(Classification of Ebb-Tide)
মহাকর্ষ ও কেন্দ্রাতিগ (granitational and centrifugul) শক্তির তারতম্যের কারণে জোয়ারের ধরনের পরিবর্তন হয়। পৃথিবীর সাথে চন্দ্র ও সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থানের পরিবর্তনও জোয়ারের ধরনে প্রভাব বিস্তার করে। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা
প্রধানত: নিম্নোক্ত জোয়ারসমূহ সনাক্ত করেছেন। যথা-

১. মুখ্য জোয়ার (Primary tide);
২. গৌণ জোয়ার (Secondary tide);
৩. ভরা কটাল ও (Spring tide); এবং
৪. মরা কটাল। (Neap tide)
এছাড়া ভূপৃষ্ঠে সময় ও স্থানভেদে কিছু বিশেষ
জোয়ার পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১. দৈনিক, অধদৈনিক ও মিশ্র জোয়ার (Diurnal, semi diurnal and mixed tides); এবং
২. ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় জোয়ার (Tropical and equitorial tides) ।
১. মুখ্য জোয়ার (Primary tide); চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। আবর্তনকালে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের কাছে অর্থাৎ ঠিক সামনে উপস্থিত হয় সেখানে চাঁদের আকর্ষণ বেশি হয়। স্থল অপেক্ষা পানিরাশির ওপর এ আকর্ষণশক্তির কার্যকারিতা অনেক বেশি বলে চারদিক থেকে পানি ঐ আকর্ষণস্থলের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে চাঁদের নিকটবর্তী অংশের পানিরাশি ফুলে উঠে। এ জোয়ারকে মুখ্য বা প্রত্যক্ষ জোয়ার বলে।

২. গৌণ জোয়ার (Secondary tide): চাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার
বিপরীত দিকে পানির নিচে যে কঠিন স্থলভাগ আছে তা পৃথিবীর কেন্দ্রের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। ফলে সেখানকার পানিরাশি অপেক্ষা স্থলভাগ চাঁদের দিকে অধিকতর আকর্ষিত হয়। এ সময় সেখানে পানিরাশির ওপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণশক্তির প্রভাব কমে যায় এবং কেন্দ্রাতিগ (centrifugul) শক্তির প্রভাবে চার পাশের পানিরাশি সেই স্থানে প্রবাহিত হয়ে জোয়ারের সৃষ্টি করে। এ জোয়ারকে দূরবর্তী (far), গৌণ (secondary) বা পরোক্ষ (indirect) জোয়ার বলে।
৩.
ভরা কটাল (Spring tide): চাঁদ ও সূর্যের জোয়ার উৎপন্ন করার ক্ষমতার অনুপাত ১১:৫। অমাবস্যায় চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর একই দিকে এক সঙ্গে সমসূত্রে (same line) অবস্থান করে। আবার পূর্ণিমার সময় পৃথিবীর এক দিকে সূর্য ও অপরদিকে চাঁদ থাকে এবং সমসূত্রে (same line) অবস্থান করে। এর ফলে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণশক্তি একই সঙ্গে কার্যকরী হয়। সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের তুলনায় কম হলেও উভয়ের মিলিত আকর্ষণ প্রবল।
পূর্ণিমা তিথিতে ভূপৃষ্ঠের যে স্থানে চাঁদের প্রভাবে মুখ্য জোয়ার হয়, সেই স্থানে সূর্যের প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়। আবার অমাবস্যায় চাঁদ ও সূর্য উভয়ের মিলিত আকর্ষণে শক্তিশালী মুখ্য জোয়ার হয়। এগুলো ভরা কটাল।

৪. মরা কটাল (Neap tide): অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য সমসূত্রে না থেকে উভয়ে পৃথিবীর সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। সুতরাং, সেই দিন জ্যোতিষ্কদ্বয়ের আকর্ষণ আড়াআড়িভাবে (সমকোণে) কার্যকরী হয়। এই সময় চাঁদের আকর্ষণে চাঁদ ও এর বিপরীত দিকে জোয়ার হয়। সূর্যের আকর্ষণেও সূর্য এবং এর বিপরীত দিকে জোয়ার হওয়ার কথা। কিন্তু সূর্য অপেক্ষা চাঁদের আকর্ষণশক্তি বেশি বলে চাঁদ ও এর বিপরীত দিকে জোয়ার কার্যকর হয়।
একই সঙ্গে সূর্য এবং এর বিপরীত দিকে ভাটা হয়। এর ফলে চন্দ্রের আকর্ষণের দিকে এবং এর বিপরীতে জোয়ারের পানি বেশি ফুলে উঠতে পারে না। ফলে জোয়ারের তীব্রতা কম হয়। এ কারণে এ জোয়ারকে মরা কটাল বলে।

এছাড়া সময় ও স্থানভেদে কতিপয় বিশেষ জোয়ার উল্লেখ করা যায়। যেমন-
১. দৈনিক, অর্থদৈনিক ও মিশ্র জোয়ার (Diurnal, semi diurnal and mixed tides): কোনো কোনো অঞ্চলে
২৪ ঘণ্টায় মাত্র একবার জোয়ার ও একবার ভাটা হয়। মেক্সিকো উপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের জোয়ার হয়ে থাকে। এটা দৈনিক জোয়ার নামে অভিহিত। অর্ধদৈনিক জোয়ার বলতে বুঝায় দৈনিক দু'বার জোয়ার ও দু'বার ভাটা। বঙ্গোপসাগর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আটলান্টিক উপকূলে এ ধরনের জোয়ার দেখা যায়। এছাড়া কোনো কোনো স্থানে দৈনিক ও অর্ধ-দৈনিকের মত পানি উঠানামা করে কিন্তু প্রতিবার পানির উচ্চতার পার্থক্য থাকে। এটা মিশ্র জোয়ার নামে অভিহিত। ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে এ ধরনের জোয়ার দেখা যায়।
২. ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় জোয়ার (Tropical and Equitorial tides): প্রতিমাসে দু'বার চন্দ্রের উত্তরায়ন ও
দক্ষিণায়নের ফলে কর্কটীয় ও মকরীয় অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ জোয়ার হয় যা ক্রান্তীয় জোয়ার নামে অভিহিত। নিরক্ষীয় এলাকায় চন্দ্র লম্বভাবে আকর্ষণ করায় সেখানে জোয়ারের উচ্চতায় তেমন পার্থক্য হয় না। এটা নিরক্ষীয় জোয়ার নামে অভিহিত।
সমুদ্রের মধ্যভাগে পানি সাধারণত ১- ৩ মাত্রায় উঁচুনিচু হয়। কিন্তু উপকূলের নিকট সাগর, উপসাগরের গভীরতা কম বলে পানিরাশি সেখানে অনেক বেশি উঁচু-নিচু হয়। এ জন্য সমুদ্রের মোহনা হতে নদীসমূহের গতিপথে কয়েক মাইলব্যাপী জোয়ার-ভাটা অনুভূত হয়। উল্লেখ, ভূপৃষ্ঠের যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয় তার প্রতিপাদ স্থানে গৌণ জোয়ার হয়।
সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই
Read more