(Interpolation of Isotherm and Isohyte)
মানচিত্রে সমমান রেখা অঙ্কনে ইন্টারপোলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে সমতাপ ও সমবর্ষণ রেখা অঙ্কন পদ্ধতি একই ধরনের। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশের প্রত্যেক আবহাওয়া কেন্দ্রের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পাওয়া গেল। এখন মানচিত্রের নির্দিষ্ট স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ লিখতে হবে। অতঃপর নির্দেশনা অথবা উদ্দেশ্য অনুযায়ী ১০"ব্যবধানে ৬০", ৭০", ৮০", ৯০", ১০০" প্রভৃতি সমবর্ষণ রেখা আঁকতে হবে। আর এই রেখাগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রের মান থেকে নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। যেমন-৬৭.৯" এবং ৭৫.১" বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট স্থানের মধ্য দিয়ে ৭০" সমবর্ষণ রেখা অংকন করতে হবে। এক্ষেত্রে ৬৭.৯" এবং ৭৫.১" বৃষ্টিপাতের স্থানদ্বয়কে সরলরেখা দ্বারা যোগ করে ৭০" রেখার জন্য নির্দিষ্ট বিন্দু নির্ণয় করতে হবে। এভাবে ১০" ব্যবধানে বেশ কয়েকটি সমবর্ষণ রেখা আঁকা যাবে।

সতর্কতা: সমতাপ ও সমবর্ষণ রেখা তথা সমমান রেখা অংকনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে-
১. একটি সমমান রেখা কখনও অপর একটি সমমান রেখাকে স্পর্শ বা ছেদ করবে না।
২. সমমান রেখা মানচিত্রের মাঝখানে শেষ হবে না তবে বেষ্টনীবদ্ধ হতে পারে।
৩. সমমান রেখাগুলোর ব্যবধান প্রকৃত মান হতে স্কেল অনুসারে হবে।
সমতাপ রেখা (Isotherm)
ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে বায়ুর তাপমাত্রার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সমগ্র পৃথিবীতে একই সঙ্গে একই তাপমাত্রা বিরাজ করবে এটা কখনোই সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কারণে বায়ুর তাপের পার্থক্য ঘটে থাকে।
কোনো একটি অঞ্চলে দিনের যেকোনো সময় একই তাপমাত্রা উপস্থিত রয়েছে। ঠিক ঐ একই সময়ে উক্ত এলাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমান তাপ থাকতে পারে। এভাবে কাছাকাছি কয়েকটি এলাকার সমান তাপবিশিষ্ট অঞ্চলকে মানচিত্রে একটি রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়। একে সমতাপ রেখা বলে।
জানুয়ারি মাস বাংলাদেশের সবচেয়ে শীতলতম মাস। । এ মাসের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১৭.৪° সেলসিয়াস। এ সময় দক্ষিণে সমুদ্র উপকূল হতে উত্তর দিকে তাপমাত্রা ক্রমশ কম হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ সময় সমতাপ রেখাগুলো অনেকটা সোজা হয়ে পূর্ব-পশ্চিমে অবস্থান করে। জানুয়ারি মাসের গড় তাপমাত্রা চট্টগ্রামে প্রায় ২০° সে. ( ফা.), নোয়াখালিতে
সে. (৬৭° ফা.), ঢাকায় ১৮.৩° সে. (৬৫° ফা.), বগুড়ায় সে. (৬৪° ফা) এবং দিনাজপুরে (৬২° ফা.)। তবে কোনো সময় উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কম হয়ে থাকে। ৬.১৫ মানচিত্রটি লক্ষ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের কোন কোন জেলায় শীতকালে কেমন তাপমাত্রা থাকে অর্থাৎ সমতাপে কোন কোন জেলা রয়েছে।

বাংলাদেশে বর্ষাকালে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানে অতিরিক্ত তাপ অনুভূত হবার কথা। কিন্তু এ ঋতুতে অধিক বৃষ্টিপাত হয় বলে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে। তবে আবহাওয়া সর্বদা উষ্ণ থাকে। এ সময়কার গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৭°সে. ( ফা.)। এ ঋতুতে উপকূলবর্তী এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পাহাড়িয়া অঞ্চলে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ অঞ্চলে তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পায়। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চলে সে. ( ফা.), উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় সর্বত্র
২৭.২০° সে. ( ফা.), কুমিল্লায় সে. (৮২° ফা.), কুষ্টিয়া ও পাবনায় (ফা) এবং রাজশাহীতে সে. (৮৫° ফা.) তাপ অনুভূত হয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে সমতাপরেখা অনেকটা উত্তর-দক্ষিণে খাড়াভাবে এবং দক্ষিণে উপকূল বরাবর অনেকটা পশ্চিমে বেঁকে অবস্থান করে।
কাজ: বাংলাদেশের মানচিত্র এঁকে তাতে এপ্রিল মাসের এই তথ্যগুলোর সাহায্যে একটি সমতাপ রেখা মানচিত্র অঙ্কন করো করো। কক্সবাজার সে.; নারায়ণগঞ্জ সে.; শ্রীমঙ্গল সে.; ব্রাহ্মণবাড়িয়া সে.; যশোর ২৯.৫০° সে
সমবর্ষণ রেখা (Isohyte)
ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কাছাকাছি কয়েকটি এলাকায়। হয় তখন তা যে রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয় তাকে সমবর্ষণ রেখা বলে।

শীতকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে এতে জলীয়বাষ্প থাকে না বললেই চলে। এই বায়ু দেশের পূর্বাঞ্চলের পর্বতসমূহে বাধা পেয়ে সামান্য বৃষ্টিপাত ঘটায়। শীতকালীন বৃষ্টিপাত উপকূল অঞ্চল এবং পূর্বদিকের পার্বত্য অঞ্চলে হয়ে থাকে। এ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থানভেদে ৫ হতে ১৫ সে.মি.। এ ঋতুতে সিলেট, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি জেলার পূর্বাংশে, বান্দরবান জেলার উত্তর-পূর্বাংশে এবং
উপকূলবর্তী অঞ্চলে ১৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়। এ বৃষ্টিপাত দেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে ক্রমশ কম হয়ে থাকে। এ সময় রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে ৫ সে.মি. (২") বৃষ্টিপাত হয়।
কালবৈশাখী ঝড় পূর্বাঞ্চলে সর্বাপেক্ষা বেশি সংঘটিত হয়। এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও অধিক। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ৩৮ সে.মি. (১৫") সমবর্ষণ রেখাটি উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশকে দু'টি অঞ্চলে বিভক্ত করে। এ রেখার পূর্বে ৩৮ (১৫") হতে ৭৫ (৩০'') সে.মি. পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ২৫ (১০'') হতে ৩৮ (১৫") সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোর মধ্যে মে মাস সর্বাপেক্ষা বৃষ্টিবহুল। এখানে গড়ে প্রতি তিন দিনে একদিন বৃষ্টিপাত হয়। বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রীষ্মকালেই হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন গড় বৃষ্টিপাত ৫১ সে.মি. (২০")। অবশ্য কোনো কোনো বছর এর তারতম্য হয়ে থাকে। সিলেট জেলাতেই এ সময় সর্বাপেক্ষা বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭৫ সে.মি. (৩০")-এর অধিক। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে এ সময় ৩৮ সে.মি. (১৫") এর কম বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টিপাত সবচেয়ে কম। এখানে ২৫ সে.মি. (১০") এর কম বৃষ্টিপাত হয়।
বর্ষাকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসে বলে এতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। এ সময় বাংলাদেশের সর্বত্র পানি থাকে। অধিক তাপে এ পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে জলীয়বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ুর সাথে মিলিত হয়। ফলে প্রায় প্রতিদিন পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়। এছাড়া জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বত গাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উত্থিত হয় এবং ঠান্ডা হয়ে ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ কারণে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, বান্দরবান প্রভৃতি জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এ সময় দেশের কোথাও ৮০ সে.মি. (৩১") এর কম বৃষ্টিপাত হয় না।
বাংলাদেশের মোট বৃষ্টিপাতের পাঁচ ভাগের চার ভাগ বৃষ্টিপাত বর্ষাকালেই হয়ে থাকে। এ সময়কার গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বনিম্ন ১১৯ সে.মি. (৪৭.৬") এবং সর্বোচ্চ ৩৪০ সে.মি. (১৩৬")। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে বৃষ্টিপাত ক্রমেই বেশি হয়ে থাকে। যেমন- পাবনায় প্রায় ১১৪ সে.মি. (৪৫"), ঢাকায় ১২০ সে.মি. (৪৭.২৪"), কুমিল্লায় ১৪০ সে.মি. (৫৫.১৫"), শ্রীমঙ্গলে ১৮০ সে.মি. (৭") এবং রাঙ্গামাটিতে ১৯০ সে.মি. (৭৪.৫") বৃষ্টিপাত হয়। এরূপ হওয়ার কারণ হচ্ছে প্রধানত জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস পূর্ব দিকের পাহাড়িয়া অঞ্চলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দিক পরিবর্তনের সময় পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত কম চাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এ বাতাস যতই পশ্চিমে যায় ততই আর্দ্রতা কমতে থাকে। কারণ, পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে যাওয়ায় এ বায়ু অনেকটা জলীয়বাষ্পহীন
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more