hsc

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক (পঞ্চম অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.8k

Factors and Elements of Climate

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ, বায়ুপ্রবাহের গতিবেগ এবং গতিপথ প্রভৃতি দিয়ে কোনো বিশেষ সময় কিংবা বছরের বিশেষ ভাগে কোনো অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলের গড় অবস্থা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কোনো বিশেষ সময়ে বায়ুমণ্ডলের এ অবস্থাকেই আবহাওয়া বলে। আর একটি বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘকালীন অবস্থা ঐ অঞ্চলের জলবায়ু নির্দেশ করে। তাই আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান একই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বায়ুর তাপ, চাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি জলবায়ুর উপাদান। পৃথিবীর সব স্থানের জলবায়ু একরকম নয়। এর কোনো অঞ্চল উষ্ণ এবং কোনো অঞ্চল শীতল। আবার কোনো স্থান বৃষ্টিবহুল এবং কোনো স্থান বৃষ্টিহীন। কিছু ভৌগোলিক বিষয়ের পার্থক্যের কারণে স্থানভেদে জলবায়ুর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এগুলোকে জলবায়ুর নিয়ামক বলে। যেমন- অক্ষাংশ, সূর্যরশ্মির পতন, পর্বত ও সমুদ্রের অবস্থান ইত্যাদি।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও :

উত্তর আমেরিকায় ও অস্ট্রেলিয়ায় এমন একটি দুর্যোগ সংঘটিত হয় যা, মূলত অতি দ্রুত আবর্তনশীল ক্ষুদ্র আকারের অথচ প্রলংকারী। এটি চোঙ আকৃতির হয়ে থাকে। 

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও :

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌছালে বা স্থির থাকলে বায়ুর নিম্নচাপের ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়।

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আজাদ তার বাবার সাথে সিলেট বেড়াতে যায়। সেখান থেকে সে জৈন্তাপুর পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে দেখল পাহাড়ের একদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে না। 

(Climate)

জলবায়ু হলো কোনো স্থান বা অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘকালীন অবস্থা। বায়ুমণ্ডলের অবস্থা বলতে এর তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, প্রবাহ এবং বায়ুমণ্ডলে গৃহীত সূর্যালোক প্রভৃতি বোঝায়। অর্থাৎ জলবায়ু বলতে একটি বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে আবহাওয়ার উপাদানগুলো যেমন- বায়ুর তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বছরের যে সাধারণ অবস্থা (গড় অবস্থা) দেখা যায় তাকে বোঝায়।

এ প্রেক্ষিতে জলবায়ুর সংজ্ঞার্থে R.G. Barry এবং R.J. Chorely কর্তৃক
প্রদত্ত সংজ্ঞা উপস্থাপন করা যায়- Climate introduces the longer time scales operating in the atmosphere. It is sometimes regarded as "the average weather" but it is more meaningful to define climate as the long term state of atmosphere encompassing the aggregate effect of weather phenomenon, the extreme as well as the mean values.

জলবায়ুর উপাদান (Elements of Climate)

যেসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে জলবায়ু বা আবহাওয়া গঠিত হয় সেগুলোকে জলবায়ু বা আবহাওয়ার উপাদান বলে। জলবায়ুর প্রধান উপাদান পাঁচটি। যেমন- তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ এবং বারিপাত। উপাদানগুলো সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

বায়ুর তাপমাত্রা (Air temperature): বায়ুর উষ্ণ ও শীতল অবস্থাকে বায়ুর তাপমাত্রা বলে। কোন স্থানের জলবায়ু কীরূপ তা তাপমাত্রার পরিমাণ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। অধিক তাপবিশিষ্ট অঞ্চলকে উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চল (মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া) এবং কম তাপবিশিষ্ট অঞ্চলকে শীতল জলবায়ু অঞ্চল (কানাডা, সাইবেরিয়া) বলে।
বায়ুর চাপ (Air pressure): বায়ুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। উন্মুক্ত উষ্ণ সাগরের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু প্রচুর জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী স্থলভাগে বৃষ্টিপাত ঘটায়। তাই জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারণে বায়ুর চাপ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বায়ুর আর্দ্রতা (Humidity): বায়ুতে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিকে বায়ুর আর্দ্রতা বলে। অর্থাৎ বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ করাই আর্দ্রতা। বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি হলে তাকে আর্দ্র বায়ু বলে। আবার বায়ুতে জলীয়বাষ্প কম হলে তাকে শুষ্ক বায়ু বলে। আর্দ্র বায়ুপ্রবাহের ফলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে না। পক্ষান্তরে, শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে না। বৃষ্টিহীন মরু অঞ্চলে বেশি উত্তাপ অনুভূত হয়।

বায়ুপ্রবাহ (Wind movement): ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে আনুভূমিকভাবে বায়ু
চলাচল করে। একেই সাধারণভাবে বায়ুপ্রবাহ বলে। নিম্নচাপ অঞ্চলের বায়ু সর্বদাই উষ্ণ ও লঘু হয়ে উপরে উঠে যায়; আর উচ্চচাপ অঞ্চলের শীতল ও ভারি বায়ু শূন্যস্থান পূরণার্থে সেদিকে ধাবিত হয়। বায়ুর তাপের স্থিতি অবস্থা বজায় রাখতে বায়ুতে প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এতে বায়ুর তাপের আদান-প্রদান ঘটে।

বারিপাত (Precipitation): জলীয়বাষ্প উপরে উঠে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষারকণায় পরিণত হয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়, একে বারিপাত বলে। শিশির, তুষার, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি বারিপাতের এক একটি রূপ। সকল প্রকার বারিপাত জলীয়বাষ্পের ওপর নির্ভরশীল।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Factors of Climate)

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জলবায়ুর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এই ভিন্নতার পেছনে জলবায়ুর কতগুলো নিয়ামক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে। এই নিয়ামকগুলো হলো- ১. অক্ষাংশ ও সূর্যের কৌণিক অবস্থান, ২. সমুদ্র সমতল থেকে উচ্চতা, ৩. পাহাড়-পর্বতের অবস্থান, ৪. জল ও স্থলভাগের অবস্থান, ৫. সমুদ্রস্রোত, ৬. ভৌগোলিক অবসান, ৭. মৃত্তিকা প্রভৃতি, ৮. বনভূমি, ৯. ভূমির ঢাল ও ১০. পৃথিবীর ঘূর্ণন।

১. অক্ষাংশ ও সূর্যরশ্মির পতন কোণ (Latitudes and Angle of sunlight fall): পৃথিবীর আহ্নিক গতির ফলে দিবারাত্রি সংঘটিত হয় আর বার্ষিক গতির ফলে ঋতু পরিবর্তন হয়। সূর্যের অবস্থান ও অক্ষাংশভেদে বায়ুমণ্ডলে সূর্যতাপের তারতম্য ঘটে। নিরক্ষরেখার উত্তরেকর্কটক্রান্তি (২৩.৫° উত্তর অক্ষরেখা) ও দক্ষিণে মকরক্রান্তি (২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষরেখা) এর মধ্যে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয়। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণের সময় এই দুই সীমানার

মধ্যে প্রতিটি স্থানে বছরে সূর্য দুইবার লম্বভাবে কিরণ দেয়। ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে যতই মেরু অঞ্চলের দিকে যাওয়া যায় সূর্যের তির্যকভাবে কিরণ ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর তাপমাত্রাও তত কমতে থাকে। লম্বভাবে পতিত সূর্যকিরণ স্বল্প গভীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে স্বল্প পরিসরে ভূমণ্ডলে পতিত হয়, এতে উত্তাপের প্রখরতা অধিক থাকে। আর সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়লে অধিক পরিমাণে বায়ুমণ্ডলের গভীরতা ভেদ করে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে যায়। এতে তাপমাত্রার প্রখরতা কমে যায়। এ সব অবস্থার ওপর নির্ভর করে সৃষ্টি হয়েছে উষ্ণমণ্ডল, নাতিশীতোষ্ণমণ্ডল ও হিমমণ্ডল।

২. সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা (Altitude from sea level):
উচ্চতা কোন অঞ্চলের জলবায়ুর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে যত ঊর্ধ্বে যাওয়া যায়, বায়ুর তাপমাত্রা তত কমতে থাকে (ট্রপোস্ফিয়ারের মধ্যে)।
ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা, জলকণা, লবণকণা প্রভৃতি তাপ শোষণ করে। এসব কারণে নিচের স্তরের বায়ু ওপরের স্তর অপেক্ষা অধিক উষ্ণ থাকে। গাঙ্গেয় সমভূমিতে  °মি. উচ্চতায় নতুন দিল্লির জুন মাসের গড় উষ্ণতা ৩৩.৩০°সে. কিন্তু নিকটবর্তী অধিক উচ্চতায় অবস্থিত সিমলায় ঐ মাসের গড় উত্তাপ ১৯.৫° সে.।

৩. পাহাড়-পর্বতের অবস্থান (Location of hills and mountains) : জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুপ্রবাহের পথে পাহাড় পর্বতে বাধা পেলে প্রতিবাত পার্শ্বে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু বিপরীত পার্শ্ব বৃষ্টিহীন থাকে। 'একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। ভারতের আসাম, মেঘালয়, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

৪. জল ও স্থলভাগের অবস্থান (Location of ground and waterbodies): ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭১% জলভাগ এবং ২৯% স্থলভাগ। এদের বিপরীতধর্মী প্রকৃতির জন্য স্থান ও সময়ভেদে সৌরতাপ বণ্টনের বিভিন্নতা লক্ষনীয়। সূর্যরশ্মি স্থলভাগে ৩ ফুট গভীরতায় আর জলভাগে ৬০০ ফুট গভীরতায় পৌছতে পারে। দিনের বেলায় ভূমি দ্রুত সৌরতাপ গ্রহণ করে ও দিন শেষে দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হতে থাকে। অন্যদিকে, চলনশীল পানির উপরিস্তর সূর্যকিরণে উত্তপ্ত হয়ে হালকা হয় এবং নিম্ন ঢালে ধাবিত হয়। তখন আবার নিচের উন্মুক্ত পানি উত্তপ্ত হতে থাকে। এই উত্তপ্তকরণ প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকে। সে সঙ্গে সমুদ্রস্রোত, তরঙ্গ, জোয়ার-ভাটা দ্বারা তাপমাত্রা পুনঃবণ্টিত হয়। হিসেবে দেখা গেছে, ১ ঘনফুট পরিমিত পানিকে ১°সে. তাপমাত্রায় আনতে যে উত্তাপ লাগে ঐ পরিমাণ শিলারাশিকে ঐ তাপমাত্রায় আনতে দ্বিগুণ তাপ দরকার। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ু প্রবাহের ফলে মনোরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। বিপরীতক্রমে সমুদ্র উপকূল থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, শীত ও গরমের পার্থক্য তত বেশি অনুভূত হয়। বাংলাদেশের কক্সবাজার বা কুয়াকাটা এলাকায় এটা সহজেই অনুভব করা যায়।

৫. সমুদ্রস্রোত (Ocean currents): কোনো অঞ্চলের জলবায়ুর ওপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
উপকূল অঞ্চলে উষ্ণস্রোত উষ্ণতা ও শীতল স্রোত শৈত্য নিয়ে আসে। যেমন: আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের জলবায়ু অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং উপকূল বরফমুক্ত থাকে। আবার শীতল ল্যাব্রাডার স্রোতের প্রভাবে কানাডার পূর্ব উপকূলের জলবায়ু শীতল থাকে।

৬. ভৌগোলিক অবস্থান (Geographic location): ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। যেমন: ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশের জলবায়ু উষ্ণ প্রকৃতির কিন্তু মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে নাতিশীতোষ্ণ অবস্থা বিজার করে। এতে করে গ্রীষ্মে বায়ু থাকে উষ্ণ ও আর্দ্র। আবার শীতকালে উত্তর দিক থেকে আগত শৈত্যপ্রবাহের ফলে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আবার হঠাৎ ঝড় কোনো অঞ্চলের উষ্ণতার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকা রাখে যেমন-বাংলাদেশের কালবৈশাখী ও উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়।

৭. শিলা অথবা মৃত্তিকার প্রকৃতি (Nature of rocks or soils): শিলা বা মৃত্তিকার গঠনপ্রকৃতি ও বর্ণ তাপধারণ ও
বিকিরণকে প্রভাবিত করে। প্রস্তর শিলা ও বালু মাটি অতি সহজে উত্তপ্ত ও শীতল হয়। এ কারণেই পার্বত্য ও মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় উষ্ণতা ও রাত্রিকালে শীতলতা উভয়ই খুব বেশি থাকে।

