পাঠানদের মধ্যে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, তারই পটভূমিকা এ উপন্যাসের উপজীব্য। দিল্লীশ্বরের সেনাপতি মানসিংহের পুত্র কুমার জগৎসিংহ বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারণ যাত্রাকালে ঝড়ের কবলে পড়ে শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে আশ্রয় নেন। সেখানে ঘটনাচক্রে মান্দারণ দুর্গাধিপতি মহারাজ বীরেন্দ্র সিংহের কন্যা তিলোত্তমার সাথে সাক্ষাৎ হয়। জগৎসিংহ ও তিলোত্তমা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখলেও দুজন দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পরে পাঠান সেনাপতি ওসমান খাঁ সুকৌশলে মান্দারণ দূর্গ দখল করে বীরেন্দ্র সিংহ, স্ত্রী বিমলা ও কন্যা তিলোত্তমাকে বন্দী করে। পাঠান নবাব প্রহসনের বিচারের নামে কতলু খাঁর মাধ্যমে বীরেন্দ্র সিংহকে হত্যা করে। অপরদিকে বিমলা কতলু খাঁকে হত্যা করে স্বামী হত্যার প্রতিশোধ নেয়। পাঠানেরা কুমার জগৎসিংহের মাধ্যমে অম্বররাজ মানসিংহ তথা দিল্লীশ্বরের সাথে সদ্ধি করে। পরিশেষে মান্দারণ পুনরায় স্বাধীন হয় ও দিল্লীশ্বরের প্রধান সেনাপতি অম্বররাজ মানসিংহের মাধ্যমে মহারানি বিমলার হস্তে রাজ্যপাঠ হস্তান্তর করে এবং মহাধুমধামের সাথে কুমারজগৎ সিংহ এবং দুর্গেশনন্দিনীর তিলোত্তমার মিলন ঘটে। দুর্গেশনন্দিনী অর্থ দুর্গ প্রধানের কন্যা। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: কুমার জগৎসিংহ, ওসমান, আয়েশা, তিলোত্তমা। এ উপন্যাসের প্রতিক্রিয়ায় ইসমাইল হোসেন সিরাজী 'রায়নন্দিনী' উপন্যাস লিখেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো:
বঙ্কিমচন্দ্রের মোট উপন্যাস ১৫টি।
Rajmohon's Wife (১৮৬৪): এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস যা ইংরেজিতে রচিত। এটি প্রথম Indian Field পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬): বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্সধারী উপন্যাস। 'পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ' এ উপন্যাসের বিখ্যাত সংলাপ। চরিত্র: কপালকুণ্ডলা, নবকুমার, কাপালির
'মৃণালিনী' (১৮৬৯): ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে তুর্কি আক্রমণ ও মুসলিম বিজয় এ উপন্যাসের মূল সুর। মগধের রাজপুত্র হেমচন্দ্রের সঙ্গে মৃণালিনীর প্রণয় এবং দেশরক্ষার জন্য হেমচন্দ্রের সংকল্প ও ব্যর্থতার সঙ্গে এক রহস্যময়ী নারী মনোরমার কাহিনি এ উপন্যাসের মূল কথাবস্তু। কেশরের কন্যা এবং পশুপতির স্ত্রী মনোরমা। এ উপন্যাসে মনোরম চরিত্রের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র ভারতীয় নারীর সনাতনী নীতি। আদর্শ প্রচার করেছেন এবং সমকালীন সতীদাহ প্রথারে নিষিদ্ধ করার আইনকে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি উপন্যাসটি দীনবন্ধু মিত্রকে উৎসর্গ করেন।
'কৃষ্ণকান্তের উইল' (১৮৭৮): এটি সামাজিক উপন্যাস রোহিণী, ভ্রমর ও গোবিন্দলালের ত্রিভুজ প্রেমের চিত্র বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে। গোবিন্দলাল তার স্ত্রী কৃষ্ণকায় ভ্রমরে প্রেমকে উপেক্ষা করে লাস্যময়ী বিধবা রোহিণীর প্রেমে মর হয়। কিছুকাল পরে মোহ কেটে গেলে গোবিন্দলাল অনুভব করে ভ্রমরের ভালোবাসার আকর্ষণ। ফলে, রোহিণী স্বীয় ব্যর্থ জীবনের হাহাকারের জন্য আত্মহত্যা করতে চায় রোহিণীকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যার রূপায়ণ এ উপন্যাসের মূল সুর। 'বিষবৃক্ষ' (১৮৭৩): সামাজিক উপন্যাস। চরিত্র: কুন্দনন্দিনী, নগেন্দ্রনাথ।
' ইন্দিরা' (১৮৭৩): এটি ১৮৭২ সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৭৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। আকারে ছোট হওয়ার কারণে এটি ছোটগল্পের মর্যাদা পেয়েছিল এবং উপন্যাসটিকে আধুনিক ছোটগল্প রচনার প্রথম পরীক্ষা বলা হয়। ইন্দিরা ও তার স্বামী উপেন্দ্র চরিত্রের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক মহেশপুর ও মনোহরপুর গ্রামে প্রচলিত বাল্যবিবাহ অর্থাৎ তৎকালীন সমাজচিত্র ও সামাজিক বাস্তবতা উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন।
'যুগলাঙ্গুরীয়' (১৮৭৪): এটি ঐতিহাসিক অনু-উপন্যাস। এটি প্রথমে ১৮৭৩ সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটিকে কেউ বলেন নভেলা, কেউ বলেন বড় গল্প। তবে বঙ্কিম এটিকে বলেছেন উপকথা। 'ইন্দিরা'র পর এ আখ্যানে বঙ্কিমচন্দ্র আবার একই ফর্মচর্চা করেন। বাল্যপ্রেম, বিচ্ছেদ, বিয়ে, বিরহ, মিলন সবমিলিয়ে দুটি মানবচরিত্রকে মিলয়ে দেয় দুটি অঙ্গুরীয় বা আংটি। চরিত্র: হিরন্ময়ী, পুরন্দর।
'চন্দ্রশেখর' (১৮৭৫): উপন্যাসটি প্রথমে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। প্রতাপ ও শৈবালিনীর বাল্যপ্রণয় এবং সেই প্রেমের করুণ পরিণতি এ উপন্যাসের প্রধান কাহিনি। চন্দ্রশেখর চরিত্রটিও উপন্যাসের ট্রাজেডি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
'রজনী' (১৮৭৭): এটি ১৮৭৫ সালে প্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৭৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ইংরেজ ঔপন্যাসিক লিটন রচিত The Last Days of Pompeii এর 'নিদিয়া' নামক 'কানাফুলওয়ালী' চরিত্র অবলম্বনে এটি রচিত। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাসের মতে, 'রজনী বাংলা ভাষায় প্রথম মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণমূলক সামাজিক উপন্যাস।' চরিত্র: রজনী (জন্মান্ধ), লবঙ্গলতা, অমরনাথ ও শচীন্দ্রনাথ।
'আনন্দমঠ' (১৮৮২): এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমিকায় সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ছায়া অবলম্বনে রচিত। এ উপন্যাসে মুসলমান সম্পর্কে বক্রোক্তির জবাবে শেখ মুহম্মদ ইদ্রিস আলী 'বঙ্কিম দুহিতা' উপন্যাস রচনা করেন।
'রাজসিংহ' (১৮৮২): এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এ উপন্যাসের মূল বিষয় হিন্দুর বাহুবল ও বীরত্ব রূপায়িত করা। রাজস্থানের চঞ্চল কুমারীকে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিবাহ ইচ্ছার ফলে রাজা রাজসিংহের সাথে বিরোধ বাঁধে এবং রাজসিংহের জয় হয়। ফলশ্রুতিতে রাজসিংহ চঞ্চল কুমারীকে লাভ করেন। এটিই এ উপন্যাসের উপজীব্য।
'দেবী চৌধুরাণী' (১৮৮৪): রংপুর অঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহ, ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের নেত্রী দেবী চৌধুরাণী ছিলেন রংপুরের পীরগাছার জমিদার। ইংরেজ বিরোধী অনেকগুলো সফল অভিযানের পর ১৭৮৩ সালে স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি নিহত হন। পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রংপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে এ ঘটনা জানতে পারেন এবং রচনা করেন 'দেবী চৌধুরাণী'।
'রাধারাণী' (১৮৮৬): এটি ১৮৭৫ সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ১৮৮৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। রাধারাণী নামক একটি বালিকার বাল্যপ্রেমই এ উপন্যাসের মূল সুর। এটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস নয়, উপন্যাসিকা হিসেবেই পরিচিত।
'সীতারাম' (১৮৮৭): সীতারাম চরিত্রটি ঐতিহাসিক হলেও এতে ঐতিহাসিকতা রক্ষা হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ধর্মতত্ত্বের আলোকে এক হিন্দু ভূ-স্বামীর অধঃপতন বর্ণনা করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের ত্রয়ী উপন্যাসগুলো
'আনন্দমঠ' (১৮৮২), 'দেবী চৌধুরানী' (১৮৮৪), 'সীতারাম' (১৮৮৭)।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধগুলো
'কমলাকান্তের দপ্তর' (১৮৭৫): এটি ব্যাঙ্গাত্মক রম্য (লঘু রচনা, যা ডিকুইনসির Confession of an English Opium Eater অবলম্বনে রচিত। এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রদ 'বিড়াল' এবং নবম সংখ্যক প্রবন্ধ 'ফুলের বিবাহ'।
'সাম্য' (১৮৭৯): এ গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহে ইউরোপে সাম্যচিন্তার ধারার ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনৈতিক প্রগতিশীর চিন্তা, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা কামনা এবং কৃষকদের দুঃখের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক শোষণকে চিহ্নিত করা প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত। এটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
'বিবিধ প্রবন্ধ': এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত সাধু রীতিতে রচিত বিখ্যাত প্রবন্ধ 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন'
'লোকরহস্য' (১৮৭৪), 'বিজ্ঞানরহস্য' (১৮৭৫), 'বিবিধ সমালোচনা' (১৮৭৬), 'কৃষ্ণচরিত্র' (১৮৮৬), 'ধর্মতন্ন অনুশীলন' (১৮৮৮), 'শ্রীমদ্ভগবদগীতা' (১৯০২), 'মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত' (ব্যঙ্গ)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯)
বন্দে আলী মিয়া ছিলেন প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক, শিশু সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রকর। তিনি তাঁর কবিতায় পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনায় নৈপূণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।
- বন্দে আলী মিয়া ১৫ ডিসেম্বর, ১৯০৬ সালে পাবনার রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো হল: 'কিশোর পরাগ', 'শিশু বার্ষিকী', 'জ্ঞানের আলো'। তিনি 'ইসলাম দর্শন' (১৯২৫) পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক লাভ করেন।
- তিনি ১৭ জুন, ১৯৭৯ সালে রাজশাহীতে মারা যান ।
তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলোঃ
'ময়নামতির চর' (১৯৩২): ২৬ জুলাই, ১৯৩২ সালে এ কাব্যের ভূমিকা লেখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
'অনুরাগ' (১৯৩২), 'পদ্মা নদীর চর' (১৯৫৩), 'মধুমতীর চর' (১৯৫৩), 'ধরিত্রী' (১৯৭৫)।
তাঁর রচিত শিশুতোষ গ্রন্থগুলোঃ
'চোর জামাই' (১৯২৭), 'মেঘকুমারী' (১৯৩২), 'মৃগপরী' (১৯৩৭), 'বোকা জামাই' (১৯৩৭), 'কামাল আতাতুর্ক' (১৯৪০), 'ডাইনী বউ' (১৯৫৯), 'রূপকথা' (১৯৬০), 'কুঁচবরণ কন্যা' (১৯৬০), 'ছোটদের নজরুল' (১৯৬০), 'শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা' (১৯৬৩)।
তাঁর রচিত অন্যান্য সাহিত্যকর্মসমূহঃ
উপন্যাস: 'বসন্ত জাগ্রত দ্বারে' (১৯৩১), 'শেষ লগ্ন' (১৯৪১), 'অরণ্য গোধূলি' (১৯৪৯), 'নীড়ভ্রষ্ট' (১৯৫৮)।
নাটক: 'মসনদ' (১৯৩১)।
গল্পগ্রন্থ: 'তাসের ঘর' (১৯৫৪)।
বিখ্যাত পঙ্ক্তিঃ
- 'আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,
আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইয়াছে প্রাণ।' (আমাদের গ্রাম)
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) (১৯ জুলাই ১৮৯৯ – ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯)
পরিচিতি:
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যিক ছদ্মনাম বনফুল, ছিলেন বাঙালি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও কবি। তিনি মূলত চিকিৎসক ছিলেন।
জন্ম ও পরিবার:
জন্ম: ১৯ জুলাই ১৮৯৯, মণিহারী, বিহার রাজ্য (অবিভক্ত ভারত)
আদি নিবাস: শিয়াখালা, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ
পিতা: সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় (চিকিৎসক), মাতা: মৃণালিনী দেবী
অনুজ: অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় (চিত্রপরিচালক)
শিক্ষা ও কর্মজীবন:
প্রাথমিক শিক্ষা: মণিহারী স্কুল
উচ্চ শিক্ষা: সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়, হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ (আই.এস.সি)
চিকিৎসা শিক্ষা: কলকাতা মেডিকেল কলেজ, পাটনা মেডিক্যাল কলেজ (এম.বি. ডিগ্রি)
পেশা: প্যাথলজিস্ট, ৪০ বছর কর্মজীবন
স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস: ১৯৬৮
মৃত্যু: ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯, কলকাতা
সাহিত্যকর্ম:
সাহিত্যিক জীবন: কৈশোর থেকেই লেখা শুরু, ছদ্মনাম বনফুল
প্রথম প্রকাশিত কাজ: ১৯১৫, মালঞ্চ পত্রিকায় কবিতা
প্রকাশিত রচনা: ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, ১,০০০+ কবিতা, জীবনী ও প্রবন্ধ
বিখ্যাত নাটক: শ্রীমধুসূদন
রচনাবলী প্রকাশিত: ২২ খণ্ডে
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:
বনফুলের কবিতা, ব্যঙ্গ কবিতা, অঙ্গারপণী, চতুর্দশী, করকমলেষু
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
তৃণখণ্ড, বৈতরণীর তীরে, নিরঞ্জনা, ভুবন সোম, মহারাণী, অগ্নীশ্বর, মানসপুর, এরাও আছে, নবীন দত্ত, হরিশ্চন্দ্র, কিছুক্ষণ, সে ও আমি, সপ্তর্ষি, উদয় অস্ত, পীতাম্বরের পুনর্জন্ম, কৃষ্ণপক্ষ, সন্ধিপূজা, হাটেবাজারে, কন্যাসু, অধিকলাল, গোপালদেবের স্বপ্ন, স্বপ্নসম্ভব, কষ্টিপাথর, দুই পথিক, রাত্রি, পিতামহ, পক্ষীমিথুন, তীর্থের কাক, রৌরব, জলতরঙ্গ, রূপকথা এবং তারপর, প্রথম গরল, রঙ্গতুরঙ্গ, আশাবারি, ঌ, সাত সমুদ্র তেরো নদী, আকাশবাসী, তুমি, অসংলগ্ন, সীমারেখা, ত্রিবর্ণ, অলংকারপুরী, জঙ্গম, অগ্নি, দ্বৈরথ, মৃগয়া, নির্মোক, মানদন্ড, নবদিগন্ত, স্থাবর, ভীমপলশ্রী, পঞ্চপর্ব, লক্ষ্মীর আগমন, ডানা, হাটে বাজারে
উল্লেখযোগ্য নাটক:
শ্রীমধুসূদন, বিদ্যাসাগর, উপাধি
পুরস্কার ও সম্মাননা:
পদ্মভূষণ (১৯৭৫)
শরৎস্মৃতি পুরস্কার (১৯৫১)
রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬২)
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক (১৯৬৭)
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট উপাধি (১৯৭৩)
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০)
প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের পরবর্তী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর রচিত সাহিত্য মধুর ও কাব্যধর্মী ভাষায় অখণ্ড ও অবিচ্ছিন্ন সত্তায় ধারণ করেছে প্রকৃতি ও নিম্নশ্রেণির মানবজীবন। তাঁর ছোটগল্পগুলোর মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়েছে গীতিকবির ব্যক্তিত্ব।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ সালে চব্বিশ পরগনার মুরারিপুর গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস চব্বিশ পরগনার ব্যারাকপুর গ্রাম।
- তিনি 'চিত্রলেখা' (১৯৩০) পত্রিকা এবং হেমন্তকুমার গুপ্তের সাথে 'দীপক' (১৯৩০), পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
- ১৯২১ সালে প্রবাসী পত্রিকায় 'উপেক্ষিতা' নামক গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
- তিনি ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০ সালে (১৫ কার্তিক, ১৩৫৭) বিহারের ঘাটশীলায় মারা যান।
তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহ
'পথের পাঁচালী' (১৯২৯): এটি তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এটি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত। মূল চরিত্র: অপু, দুর্গা। উপন্যাসটি তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা: বল্লালী বালাই, আমআঁটির ভেঁপু ও অক্রুর সংবাদ। সত্যজিৎ রায় এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
'অপরাজিত' (১৯৩১): এটিকে 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড বলা হয়। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে মাসিক 'প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে (১৩৩৮)। 'আলোেক সারথী' নামে এ উপন্যাসটির প্রথমে নামকরণ করা হয়েছিল।
উপন্যাসের নায়ক অপুর শৈশব ও কৈশোর জীবন, মা সর্বজয়ার মৃত্যু, অপর্ণার সাথে বিবাহ ও শিশুপুত্র কাজলের মাধ্যমে পুনরায় প্রিয় শৈশবের প্রিয় গ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের স্মৃতিমন্থন এ উপন্যাসের মূল কাহিনি। অপরাজিত উপন্যাসের একটি অংশ নিয়েই সত্যজিৎ রায় 'অপুর সংসার' সিনেমা তৈরি করেছেন।
'দৃষ্টিপ্রদীপ' (১৯৩৫): অবাস্তব ও অধিবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এর কাহিনি।
'আরণ্যক' (১৯৩৮): এ উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে অরণ্যাচারী মানুষের জীবন। ভাগলপুরের নিকটবর্তী বনাঞ্চলের মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচিত্র চরিত্র, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আনন্দ এ উপন্যাসের মূল কাহিনি।
'আদর্শ হিন্দু হোটেল' (১৯৪০): এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারী ঠাকুরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রাতষ্ঠা লাভএবং মানুষের ভালোবাসা অর্জনের কাহিনিই এ উপন্যাসের মূল বিষয়।
'অনুবর্তন' (১৯৪২): বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তি অভিজ্ঞতার রূপায়ণ এ উপন্যাস। গ্রামের মানুষের মধ্যে সামান্য স্বার্থ নিয়ে দলাদলি এবং পরিণামে ট্র্যাজিক পরিণতিই এ উপন্যাসের মূল সুর।
'দেবযান' (১৯৪৪): এটি প্রেমতত্ত্ব ও পরলোকতত্ত্ব ভিত্তিক উপন্যাস। অবাস্তব ও অধিবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এর কাহিনি ও চরিত্রবিন্যাসের নিয়ামক।
'ইছামতি' (১৯৪৯): ইছামতি নদীর তীরবর্তী গ্রামে প্রচলিত সংস্কার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারী জাগরণ, ইংরেজ শাসকদের প্রভাবে কৃষিনির্ভর বাঙালির বাণিজ্য চেতনা এবং নীলচাষের প্রতিবাদ, নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনকথা এ উপন্যাসের আলেখ্য। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসের জন্য 'রবীন্দ্র পুরস্কার' (মরণোত্তর) লাভ করেন।
'অশনি সংকেত' (১৯৫৯): এ উপন্যাসটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে রচিত। এটি ধারাবাহিকভাবে মাতৃভূমি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। [বাজারে প্রচলিত বইয়ে বলা হয়েছে যে, ঋত্বিক ঘটক এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যজিৎ রায় এ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৩ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেনা। এ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতাকে চলচ্চিত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়।
'বিপিনের সংসার' (১৯৪১), 'দম্পতি' (১৯৫২)।
| পথের পাঁচালী (উপন্যাস) | বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় |
| পথের দাবী (উপন্যাস) | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যান্য রচনাবলিঃ
ছোটগল্প:
'আহ্বান': গল্পটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাবনি থেকে সংকলিত। এটি উদার মানবিক সম্পর্কের গল্প মানুষের স্নেহ-মমতা-প্রীতির যে বাঁধন তা ধন-সম্পদে না হৃদয়ের নিবিড় আন্তরিকতার স্পর্শেই গড়ে ওঠে- এটিই 'আহ্বান' গল্পের মূল উপজীব্য। চরিত্র: বুড়ি, গোপাল।
'মেঘমল্লার' (১৯৩১), 'মৌরীফুল' (১৯৩২), 'যাত্রাবদল (১৯৩৪), 'কিন্নর দল' (১৯৩৮), পুঁইমাচা', 'পড়ে পারা (কিশোর গল্প)।
আত্মজীবনী: 'তৃণাঙ্কুর' (১৯৪৩)।
ভ্রমণকাহিনি: 'অভিযাত্রিক', 'বনে পাহাড়ে', 'হে অরণা কথা কও'।
বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক। তিনি তাঁর রচনাতে সর্বপ্রথম কাব্যরীতিতে কথ্যরীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বুদ্ধদেবের কাব্যে সমাজচেতনা বিশেষভাবে প্রকাশ না পেলেও বাস্তববাদিতা ও নাগরিক চেতনা প্রকাশে সিদ্ধহস্ত ছিলেন বলেই তাঁকে 'নাগরিক কবি' বলে। ১৯৪২ সালে ফ্যাসীবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের আন্দোলনে যোগদান করেন।
- বুদ্ধদেব বসু ৩০ নভেম্বর, ১৯০৮ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- মুন্সীগঞ্জের মালখানগর।
- ঢাকার পুরানা পল্টন থেকে তাঁর ও অজিত দত্তের যৌথ সম্পাদনায় সচিত্র মাসিক পত্রিকা 'প্রগতি' (১৯২৭-২৯) ও কলকাতা থেকে তাঁর ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের যৌথ সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক 'কবিতা' (১৯৩৫) এবং হুমায়ুন কবিরের সাথে ত্রৈমাসিক 'চতুরঙ্গ' (১৯৩৪) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। (জগন্নাথ হলের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি 'বাসন্তিকা' পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত ছিলেন)।
- রবীন্দ্রনাথের পর বুদ্ধদেব বসুকে 'সব্যসাচী' বলা হয়।
- তিনি 'তপস্বী ও তরঙ্গিণী' কাব্যনাট্যের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬৭), 'স্বাগত বিদায়' গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৭৪) পান এবং পদ্মভূষণ (১৯৭০) উপাধি লাভ করেন।
তিনি ১৮ মার্চ, ১৯৭৪ সালে মারা যান।
বাংলা সাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডবঃ
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ত্রিশের দশকে 'কল্লোল' (১৯২৩) পত্রিকাকে ঘিরে তরুণ লেখকদের সম্মিলনে একট সাহিত্যবলয় সৃষ্টি হয়। এদের মধ্যে অন্যতম পাঁচজন কবিকে একত্রে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়। এরা হলেন: বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দর পঞ্চপাণ্ডবগণ রবীন্দ্র প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁরা বাংলা সাহিত্যে প্রথম আধুনিক নবজাগরণের সূচনা করেন। এরা সবাই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। অপরদিকে, আধুনিকতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা ও অশ্লীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে- এই অভিযোগে 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কল্লেখ বিরোধী আরেকটি সাহিত্য বলয় সৃষ্টি হয়। এদের নেতৃত্বে ছিলেন- মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, নীরদ চৌধুরী প্রমুখ।
বুদ্ধদেব বসুর কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'কঙ্কাবতী' (১৯৩৭): এ কাব্যের কবিতাগুলির প্রধান বিষয় প্রেম। 'মর্মবাণী' (১৯২৫), 'বন্দীর বন্দনা' (১৯৩০), 'দময়ন্তী' (১৯৪৩), 'মরচেপড়া পেরেকের গান' (১৯৬৬), 'একদিন: চিরদিন' (১৯৭১), 'স্বাগত বিদায়' (১৯৭১)।
তাঁর উপন্যাসঃ
'একদা তুমি প্রিয়ে' (১৯৩৩): পলাশ ও রেবার প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে জটিল সমস্যার সৃষ্টি বিষয়ক কাহিনি এ উপন্যাসের মূল বিষয়। রেবা নতুনভাবে প্রেমের অভিষেক করতে চায় কিন্তু পলাশ বুঝতে পারে তা সম্ভবপর নয়, এরকম কাহিনি নিয়ে এগিয়ে যায় উপন্যাসের গতি।
তিথিডোর' (১৯৪৯): বাঙালি মধ্যবিত্ত শিল্পিত স্বভাব নর-নারীর জীবনযাপনের মনোরম ও মধুর কাহিনি, প্রেম ও যৌবনের বন্দনা এ উপন্যাসের মূল সুর। চরিত্র: স্বাতী, সত্যেন।
'সাড়া' (১৯৩০), 'সানন্দা' (১৯৩৩), 'লালমেঘ' (১৯৩৪), 'পরিক্রমা' (১৯৩৮), 'কালো হাওয়া' (১৯৪২), 'নির্জন স্বাক্ষর' (১৯৫১), 'মৌলিনাথ' (১৯৫২), 'নীলাঞ্জনের খাতা' (১৯৬০), 'পাতাল থেকে আলাপ' (১৯৬৭), 'রাত ভরে বৃষ্টি' (১৯৬৭), 'গোলাপ কেন কালো' (১৯৬৮), 'বিপন্ন বিস্ময়' (১৯৬৯)।
তাঁর নাটকঃ
'মায়া-মালঞ্চ' (১৯৪৪), 'তপস্বী ও তরঙ্গিণী' (১৯৬৬), 'কলকাতার ইলেক্ট্রা ও সত্যসন্ধ' (১৯৬৮)।
| বন্দীর বন্দনা (কাব্যগ্রন্থ) | বুদ্ধদেব বসু |
| বন্দী শিবির থেকে (কাব্যগ্রন্থ) | শামসুর রাহমান |
| বন্দীর বাঁশি (কাব্যগ্রন্থ) | বেনজীর আহমদ |
| রাজবন্দীর জবানবন্দী (প্রবন্ধ) | কাজী নজরুল ইসলাম |
| রাজবন্দীর রোজনামচা (প্রবন্ধ) | শহীদুল্লা কায়সার |
| কঙ্কাবতী (কাব্যগ্রন্থ) | বুদ্ধদেব বসু |
| কঙ্কাবতী (উপন্যাস) | অন্নদাশঙ্কর রায় |
তাঁর অন্যান্য রচনাবলি:
গল্পগ্রন্থ: 'অভিনয়, অভিনয় নয়' (১৯৩০), 'রেখাচিত্র' (১৯৩১), 'হাওয়া বদল' (১৯৪৩), 'হৃদয়ের জাগরণ (১৯৬১), 'ভালো আমার ভেলা' (১৯৬৩), 'প্রেমপত্র' (১৯৭২)।
প্রবন্ধগ্রন্থ: 'হঠাৎ আলোর ঝলকানি' (১৯৩৫), 'কালের পুতুল' (১৯৪৬), 'সাহিত্যচর্চা' (১৯৫৪), 'স্বদেশ ও সংস্কৃতি' (১৯৫৭), 'সঙ্গ, নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ' (১৯৬৩)।
স্মৃতিকথা: 'আমার ছেলেবেলা' (১৯৭৩), 'আমার যৌবন' (১৯৭৬)।
ভ্রমণকাহিনি: 'সব পেয়েছির দেশে' (১৯৪১), 'দেশান্তর' (১৯৬৬)।
সম্পাদনা: 'আধুনিক বাংলা কবিতা' (১৯৬৩)।
কবিতা: 'নদীর স্বপ্ন'।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)
অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও মঙ্গলকাব্যের সর্বশেষ শক্তিমান কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ও হিন্দুস্তানি ভাষার সংমিশ্রণে আশ্চর্য নতুন এক বাঙ্গি ও প্রাচীন সংস্কৃত ছন্দের অনুকরণে বাংলা কবিতায় নিপুণ ছন্দপ্রয়োগ ছিল তাঁর কাব্যের বৈশিষ্ট্য।
- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ১৭১২ সালে হাওড়া জেলার ভুরশুট পরগণার পেঁড়ো (পান্ডুয়া) গ্রামে ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে 'সত্যনারায়ণের পাঁচালী' (১৭২৭) রচনা করেন।
- তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন।
- তাঁর কবিত্ব শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাকে 'রায়গুণাকর' উপাধি দেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাগরিক কবি এবং মঙ্গলযুগের শেষ কবি হিসেবে পরিচিত।
- ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে মধ্যযুগের 'শেষ বড় কবি' বলা হয়।
- তিনি অন্নদামঙ্গল ধারার প্রধান কবি।
- তিনি ১৭৬০ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে।
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'অন্নদামঙ্গল' (১৭৫২-৫৩): এটি তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে রচনা করেন। কাব্যটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি এ কাব্যের দ্বিতীয় অংশ 'বিদ্যাসুন্দর'।
'সত্য পীরের পাঁচালী' (১৭৩৭-৩৮): এটি তাঁর রচিত অন্যতম গ্রন্থ।
'রসমঞ্জরী', 'নাগাষ্টক', 'গঙ্গাষ্টক', 'চণ্ডীনাটক' (নাটক)।
অন্নদামঙ্গল কাব্য ৩ খণ্ডে বিভক্ত । এতে দেবী অন্নদার বন্দনা আছে।
'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে'- এ বিখ্যাত উক্তিটি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত বিখ্যাত 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে'র চরিত্র ঈশ্বরী পাটনীর।
বিখ্যাত উক্তিঃ
- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
- ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’
- ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।’
- ‘হাভাতে যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়।’
- ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ। ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।’
- 'না রবে প্রাসাদগুণ না হবে রসাল অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।'
পুরাতন রীতির শেষ কবি, হিন্দু কলেজ ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক, ভারতীয় উপমহাদেশের পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব, হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রথার অন্যতম উদ্যোক্তা, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মদনমোহন তর্কালঙ্কার লেখ্য বাংলা ভাষার বিকাশে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন।
