hsc

পানি দূষণের উৎস ও কারণ (পাঠ-১৪)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1

(Sources & Causes of Water Pollution)

১. নর্দমার ময়লা (Sewage): নদী বা কূপ যা হতে আমরা খাওয়ার পানি পেয়ে থাকি এগুলো সাধারণত নর্দমার ময়লা (Domestic Sewage) দ্বারা কলুষিত হয়। শহরাঞ্চলের নর্দমাগুলো সাধারণত নদীতে গিয়ে শেষ হয় এবং এগুলো দ্বারা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের মলমূত্র ও অন্যান্য ময়লা আবর্জনা নদীতে পতিত হয়। এছাড়া মানুষ বা অন্যান্য পশুর মল, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদির অপ্রয়োজনীয় অংশ নদীতে পতিত হলে এগুলো ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে অজৈব পদার্থে রূপান্তরিত হয়। ব্যাকটেরিয়াসমূহের এ ধরনের কার্যাবলির জন্য প্রচুর অক্সিজেন খরচ হয়।

২. শিল্পের আবর্জনা (Industrial wastage): শিল্পবিপ্লবের শুরু হতেই শিল্পসমূহ হতে নির্গত ময়লা ও আবর্জনা
নদী ও সমুদ্রের পানি কলুষিত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কাগজ ও কাগজমণ্ড, বস্ত্র, চিনি, সার, লৌহ জাতীয় ধাতু, চামড়া ও রাবার, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্প-কারখানা হতে নির্গত আবর্জনাসমূহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানে গঠিত। এসব শিল্পের বর্জ্য অহরহ পানিকে দূষিত করছে।

৩. তাপমাত্রার বৃদ্ধি (Increased temperature): তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পানিতে অক্সিজেনের ভাগ কমে যায়। শিল্প ও পারমাণবিক চুল্লিসমূহকে ঠান্ডা রাখার জন্য প্রতিনিয়ত পানি সরবরাহ করা হয় এবং এসব পানি আবার নদীতে উত্তপ্ত অবস্থায় ফিরে আসে। এভাবে এসব স্থানের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং তা দূষিত হয়।

৪. তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ (Radio-active wastage): বর্তমান আণবিক যুগে মানুষ তাদের ঘর উষ্ণ রাখার জন্য, খাদ্য সংরক্ষণের জন্য, শিল্পের শক্তি সরবরাহের জন্য ও গাড়ির জ্বালানি সরবরাহের জন্যে বিভিন্ন ধরনের পরমাণু ও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। পারমাণবিক চুল্লি ও অন্যান্য পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে উদ্ভূত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো পানিতে মিশে গিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের ক্ষতিসাধন করতে পারে।

৫. কীটপতঙ্গ ও আগাছানাশক ওষুধ (Pesticides and herbicides): মানুষ উন্নতমানের বীজ, সার, উন্নত ধরনের সেচ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধরনের মড়ক, আগাছা ও পোকা দমনকারী ওষুধ ইত্যাদি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। এ ধরনের যৌগিক ওষুধসমূহ যখন উদ্ভিদের ওপর ছড়ানো হয় তখন এরা মাটিস্থ পানির সাথে মিশে পানিকে দূষিত করে। এছাড়া ওষুধগুলো বৃষ্টির পানির সাথে নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে জমা হয়। এতে জলজ জীবের প্রভূত ক্ষতিসাধন হয়।

৬. এসিডসমূহ (Acids): খনিসমূহ হতে নির্গত এসিডসমূহ পানিতে এসিডের হার বৃদ্ধি করে থাকে। পানিতে এসিডের পরিমাণ অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেলে বহু জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রতি এটি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

৭. পলি ও তলানি (Silt and sediments): ভূমিক্ষয় ও পাহাড় ধসের ফলে পানিবাহিত মাটি, বালুকণা ইত্যাদি পানিকে দূষিত করে। পানি ঘোলাটে হলে জলজ প্রাণীর ডিম ও লার্ভার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটে এবং খাদ্যের অভাব ঘটে।

৮. তেল (Oils): পানিতে তেলের সংমিশ্রণ অথবা পানির উপর তেলের বিস্তার জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রভূত ক্ষতিসাধন করে। বিশেষ করে সমুদ্রে তেলবহনকারী ট্যাংকার থেকে দুর্ঘটনার ফলে অপরিশোধিত তেল নির্গত হলে তা পানিতে মিশে যায় এবং বহু এলাকা জুড়ে জীবকুলের ক্ষতি করে থাকে।

৯. ভারি ধাতু (Heavy metals): ধাতুর আণবিক সংখ্যা ২৩ এর বেশি হলে তাকে ভারি ধাতু বলে। ভারি ধাতুর মধ্যে রয়েছে ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, কপার, জিংক, লেড ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে রেডিয়াম, প্লুটোনিয়াম, কোবাল্ট যা তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত হয়ে পানি দূষণ ঘটায়। পানির সাথে এসব ধাতু মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