৮. উদ্ভিদের আচ্ছাদন (Vegetation cover): স্বাভাবিক উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে। যেমন- নিবিড় বনভূমির ভেতর সূর্যের আলো পৌঁছে না। ফলে উত্তাপ কম হয় ও স্যাঁতসেতে অবস্থা বিরাজ করে। বৃক্ষ প্রস্বেদনের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়; বনভূমি এলাকার জলবায়ু আর্দ্রভাবাপন্ন ও বৃষ্টিবহুল হয়। পক্ষান্তরে, বৃক্ষহীন অঞ্চল হয় রুক্ষ, শুষ্ক ও উষ্ণ।

৯.ভূমির ঢাল (Slope of landmass): ভূমির ঢালের সাথে সূর্যরশ্মির তির্যক ও লম্ব পতন জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। সাধারণভাবে বলা যায়, ভূমির সম্মুখ ঢাল বরাবর সূর্যকিরণ পড়লে উত্তাপ বেড়ে যাবে আর বিপরীত দিকে (অনুবাত পার্শ্ব) ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে।

১০. পৃথিবীর ঘূর্ণন (Rotation of earth): পৃথিবী নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণনের কারণে ঋতুচক্র সংঘটন ও দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের তারতম্য হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতার পার্থক্য ঘটে এবং জলবায়ুতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Temperature Zone / Temperature Belt of the World)

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপের বিন্যাসের প্যাটার্ন অনুযায়ী অক্ষাংশভেদে পৃথিবীকে মোট ৫টি তাপমণ্ডল বা তাপবলয়ে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- (১) উষ্ণমণ্ডল, (২-৩) উত্তর ও দক্ষিণ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল, (৪-৫) উত্তর ও দক্ষিণ হিমমণ্ডল। এগুলো গোলাকার পৃথিবীকে ঘিরে অবস্থান করছে।

(১) উষ্ণমণ্ডল (Torrid zone/Tropical zone)

নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে ২৩.৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষরেখা তথা কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার মধ্যবর্তী অঞ্চল ও তাদের সন্নিহিত এলাকা নিয়ে উষ্ণমণ্ডল গঠিত। সাধারণত ২৭°সে. বা ° ফা. সমোষ্ণরেখা পর্যন্ত অঞ্চলই প্রকৃত উষ্ণমণ্ডল। এ অঞ্চলের যেকোনো স্থানে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা সাধারণত ২৭°সে. হয়। তবে বিশেষ কারণবশত স্থানভেদে বেশিও হয়ে থাকে। উষ্ণমণ্ডলের বিস্তার স্থানভেদে °-° পর্যন্ত হতে পারে।

(২-৩) উত্তর ও দক্ষিণ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল (North and South temperate zone)

উত্তরে ° অক্ষাংশ থেকে সুমেরু বৃত্তের নিকট ৬৬.৫° উত্তর অক্ষরেখা এবং দক্ষিণে ° অক্ষাংশ থেকে কুমেরু বৃত্তের নিকট .° দক্ষিণ অক্ষরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে যথাক্রমে উত্তর নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল ও দক্ষিণ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল বলে। এক্ষেত্রে সমোষ্ণরেখার ব্যাপ্তি হচ্ছে ২৭°সে. থেকে ০°সে. (৩২°ফা.)। এ মন্ডলের বিস্তৃতি প্রায় ° কি.মি.।

(৪-৫) উত্তর ও দক্ষিণ হিমমণ্ডল (North and South frigid zone)

উত্তর গোলার্ধে সুমেরু বৃত্ত থেকে উত্তর মেরু বিন্দু (৯০°উঃ) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে কুমেরু বৃত্ত থেকে দক্ষিণ মেরু বিন্দু (৯০°দঃ) পর্যন্ত অঞ্চলকে যথাক্রমে উত্তর হিমমণ্ডল ও দক্ষিণ হিমমণ্ডল বলে। এই অঞ্চলে সূর্যরশ্মির অতি তির্যক পতনের ফলে সূর্য থেকে আগত তাপ অনেক কম পাওয়া যায়। ফলে অধিকাংশ স্থান প্রায় কম-বেশি বরফাচ্ছন্ন থাকে। তাপমাত্রা মাইনাস ডিগ্রিতে থাকে। বিশেষ করে শীতকালে প্রায় রাত্রির অবস্থা বিরাজ করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্ব-স্ব মণ্ডলে সব জায়গায় উত্তাপ একই থাকে না। স্থান বিশেষে জলবায়ুর নিয়ামকগুলো উত্তাপের সমতার ব্যত্যয় ঘটায়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Horizontal Distribution of Temperature)

বিশ্বের উত্তাপের বিন্যাস সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য জানুয়ারি ও জুলাই মাসকে আদর্শ (Standard) ধরা সুবিধাজনক। এই দুই মাসের উষ্ণতার মধ্যে চরমভাব লক্ষ করা যায়। সূর্যের অবস্থান সাপেক্ষে এই দুই মাসের গড় উষ্ণতা হিসাব করে সমোষ্ণরেখার (Isotherm) সাহায্যে তাপমাত্রার বিন্যাস দেখানো হয়।

১. জুলাই মাসে তাপের বিন্যাস: গ্রীষ্মকালে সূর্য উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করে। আর দক্ষিণ গোলার্ধ এ সময় সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকে। জুলাই মাসে উত্তর গোলার্ধে সর্বাধিক উষ্ণতা বিরাজ করে।

ক. উত্তর গোলার্ধে তাপের বিন্যাস: জুলাই মাসে ৪৫°সে, সমোষ্ণরেখা সাহারা মরুভূমির ক্ষুদ্র এলাকা বেষ্টন করে থাকে। তারপর থেকে কমতে থাকে। ৩০°সে. সমোষ্ণরেখা দ্বারা সৃষ্ট নিম্নচাপ বৃত্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে, আফ্রিকার উত্তর দিকে এবং এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে স্থান করে নেয়। এ সময় এসব অঞ্চলে রীতিমতো উত্তাপ (> ২৫° সে.) বিরাজ করে। ° উত্তর অক্ষাংশের অঞ্চলগুলোতে বেশি তাপ অনুভূত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে সমতাপ রেখাগুলোর মান দক্ষিণ থেকে উত্তরে কমতে থাকে। তবে উত্তর মেরু থেকে আগত শীতল সমুদ্রস্রোত। প্রবাহিত অঞ্চলে সমোষ্ণরেখাগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তিত হয়। জলভাগের ওপর সমোষ্ণরেখা প্রায় সমান্তরাল থাকে।

খ. দক্ষিণ গোলার্ধে তাপের বিন্যাস: স্বাভাবিকভাবে উত্তর গোলার্ধে যখন গ্রীষ্মকাল, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন
শীতকাল। দক্ষিণ গোলার্ধে স্থলভাগ কম থাকায় সমোষ্ণরেখাগুলো প্রায় সোজাভাবে পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত হয়। এই গোলার্ধে ২৫°সে. সমোষ্ণরেখা থাকে না। ২০°সে. সমোষ্ণরেখা দক্ষিণ গোলার্ধে প্রায় ° অক্ষাংশের ওপর অবস্থান করে। জলরাশির ওপর সমান্তরালভাবে বিস্তৃত সমোষ্ণরেখাগুলো স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় স্থানীয় কারণে বেশ বাঁকা হয়ে যায়। নিরক্ষরেখা থেকে যত দক্ষিণে যাওয়া যায় তত এ রেখাগুলোর মান কমতে থাকে। বেশ দক্ষিণে ° সে. সমোষ্ণরেখা প্রায় ° অক্ষাংশের কাছ দিয়ে সমান্তরাল অবস্থান সৃষ্টি করে অগ্রসর হয়।

২. জানুয়ারি মাসে তাপের বিন্যাস: জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে শীতকাল আর দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল। এ সময় তাপ শোষণ ক্ষমতা অনুযায়ী নিকটবর্তী সমুদ্র অপেক্ষা স্থলভাগ অধিক শীতল হয়। সমোষ্ণরেখাগুলো সমুদ্রের ওপর উচ্চ অক্ষাংশের দিকে এবং স্থলভাগে নিম্ন অক্ষাংশের দিক থেকে অগ্রসর হয়।

ক . উত্তর গোলার্ধে তাপের বিন্যাস: জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে ° সে. সমোষ্ণরেখা সামান্য আঁকাবাঁকাভাবে অবস্থান করে। এটি উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার °-° অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করে। কর্কটক্রান্তি রেখার উত্তর দিকে ১৫°সে. সমোষ্ণরেখা অগ্রসর হয়। মধ্য প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে এটি উচ্চ অক্ষাংশের দিকে বাঁক নিয়ে ° অক্ষাংশের দিকে অগ্রসর হয়। ১০°সে. সমোষ্ণরেখা প্রশান্ত মহাসাগরের °অক্ষাংশে পৌছলে সেখানে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের প্রভাবে আঁকাবাঁকাভাবে অবস্থান নেয়। ° সে. সমোষ্ণরেখাটি উত্তর আমেরিকার মধ্যভাগে ° অক্ষাংশের নিকট দিয়ে যায়। তবে এটি আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর-পূর্বে °অক্ষাংশের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এটি আবার ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের °-° অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করে।
এ মাসে পৃথিবীর শীতলতম এলাকা হচ্ছে উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়া এবং গ্রিনল্যান্ড। মেরুর নিকটবর্তী এলাকার আবহাওয়া সংক্রান্ত বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।

খ. দক্ষিণ গোলার্ধে তাপের বিন্যাস: জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকায় সমুদ্র অপেক্ষা স্থলভাগের উষ্ণতা বেশি থাকে। এই গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় সমোষ্ণরেখাগুলো অনেকটা সমান্তরালভাবে চলে এবং ভূভাগে বেঁকে যায়।
এ সময় অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার দক্ষিণাংশ, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যভাগের কিছু অংশে পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপ অনুভূত হয়। এখানে ৩০°সে. সমোষ্ণরেখা বৃত্তাকারে এসব অঞ্চলে নিম্নচাপ বৃত্তের সৃষ্টি করে। এর কাছাকাছি ২৫° সে. সমোষ্ণরেখা ° অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করে এবং বিষুবরেখা অতিক্রম করে। এর পরে সমোষ্ণরেখাগুলো প্রায় সমান্তরালভাবে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হয়।

বায়ু তাপের উলম্ব বিস্তার (Vertical Distribution of Temperature)

লক্ষণীয় যে, বিষুবরেখা থেকে যত উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে যাওয়া যায় তত উত্তাপ কমতে থাকে। আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ভূপৃষ্ঠ থেকে যতই উপরের দিকে যাওয়া যায় বায়ুর তাপমাত্রা ততই কমতে থাকে। তবে এই কমার হার সর্বত্র এক রকম নয়। সাধারণত ওপরের দিকে প্রতি ১০০০ ফুট উচ্চতায় বায়ুর তাপ কমে .° ফা (৬.৫°c/km.)। কখনও কখনও এই হার ° ফা./১০০০' ও হতে পারে। একে বায়ু তাপের স্বাভাবিক তাপ হ্রাস (normal lapse rate) বলে। পৃথিবীপৃষ্ঠে স্থানভেদে তাপ হ্রাসের হারে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। এক্ষেত্রে দিবাভাগের দৈর্ঘ্য, ঋতু পরিবর্তন এবং পৃথিবী পৃষ্ঠের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি প্রভৃতি প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Air Pressure Belt)

পৃথিবীর মাধ্যকর্ষণ শক্তির প্রভাবে বায়ুমণ্ডল ভূপৃষ্ঠের প্রতি বর্গমিটার স্থানের উপর যে বল প্রয়োগ কেের তাকে বায়ুচাপ বলে। চাপীয় মানের পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন চাপকোষ বলয় আকারে পৃথিবীকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে আছে যাদেরকে চাপবলয় বলা হয়। বিভিন্ন অক্ষাংশে তাপের পার্থক্য এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত কারণে চাপ বলয়গুলো সৃষ্টি হয়েছে। চাপ বলয়গুলো দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা: ক. উচ্চচাপ বলয় ও খ. নিম্নচাপ বলয়।

ক. উচ্চচাপ বলয় (High pressure belt / zone): কোনো চাপ কক্ষের কেন্দ্রে যদি উচ্চচাপ থাকে এবং চারপাশে বায়ুচাপ তুলনামূলকভাবে কমতে থাকে তখন তাকে উচ্চচাপ অঞ্চল বলে।
খ . নিম্নচাপ বলয় (Low pressure belt/zone): কোনো চাপ কক্ষের কেন্দ্রে যদি নিম্নচাপ ও বাইরের দিকে বায়ুচাপ তুলনামূলকভাবে বাড়তে থাকে, তবে এ অবস্থায় তাকে নিম্নচাপ অঞ্চল বলে। পৃথিবীতে সর্বমোট সাতটি চাপবলয় আছে।
উৎপত্তিগত দিক থেকে বায়ুচাপ বলয়গুলো দুইটি বড় ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়-

১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় এবং মেরু উচ্চচাপ বলয় (Thermally induced pressure belt)
২. উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় এবং উপমেরু নিম্নচাপ বলয় (Dynamically induced pressure belt)