- মদনমোহন তর্কালঙ্কার ১৮১৭ সালে নদীয়ার বিল্বগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সংস্কৃত কলেজের সহপাঠী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগিতায় কলকাতায় 'সংস্কৃত যন্ত্র' (১৮৪৭) নামক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল' কাব্য প্রথম মুদ্রিত হয়।
- তিনি ১৮৫০ সালে 'সর্ব্ব-শুভঙ্করী' নামক পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় স্ত্রীশিক্ষার সমর্থনে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে শিক্ষিত সমাজের প্রশংসাভাজন হন।কবি প্রতিভার জন্য সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকগণ কর্তৃক 'কাব্যরত্নাকর' উপাধি লাভ করেন এবং পরে পাণ্ডিত্যের জন্য 'তর্কালঙ্কার' উপাধি পান।
- তিনি ৯ মার্চ, ১৮৫৮ সালে কান্দীতে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন।
মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'শিশুশিক্ষা' (১ম খণ্ড ও ২য় খণ্ড- ১৮৪৯, ৩য় খণ্ড- ১৮৫০।) এভাবে 'বোধোদয়' নামে ৪র্থ খণ্ড রচনা করেন)। কলকাতা বেথুন কলেজ কর্তৃক 'হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়' (১৮৪৯)
প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি বিনা বেতনে ছাত্রীদের শিক্ষাদান ও শিশুপাঠ্য হিসেবে এ গ্রন্থটি রচনা করেন।
প্রবন্ধ: 'রসতরঙ্গিনী' (১৮৩৪), 'বাসবদত্তা' (১৮৩৬)।
বিখ্যাত পঙ্ক্তিঃ
- পাখি সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল। (পাখি সব করে রব) - সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। (আমার পণ) - লেখাপড়া করে যে,
গাড়ী ঘোড়া চড়ে সে।
বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসে মানুষের অন্তরে তার ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস-সংস্কারের সাথে প্রণয়াকাঙ্ক্ষার যে নিরন্তর দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গার্হস্থ্য ও সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি অসাধারণভাবে শিল্প কুশলতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। বাঙালি সমাজে নারীর বঞ্চনা, নারীর দুঃখ তাঁর উপন্যাসের অন্যতম দিক।
- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ সালে (৩১ ভাদ্র, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) হুগলীর দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি মাতৃবিয়োগের (১৮৯৫) কারণে চরম অর্থকষ্টে নিপতিত হন এবং ১৯০৩ সালে ভাগ্যান্বেষণে রেঙ্গুন (বার্মা) গমন করেন।
- তিনি মাঝে মাঝে অনিলা দেবী, অপরাজিতা দেবী, শ্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুরূপা দেবী, পরশুরাম (এটি রাজশেখর বসুরও ছদ্মনাম), শ্রীকান্ত শর্মা ও সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছদ্মনামে লিখতেন।
- তিনি ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রী লাভ করেন।
- তাঁর রচিত উপন্যাসে প্লটের তুলনায় চরিত্রের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। তিনি সমাজে প্রচলিত বর্ণ-বিভাজনকে তাঁর লেখায় প্রশ্রয় দেননি।
- তিনি ১৬ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে (২ মাঘ, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) পাক নার্সিংহোমে মৃত্যুবরণ করেন।
শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম 'মন্দির': গল্পটি প্রথমে তাঁর মামা ও বাল্যবন্ধু সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে 'বসুমতি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটি ১৯০৩ সালে কুন্তলীন পুরস্কার পায়। চরিত্র: অমরনাথ, অপর্ণা, শক্তিনাথ।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলো:
'বড়দিদি' (১৯০৭): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এটি সরলা দেবী সম্পাদিত 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ পায়। প্রথমে এটির নাম ছিল 'শিশু'। মাধবীর নাম 'বড়দিদি'। চরিত্র: মাধবী, সুরেন্দ্রনাথ, ব্রজরাজ, প্রমীলা।
'বিরাজ বৌ' (১৯১৪): উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সুন্দরী বিরাজ বৌয়ের নানাবিধ সমস্যা উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। চরিত্র: বিরাজ, নীলাম্বর, পীতাম্বর।
'পরিণীতা' (১৯১৪): বিংশ শতাব্দীর প্রথম সময়ের ভারতের কলকাতার পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত। চরিত্র: ললিতা, গুরুচরণ, আন্নাকালী, চারু, শেখর রায়, মনোরমা, গিরীন।
'পল্লীসমাজ' (১৯১৬): উপন্যাসটি ১৯১৫ সালে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে ১৯টি পরিচ্ছেদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার মালিক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। 'কুঁয়াপুর' নামক গ্রামকে কেন্দ্র করেন বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা, পল্লিজীবনের নীচতা ও ক্ষুদ্র রাজনীতির পটভূমিকায় এক আদর্শবাদী যুবক-যুবতীর সম্পর্ক ও বিশেষ করে তাদের অভিশপ্ত প্রেমকাহিনি এই উপন্যাসের মূল বিষয়। রমা ও রমেশের প্রেমের মাঝে এতো তিক্ততা ছিলো যে, রমা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে রমেশকে জেলে পাঠাতেও দ্বিধা করেনি। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'রমা' (১৯২৮)। চরিত্র: রমা, রমেশ, বেণীমাধব, বিশ্বেশ্বরী।
'নিষ্কৃতি' (১৯১৭): এ উপন্যাসের প্রথমাংশ 'ঘরভাঙা' নামে 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ভবানীপুরের চাটুয্যেদের একান্নবর্তী পরিবার এবং সেই পরিবারের সম্পর্কের জটিলতা এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: গিরিশ, হরিশ, সিদ্ধেশ্বরী, শৈলজা, রমেশ, নয়নতারা। ১৯৪৪ সালে Deliverance নামে দিলীপকুমার রায়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এটি গল্প আকারে রচিত হলেও পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র পরিবর্ধিত করে উপন্যাস আকারে প্রকাশ করেন।
'শ্রীকান্ত' (১ম খণ্ড- ১৯১৭, ২য় খণ্ড- ১৯১৮, ৩য় খণ্ড-১৯২৭, ৪র্থ খণ্ড- ১৯৩৩): এটি তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র 'শ্রীকান্ত শর্মা' ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। চরিত্র: রাজলক্ষ্মী, ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত, অভয়া। ইন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কিশোর চরিত্র।
'দেবদাস (১৯১৭): দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী অন্যতম চরিত্র।
'চরিত্রহীন' (১৯১৭): এটি প্রথমে ধারাবাহিকভাবে 'যমুনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রথা বহির্ভূত প্রেম ও নারী-পুরুষের সমাজ অননুমোদিত সম্পর্ক এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: সতীশ, সাবিত্রী, দিবাকর, কিরণময়ী, সরোজিনী।
'দত্তা' (১৯১৮): উপন্যাসটি ১৩২৪-১৩২৫ বঙ্গাদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চরিত্র: নরেন, বিজয়া, রাসবিহারী, বনমালী। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'বিজয়া' (১৯৩৪)
'গৃহদাহ' (১৯২০): এতে ত্রিভুজ প্রেমের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। চরিত্র: সুরেশ, অচলা, মহিম।
'বামুনের মেয়ে' (১৯২০): এ উপন্যাসে তৎকালীন সমাজের জাতিভেদ, কুসংস্কার ও আর্থিক বৈষম্যের বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। চরিত্র: রাসমণি, গোলোক চাটুয্য, জ্ঞানদা।
'দেনা-পাওনা' (১৯২৩): এ উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র: জীবানন্দ, ষোড়শী। উপন্যাসটি 'ষোড়শী' নামে নাট্যায়িত হয়
'পথের দাবী' (১৯২৬): এটি রাজনৈতিক উপন্যাস জ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। চরিত্র: সব্যসাচী।
'বিপ্রদাস' (১৯৩৫): এটি শরৎচন্দ্রের জীবিতাবস্থায় প্রকশি সর্বশেষ গ্রন্থ। উপন্যাসটি 'বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় চরিত্র: বিপ্রদাস, দ্বিজদাস, বন্দনা।
'শেষ প্রশ্ন' (১৯৩১): এটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিতর্কপ্রধান ও সমস্যামূলক উপন্যাস। উল্লেখযোগ্য চরিত্র শিবনাথ-মনোরমা, অজিত-কমল, নীলিমা-আশুবাবু।
'শেষের পরিচয়' (১৯৩৯): এটি তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস এটি শরৎচন্দ্র লেখা শেষ করে যেতে পারেননি। বাকী অংশ রাধারানী দেবী কর্তৃক রচিত। উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
'পণ্ডিত মশাই' (১৯১৪), 'বৈকুণ্ঠের উইল' (১৯১৬) 'অরক্ষণীয়া' (১৯১৬), 'চন্দ্রনাথ' (১৯১৬), 'নববিধান (১৯২৪)।
শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধগুলো:
'নারীর মূল্য' (১৯২৩): এটি নারীর সামাজিক অধিকার ও সমাজে নারীর স্থান সম্পর্কিত প্রবন্ধ। এটি তিনি 'অনিলা দেবী' ছদ্মনামে রচনা করেন, যা 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনিলা দেবী শরৎচন্দ্রের বড় বোনের নাম।
'তরুণের বিদ্রোহ' (১৯২৯): এ প্রবন্ধটি ১৯২৯ সালের ৩০ মার্চ রংপুর বঙ্গীয় যুব সম্মিলনীর অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ। এ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে 'সত্য ও মিথ্যা' নামে আরো একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
'স্বদেশ ও সাহিত্য' (১৯৩২)।
শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগুলো:
'কাশীনাথ' (১৯১৭): সতের বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম পাঠশালার সহপাঠী কাশীনাথের নামে গল্পটি লিখেন।
'বিলাসী': সাধু রীতিতে রচিত ন্যাড়া নামের এক যুবকের জবানিতে বিবৃত এ গল্পের কাহিনিতে শরৎচন্দ্রের প্রথম জীবনের ছায়াপাত ঘটেছে। গল্পটিতে বর্ণিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী দুই মানব-মানবীর চরিত্রের অসাধারণ প্রেমের মহিমা, যা ছাপিয়ে উঠেছে জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা। চরিত্র: বিলাসী, মৃত্যুঞ্জয়, খুড়া, ন্যাড়া।
'মন্দির', 'মহেশ' (চরিত্র: গফুর, আমিনা), 'মামলার ফল', 'সতী', 'অনুরাধা', 'পরেশ', 'অভাগীর স্বর্গ', 'অতিথির স্মৃতি' (দেওঘরের স্মৃতি) ইত্যাদি।
| দেনা-পাওনা (ছোটগল্প) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| দেনা-পাওনা (উপন্যাস) | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য বড় গল্পগুলো:
'বিন্দুর ছেলে ও অন্যান্য গল্প' (১৯১৪): এটি বিন্দুর ছেলে, রামের সুমতি ও পথনির্দেশ গল্পের সংকলন। এ গল্পগুলি ' যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'মেজদিদি' (১৯১৫): এটি মেজদিদি, দর্পচূর্ণ ও আঁধারে আলো গল্পের সংকলন। এ তিনটি গল্পই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। 'মেজদিদি'র চরিত্র: হেমাঙ্গিনী, কেষ্ট, কাদম্বিনী।
'ছবি' (১৯২০): এটি ছবি, বিলাসী ও মামলার ফল গল্পের সংকলন।
শরৎচন্দ্রের নাটকগুলো:
'ষোড়শী' (১৯২৮), 'রমা' (১৯২৮), 'বিজয়া' (১৯৩৪)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আধুনিক কবি শামসুর রাহমান, যিনি রোমান্টিকতার সাথে সমাজমনস্কতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন কাব্যধারার জন্ম দিয়েছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন তাঁর কবিতাকে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নগর জীবনের যন্ত্রণা, একাকিত্ব, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ইত্যাদি তাঁর কবিতায় লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
- শামসুর রাহমান ২৪ অক্টোবর, (পারিবারিক হিসেবে ২৩ অক্টোবর) ১৯২৯ সালে পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরার পাড়াতলি গ্রাম।
শামসুর রাহমানের ডাকনাম- বাচ্চু। - ১৯৫৭ সালে সাংবাদিক হিসেবে 'দৈনিক মর্নিং নিউজ'- এ কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে 'দৈনিক পাকিস্তান' পত্রিকায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে এটি 'দৈনিক বাংলা' নামে নামকরণ হয়। ১৯৭৭ সালে 'দৈনিক বাংলা' ও সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা'র সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সরকার পরিচালিত 'দৈনিক বাংলা' থেকে পদত্যাগ করেন।
- মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি কলকাতার 'দেশ' পত্রিকায় 'মজলুম আদিব' ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন।
- তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সিন্দাবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক প্রভৃতি ছদ্মনামে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতেন।
- ১৯৪৯ সালে 'সাপ্তাহিক সোনার বাংলা' পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।
- তিনি ১৯৬৩ সালে 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার', ১৯৬৯ সালে 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার', ১৯৭৭ সালে 'একুশে পদক' এবং ১৯৯১ সালে 'স্বাধীনতা পুরস্কার' লাভ করেন।
- শামসুর রাহমান 'নাগরিক কবি' হিসেবে খ্যাত।
- তিনি ১৭ আগস্ট, ২০০৬ সালে ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। কবির ইচ্ছানুযায়ী ১৮ আগস্ট বনানী কবরস্থানে মায়ের সমাধির মধ্যে সমাহিত করা হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো :
তাঁর মোট কাব্য ৬৫ টি ।
‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' (১৯৬০): এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ।
‘বন্দী শিবির থেকে ’ (১৯৭২): এ কাব্যে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন আবেগ ও প্রত্যাশা প্রাধান্য পেয়েছে। এ কাব্যের মাধ্যমে তিনি কবি খ্যাতি অর্জন করেন।
‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ' (১৯৮২): ১৯৭৫-৮২ সাল পর্যন্ত দেশে সংঘটিত একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের যুপকাষ্ঠে দেশ ও জনগণের চরম অবস্থার প্রতিফলন আছে এ কাব্যে।
‘রৌদ্র করোটিতে' (১৯৬৩), 'বিধ্বস্ত নীলিমা' (১৯৬৭), ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ (১৯৬৮), ‘নিজ বাসভূমে' (১৯৭০), ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি' (১৯৭৩), 'ফিরিয়ে নাও ঘাতককাটা' (১৯৭৪), ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি' (১৯৭৪), ‘এক ধরনের অহংকার' (১৯৭৫), ‘আমি অনাহারী' (১৯৭৬), ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা' (১৯৭৭), ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে' (১৯৭৭), ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে' (১৯৭৮), 'প্রেমের কবিতা' (১৯৮১), ‘ইকারুসের আকাশ' (১৯৮২), ‘এক ফোঁটা কেমন অনল' (১৯৮৬), ‘বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়’ (১৯৮৮), ‘হরিণের হাড়' (১৯৯৩), ‘তুমিই নিঃশ্বাস, তুমিই হৃদস্পন্দন' (১৯৯৬), ‘হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল' (১৯৯৭), ‘না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন' (২০০৬)।
তাঁর উপন্যাসগুলো:
‘ অক্টোপাস ' (১৯৮৩), ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ (১৯৮৫), ‘নিয়ত মন্তাজ' (১৯৮৫),‘এলো সে অবেলায়’ (১৯৯৪)।
তাঁর অন্যান্য রচনাবলিঃ
আত্মস্মৃতি: 'স্মৃতির শহর' (১৯৭৯), 'কালের ধূলোয় লেখা' (২০০৪)।
শিশুতোষ: 'এলাটিং বেলাটিং' (১৯৭৫), 'ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো' (১৯৭৭), 'লাল ফুলকির ছড়া' (১৯৯৫)।
প্রবন্ধ: 'আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ' (১৯৮৬), 'কবিতা এক ধরনের আশ্রয়' (২০০২)।
বিখ্যাত কবিতা :
‘হাতির শুড়’: ১৯৫৮ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রূপ করে ‘সমকাল' পত্রিকায় এ কবিতাটি লেখেন।
‘টেলেমেকাস’: ১৯৬৬ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বন্দী হলে তাঁকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ কবিতাটি লেখেন।
‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা': ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন। এ ঘটনার ফলে শামসুর রাহমান এ কবিতাটি লেখেন ।
‘আসাদের শার্ট’: ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে লাঠিতে শহীদ আসাদের শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে আলোড়িত শামসুর রাহমান এ কবিতাটি লেখেন ।
‘স্বাধীনতা তুমি' ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’: মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিলের প্রথম দিকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা দেখে তিনি এ দুটি কবিতা লেখেন।
বিখ্যাত পক্তি
- পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত জ্বলন্ত,
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, নতুন নিশানা উড়িয়ে,
দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক এই বাংলায় তোমাকেই আসতেই হবে। (তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা) - স্বাধীনতা তুমি, রবী ঠাকুরের অজর কবিতা । (স্বাধীনতা তুমি)
- স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন। (স্বাধীনতা তুমি)
- তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো, বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা (বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা)
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে 'ছন্দের রাজা' ও 'ছন্দের জাদুকর' 'বাস্তববাদী কবি' অভিধায় বিশেষায়িত করা হয়। দেশাত্মবোধ, শক্তির সাধনা ও মানবতার বন্দনা তাঁর কবিতার বিষয়। প্রেম-
প্রকৃতি তাঁর কাব্যের প্রধান পাত্র-পাত্রী ছন্দের ঝংকারে তাঁর কবিতা সমৃদ্ধ হয়।
- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮২ সালে নিমতাগ্রাম, কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বর্ধমান জেলার চুপী গ্রাম।
- 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয় কুমার দত্ত ছিলেন তার পিতামহ।
- তিনি 'ছন্দের রাজা' ও 'ছন্দের জাদুকর' হিসেবে খ্যাত।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে 'ছন্দের জাদুকর' উপাধিতে ভূষিত করেন।
- ছদ্মনাম: নবকুমার, কবিরত্ন, অশীতিপর শর্মা, ত্রিবিক্রম বর্মণ, কলমগীর।
- তিনি সমাজের তুচ্ছ মানুষকে নিয়ে কবিতা রচনা করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এ বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'মেথর'।
- তাঁর মৃত্যুর পর কবি কাজী নজরুল ইসলাম 'সত্যেন প্রয়াণ' কবিতাটি লেখেন।
- তিনি 'বৈদিক গায়ত্রী' ছন্দে বাংলা কবিতা রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত গায়ত্রী ছন্দ এখন 'গৌড়ি গায়ত্রী' নামে পরিচিত। মন্ত্রের ছন্দকে গায়ত্রী বলে।
- তিনি ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ সালে ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
মৌলিক কাব্য: 'সবিতা' (১৯০০), 'সন্ধিক্ষণ' (১৯০৫), 'বেণু ও বীণা' (১৯০৬), 'হোমশিখা' (১৯০৭), 'ফুলের ফসল' (১৯১১), 'কুহু ও কেকা' (১৯১২), 'তুলির লিখন' (১৯১৪), 'অভ্র-আবীর' (১৯১৬), 'হসন্তিকা' (১৯১৯), 'বেলা শেষের গান' (১৯২৩), 'বিদায় আরতি' (১৯২৪), 'কাব্য সঞ্চয়ন' (১৯৩০)।
অনুদিত কাব্য: 'তীর্থ রেণু' (১৯১০), 'মণি-মঞ্জুষা' (১৯১৫), 'তীর্থ সলিল' (১৯১৮)।
উপন্যাস: 'জনম দুঃখী' (১৯১২- এটি অনুবাদ উপন্যাস)।
নাটক: 'রঙ্গমল্লী' (১৯১৩- এটি অনুবাদ নাটক)।
প্রবন্ধ: 'চীনের ধূপ' (১৯১২- এটি অনুবাদ প্রবন্ধ), 'ছন্দ-সরস্বতী' (১৯১৯)।
সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫)
প্রখ্যাত কবি, সংগীত রচয়িতা, নাট্যকার ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফর 'সমকাল' পত্রিকার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার যে ধারা গড়ে ওঠে, তিনি ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে রবীন্দ্রসংগীত পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী- এই বক্তব্য উপস্থাপন করে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি এর বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও বিপ্লবের চেতনাসম্পন্ন অনেক গান রচনা করেন যা জনগণকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর কবিতায় যুগযন্ত্রণা বলিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
- সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালে সাতক্ষীরা (তৎকালীন খুলনা) জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। (আদি নিবাস- পাকিস্তানের পেশোয়ার)
- প্রকৃত নাম সৈয়দ আল্ হাশেমী আবু জাফর মুহাম্মদ বস্তু সিকান্দার।
- তিনি কিছুকাল কলকাতার 'দৈনিক নবযুগ' পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।
- তিনি ১৯৬৬ সালে 'বাংলা একাডেমি পুরস্কার' লাভ করেন।
- ৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
পত্রিকার সাথে যুক্তঃ
'মাসিক সমকাল' (১৯৫৭)- প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, 'দৈনিক ইত্তেফাক' (১৯৫৩)- সহযোগী সম্পাদক, 'দৈনিক মিল্লাত' (১৯৫৪)- প্রধান সম্পাদক।
তাঁর সাহিত্যকর্মসমূহঃ
কাব্যগ্রন্থ:
'বাঙলা ছাড়ো': এ কাব্যের কবিতা 'গরবিনী মা-জনী, 'বিধ্বস্ত নীলিমা', 'আর্ত শব্দাবলী', 'নজরুল: জন্মদিনে'।
'মালব কৌশিক' (১৯৬৯)
'প্রসন্ন প্রহর' (১৯৬৫): এ কাব্যের কবিতা 'আলো চাই' 'বৈরীবৃষ্টিতে' (১৯৬৫), 'তিমিরান্তিক' (১৯৬৫), 'কবিতা' (১৯৬৮), 'বৃশ্চিক লগ্ন' (১৯৭১)।
উপন্যাস: 'মাটি আর অশ্রু' (১৯৪২), 'পূরবী' (১৯৪৪), 'নতুন সকাল' (১৯৪৫)। কিশোর উপন্যাস : 'জয়ের পথে' (১৯৪২), 'নবী কাহিনী, (জীবনী-১৯৫১)।
গল্পগ্রন্থ : 'মতি আর অশ্রু' (১৯৪১)।
রূপক নাটক : 'শকুন্ত উপাখ্যান' (১৯৫৮)।
ঐতিহাসিক নাটক : 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)।
জীবনী নাটক : 'মহাকবি আলাওল' (১৯৬৫)।
অনুবাদ : 'রুবাইয়াৎ ওমর খৈয়াম' (১৯৬৬), 'সিংয়ের নাটক' (১৯৭১)।
বিখ্যাত গান : 'আমাদের সংগ্রাম চলবেই, জনতার সংগ্রাম চলবেই'।
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা যেন জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, যা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিকামী বাঙালির মনে বিশেষ শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। তাঁর কাব্যে অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিপ্লব ও মুক্তির আহবান প্রাধান্য পেয়েছে।
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৫ আগস্ট, ১৯২৬ সালে (৩০ শ্রাবণ, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিট, কালীঘাটে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন।
- পৈতৃক নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার উনশিয়া গ্রামে।
- তিনি বামপন্থি মার্কসবাদী বিপ্লবী কবি হিসেবে খ্যাত হলেও 'কিশোর কবি' হিসেবে পরিচিত।
- তিনি ছিলেন দৈনিক পত্রিকা 'স্বাধীনতা'র কিশোর সভা অংশের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।
- তিনি ১৪ মে, ১৯৪৭ সালে (২৯ বৈশাখ, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ) যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে যাদবপুর টিবি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। (তিনি মাত্র ২০ বছর ৯ মাস জীবিত ছিলেন)।
তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহঃ
'ছাড়পত্র' (১৯৪৮): এটি কবির মৃত্যুর তিনমাস পরে প্রকাশিত হয়। শোষিত মানুষের জীবন-যন্ত্রনা, বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ, অনাচার ও বৈষম্যের প্রতিবাদ এ কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু। এ কাব্যের কবিতা: 'ছাড়পত্র', 'আঠারো বছর বয়স', 'প্রার্থী', 'রানার'।
'ঘুম নেই' (১৯৫০), 'পূর্বাভাস' (১৯৫০), 'মিঠেকড়া' (১৯৫১), 'অভিযান' (১৯৫৩), 'হরতাল' (১৯৬২), 'গীতিগুচ্ছ' (১৯৬৫)।
সাহিত্য সংকলন সম্পাদনাঃ
'আকাল' (১৯৪৩): পঞ্চাশের মন্বন্তর এ সংকলন কবিতাগুলোর মূল প্রেরণা। ১৯৬৬ সালে সুভাস মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাসহ এর নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় এটি ছিল জীবিত অবস্থায় প্রকাশিত তাঁর একমাত্র গ্রন্থ।
| গীতাঞ্জলি (কাব্যগ্রন্থ) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| গীতাঞ্জলি (কাব্যগ্রন্থ) | |
| গীতবিতান (কাব্যগ্রন্থ) | |
| গীতিগুচ্ছ (কাব্যগ্রন্থ) | সুকান্ত ভট্টাচার্য |
গুরুত্বপূর্ণ পঙ্ক্তিঃ
- 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানে রুটি'। (হে মহাজীবন)
- 'কবি সে, ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল না ছোট বয়সে, অথচ শিল্পি বলে সে-ই পেল শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সম্মান।' (এক যে ছিল)
- 'বন্ধু তোমার ছাড় উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ কর চিত্ত, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত'। (উদ্যোগ)
- 'এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার'। (ছাড়পত্র)
- 'এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত ধ্বংসস্তূপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের'। (ছাড়পত্র)
- 'অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি, জন্যেই দেখি ক্ষুব্ধ স্থালি ভূমি'।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সুকুমার রায় (৩০ অক্টোবর ১৮৮৭ – ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩)
সুকুমার রায় ছিলেন বাঙালি শিশুসাহিত্যিক, ননসেন্স ছড়ার প্রবর্তক, লেখক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার এবং সম্পাদক। তিনি জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পুত্র এবং খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পিতা।
জন্ম ও পরিবার:
কলকাতার দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ বংশীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: উপেন্দ্রকিশোর রায়, মাতা: বিধুমুখী দেবী। দুই ভাই: সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায়; তিন বোন: সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা।
শিক্ষাজীবন:
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামে, পরে কলকাতার সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় B.Sc (অনার্স) লাভ করেন। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডে মুদ্রণ ও আলোকচিত্রের উপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান।
কর্মজীবন:
উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদনা ও পারিবারিক ছাপাখানা পরিচালনা করেন।
শিশুদের জন্য ননসেন্স ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
‘ননসেন্স ক্লাব’ ও ‘Monday Club’-এর মাধ্যমে সাহিত্যকর্মের সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করেন।
ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
সাহিত্যকর্ম:
