(Living World and Air Pollution)
প্রতিটি জীব তথা মানুষের জীবন ধারণ ও বেঁচে থাকার জন্য বায়ু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান। কিন্তু মানুষের কার্যকলাপ ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে প্রতিনিয়ত বায়ু দূষণ সংঘটিত হচ্ছে, যার ফলে আমাদের জীবন আজ হুমকির মুখে। বায়ু দূষণের ফলে মানব স্বাস্থ্য বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
মানব স্বাস্থ্যের ওপর বায়ু দূষণের প্রভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, 'স্বাস্থ্য শুধু অসুখের অনুপস্থিতিই নয় বরং সম্পূর্ণ দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাও।' বায়ু শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসই নয় বরং এর মাধ্যমে জীবনও বিপন্ন করতে পারে। মূলত বায়ুর উপাদানগুলো যখন নিজেদের মধ্যে সমতা আনতে ব্যর্থ হয় তখনই বায়ু দূষণ ঘটে। দূষকের প্রকৃতি মানব স্বাস্থ্য তথা সমগ্র জীবকুলের ক্ষতির প্রধান নিয়ামক। বায়ু দূষণের ফলে মানব স্বাস্থ্যের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
স্বল্পস্থায়ী প্রভাব: বায়ু দূষণের ফলে মানুষ চলার পথে হঠাৎ মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখ জ্বালাপোড়া ইত্যাদি অবস্থার সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে নগর অঞ্চলে যেখানে যানবাহনের আধিক্য রয়েছে সেখানে এ অবস্থা বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: মানব স্বাস্থের উপর বায়ু দূষণের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এর প্রভাবে নানা ধরনের রোগ-
ব্যাধি হয়ে থাকে। যেমন,
i. যানবাহন হতে নির্গত নানা ধরনের গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড উল্লেখযোগ্য। এ গ্যাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে রক্তের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা হ্রাস পায়।
ii. তেল ও কয়লা দহনের ফলে সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়। এতে শ্বাসকষ্ট, মাথাধরা, বমি বমি ভাব হয়ে থাকে।
iii. রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় উৎপন্ন হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস চোখ ও গলার বিশেষ ক্ষতি করে।
iv. তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে নির্গত সূক্ষ্ম ধূলিকণা ক্যান্সার রোগ সৃষ্টি করে।
v. বিস্ফোরক দ্রব্য, রঙ, সার প্রভৃতি উৎপাদনের সময় যে অ্যামোনিয়া নির্গত হয় তা মানুষের শ্বাসনালীর ক্ষতি করে।
উদ্ভিদের ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ দীর্ঘসময় ধরে উদ্ভিদের ক্ষতি করে থাকে। বেশ কিছু বায়ু দূষক উদ্ভিদের ক্ষতি করে। এগুলোর মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, এবং এ্যামোনিয়া দূষণের জন্য দায়ী। কার্বন মনোক্সাইড উদ্ভিদের নাইট্রোজেন সংবন্ধন প্রক্রিয়া বিঘ্ন ঘটায়। সালফার ডাইঅক্সাইড সালোকসংশ্লেষণে বাঁধা প্রদান করে। নাইট্রোজেন অক্সাইড ফসল উৎপাদন হ্রাস করে থাকে। তাপমাত্রা, শিকড়ের আর্দ্রতা সরবরাহ ও আলোর ওপর নির্ভর করে দূষক উদ্ভিদকে ক্ষতি করে।
বাস্তুসংস্থানের ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ বাস্তুসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যেমন- এসিড বৃষ্টির ফলে যেকোনো বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। বায়ু দূষণ শুধু স্থলজ বাস্তুসংস্থানকেই প্রভাবিত করে না এটি জলজ বাস্তুসংস্থান এমনকি পানি প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলে।
পশুপাখির ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ মানব স্বাস্থ্যের মতোই পশুপাখিরও ক্ষতি করে। পশুপাখি দুটি প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রথমত, বায়ুর পুঞ্জীভূত দূষিত পদার্থ উদ্ভিদ ও গৃহপালিত পশুপাখির খাদ্যকে দূষিত করে। দ্বিতীয়ত, যখন তারা এই দূষিত উদ্ভিদ ও খাদ্য গ্রহণ করে তখন বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Prevention of Air Pollution)
বায়ু দূষণ জীবজন্তু ও মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। তাই বিভিন্ন সময়ে বায়ু দূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বায়ু দূষণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫; পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি, ১৯৯৭; এবং পরিবেশ পরিষদ আইন, ২০০০ ইত্যাদি আইন করেছে। বায়ু দূষণ প্রতিরোধে করণীয়সমূহ-
(ক) যানবাহনের জ্বালানি পরিবর্তন/রূপান্তর: বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ১৯৮৫-৮৬ সালে প্রথম যানবাহনে গ্যাসোলিনের পরিবর্তে কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) ব্যবহার করে। ব্যবহারের পর দেখা গেছে গ্যাসোলিনের চেয়ে সিএনজিতে বায়ু দূষণের পরিমাণ অনেক কম। বায়ু দূষণ রোধে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বিভিন্ন যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে।