সামগ্রিকভাবে চাপ বলয়গুলো হলো-

(১) নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা শান্ত বলয়;

(২-৩) উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়: (২) কর্কটীয় ও (৩) মকরীয় উচ্চচাপ বলয়

(৪-৫) মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়: (৪) সুমেরু ও (৫) কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়;

(৬-৭) মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়: (৬) উত্তর ও (৭) দক্ষিণ মেরুদেশীয় বা কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।

১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা শান্ত বলয় (Equatorial low pressure belt or doldrums): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় নিরক্ষরেখার উভয় দিকে °-° অক্ষাংশের মধ্যে বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অবস্থিত। পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য বছরের বিভিন্ন সময় এই চাপবলয় ° থেকে ° অক্ষাংশের মধ্যে যাওয়া-আসা করে। এই নিম্নচাপ বলয় প্রধানত তিনটি কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো হলো-

i. নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য প্রায় সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে প্রসারিত হয় এবং উপরে উঠে যায়।
ii. এই অঞ্চলে স্থলভাগ অপেক্ষা জলভাগ বেশি হওয়ায় প্রখর সূর্যতাপে অধিকতর জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু হালকা হওয়ায় ওপরে উঠে যায়।
iii. এছাড়া এই অঞ্চলের উঁচু স্তরে উষ্ণ, আর্দ্র ও লঘু বায়ু পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য উত্তর-দক্ষিণ উভয় দিকে ছিটকে যায়।

উপরিউক্ত কারণেই বিশেষ করে অত্যধিক উষ্ণতার জন্যই বলয়টি নিম্নচাপ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

Inter Tropical Convergence Zone বা সংক্ষেপে ITCZ বা আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল নিরক্ষীয় শান্তবলয়ে অবস্থিত একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলটিই মূলত ডোলড্রাম (doldrum), যেখানে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাণিজ্য বায়ু পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং বজ্রঝড় সৃষ্টি করে।

আবহাওয়ার অবস্থা: নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুর পরিচলন স্রোতে কিউমুলাস মেঘের সৃষ্টি হয়। বজ্র-বিদ্যুৎসহ প্রবল পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ অঞ্চলে সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়, বিশেষ করে বিকেলের দিকে। বাতাসে অধিক জলীয়বাষ্প থাকায় আবহাওয়া গুমোট থাকে ও ভ্যাপসা গরম পড়ে। এতে রীতিমতো গা ঘামে। ফলে শরীরে অবসন্নতা আসে ও মানুষের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়।

(২-৩) উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় (subtropical high pressure belt: tropic of cancer and tropic of capricorn high pressure belt): নিরক্ষরেখার উভয়পাশে ২৫০-৩৫০ অক্ষাংশের মধ্যে উচ্চচাপ বলয় দু'টি অবস্থিত। এখানে বায়ুপ্রবাহের কয়েক রকম অবস্থা দেখা যায়।
i. নিরক্ষীয় অঞ্চলে উঊর্ধ্বে প্রবাহিত উষ্ণ, আর্দ্র ও হালকা বায়ু পৃথিবীর আবর্তনের ফলে উত্তরে ও দক্ষিণে ছিটকে যায়। এ বায়ু শীতল ও ভারি হয়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে নেমে আসে। পরে কিছুটা উষ্ণ হয়ে উঠে।
ii. সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারি বাতাস নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। এই দু'দিকের বায়ুপ্রবাহ যথাক্রমে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার নিকট নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে আগত বায়ুপ্রবাহের সজো পরস্পর মিলিত হয় এবং চাপ বৃদ্ধি পায়। এভাবে উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়।
iii. উভয় ক্রান্তীয় অঞ্চলে বায়ুর প্রবাহ নিম্নমুখী হওয়ায় বায়ুর পার্শ্বপ্রবাহ লক্ষ করা যায় না। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো এ অঞ্চলেও বায়ুপ্রবাহে সর্বদা শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। তাই এদের ক্রান্তীয় শান্তবলয় (tropical calms) বলে অভিহিত করা হয়।
এই উচ্চচাপ বলয়ের সর্বত্র একইরূপ অবস্থা থাকে না। কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়।

অশ্ব অক্ষাংশ (Horse latitude): আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর বিস্তৃত কর্কটীয় শান্তবলয় অশ্ব অক্ষাংশ নামে পরিচিত। আগের দিনে সমুদ্রে পালতোলা জাহাজগুলো বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলাচল করত। এ অঞ্চলে বায়ুর পার্শ্ব-প্রবাহ না থাকায় প্রাচীনকালে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ বা পূর্ব এলাকা থেকে উত্তর-আমেরিকামুখী ঘোড়া বোঝাই জাহাজ এ অঞ্চলে এসে আটকা পড়ত। তখন খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে ঘোড়াগুলোকে সাগর বক্ষে নিক্ষেপ করে জাহাজ হালকা করা হতো। সে থেকে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে অশ্ব অক্ষাংশ।

জলবায়ুর অবস্থা: এ অঞ্চলে বায়ু ওপর থেকে নিচে নেমে আসায় বায়ু শুষ্ক থাকে (জলীয়বাষ্প থাকে না)। বিশ্বের বড়। বড় মরুভূমিগুলো; যথা- আফ্রিকার সাহারা ও কালাহারি, এশিয়ার আরব মরুভূমি, অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি এ অঞ্চলে অবস্থিত। আর উপকূলের নিকটে পাহাড়-পর্বত থাকলে অনুবাত পার্শ্বে বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড় হয়।

(৪-৫) মেরুবৃত্তীয় নিম্নচাপ বলয়: সুমেরু ও কুমেরু বৃত্তীয় নিম্নচাপ বলয় (subpolar low pressure belts of both hemispheres): উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে °-° অক্ষাংশ জুড়ে সুমেরু বৃত্ত ও কুমেরু বৃত্ত অঞ্চলে নিম্নচাপ বলয় অবস্থিত। এখানে ভূপৃষ্ঠে সর্বনিম্ন চাপবলয় বিদ্যমান। এ অঞ্চলে কতকগুলো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেমন:

i. পৃথিবীর আবর্তনের বেগ মেরুদ্বয় অপেক্ষা দুই মেরুবৃত্ত প্রদেশে অধিক এবং বহির্মুখী শক্তি কার্যকরী হয়। এ কারণে এই দুই অঞ্চলে বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে বিক্ষিপ্ত হয়।
ii. বিশেষ করে সুমেরু বৃত্তে শীত-গ্রীষ্ম ভেদে উত্তর গোলার্ধে চাপ বলয়গুলো কম-বেশি বিস্তৃত হয়। পৃথিবীর আবর্তনের ফলে এখানে বায়ুপ্রবাহ ভেঙে বিরাট ঘূর্ণিতে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। ঘূর্ণিগুলোর কেন্দ্রস্থলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এ সময় এই অঞ্চলে উষ্ণ পশ্চিমা বায়ু শীতল মেরু বায়ুর ওপর উঠে গিয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
iii. পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ ও মেরু বায়ুপ্রবাহ যেখানে মিলিত হয়েছে তাকে মেরুপ্রদেশীয় শান্তবলয় বলে।
iv. এ অঞ্চলে বায়ুর পরিমাণ কমে যাওয়ায় বায়ুর চাপ নিম্ন হয়। উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগের প্রাধান্য থাকায় বায়ুপ্রবাহের জটিল আবর্তে শীতকালে ঝড়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মকাল বেশ মৃদু শান্ত থাকে। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় শীত-গ্রীষ্মের উষ্ণতার পার্থক্য কম থাকে। এই চাপবলয়ে যেখানে জলভাগ আছে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

(৬-৭) মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় (Polar high pressure belt of both hemispheres): এই এলাকায় উচ্চচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণগুলো হলো-

i. উভয় মেরু এলাকা বরফাচ্ছন্ন; প্রচণ্ড শীতল অবস্থা বিরাজ করে (উষ্ণতা-০°c হয়)। বাতাস খুব ঠাণ্ডা ও ভারি হয়।
ii. সূর্যকিরণের অভাবে জলীয়বাষ্প খুব কম থাকে।
iii. পৃথিবীর আবর্তনে মেরুবৃত্তীয় নিম্নচাপ এলাকায় ছিটকে যাওয়া ঊর্ধ্বগামী বাতাস শীতল ও ভারি হয়ে এখানে নেমে আসে। ফলে এখানে চাপ বৃদ্ধি পায়।
মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন: উত্তর মেরুর উচ্চচাপ বলয়কে সুমেরু উচ্চচাপ বলয় (arctic high pressure belt) এবং দক্ষিণ মেরুর উচ্চচাপ বলয়কে কুমেরু উচ্চচাপ বলয় (antarctic high presure belt) বলে। এসব এলাকার আবহাওয়ার তথ্য তেমন পাওয়া যায় না।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Wind Movement)

বায়ু সর্বদা একস্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। সাধারণত ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে অনুভূমিকভাবে বায়ু চলাচল করে। বায়ুর এই চলাচলকে বায়ুপ্রবাহ বলে। নিম্নচাপ অঞ্চলের বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়; আর উচ্চচাপ অঞ্চলের শীতল ও ভারি বায়ু শূন্যস্থান পূরণার্থে সেদিকে ধাবিত হয়। এটা সবার জানা যে, উষ্ণমণ্ডলে বায়ুর উত্তাপের আধিক্য ও হিমমণ্ডলে উত্তাপের ঘাটতি থাকে। আর এ কারণে বায়ুর তাপের স্থিতি অবস্থা (balance) বজায় রাখতে বায়ুতে প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এতে বায়ুর তাপের আদান-প্রদান চলে।

বায়ুপ্রবাহের কারণসমূহ (Causes of Winds Movement)

বায়ুপ্রবাহ সাধারণত যেসব কারণে ঘটে সেগুলো হলো: (i) উষ্ণতা/তাপমাত্রার পার্থক্য; (ii) বায়ুচাপের পার্থক্য; (iii) পৃথিবীর আবর্তন গতি; (iv) পৃথিবীর ভূমিরূপ; এবং (v) বায়ুমণ্ডলীয় উপাদান প্রভৃতি।

i. উষ্ণতার পার্থক্য (Difference in temperature): বায়ু উষ্ণ হলে হালকা ও প্রসারিত হয় এবং ঘনত্ব ও আপেক্ষিক পুরুত্ব (Relative thickness) কমে যায়। জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু উষ্ণ ও হালকা বিধায় ঊর্ধ্বে গমন করে। তখন সমতা রক্ষার্থে উচ্চচাপ অঞ্চলের শীতল ও ভারি বায়ু নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। পৃথিবীর কোথাও অঞ্চল বা স্থান বিশেষে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

ii. বায়ুচাপের পার্থক্য (Difference in air pressure): মূলত তাপমাত্রার সঙ্গে বায়ুচাপ অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কযুক্ত। বায়ুর উচ্চচাপ যুক্ত অঞ্চলের ভারি বার্তাস নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন- ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়।

iii. পৃথিবীর আবর্তন গতি (Rotation (Rotatio of the earth): পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে কার্যকরী শক্তি; যেমন- কেন্দ্রাতিগ শক্তি (Centrifugal force), ঘর্ষণজনিত শক্তি (Frictional force), কোরিওলিস বল (Coriolis force) বা জিয়োট্রোফিক বল (Geotrophic force)-এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ নির্দিষ্ট গতিপথে প্রবাহিত হয়।

iv.পৃথিবীর ভূমিরূপ (Relief features of the earth): পৃথিবীর কোথাও পা মরুভূমি, কোথাও সমভূমি প্রভৃতি ভূপ্রকৃতি দেখা যায়। উচ্চভূমির অনুবাত পাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যেমন- শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আগত অত্যন্ত শীতল হয়ে পশ্চিমে ঘুরে যায় আর কিছু অংশ বাংলাদেশে আসে। এতে শীতের প্রতে এলাকায় প্রখর সূর্যতাপে দিনের বেলায় বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়। রাতে শীত স্থলভাগের সংযোগ এলাকায় স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ু প্রবাহিত হয়।

v. বায়ুমণ্ডলীয় উপাদান (Elements of the atmosphere): বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা প্রভৃতি কারণে বায়ুপ্রবাহের পার্থক্য ঘটে। যেমন- উষ্ণ জলীয়বাষ্পপূর্ণ বা তখন চারপাশ থেকে শীতল বায়ু শূন্যস্থান পূরণ করে।
কাজ: বায়ুপ্রবাহের কারণগুলোর মধ্যে কোনটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ? নির্ণয় করো।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Classification of Wind Movement)