ননসেন্স ছড়া ও কবিতা:
আবোল তাবোল
পাগলা দাশু
খাই-খাই
অবাক জলপান
লক্ষ্মণের শক্তিশেল
ঝালাপালা ও অন্যান্য নাটক
হ য ব র ল
শব্দ কল্প দ্রুম
বহুরুপী
প্রবন্ধ ও অন্যান্য:
ভাষার অত্যাচার (১৯১৫)
বর্ণমালাতত্ত্ব
দেশের-বিদেশের গল্প
জীবনের হিসাব (বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই)
চলচ্চিত্তচঞ্চরী
মৃত্যু:
১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১)
বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার, জীবনসন্ধানী ও সমাজ-সচেতন শিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তিনি ব্যক্তিজীবন ও সমাজসমস্যার প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, মূল্যবোধের বিপর্যয়, মানসিক স্খলন ও পতনের আলেখ্য উজ্জ্বলভাবে অঙ্কন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি প্রবাসে ইউনেস্কোতে কর্মরত থাকায় স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ার ক্ষেত্রে কাজ করেন।
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৫ আগস্ট, ১৯২২ সালে চট্টগ্রামের ষোলশহরে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস নোয়াখালী।
- তিনি 'Contemporary' নামে একটি ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার 'দৈনিক স্টেটসম্যান' পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে যোগদান করেন।
- ১৯৫৬ সালে সিডনী দূতাবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিডনীর ফরাসী দূতাবাসে কর্মরত অ্যান মারিকে বিবাহ করেন। অ্যান মারি ধর্মান্তরিত হয়ে নাম রাখেন আজিজা মোসাম্মত নাসরিন। যদিও তিনি এ নামে পরিচিত হননি।
- তিনি 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৬১), 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৬৫), 'একুশে পদক' (১৯৮৩- মরণোত্তর) পান।
- তিনি ১০ অক্টোবর, ১৯৭১ সালে প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন। প্যারিসের উপকণ্ঠে মদোঁ-স্যুর বেলভুতে তাকে সমাহিত করা হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রকাশিত প্রথম গল্পের নাম 'হঠাৎ আলোর ঝলকানি': এটি ঢাকা কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
তাঁর উপন্যাসসমূহঃ
'লালসালু' (১৯৪৮): এতে গ্রাম-বাংলায় ধর্ম নিয়ে একটি শ্রেণির ব্যক্তিস্বার্থ অর্জন ও নারী জাগরণের চিত্র ফুটে উঠেছে। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে ঢাকার 'কমরেড পাবলিশার্স' থেকে। এর প্রকাশক ছিলেন মুহাম্মদ আতাউল্লাহ। ১৯৬০ সালে উর্দু ভাষায় 'Lal Shalu' নামে করাচি থেকে প্রকাশিত হয়। অনুবাদক ছিলেন কলিমুল্লাহ। ১৯৬১ সালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সহধর্মিণী অ্যান-মারি-থিবো L'arbre sans racines নামে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন, যা প্যারিসের Editions du Seuil প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ 'Tree without Roots' নামে লন্ডনের Chatto and Windus Ltd. এটি প্রকাশ করেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নিজেই এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। পরবর্তীতে এটি জার্মান, চেক, ইন্দোনেশীয় ও জাপানি ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। ২০০১ সালে উপন্যাসটি তানভীর মোকাম্মেল 'লালসালু' নামে চলচ্চিত্রে রূপদান করেন। এতে মজিদ চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ।
'চাঁদের অমাবস্যা' (১৯৬৪): আরেফ আলী নামের এক স্কুল মাস্টারকে অবলম্বন করে মানুষের চেতনাগত জটিলতা উল্লেখ প্রসঙ্গে সামন্ত-সমাজ প্রভাবিত গ্রামীণ জীবনের নানা অসঙ্গতি এ উপন্যাসের মূল বিষয়। এটি মনঃসমীক্ষণমূলক অস্তিত্ববাদী উপন্যাস। এক জ্যোৎস্না রাতে আরেফ আলী ঘর থেকে বের হয়ে দেখে বাঁশঝাড়ের ভেতর এক নগ্ন যুবতির লাশ পড়ে আছে। পাশে দণ্ডায়মান কাদের মিয়া (আরেফ আলী যে বাড়িতে আশ্রিত সেই বাড়ির মালিক)। কাদেরের সহযোগী হয়ে সে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। কিন্তু এ সত্য কথাটি সে বলতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। একদিকে আশ্রয় হারানোর ভয়, অন্যদিকে সত্য গোপনের যন্ত্রণা। অবশেষে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দাদা সাহেব ও আইন কর্তৃপক্ষের নিকট সব সত্য বলে দিয়ে নিজে অস্তিত্ববান হয়ে উঠে। আরেফ আলী চরিত্রের মাধ্যমে উপন্যাসটিতে অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শন রূপায়িত হয়েছে। চরিত্র: আরেফ আলী, কাদের (দরবেশ), আলফাজ উদ্দিন (দাদা সাহেব)।
The Ugly Asian: এটি ইংরেজিতে রচিত। এটি শিবব্রত বর্মণ 'কদর্য এশীয়' (২০০৬) নামে অনুবাদ করেন।
'কাঁদো নদী কাঁদো' (১৯৬৮): ধর্মের নামে আচার-সর্বস্বতা, বিজ্ঞানের নামে অদৃষ্টবাদিতা, বাস্তবতার নামে স্বপ্ন-কল্পনা ইত্যাদির বিরুদ্ধাচরণ, ব্যক্তির সামগ্রিক জীবনের সুখ-দুঃখ ইত্যাদির সার্থক রূপায়ণ এ উপন্যাস। এ মনঃসমীক্ষণমূলক উপন্যাসে ফুটে উঠেছে একদিকে মুহাম্মদ মুস্তফার করুণ জীবনালেখ্য, অন্যদিকে শুকিয়ে যাওয়া বাকাল নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনচিত্র। এটি চেতনাপ্রবাহ রীতিতে লেখা। বাংলা সাহিত্যে ওয়ালীউল্লাহ প্রথম চেতনাপ্রবাহ রীতির প্রয়োগ ঘটান।
How to cook beans: এটি ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস। এটি শিব্রত বর্মণ 'শিম কিভাবে রান্না করতে হয়' নামে অনুবাদ করেন।
তাঁর নাটকসমূহঃ
'বহিপীর' (১৯৬০): এ নাটকে ধর্মকে কিভাবে ভণ্ড বহিপীর নিজের সুবিধার্থে কাজে লাগিয়েছে তাই ফুটে উঠেছে। চরিত্র: বহিপীর, তাহেরা, হাতেম, হাসেম।
'সুড়ঙ্গ' (১৯৬৪): এ নাটকে মানুষের চেতনার গভীরস্থ লোভ, লালসা, ঘৃণা, ঈর্ষাকে রূপকাশ্রয়ে তুলে ধরেছেন।
'তরঙ্গভঙ্গ' (১৯৬৫): অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত মানুষের অন্তর্গত আর্তনাদ শব্দরূপ পেয়েছে এ নাটকে। চরিত্র: আমেনা, মতলুব আলী।
'উজানে মৃত্যু' (১৯৬৬): আধুনিক সভ্যতার অন্তঃসারশূন্যতা, এর ক্লান্তিকর পথপরিক্রমা, নিরাশাবাদী ভাব কিন্তু সুখের জন্য অসীম প্রতীক্ষা, যা শেষ হবার নয়, এগুলোই এ নাটকের বিষয়বস্তু। এটি একটি অ্যাবসার্ড নাটক।
তাঁর গল্পগ্রন্থসমূহঃ
'নয়নচারা' (১৯৫১): এটি তার প্রথম গল্পগ্রন্থ, যা ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয়।
'দুই তীর ও অন্যান্য গল্প' (১৯৬৫): এ গ্রন্থের বিখ্যাত গল্প 'একটি তুলসী গাছের কাহিনি'।
'গল্প সমগ্র' (১৯৭২)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
নীলিমা ইব্রাহিম (১৯২১-২০০২)
বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী ড. নীলিমা ইব্রাহিম আমৃত্যু মানুষের শুভ ও কল্যাণী চেতনায় আস্থাশীল ছিলেন। মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও উদার মানবিকতাবোধ ছিল তাঁর জীবনদর্শন। ১৯৪৫ সালে নিজের পছন্দে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে (বারডেম হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা) বিয়ে করেন। বিয়ের পর নীলিমা রায় চৌধুরী থেকে নীলিমা ইব্রাহিম নামে পরিচিত হন।
- ড. নীলিমা ইব্রাহিম ১১ অক্টোবর, ১৯২১ সালে (সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান) বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মুলঘর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার তাঁর মেয়ে।
- তিনি বাংলা একাডেমির প্রথম নারী মহাপরিচালক ছিলেন।
- ১৯৬২-৬৩ সালে 'রঙ্গম' নামে একটি নাট্যসংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), একুশে পদক (২০০০), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১১) লাভ করেন।
- তিনি ১৮ জুন, ২০০২ সালে মারা যান
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহঃ
প্রবন্ধ: 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' (ফেব্রুয়ারি বইমেলা-১৯৯৪ এবং অখণ্ড প্রকাশ-১৯৯৮। (সূত্র: গ্রন্থটির ভূমিকা অংশে লেখিকার আত্মকথন): এটি মুক্তিযুদ্ধের সত্য কাহিনিনির্ভর জীবন ইতিহাস।
'শরৎ প্রতিভা' (১৯৬০), 'বাংলার কবি মধুসূদন' (১৯৬১), 'বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য' (১৯৮৭), 'অগ্নিস্নাত বঙ্গবন্ধুর ভস্মাচ্ছাদিত কন্যা আমি' (১৯৯৫)।
উপন্যাস: 'বিশ শতকের মেয়ে' (১৯৫৮), 'এক পথ দুই বাঁক' (১৯৫৮), 'কেয়াবন সঞ্চারিণী' (১৯৬২), 'বহ্নিবলয়' (১৯৮৫)।
নাটক: 'দুয়ে দুয়ে চার' (১৯৬৪), 'যে অরণ্যে আলো নেই' (১৯৭৪), 'সূর্যাস্তের পর' (১৯৭৪), 'রোদ জ্বলা বিকেল' (১৯৭৪)।
গল্প: 'রমনা পার্কে' (১৯৬৪)।
আত্মজীবনী: 'বিন্দু-বিসর্গ' (১৯৯১)।
ভ্রমণকাহিনি: 'শাহী এলাকার পথে পথে' (১৯৬৩), 'বস্টনের পথে' (১৯৬৯)।
শেখ মুজিবুর রহমান (১৭ মার্চ ১৯২০ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫)
উপাধি: বঙ্গবন্ধু
পরিচিতি: বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতার পিতা, এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।
জন্ম ও পরিবার
জন্ম: ১৭ মার্চ ১৯২০, টুঙ্গিপাড়া, ফরিদপুর জেলা, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলা, বাংলাদেশ)
পিতা: শেখ লুৎফুর রহমান
মাতা: সায়েরা খাতুন
স্ত্রী: বেগম ফজিলাতুন্নেসা
সন্তান: হাসিনা, কামাল, জামাল, রেহানা, রাশেল
আত্মীয়: শেখ-ওয়াজেদ পরিবার
শিক্ষা
ইসলামিয়া কলেজ, কলকাতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রাজনৈতিক জীবন
১৯৩৭–১৯৪৭: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ
১৯৪৭–১৯৪৯: মুসলিম লীগ
১৯৪৯–১৯৭৫: আওয়ামী লীগ
পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় নেতা
প্রধান পদসমূহ:
প্রথম প্রধানমন্ত্রী: ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ – ২৪ জানুয়ারি ১৯৭৫
রাষ্ট্রপতি: ১১ এপ্রিল ১৯৭১ – ১২ জানুয়ারি ১৯৭২, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
চেয়ারম্যান: বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
অন্যান্য রাজনৈতিক দায়িত্ব
বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের উপদেষ্টা (১৯৪৬–১৯৪৮)
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (১৯৫৩–১৯৬৬)
পূর্ববঙ্গের কৃষিমন্ত্রী (১৯৫৪)
পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৫৪–১৯৫৮)
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (১৯৫৫–১৯৫৮)
পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী (১৯৫৬–১৯৫৭)
সাহিত্যকর্ম ও লেখনী
নাম | প্রকাশকাল | প্রকাশনী | বিষয়বস্তু |
| অসমাপ্ত আত্মজীবনী | জুন ২০১২ | দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড | শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিজের জীবনী লিখেছেন। এই গ্রন্থটি ইংরেজিসহ আরও কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়। |
| কারাগারের রোজনামচা | মার্চ ২০১৭ | বাংলা একাডেমি | গ্রন্থটি ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমানের কারাভোগের দিনলিপি। গ্রন্থটির নামকরণ করেন তার কনিষ্ঠা কন্যা শেখ রেহানা। |
| আমার দেখা নয়াচীন | ফেব্রুয়ারি ২০২০ | বাংলা একাডেমি | ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে গণচীনের পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শান্তি সম্মেলন উপলক্ষে শেখ মুজিবের চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত। |
| আমার কিছু কথা | ২০২০ | ইতিহাস প্রকাশন |
পুরস্কার ও সম্মাননা
জুলিও ক্যুরি শান্তি পুরস্কার (১৯৭৩)
স্বাধীনতা পদক (২০০৩)
গান্ধী শান্তি পুরস্কার (২০২০)
সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)
মৃত্যু
মৃত্যু: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ধানমন্ডি, ঢাকা, বাংলাদেশ
মৃত্যুর কারণ: সেনা অভ্যুত্থান/গুপ্তহত্যা
সমাধি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, গোপালগঞ্জ
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩)
বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নাটক লেখেন দীনবন্ধু মিত্র। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের অনুপ্রেরণায় কবিতা রচনা দিয়ে সাহিত্যজীবন শুরু করেন। বাংলার আধুনিক নাট্যধারার প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমসাময়িক দীনবন্ধু মাইকেল প্রবর্তিত পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নাট্যরচনার পথে না গিয়ে বাস্তবধর্মী সামাজিক নাট্যরচনায় মনোনিবেশ করেন।
- দীনবন্ধু মিত্র ১৮৩০ সালে নদীয়ার চৌবেড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতৃপ্রদত্ত নাম 'গন্ধর্ব নারায়ণ' পরিবর্তন করে নিজে রাখেন 'দীনবন্ধু'।
- তিনি 'সংবাদ প্রভাকর' (১৮৩১) ও 'সংবাদ সাধুরঞ্জন' (১৮৪৭) পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যজীবন শুরু করেন।
- ১৮৭১ সালে লুসাই যুদ্ধের সময় কাছাড়ে সফলভাবে ডাক বিভাগ পরিচালনা করেন, এজন্য সরকার তাঁকে 'রায়বাহাদুর' উপাধিতে ভূষিত করে।
- তিনি ১ নভেম্বর, ১৮৭৩ সালে মারা যান।
দীনবন্ধু মিত্র রচিত বিখ্যাত নাটকঃ
'নীলদর্পণ' (১৮৬০): এটি ঢাকার বাংলা প্রেস থেকে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ। এতে মেহেরপুরের কৃষকদের ওপর নীলকরদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। নাটকটি প্রথম মঞ্চায়ন হয় ঢাকায়। দীনবন্ধু মিত্র নাটকটি 'নীলকর-বিষধর-দংশন-কাতর-প্রজানিকর-ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিক' ছদ্মনামে রচনা করেন। এ নাটকের অভিনয় দেখতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মঞ্চের অভিনেতাদের লক্ষ্য করে জুত ছুড়ে মেরেছিলেন। নাটকটির ঘটনা, রচনা, মুদ্রণ, প্রকাশ ও প্রথম মঞ্চায়ন সব কিছুই বাংলাদেশে বলে একে 'বাংলাদেশের নাটক' বলা হয়।
দীনবন্ধু মিত্রের অন্যান্য নাটকগুলোঃ
'জামাই বারিক' (১৮৭২): প্রহসনধর্মী নাটকটি ১৪ ডিসেম্বর, ১৮৭২ সালে কলকাতার ন্যাশনাল থিয়েটারে প্রথম মঞ্চই হয়। বিন্দুবাসিনী ও বগলার কলহ এবং দুই স্ত্রীর বৃত্তান্ত এ নাটকের মূল বিষয়। এ নাটকে দেখা যায়, সে সময়কালে দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে জামাইদের দেখা করার কোনো সুযোগ ছিলো না, ফলে রাতে জামাইদের ডাক পড়ত অন্তঃপুরে। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: বিজয়বল্লভ, অভয়কুমার, কামিনী, বগলা, বিন্দুবাসিনী।
' কমলে কামিনী' (১৮৭৩): নাটকটি ২০ ডিসেম্বর, ১৮৭৩ সালে কলকাতার ন্যাশনাল থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকটি কাছাড় অঞ্চলের অভিজাত কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ভাবে দুর্বল মানুষদের আখ্যান। চরিত্র: সমরকেতু, শশাঙ্কশেখর, গান্ধারী, সুশীলা, সুরবালা।
'নবীন তপস্বিনী' (১৮৬৩), 'লীলাবতী' (১৮৬৭)।
দীনবন্ধু মিত্রের কাব্যগুলোঃ
'সুরধুনী কাব্য' (১ম ভাগ- ১৮৭১, ২য় ভাগ- ১৮৭৬), 'দ্বাদশ কবিতা' (১৮৭২)। কাব্যটিতে হিমালয় থেকে গঙ্গাদেবীর সাগরসঙ্গমে যাত্রার ছন্দবদ্ধ বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে।
দীনবন্ধু মিত্রের প্রহসনগুলোঃ
'সধবার একাদশী' (১৮৬৬): এটি নব্য ইংরেজি শিক্ষিত যুবকদের মদ্যপান ও বারবনিতা সঙ্গকে ব্যঙ্গ করে রচিত। এতে তিনটি অঙ্ক আছে।
'বিয়ে পাগলা বুড়ো' (১৮৬৬): প্রহসনটি ১৮৭২ সালে প্রথম অভিনীত হয়। এটি সমাজের প্রাচীনপন্থীদের ব্যঙ্গ করে রচিত। এ প্রহসনে বিবাহবাতিকগ্রস্ত এক বৃদ্ধের নকল বিয়ের আয়োজন করে স্কুলের অপরিপক্ক ছেলেরা কিভাবে তাকে নাস্তানুবাদ করে, সে কাহিনিই এ প্রহসনের বিষয়। চরিত্র: নসিরাম, রতা, রাজীব, রাজমণি, কেশব, বৈকুণ্ঠ।
| নীলদর্পণ (নাটক) | দীনবন্ধু মিত্র |
| নীলদংশন (উপন্যাস) | নীলদংশন (উপন্যাস) |
| নীললোহিত (গল্প) | প্রমথ চৌধুরী |
দীনবন্ধু মিত্রের গল্প দুটি হলো 'যমালয়ে জীবন্ত মানুষ' (১২৭৯), 'পোড়া মহেশ্বর' (১২৭৯)।
অক্ষয়কুমার বড়াল (১৮৬০–১৯১৯)
উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকবি অক্ষয়কুমার বড়াল বাংলা গীতিকবিতার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রকৃতি, সৌন্দর্যবাদ, কল্পনাপ্রবণ প্রেম, শোক ও মানববন্দনাই ছিল তাঁর কাব্যের মূল উপজীব্য। নারীপ্রেমের শান্তরস ও গভীর আবেগ তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলা গীতিকবিতার ইতিহাসে তিনি ‘বড়াল কবি’ নামে সুপরিচিত।
অক্ষয়কুমার বড়াল ১৮৬০ সালে কলকাতার চোরাবাগানে এক স্বর্ণব্যবসায়ীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কালীচরণ বড়াল। তাঁদের আদি নিবাস ছিল হুগলী জেলার চন্দননগর।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তবে পড়াশোনায় তিনি বিশেষ উন্নতি করতে পারেননি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অগ্রগতি ছিল সীমিত, তবুও সারাজীবন জ্ঞানচর্চায় তিনি নিবেদিত ছিলেন। এই কারণে তাঁকে একজন স্বশিক্ষিত মানুষ বলা যায়।
শিক্ষা জীবন শেষ হওয়ার পর তিনি দিল্লি অ্যান্ড লন্ডন ব্যাংকের হিসাব বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে নর্থ ব্রিটিশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে হিসাব সচিব পদে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি ১৯ জুন ১৯১৯ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
হেয়ার স্কুলে অধ্যয়নকালে অক্ষয়কুমার বড়াল বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতায় অনুপ্রাণিত হন। বিহারীলাল ছিলেন বাংলা গীতিকবিতার প্রবর্তক। তাঁর প্রেরণাতেই বড়াল কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গদর্শন পত্রিকার ১২৮৯ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘রজনীর মৃত্যু’ প্রকাশিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অক্ষয়কুমার বড়ালকে “বিহারীলালের সাক্ষাৎ ভাবশিষ্য” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কবিতায় নিসর্গপ্রেম, সৌন্দর্যচেতনা ও আবেগের গভীরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি মৃতা স্ত্রীর স্মৃতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘এষা’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি ছিলেন মার্জিত রুচির অধিকারী এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারার অনুসারী।
সমালোচক সুকুমার সেনের মতে, ছন্দের কৃত্রিম চাতুর্যের প্রতি বেশি ঝোঁক না থাকায় তাঁর ভাবপ্রকাশ হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত। তবে আবেগের তীব্রতায় কোথাও কোথাও ভাষার সংযম বজায় রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
কাব্যগ্রন্থ
প্রদীপ (১৮৮৪)
কনকাঞ্জলি (১৮৮৫)
ভুল (১৮৮৭)
শঙ্খ (১৯১০)
এষা (১৯১২)
চণ্ডীদাস (১৯১৭)
সম্পাদিত গ্রন্থ
রাজকৃষ্ণ রায়ের কবিতা (১৮৮৭)
গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর অশ্রুমালা (১৮৮৭)
অক্ষয়চন্দ্র সরকার (১৮৪৬–১৯১৭)
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক অক্ষয়চন্দ্র সরকার ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব। রায়বাহাদুরের পুত্র হয়েও তিনি ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রবল সমর্থক। দেশীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন, স্বদেশী চিন্তা ও স্বায়ত্তশাসনের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন।
অক্ষয়চন্দ্র সরকার জন্মগ্রহণ করেন ১১ ডিসেম্বর ১৮৪৬ সালে বর্তমান হুগলি জেলার চুঁচুড়ার কদমতলায়। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক রায়বাহাদুর গঙ্গাচরণ সরকার।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয় হুগলি কলেজিয়েট স্কুলে এবং পরবর্তীতে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যয়ন করেন। কর্মজীবনে প্রথমে বহরমপুরে এবং পরে চুঁচুড়ায় ওকালতি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
প্রথম যৌবনেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শনের প্রথম সংখ্যায় তাঁর ‘উদ্দীপনা’ নামক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যা তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৭২ সালে তিনি মাসিক নবজীবন এবং ১৮৭৩ সালে সাপ্তাহিক সাধারণী পত্রিকা প্রকাশ করেন। নবজীবন পত্রিকাটি ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মতো খ্যাতনামা সাহিত্যিকরা নিয়মিত লেখালেখি করতেন। রামেন্দ্রসুন্দরের প্রথম বাংলা রচনাও এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।
চুঁচুড়া থেকে প্রকাশিত সাধারণী পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক আলোচনা ও হিন্দুসমাজের ভিত্তি দৃঢ় করা। এই পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু প্রমুখ প্রথম সারির সাহিত্যিকের লেখা প্রকাশিত হতো।
১৮৭৪ সালে তিনি যুক্তাক্ষরবর্জিত শিশুপাঠ্য কাব্য ‘গোচারণের মাঠ’ এবং একই বছরে ‘শিক্ষানবীশের পদ্য’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সারদাচরণ মিত্রের সহযোগিতায় তিনি ‘প্রাচীন কাব্যসংগ্রহ’ নামে একটি কাব্যসংকলন সম্পাদনা করেন। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত এই সংকলনে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, মুকুন্দ চক্রবর্তী প্রমুখ মধ্যযুগীয় কবিদের কাব্য স্থান পায়।
যদিও তিনি কবিতাও রচনা করেছেন, তবে কবিতার তুলনায় গদ্যরচনাতেই তাঁর খ্যাতি অধিক। ১৮৭৪ সালে রচিত ‘সমাজ সমালোচনা’ এবং মৃত্যুর পরে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘রূপক ও রহস্য’ তাঁর গদ্যরচনার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গভাষার লেখক’ গ্রন্থের ‘পিতাপুত্র’ প্রবন্ধে তিনি পিতা গঙ্গাচরণ সরকার ও নিজের সাহিত্যজীবনের কথা তুলে ধরেন।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে কবি হেমচন্দ্র, সংক্ষিপ্ত রামায়ণ, মোতিকুমারী, মহাপূজা, সনাতনী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি রেন্ট বিল ও এজ অব কনসেন্ট বিল (অ্যাক্ট–১০)-এর বিরুদ্ধে প্রবল ব্রিটিশ-বিরোধী অবস্থান নেন এবং স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের সমর্থক ছিলেন। যদিও আদর্শগতভাবে তিনি কংগ্রেসি মধ্যপন্থী ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের ষষ্ঠ অধিবেশনের মূল সভাপতি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতি এবং ভারতসভার প্রথম যুগ্ম সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ১৮৮৬ সালের অধিবেশনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। রায়তদের স্বার্থরক্ষায়ও তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন।
সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাবশিষ্য হলেও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো দৃঢ়তা ও ঋজুতা তাঁর রচনায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি ২ অক্টোবর ১৯১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলা সাহিত্যে প্রাবন্ধিক হিসেবে সমধিক খ্যাত অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন প্রথম বাঙালি বিজ্ঞানমনস্ক লেখক, সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রধান কর্মপুরুষ। তিনি ১৮৩৮ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সহায়তায় 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন।
- অক্ষয়কুমার দত্ত ১৫ জুলাই, ১৮২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার নবদ্বীপের চুপী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ছিলেন 'তত্ত্ববোধিনী' (১৮৪৩) পত্রিকার সম্পাদক। এ পত্রিকাটি ছিল ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মসমাজের মাহাত্ম্য প্রচার।
- তিনি 'দিগদর্শন' (১৮৪২) নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।
- তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে 'অনঙ্গমোহন' নামে কাব্য রচনা করেন। এটি তাঁর প্রথম রচনা।
- কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর নাতি।
- তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে দুর্লভ বৃক্ষচারা সংগ্রহ করে বালিগ্রামের নিজ বাসভবনে 'শোভনোদ্যান' নামে একটি বাগান তৈরি করেন।
- ১৮ মে, ১৮৮৬ সালে তিনি মারা যান।
অক্ষয়কুমার দত্তের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'ভূগোল' (১৮৪১), 'বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার' (১ম খণ্ড- ১৮৫২, ২য়- খণ্ড ১৮৫৩), 'চারুপাঠ' (১ম খণ্ড- ১৮৫২, ২য় খণ্ড- ১৮৫৪, ৩য় খণ্ড- ১৮৫৯), 'ধর্মনীতি' (১৮৫৫), 'পদার্থবিদ্যা' (১৮৫৬), 'ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়' (১ম খণ্ড- ১৮৭০, ২য় খণ্ড- ১৮৮৩)।
অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী (জন্ম: ৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৫০- মৃত্যু: ৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৮) ছিলেন একজন বাঙালি কবি ও সাহিত্যিক।
হাওড়ার আন্দুলের স্বনামধন্য ভরদ্বাজ গোত্রীয় দত্তচৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী। উনার পিতার নাম মিহিরচন্দ্র চৌধুরী, যিনি দত্তচৌধুরী বংশের ২২তম পুরুষ। সাধারণ্যে ইনি বিশেষ পরিচিত ও সুনাম অর্জন না করলেও তার রচনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সমসাময়িক সাহিত্যিকদের প্রেরণা ও উৎসাহ যুগিয়েছিল। তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম "উদাসিনী", "ভারতগাথা" এবং "সাগরসংগমে"। সঙ্গীতচর্চায় রবীন্দ্রনাথ ও তার ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ অক্ষয়চন্দ্রের সহকর্মী ছিলেন। তৎকালে এম এ পাশ করে তিনি অ্যাটর্নীশিপ পরীক্ষা দেন। তিনি বিখ্যাত "ভারতী" পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩–১৯৭৬)
কল্লোল যুগের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও সম্পাদক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতার ঢেউ ওঠে, তার অন্যতম পুরোধা ছিলেন তিনি। রোমান্টিকতা ও গণচেতনার সমন্বয় তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সালে নোয়াখালীতে। তাঁর পিতা রাজকুমার সেনগুপ্ত নোয়াখালী আদালতের একজন আইনজীবী ছিলেন। যদিও জন্ম নোয়াখালীতে, তাঁদের পারিবারিক আদি নিবাস ছিল বর্তমান মাদারীপুর জেলায়। শৈশব, বাল্যজীবন ও প্রাথমিক শিক্ষা নোয়াখালীতেই সম্পন্ন হয়।
১৯১৬ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি কলকাতায় তাঁর অগ্রজ জিতেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কাছে চলে আসেন। এরপর সাউথ সাবার্বান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯২০), সাউথ সাবার্বান কলেজ (বর্তমান আশুতোষ কলেজ) থেকে আই.এ. (১৯২২) এবং ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. (১৯২৪) পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. (১৯২৬) এবং পরে বি.এল. ডিগ্রি (১৯২৯) লাভ করেন।