১০. আর্সেনিক (Arsenic): আর্সেনিক বিষাক্ত মৌলিক পদার্থ, যা ২৪০ টিরও বেশি খনিজ পদার্থের সাথে একটা অংশ হিসেবে থাকে। অনেক আর্সেনিক যৌগই পানিতে দ্রবণীয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে সর্বপ্রথম মানুষের চামড়ার বর্ণ পরিবর্তন হয়। পরে হাত ও পায়ের তালুতে অর্বুদ সৃষ্টি হয়। অতঃপর চামড়া, যকৃত ও বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। পরিণামে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

১১. অণুজীব (Micro-organisms): বিভিন্ন ধরনের অণুজীব যেমন- ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা পানি দূষিত হয়। এরা বিভিন্ন পয়ঃপ্রণালির মাধ্যমে পানিতে চলে আসে। ফলে পানি দূষিত হয়। এদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন- কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, পোলিও ইত্যাদি ছড়ায়।

১২. কঠিন আবর্জনা (Solid wastage): প্লাস্টিক, পলিথিন, রাবার, অ্যাসবেস্টস ইত্যাদি দ্বারা পরিবেশ দূষিত হয়। এসব পদার্থ দ্বারা তৈরি দ্রব্যাদি সহজে নষ্ট হয় না এবং সহজে তার রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে না। ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণুজীব এর ওপর কোন বিক্রিয়া করতে পারে না। তাই এসব পদার্থগুলো জলাধারের (যেমন- নদী) পানি দূষিত করে।

পানি দূষণ রোধের উপায় (Measures to Prevent Water Pollution)

১. বিষাক্ত বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ: শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদী-নালা ও অন্যান্য জলাশয়ে না ফেলা।

২. বর্জ্য ও আবর্জনা শোধন: শিল্প-কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য যথাযথভাবে শোধনপূর্বক নদী-নালাতে নিক্ষেপ করা। পয়ঃপ্রণালি ও গৃহস্থালির আবর্জনা ও ময়লা জলাশয়ে নিষ্কাশনের পূর্বে যথাযথভাবে শোধন করা। পয়ঃপ্রণালি বাহিত আবর্জনাগুলোকে নদীতে নিক্ষেপ করার পূর্বে ফিল্টার ট্যাংক বা জারন ট্যাংক এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতে হবে। ফিল্টার ও জারন ট্যাংকগুলোতে বিয়োজক অণুজীব রেখে পয়ঃপ্রণালি বাহিত জৈব আবর্জনাগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তিত করতে হবে, যাতে তারা ক্ষতিকর অবস্থায় না থাকে।

৩. কীটনাশক ও সারের নিয়ন্ত্রণ: কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার সীমিত রাখা এবং এদের ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা। সাথে সাথে জৈব সারের ও প্রাকৃতিক কীটনাশকের ব্যবহার বাড়াতে এবং সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করতে হবে।

৪. তেল নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ: পানিতে তেল নিষ্কাশন বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

৫. জলাশয়ে গোসল ও কাপড় কাচা বন্ধ রাখা: পুকুরসহ অন্যান্য আবদ্ধ জলাশয়ে গোসল ও কাপড় কাচা বন্ধ রাখা।

৬. কচুরিপানা ও শৈবাল নিয়ন্ত্রণ: জলাশয়, খাল-বিল যাতে কচুরিপানা ও ভাসমান শৈবালে ভরে না যায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

৭. খনিজ পদার্থের নিয়ন্ত্রণ: খনিজ বর্জ্য যাতে নদী ও সমুদ্রের পানিতে শোধনপূর্বক নির্গত হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

৮. আইন প্রয়োগ: পরিবেশ বিষয়ক কঠোর আইন প্রণয়ন করা ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ইউরোপীয় দেশগুলোতে পানিদূষণের বিরুদ্ধে ভীষণ কঠোর আইন রয়েছে। জলজ যানবাহনের তেল, ময়লা আবর্জনা থেকে যেন পানি দূষিত না হয়, তার ব্যবস্থা সব জলযানকে নিতে হয়। না নিলে কঠোর শাস্তি বা জরিমানার সম্মুখীন হতে হয়।

৯. কূটনৈতিকভাবে নদীতে পানির প্রবাহ সুষ্ঠুকরণ: নদীতে পানিপ্রবাহ কম থাকলে এতে পলি জমে নদীর গভীরতা কমে যায়। ফলে বর্জ্য আবর্জনা দ্রুত স্থানান্তর না হতে পেরে পানিদূষণের সৃষ্টি হয় ও বন্যার প্রকোপ ঘটে। বাংলাদেশের নদীমুখে ভারতের দেওয়া ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধের ফলে দেশের নদীগুলোর অবস্থা বর্তমানে সংকটাপন্ন। তাই কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা ও চাপ সৃষ্টি করে প্রতিবেশী দেশের সাথে এর সমাধান করতে হবে।

১০. গণসচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল কলেজে শিক্ষা, রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক হারে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা।

জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...