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল, ঋতু এবং প্রকৃতিভেদে পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- নিয়ত ও স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ। এছাড়া সাময়িক বায়ুপ্রবাহ দেখা যায়।
নিয়ত বায়ু (Planetary winds): এ বায়ুর অপর নাম প্রবাহমান বা স্থায়ী বায়ুপ্রবাহ। বায়ুপ্রবাহের ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য
অনুযায়ী সারাবছর নিয়মিতভাবে উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তা নিয়ত বায়ু নামে পরিচিত। ভূপৃষ্ঠে সাতটি সুনির্দিষ্ট চাপবলয় রয়েছে (চিত্র-৫.১১)। এ চাপ বলয়গুলোর অবস্থান লক্ষ্য করলে বায়ুপ্রবাহের দিক সহজেই জানা যায়। বায়ুপ্রবাহ উচ্চচাপ অঞ্চল হতে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। নিয়ত বায়ুকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা- (i) অয়ন বা বাণিজ্য বায়ু; (ii) প্রত্যয়ন বা পশ্চিমা বায়; এবং (iii) মেরুদেশীয় বায়ু।

i. অয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু (Trade winds): কর্কটীয় উত্তর-পূর্ব এবং মকরীয় দক্ষিণ-পূর্ব উচ্চচাপ বলয় থেকে
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে অয়ন বা বাণিজ্য বায়ু বলে। নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে °-° অক্ষাংশের মধ্যে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। সমগ্র উষ্ণমণ্ডলের অর্ধেকের বেশি এলাকায় এই বায়ু প্রবাহিত হয়। তবে শীতকালেই এ বায়ু বেশি শক্তিশালী হয়। পূর্বে পালতোলা জাহাজ চলাচলে এই অবাধ গতিসম্পন্ন বায়ুপ্রবাহ বিশেষ উপযোগী ছিল বলে অয়ন বায়ুকে বাণিজ্য বায়ু নামে নামকরণ করা হয়।

বাণিজ্য বায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

১. বাণিজ্য বায়ু উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।
এদের যথাক্রমে উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু (North-East trade winds) ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু (South-East trade winds) বলে।
২. এ বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে উষ্ণ অবস্থায় যখন নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে যেতে থাকে তখন জলীয়বাষ্প বহন করে না। এ কারণে অয়ন বায়ুর গতিপথে বিশ্বের বৃহৎ মরুভূমিগুলো (আফ্রিকার সাহারা, এশিয়ার গোবি) অবস্থিত।

৩. তুলনামূলকভাবে শীতল এলাকা থেকে আসা বায়ুপ্রবাহে মনোরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়।

৪. বাণিজ্য বায়ু নিয়মিত ও সুস্থিত (steady)। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০-১৫ মাইল হয়।

৫. মহাসাগরের ওপর বাণিজ্য বায়ু অধিক মাত্রায় প্রবাহিত হয়।

৬.প্রশান্ত এই বায়ুপ্রবাহগুলো শীতকালে অত্যন্ত প্রবল এবং গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত দুর্বল হয়। আটলান্টিকের চেয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে দুর্বল অবস্থা হয় যখন উত্তর ভারত মহাসাগরে তা মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ হিসেবে চলতে থাকে।

৭.অয়ন বায়ু মহাদেশের ওপরে শীতকালে নিয়মিত ও একইরূপে প্রবাহিত হয়।

ii. পশ্চিমা বায়ু (The westerlies): দুই ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের দিকে দু'টি বায়ু
সারাবছর নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। এদেরকে পশ্চিমা বায়ু বলে। এই বায়ু দু'টি ৩৫০-৬০০ অক্ষাংশের মধ্যে প্রবাহিত হয়। বায়ু দু'টির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-

১. উত্তর গোলার্ধে এই বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (South-West westerlies) বলে। দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ু উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে যায়। এই বায়ুপ্রবাহকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (North-West westerlies) বলে। বাণিজ্য বায়ুর বিপরীত দিক থেকে প্রবাহিত হয় বলে পশ্চিমা বায়ুকে বিপরীত বাণিজ্য বায়ু (Anti-trade winds) বলে।
২. উষ্ণ থেকে শীতল অক্ষাংশীয় এলাকার দিকে বায়ু প্রবাহিত হওয়ার ফলে সারাবছর কম-বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
৩. এই বায়ু চলাচলের পথে রীতিমতো বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ (Atmospheric disturbance) সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড়, প্রতীপ ঘূর্ণিবাত (Anti-cyclone), বজ্রঝড়, শক্তিশালী ঘূর্ণন প্রভৃতি সৃষ্টিতে এ বায়ু ভূমিকা রাখে।
৪. পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত এলাকা শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে শান্ত থাকে। এ বায়ুর বিশেষত্ব হচ্ছে শীতকালে বাতাস যেকোনো দিক থেকে প্রবাহিত হতে পারে এবং কদাচিৎ ঘূর্ণিঝড় হয়।
৫. উত্তর গোলার্ধে বেশি স্থলভাগ ও নানারূপ ভূপ্রকৃতির জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর দিক ও গতি অধিক পরিবর্তিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু ৪০০-৪৭০ অক্ষাংশের মধ্যে সারাবছর বাধাহীনভাবে প্রবল গতিতে প্রবাহিত হয়। এজন্য এ অবস্থানকে 'গর্জনশীল চল্লিশা' (Roaring forties) বলা হয়।
৬. পশ্চিমের সমুদ্রের ওপর থেকে জলীয়বাষ্প গ্রহণ করায় এই বায়ুপ্রবাহের ফলে সকল মহাদেশের পশ্চিম উপকূলে বৃষ্টিপাত হয়।
৭. শীতকালে জলভাগ অপেক্ষা স্থলভাগ অধিক শীতল হওয়ার কারণে এই বায়ুপ্রবাহে অধিক বৃষ্টিপাত হয়।

iii. মেরু বায়ু (Polar winds): সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে নিয়মিতভাবে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়
দু'টির দিকে বাতাস প্রবাহিত হয়। আমেরিকান আবহাওয়াবিদ উইলিয়াম ফেরেলের সূত্র অনুসারে, বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে বেঁকে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ গোলার্ধে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব বায়ুরূপে প্রবাহিত হয়। এদের যথাক্রমে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব মেরুদেশীয় বায়ু বলে।
এ বায়ুপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- মেরু এলাকা থেকে আগত এই বায়ু শুষ্ক ও শীতল। ক্রান্তীয় এলাকার নিকট থেকে আগত পশ্চিমা বায়ুর সঙ্গে মেরু বায়ুর সংযোগ হলে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের আধিক্য থাকায় এ বায়ুপ্রবাহ দ্বারা প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়। এ বায়ুপ্রবাহ মেরু বৃত্তপ্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়কে নিচের দিকে ঠেলে দেয়। এ বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় ২ কি.মি. এর কাছাকাছি।

স্থানীয় বায়ু (Local winds): ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, ভৌগোলিক অবস্থান
প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে স্থানীয় বায়ুর সৃষ্টি হয়। এই বায়ুপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম এবং সীমিত এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বায়ু দু'প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন- (ক) উষ্ণ প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু (warm) ও (খ) শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু (cold)।

ক. উষ্ণ প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু:

১. ফন (Fohn) বা ফেরন (Feron), ২. চিনুক (Chinook), ৩. হারমাট্টান (Harmattan), ৪. খামসিন (Khamsin), ৫. লেভেন্টার (Levanter), ৬. লু (Loo), ৭. পাম্পেরো (Pampero), ৮. বার্গ (Berg), ৯. মিস্ট্রাল (Mistral), ১০. ব্রিকফিল্ডার (Brickfielder) ইত্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত উষ্ণ স্থানীয় বায়ু।

খ. শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু:

১. বোরা (Bora); ২. খাজরী (Khazri), ৩. সার্মা (Sarma), ৪. হওক ইত্যাদি শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Periodic Winds)

পার্বত্য ও উপত্যকা বায়ুপ্রবাহ (Mountain and valley winds): রাতে তাপ বিকিরণ হয়ে উপত্যকা দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে
গেলে তখন পার্বত্য ঠাণ্ডা বায়ু ঢাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে। দিনে উপত্যকার তলদেশ অপেক্ষা পর্বতের গা অধিকতর উষ্ণ হয় বলে পর্বতের গা বেয়ে উপরের দিকে উপত্যকা বায়ু প্রবাহিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলে এভাবে চক্রাকারে প্রতিদিন উষ্ণ উপত্যকা বায়ু ও শীতল পার্বত্য বায়ু প্রবাহিত হতে থাকে। যেমন- বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার বায়ুপ্রবাহ।

সমুদ্র ও স্থলবায়ু (Sea and Land Breeze): দিনের বেলায় স্থলভাগ বেশি উত্তপ্ত হয় বলে সেখানে নিম্নচাপের সৃষ্টি
হয়। কিন্তু জলভাগ বেশি উত্তপ্ত হয় না বলে সেখানকার বায়ু উচ্চচাপযুক্ত হয়। ফলে তখন জলভাগ থেকে স্থলভাগের দিকে : বায়ু প্রবাহিত হয়। একে সমুদ্রবায়ু বলে।

আবার রাত্রিকালে জলভাগের চেয়ে স্থলভাগ বেশি শীতল বলে স্থলভাগের বায়ু উচ্চচাপযুক্ত হয়। তখন স্থলভাগ থেকে জলভাগ বা সমুদ্রের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। একে স্থলবায়ু বলে। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থানের কারণে সামুদ্রিক ও স্থলবায়ু নিয়মিত প্রবাহিত হয়।

মৌসুমি বায়ু (Monsoon): মৌসুমি বায়ুপ্রবাহকেও সাময়িক বায়ু বলা যেতে পারে। এটি ঋতুভিত্তিক সাময়িক বায়ুপ্রবাহ। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শীত মৌসুমে শুষ্ক মৌসুমি বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক (ভূভাগ) থেকে সমুদ্র অভিমুখে এবং গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম (সমুদ্রভাগ) থেকে ভূমি অভিমুখে প্রবাহিত হয়।

কাজ: নিচের ছকটি পূরণ করো।

বায়ুপ্রবাহ

সময়

দিক

পার্বত্য
উপত্যকা
সমুদ্র
সমুদ্র

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Air Humidity)

জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলের একটি অন্যতম উপাদান কিন্তু তা পরিবর্তনশীল। স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে এর পরিমাণ কমবেশি হয়। বায়ুর আর্দ্রতা বলতে বায়ুতে উপস্থিত জলীয়বাষ্পকে (water vapour) বোঝায়। সূর্যের তাপে ভূপৃষ্ঠের জলভাগ থেকে এবং শীতপ্রধান এলাকায় তুষাররাশি থেকে জলীয়বাষ্প উত্থিত হয়ে বায়ুতে মিশে যাচ্ছে। পৃথিবীর যে এলাকায় জলভাগ বেশি এবং সূর্য কিরণের আধিক্য আছে সেখানে জলীয়বাষ্পের পরিমাণও বেশি। বায়ুর আর্দ্রতা পরিমাপক যন্ত্রের নাম হাইগ্রোমিটার (hygrometer) ।

আর্দ্রতার প্রকারভেদ (Classification of Humidity):

আর্দ্রতার প্রকৃতি অনুযায়ী একে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ১. চরম বা নিরপেক্ষ আর্দ্রতা (Absolute humidity), ২. আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative humidity)।

১. চরম বা নিরপেক্ষ আর্দ্রতা: একটি নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে জলীয়বাষ্পের প্রকৃত পরিমাণকে চরম আর্দ্রতা বলে। বায়ুর প্রতি ঘনমিটার আয়তনে যে জলীয়বাষ্প থাকে তার ওজন যত গ্রাম হয় সেই গ্রাম হিসেবে এর পরিমাপ করা হয়। চরম আর্দ্রতা নিম্ন অক্ষাংশে বেশি এবং উচ্চ অক্ষাংশে কম থাকে।

২. আপেক্ষিক আর্দ্রতা: যে কোনো উষ্ণতায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে প্রকৃত জলীয়বাষ্পের ভরের (mass) সঙ্গে সেই উষ্ণতায় উক্ত বায়ুকে পরিপৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় জলীয়বাষ্পের ভরের যে অনুপাত, তাকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। এছাড়া বিশেষ আর্দ্রতার সাথে পরিপৃক্ত বিশেষ আর্দ্রতার অনুপাতকেও আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। এই আর্দ্রতা সবসময়ই শতকরা (%) হিসেবে প্রকাশ করা হয়। আপেক্ষিক আর্দ্রতা বের করার নিয়ম:

আপেক্ষিক আর্দ্রতা (%) =বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ/একই উষ্ণতায় বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা=× ১০০

যেমন: একটি ঘরে বায়ুতে যদি জলীয়বাষ্পের পরিমাণ ১৫ gm এবং ঘরের উষ্ণতায় বায়ুর সর্বোচ্চ জলীয়বাষ্প ধারণক্ষমতার পরিমাণ ২২.৯ gm. হয়,