১৯২৫ সালে তিনি কল্লোল পত্রিকার প্রকাশনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা কল্লোল যুগের সাহিত্য আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিছুদিন তিনি বিচিত্রা পত্রিকায়ও কাজ করেন। ১৯৩১ সালে অস্থায়ী মুন্সেফ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে তিনি সাব-জজ, জেলা জজ এবং ল’ কমিশনের স্পেশাল অফিসার পদে উন্নীত হন। ১৯৬০ সালে বিচারবিভাগ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
১৯২১ সালে প্রবাসী পত্রিকায় নীহারিকা দেবী ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্প—তিন ক্ষেত্রেই অসামান্য কৃতিত্ব দেখান। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বেদে’ (১৯২৮) আধুনিক বাংলা উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই উপন্যাসের জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিনন্দনপত্র লাভ করেন।
‘কাকজোৎস্না’ ও ‘প্রথম কদমফুল’ তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত উপন্যাস। বিচারবিভাগে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে ঘুরে তিনি বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর ছোটগল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘টুটা-ফুটা’ (১৯২৮)। স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘কল্লোল যুগ’ (১৯৫০) বাংলা সাহিত্য ইতিহাসে একটি মূল্যবান দলিল।
তিনি উপন্যাসের আঙ্গিকে আবেগঘন ভাষায় ধর্মগুরুদের জীবনভিত্তিক গ্রন্থও রচনা করেন, যার মধ্যে ‘পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ’ ও ‘বীরেশ্বর বিবেকানন্দ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোটের উপর তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় সত্তরের কাছাকাছি।
উপন্যাস
বেদে (১৯২৮)
কাকজোৎস্না (১৯৩১)
বিবাহের চেয়ে বড় (১৯৩১)
প্রাচীর ও প্রান্তর (১৯৩২)
প্রথম কদমফুল (১৯৬১)
জীবনীগ্রন্থ
পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ (চার খণ্ড, ১৯৫২–১৯৫৭)
বীরেশ্বর বিবেকানন্দ (তিন খণ্ড, ১৯৫৮–১৯৬৯)
উদ্যত খড়্গ (অখণ্ড সংস্করণ)
পরমাপ্রকৃতি শ্রী শ্রী সারদামণি
অখণ্ড অমিয় শ্রী গৌরাঙ্গ
স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ
কল্লোল যুগ (১৯৫০)
জৈষ্ঠের ঝড়
গল্পগ্রন্থ
টুটা-ফুটা (১৯২৮)
অকাল বসন্ত (১৯৩২)
অধিবাস (১৯৩২)
যতনবিবি (১৯৪৪)
কাঠ খড় কেরোসিন (১৯৪৫)
চাষাভুষা (১৯৪৭)
সারেঙ (১৯৪৭)
হাড়ি মুচি ডোম (১৯৪৮)
একরাত্রি (১৯৬১)
কাব্যগ্রন্থ
অমাবস্যা (১৯৩০)
আমরা (১৯৩৩)
প্রিয়া ও পৃথিবী (১৯৩৬)
নীল আকাশ (১৯৪৯)
আজন্মসুরভী (১৯৫১–৫২)
পূর্ব-পশ্চিম (১৯৬৯)
উত্তরায়ণ (১৯৭৪)
নাটক
একাঙ্ক নাট্য-সংকলন (১৯৪৫)
পুরস্কার
সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে
জগত্তারিণী পুরস্কার,
রবীন্দ্র পুরস্কার ও
শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার
লাভ করেন।
তিনি ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৬ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
অজয় ভট্টাচার্য (১৯০৬–১৯৪৩)
অজয় ভট্টাচার্য ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও চিত্রপরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতজগতে তিনি এক স্মরণীয় নাম। হিমাংশু দত্ত, শচীন দেব বর্মন প্রমুখ সুরকারের সুরে এবং বিভিন্ন খ্যাতনামা শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর রচিত বহু গান আজও বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ। অল্প জীবনকাল হলেও বাংলা গান ও চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অজয় ভট্টাচার্যের জন্ম ৬ জুলাই ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের ত্রিপুরার শ্যামগ্রামে। তাঁর পিতা রাজকুমার ভট্টাচার্য কুমিল্লায় ওকালতি করতেন এবং মাতা ছিলেন শশীমুখী দেবী। পিতার কর্মসূত্রে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয় কুমিল্লায়, দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বর পাঠশালায়।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাহিত্য, সংগীত, গান ও নাট্যচর্চায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করার সুবাদে কুমিল্লা শহরে তিনি যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক পশুপতি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী।
চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন রেকর্ড—উভয় ক্ষেত্রেই অজয় ভট্টাচার্যের গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের সূচনালগ্ন থেকেই তাঁর গান শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলে। তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করেন। তাঁর প্রথম লেখা গান ছিল—
‘হাসনুহানা আজ নিরালায় ফুটলি কেন আপন মনে’।
তাঁর রচিত গানগুলোর মধ্যে ‘একদিন যবে গেয়েছিল পাখি’, ‘আজো ওঠে চাঁদ’, ‘আমার দেশে যাইও সুজন’, ‘যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা’ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গান সংকলন আকারেও প্রকাশিত হয়েছে।
গীতিকার হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংলাপ রচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ‘অধিকার’, ‘শাপমুক্তি’, ‘নিমাই সন্ন্যাস’, ‘মহাকবি কালিদাস’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে তিনি কাহিনি বা সংলাপ রচনা করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র দুটি হলো ‘অশোক’ ও ‘ছদ্মবেশী’।
গীতিকার ও চলচ্চিত্রকর্মীর পাশাপাশি অজয় ভট্টাচার্য একজন শক্তিশালী কবিও ছিলেন। তাঁর কবিতায় কল্পনা, আবেগ ও সামাজিক চেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়।
কাব্যগ্রন্থ
রাতের রূপকথা
ঈগল ও অন্যান্য কবিতা
সৈনিক ও অন্যান্য কবিতা
তিনি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৪৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। স্বল্পায়ু হলেও বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অজিতকুমার দত্ত (১৯০৭–১৯৭৯)
অজিতকুমার দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও অধ্যাপক। ত্রিশের দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম এবং কল্লোল সাহিত্যগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৭ সালে ঢাকার বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ)। পিতা অতুলকুমার দত্তের অকালমৃত্যুর পর সাহিত্যপ্রেমী মা হেমালিনী দেবীর তত্ত্বাবধানে তিনি বড় হন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ও সংস্কৃতে ১৯২৮ সালে বি.এ. এবং ১৯৩০ সালে এম.এ.—উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রিপন স্কুল ও রিপন কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপানশন বোর্ড ও ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যাংকে দীর্ঘদিন কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৩০ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমের মাস’ প্রকাশিত হয়। তিনি বুদ্ধদেব বসুর সতীর্থ ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে যৌথভাবে ‘প্রগতি’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। কল্লোল পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে তিনি আধুনিক কবিতা ও ছন্দচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা ও শিশুসাহিত্য মিলিয়ে প্রায় ৫০টি প্রবন্ধ রচনা করেন।
কাব্যগ্রন্থ
কুসুমের মাস, পাতাল কন্যা, নষ্ট চাঁদ, পূর্ণনবা, ছড়ার বই, ছায়ার আলপনা, জানালা, কবিতা-সংগ্রহ, শ্রেষ্ঠ কবিতা, সাদা মেঘ কালো পাহাড়।
প্রবন্ধগ্রন্থ
জনান্তিকে, মন পবনের নাও, সরস প্রবন্ধ, বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস।
তিনি ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৩–১৯৮৩)
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাঙালি নাট্যকার, নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা; গণনাট্য ও আধুনিক বাংলা নাটকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে মানভূম (বর্তমান পুরুলিয়া) জন্ম। ইংরেজিতে অনার্স পাশ (মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র কলেজ, ১৯৫৭) এবং একই বছর ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগদান।
১৯৫৪ সালে ‘সংঘাত’ নাটক রচনা। ১৯৬০ সালে নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা। তিন পয়সার পালা নির্দেশনায় বিশেষ খ্যাতি। রচিত নাটক— সেতু বন্ধন, সওদাগরের নৌকা। ১৯৭৭ সালে নান্দীমুখ গোষ্ঠী গঠন (নাটক: পাপপুণ্য)।
চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় ছুটি (১৯৬৫); বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে ৬৩টি ছবি। হাটে বাজারে-তে অভিনয় উল্লেখযোগ্য।
মৃত্যু: ১৩ অক্টোবর ১৯৮৩, কলকাতা।
অজিতকুমার গুহ (১৯১৪–১৯৬৯)
অজিতকুমার গুহ ছিলেন বাঙালি শিক্ষাবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী; রবীন্দ্রসাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক।
জন্ম: ১৫ এপ্রিল ১৯১৪, কুমিল্লার সুপারিবাগান। পিতা—নৃপেন্দ্রমোহন গুহ।
শিক্ষা: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আই.এ., বি.এ.; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. (১৯৩৯); বি.টি. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।
কর্মজীবন: ১৯৪২ সালে শিক্ষকতা শুরু। জগন্নাথ কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (১৯৪৮–১৯৬৮)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন অধ্যাপক (১৯৫৭–৫৮)। পরে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের উপাধ্যক্ষ।
সাহিত্য ও মতাদর্শ: শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে রবীন্দ্রসাহিত্যে গভীর দখল অর্জন। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা ও ভূমিকা রচনা। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য পাকিস্তান আমলে দু’বার কারাবরণ। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চার প্রবক্তা।
সম্পাদিত গ্রন্থ
মেঘদূত, কৃষ্ণকান্তের উইল, গল্পগুচ্ছ, সোনার তরী, গীতাঞ্জলি।
মৃত্যু: ১২ নভেম্বর ১৯৬৯, কুমিল্লা।
সম্মাননা: মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৩)।
অজিতকুমার গুহ (১৯১৪–১৯৬৯)
অজিতকুমার গুহ ছিলেন বাঙালি শিক্ষাবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী; রবীন্দ্রসাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক।
জন্ম: ১৫ এপ্রিল ১৯১৪, কুমিল্লার সুপারিবাগান। পিতা: নৃপেন্দ্রমোহন গুহ।
শিক্ষা: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ (আই.এ., বি.এ.), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা এম.এ., ১৯৩৯); বি.টি. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।
কর্মজীবন: ১৯৪২ সালে শিক্ষকতা শুরু। জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (১৯৪৮–১৯৬৮)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক (১৯৫৭–৫৮)। টিচার্স ট্রেনিং কলেজে উপাধ্যক্ষ।
সাহিত্য ও মতাদর্শ: শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসাহিত্যে পারদর্শিতা অর্জন। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা ও ভূমিকা রচনা। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়, পাকিস্তান আমলে দুইবার কারাবরণ। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চার প্রবক্তা।
সম্পাদিত গ্রন্থ: মেঘদূত, কৃষ্ণকান্তের উইল, গল্পগুচ্ছ, সোনার তরী, গীতাঞ্জলি।
মৃত্যু: ১২ নভেম্বর ১৯৬৯, কুমিল্লা।
সম্মাননা: মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৩)।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় (৬ নভেম্বর ১৯৩০ (২২শে কার্তিক ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) - ১৯ জানুয়ারি ২০১৯) ছিলেন এক প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি লেখক।
জন্ম: ৬ নভেম্বর ১৯৩০, ঢাকা জেলার রাইনাদি গ্রাম। পিতা: অভিমন্যু বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা: লাবণ্যপ্রভা দেবী।
শিক্ষা: কৃষ্ণনাথ কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (বি.কম., বি.টি.)।
কর্মজীবন: প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, সাটুই রাজেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক, 'যুগান্তর' পত্রিকায় সাংবাদিক।
সাহিত্যকর্ম:
প্রথম গল্প: কার্ডিফের রাজপথ, প্রথম উপন্যাস: সমুদ্র মানুষ (১৯৫৮, মানিক স্মৃতি পুরস্কার)
জনপ্রিয় সিরিজ: নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে (৪ খণ্ড)
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও গল্প: অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান, একজন দৈত্য একটি লাল গোলাপ, সমুদ্র মানুষ, দুটি ভারতবর্ষ প্রভৃতি।
পুরস্কার: মানিক স্মৃতি (১৯৫৮), বিভূতিভূষণ স্মৃতি (১৯৯১), বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৮), সাহিত্য অকাদেমি (২০০১), শরৎ পুরস্কার (২০০৫) ইত্যাদি।
মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, কলকাতা (৮৫ বছর)।
অতুলপ্রসাদ সেন (২০ অক্টোবর ১৮৭১ – ২৬ আগস্ট ১৯৩৪)
জাতি: ভারতীয় বাঙালি গীতিকার, সুরকার ও গায়ক।
জন্ম: ২০ অক্টোবর ১৮৭১, ঢাকার মাতুলালয়।
শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা; লন্ডনে ব্যারিস্টারি।
বিবাহ: মামাতো বোন হেমকুসুমের সঙ্গে বিয়ে, স্কটল্যান্ডে আইনসিদ্ধ।
কর্মজীবন: কলকাতা ও রংপুরে আইনজীবী; পরে লক্ষ্ণৌয়ে আউধ বার অ্যাসোসিয়েশন ও কাউন্সিলের সভাপতি।
সঙ্গীত ও সাহিত্য:
বাংলা গানের ঠুংরি, দাদরা ও রাগধর্মী ঢঙ্গের প্রবর্তক।
প্রধান গান: উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী, বলো বলো বলো সবে, মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
গানের সংখ্যা: ২০৬; উল্লেখযোগ্য ৫০–৬০ গান জনপ্রিয়।
গানের ধারা: দেশপ্রেম, ভক্তি ও প্রেম; বেদনার প্রভাব দেখা যায়।
গ্রন্থ: গীতিপুঞ্জ (১৯৩১), কাকলি (স্বরলিপিসহ)।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদান: বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলনের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, স্থানীয় জনকল্যাণে অর্থ ব্যয়।
মৃত্যু: ২৬ আগস্ট ১৯৩৪, লক্ষ্ণৌ। সমাধিস্থল: গাজীপুরের কাওরাইদ।
মালো বংশের সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। ব্যক্তিগত জীবনের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা, সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রভাববলে সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষের চালচিত্র সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর রচিত সাহিত্যকর্মে। তিনি শৈশবে পিত-মাতৃহীন হন এবং গ্রামের মালোদের চাঁদার টাকায় পড়ালেখা করেন।
- অদ্বৈত মল্লবর্মণ ১ জানুয়ারি, ১৯১৪ সালে গোকর্ণ গ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দরিদ্র ধীবর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি মাসিক 'ত্রিপুরা' পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে নরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিষ্ঠিত এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'নবশক্তি' পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৫ সালে 'সাপ্তাহিক দেশ' পত্রিকায় সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগ দেন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন। সহকারী সম্পাদক: নবযুগ, কৃষক, যুগান্তর, মাসিক মোহাম্মদী।
- তাঁর জীবদ্দশায় 'দলবেঁধে', 'ভারতের চিঠি: পার্ল বাককে', 'এক পয়সার একটি' (১৯৪৪) প্রকাশিত হয়।
- তিনি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৬ এপ্রিল, ১৯৫১ সালে কলকাতার নারকেলডাঙ্গার ষষ্ঠীপাড়ার নিজ বাড়িতে মারা যান।
তাঁর উপন্যাসগুলোঃ
'তিতাস একটি নদীর নাম' (১৯৫৬): এটি ১৯৪৫ সালে প্রথমে 'মাসিক মোহাম্মদী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কয়েকটি অধ্যায় মুদ্রিত হওয়ার পর এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। পরে বন্ধুবান্ধব ও পাঠকদের আগ্রহের কারণে পুনরায় কাহিনিটি লেখেন। লেখকের মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে এটি ৪ খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত তিতাস নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের দরিদ্র, শ্রমজীবী 'মালো' সম্প্রদায়ের আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, শ্রম-বিশ্রাম, সংকীর্ণতা ও ঔদার্যকে লেখক এ উপন্যাসে শিল্পরূপ দিয়েছেন। জীবিকার জন্য তারা দিনরাত পরিশ্রম করলেও প্রাচুর্যের আলো কখনোই তাদের জীবনে প্রবেশ করে না। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রক্তমাংসময় কোনো ব্যক্তি নয়, তিতাস নদী। কিশোর, কিশোরের স্ত্রী, সুবল, বাসন্তী প্রভৃতি চরিত্রগুলো তিতাসকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। ১৯৬৩ সালে উৎপল দত্ত উপন্যাসটির নাট্যরূপ দেন। ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৩ সালে এ উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
'সাদা হাওয়া' (১৯৯৬), 'রাঙ্গামাটি' (১৯৯৭), 'জীবনতৃষা' (অনূদিত), 'নয়াবসত'।
অন্নদাশঙ্কর রায় (১৫ মার্চ ১৯০৪ – ২৮ অক্টোবর ২০০২) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি কবি, লেখক ও ছড়াকার। তিনি উড়িষ্যার ঢেঙ্কানলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নিমাইচরণ রায় ঢেঙ্কানল রাজস্টেটে কর্মরত ছিলেন এবং মাতা হেমনলিনী কটকের প্রখ্যাত পালিত বংশের কন্যা। অন্নদাশঙ্করের শিক্ষাজীবন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় এবং তিনি ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে আই.সি.এস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ইংল্যান্ডে সরকারি খরচে দুই বছর শিক্ষালাভ করেন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মার্কিন কন্যা অ্যালিস ভার্জিনিয়া অনফোর্ডকে বিবাহ করেন, যিনি লীলা রায় নামে পরিচিত এবং তার অনেক বাংলা লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সরকারি চাকরিতে তিনি কুষ্টিয়া, নদীয়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার হাকিম ও জজ পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের বিচার বিভাগের সেক্রেটারি হন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অবসর নেন। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় বাংলা আকাদেমির প্রথম সভাপতি হন।
অন্নদাশঙ্করের সাহিত্যকর্মে উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী অন্তর্ভুক্ত। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে সত্যাসত্য, যার যেথা দেশ, অজ্ঞাতবাস, কঙ্কাবতী, দুঃখমোচন, মর্ত্যের স্বর্গ, অপসারণ, আগুন নিয়ে খেলা, অসমাপিকা, পুতুল নিয়ে খেলা, না। প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে তারুন্য, আমরা, জীবনশিল্পী, ইশারা, জীয়নকাঠি, দেশকালপাত্র, প্রত্যয়, নতুন করে বাঁচা, আধুনিকতা, পারী, শিক্ষার সংকট, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, সাতকাহন, আত্মজীবনী, বিনুর বই, পথে প্রবাসে, জাপানে। ছোটগল্প ও গল্পের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির পরিহাস, দু কান কাটা, হাসন শখী, মন পাহন, যৌবন জ্বালা, কামিনি কাঞ্চন, রুপের দায়।
অন্নদাশঙ্কর রায় বহু পুরস্কারে ভূষিত হন, যেমন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬২), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৩ ও ১৯৯৪), বিদ্যাসাগর পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৫), রবীন্দ্র পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার, বাংলাদেশের জেবুন্নিসা পুরস্কার। এছাড়াও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক, দেশিকোত্তম সম্মান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডিলিট) উপাধি পান। তিনি ২৮ অক্টোবর ২০০২ মৃত্যুবরণ করেন।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ আগস্ট ১৮৭১ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫১) ছিলেন একজন খ্যাতিমান ভারতীয় বাঙালি চিত্রশিল্পী, নন্দনতাত্ত্বিক এবং লেখক। তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রপৌত্র এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র। শৈশব থেকেই শিল্পকলার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং ১৮৮১–১৮৮৯ পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৮৯৬ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলের সহকারী অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম এই মর্যাদা পান। তিনি পশ্চিমা শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় রীতির সংমিশ্রণে চিত্রকলা সৃষ্টি করেন; উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণলীলা সিরিজ, শাজাহান, শেষযাত্রা, বুদ্ধ, সুজাতা, ঋতুসঙ্ঘ, ওমর খৈয়াম, বসন্তের হিমালয়, আরব্যপোন্যাসের গল্প, কবিকঙ্কন চন্ডী, প্রত্যাবর্তন, বজ্রমুকুট এবং কচদেবযানি। সাহিত্যকর্মে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ছাব্বিশ এবং গল্প, কবিতা, চিঠিপত্র, শিল্প আলোচনা, যাত্রাপালা ও পুথিসহ রচনার সংখ্যা প্রায় তিনশত্তর। উল্লেখযোগ্য রচনা: শকুন্তলা, ক্ষীরের পুতুল, রাজ কাহিনী, ভারত শিল্প, ভূতপতরীর দেশ, নালক, বাংলার ব্রত, পথে বিপথে, খাজাঞ্চির খাতা, প্রিয় দর্শিকা, চিত্রাক্ষর, বসন্তের হিমালয়, বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, বুড়ো আংলা, ঘরোয়া, জোড়াসাঁকোর ধারে, আপন কথা, সহজ চিত্র শিক্ষা, ভারত শিল্পের ষড়ঙ্গ, আলোর ফুলকি, ভারত শিল্পে মূর্তি, মাসি, একে তিন তিনে এক, শিল্পায়ন, মারুতির পুঁথি, রং বেরং। যাত্রাপালা ও পুথি রচনার মধ্যে রয়েছে অরণ্যকান্ত পালা, কঞ্জুশের পালা, কাক ও পানির পালা, ঋষিযাত্রা, মারুতির পুঁথি, চাইবুড়োর পুঁথি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৫ ডিসেম্বর ১৯৫১ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
ত্রিশের দশকের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তী। বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল রবীন্দ্র প্রভাব বলয়ের বাইরে এবং কবিতা ছাড়াও তিনি পরিচিত ছিলেন গদ্যশিল্পী হিসেবে। আধুনিক ভাব, দর্শন ও রসের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ সংযোজন ঘটিয়েছেন। মরমী সুর ও আধ্যাত্মিকতাও তাঁর কবিতার অন্যতম বিষয়
- অমিয় চক্রবর্তী ১০ এপ্রিল, ১৯০১ সালে হুগলীর শ্রীরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি পঞ্চপাণ্ডবদের একজন এবং রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম আধুনিক কবি হিসেবে পরিচিত।
- তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব (১৯২৬-৩৩) ছিলেন।
- তিনি ড্যানিশ কন্যা হিয়োর্ডিস সিগার্ডকে বিয়ে করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ বিদেশিনী নববধুর নাম দিয়েছেন 'হৈমন্তী'।
- তিনি ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬০), পদ্মভূষণ উপাধি (১৯৭০) পান।
- তিনি ১২ জুন, ১৯৮৬ সালে শান্তিনিকেতনে মারা যান।
তাঁর কাব্যগুলোঃ
‘ একমুঠো ” (১৯৩৯): বিশ শতকের বিজ্ঞানের যুগে মানুষের ব্যবহারিক জীবনে যেমন জটিলতা বাড়ছে, তেমনি মানুষের মনোজাগতিক চিন্তাতেও বাড়ছে জটিলতা। কবি এ কাব্যে সময়কে বিবেচনায় এনে মানব-মানবীর অন্তর্গত সুখ ও সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ।
' কবিতাবলী ' (১৯২৫), ' উপহার ' (১৯২৭), ‘ খসড়া ’ (১৯৩৮), ‘মাটির দেয়াল' (১৯৪২), ‘অভিজ্ঞান বসন্ত’ (১৯৪৩), ‘ দূরবাণী ’ (১৯৪৩), ‘ পারাপার' (১৯৫৩), ‘ পালাবদল' (১৯৫৫), ‘ঘরে ফেরার দিন' (১৯৬১), ‘হারানো অর্কিড’ (১৯৬৬), ‘পুষ্পিত ইমেজ' (১৯৬৭), ‘অনিঃশেষ’ (১৯৭৬)।
তাঁর বিখ্যাত কবিতা:
‘ বাংলাদেশ’: এটি ‘অনিঃশেষ’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত। এটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এতে উল্লেখ আছে পদ্মা, যমুনা নদী ও প্রকৃতির কথা ।
অমর্ত্য সেন : অমর্ত্য সেন ১৯৩৩ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলায়। তিনি দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্রের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদার রাজনৈতিক অবদান রাখার জন্য ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অমর্ত্য সেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি বর্তমানে ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য।
নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির দিক থেকে তিনি দ্বিতীয় বাঙালি, উপমহাদেশে ষষ্ঠ এবং ২২তম এশীয়। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী প্রথম এশীয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Poverty and Famine', 'The Idea of Justice', 'Identity and Violence: The illusion of destiny', 'The Country of First boys'
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মূলত নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী। তাঁর গল্পগুলোতে পুরান ঢাকার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রচিত। অনাহার, অভাব, দারিদ্র্য ও শোষণের শিকার হয়ে যারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে, সেসব অবহেলিত মানুষের জীবনাচরণ তাঁর গল্প ও উপন্যাসে উজ্জ্বলভাবে অঙ্কিত ।
- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩ সালে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার গোটিয়া গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন।
- পৈতৃক নিবাস চেলোপাড়া, বগুড়া। ডাকনাম- মঞ্জু।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২), একুশে পদক (মরণোত্তর)- ১৯৯৯ পান।
- তিনি ১৯৬৫ সালে জগন্নাথ কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ঢাকা কলেজে আমৃত্যু অধ্যাপনা করেন।
- তিনি ৪ জানুয়ারি, ১৯৯৭ সালে ক্যান্সার রোগে আক্রন্ত হয়ে মারা যান।
তাঁর উপন্যাস দুটি যথা:
‘চিলেকোঠার সেপাই' (১৯৮৭): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এটি উনসত্তরের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। চরিত্র: ওসমান, খিজির, আনোয়ার ।
‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬): এতে গ্রাম বাংলার নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবনালেখ্যসহ তেভাগা আন্দোলন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ১৯৪৩ এর মন্বন্তর, পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি ঐতিহাসিক উপাদান নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। কাৎলাহার বিলের দু'ধারের চাষী-মাঝিদের জীবনচরিত এ উপন্যাসের উপজীব্য।
গল্পগ্রন্থঃ