(খ) বায়ুর গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন: বায়ু দূষণ প্রতিরোধে সরকার বায়ুর গুণগত মান মনিটরিং ও মূল্যায়ন করতে পারে। মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নে সরকার কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, যা বায়ু দূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
(গ) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা: ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারিভাবে বায়ু দূষণ প্রতিরোধ করা যায়। ট্রাফিক জ্যাম প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট রাস্তায় নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচল করলে যানবাহন নির্গত জ্বালানি দূষণ কমানো সম্ভব, যা বায়ু দূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত তা হচ্ছে ট্রাফিক সিগন্যাল, একমুখী সড়ক তৈরি, পার্কিং সুবিধার উন্নতি, বিভিন্ন গতির গাড়ির জন্য ভিন্ন ভিন্ন সড়ক বা লেন তৈরি ও ব্যবহার। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়ু দূষণ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি যানবাহন মালিকদেরও সচেতন হতে হবে।
(ঘ) নির্দিষ্ট স্থানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা: যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে তুললে বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পায়। যেখানে শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে সেখানে আবাসিক ভবন থাকবে না। তাহলে বায়ু দূষণ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
(ঙ) বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার: জ্বালানি হিসেবে কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ু ও তাপশক্তি, জৈব জ্বালানি প্রভৃতির ব্যবহার বৃদ্ধির সাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশে সম্ভব।
(চ) কলকারখানার চিমনি উঁচু করে তৈরি করা এবং কারখানার চারদিকে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা।
(ছ) আবাদী জমিতে সীমিত পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করা।
(জ) রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র প্রভৃতি মাধ্যমে জনগণকে বায়ু দূষণের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা।
(ঝ) পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও এসবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা।
| বায়ুর উপাদান | বায়ুর উপাদানগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- গ্যাসীয় উপাদান, জলীয়বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা। বায়ুর প্রধান দুটি গ্যাসীয় উপাদান হলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। বায়ুতে ৭৮.০২% নাইট্রোজেন এবং ২০.৭১% অক্সিজেন বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়াও আর্গন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নিয়ন, হিলিয়াম, ক্রিপটন, ইত্যাদি বায়ুর গ্যাসীয় উপাদান। |
| বায়ুমণ্ডল | ভূপৃষ্ঠকে বেষ্টনকারী যে গ্যাসীয় আবরণ রয়েছে তাকে বায়ুমণ্ডল বলে। এটি পৃথিবীর সাথে অবিচ্ছেদ্য। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে লেগে থাকে এবং সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয়। |
| বায়ুমণ্ডলীয় স্তর | বায়ুমণ্ডলকে প্রধান দুটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, যেমন- (ক) সমমণ্ডল ও (খ) বিষমমণ্ডল। ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, ওজোনোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং সমতাপ অঞ্চল নিয়ে সমমণ্ডল গঠিত। নাইট্রোজেন পারমাণবিক স্তর, অক্সিজেন পারমাণবিক স্তর, হিলিয়াম ও হাইড্রোজেন স্তর নিয়ে বিষমমণ্ডল বিস্তৃত। ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তরটিকে ট্রপোস্ফিয়ার বলা হয়। এ স্তরের গড় গভীরতা প্রায় ১২ কি.মি.। মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। |
| বায়ু দূষণ | বায়ুতে এক বা একাধিক দূষকের উপস্থিতি ও স্থায়িত্ব সেখানকার জীব সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের জন্য ক্ষতিকর হলে তাকে বায়ু দূষণ বলে। |
| দূষক | যেসব উপাদান বায়ুকে দূষিত করে তাকে দূষক বলে। শিল্পকারখানার চিমনি হতে ধোঁয়া ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ, নির্গত CFC গ্যাস, জীবের নিঃশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ইগজস্ট গ্যাস, সালফার ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি বায়ু দূষক। |
| স্বল্পস্থায়ী প্রভাব | বায়ুদূষণের স্বল্পস্থায়ী প্রভাব প্রতিনিয়ত জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। মানুষ চলার পথে দূষণের কারণে হঠাৎ করেই মাথা ব্যাথা, বমি, চোখ জ্বালাপোড়া করা, শ্বাসকষ্টে ভুগছে। |
| বিকল্প জ্বালানি | বায়ুদূষণ প্রতিরোধে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সৌরশক্তি, বায়ু ও তাপশক্তি এবং জৈব জ্বালানির ব্যবহার বায়ুদূষণ প্রতেিরাধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা। |
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ - খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more