তখন আপেক্ষিক আর্দ্রতা = .×  = %

শিশিরাঙ্ক (Dew point): সাধারণত দেখা যায়, বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প থাকে, তাতে বায়ু সম্পৃক্ত হয় না।
যদি কোনো স্থানের বায়ুকে ধীরে ধীরে শীতল করা যায় তাতে উষ্ণতা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প থাকে, তাতেই ঐ স্থানের বায়ু পরিপূক্ত হয়। এতেই শিশিরের সৃষ্টি হয় এবং এ অবস্থাকে শিশিরাঙ্ক বলে। অর্থাৎ যে তাপমাত্রায় বায়ুসহ জলীয়বাষ্প শিশিরে পরিণত হয় তাকে শিশিরাঙ্ক বলে। শিশিরাঙ্কে বাষ্পের সর্বোচ্চ চাপ এবং তৎক্ষণাত বায়ুতে বিদ্যমান প্রকৃত বাষ্পের চাপ সমান হয়।

বাষ্পীভবন (Evaporation): যে প্রক্রিয়ায় তরল পদার্থ গ্যাসীয় পদার্থে বা বাষ্পে রূপান্তরিত হয় তাকে বাষ্পীভবন
বলে। জল সূর্যতাপে বাষ্পীভূত হয়ে জলীয়বাষ্পে পরিণত হয়। উন্মুক্ত জলরাশি থেকে প্রতিনিয়ত কম-বেশি বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এছাড়া আর্দ্র মৃত্তিকা, উদ্ভিদ, বৃষ্টি বিন্দু থেকে বাষ্পীভবন হয়ে থাকে। জলবায়ুবিদ্যায় (Climatology) বৃষ্টিপাতের ন্যায় বাষ্পীভবনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উদ্ভিদের প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার (Transpiration) মাধ্যমে বাষ্পীভবন সংঘটিত হলে তাকে Evapo-transpiration বা বাষ্পীয় প্রস্বেদন বলে। এর ফলে দিনের বেলায় পাহাড়ি অঞ্চলে বা বনভূমি এলাকায় ধোঁয়ার মতো দেখায়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Condensation & Classification of Condensation)

পরিপৃক্ত (saturated) বায়ু উষ্ণ হলে তা আর পরিপৃক্ত থাকে না, আরও বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। তেমনি বায়ু শীতল হতে থাকলে পূর্বের মতো জলীয়বাষ্প ধারণ করে রাখতে পারে না। তখন জলীয়বাষ্পের কিছু অংশ পানিতে পরিণত হয়, একে ঘনীভবন বলে।

ঘনীভবনকে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়: (i) ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ ও নিকটস্থ ঘনীভবন এবং (ii) ঊর্ধ্ব বায়ুস্থ ঘনীভবন।

১. ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ ঘনীভবন: শিশির, তুষার, কুয়াশা ও কুজ্জটিকা হলো ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ এবং ভূপৃষ্ঠস্থ ঘনীভবনের রূপ। নিচে তা আলোচনা করা হলো:

ক. শিশির (Dew) ও তুষার (Snow): ভূপৃষ্ঠের উপরিস্থিত কোনো বস্তুর উপর (যেমন- ঘাস) জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলবিন্দু ও বরফকণার আকারে জমা হয়। এদেরকে যথাক্রমে শিশির ও তুষার বলে। শিশির ও তুষার সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে অনুকূল নিয়ামকগুলো হলো:

১. ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুস্তরে অধিক আপেক্ষিক আর্দ্রতা বা অতি আর্দ্র মাটি; আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলে সামান্য শীতল হলেই বায়ু সম্পৃক্ত অবস্থায় পৌঁছবে।
২. রাতের মেঘমুক্ত আকাশ; যাতে পৃথিবী অবাধে উত্তাপ বিকিরণ করে তাড়াতাড়ি শীতল হতে পারে।
৩. দীর্ঘ শীতের রাত; যাতে পৃথিবী দিনের বেলা যে সৌরশক্তি লাভ করে দীর্ঘ রাতে তার চেয়ে বেশি উত্তাপ বিকিরণ করে বেশ শীতল হতে পারে।
৪. বাতাসের শান্ত অবস্থা; যাতে উষ্ণ ও শীতল বায়ুর মিশ্রণ না হয়। এতে শীতল ও ভারি বায়ুর স্তরটি পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান করে আরও শীতল হওয়ার সুযোগ পায়।

উল্লিখিত নিয়ামকগুলোর সমন্বিত প্রভাবে পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে বেশ শীতল হয়ে পড়ে। শীতল ভূমির সংস্পর্শে এসে পৃথিবী সংলগ্ন বায়ুস্তরটি শীতল হতে হতে যখন এর তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তখন ঘনীভবন হয়।

খ. কুয়াশা (Fog) ও কুঞ্ঝটিকা (Mist): ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তরে জলাকর্ষী কণাকে আশ্রয় করে মেঘের মতো যে ঘনীভবন হয় তাকে কুয়াশা বলে। কখনো কখনো কুয়াশা এতো ঘন হয় যে, তার ফলে ইলশেগুড়ির মতো জলকণা বর্ষিত হয়। এদেরকে কুদ্ধটিকা বলে। কুয়াশা কয়েক রকম হতে পারে। যেমন-

i. বিকিরণজাত কুয়াশা: বিভিন্ন ধরনের কুয়াশার মধ্যে বিকিরণজাত কুয়াশাই সাধারণত বেশি দেখা যায়। যেসব অনুকূল অবস্থায় এ কুয়াশার সৃষ্টি হয় সেগুলো হলো: ক. ভূমি সংলগ্ন আর্দ্র বায়ুস্তর, খ. বায়ুতে প্রচুর পরিমাণে জলাকর্ষী কণার উপস্থিতি, গ. মেঘমুক্ত রাতের আকাশ,, ঘ. দীর্ঘ শীতের রাত, ঙ. বাতাসের শান্ত অবস্থা প্রভৃতি। উল্লিখিত নিয়ামকগুলোর প্রভাবে বায়ুর তাপমাত্রা কমে শিশিরাঙ্কের নিচে নামে। তখন জলাকর্ষী কণাগুলোকে আশ্রয় করে ভাসমান ঘনীভবন হয়ে বিকিরণজাত কুয়াশার সৃষ্টি করে।

ii. আনুভূমিক বায়ুপ্রবাহজনিত কুয়াশা: সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু শীতল স্থানের উপর দিয়ে (শীতল স্থলভাগ বা জলভাগ) প্রবাহিত হলে এ ধরনের কুয়াশার সৃষ্টি হয়। আলাস্কার পশ্চিমে এবং পেরু উপকূলে এ ধরনের কুয়াশার সৃষ্টি হয়। মেরু অঞ্চলের সামুদ্রিক বায়ু যখন বরফাচ্ছাদিত উপকূল অঞ্চলে প্রবেশ করে তখনও এ জাতীয় কুয়াশার সৃষ্টি করে। শীতের প্রথম দিকে নদী ও হ্রদে এ ধরনের কুয়াশার প্রকোপ দেখা যায়।

iii. বায়ুপ্রাচীরজনিত কুয়াশা: মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চলে যখন ভিন্ন তাপ ও আর্দ্রতাবিশিষ্ট দুটি বায়ুপুঞ্জ মিলিত হয়
তখন তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য প্রাচীর ঢালু হয়ে অবস্থান করে। দুটি বায়ুপুঞ্জের মধ্যে যেটি উষ্ণ সেটি বায়ু প্রাচীরের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে মেঘের সৃষ্টি করে বৃষ্টিপাত ঘটায়। মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চলে শীতকালে শীতল বায়ুপ্রাচীরের পেছনে অবস্থিত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে কুয়াশার সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এটিই হচ্ছে বায়ুপ্রাচীরজনিত কুয়াশা।

২. ঊর্ধ্ব বায়ুস্থ ঘনীভবন; ঊর্ধ্ব বায়ুতে ঘনীভবন হয়ে মেঘের সৃষ্টি হয়। বায়ুর উপরের স্তরের ঘনীভবন হবার জন্য বায়ুকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপরে উঠতে হয়। যে প্রক্রিয়ায় বায়ু স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপরে উঠে তাকে রুদ্ধ তাপ পরিবর্তন প্রক্রিয়া বলে। বায়ু যখন উপরের দিকে উঠে তখন সম্প্রসারিত হবার ফলে তা শীতল হয়। অপরদিকে, বায়ু যখন নিচের দিকে নামে তখন সংকুচিত হওয়ার ফলে তা উত্তপ্ত হয়।

বায়ু যদি অসম্পৃক্ত থাকে, তাহলে উপরের দিকে উঠার সময় সে বায়ুর তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকে, যার পরিমাণ হলো-১০°C/km। এখানে ১০°C এর আগে যে বিয়োগ চিহ্ন রয়েছে তাতে উপরের দিকে বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া নির্দেশ করে। ঊর্ধ্বমুখী অসম্পৃক্ত বায়ুর এ নির্দিষ্ট তাপ হ্রাস হারকে শুষ্ক রুদ্ধতাপ হ্রাস হার (Dry Adiabatic Lapse Rate, DALR) বলে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় যে, ভূপৃষ্ঠে একটি অসম্পৃক্ত বায়ুর তাপমাত্রা হলো ৩০°C। সে বায়ুটি যদি কোনো কারণে উপরের দিকে উঠে তাহলে ১ km উচ্চতায় এর তাপমাত্রা হবে °c। তারপরও যদি বায়ুটি অসম্পৃক্ত থাকে এবং বায়ুটি যদি উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ২km উচ্চতায় এর তাপমাত্রা হবে °c। উপরের দিকে উঠতে থাকার ফলে অসম্পৃক্ত বায়ুর তাপমাত্রা প্রতি কিলোমিটারে vat ১০°C হ্রাস পায়। বায়ুর তাপমাত্রা (৩০°C) এবং শিশিরাঙ্কের (-১০°C) ব্যবধান ৪০°C হলে শিশিরাঙ্কে পৌঁছার Set জন্য বায়ুকে চার কিলোমিটার উঠতে হবে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Formation & Classification of Clouds)

সম্পৃক্ত বায়ু উষ্ণ হলে তখন এটি আরও বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। আবার বায়ু শীতল হতে থাকলে পূর্বের মতো বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করে রাখতে পারে না। তখন জলীয়বাষ্পের কিছু অংশ পানিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ঘনীভবন বলে। ঊর্ধ্বমুখী সম্পৃক্ত বায়ু ঘনীভবন সমতলের আরও উপরে উঠে নানা প্রকারের মেঘের সৃষ্টি করে। বায়ু যদি দ্রুত বেগে উপরের দিকে উঠে ঘনীভবন ঘটায়, তাহলে মেঘের উলম্ব বিস্তৃতি হয় খুব বেশি। আর বায়ু যদি ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে ঘনীভবন ঘটায়, তাহলে মেঘ অনুভূমিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন আকার ও আকৃতি, বর্ণ এবং আলোকের প্রতিফলন ও প্রতিসরণের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মেঘের শ্রেণিবিভাগ করা হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) মেঘকে দশটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। বোঝার সুবিধার জন্য উচ্চতা অনুযায়ী মেঘকে চারটি গোত্রে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন- (ক) ঊর্ধ্ব মেঘ, (খ) মধ্যম উচ্চতার মেঘ, (গ) নিচের স্তরের মেঘ এবং (ঘ) উলম্ব বিস্তার সম্পন্ন মেঘ।

(ক) ঊর্ধ্ব মেঘ (High Altitude Clouds): ঊর্ধ্ব মেঘ ৬ km থেকে ট্রপোপজ (১২-১৫ Km) এর মধ্যে অবস্থান করে। এ উচ্চতায় বায়ুর তাপমাত্রা এত কম থাকে যে, বায়ু সম্পৃক্ত হলেও এর জলীয় পদার্থের পরিমাণ থাকে খুবই কম এবং তাপমাত্রা অত্যন্ত কম বলে ঘনীভবন হয় বরফকণার আকারে। ঊর্ধ্ব মেঘ গোত্রে তিন শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। যেমন- ১. পালক মেঘ, ২. পালকপুঞ্জ মেঘ এবং ৩. ঊর্ধ্বস্তর মেঘ। এসব মেঘ থেকে অধঃক্ষেপণ হয় না।

১. পালক-মেঘ (Cirrus clouds): এ শ্রেণির মেঘকে দেখতে পাখির পালকের মতো বা চিত্রপটে আঁকা তুলির আঁচড়ের মতো মনে হয়। এগুলো আকাশের সবচেয়ে উঁচু মেঘ এবং বেশ স্বচ্ছ বা সাদা হয়ে থাকে। এসব মেঘ যখন আকাশে বিচ্ছিন্ন ও অবিন্যস্ত অবস্থায় অবস্থান করে তখন নির্মল আবহাওয়া নির্দেশ করে।
২. পালকপুঞ্জ মেঘ (Cirrocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ আকাশের অনেক উপরের স্তরে, কিন্তু পালক মেঘের নিচে অবস্থান করে। এগুলো দেখতে পেঁজা তুলার মতো। সূর্যাস্তের সময় এসব মেঘ সূর্যের লাল বর্ণকে প্রতিফলন করে বলে আকাশকে লাল দেখায়।
৩. ঊর্ধ্বস্তর মেঘ (Cirrostratus clouds): পালকপুঞ্জ মেঘের নিচে এ শ্রেণির মেঘ অবস্থান করে। এ ধরনের মেঘ সাদা এবং বেশ হালকা ও স্বচ্ছ হয়ে থাকে। এসব মেঘের মধ্যে অবস্থিত বরফকণায় সূর্য ও চাঁদের আলোর Activ প্রতিসরণ (Reflaction) হয় বলে এরকম আবেষ্টনীর সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের (Cyclonic Storm) আগে এ ধরনের মেঘ আকাশে দেখা যায়।