‘অন্যঘরে অন্যস্বর' (১৯৭৬): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ সালে রচিত নিরুদ্দেশ যাত্রা, উৎসব, প্রতিশোধ, যোগাযোগ, ফেরারী, অন্যঘরে অন্যস্বর ইত্যাদি গল্প নিয়ে তিনি এ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এ গল্পগ্রন্থে প্রথমবারের মতো পুরনো ঢাকার জনজীবন বিশেষত্ব পেয়েছে।
‘খোঁয়ারি’ (১৯৮২), ‘দুধেভাতে উৎপাত' (১৯৮৫), ‘দোজখের ওম' (১৯৮৯)
গল্পঃ
‘রেইনকোট’ (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক), ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল' (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক), ‘ফোঁড়া’ (মার্কসীয় তত্ত্বভিত্তিক), ‘মিলির হাতে স্টেনগান' (স্বাধীনতা পরবর্তী বিশৃঙ্খল বাংলাদেশের প্রকৃত রূপ রূপায়িত)।
প্রবন্ধগ্রন্থঃ
'সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু' (১৯৯৮): এতে ২২টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত আছে।
বাংলাদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও মনস্বী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছেন শিকাগো ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি দীর্ঘকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। আনিসুজ্জামান উচ্চমানের গবেষণা ও সাবলীল গদ্য রচনার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক (২০১৮) ছিলেন।
- আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট গ্রাম) জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর পিতার নাম ডা. এ.টি.এম মোয়াজ্জেম ও মাতার নাম সৈয়দা খাতুন।
- তিনি দাউদ পুরস্কার (১৯৬৫), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৮৫), আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৩, ২১০৭), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট (২০০৫), ভারত সরকারের পদ্মভূষণ (২০১৪), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৫), ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদকসহ (২০১৮) বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
- তিনি ১৪ মে, ২০২০ সালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য' (১৯৬৪), 'মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র' (১৯৬৯), 'স্বরূপের সন্ধানে' (১৯৭৬), 'আঠারো শতকের চিঠি' (১৯৮৩), 'পুরোনো বাংলা গদ্য' (১৯৮৪), 'বাঙালি নারী সাহিত্যে ও সমাজে' (২০০০), 'বাঙালি সংস্কৃতি ও অন্যান্য', 'ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য', 'সংস্কৃতি ও সংস্কৃতি সাধক', 'চেনা মানুষের মুখ', 'আমার একাত্তর' (১৯৯৭), 'আমার চোখে' (১৯৯৯), 'কাল নিরবধি' (২০০৩), 'বাংলাদেশের উৎসব' (২০০২৮), 'মুক্তির সংগ্রাম' (২০১২), 'বিপুলা পৃথিবী' (২০১৫)।
তাঁর রচিত প্রবন্ধ 'জাদুঘরে কেন যাব'। রচনাটি 'ঐতিহ্যায়ন' নামক স্মারক পুস্তিকা থেকে সংকলিত।
আনিসুজ্জামানের 'কাল নিরবধি'ঃ
আনিসুজ্জামানের 'কাল নিরবধি' (২০০৩) একটি স্মৃতিকথা। এটি ২১ নভেম্বর, ১৯৯৭ থেকে ২৮ আগস্ট, ১৯৯৮ পর্যন্ত 'ভোরের কাগজ' পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে এবং ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ থেকে ৮ মার্চ, ২০০২ পর্যন্ত 'প্রথম আলো' পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ স্মৃতিকথার শুরু আনিসুজ্জামানের পূর্বপুরুষের জীবন বৃত্তান্ত দিয়ে এবং শেষ হয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনার মাধ্যমে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আনিসুল হক (জন্ম: ৪ মার্চ ১৯৬৫, নীলফামারী) একজন বাংলাদেশী কবি, লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। তিনি বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক এবং কিশোর আলোর সম্পাদক পদে কর্মরত। মুক্তিযুদ্ধকালীন সত্যঘটনা নিয়ে তার লেখা ‘মা’ উপন্যাসটি বিশেষ জনপ্রিয় এবং এটি ইংরেজি ও ওড়িয়া ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এসএসসি এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন, এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগে যোগদান করেন, কিন্তু অল্পকালের মধ্যে সাংবাদিকতায় চলে আসেন। তিনি ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক দেশবন্ধু, ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ এবং ১৯৯৩–১৯৯৮ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যকর্মের মধ্যে গল্পে ‘যে স্বপ্ন দেখতে জানতো’, ‘আজকালকার ভালোবাসার গল্প’, ‘অসমাপ্ত চুম্বনের ১২ বছর পর’, কবিতায় ‘খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে’, ‘আমি আছি আমার অনলে’, ‘জলরংপদ্য’, ‘তোমাকে ভাবনা করি’, উপন্যাসে ‘মা’, ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’, ‘নিধুয়া পাথার’, ‘আয়েশামঙ্গল’, ‘ফাঁদ’, ‘খেয়া’, ‘ভালোবাসা আমি তোমার জন্য কাঁদছি’, নাটকে ‘নাল পিরান’, ‘করিমন বেওয়া’, ‘প্রত্যাবর্তন’, ‘সাঁকো’, ‘মেগা সিরিয়াল ৫১বর্তী’, ব্যঙ্গাত্মক রচনায় ‘গদ্যকার্টুন’, ‘কথাকার্টুন’, ‘গণতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি’, ‘রাজা যায় রানি আসে’, ‘ছাগলতন্ত্র’, ‘অশ্বডিম্ব’, ‘হাসতে হাসতে খুন’ উল্লেখযোগ্য। তিনি সিনেমার জন্যও কাজ করেছেন, যেমন ‘ব্যাচেলর’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘বৃত্তের বাইরে’ ও ‘স্বপ্নডানায়’। আনিসুল হক পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১২), আনন্দ আলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৯) সহ বিভিন্ন সম্মাননা।
রবীন্দ্র সাহিত্যের অনুরাগী ভক্ত ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী আনোয়ার পাশা ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে দেশাত্মবোধ, মননশীলতা এবং প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা। আমৃত্যু তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক।
- আনোয়ার পাশা ১৫ এপ্রিল, ১৯২৮ সালে ডবকাই গ্রাম, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন।
- রাজশাহী কলেজে বিএ অধ্যয়নকালে 'হাস্নাহেনা' শিরোনামে তাঁর একটি রম্যরচনা প্রকাশিত হয়।
- তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (মরণোত্তর) পান।
- ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাক-বাহিনী (আল বদর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে।
তাঁর সাহিত্যকর্মসমূহঃ
উপন্যাস:
'রাইফেল রোটি আওরাত' (১৯৭৩): এটি মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত প্রথম উপন্যাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে আনোয়ার পাশা এপ্রিলে এটি রচনা শুরু করেন এবং রূপ মাসে সমাপ্ত করেন। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে এ উপন্যাসে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদীপ্ত শাহীনের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।
'নীড় সন্ধানী' (১৯৬৮), 'নিশুতি রাতের গাথা' (১৯৬৮)
'নীড় সন্ধানী' (১৯৬৮), 'নিশুতি রাতের গাথা' (১৯৬৮)
কাব্য : 'নদী নিঃশেষিত হলে' (১৯৭০), 'সমুদ্র শৃঙ্খলতা উজ্জয়িনী' (১৯৭৪)।
আফজাল চৌধুরী (১৯৪২-২০০৪) বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ "কল্যাণব্রত" প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। "সাহিত্যের টাইরেসিয়াস" খ্যাত এই দূরদর্শী কবি আত্মিক দিক দিয়ে নিপীড়িত বিশ্বের সকল মানুষের পক্ষে ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার।
সাহিত্যকর্ম
কাব্যগ্রন্থঃ
কল্যাণব্রত(১৯৬৯), হে পৃথিবী নিরাময় হও(১৯৭৯), শ্বেতপত্র(১৯৮৩), সামগীত দুঃসময়ের(১৯৯১) , শবেমেহেরের ছুটি(২০০৫), নয়া পৃথিবীর জন্য (২০০৬), বিশ্বাসের দিওয়ান (২০০৭), এই ঢাকা এই জাহাঙ্গীরনগর (২০১১), বন্দী আরাকান ও অন্যান্য কবিতা (২০১৭), অন্য গোলার্ধে হৃদয় (অপ্রকাশিত) ইত্যাদি।
প্রবন্ধগ্রন্থঃ
- ঐতিহ্যচিন্তা ও রসুল প্রশস্তি(১৯৭৯)
- তাঁর কাব্যালোকে সৈয়দ আলী আহসান(২০১২)
- সিলেটে সুফি সাধনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১৩)
- মক্কার পথ:মোহাম্মদ আসাদের মহাজীবন (২০১৫)
- প্রতিশ্রুত কথকতা(অপ্রকাশিত)
- কবিতার সংসারে জটিলতা(অপ্রকাশিত)
- সমকালীন সাহিত্যের ধারা (অপ্রকাশিত)
- নান্দনিক ভুবন
অনুবাদঃ
- বার্নাবাসের বাইবেল(১৯৯৬)
- জালালুদ্দীন রুমির কবিতা(২০১৩)
- আলী শরীয়তির কবিতা ইত্যাদি।
নাটক
- সিলেট বিজয় (২০০৫)
- বাঁশি
সম্পাদনাঃ
- আফগানিস্তানঃ আমার ভালোবাসা ( কবি আল মাহমুদ সহযোগে)
- ঐতিহ্য( ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্রিকা)।
পুরস্কার/সম্মাননা
- মহাকবি সৈয়দ সুলতান সাহিত্য পুরস্কার
- রাগীব রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০১)
- কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪)
- বিএনএসএ পুরস্কার ইত্যাদি।
কবি আফজাল চৌধুরী ২০০৪ সালের ৯ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন।
আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩)
প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আবু ইসহাক ছিলেন জীবনসন্ধানী লেখক। তাঁর রচনার মূল বিষয় ছিল বিশ্বযুদ্ধ, দূর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থ নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র, যা তিনি নির্মোহ দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন।
- আবু ইসহাক ১ নভেম্বর, ১৯২৬ সালে শরিয়তপুরের নডিয়া উপজেলার শিরঙ্গল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৪০ সালে 'রসের জলসায়' গল্পটি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত 'নবযুগ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
- ১ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালে এনএসআই এর খুলনা বিভাগের প্রধানের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমির 'সমকালিন বাংলা ভাষার অভিধান' (১৯৯৩) সম্পাদনা করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৩), একুশে পদক (১৯৯৭) পান।
- চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে খুলনার খালিশপুর এলাকায় 'সূর্যদীঘল বাড়ি' নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন।
- তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ সালে ঢাকায় মারা যান।
তাঁর উপন্যাসগুলোঃ
'সূর্য দীঘল বাড়ী' (১৯৫৫): এটি প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। পঞ্চাশের মন্বন্তর, দেশ বিভাগ, স্বাধীনতার আনন্দ ও বেদনাসহ বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের বিশ্বস্ত দলিল এ উপন্যাস। এপ্রিল, ১৯৮৯ সালে এর কিশোর সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রধান চরিত্র: জয়গুন।
'পদ্মার পলিদ্বীপ' (১৯৮৬): এটির প্রথম ১৬টি অধ্যায় ১৯৭৪-৭৬ পর্যন্ত 'মুখর মাটি' নামে বাংলা একাডেমির 'উত্তরাধিকার' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এর অনেক পরে তিনি উপন্যাসটি ৩২টি অধ্যায়ে সমাপ্ত করে ১৯৮৬ সালে 'পদ্মার পলিদ্বীপ' নামে প্রকাশ করেন। এ উপন্যাসের একদিকে রয়েছে পদ্মাতীর কেন্দ্রীক চরের অধিবাসীর জীবনসংগ্রাম, পদ্মার বুকে জেগে উঠা চর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাত, অন্যদিকে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় গ্রামীণ বা চরাঞ্চলের মানুষের জীবনের দুর্বিষহ দিনাতিপাত। চরিত্র: ফজল, এরফান মাতব্বর, জরিনা।
'জাল' (১৯৮৮): এটি গোয়েন্দা কাহিনি ভিত্তিক উপন্যাস।
তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'মহাপতঙ্গ' (১৯৬৩): এ গল্পটিতে একজোড়া চড়ুই পাখির জবানিতে একদিকে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ, অন্যদিকে অভিশাপের কথা বিধৃত হয়েছে। এ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ Dragon Fly এর নাট্যরূপের জন্য 'সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক পুরস্কার' লাভ করেন।
'অভিশাপ' (১৯৪০): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প। যা কাজী নজরুল ইসলামের 'নবযুগ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'বনমানুষ': ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে গল্পটি রচিত।
'হারেম' (১৯৬২), 'জোঁক' (ছোটগল্প)।
নাটক: 'জয়ধ্বনি'
স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ: 'স্মৃতিবিচিত্রা'
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১)
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পঞ্চাশ দশকের অন্যতম কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর কবিতায় আবহমান বাংলার ছবি পাওয়া যায়। তাঁর কবিত সূচনা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এবং বিকাশ ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামি জনজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন-বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ।
- আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর-ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।
- তিনি বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং এরশাদ সরকারের কৃষি মন্ত্রী ছিলেন।রাশেদ খান মেনন তাঁর ভাই এবং সেলিমা রহমান একমাত্র বোন ।
- ‘পদাবলি’ নামে কবিদের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৮৫) পান ।
- তিনি ১৯ মার্চ, ২০০১ সালে মারা যান।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ গুলো:
‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫): এটি তাঁর প্রথম কাব্য ।
‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৮১): বাঙালি জাতিসত্তার মৃত্তিকামূলে শিকড় সঞ্চার করে এ কাব্যগ্রন্থে কবি ঐক্যবদ্ধ চেতনায় সাহসী মানুষের সম্ভাবনার ছবি এঁকেছেন। এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি', ‘কোন এক মাকে' (কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা), ‘মাগো ওরা বলে'। এতে ৩৯টি কবিতা স্থান পেয়েছে।
‘কখনো রং কখনো সুর' (১৯৭০), ‘কমলের চোখ' (১৯৭৪), ‘সহিষ্ণু প্রতীক্ষা' (১৯৮২), ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা' (১৯৮৩), ‘আমার সময়’ (১৯৮৭), ‘নির্বাচিত কবিতা' (১৯৯১), ‘আমার সকল কথা’ (১৯৯৩), ‘মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ' (২০০২)।
শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৭)
বাংলাদেশের একটি বিশেষ এলাকার জীবনপ্রবাহকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম প্রাণবন্তরূপে পরিবেশন করে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষ ছিল তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য এবং এসকল মানুষের প্রতি ছিল প্রগাঢ় সহানুভূতি। তাঁর গল্প-উপন্যাসে সমকালীন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট চিত্রিত হয়েছে।
- শামসুদ্দীন আবুল কালাম আগস্ট, ১৯২৬ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটির কামদেবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর প্রকৃত নাম আবুল কালাম শামসুদ্দীন। 'দৈনিক আজাদ' পত্রিকার সম্পাদকের নাম তাঁর নামের সাথে মিলে যাওয়ায় তিনি ১৯৫৫ সালে পত্র-পত্রিকায় ঘোষণা দিয়ে 'শামসুদ্দীন আবুল কালাম' নামে পরিচিত হন।
- তিনি 'মাহেনও' (১৯৪৯) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
- তিনি ১৯৯৪ সালে 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' পান।
- তিনি ১০ জানুয়ারি, ১৯৯৭ সালে ইতালির রোমে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকায় সমাহিত করা হয়।
তাঁর উপন্যাসগুলোঃ
'আলমনগরের উপকথা' (১৯৫৪): সামন্তবাদ ও ধনতন্ত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং উভয়ের দ্বন্দ্বের ফলে গণচেতনার প্রকাশই এ উপন্যাসের মূল বিষয়।
'কাশবনের কন্যা' (১৯৫৪): এ উপন্যাসে বরিশাল অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, লোকজীবন, গ্রামীণ দিগন্ত ফটোগ্রাফিকভাবে চিত্রায়িত। এ গ্রামে দুঃখ-দারিদ্র্য থাকলেও গ্রামই সুখের স্বর্গ, সমস্ত বিশ্বাসের আধার। চরিত্র: শিকদার, হোসেন, মেহেরজান, জোবেদা।
| কাশবনের কন্যা (উপন্যাস) | শামসুদ্দীন আবুল কালাম |
| কুঁচবরণ কন্যা (কাব্যগ্রন্থ) | কুঁচবরণ কন্যা (কাব্যগ্রন্থ) |
| ধানকন্যা (গল্প) | আলাউদ্দিন আল আজাদ |
'জায়জঙ্গল' (১৯৭৩): এতে সুন্দরবনের জনবিরল বনজঙ্গলঘেরা পরিবেশ চিত্রায়িত হয়েছে। উপন্যাসের পটভূমি সুন্দরবন হলেও চরিত্রগুলো এ অঞ্চলের নয়, সবাই সেটেলার। জনসংখ্যা, দারিদ্র্যের চাপে তারা পিতৃপুরুষের নিবাসভূমি ছেড়ে সমুদ্র তীরবর্তী শ্বাপদসংকুল সুন্দরবন অঞ্চলে বাস করতে বাধ্য হয়েছে।
'সমুদ্র বাসর' (১৯৮৬): বৃহত্তর বরিশাল জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রতীরবর্তী জনজীবনকে কেন্দ্র করে রচিত এ উপন্যাস।
'দুই মহল' (১৯৫৫), 'জীবনকাব্য' (১৯৫৬), "কাঞ্চনমালা' (১৯৬১), 'মনের মতো ঠাঁই' (১৯৮৫), 'যার সাথে যার' (১৯৮৬), 'নবান্ন' (১৯৮৭), 'কাঞ্চনগ্রাম' (১৯৯৮)।
তাঁর গল্পগ্রন্থসমূহ
'অনেক দিনের আশা' (১৯৫২): এ গ্রন্থের গল্প 'মৌসুম'। 'ঢেউ' (১৯৫৩), 'পথ জানা নেই' (১৯৫৩), 'দুই হৃদয়ের তীর' (১৯৫৫), 'শাহের বানু' (১৯৫৭), 'পুঁই ডালিমের কাব্য' (১৯৮৭)।
আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫)
আবুল হাসান ষাটের দশকের একজন সৃষ্টিশীল কবি হিসেবে খ্যাত। আত্মগত দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
- আবুল হাসান ৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ার বর্নিগ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস: ঝনঝনিয়া গ্রাম, নাজিরপুর, পিরোজপুর।
- তাঁর প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া। সাহিত্যিক নাম আবুল হাসান।
- তিনি ১৯৬৯ সালে 'ইত্তেফাক' পত্রিকায় বার্তা বিভাগে যোগ দেন। পরবর্তীতে 'গণবাংলা'র সহকারী সাহিত্য সম্পাদক (১৯৭৩), দৈনিক 'গণকণ্ঠ' পত্রিকার সহসম্পাদক (১৯৭৪) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- তিনি ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫, মরণোত্তর), একুশে পদক (১৯৮২, মরণোত্তর) পান।
- তিনি ২৬ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
তাঁর প্রকাশিত সাহিত্যসমূহ:
কাব্যগ্রন্থ: রাজা যায় রাজা আসে' (১৯৭২), 'যে তুমি হরণ করো' (১৯৭৪), 'পৃথক পালঙ্ক' (১৯৭৫)।
কাব্যনাট্য : 'ওরা কয়েকজন' (১৯৮৮)- এটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়।
গল্প সংকলন: 'আবুল হাসান গল্প সংগ্রহ' (১৯৯০)।
আবুল হুসেন (১৮৯৬ - ১৫ অক্টোবর ১৯৩৮) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় লেখক, চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারক।
১৯৩২ সালে তিনি শিক্ষকতা ত্যাগ করে কলকাতা হাই কোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন। বাংলার আইন সভায় গৃহীত ওয়াকফ আইনের মূল খসড়া তিনি প্রণয়ন করেছিলেন।
বাংলার মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে আবুল হুসেন লেখালেখি করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠিত হয়। তিনি এতে অংশ নিয়েছিলেন। সংগঠনের মুখপত্ররূপে প্রকাশিত শিখা পত্রিকার সম্পাদনায় তিনি জড়িত ছিলেন।
তাঁর রচনাবলির মধ্যে রয়েছে: *বাঙালী মুসলমানদের শিক্ষাসমস্যা (১৯২৮)
- মুসলিম কালচার (১৯২৮)
- বাঙলার নদীসমস্যা
- শতকরা পঁয়তাল্লিশ জের
- সুদ-রিবা ও রেওয়াজ
- নিষেধের বিড়ম্বনা
- Helots of Bengal
- Religion of Helots of Bengal,
- Development of Muslim Law in British
- কৃষকের আর্তনাদ
- কৃষকের দুর্দশা
- কৃষি বিপ্লবের সূচনা''
তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি আবুল হুসেন রচনাবলী নামে তাঁর রচনাসমগ্র প্রকাশ করে।
মৃত্যু
আবুল হুসেন ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)
আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন সাহিত্যিক ও সফল সাংবাদিক। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ দলের অন্যতম কর্মী ছিলেন।
নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসুর কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগ দেন। পাকিস্তান সরকার বেতার ও টিভিতে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী বলে প্রচার করলে তিনি সে সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দান করেন। সমকালীন সমাজজীবনে বিরাজমান অন্যায় অত্যাচারের চিত্র তিনি ব্যঙ্গরসাত্মক ভাষার মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। তাঁর ব্যঙ্গধর্মী রচনায় সমাজের মুখোশধারী মানুষের অন্তরের রূপ সার্থকভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
- আবুল মনসুর আহমদ ৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানিখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ইংরেজি দৈনিক The Daily Star পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা এবং 'A Golden Age' এর লেখিকা তাহমিমা আনামের দাদা।
- তিনি 'দৈনিক কৃষক' (১৯৩৮) ও 'দৈনিক ইত্তেহাদ' (১৯৪৬) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং 'ছোলতান' (১৯২৩) ও 'মোহাম্মদী' (১৯২৩) পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন।
- তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি (১৯৫৩-৫৮), যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার প্রণেতা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী (১৯৫৪) ছিলেন। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী ও ১৯৫৬-৫৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।
- বিদ্রূপাত্মক রচনার জন্য তিনি বিখ্যাত।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০) পান।
- তিনি ১৮ মার্চ, ১৯৭৯ সালে ঢাকায় মারা যান।
আবুল মনসুর আহমদের উপন্যাসসমূহঃ
'সত্যমিথ্যা' (১৯৫৩): এটি Johan Bojer এর 'The Power of a lie' গ্রন্থের বাংলা ভাবানুবাদ।
'জীবনক্ষুধা' (১৯৫৫): বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও লালিত আদর্শের সাথে বাস্তবতার যে দ্বন্দ্ব, তারই প্রতিফলন এ উপন্যাস। এ উপন্যাসের নায়ক হালিম মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি।
'আবে হায়াত' (১৯৬৮): গ্রামের পির পরিবারের সন্তান হামিদ ডাক্তার হিসেবে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। মুখে সে জনদরদী হলেও প্রকৃতপক্ষে সে অর্থলিপ্স। বাইরে বিজ্ঞানমনস্ক হলেও ভিতরে সে আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। প্রাক্তন বিবাহিত সহপাঠী রাজিয়াকে বিয়ে করার জন্য সে বিজ্ঞানের খোলস ছেড়ে আধ্যাত্মিকতার পথ বেছে নেয়, এখানেই তাঁর মুখোশ উন্মোচিত হয়। এ সব নিয়েই রচিত 'আবে-হায়াত'।
আবুল মনসুর আহমদের গল্পগ্রন্থসমূহঃ
'আয়না' (১৯৩৫): এটির ভূমিকা লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম। মুখবন্ধে নজরুল লেখেন, 'যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে।' হুজুরে কেবলা, গো-দেওতা-কা দেশ, নায়েবে নবী, লীডরে কওম, মুজাহেদীন, বিদ্রোহী সংঘ, ধর্মরাজ্য- এই সাতটি গল্প নিয়ে রচিত 'আয়না' গল্পগ্রন্থ। আবুল মনসুর আহমদের 'বিদ্রোহী সংঘ' ব্যতীত অন্যান্য সব গল্পে ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ীদের স্বরূপ তুলে ধরেছেন।
'ফুড কনফারেন্স' (১৯৪৪): ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষের করুণ চিত্র এতে প্রতিফলিত।
'আসমানী পর্দা' (১৯৬৪)।
আবুল মনসুর আহমদের অন্যান্য গ্রন্থসমূহঃ
প্রবন্ধ:
'বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা' (১৯৮২): ৪২টি নিবন্ধের সমন্বয়ে গ্রন্থিত এ প্রবন্ধগ্রন্থটির ৩৯টি নিবন্ধ ১৯৭২-৭৩ সালে 'দৈনিক ইত্তেফাক' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে নিবন্ধগুলো একত্র করে আবুল মনসুর আহমদের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে 'আহমদ পাবলিশিং হাউস' থেকে 'বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা' নামে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের নিবন্ধগুলো পাঁচমিশালি হলেও প্রত্যেকটির মূল বক্তব্য অভিন্ন। প্রবন্ধগুলোয় প্রাধান্য পেয়েছে নানান দিক থেকে উদ্ভূত জাতীয় সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের পথ-নির্দেশনা। উল্লেখযোগ্য নিবন্ধ: 'গণতন্ত্র, সমাজবাদ ও শ্রেণীসংগ্রাম', 'আমাদের কাজ শেষ হয় নাই, শুরু হইয়াছে মাত্র', 'রাষ্ট্র পরিচালনায় যৌবনের অধিকার স্বীকৃতি', 'স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের আর্থিক পুননির্মাণ', 'পাট বাঁচিলে আমরা বাঁচিব : এ কথা আজো সত্য', 'প্রথম নির্বাচনেই সংবিধানকে সফল করিতে হইবে', 'গণতন্ত্রী সমাজবাদী রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা' প্রভৃতি।
'পাক-বাংলার কালচার' (১৯৬৬)।
শিশু সাহিত্য:
'গালিভারের সফরনামা' (১৯৫৯): এটি শিশু বিষয়ক সাহিত্য। এটি Jonathan Swift এর Guliver's Travels অবলম্বনে রচিত।
'মুসলমানী কথা' (১৯২৪): ইসলামের নবী-রাসুলদের কাহিনিভিত্তিক কিশোর গ্রন্থ।
'ছোটদের কাসাসুল আম্বিয়া' (১৯৪৯), আদুভাই (গল্প)।
আত্মজীবনী: 'আত্মকথা' (১৯৭৮)
রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থ:
'আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর' (১৯৬৯), 'শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু' (১৯৭২)।
| জীবনক্ষুধা (উপন্যাস) | আবুল মনসুর আহমদ |
| মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) | কাজী নজরুল ইসলাম |
আব্দুর রউফ চৌধুরী (মার্চ ১, ১৯২৯ - ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৯৬) একজন বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক। তিনি একজন স্বল্পপ্রজ লেখক ছিলেন। পাঁচটি উপন্যাস, চারটি গল্পগ্রন্থ, চারটি প্রবন্ধ সংকলন, ১০টি গবেষণা ও ইতিহাস গ্রন্থ, ছয়টি ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ রচনা, অন্যান পাঁচটি গ্রন্থ, দুটো কবিতাগ্রন্থ এই নিয়ে তার রচনাসম্ভার। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তার রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা। বাংলা সাহিত্যে তিনি প্রশংসিত বাংলাদেশী লেখক।
উপন্যাস
- পরদেশে পরবাসী
- নতুন দিগন্ত
- সাম্পান ক্রুস
- অনিকেতন
- মা
ছোট গল্প সংকলন
- গল্পসম্ভার (১০টি গল্প)
- বিদেশী বৃষ্টি (১০টি গল্প)
- গল্পভুবন (১০টি গল্প)
- গল্পসল্প (১০টি গল্প)
প্রবন্ধ সংকলন
- প্রবব্ধগুচ্ছ (১৬টি প্রবন্ধ)
- নজরুল : নন্দনের অন্দরমহল
- রবীন্দ্রনাথ : চির-নূতনের দিল ডাক
গবেষণা ও ইতিহাস
- ফরাসি বিপ্লব
- ১৯৭১ (দুই খণ্ড)
- একটি জাতিকে হত্যা
- স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা
- যুগে যুগে বাংলাদেশ
- বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা (পাঁচ খণ্ড)
- মহান একুশে
- কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস
- বাইবেলে নবী মোহাম্মদ সা.