(খ) মধ্যম উচ্চতার মেঘ (Mid Altitude clouds): আকাশে দুই থেকে ছয় km উচ্চতার মধ্যে মধ্যম উচ্চতার মেঘ
অবস্থান করে। মূলত জলকণা দিয়ে এ গোত্রের মেঘগুলো গঠিত। এ গোত্রের মেঘে দুটি পৃথক শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। যেমন-১. উন্মেঘপুঞ্জ মেঘ ও ২. উন্মেঘস্তর মেঘ। এসব মেঘ থেকে কখনও কখনও অধঃক্ষেপণ (Precipitation) হয়ে থাকে।

৪. উন্মেঘপুঞ্জ মেঘ (Altocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ হলো চাপা মেঘের পুঞ্জ। এসব মেঘ প্রধানত জলকণা
দিয়ে গঠিত। তবে যখন এসব মেঘের তাপমাত্রা বেশ নিচে নেমে যায় তখন এতে জলকণা ও বরফকণার মিশ্রণ দেখা যায়। এ থেকে কখনও কখনও বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে সে বৃষ্টি সব সময় পৃথিবীতে এসে পৌঁছে না। এই মেঘ সাদাটে ধূসর রঙের সূক্ষ্ম ও মসৃণ পশমের গুচ্ছের মতো দেখায়। এগুলো নীল আকাশে টেউয়ের মতো ছড়িয়ে থাকে। এ মেঘ সুন্দর আবহাওয়ার প্রতীক।

৫. উন্মেঘস্তর মেঘ (Altostratus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো Altocumulus মেঘের নিচে স্তরে স্তরে আঁশের মতো (Fibrous) অবস্থান করে। এদের বর্ণ ধূসর কিংবা নীলচে ধূসর হয়ে থাকে। Altocumulus মেঘের মতো এসব মেঘ থেকেও বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে এসব বৃষ্টি সব সময় পৃথিবীতে এসে পৌঁছে না। মেঘের তলদেশ থেকে ঝালরের মতো এসব বৃষ্টিকে ঝুলতে দেখা যায়।

(গ) নিচের স্তরের মেঘ (Low Altitude clouds): এ গোত্রের মেঘ দু' কিলোমিটার উচ্চতার নিচে অবস্থান করে। এ গোত্রের মেঘগুলো সম্পূর্ণভাবে জলকণা দিয়ে গঠিত। তবে মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চলে শীতকালে এ গোত্রের মেঘে বরফকণা এবং তুষার অবস্থান করে। নিচের স্তরের মেঘের গোত্রে তিন শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। সেগুলো হলো- ১. স্তরপুঞ্জ মেঘ বা স্তূপ মেঘ, ২. বর্ষণ মেঘ এবং ৩. স্তর মেঘ।

৬. স্তরপুঞ্জ বা স্তূপ মেঘ (Stratocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ এক থেকে দুই কিলোমিটার উচ্চতায়
স্তূপাকারে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। এদের বর্ণ ধূসর থেকে গাঢ় ছাই রংয়ের হতে পারে। কখনও কখনও Altostratus মেঘকে স্তরপুঞ্জ মেঘ বলে মনে হয়। এ ধরনের মেঘ থেকে খুব কমই বৃষ্টিপাত হয়, হলেও তা খুবই সামান্য হয়ে থাকে।

৭. বর্ষণ মেঘ বা বর্ষণ স্তর মেঘ (Nimbus or Nimbostratus clouds): এ শ্রেণির মেঘ স্তরপুঞ্জ মেঘের নিচে অবস্থান করে। অতি ঘন ও কালো বর্ণের এসব মেঘ হতে অবিরাম হালকা থেকে মাঝারি রকমের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা (Intensity) কম হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত হয় বলে এ ধরনের মেঘ থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে।

৮. স্তর মেঘ (Stratus clouds): এ শ্রেণির মেঘ হলো ভূপৃষ্ঠের নিকটতম মেঘ। মেঘগুলো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত থাকে। অনুভূমিকভাবে বিস্তৃত ছাই রংয়ের এ মেঘগুলো সারা আকাশকে ছেয়ে রাখে। পর্বতারোহী ও বিমান চালকদের জন্য এ মেঘ খুবই বিপদজনক।

(ঘ) উল্লম্ব বিস্তার সম্পন্ন মেঘ (Vertically developed clouds): এ গোত্রের মেঘগুলো কেবল উলম্বভাবেই বিস্তৃত হয়। এসব মেঘ কখনো সারা আকাশকে ঢেকে রাখে না, বরং এরা আকাশে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে। যে দু'শ্রেণির মেঘ এ গোত্রে দেখা যায়। সেগুলো হলো- ১. পুঞ্জ মেঘ এবং ২. ঝড়োপুঞ্জ মেঘ।

৯. পুঞ্জ মেঘ (Cumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো বিশালাকার পেঁজা তুলার মতো বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে
বিচ্ছিন্নভাবে ভেসে বেড়ায়। এদের গভীরতা ৫০ মি. থেকে ১০০০ মি. পর্যন্ত হতে পারে। স্বল্প গভীরতাসম্পন্ন পুঞ্জ মেঘগুলো নির্মল আবহাওয়া নির্দেশ করে।

১০. ঝড়োপুঞ্জ মেঘ (Cumulonimbus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো অতি গভীর, ঘন, কালো এবং বিশাল
আকারের হয়ে থাকে। এদের গভীরতা ভূপৃষ্ঠ হতে আধা কিলোমিটার উপর থেকে ট্রপোপজ (১২-১৫km) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। ঊর্ধ্ব বায়ুতে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এ মেঘগুলো পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়ে কামারের লোহা পেটানোর নেহাই (anvil head) এর আকৃতি ধারণ করে। এ ধরনের মেঘ থেকে বজ্রপাত ও বিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়। কোনো কোনো সময় এসব মেঘ থেকে শিলাবৃষ্টিও হয়ে থাকে। বাংলাদেশের কালবৈশাখী ঝড় এ ধরনের মেঘ থেকে হয়ে থাকে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Rainfall and Causes of Rainfall)

সূর্যের উত্তাপে সৃষ্ট জলীয়বাষ্প উপরের শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এলে সহজেই তা সম্পৃক্ত হয়। পরে ঐ সম্পৃক্ত বায়ু অতি ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণাকে আশ্রয় করে জমাট বেঁধে মেঘের আকারে আকাশে ভাসতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা কোনো কারণে আরও হ্রাস পেলে ঐ মেঘ ঘনীভূত হয়ে পানিবিন্দুতে অথবা বরফকুচিতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে তা ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। এভাবে বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ অনুকূল পরিবেশে ভাসমান মেঘ ঘনীভূত হয়ে পানির ফোঁটা আকারে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে তাকে বৃষ্টিপাত বলে। এটি কখনো প্রবল আবার কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আকারে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। কোনো স্থানে বৃষ্টিপাত সংঘটনের জন্য মূলত তিনটি বিষয় কাজ করে থাকে।

যেমন- i. বাতাসে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি;
ii. জলীয়বাষ্পের ঊর্ধ্বগমন এবং

iii. ঊর্ধ্বাকাশে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া। এর ফলে মেঘ থেকে জলকণা সৃষ্টির মাধ্যমে বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়।

সাধারণত এ বৃষ্টিপাত সংঘটনকে দু'ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে-

১. শীতল বৃষ্টিপাতের উৎপত্তি (Formation of cold rain) : সুইডিস আবহাওয়াবিদ টর বারজেরন এবং ওয়াল্টার ফিন্ডেইসেন (Bergeron-Findeisen)-এর মতে, মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশের শীতল বৃষ্টিপাত প্রায় ১৫০০ mm এর অধিক গভীর মেঘ থেকে হয়ে থাকে। এ সময় তাপমাত্রার পরিমাণ থাকে ° থেকে ৮০° সে.। এ মেঘে প্রচুর পরিমাণে জলকণা ও বরফের কেলাস (Crystal) থাকে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় বরফের কেলাসগুলো জলকণাগুলোকে যুক্ত করে বড় আকার ধারণ করে নিচে পড়তে থাকে। তাপমাত্রা একটু বৃদ্ধি পেলে কেলাসগুলো জলকণায় পরিণত হয়ে অনুকূল অবস্থায় শীতল বৃষ্টিরূপে পতিত হয়।

২. উষ্ণ বৃষ্টিপাতের উৎপত্তি (Formation of warm rain) : উষ্ণমণ্ডলে ভূপৃষ্ঠের জলভাগ থেকে প্রচুর পরিমাণ জলীয়বাষ্প রায়ুমণ্ডলে উত্থিত হয়। এই জলীয়বাষ্প ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় বায়ুতে ভাসমান জৈব ও অজৈব কণিকাকে আশ্রয় করে জলকণায় পরিণত হয়। পরে বড় আকারের এই জলকণাগুলো বাতাসে ভেসে থাকতে না পেরে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে বৃষ্টিরূপে নিচে পতিত হয়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Classification of Rainfall)

প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে বৃষ্টিপাতকে প্রধানত নিম্নলিখিত শ্রেণিসমূহে ভাগ করা যায়:
১. পরিচলন বৃষ্টি (Convectional rain);
২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic rain);
৩. বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি (Frontal rain) এবং
৪. ঘূর্ণি বৃষ্টি (Cyclonic rain);

১. পরিচলন বৃষ্টি (Convectional rain) : ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যধিক হলে বায়ুর বাষ্পীভবনের ক্ষমতা বাড়ে।
এ অবস্থায় জলীয়বাষ্পপূর্ণ হালকা বায়ু ঊর্ধ্বে প্রসারিত ও শীতল হলে সেখানে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিপাতকে পরিচলন বৃষ্টিপাত বলে।

বৈশিষ্ট্য: সাধারণত নিরক্ষীয় অঞ্চলে (°-°উ. ও দ. অক্ষাংশ) প্রতিদিন পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়। জলভাগ ও বনভূমির প্রাধান্য এবং লম্বভাবে সূর্যরশ্মির পতনে সারাদিন বাষ্পীভবন ও বাষ্পীয় প্রস্বেদনে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু সোজা উপরে উঠে যায়। এ বায়ু শীতল বায়ুস্তরের সংস্পর্শে শীতল ও ঘনীভূত হলে বিকেলে বজ্র-বিদ্যুৎসহ ঝড়-বৃষ্টি হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পরিচলন প্রক্রিয়ায় বিকেলের দিকে ও সন্ধ্যায় পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়।

অঞ্চল: ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিলের আমাজান অববাহিকা, নিউগিনি, জায়ারের কঙ্গো অববাহিকায় পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে মৌসুমি জলবায়ুর দেশ ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ইত্যাদি অঞ্চলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আগমনের পূর্বে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে মহাদেশসমূহের অভ্যন্তরভাগে গ্রীষ্মকালে এ প্রক্রিয়ায় বৃষ্টি হয়ে থাকে।

২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic rainfall): জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুর গতিপথে পর্বত থাকলে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পর্বতের প্রতিবাত অংশে বৃষ্টিপাত হয়। শৈল বা পাহাড় দ্বারা উৎক্ষিপ্ত হয়ে বৃষ্টিপাত হয় বলে একে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।
বৈশিষ্ট্য: সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাহাড়, পর্বত, মালভূমি থাকলে নিকটবর্তী উষ্ণ সমুদ্র থেকে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু এই উচ্চভূমিতে ধাক্কা খায় এবং উপরে উঠতে থাকলে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

এই অংশকে প্রতিবাত পার্শ্ব (windward side) বলে। উচ্চভূমি অতিক্রম করে বায়ু অপর পার্শ্বে অর্থাৎ অনুবাত পার্শ্বে (lee ward side) পৌছলে এতে জলীয়বাষ্প আর থাকে না বলে বৃষ্টি খুব কম হয়। এ অঞ্চলকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (rain shadow area) বলে। পর্বতের অনুবাত পার্শ্বের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলটি সাধারণভাবে শুষ্ক বা প্রায় শুষ্ক হয়। অন্যান্য উপাদান যেমন- গিরিখাতের অবস্থান, উষ্ণতার পার্থক্য ইত্যাদিও শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের ওপর প্রভাব ফেলে।.

অঞ্চল: আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পশ্চিম ঢালে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পূর্বে দাক্ষিণাত্যে বৃষ্টিপাত অনেক কম হয়। এটা বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়। হিমালয়ের পাদদেশ ও সমগ্র উত্তর ভারতে, বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় যেখানে পর্বতশ্রেণি রয়েছে সেখানে প্রতিবাত পার্শ্বে এ ধরনের বৃষ্টিপাত দেখা যায়।

৩. বায়ু প্রাচীরজনিত বৃষ্টি (Frontal rain): মধ্য অক্ষাংশ অঞ্চলে যখন শীতল ও উষ্ণ বায়ু মুখোমুখি উপস্থিত হয়ে
একে অপরের দিকে পাশাপাশি চলতে থাকে তখন শীতল বায়ুর আঘাতে উষ্ণ বায়ু ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে। এ সময় ঐ উষ্ণ বায়ু প্রসারিত ও শীতল হয়ে উভয় বায়ুর সীমান্ত বরাবর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ জাতীয় বৃষ্টিপাতকে সংঘর্ষ বৃষ্টিপাত বলে।

বৈশিষ্ট্য: শীতল বায়ুপ্রাচীরের ঢাল অপেক্ষাকৃত খাড়া হয়। তাই এই বায়ু প্রাচীর সংলগ্ন এলাকায় মেঘ ও বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রটি সংকীর্ণ হয়ে যায়। আবার উষ্ণ বায়ু প্রাচীরের ক্ষেত্রে বিপরীত অবস্থা ঘটে।
অঞ্চল: মধ্য অক্ষাংশের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এরূপ প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।

৪. ঘূর্ণি বৃষ্টি (Cyclonic rain): কোনো অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হলে জলভাগের উপর থেকে
জলীয়বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ এবং স্থলভাগের উপর থেকে শুষ্ক শীতল বায়ু ঐ একই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে অনুভূমিকভাবে ছুটে আসে। শীতল বায়ু ভারী বলে উষ্ণ বায়ু শীতল বায়ুর উপর ধীরে ধীরে উঠতে থাকে। জলভাগের উপর থেকে আসা উষ্ণ বায়ুতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। ঐ বায়ু শীতল বায়ুর উপরে উঠলে তার ভিতরে জলীয়বাষ্প ঘণীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিকে ঘূর্ণি বৃষ্টি বলে।

বৈশিষ্ট্য: বায়ু সব সময় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ছুটে যায়। ঘূর্ণিবাতের ফলে নিম্নচাপ কেন্দ্রের বায়ু জলীয়বাষ্প নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে উপরে ওঠে এবং শীতল ও ঘনীভূত হয়ে প্রবল ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এসময় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ঘূর্ণিবৃষ্টির প্রক্রিয়া স্বভাবতই ভিন্ন। এখানে উষ্ণ বায়ুস্তর অতি ধীরে শীতল বায়ুস্তরের উপরে উঠার ফলে ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রবল না হয়ে ঝিরঝির করে অনেক সময় ধরে বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে শীতকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে।
অঞ্চল: পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িষ্যা উপকূলের কোনো কোনো অংশ এবং আসাম, বাংলাদেশে মার্চ-মে মাসে কালবৈশাখীর প্রভাবে ঘূর্ণিবাত বৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মকালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিবাতসমূহ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের সাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বৃষ্টিপাত ঘটায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল অঞ্চলে এ ধরনের বৃষ্টি হয়।

উপরিউক্ত চার প্রকার ছাড়াও আরও কয়েক প্রকার বৃষ্টিপাত শনাক্ত করা যায়-

৫. উষ্ণ স্রোতজনিত বৃষ্টিপাত: উষ্ণ স্রোতের মাধ্যমে বাহিত জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে উপকূলভাগে সংঘটিত হয়। ব্রিটেন ও নরওয়ের উপকূলের বৃষ্টিপাত এ ধরনের।
৬. নিয়ত বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত: সমুদ্রভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত অয়ন ও প্রত্যয়ন বায়ুর দ্বারা আনীত জলীয়বাষ্পের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং সামুদ্রিক অঞ্চলে কিংবা সমুদ্রমধ্যে সংঘটিত বৃষ্টি এভাবে সৃষ্ট।
৭. আগ্নেয় বৃষ্টিপাত: অগ্ন্যুৎপাতে উদগীরিত জলীয়বাষ্পের ঘনীভবন থেকে সৃষ্ট মেঘের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। অগ্ন্যুৎপাতে উদগীরিত পদার্থের ৬০%-৯০% পানি এবং অগ্ন্যুৎপাতকালীন প্রচণ্ড উত্তাপ থাকায় এ পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে উর্দ্ধ বায়ুমণ্ডলে গমন করে এবং ঘনীভূত হয়ে আগ্নেয়গিরি সন্নিহিত এলাকায় বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৮. অরণ্য বৃষ্টিপাত: সুবিস্তৃত অরণ্য এলাকার প্রস্বেদন থেকে সৃষ্টি হয়। পূর্ব ভারতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিস্তীর্ণ অরণ্য এলাকায় এ ধরনের হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপাত দেখা যায়।
৯. প্রতীপ ঘূর্ণিবাত জনিত বৃষ্টিপাত: উচ্চচাপ এলাকা থেকে নিম্নচাপ এলাকায় আগত বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ও ঘনীভবন থেকে সৃষ্ট। উদাহরণ হিসেবে ভারতবর্ষের শীতকালীন বৃষ্টিপাতের কথা বলা যায়

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Effects of Different Types of Climate on Living World)

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর ভিন্নতা বা পরিবর্তন জীবজগতের ওপর নানাধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে। অতীতকালের স্বাভাবিক জলবায়ু ছিল মৃদুভাবাপন্ন। এ সময় মেরু অঞ্চলে বরফাবরণ ছিল না বলে মেরু অঞ্চলে শৈত্যতাপ জনিত চাপ ছিল না। সে সঙ্গে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াও ছিল অনুপস্থিত। কিন্তু হিমযুগে মধ্য ও নিম্ন অক্ষাংশের চাপ বলয়গুলো সংকুচিত হয় এবং সেখানে ঝড়ো আবহাওয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
জলবায়ু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল বিষয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। জলবায়ুর উপাদানগুলো একক বা সম্মিলিতভাবে কাজ করে। নিচে বিশেষ বিশেষ কতিপয় ক্ষেত্র আলোচনা করা হলো

১. কৃষিকাজ: কৃষিকাজ প্রধানত জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। হাজার হাজার বছর ধরে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপন্ন হয়। যেমন-উষ্ণমণ্ডলের বৃষ্টিবহুল এলাকায় ধান, পাট, চা, ইক্ষু, বিভিন্ন রসাল ফল ইত্যাদি জন্মায় (উদাহরণ-বাংলাদেশ)। অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাত যুক্ত নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে গম, যব, ভুট্টা ইত্যাদি খাদ্যশস্য জন্মায়। যে অঞ্চলে মানুষ বসবাস করে সেসব অঞ্চলের জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খেয়ে যে ফসল উৎপাদন হয় তার ওপর মানুষের জীবন-জীবিকা বা খাদ্যাভ্যাস নির্ভর করে। তাই ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত এবং গম উৎপাদনকারী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য রুটি। আর একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, অধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত সমভূমি অঞ্চলে বন্যার প্রভাবে পলিময় মৃত্তিকার সৃষ্টি হয় এবং মৃত্তিকার উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়, যা ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

২. পশুপালন: পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মহাদেশীয় জলবায়ুর প্রভাবে বিশাল আয়তনের তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে। পশুপালনের জন্য তৃণভূমির প্রয়োজন। এ কারণে উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, দক্ষিণ আমেরিকার পাম্পাস, অস্ট্রেলিয়ার ডাউন্স, ইউরেশিয়ার স্টেপ প্রভৃতি তৃণভূমি অঞ্চলে পশুপালনের পাশাপাশি পশুসম্পদ ভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে অঞ্চলবিশেষে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের তৃণভূমি এলাকায় লাভজনকভাবে পশুপালন করা হয়।

৩. মৎস্য শিল্প: পৃথিবীর প্রধান মৎস্য শিকার কেন্দ্রগুলো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। এই জলবায়ুতে মাছের প্রিয় খাদ্য প্লাঙ্কটন (plankton) ভালো জন্মায়। এছাড়া মাছ সংরক্ষণের সুবিধাও বেশি। উষ্ণমণ্ডলে মাছ সংরক্ষণ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু বৃষ্টিবহুল এলাকায় নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, দীঘি মিঠাপানির মাছে ভরপুর। এটা যেমন মানুষের খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তেমনি কর্মসংস্থানেরও ক্ষেত্র।

৪. শিল্প: যন্ত্র শিল্প, কুটির শিল্প, হস্ত শিল্পের ওপর জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ব্যাপক। এসব শিল্প বিকাশে কাঁচামাল, শ্রমিক, মূলধন ও সংগঠন প্রধান সহায়ক শক্তি। এছাড়া রয়েছে সুষ্ঠু পরিবহন ও স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা। যেমন- নৌ পরিবহন বাণিজ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শিল্প বিকাশের এসব নিয়ামক জলবায়ুর আনুকূল্যেই গড়ে ওঠে। তাই এক এক জলবায়ু অঞ্চলে এক এক ধরনের শিল্প গড়ে ওঠে। যেমন- আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চল বস্ত্রশিল্প বিকাশের অনুকূল।

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য: অনুকূল জলবায়ু অঞ্চলের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষিকার্য, খনিজ উত্তোলন, কাঠ আহরণ প্রভৃতি সহজসাধ্য হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। এজন্য নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নত। যেমন- ইউরোপের বাণিজ্য।

৬. বসতি স্থাপন: উষ্ণতা, প্রচণ্ড গরম বা স্বাভাবিক গরম, প্রচণ্ড শীত বা স্বাভাবিক শীত জনসংখ্যা বণ্টনে প্রভাব ফেলে। খুবই উষ্ণ বা খুবই শীতল এলাকায় মানুষের বসবাস করা কষ্টসাধ্য। উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে বা শীতল তুন্দ্রা অঞ্চলে জনবসতি বিরল। জলবায়ুর বিভিন্নতার জন্য বাসগৃহের আকৃতি বা নির্মাণ কৌশলও ভিন্নতর হয়। অত্যধিক বৃষ্টিবহুল বা তুষারপাত এলাকায় ঘরের ছাদ ঢালু হয়। জলবায়ুর পরোক্ষ প্রভাবে বনভূমি প্রাধান্য এলাকায় কাঠের ঘর-বাড়ি, পলিযুক্ত মৃত্তিকা অঞ্চলে মাটির ঘর না হয়ে টিন ও বেড়ার ঘর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

৭. পোশাক-পরিচ্ছদ: শীতল এলাকার জনসাধারণ পশম, চামড়া ইত্যাদি দ্বারা তৈরি পোশাক পরিধান করে। শুষ্ক-গরম অঞ্চলের অধিবাসীগণ সাদা কাপড় পরে (আরব দেশ), আর্দ্র-গরম অঞ্চলে মানুষ সাধারণত সুতি বস্ত্র পরিধান করে (উপমহাদেশ)।

৮. সভ্যতার বিকাশ: মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে নদী উপত্যকায় সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। যেমন- সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা। বসবাস উপযোগী আবহাওয়া, উর্বর মৃত্তিকায় চাষাবাদ, সুপেয় পানি, নদীপথে চলাচল, মৎস্য শিকার, বৃক্ষরাজির সমাহার প্রভৃতি সেক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। জলবায়ুর আনুকুল্যেই বিশ্বের ঘনবসতি অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছে নদী অববাহিকাগুলো।

প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আবহাওয়া তথা জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানগুলোর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় জীবজগৎ আজ হুমকির সম্মুখীন। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবে মানব সমাজ আজ নানা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন। তবে আশার কথা, এ ব্যাপারে বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Atmospheric Disturbances)

বায়ুমণ্ডলে বায়ুর তাপ ও চাপের অনিয়মিত পার্থক্যের কারণে গোলযোগ দেখা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বায়ুপ্রবাহ অঞ্চলে বায়ুপ্রাচীরের আকারে, তরঙ্গাকারে, ঘূর্ণিপাকের ন্যায়, আবার কোথাও পরিচলনের আকারে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। এগুলো ছোট, বড় এবং স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অভিসরণ ও উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহের কেন্দ্র অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগসমূহ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং এর প্রভাবেই বর্ষণ হয়ে থাকে। বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ অঞ্চলে অবস্থিত মেঘ আগত সৌর শক্তি এবং বহির্গামী পৃথিবীর বিকিরণের পরিমাণকে প্রভাবিত করে বলে বায়ুর তাপমাত্রার পরিমাণেও ভিন্নতা দেখা যায়। তাছাড়া বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগের ফলে বায়ুর তাপমাত্রা আনুভূমিকভাবেও প্রভাবিত হয়। বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ও টর্নেডো জনজীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