- আরব জাতির ইতিহাস
- ধর্মের নির্যাস
- মুক্তিসংগ্রাম সমগ্র
- ইসলামি রাচনাসমগ্র
হবিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (মরণোত্তর) (২০০১)
মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ছিলেন বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত। তিনিই প্রথম বাংলায় আকাশের তারাসমূহের ছক প্রস্তুত করেন এবং তাঁর পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের প্রথম খ-গোলক নির্মিত হয়। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জন্ম ও মৃত্যু
মোহাম্মদ আবদুল জব্বার জন্মগ্রহণ করেন ১ জানুয়ারি ১৯১৫ সালে, পাবনা জেলার সুজানগর থানার গোপালপুর গ্রামে। তিনি ২০ জুলাই ১৯৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
রচনাবলি
বিশ্ব রহস্যে নিউটন ও আইনস্টাইন (১৯৪২)
খগোল পরিচয় (১৯৬৫)
তারা পরিচিতি (১৯৬৭)
প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা (১৯৭৩)
বিশ্ব ও সৌরজগৎ (১৯৮৬)
আকাশ পট (১৯৮৯)
টেক্সট বুক অব ইন্টারমিডিয়েট স্ট্যাটিসটিক্স
টেক্সট বুক অব ইন্টারমিডিয়েট ডাইনামিক্স
টেক্সট বুক অব ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস
টেক্সট বুক অব ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস
আবদুল জব্বার ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। দারিদ্র্যপীড়িত সাধারণ মানুষের জীবন, বিশেষত বাংলার পল্লীজীবনের বাস্তব ও মমতাময় রূপায়ণ তাঁর সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফিচারধর্মী রচনায় ও কথাচিত্রে তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি ‘অশোক’ ও ‘ফিরদৌসী’ ছদ্মনামেও লিখতেন।
জন্ম ও মৃত্যু
আবদুল জব্বার জন্মগ্রহণ করেন ৩০ এপ্রিল ১৯৩৪ সালে, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সাতগাছিয়া থানার নোদাখালি গ্রামে। তিনি ৩০ নভেম্বর ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
সাহিত্যকর্ম / রচনাবলি
উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ
অশান্ত ঝিলাম
মোঘল প্রেমকথা
ভরা কটাল
মরিয়মের কান্না
ইলিশমারির চর
পল্লীর পদাবলী (১৯৭৫)
রূপের আগুন
মাতালের হাট
মুখের মেলা
ঝিনুকের নৌকা
বিদ্রোহী বাসিন্দা
মাটির কাছাকাছি
ফিচারধর্মী গ্রন্থ
বাংলার নৈবেদ্য
গ্রাম গঞ্জের পথে পথে
আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০)
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, জগন্নাথ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, গবেষক ও সাহিত্য সম্পাদক। রবীন্দ্রোত্তরকালে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে তিনি ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দেশের প্রধান কবিদের সবাই যখন 'জাতীয় কবিতা পরিষদ' গঠন করে এরশাদের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেন, তখন তিনি এরশাদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত 'এশীয় কবিতা উৎসব'- এ একাধিকবার যোগদান করেন। জনশ্রুতি আছে, এরশাদ ঐ সময় যে কবিতাগুলি নিজের নামে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করতেন সেগুলোর রচয়িতা ছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ।
- আবদুল মান্নান সৈয়দ ৩ আগস্ট, ১৯৪৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার ইছামতি নদীর তীরে জালালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পর ঢাকার কুলি রোডে (বর্তমান গ্রীন রোড) স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
- তিনি 'অশোক সৈয়দ' ছদ্মনামে লিখতেন এবং 'পরাবাস্তব কবি' হিসেবে খ্যাত।
- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম 'পোয়েট ইন রেসিডেন্ট'।
- তিনি কবি জীবনানন্দ দাশ ও কাজী নজরুল ইসলামের উপর গবেষণার প্রবাদ পুরুষ হিসেবে খ্যাত।
- ১৯৫৯ সালে ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে 'সোনার হরিণ' কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে কবিতার জগতে আত্মপ্রকাশ করেন।
- তিনি 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৮১), 'নজরুল পুরস্কার' (১৯৯৮), 'নজরুল পদক' (২০০১) ও একুশে পদক পান।
- তিনি ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০ সালে মারা যান।
তাঁর রচিত সাহিত্যকর্মসমূহ:
কাব্য:
‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ' (১৯৬৭), 'জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা' (১৯৬৯), 'ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ' (১৯৭৪), ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড' (১৯৮২), ‘পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি' (১৯৮৩), ‘পরাবাস্তব কবিতা' (১৯৮৪), 'মাছ সিরিজ' (১৯৮৪), ‘সকল প্রশংসা তাঁর' (১৯৯৩), 'নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা' (১৯৯৭)।
উপন্যাস:
‘পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী' (১৯৭৪), ‘কলকাতা’ (১৯৮০), ‘অ-তে অজগর' (১৯৮২), ‘পোড়ামাটির কাজ’ (১৯৮২), ‘গভীর গভীরতর অসুখ' (১৯৮২), ‘ক্ষুধা প্রেম আগুন' (১৯৯৪), ‘শ্রাবন্তীর দিনরাত্রি' (১৯৯৮), ‘হে সংসার হে লতা'।
গল্পগ্রন্থ:
‘একরাত্রি': এক কাজ পাগল কেরানীর নিষ্ঠাময় চাকরী জীবনের গল্প । ‘মার্চ’: পরাবাস্তব চেতনা ভিত্তিক গল্প । ‘সত্যের মত বদমাশ' (১৯৬৮), 'চলো যাই পরোক্ষে (১৯৭৩), ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা' (১৯৭৭), ‘নেকড়ে হায়েনা ও তিন পরী' (১৯৯৭), ‘অমরতার জন্য মৃত্যু'।
কাব্যনাট্য:
‘চাকা' (১৯৮৫), ‘কবি ও অন্যরা' (১৯৯৬)।
প্রবন্ধ:
‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’, ‘করতলে মহাদেশ’, ‘আমার বিশ্বাস’, ‘ছন্দ’।
স্মৃতিকথা :
‘আমার বিশ্বাস' (১৯৮৮), ‘স্মৃতির নোটবুক' (২০০১), ‘ভেসেছিলাম ভাঙা ভেলায়' (২০০৯), 'মিটিলনা সাধ ভালবাসিয়া তোমায়' (২০১২)।
প্রবন্ধ গবেষণা:
‘শুদ্ধতম কবি' (১৯৭২), ‘নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা' (১৯৭৭), ‘নজরুল : কালজ কালোত্তর' (১৯৮৭), ‘আধুনিক সাম্প্রতিক' (২০০১)।
আবদুল হাই শিকদার (জন্ম ১৯৫৭) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। তিনি মূলত কবি হিসেবেই অধিক পরিচিত। মানবতা, স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ, প্রেম, প্রকৃতি ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। লেখনীতে জাতিসত্তা ও বিশ্বমানবতার প্রকাশের কারণে তাঁকে ‘জাতিসত্তার কবি’ বলা হয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি গণমাধ্যম, গবেষণা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
জন্ম
আবদুল হাই শিকদার জন্মগ্রহণ করেন ১ জানুয়ারি ১৯৫৭ সালে, কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদীর তীরে দক্ষিণ ছাট গোপালপুর গ্রামে।
রচনাবলি
কাব্যগ্রন্থ
আশি লক্ষ ভোর (১৯৮৭)
আগুন আমার ভাই (১৯৯১)
রেলিঙ ধরা নদী (১৯৯২)
মানব বিজয় কাব্য (১৯৯২)
এই বধ্যভূমি একদিন স্বদেশ ছিলো (১৯৯৭)
লোডশেডিং নামিয়াছে (২০০১)
দুধকুমারের জানালাগুলি (২০০১)
সুন্দরবন গাথা (২০০৩)
শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৬)
কসম (২০১০)
নদীর মেয়ে বাংলাদেশ (২০১৮)
ইশক আবাদ (২০২২)
কবিতাসমগ্র (অখণ্ড)
প্রবন্ধ
বাংলাদেশের পথ
জানা অজানা মওলানা ভাসানী
বাংলা সাহিত্য : কোলাহলের বাইরে
জ্যোতির্ময় জিয়া এবং কালো মেঘের দল
তুমি রুমি
গল্প
শুকুর মামুদের চুয়াত্তর ঘাট
ভ্রমণকাহিনি
কবিতার্থ চুরুলিয়া
ফিরে ফিরে আসি
ভ্রমণ সমগ্র
শিশুতোষ সাহিত্য
কিশোর মওলানা ভাসানী
বাঘ বাহাদুর
দারুণ সুন্দর সুন্দরবন
ছড়া সমগ্র
নজরুল বিষয়ক গ্রন্থ
কবিতীর্থ চুরুলিয়া
বিশ্বময় নজরুল
সার্বজনীন নজরুল
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩)
নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার, ভারত (২০১০)
চুরুলিয়া নজরুল একাডেমি পুরস্কার, ভারত (২০০৬)
কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬)
জিরো পয়েন্ট সম্মাননা, ভারত (২০০৬)
জাতীয় প্রেস ক্লাব সম্মাননা (২০০৩, ২০০৮)
শহীদ জিয়া স্মৃতি পুরস্কার (২০০৩)
মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পদক (২০০২)
জাতীয় নজরুল সমাজ পদক (২০০১)
হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড (২০২১)
শহীদ জিয়া স্মৃতি সম্মাননা (২০২২)
আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০)
সপ্তদশ শতকের মুসলিম কবি আবদুল হাকিম। মধ্যযুগে মুসলমানগণ বাংলাকে নিজেদের ভাষা মনে না করে ফারসি-আরবি-উর্দুকে আপন ভাষা মনে করতো। এই পরভাষাপ্রীতিকে আঘাত করার জন্য তিনি বিভিন্ন শ্লেষমূলক কবিতা রচনা করেন। তিনি সমাজের সার্বিক কল্যাণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সে লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রন্থে আদর্শ জীবন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন।
- আবদুল হাকিম ১৬২০ সালে সন্দ্বীপের সুধারাম/ নোয়াখালী জেলার বাবুপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ১৬৯০ সালে মারা যান।
আবদুল হাকিম এর ৮টি কাব্য পাওয়া গেছে। । 'ইউসুফ জোলেখা', 'নূরনামা', 'দোররে মজলিশ', 'লালমতী সয়ফুলমুলক', 'হানিফার লড়াই', 'শিহাবুদ্দীন নামা', 'নসীহৎনামা', 'কারবালা ও শহরনামা'।
নূরনামা গ্রন্থঃ
'নূরনামা' ফারসি নীতিকাব্য 'নূরনামাহ' অবলম্বনে রচিত। বাংলা ভাষার প্রতি এরূপ শ্রদ্ধাপূর্ণ বক্তব্যের জন্য কবির 'নূরনামা' কাব্যটি বিশেষ প্রশংসিত। এ কাব্যের কবিতা 'বঙ্গবাণী'তে কবির মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে।
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।
সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।
তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।
নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জনা।।
যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়। (বঙ্গবাণী)
আবদুল্লাহ আল মামুন (১৯৪২-২০০৮)
আবদুল্লাহ আল মামুন ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও প্রখ্যাত নাট্যকার। তিনি সাম্রাজ্যবাদী নাটক রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের সমসাময়িক পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিপক্ষে তিনি জীবনভর নাট্য রচনা অব্যাহত রাখেন।
- আবদুল্লাহ আল মামুন ১৩ জুলাই, ১৯৪২ সালে জামালপুর সদরের আমড়া পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি নাট্যসংগঠন 'থিয়েটার' এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
- তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (১৯৯১-২০০১) এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (২০০১) ছিলেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৪), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
- তিনি ২১ আগস্ট (বৃহস্পতিবার), ২০০৮ সালে মারা যান।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত নাটক 'শপথ' (১৯৬৪)।
তাঁর রচিত নাটকসমূহঃ
‘সুবচন নির্বাসনে’ (১৯৭৪): স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সমাজে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেয়, তাকে কেন্দ্র করেই এ নাটকটি রচিত।
‘এখনও ক্রীতদাস' (১৯৮৪): এ নাটকে ঢাকা শহরের ‘গলাচিপা’ বস্তির যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বাক্কা মিয়ার পরিবারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের নিম্নবর্গের মানুষের অসহায় জীবনযাপনের ইতিবৃত্ত। এতে পুরুষতান্ত্রিক, পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের উপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
‘কোকিলারা' (১৯৯০): ঢাকা গাইড হাউস মিলনায়তনে ১৯ জানুয়ারি, ১৯৮৯ সালে নাটকটি প্রথম অভিনীত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ১৯৯০ সালে। এ নাটকটি তিন কোকিলার কাহিনি। প্রথম কোকিলা সরল বালিকা, চোর সাব্যস্ত হয়ে শেষে আত্মহত্যা করে। দ্বিতীয় কোকিলা নিরীহ প্রাণী, স্বামীর ভোগপণ্যরূপে মধ্যবিত্ত সংসারে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যায়। তৃতীয় কোকিলা প্রতিবাদী, সমাজের অন্যায় ও অমানবিকতার বিপক্ষে সে সর্বদা সোচ্চার। । বাংলাদেশের নারীদের তিনটি রূপ তিন কোকিলা। এটি এক চরিত্রনির্ভর নাটক। ফেরদৌসী মজুমদার কোকিলা নামে এই একক অভিনয় করেন।
‘এখন দুঃসময়' (১৯৭৫): বন্যা দুর্গত একটি গ্রামের পটভূমিতে নাটকটি রচিত।
‘এবার ধরা দাও' (১৯৭৭), ‘শাহজাদীর কাল নেকাব' (১৯৭৮), ‘চারিদিকে যুদ্ধ’ (১৯৮৩), ‘মেরাজ ফকিরের মা' (১৯৯৭)।
তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহ:
‘মানব তোমার সারা জীবন' (১৯৮৮), ‘আহ দেবদাস’ (১৯৮৯), ‘তাহাদের যৌবনকাল' (১৯৯১), ‘হায় পার্বতী’ (১৯৯১), ‘এই চুনীলাল’ (১৯৯৩), ‘গুন্ডাপাণ্ডার বাবা' (১৯৯৩), ‘খলনায়ক’ (১৯৯৭)
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১ জানুয়ারি ১৯৩০ – ৩০ নভেম্বর ১৯৯৮) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক, বিজ্ঞান কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা। তিনি আবদুল্লাহ আল-মুতী নামেই সমধিক পরিচিত। সহজ ভাষায় বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে বিশেষ ভূমিকার জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো কলিঙ্গ পুরস্কার লাভ করেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
আবদুল্লাহ আল-মুতীর জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। তাঁর পিতা শেখ মইন শরফুদ্দিন এবং মাতা হালিমা শরফুদ্দিন। ১৯৪৫ সালে ঢাকার মুসলিম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে পদার্থবিদ্যায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬০ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষায় এমএ এবং ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
তিনি কর্মজীবন শুরু করেন রাজশাহী কলেজে শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। রেডিও ও টেলিভিশনে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও বিজ্ঞান শিক্ষা সমিতিসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
রচনাবলি
বিজ্ঞান ও শিশুতোষ গ্রন্থ (নির্বাচিত)
এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে
অবাক পৃথিবী
আবিষ্কারের নেশায়
রহস্যের শেষ নেই
সাগরের রহস্যপুরী
এ যুগের বিজ্ঞান
বিচিত্র বিজ্ঞান
বিজ্ঞানের বিস্ময়
তারার দেশের হাতছানি
মহাকাশে কী ঘটছে
আজকের বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ
শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থ
শিক্ষা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
শিক্ষা ও বিজ্ঞান : নতুন দিগন্ত
আমাদের শিক্ষা কোন পথে
অনুবাদ গ্রন্থ (নির্বাচিত)
আকাশের সঙ্গে মিতালী
মহাবীর পরমাণু
আলো
তাপ
পরমাণুর রাজ্যে
সম্পাদনা
বাংলা একাডেমির বিজ্ঞান বিশ্বকোষ (প্রধান সম্পাদক)
শিশু একাডেমির শিশু বিশ্বকোষ (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ)
পুরস্কার ও সম্মাননা
ইউনেস্কো কলিঙ্গ পুরস্কার (১৯৮৩)
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫)
একুশে পদক (১৯৮৫)
স্বাধীনতা পদক (১৯৯৫)
কুদরাত-ই-খুদা স্বর্ণপদক (১৯৭৯)
জিয়াউর রহমান জাতীয় পুরস্কার (১৯৮১)
শিশু একাডেমি পুরস্কার
আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫)
কাজী মাহবুব উল্লাহ স্বর্ণপদক (১৯৮৭)
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। প্রথম পর্যায়ে তিনি গ্রামবাংলার গণমানুষের প্রবহমান জীবনধারা ও তার পটভূমি থেকে কাব্য রচনার উপাদান সংগ্রহ করেন, পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় শহুরে জীবনের ছায়াপাত ঘটে। তিনি কবিতায় বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য ও লোকশব্দ ব্যবহারে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) প্রতিষ্ঠিত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ প্রকাশিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে এ পত্রিকা বন্ধ করা হয় এবং সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয় । জেলে থাকাকালে তিনি মার্কসবাদী আদর্শকে পরিত্যাগ করে ইসলামি আদর্শ গ্রহণ করেন ।
- আল মাহমুদ ১১ জুলাই, ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাঁর প্রকৃত নাম মির আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ।
- তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা- মাধ্যমিক পাস।
- বঙ্গবন্ধুর সুপারিশে তিনি শিল্পকলা একাডেমির অফিসার পদে যোগদান করেন এবং ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত 'দৈনিক কর্ণফুলি' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৮৬), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০) পান।
- তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সালে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে শুক্রবার রাত ১১:০৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলো:
'লোক লোকান্তর' (১৯৬৩): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।
'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩): এটির প্রথমে নাম ছিলো 'অবগাহনের শব্দ'। পরে তিনি এটির নামকরণ করেন 'সোনালী কাবিন'। গ্রামীণ আবহে রচিত ৪৪টি কবিতার সংকলনে এ কাব্যগ্রন্থে তাঁর কবি প্রতিভা নিশ্চিত হয়েছে। এতে প্রকাশ পেয়েছে বঞ্চিতের ক্ষোভ, শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের পরিশ্রম ও গ্রামীণ আবহ। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ 'গোল্ডেন কাবিন' নামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যের অন্যতম কবিতা 'প্রত্যাবর্তনের লজ্জা'।
'কালের কলস' (১৯৬৬), 'মায়াবী পর্দা দুলে উঠো' (১৯৭৬), 'অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না' (১৯৮০), 'বখতিয়ারের ঘোড়া' (১৯৮৫), 'আরব্য রজনীর রাজহাঁস' (১৯৮৭), 'প্রহরান্তে পাশফেরা' (১৯৮৮), 'একচক্ষু হরিণ' (১৯৮৯), 'মিথ্যাবাদী রাখাল' (১৯৯৩), 'আমি দূরগামী' (১৯৯৪), 'হৃদয়পুর' (১৯৯৫), 'দোয়েল ও দয়িতা' (১৯৯৬), 'দ্বিতীয় ভাঙ্গন' (২০০০), 'নদীর ভিতরে নদী' (২০০১), 'উড়ালকাব্য' (২০০৩), 'না কোনো শূন্যতা মানি না' (২০০৪), 'বিরামপুরের যাত্রী' (২০০৫), 'তোমার জন্য দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী' (২০০৫), 'তুমিই তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল' (২০০৭), 'সেলাই করা মুখ' (২০০৮), 'পিপাসার বালুচরে' (২০০৮), 'প্রেমপত্র পল্লবে' (২০০৯), 'তোমার রক্তে তোমার গন্ধে' (২০১১), 'পাখির কথায় পাখা মেললাম' (২০১২), 'ইতিহাস দেখো বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে' (২০২০)।
আল মাহমুদ রচিত কিশোর সাহিত্য:
'পাখির কাছে ফুলের কাছে' (১৯৮০): এ কিশোর সাহিত্যের কবিতা 'বোশেখ', 'একুশের কবিতা'। 'বোশেখ' কবিতায় কবি বৈশাখের বিধ্বংসী প্রতীকের মধ্য দিয়ে অত্যাচারীর অবসান কামনা করেছেন।
আল মাহমুদ রচিত উপন্যাসগুলো:
'ডাহুকী' (১৯৯২): এটি তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস। এটি অতৃপ্ত দাম্পত্য বিষয়ক কাহিনি। চরিত্র: আতিকা, কেরামত।
'কাবিলের বোন' (১৯৯৩): এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। পাঁচ পর্বে বিভক্ত এ উপন্যাসে পূর্ব পাকিস্তানে নাগরিক পরিচয়ের সংকট, গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিমূর্ত প্রকাশ ঘটেছে। চরিত্র: কাবিল, রোকসানা।
'উপমহাদেশ' (১৯৯৩): এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। যুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা, যুদ্ধের মাঝে প্রেম, দেশপ্রেম-সবকিছুরই প্রতিচ্ছবি এ উপন্যাস। চরিত্র: হাদী মীর, হামিদা, আনিস, নন্দিনী, সীমা।
'কবি ও কোলাহল' (১৯৯৩), 'পুরুষ সুন্দর' (১৯৯৪), 'আগুনের মেয়ে' (১৯৯৫), 'নিশিন্দা নারী' (১৯৯৫), 'মরু মূষিকের উপত্যকা' (১৯৯৫; কিশোর উপন্যাস), 'যে পারো ভুলিয়ে দাও' (১৯৯৫), 'পুত্র' (২০০০), 'চেহারার চতুরঙ্গ' (২০০১), 'কলঙ্কিনী জ্যোতির্বলয়' (২০০৩), 'ধীরে খাও অজগরী' (২০০৪), 'যে যুদ্ধে কেউ জেতেনি' (২০০৬), 'তুহিন তামান্না উপাখ্যান' (২০০৭), 'তুষের আগুন' (২০০৮), 'জীবন যখন বাঁক ঘোরে' (২০১৮), 'সহোদরা' (২০২০), 'রাগিনী' (২০২০)।
তাঁর গল্পগ্রন্থসমূহ:
'পানকৌড়ির রক্ত' (১৯৭৫), 'সৌরভের কাছে পরাজিত' (১৯৮২), 'গন্ধবণিক' (১৯৮৮), 'ময়ূরীর মুখ' (১৯৯৪), 'নদীর সতীন' (২০০৪), 'ছোট-বড়' (২০০৫), 'চারপাতার প্রেম' (২০০৯), 'সপ্তর্ষী' (২০১৪), 'জলবেশ্যা ও তাহারা' (২০১৫), 'প্রিয় পঞ্চমী' (২০১৬)।
আল মাহমুদ রচিত অন্যান্য সাহিত্য:
আত্মজীবনী:
'যেভাবে বেড়ে উঠি' (১৯৯৭), 'বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ' (২০০৭)।
প্রবন্ধ:
'দিনযাপন' (১৯৯০), 'কবির আত্মবিশ্বাস' (১৯৯১), 'নারী নিগ্রহ' (১৯৯৭), 'কবিতার জন্য বহুদূর' (১৯৯৭), 'কবিতার জন্য সাত সমুদ্র' (১৯৯৯), 'কবির সৃজন বেদনা' (২০০৫), 'সময়ের সাক্ষী' (২০০৫), ‘বারো মাস তেরো পার্বন (২০০৮)’, 'দশ দিগন্তে উড়াল' (২০০৯), 'কবির কররেখাং (২০০৯), 'কবির মুখ' (২০১৫)।
সম্পাদনা:
'কাফেলা', 'দৈনিক গণকণ্ঠ', 'দৈনিক কর্ণফুলী'।
বিখ্যাত পঙ্ক্তি:
- আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।' (নোলক) - নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর।
(পাখির কাছে ফুলের কাছে)
আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯)
পঞ্চাশের দশকের প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদ। তাঁর উপন্যাসে মানুষের জীবনের আশা, সঙ্কট, আনন্দ ও বেদনা পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর কবিতায় মার্কসবাদী চেতনার কথা থাকলেও এতে রোমান্টিক আবেগ অক্ষুণ্ণ থেকেছে। নগরজীবনের কৃত্রিমতা, রাজনীতির সংগ্রাম, নিপীড়ন, প্রতারণা তিনি তাঁর কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু করেছেন। তিনি এরশাদ সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ছিলেন।
- আলাউদ্দিন আল আজাদ ৬ মে, ১৯৩২ সালে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- প্রকৃত নাম আলাউদ্দিন, ডাকনাম- বাদশা।
- তিনি ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর উদ্যোগেই প্রথম প্রকাশিত হয় 'একুশের প্রথম বুলেটিন'।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৫), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার' (১৯৭৭), একুশে পদক (১৯৮৬) লাভ করেন।
- তিনি ৩ জুলাই, ২০০৯ সালে মারা যান (সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।
তাঁর গল্পগ্রন্থসমূহঃ