ঘূর্ণিঝড় (Cyclone): বাংলাদেশে সংঘটিত প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং মারাত্মক ধ্বংসকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় উল্লেখযোগ্য। স্থান অনুসারে ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রমুখী ও ঊর্ধ্বমুখী বায়ুরূপে পরিচিত। ভূপৃষ্ঠের কোনো অংশে বায়ুমণ্ডল যদি অধিক উত্তপ্ত হয় তখন বায়ু দ্রুত উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। এখানে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। তখন চাপের সমতা রক্ষার্থে চারদিকের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারি বায়ু প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রে প্রবেশ করে, আবার ক্রমাগত উষ্ণ ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বলে।

ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির কারণ: ঘূর্ণিঝড় সাধারণত গভীর সমুদ্রে সৃষ্টি হয়। মূলত যে দুটি কারণ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে তা হলো নিম্নচাপ ও উচ্চ তাপমাত্রা। ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে সাগরের তাপমাত্রা ২৭০ সেলসিয়াস এর বেশি হতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত বঙ্গোপসাগরে প্রায় সারা বছরই তা বিদ্যমান থাকে। সাগরে বৃষ্টিপাতের ফলে তা সুপ্ততাপ ছেড়ে দেয়, যা বাষ্পীভবন বাড়িয়ে দেয়। আবার এই সুপ্ততাপের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে বায়ুমণ্ডল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং নিম্নচাপের সৃষ্টি করে।

নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে আশপাশের বাতাস সেখানে ধাবিত হয়, যা বাড়তি তাপমাত্রার কারণে ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠতে থাকে ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করে। এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের বেগ অনেক বেশি হয়। তবে বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ৬৩ কি.মি. বা তার বেশি হলে তা সাইক্লোন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোন আঘাত হানে ১৯৯১ সালে, যেখানে বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশে আশ্বিন-কার্তিক এবং চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে ঘূর্ণিঝড় হয়।
জনজীবনে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব: বাংলাদেশে ১৯৬৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১২টি বড় আকারের ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়সহ সর্বমোট ছোট বড় প্রায় ৬১টি ঘূর্ণিঝড় এবং ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এসব ঝড়ে মানুষ ও পশুর মৃত্যু ছাড়াও কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংঘটিত উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

১৯৬০, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১২ কোটি টাকা এবং মানুষের মৃত্যু সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৫১ হাজার। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে যে ঝড় সংঘটিত হয় তা উনবিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মনে করা হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ে ১০০ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় এবং সাড়ে ৫ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Norwester)

বাংলাদেশের অতি পরিচিত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো কালবৈশাখী ঝড়। এদেশে সাধারণত বৈশাখ (এপ্রিল-মে) মাসের দিকে কালবৈশাখী ঝড় হয়। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতি এলাকায় মার্চ-এপ্রিল মাসে সন্ধ্যার দিকে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আসে। সে সঙ্গে যে ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হয় তাকে কালবৈশাখী বলে। কালবৈশাখীর আগমনে উষ্ণতা স্বাভাবিকের তুলনায় °-°সে. কমে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের মতো কালবৈশাখীর ক্ষেত্রেও প্রচন্ড বেগে বাতাস ঘূর্ণির আকারে প্রবাহিত হয় এবং পথিমধ্যে যা পড়ে তার সবই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়।

স্থানীয়ভাবে কোনো এলাকার ভূপৃষ্ঠ অত্যধিক তাপমাত্রা অথবা অন্যান্য কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডল যথেষ্ট অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং এ ঝড়ের জন্ম হয়। উত্তপ্ত, হাল্কা ও অস্থির বায়ু উর্দ্ধমুখী উঠতে থাকে এবং সমতাপীয় সম্প্রসারণ (adiabatic expansion) প্রক্রিয়ায় বায়ুস্তর সম্পৃক্ত বিন্দুতে (saturation point) না পৌছা পর্যন্ত শীতল হতে থাকে এবং কিউমুলাস মেঘ সৃষ্টি হয়। বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কিউমুলাস মেঘ উল্লম্বভাবে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ গঠন করে এবং পরবর্তী সময়ে বজ্রঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয় যা সবার কাছে কালবৈশাখী নামে পরিচিত। সাধারণ বর্ষণের সঙ্গে এ ঝড়ের মূল পার্থক্য হচ্ছে, এ ঝড়ের সঙ্গে সবসময়ই বিদ্যুৎ চমকায় ও বজ্রপাত হয়।

মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের তাপমাত্রা পূর্ববর্তী মাসগুলির (শীতকালের মাসগুলি) তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে সারা দেশে বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে দৈনিক তাপমাত্র সর্বোচ্চ পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর উপস্থিতি কালবৈশাখী সৃষ্টির অপরিহার্য পূর্বশর্ত। অস্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল আর দ্রুত পরিচলন ক্রিয়া (convective activity) কালবৈশাখীর উৎপত্তি ও বৃদ্ধির অন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

কালবৈশাখীকে বায়ুপুঞ্জ বজ্রঝড় (air mass thunderstorm) অথবা পরিচলনগত বজ্রঝড় (convective thunderstorm) নামেও আখ্যায়িত করা যায়। বাংলাদেশে কালবৈশাখী সৃষ্টির প্রধান কারণ হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব - দিক থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু যা উর্ধ্বে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাপৃত থাকে এবং এ উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিম দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল ও শুষ্ক বায়ুর সঙ্গে মিলিত বা মুখোমুখি হয়। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু ছোটনাগপুর মালভূমিতে সৃষ্টি হয়ে পূর্বদিকে ধাবিত হয়ে বাংলাদেশের সীমায় উপস্থিত হয়। বিপরীতধর্মী ও অসম এ দু বায়ুপ্রবাহের মুখোমুখি হওয়ার ফলে প্রাক-কালবৈশাখীর সৃষ্টি হয়।

কালবৈশাখীর প্রভাব: কালবৈশাখী ঝড়ের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হতে ৮০ কি.মি. হয়ে থাকে। অনেক সময় এ ঝড়ের গতি ঘণ্টায় ১২৮ কি.মি. এরও বেশি হয়ে থাকে। এর ফলে ঘরবাড়ি, গাছপালা, শস্য প্রভৃতি নষ্ট হয়। কোনো কোনো বছর কালবৈশাখীর প্রভাবে মানুষ ও পশুপাখির প্রাণহানি ঘটে। অনেক সময় কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে শিলা বৃষ্টিও হয়ে থাকে।

টর্নেডো (Tornado)
আমাদের অতি পরিচিত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো টর্নেডো। বাংলাদেশ ছাড়াও আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই টর্নেডো আঘাত হানে। টর্নেডোর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো এটি হঠাৎ করে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করে। টর্নেডো শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ শব্দ "Tronada" থেকে যার অর্থ হলো 'বজ্রঝড়'।
টর্নেডো সৃষ্টির কারণ: ঘূর্ণিঝড়ের মতো টর্নেডোর জন্যও লঘু বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়াই প্রধান কারণ। এর ফলে উষ্ণ বাতাস
উপরে উঠে যায় এবং ঐ শূন্য জায়গা পূরণের জন্য শীতল বাতাস প্রচণ্ড বেগে ঐ শূন্য জায়গার দিকে ধাবিত হয়। ফলশ্রুতিতে টর্নেডো সৃষ্টি হয়। টর্নেডোর ক্ষেত্রে বাতাসের গতিবেগ সাইক্লোনের চেয়ে বেশি হয় এবং তা সাধারণত ঘণ্টায় ১০০-৪৮০ কি.মি. হতে পারে। টর্নেডোর বিস্তার মাত্র কয়েক মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৫-৩০ কি.মি. হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের সাথে টর্নেডোর মূল পার্থক্য হলো ঘূর্ণিঝড় সাগরে সৃষ্টি হয়ে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। অপরদিকে টর্নেডো যে কোনো স্থানেই সৃষ্টি হতে পারে ও আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত শীতের শেষ থেকে বর্ষার শুরু এ সময়ে টর্নেডো হয়ে থাকে।

টর্নেডোর প্রভাব: টর্নেডোর প্রভাবে কখনও কখনও প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে এবং কখনও কখনও শিলাবৃষ্টিও হয়ে থাকে। ১৯৬৯ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকার মহাখালী থেকে ডেমরা পর্যন্ত অঞ্চলে যে টর্নেডো হয়েছিল তার ফলে হাজার হাজার মানুষ ও জীবজন্তু প্রাণ হারিয়েছিল এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ও শিল্প কারখানা বিধ্বস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশে একটি প্রলয়ঙ্কারী টর্নেডো আঘাত হানে ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতে। ঐ আঘাতের ফলে টর্নেডোর গতিপথের মধ্যে প্রায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও ২০১৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক ভয়াবহ টর্নেডো আঘাত হানে। এতে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং ফসলহানি ঘটে।

জলবায়ুর উপাদানকোনো স্থানের বায়ুর তাপ, চাপ, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদির ৩০ থেকে ৩৫ বছরের গড় অবস্থাকে জলবায়ু বলে। জলবায়ুর প্রধান উপাদানগুলো হচ্ছে তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ, বায়ুর গতি, বায়ুর আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদি।
জলবায়ুর নিয়ামকজলবায়ু নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ামকগুলো হলো- অক্ষাংশ, উচ্চতা, বায়ুপ্রবাহের দিক, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্রোত, পর্বতের অবস্থান, বনভূমি, ভূমির ঢাল ইত্যাদি।
তাপবলয়পৃথিবীর তাপবলয়গুলো হলো- উষ্ণমণ্ডল, উত্তর নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল, দক্ষিণ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল, উত্তর হিমমণ্ডল, দক্ষিণ হিমমণ্ডল। এগুলো গোলাকার পৃথিবীকে ঘিরে অবস্থান করছে। সমতাপ রেখা দ্বারা ভূপৃষ্ঠকে প্রকৃত তাপ বলয়ে ভাগ করা যায়।
চাপবলয়ভূপৃষ্ঠে নানা আকৃতির বায়ুচাপ বলয় দেখা যায়। ভূপৃষ্ঠে প্রধানত ৭টি চাপ বলয় রয়েছে। যেমন-নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়, কর্কটক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়, মকরক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়, মেরুদেশীয় নিম্নচাপ বলয়, মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়, সুমেরু উচ্চচাপ বলয়, কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।
বায়ুপ্রবাহভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে অর্থাৎ আনুভূমিকভাবে প্রবাহিত বায়ুকে বায়ুপ্রবাহ বলে। বায়ুচাপের পার্থক্যই বায়ুপ্রবাহের কারণ। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ৪ ধরনের বায়ু প্রবাহিত হয়। যথা-নিয়ত বায়ু, সাময়িক বায়ু, অনিয়মিত বায়ু, স্থানীয় বায়ু। এগুলোর মধ্যে নিয়ত বায়ু অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু, প্রত্যয়ন বায়ু ও মেরুদেশীয় বায়ু এই তিনটি শ্রেণিতে নিয়ত বায়ুকে বিন্যস্ত করা হয়।
বায়ুর আর্দ্রতাবায়ুতে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিকে বায়ুর আর্দ্রতা বলে। আবহাওয়াবিদ্যায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা শতকরায় প্রকাশ করা হয়।
ঘনীভবনজলাকর্ষী কণার উপস্থিতিতে বায়ুর তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নিচে নামলেই ঘনীভবন হয়। ঘনীভবনকে প্রধান ২টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়- (ক) ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ ঘনীভবন ও (খ) উর্ধ্ব বায়ুস্থ ঘনীভবন। শিশির, তুষার, কুয়াশা, কুজ্জাটিকা হলো ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ ও নিকটস্থ ঘনীভবনের রূপ। উর্ধ্ব বায়ুতে ঘনীভবন হয়ে মেঘের সৃষ্টি হয়।
মেঘ ও বৃষ্টিপাতপৃথিবী পৃষ্ঠের সাগর, মহাসাগর, নদ-নদী প্রভৃতি জলরাশি থেকে পানি সূর্যতাপে বাষ্পাকারে বায়ুমণ্ডলে গিয়ে মেঘ সৃষ্টি করে। ঊর্ধ্ব মেঘ, মধ্যম উচ্চতার মেঘ, নিচের স্তরের মেঘ এবং উল্লম্ব বিস্তার সম্পন্ন মেঘ; এই চারটি প্রধান শ্রেণিতে মেঘের শ্রেণিবিভাগ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জলরাশি থেকে উত্থিত জলীয়বাষ্প ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের সৃষ্টি করে, যা ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি আকারে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। একে বৃষ্টিপাত বলে। বৃষ্টিপাতকে প্রধান ৪টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যথা-শৈলোৎক্ষেপ, পরিচলন, ঘূর্ণিবাত এবং সংঘর্ষ বৃষ্টি।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...