‘জেগে আছি’ (১৯৫০): এটি তাঁর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ । ‘ধানকন্যা’ (১৯৫১), ‘অন্ধকার সিঁড়ি' (১৯৫৩), ‘মৃগনাভি’ (১৯৫৩), ‘উজান তরঙ্গে' (১৯৬৩), ‘যখন সৈকত’ (১৯৬৭), ‘আমার রক্ত স্বপ্ন আমার' (১৯৭৫), ‘জীবনজমিন’ (১৯৮৮)।
তাঁর উপন্যাসসমূহ:
‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র' (১৯৬০) : এটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণমূলক উপন্যাস। মাতৃত্বের গভীর ও আবেগী প্রকাশ এবং সাংসারিক জীবনের আকুতি এ উপন্যাসের বিষয়। এটি ‘বসুন্ধরা’ নামে চলচ্চিত্রায়িত করেন সুভাষ দত্ত যা ১৯৭৭ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার' লাভ করে। এটি বুলগেরীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে ‘পোত্রেৎ দুবাতসাৎ ত্ৰি' নামে।
‘কর্ণফুলী' (১৯৬২): এটি পাহাড়-সমুদ্রঘেরা উপজাতীদের জীবনচিত্র নিয়ে রচিত। আদিবাসী তরুণী রাঙ্গামিলার প্রণয়ে আকৃষ্ট হয় চোরাকারবারি, উচ্চাভিলাসী বাঙালি ইসমাইল। প্রেমিক দেওয়ান পুত্র, জলি, রমজানদের জীবন-যাপন, প্রণয় ইত্যাদি এ উপন্যাসের মূল বিষয়।
‘ক্ষুধা ও আশা' (১৯৬৪): এতে রূপায়িত হয়েছে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষপীড়িত সামাজিক অবস্থায় সংগ্রামী মানুষের চিত্র।
‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন' (১৯৬২), 'খসড়া কাগজ' (১৯৮৬), ‘শ্যামল ছায়ার সংবাদ' (১৯৮৬), ‘জ্যোৎস্নার অজানা জীবন' (১৯৮৬), ‘যেখানে দাঁড়িয়ে আছি' (১৯৮৬), ‘স্বাগতম ভালোবাসা' (১৯৯০), ‘অপর যোদ্ধারা’ (১৯৯২), ‘পুরানা পল্টন' (১৯৯২), ‘অন্তরীক্ষে বৃক্ষরাজী' (১৯৯২), ‘স্বপ্নশিলা’ (১৯৯২), ‘ক্যাম্পাস' (১৯৯৪), ‘প্রিয় প্রিন্স' (১৯৯৫), ‘কালো জ্যোৎস্নায় চন্দ্রমল্লিকা' (১৯৯৬), ‘বিশৃঙ্খলা’ (১৯৯৭)।
তাঁর অন্যান্য রচনাবলিঃ
‘ মানচিত্র' (১৯৬১): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘ স্মৃতিস্তম্ভ' (স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার / ভয় কি বন্ধু), যা ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি পুলিশ কর্তৃক শহিদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে তিনি রচনা করেন ।
‘ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ' (১৯৬২), ‘লেলিহান পাণ্ডুলিপি' (১৯৭৫), ‘সাজঘর' (১৯৯০), ‘চোখ' (১৯৯৬)।
| মানচিত্র (কাব্যগ্রন্থ | আলাউদ্দিন আল আজাদ |
| মানচিত্র (নাটক) | আনিস চৌধুরী |
নাটক: 'মরক্কোর জাদুঘর' (১৯৫৯), 'মায়াবী প্রহর (১৯৬৩), 'ধন্যবাদ' (১৯৬৫), 'নিঃশব্দ যাত্রা' (১৯৭২) 'ধন্যবাদ' (১৯৬৫), 'নরকে লাল গোলাপ' (১৯৭২)।
কাব্যনাট্য:
‘ইহুদির মেয়ে' (১৯৬২), ‘রঙ্গিন মুদ্রারাক্ষস' (১৯৯৪)।
গল্প:
‘জমা খরচ’: এ গল্পটি সিলেটের চা বাগানের কুলি- কামিনদের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত ।
‘যখন সৈকত’: এ গল্পে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সন্দেহ এবং তা থেকে জিঘাংসার সৃষ্টির স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে।
মহাকবি আলাওল ছিলেন বাঙালি পণ্ডিত কবি। বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের ধর্মীয় বিষয়বস্তুর গতানুগতিক পরিসীমায় রোমান্টিক প্রণয়কাব্যধারা প্রবর্তনকারী হিসেবে মুসলমান কবিদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। তিনি রাজসভার কবি হিসেবে আবির্ভূত হলেও মধ্যযুগের সকল বাঙালি কবির মধ্যে 'শিরোমণি আলাওল' রূপে আরবি, ফারসি ও হিন্দি সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও ভাববৈচিত্র্য অবলম্বনে কাব্য রচনায় এক নতুন যুগের সূচনা করেন।
- আলাওল ১৬০৭ সালের দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জোবরা গ্রাম / ফরিদপুরের ফতেয়াবাদ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন।
- আলাওলের পিতা ফতেয়াবাদের শাসনকর্তা মজলিস কুতুবের অমাত্য ছিলেন। জলপথে ফতেয়াবাদ থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে আলাওল ও তাঁর পিতা পর্তুগিজ জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং ঘটনাস্থলে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে আরাকান রাজ্যে উপস্থিত হন।
- আলাওল আরাকানে প্রথমে রাজদেহরক্ষী অশ্বারোহী পরে সেনাবাহিনীর চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
- আরাকানের প্রধান অমাত্য মাগন ঠাকুর আলাওলকে কাব্য রচনায় উৎসাহিত করেন।
- তিনি 'লোরচন্দ্রাণী ও সতীময়না' (১৬৫৯) কাব্যের ৩য় খণ্ড রচনা করেন। ১ম ও ২য় খণ্ড রচনা করেন দৌলত কাজী।
- তিনি ১৬৮০ সালে মারা যান।
'পদ্মাবতী' কাব্য:
'পদ্মাবতী' (১৬৪৮) মহাকবি আলাওলের প্রথম রচনা, যা ইতিহাস আশ্রিত রোমান্টিক প্রেমকাব্য। মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি ভাষায় রচিত 'পদুমাবৎ' অবলম্বনে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি আলাওল মাগন ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় 'পদ্মাবতী' কাব্য রচনা করেন। পদ্মাবতী কাব্য দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্ব হচ্ছে সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতীকে লাভ করার জন্য চিতোররাজ রত্নসেনের সফল অভিযান এবং দ্বিতীয় পর্বে আছে রানি পদ্মাবতীকে লাভ করার জন্য দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর ব্যর্থ সামরিক অভিযানের বিবরণ। এ কাব্যে হিরামন নামে একটি শুকপাখির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এ কাব্যে কবির নাগরিক শিক্ষা, রুচির বৈদগ্ধ্য রূপ, ভাবের গভীরতা, ভাষা ও অলংকার প্রয়োগে বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় পাওয়া যায় বলে 'পদ্মাবতী'কে আলাওলের শ্রেষ্ঠ রচনা বলা হয়। এ কাব্যে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু পরিচয় বিধৃত রয়েছে। এ কাব্যের বিখ্যাত পঙ্ক্তি- 'তাম্বুল রাতুল হৈল অধর পরশে।'
'পদ্মাবতী' কাব্যের অন্যতম খণ্ড 'ঋতু বর্ণন' এর পঙ্ক্তি:
প্রথমে বসন্ত ঋতু নবীন পল্লব।
দুই পক্ষ আগে পাছে মধ্যে সুমাধব ।।
মলয়া সমীর হৈলা কামের পদাতি।
মুকুলিত কৈল তবে বৃক্ষ বনস্পতি।।
আলাওলের কাব্যসমূহ
গ্রন্থ | প্রকাশকাল | উৎস | পৃষ্ঠপোষক |
| পদ্মাবতী | ১৬৪৮ | পদুমাবৎ (মালিক মুহম্মদ জায়সী) | কোরেশী মাগন ঠাকুর |
| রওনকলিকা আনন্দবর্মা | ১৬৫৯ | মৌলিক (লোরচন্দ্রাণী ও সতীময়নার উত্তরাংশ) | শ্রীমন্ত সোলেমান |
| তোহফা (নীতিকাব্য) | ১৬৬৪ | তুহফ-ই নসাঈহ (ইউসুফ গদা) | শ্রীমন্ত সোলেমান |
| হপ্তপয়কর | ১৬৬৫ | হফত্ পয়কর (নিজামী) | সৈয়দ মুহম্মদ খান |
| সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল | ১৬৬৯ | সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল (গাওয়াসী) | মাগন ঠাকুর |
| সিকান্দরনামা | ১৬৭৩ | সিকান্দরনামা (নিজামী) | নবরাজ মজলিস |
| রাগতালনামা | মৌলিক | - | - |
| পদাবলী | মৌলিক | - | - |
| শিরী খুসরু | মৌলিক | - | - |
আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯)
ড. আহমদ শরীফ ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ। তাঁর লেখার প্রধান এলাকা ছিল বাংলাদেশ, বাঙালি সমাজ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তার স্বরূপ সন্ধানে তিনি ছিলেন আমৃত্যু অনুসন্ধিৎসু। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, সেনাশাসন, স্বৈরাচার এবং স্বাধীনতার শত্রুদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন তৎপর। ১৯৭১ এর মার্চে পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পূর্ব বাংলার লেখকদের শপথবাক্য পাঠ করান।
- ড. আহমদ শরীফ ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এন্ট্রাস পাশ করা বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তাঁর চাচা।
- তিনি 'বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান' এর সম্পাদক।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৯১) পান এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৯৩) লাভ করেন।
ড. আহমদ শরীফের প্রবন্ধগ্রন্থসমূহের নাম:
'বিচিত চিন্তা' (১৯৬৮), 'সাহিত্য সংস্কৃতি চিন্তা' (১৯৬৯), 'স্বদেশ অন্বেষা' (১৯৭০), 'জীবনে সমাজে সাহিতা (১৯৭০), 'যুগ যন্ত্রণা' (১৯৭৪), 'কালিক ভাবনা' (১৯৭৪), 'মধ্যযুগের সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ' (১৯৭৭), 'বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য' (১ম খণ্ড-১৯৭৮, ২য় খণ্ড ১৯৮৩), 'সময় সমাজ মানুষ' (১৯৯৫), 'স্বদেশ চিন্তা (১৯৯৭), 'বিশ শতকের বাঙালি' (১৯৯৮), 'সংস্কৃতি।
তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থসমূহের নাম:
'লায়লী মজনু' (১৯৫৭), 'রসুল বিজয়' (১৯৬৪) 'চন্দ্রাবতী' (১৯৬৭), 'সিকান্দারনামা' (১৯৭৭), 'নবী বংশ' (১৯৭৮), 'রসুল চরিত' (১৯৭৮)।
তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯ সালে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি এক উইল (১৯৯৫) করে নিজের মৃত্যু-উত্তর চক্ষু ও দেহ 'বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ'কে দান করে যান। এ উইল কমিটির আহবায়ক ছিলেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ।
আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১)
বিশিষ্ট লেখক, চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক আহমদ ছফার রচনায় প্রাধান্য পেয়েছে জাতিসত্তার পরিচয়। জীবদ্দশায় তিনি তাঁর প্রথাবিরোধী, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ পরিচিত ছিলেন।
- আহমদ ছফা ৩০ জুন, ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাকে স্বাধীন করার প্রত্যয়ে 'লেখক সংগ্রাম শিবির' গঠন করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা 'প্রতিরোধ' প্রকাশ করেন।
- ১৯৮০ সালে কাঁটাবন বস্তিতে তিনি 'শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র' চালু করেন।
- তিনি 'উত্থানপর্ব', 'দাবানল' (এটি তিনি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
- তিনি একুশে পদক (মরণোত্তর) পান।
- তিনি ২৮ জুলাই, ২০০১ সালে মারা যান।
তাঁর উপন্যাসসমূহঃ
'সূর্য তুমি সাথী' (১৯৬৭): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস।
'‘ ওঙ্কার ' (১৯৭৫) : এটি ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে লেখা স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি উত্থানের এক মনোজ্ঞ রূপায়ণ। উপন্যাসের নায়ক আবু নসরের বোবা মেয়েকে বিয়ে করে। আবু নসরের সাথে আইয়ুব খানের সম্পর্ক থাকায় সে একধরনের ক্ষমতা লাভ করে। এ কাহিনিসূত্র ধরেই উপন্যাসের কাহিনি গতি লাভ করেছে। এখানে আইয়ুব খানের তথাকথিত সামরিক শাসনের সমালোচনা করা হয়েছে।
‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন' (১৯৮৮): আইয়ুব খান থেকে শুরু করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত।
‘মরণ বিলাস' (১৯৯০): রাত ১২:১৩ মিনিট থেকে ভোর পর্যন্ত একান্ত সাগরেদ মাওলা বক্সের কাছে একজন মুমূর্ষু রাজনীতিবিদের সরল স্বীকারোক্তিতে ব্যক্ত হয় রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, সিঁড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনি। একই সাথে নেতার করুণ মিনতিও প্রকাশিত হয়েছে।
‘ অলাতচক্র' (১৯৯৩): উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে অভিবাসী বাঙালিদের নিয়ে রচিত। প্রেমের কাহিনি হলেও এতে ধ্বনিত হয়েছে উদ্বাস্তু বাঙালিদের দৈন্যদশা।
‘গাভী বিত্তান্ত” (১৯৯৫) : এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রেক্ষাপটে রচিত ব্যাঙ্গাত্নক রচনা। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত ভিসি মিঞা মোহাম্মদ আবু জোনায়েদ (প্রতীকী চরিত্র) ।
‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী' (১৯৯৬): উপন্যাসটি ‘প্রাণপূর্ণিমার চান’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী' ।
‘বিহঙ্গ পুরাণ” (১৯৮৬), ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ' (১৯৯৬)।
তাঁর প্রবন্ধগুলো:
‘জাগ্রত বাংলাদেশ” (১৯৭১): এটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্ৰথম গ্ৰন্থ ৷
‘যদ্যপি আমার গুরু' (১৯৯৭): এটি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক প্রসঙ্গে রচিত।
‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' (১৯৭২), ‘বাংলা ভাষা : রাজনীতির আলোকে’ (১৯৭৫), ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা' (১৯৭৭), 'বাঙালি মুসলমানের মন' (১৯৮১), ‘রাজনীতির লেখা’ (১৯৯৩), ‘সংকটের নানা চেহারা' (১৯৯৬), ‘বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র' (২০০১), ‘উপলক্ষের লেখা’ (২০০১), ‘সেইসব লেখা' (২০০৮)
তাঁর অন্যান্য রচনাবলি:
গল্প :
‘নিহত নক্ষত্র' (১৯৬৯)
কবিতা :
‘জল্লাদ সময়’ (১৯৭৪), ‘দুঃখের দিনে দোহা' (১৯৭৫), ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা' (১৯৭৭), ‘লেনিন ঘুমোবে এবার' (১৯৯৯)।
অনুবাদ :
‘তানিয়া’ (১৯৬৭), ‘ফাউস্ট' (১৯৮৬)।
শিশুতোষ :
‘দোলা আমার কনক চাপা' (১৯৬৮), 'গোঁ-হাকিম' (১৯৭৭)।
ইতিহাস গ্রন্থ :
‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস' (১৯৭৯)
পঞ্চাশের দশকের অন্যতম আধুনিক কবি আহসান হাবীব। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল বস্তুনিষ্ঠতা ও বাস্তব জীবনবোধ। তাঁর মানুষের সংগ্রামী চেতনা ও সমকালীন যুগ-যন্ত্রণা শিল্পসম্মতভাবে কবিতায় গ্রামীণ ঐতিহ্যমণ্ডিত সামাজিক বাস্তবতা, মধ্যবিত্ত পরিস্ফুট হয়েছে। ২২ জুন, ১৯৬৭ সালে সরকার বেতার ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের সে সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে বিবৃতি দেন। ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে অনুষ্ঠিত এক বৃদ্ধিজীবী সমাবেশে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
আহসান হাবীব ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ সালে পিরোজপুরের শঙ্করপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান তাঁর সন্তান।
তিনি ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা) পত্রিকার সাহিত্যপাতার সম্পাদক হিসেবে ২১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী সম্পাদক: 'দৈনিক তকবীর' (১৯৩৭), 'মাসিক বুলবুল' (১৯৩৭-৩৮), 'মাসিক সওগাত' (১৯৩৯-৪৩: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক)। দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক কৃষক, দৈনিক ইত্তেহাদ, সাপ্তাহিক প্রবাহ প্রভৃতি পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন।
- সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তার প্রথম প্রবন্ধ 'ধর্ম' প্রকাশিত হয়।
- ১৯৩৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা 'মায়ের কবর পাড়ে কিশোর' পিরোজপুর সরকারি স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
- তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬১), একুশে পদক (১৯৭৮) পান।
- তিনি ১০ জুলাই, ১৯৮৫ সালে মারা যান।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যের নাম
- 'রাত্রিশেষ' (১৯৪৭): এতে গ্রাম ও নগর উভয়কেন্দ্রিক কবিতা বিদ্যমান। তাঁর কবিতায় ব্যঙ্গের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠতা ও বাস্তব জীবনবোধ ফুটে উঠেছে।
আহসান হাবীবের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহের নামঃ
'ছায়াহরিণ' (১৯৬২): এ কাব্যে ঐতিহ্য আশ্রয়ী কবি বণিক সভ্যতার রুদ্র রূপ দেখিয়েছেন। তিনি গ্রামীণ অনুষঙ্গে স্থিত হতে চেয়েছেন।
'সারা দুপুর' (১৯৬৪): এটি আহসান হাবীবের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।
'বিদীর্ণ দর্পণে মুখ' (১৯৮৫): এ কাব্যের কবিতা ' সেই অস্ত্র। 'আশায় বসতি' (১৯৭৪), 'মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬), 'দু'ই হাতে দুই আদিম পাথর' (১৯৮০), 'প্রেমে কবিতা' (১৯৮১)।
| অরণ্যবহ্নি (উপন্যাস) | তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় |
| বহ্নিবলয় (উপন্যাস) | ড. নীলিমা ইব্রাহীম |
| বহ্নিবলয় (উপন্যাস) | বন্দে আলী মিয়া |
| আরণ্য নীলিমা (উপন্যাস) | আহসান হাবীব |
| বিধ্বস্ত নীলিমা (কাব্যগ্রন্থ) | শামসুর রাহমান |
| বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ (উপন্যাস) | সরদার জয়েনউদ্দিন |
তাঁর অন্যান্য রচনা সমূহের নামঃ
উপন্যাস : 'আরণ্য নীলিমা' (১৯৬২): উদীয়মান মুসলমান মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের প্রতিনিধি এক তরুণ চিত্রশিল্পী তার স্ত্রীর মনোজাগতিক সংকট এ উপন্যাসের উপজীব্য।
'রানী খালের সাঁকো' (১৯৬৫), 'জাফরানী রং পায়রা'।
শিশুতোষ: 'ছোটদের পাকিস্তান' (১৯৫৪), 'বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর' (১৯৭৭), 'ছুটির দিন দুপুরে' (১৯৭৮), 'মেলা (কবিতা), 'আমি কোনো আগন্তুক নই' (কবিতা)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ইমদাদুল হক মিলন (১৯৫৫-)
বাংলাদেশের একজন কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলন। তিনি গল্প, উপন্যাস ও নাটক- এই তিন শাখাতেই জনপ্রিয় রচনা উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় 'সজনী' নামে ছোট গল্পের মাধ্যমে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং 'কিশোর বাংলা' পত্রিকায় শিশুতোষ গল্প লিখে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন।
- ইমদাদুল হক মিলন ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে।
- তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২) এবং একুশে পদক (২০১৯) পান।
ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যকর্মসমূহ:
উপন্যাস:
‘যাবজ্জীবন' (১৯৭৬): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ।
‘কালোঘোড়া' (১৯৯১): এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ।
‘নূরজাহান' (১৯৯৫): এপার-ওপার বাংলার ব্যাপক জনপ্রিয় উপন্যাস ।
‘দুঃখ কষ্ট’ (১৯৮২), ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ (১৯৮২), ‘এক দেশ' (১৯৮৩), ‘প্রিয় নারী জাতি' (১৯৮৪), 'ভূমিপুত্র’ (১৯৮৫), ‘পরবাস' (১৯৮৭), ‘নায়ক’ (১৯৮৮), ‘সারাবেলা’ (১৯৮৮), 'রূপনগর' (১৯৮৮), ‘কথা ছিলো’ (১৯৮৮), ‘দুজনে' (১৯৮৮), ‘রাজাকারতন্ত্র' (১৯৮৯), ‘বালকের অভিমান' (১৯৮৯), ‘বন মানুষ' (১৯৮৯), ‘স্বপ্ন’ (১৯৮৯), ‘মহাযুদ্ধ' (১৯৮৯), 'কোন কাননের ফুল' (১৯৯০), ‘সুদূরতমা’ (১৯৯১), ‘আশায় আশায় থাকি' (১৯৯২), ‘বাঁকা জল’ (১৯৯৩), ‘মানুষজন’ (১৯৯৪), ‘আছ তুমি হৃদয় জুড়ে' (১৯৯৬), 'সুচরিতাসু' (১৯৯৭), 'যুবরাজ' (১৯৯৭), 'মৌসুমী' (১৯৯৮), ‘রহস্যময়ী' (১৯৯৯), ‘তখন ছিলাম আমি' (২০০০), 'এসো' (২০০১), 'জান' (২০০২), ‘কুসুমের মতো মেয়েরা' (২০০৩), ‘বন্ধুয়া' (২০০৪), ‘তুমিই’ (২০০৫), ‘অপরবেলা’ (২০০৬)।
গল্পগ্রন্থ:
‘নিরন্নের কাল’ (১৯৭৯), ‘হে প্রেম' (১৯৮৩), ‘তাহারা’ (১৯৮৬), ‘মর্মবেদনা' (১৯৮৮), 'প্রেম নদী’ (১৯৮৮), ‘ফুলের বাগানে সাপ' (১৯৮৩), ‘আহারী' (১৯৮৪), ‘বারো রকমের মানুষ' (১৯৮৮)
ছোটগল্প:
‘রাজার চিঠি’, ‘মানুষ কাঁদছে’, ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন' ।
আত্মজীবনী: 'কেমন আছ সবুজ পাতা' (২০১২)।
ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১)
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী যৌবনকালে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতেন এবং কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মীয় চেতনায় প্রভাবিত হয়ে মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী হিসেবে পরিচিত হন। মুসলমানদের নবজাগরণ ও দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। এ কারণেই তিনি জাতীয় জাগরণমূলক কাব্য সৃষ্টিতে ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত এবং কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বসূরি। মুসলমানদের অন্ধকারকালে তাঁর কাব্য এবং অনলবর্ষী বক্তৃতা মুসলিম জাতিকে যেমন অনুপ্রাণিত করেছে, তেমনি আলোর পথ দেখিয়েছে। তিনি সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর রচিত গদ্য ছিল সংস্কৃতবহুল এবং কবিতা ক্লাসিক রীতির।
- সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ১৩ জুলাই, ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে নামের সাথে 'সিরাজী' যুক্ত হয়।
- তিনিই প্রথম সাহিত্যিক, যিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করেন।
- তিনি 'মাসিক নূর' (১৯১৯) ও 'সাপ্তাহিক সুলতান' (১৯২৩) পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
- বলকান যুদ্ধের (১৯১২) সময় তুরস্ককে সাহায্য করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। এ টিমে থেকে তিনি আহত সৈনিকদের সেবা করার জন্য তুরস্কের সুলতান কর্তৃক 'গাজী' উপাধি লাভ করেন।
- তিনি ১৭ জুলাই, ১৯৩১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ইসমাইল হোসেনের কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'অনল প্রবাহ' (১৯০০): এটি তাঁর প্রথম রচনা যা সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয় এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের অভিযোগে তার ২ বছরের (১৯১০-১২) কারাদণ্ড হয়।
'স্পেন বিজয় কাব্য' (১৯১৪): এটি স্পেনের সম্রাট রডরিকের সাথে মুসলিম বীর তারেকের সংগ্রাম কাহিনি নিয়ে রচিত মহাকাব্য। এ কাব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের অতীত বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস নতুন করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
'আকাঙ্ক্ষা' (১৯০৬), 'উদ্বোধন' (১৯০৭), 'উচ্ছ্বাস' (১৯০৭), 'নব উদ্দীপনা' (১৯০৭)।
ইসমাইল হোসেনের উপন্যাসসমূহঃ
'রায়নন্দিনী' (১৯১৮): বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী' উপন্যাসের নায়ক হিন্দু এবং নায়িকা মুসলমান। দুই ধর্মের অবৈধ সম্পর্কের রচনার কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে রচনা করেন 'রায়নন্দিনী'। এর নায়ক মুসলিম এবং নায়িকা হিন্দু। এ উপন্যাসে তিনি দেখান যে, হিন্দু নায়িকা কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ী মুসলিম নায়ক ঈশা খাঁর প্রেমেই পড়েনি, বরং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়েও করেছেন। 'রায়নন্দিনী' উপন্যাস হিসেবে সফল না হলেও প্রতিক্রিয়া হিসেবে সফল।
'তারা-বাঈ' (১৯১৮), 'ফিরোজা বেগম' (১৯২৩), 'নূরউদ্দিন' (১৯২৩), 'জাহানারা' (১৯৩১)।
ইসমাইল হোসেনের অন্যান্য রচনাবলিঃ
প্রবন্ধ: 'স্বজাতি প্রেম' (১৯০৯), 'তুর্কি নারী জীবন' (১৯১৩), 'মহানগরী কর্ডোভা' (১৯১৩), 'আদব কায়দা শিক্ষা' (১৯১৪), 'স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা' (১৯১৬), 'সুচিন্তা' (১৯১৬)।
ভ্রমণকাহিনি: 'তুরস্ক ভ্রমণ' (১৯১০): এ গ্রন্থে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি তুরস্ক ভ্রমণকালে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, এ গ্রন্থে সেসবের বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
সঙ্গীত গ্রন্থ: 'প্রেমাঞ্জলি' (১৯১৬): এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের প্রতিযোগী হিসেবে রচিত সঙ্গীত গ্রন্থ।
'সঙ্গীত সঞ্জীবনী' (১৯১৬)।
যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন কবি ও সাংবাদিক। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, দেশ ও সমাজভাবনা তাঁর রচনারীতির বিশেষত্ব। তাঁর হাত ধরেই বাংলা কবিতা মধ্যযুগের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিকতার রূপ পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যে দুই যুগের মিলনকারী হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
- ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ৬ মার্চ, ১৮১২ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার শিয়ালডাঙ্গার কাঁচড়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- ছদ্মনাম ‘ভ্রমণকারী বন্ধু’
- তিনি যুগসন্ধিক্ষণের কবি, গুপ্ত কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত।
- যুগসন্ধিক্ষণের সময়কাল ১৭৬০-১৮৬০ সাল।
- তিনি ২৩ জানুয়ারি, ১৮৫৯ সালে মারা যান।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত 'সংবাদ প্রভাকর' (২৮ জানুয়ারি, ১৮৩১): এটি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক। তিনি যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর ও প্রেমচান তর্কবাগিশের আনুকূল্যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি ১৮৩১ সালে সাপ্তাহিক এবং ১৪ জুন, ১৮৩৯ সালে দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা।
'সংবাদ রত্নাবলী' (১৮২৫), 'সংবাদ সাধুরঞ্জন' (১৮৪৭)
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত বিখ্যাত কবিতাগুলোঃ স্বদেশ, তপসে মাছ, কে, বাঙালি মেয়ে, নীলকর, আনারস।
ঈশ্বরচন্দ্র রচিত সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'প্রবোধ প্রভাকর' (১৮৫৮): এটি কবিতার সংকলন।
'হিত প্রভাকর' (১৮৬১): এটি গদ্যে ও পদ্যে রচিত বিশেষ ধরনের গল্প।
'বোধেন্দু বিকাশ' (১৮৬৩): এটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত নাটক।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়। ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মৃত্যুর মাধ্যমে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং ১৮০১ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ শুরু হলেও বাংলা কাব্যসাহিত্যে ১৮৬১ সালে 'মেঘনাদবধ' প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে আধুনিকতা শুরু হয়নি। এই একশ (১৭৬০-১৮৬০) বছর কাব্যে আধুনিকতায় পৌঁছার প্রচেষ্টা চলেছে মাত্র। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মধ্যযুগের দেব-দেবীর কাহিনি বর্জন করে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর কবিতায় সমাজচেতনা থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠে। আবার তাঁর কবিতায় কবিয়াল ও শায়েরদের রচনার ঢং, পয়ার ও ত্রিপদীর ব্যবহারও লক্ষণীয়। তাঁর মধ্যে মধ্যযুগের কাব্য-বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক যুগের সূচনা-বৈশিষ্ট্য সমানভাবে লক্ষ করা যায় বলে তাকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাকে 'খাঁটি বাঙালি কবি' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিখ্যাত পঙ্ক্তিঃ
- কতরূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,
বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া। (স্বদেশ) - নগরের লোক সব এই কয়মাস।
তোমার কৃপায় করে মহাসুখে বাস। (তপসে মাছ) - তুমি মা কল্পতরু,
আমরা সব পোষাগরু। (নীলকর)
কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০)
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আধুনিক বাংলা সাহিত্যধারায় আবদুল ওদুদের প্রধান পরিচয় চিন্তাশীল লেখক হিসেবে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য সমাজের 'শিখা' (১৯২৭) পত্রিকায় লেখার জন্য নওয়াব পরিবার কর্তৃক নিগৃহীত হন এবং ঢাকা ত্যাগ করে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রবীন্দ্র-বিশ্লেষক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
- কাজী আবদুল ওদুদ ২৬ এপ্রিল, ১৮৯৪ সালে রাজবাড়ী (তৎকালীন ফরিদপুর) জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাময়িক 'সংকল্প' (১৯৫৪) পত্রিকার সম্পাদক এবং 'তরুণ পত্র' (১৯৬৫) পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন।
- তিনি 'ব্যবহারিক শব্দকোষ' (১৯৫৩) নামে একটি অভিধান সংকলন করেন।
- তিনি ১৯ মে, ১৯৭০ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
কাজী আবদুল ওদুদের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
উপন্যাস:
‘নদীবক্ষে' (১৯১৮) উপন্যাসটি তাঁর ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয়। গ্রামীণ সমাজের কলহ, বিবাদ, দ্বন্দ্ব আবার মিলনের কথা চারটি কৃষক পরিবারকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসটির আখ্যানভাগ এগিয়ে চলেছে। এ উপন্যাসে কাজী আবদুল ওদুদ দেখিয়েছেন গ্রামের মুসলিমরা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিন্তু ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি তাদের মাঝে নেই। লালু ও মতির প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক ব্যাপক আকর্ষণীয়। কাজী আবদুল ওদুদ বাংলাদেশের শাশ্বত ধর্মবোধকেই এখানে তুলে ধরেছেন। এ উপন্যাসে অন্ত্যজ চাষি মুসলিম জীবনের যে নির্ভরযোগ্য চিত্র উল্লেখ আছে, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও আকৃষ্ট করেছিল।
‘আজাদ' (১৯৪৮)।
প্রবন্ধ: ‘শাশ্বতবঙ্গ' (১৯৫১), এটি আবদুল ওদুদ রচিত প্রবন্ধের সংকলন। ‘শাশ্বতবঙ্গ' এর প্রবন্ধগুলো ৬টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধগুলোতে লেখক বৃহৎ বাংলা ও ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন এবং শিক্ষিত সমাজের অসাবধানতায় জাতির কতটুকু বিড়ম্বনা ঘটতে পারে, সে আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন। তিনি এখানে অবিভক্ত বাংলা প্রত্যাশা করেছিলেন।
‘বাঙালার জাগরণ’ (১৯৫৬) : এটি ১৯৫৬ সালে ‘বিশ্বভারতী’তে প্রদত্ত বক্তৃতাবলির সংকলন ।
‘রবীন্দ্রকাব্য পাঠ' (১৯২৭), ‘সমাজ ও সাহিত্য' (১৯৩৪), ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ' (১৯৩৬), 'কবিগুরু গোটে (১৯৪৬, এটি দুই খণ্ডে প্রকাশিত), ‘নজরুল প্রতিভা (১৯৪৯), ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ' (১ম খণ্ড- ১৯৬২, ২য় খণ্ড ১৯৬৯), ‘মোহাম্মদ ও ইসলাম' (১৯৬৬)।
নাটক : 'পথ ও বিপথ' (১৯৩৯), 'মানব বন্ধু' (১৯৪১)।
গল্পগ্রন্থ: 'মীর পরিবার' (১৯১৮)- এটি তার ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয়। 'তরুণ' (১৯৪৮)।
ব্রিটিশ ভারতের একজন বাঙালি লেখক ও শিক্ষাবিদ কাজী ইমদাদুল হক বাংলার মুসলিম সমাজের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সাহিত্যকর্মে নিয়োজিত হন। তিনি 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' (১৯১৮) প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
- কাজী ইমদাদুল হক ৪ নভেম্বর, ১৮৮২ সালে খুলনার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি 'শিক্ষক' (১৯২০) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এটি তিন বছর চালু ছিলো।
- তিনি 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র (১৯১১) স্থপতি ছিলেন।
- ১৯২১ সালের মে মাসে ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপিত হলে তিনি এর সেক্রেটারি পদে যোগদান করেন।
- অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সহিত শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব পালন করায় সরকার তাঁকে 'খান সাহেব' (১৯১৯) ও 'খান বাহাদুর' (১৯২৬) উপাধিতে ভূষিত করেন।
- তিনি ২০ মার্চ, ১৯২৬ সালে কিডনী রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় মারা যান। কলকাতার গোরা কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
ইমদাদুল হকের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
- উপন্যাস: 'আবদুল্লাহ' (১৯৩৩)।
- কাব্য: 'আঁখিজল' (১৯০০), 'লতিকা' (১৯০৩-এটি অপ্রকাশিত)।
- প্রবন্ধ: 'মোসলেম জগতে বিজ্ঞান চর্চা' (১৯০৪), 'ভূগোল শিক্ষা প্রণালী' (১৯১৩), 'প্রবন্ধমালা' (১৯১৮)।
- শিশুতোষ গ্রন্থ: 'নবীকাহিনী' (১৯১৭), 'কামারের কাণ্ড' (১৯১৯)।
ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মদ ছিলেন বাংলাদেশের একজন বরেণ্য ভাষাতত্ত্ববিদ ও সাহিত্যিক। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব ও ইসলামী সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জন্ম ও মৃত্যু
ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন ১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭ সালে, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর পিতা কাজী আলীম উদ্দীন এবং মাতা মোসাম্মৎ কাওসার বেগম। তিনি ২৮ অক্টোবর ২০১১ সালে ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
শিক্ষাজীবন
তিনি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে কবি নজরুল সরকারি কলেজ) পড়াশোনা করেন। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন
পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।
রচনাবলি
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ (নির্বাচিত)
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (৪ খণ্ড)
সাহিত্য শিল্প
সাহিত্য সম্ভার
সেকালের সাহিত্য
একালের সাহিত্য
ভাষাতত্ত্ব
লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ
মানবমর্যাদা
সংস্কৃতি ও আদর্শ
জীবন সৌন্দর্য
ইসলাম ও ধর্মীয় বিষয়ক রচনা
সুফিবাদ ও আমাদের সমাজ
সুফিবাদের গোড়ার কথা
ইসলামি সংস্কৃতি
বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব
মহানবীর বাণী শতক
ছোটদের হযরত মুহাম্মদ (সা.)
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
দি ভার্বাল স্ট্রাকচার ইন কলোকুয়াল বেঙ্গলি
নাস্তিকতা ও আস্তিকতা
সুখের লাগিয়া
শিক্ষা
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার (১৯৮৯)
বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯০)
Distinguished Leadership Award (American Biographical Institute)
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণ ফলক, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা (২০০২)
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক (২০০৩)
কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪)
ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (২০০৭)
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম ব্যাচের পক্ষ থেকে গুণীজন সম্মাননা
কালিদাস রায় (২২ জুন ১৮৮৯ — ২৫ অক্টোবর ১৯৭৫) ছিলেন রবীন্দ্রযুগের বিশিষ্ট রবীন্দ্রানুসারী কবি, প্রাবন্ধিক ও পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা। গ্রামবাংলার রূপকল্প, বৈষ্ণবপ্রাণতা ও সংযত তত্ত্বপ্রবণতা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যচর্চা করেন এবং বাংলা কাব্যধারায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
কালিদাস রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৯ সালের ২২ জুন বর্ধমান জেলার কড়ুই গ্রামে। তিনি চৈতন্যদেবের জীবনীকার লোচনদাসের বংশধর। শৈশবকাল কেটেছে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। সেখান থেকেই তিনি বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।
কর্মজীবন
১৯১৩ সালে রংপুর জেলার উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী হাইস্কুলে সহশিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২০ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বড়িশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫২ সালে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন।
সাহিত্যকর্ম
কালিদাস রায় রবীন্দ্রভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাব্যচর্চা শুরু করেন। পরবর্তীতে কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশু সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ‘বেতালভট্ট’ ছদ্মনামে রচিত তাঁর রসরচনাগুলি পাঠকমহলে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
কাব্যগ্রন্থ
কুন্দ (১৯০৭)
কিশলয় (১৯১১)
পর্ণপুট (১৯১৪, ১৯২১)
ব্রজবেণু (১৯১৬)
বল্লরী (১৯১৫)
ক্ষুদকুঁড়া (১৯২২)
রসকদম্ব (১৯২৩)
লাজাঞ্জলি (১৯২৪)
হৈমন্তী (১৯৩৫)
বৈকালী (১৯৪০)
গাথাঞ্জলি (১৯৫৮)
সন্ধ্যামণি (১৯৫৮)
পূর্ণাহুতি (১৯৬৮)
দিন ফুরানোর গান (১৯৮৪)
তথাগত (১৯৯৪)
প্রবন্ধগ্রন্থ
পদাবলী সাহিত্য
প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়
সাহিত্য প্রসঙ্গ
প্রাচীন বঙ্গসাহিত্য
শরৎ সাহিত্য
চাণক্য সংহিতা
চালচিত্র
রঙ্গচিত্র
শিশু সাহিত্য
গাথাঞ্জলি (১৯৬১)
গাথাকাহিনী (১৯৬৪)
তৃণদল (১৯৭০)
গাথামঞ্জরী (১৯৭৪)
মণীষী বন্দনা (১৯৭৬)
গাথাবলী (১৯৭৮)
পুরস্কার ও সম্মাননা
রংপুর সাহিত্য পরিষদ প্রদত্ত ‘কবিশেখর’ উপাধি (১৯২০)
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৫৩)
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী স্বর্ণপদক
বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬৩)
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি (১৯৭১)
মৃত্যু
কালিদাস রায় ১৯৭৫ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে তাঁর নিজ বাসভবন ‘সন্ধ্যার কুলায়’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
চর্যাদের কবিদের মধ্যে সর্বাধিক পদ রচয়িতা হলেন কাহ্নপা । চর্যাপদে তাঁর পদের সংখ্যা ১৩টি। তিনি কাহ্নপা, কৃষ্ণবজ্রপাদ, কাহ্ন, কানু, কাহ্নিল, কৃষ্ণচর্য প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিলেন। এ নামগুলো তার রচিত পদগুলোর ভূমিকায় পাওয়া গিয়েছে। কাহ্নপার জীবনকালের শেষ সীমা ৮৪০ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর জন্ম উড়িষ্যায় হলেও তিনি বিহারে বসবাস করতেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি সহজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের যোগী ছিলেন। তিনি ধর্মশাস্ত্র ও সঙ্গীতশাস্ত্র উভয়দিকেই দক্ষ ছিলেন । তিনি ডোম্বীর প্রেমে পড়ে নিজের সাধনা জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন বলে তার রচনা হতে জানা যায় (১০ নং পদ)। চর্যাপদের ১৩নং ও ১৮নং পদে তার বিবাহের সংবাদ রয়েছে। চর্যাপদ ছাড়া তিনি অপভ্রংশ ভাষায় দোহাকোষ রচনা করেন । তিনি দেবপালের রাজত্বকালে বর্তমান ছিলেন ।
রোসাঙ্গ রাজসভার বাঙালি কবি ও সিদ্দিক বংশজাত কোরেশী মাগন ঠাকুর মধ্যযুগের অন্যতম কবি। তিনি রোসাঙ্গরাজ সাদ উমাদার ও তাঁর পুত্র চন্দ্র সুধর্মার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
- কোরেশী মাগন ঠাকুর আনুমানিক ১৬০০ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চক্রশালা (মতান্তরে আরাকান) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- ডাকনাম মাগন। উপাধি: ঠাকুর (আরাকানি রাজাদের সম্মানিত উপাধি)।
- তাঁর পিতা বড়াই ঠাকুরও আরাকান রাজসভার মন্ত্রী ছিলেন।
- মহাকবি আলাওল তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় 'পদ্মাবতী' ও 'সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল' কাব্য রচনা করেন।
- তিনি ১৬৬০ সালে মারা যান।
কোরেশী মাগন ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থের নাম 'চন্দ্রাবতী': এটি লোককাহিনি আশ্রিত রোমান্টিক প্রণয়কাব্য।
কৃত্তিবাস ওঝা (১৩৮১-১৪৬১)
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের পনের শতকের প্রধান কবি ও বাংলা রামায়ণের আদি কবি কত্তিবাস ওঝা। তিনি বাল্মীকির রামায়ণের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ অনুবাদক। মৈথিলি ব্রাহ্মণদের অসমিয়া ভাষায় ওঝা বলা হয়। ওঝা শব্দটি এসেছে 'উপাধ্যায়' থেকে।
- কৃত্তিবাস ওঝা আনুমানিক ১৩৮১ সালে রাজশাহী জেলার প্রেমতলীতে / পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপের অন্তর্গত ফুলিয়া গ্রামের মুখুটি বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
- কৃত্তিবাসের পদবী মুখোপাধ্যায়। পিতামহ প্রদত্ত নাম কৃত্তিবাস।
- কৃত্তিবাস সম্পর্কে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন, "কৃত্তিবাস 'কীর্তিবাস কবি', এ বঙ্গের অলঙ্কার।"
- তিনি আনুমানিক ১৪৬১ সালে মারা যান।
কৃত্তিবাসের রামায়ণের বিস্তারিত আলোচনাঃ
গৌড়েশ্বরের আদেশে কৃত্তিবাস ওঝা প্রথম 'রামায়ণ' সহজবোধ্য বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। এটি পয়ার ছন্দে রচিত। তাঁর রচিত রামায়ণের অন্য নাম 'শ্রীরাম পাঁচালী'। এটি 'কৃত্তিবাসী রামায়ণ' নামেও পরিচিত। এর মাধ্যমে অনুবাদ সাহিত্যের সূচনা হয়। ১৮০২ সালে উইলিয়াম কেরির সহায়তায় শ্রীরামপুর মিশনের প্রেস থেকে এটি পাঁচখণ্ডে মুদ্রিত হয়। কৃত্তিবাসের রামায়ণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘প্রাচীন বাঙালি সমাজই আপনাকে ব্যক্ত করিয়াছে।’
পবিত্র কোরআন বাংলায় প্রথম অনুবাদকারী গিরিশচন্দ্র সেন (ভাই)। বাঙালি মুসলিমদের জন্য মুসলিম ধর্মগ্রন্থ বঙ্গানুবাদ ও মহাপুরুষদের জীবনী রচনা করে তিনি অমর হয়ে আছেন। ধর্মচর্চা যে শুধু আপনধর্মের গুণকীর্তন ও মাহাত্ম্য বর্ণনা নয়, পরধর্ম ও মতের ভালো দিকগুলোর প্রকাশ ও উন্মোচন, গিরিশচন্দ্র তা দেখিয়েছেন।
- গিরিশচন্দ্র সেন নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি ১৮৮১-৮৬ সালে পবিত্র কোরআন অনুবাদ করেন।
- তিনি 'মহিলা' (১৮৯৫) পত্রিকার সম্পাদক এবং 'সুলভসমাচার' ও 'বঙ্গবন্ধু' পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ছিলেন।
- তিনি ১৫ আগস্ট, ১৯১০ সালে মারা যান।
গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্মধর্ম ধর্মের অনুসারী ছিলেন । ১৮৭১ সালে কেশবচন্দ্র সেন ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর প্রভাবে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। ব্রাহ্মসমাজ তাঁর কর্মনিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তাকে 'ভাই' উপাধিতে ভূষিত করেন।
গিরিশচন্দ্র সেনের সাহিত্যকর্মসমূহঃ
'তাপসমালা' (১৮৮০-১৮৯৬): এটি ফারসি ভাষায় রচিত মাওলানা ফরিদুদ্দিন আক্তারের 'তাজকেরাতুল আওলিয়া' অবলম্বনে রচিত। এতে ৯৬ জন ওলি-আওলিয়ার জীবন কাহিনি বর্ণিত। এটি বাংলা সাহিত্যে সুফী-দরবেশদের জীবন কাহিনি নিয়ে রচিত প্রথম গ্রন্থ।
'মহাপুরুষ চরিত' (১৮৮২-১৮৮৭): এটি তাঁর মৌলিক গ্রন্থ।
'গোলেস্তাঁ ও বুস্তার হিতোপাখ্যানমালা': এটি দুই খণ্ডে বিভক্ত ছিল। গ্রন্থটি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি ছিল।
'হাদিস বা মেসকাত মসাবিহের' (১৮৯২-১৮৯৮), 'তত্ত্বরত্নমালা', 'বনিতা বিনোদন', 'রামকৃষ্ণ পরমহংসের উক্তি ও জীবনী'।
গোবিন্দদাস (১৫৩৪-১৬১৩)
কবি বিদ্যাপতির ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ চৈতন্যোত্তরকালে খ্যাতি অর্জনকারী কবিদের একজন গোবিন্দদাস। গোবিন্দদাসের কবিত্বগুণের সাথে বিদ্যাপতির ভাবের বিশেষ মিলের কারণে কবি বল্লভদাস তাকে 'বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য' অভিধা প্রদান করেন। তাঁর পদাবলিতে রাধা চরিত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ও পরিণতি লক্ষ করা যায়। প্রথম জীবনে তিনি শাক্ত ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। ৪০ বছর বয়সে বৈষ্ণবগুরু শ্রীনিবাস আচার্যের কাছ থেকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেন।
- গোবিন্দদাস মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলার নিকটবর্তী তেলিয়াবুধুরি গ্রামে আনুমানিক ১৫৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
- গোবিন্দদাসের আসল পদবি 'সেন'।
- গোবিন্দদাসকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলা হয়।
- তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়ে শ্রীনিবাস আচার্য গোবিন্দদাসকে 'কবিরাজ' উপাধি প্রদান করেন।
- তাঁর পদাবলিতে মুগ্ধ হয়ে জীব গোস্বামী তাকে 'কবিন্দ্র' উপাধি প্রদান করেন।
- 'গীতগোবিন্দ' তার বিখ্যাত পদাবলি।
- তিনি আনুমানিক ১৬১৩ সালে মারা যান।
গোবিন্দদাস রচিত সংস্কৃত নাটকের নাম 'সংগীতমাধব'। তিনি এটি রচনা করেন রাজা সন্তোষদত্তের অনুরোধে। এ গ্রন্থে তার পারিবারিক পরিচিতি পাওয়া যায়।
গোবিন্দদাসের শ্রেষ্ঠত্বঃ
তিনি মূলত পূর্বরাগ, অভিসার, মান, মাথুর প্রভৃতি পর্যায়ের পদকর্তা এবং অলঙ্কার শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তিনি অভিসার পদ পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। সমালোচকরা তাকে অভিসার পর্যায়ে 'রাজাধিরাজ' নামে অভিহিত করেছেন। তার নামে প্রায় সাড়ে চারশত বৈষ্ণবপদ পাওয়া যায়।
বিখ্যাত পঙ্ক্তিঃ
- যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি।
তাঁহা তাঁহা বিজুরি চমকময় হোতি ॥ - ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি / অবনী বহিয়া যায়।
ঈষত হাসির তরঙ্গ-হিল্লোলে / মদন মুরুছা পায়।। - নন্দ নন্দন চন্দ চন্দন / গন্ধ নিন্দিত অঙ্গ।
জলদ সুন্দর কম্বু কন্ধর / নিন্দি সিন্ধুর ভঙ্গ।।
গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪)
পাকিস্তান আদর্শে বিশ্বাসী গোলাম মোস্তফা গদ্য ও পদ্য রচনায় সমান দক্ষ হলেও কবি হিসেবে তিনি অধিক সমাদৃত। তাঁর কাব্যের মূল বিষয় ইসলাম ও প্রেম। পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমিকায় তিনি প্রচুর পরিমাণ ইসলামি ও পাকিস্তান প্রীতিমূলক সংগীত রচনা করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি উর্দুকে সমর্থন করেন।
- গোলাম মোস্তফা ১৮৯৭ সালে (৭ পৌষ, ১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ঝিনাইদহের শৈলকূপার মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- বিখ্যাত পাপেট নির্মাতা চিত্রশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার তাঁর ছেলে এবং ২০০৭ সালে প্রথম বাংলাদেশী অস্কারজয়ী নাফিস বিন জাফর তাঁর নাতি।
- স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন তাঁর 'আদ্রিয়ানোপল উদ্ধার' কবিতাটি মাসিক 'মোহাম্মদী' পত্রিকায় প্র