(Political Region of the World)
রাজনৈতিক অঞ্চল (Political Region)
রাজনৈতিক পরিচিতি বা অস্তিত্ব রয়েছে ভূপৃষ্ঠের এমন অংশবিশেষকে রাজনৈতিক অঞ্চল বলে। রাজনৈতিক অঞ্চলের সাধারণ ও মুখ্য উপাদান হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন কোনো ভূখণ্ড। উল্লেখ্য যে, ভূখণ্ড বলতে কেবল স্থলভাগকে বোঝায় না; জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষের সমগ্রতাও এর অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক অঞ্চলের প্রধান পারিসরিক (Spatial) বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে অবস্থান (location), অভিগম্যতা (accessibility), আয়তন (area), আকৃতি (size or shape), সীমানা (boundaries)। প্রত্যেক ভূগোলবিদের অঞ্চল সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।
কোনো ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সত্ত্বা মূলত নির্ভর করে এর পরিবেশিক বৈশিষ্ট্যের ওপর; বিশেষ করে জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর। কোনো ভূখণ্ড যখন রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত হয় ও একক রাজনৈতিক সত্ত্বার রূপ নেয় সেরূপ ভূখণ্ডকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় অঞ্চল বলা হয়।
বস্তুত রাষ্ট্রই হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের মূল রাজনৈতিক অঞ্চল। বলা বাহুল্য রাষ্ট্রীয় অঞ্চলের নিজস্ব সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও কার্যনির্বাহী কর্তৃপক্ষ বা সরকার থাকে।
রাজনৈতিক অঞ্চলের গুরুত্ব: একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়; বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিশেষ করে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে সুসম্পর্ক প্রভৃতি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাজনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রধান সুবিধাসমূহ হলো-
১. কোনো ভূখণ্ডের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম হয়।
২. সমন্বিত ভূমি ব্যবহার সহজতর হয়।
৩. আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপক সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
৪. নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হয় এবং
৫. জনগোষ্ঠীর অধিকার সুনিশ্চিত হয়।
রাজনৈতিক অঞ্চলের উপাদান: রাজনৈতিক অঞ্চলের মৌলিক উপাদানগুলোকে প্রধানত দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-ভৌগোলিক উপাদান এবং রাজনৈতিক উপাদান।
ভৌগোলিক উপাদান: রাজনৈতিক অঞ্চলের ভৌগোলিক উপাদানের মৌলিক বিষয় হচ্ছে ভূখণ্ড বা ভূভাগ। ভূভাগ বলতে শুধু স্থলভাগকেই বোঝায় না। এর দ্বারা জল, স্থল ও অন্তরীক্ষের বিস্তৃত পরিসরকে বোঝায়। রাজনৈতিক অঞ্চল যেহেতু কোনো পরিসরে অবস্থিত থাকে সেহেতু এর পারিসরিক (Spatial) বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
১. অবস্থান (location): অবস্থান রাজনৈতিক অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারিসরিক বৈশিষ্ট্য। অবস্থানগত তারতম্য-প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদ চলাচল ও সংযোগ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় মিথস্ক্রিয়াগত তারতম্য সৃষ্টি করে থাকে।
২. অভিগম্যতা (accessibility): স্থানের গমনাগমন সুবিধাকে অভিগম্যতা বলে। যাতায়াত ও যোগাযোগ
ব্যবস্থার ওপর অভিগম্যতা নির্ভরশীল। সড়ক, রেল, নৌ, সমুদ্র এবং বিমানপথ অভিগম্যতার প্রধান মাধ্যম। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক পরিবহনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অপরদিকে স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় অভিগম্যতার ক্ষেত্রে বিশেষ বাধা রয়েছে। বর্তমানে ৪৪টি (সূত্র: www.thoughco.com) রাষ্ট্র এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন। যেমন- নেপাল, ভুটান।
৩. আয়তন (Area or size): রাজনৈতিক অঞ্চলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পারিসরিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আয়তন বা আকার। আয়তন রাষ্ট্রীয় শক্তি ও জাতীয় গুরুত্বের মাপকাঠিস্বরূপ। কতিপয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন: বাণিজ্যিক কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান পরিবহন, শিল্প, আবহাওয়া গবেষণা, বেতার সংযোগ প্রভৃতির জন্য বিস্তৃত পরিসরের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
৪. আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য: রাজনৈতিক অঞ্চলের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা- সংঘবদ্ধ (compact) ও অসংঘবদ্ধ (non-compact)। সংঘবদ্ধ আকৃতি সীমানা প্রহরার মাধ্যমে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য রাজনৈতিক কাঠামো সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, অসংঘবদ্ধ আকৃতির রাষ্ট্র সাধারণত দীর্ঘায়িত, অভিক্ষেপিত, বিক্ষিপ্ত এবং ছিদ্রায়িত প্রকৃতির হতে পারে। এ ধরনের রাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক দ্বীপ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রগুলো অন্তর্ভুক্ত। যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ।
৫. সীমানা: সীমানা রাজনৈতিক অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাংশ। সকল রাষ্ট্রীয় অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সীমানা থাকে। সীমানা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরিব্যাপ্তি নির্দেশ করে।
রাজনৈতিক উপাদান: রাজনৈতিক অঞ্চলের ভূভাগগত বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্যান্য উপাদানগুলো রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত; এগুলো হচ্ছে সরকার ও সার্বভৌমত্ব।
১. সার্বভৌমত্ব: রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সর্বময় ক্ষমতাকে সার্বভৌমত্ব বলা হয়। যদিও কার্যত কোনো সরকারই মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে এমন ক্ষমতা প্রয়োগ করে না। স্বাধীন নয় যেমন-উপনিবেশ, আশ্রিত অঞ্চল প্রভৃতি রাজনৈতিক অঞ্চলের সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে না।
২. সরকার: রাজনৈতিক অঞ্চলের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সরকার। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা, আইন পরিষদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, আদমশুমারি কমিশন, কর্মকমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী।
রাজনৈতিক অঞ্চলের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Political Region)
বর্তমান পৃথিবী একাধিক রাজনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত। রাজনৈতিক প্রকৃতি অনুযায়ী এগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়।
i. উপনিবেশ (Colony): পরাধীন অঞ্চলের মধ্যে উপনিবেশ ও নির্ভরশীল এলাকাসমূহের ওপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা সর্বাধিক হয়ে থাকে। ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রেরই এক সময় বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ ছিল। যেমন- ১৯৪৭ পূর্ববর্তী ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশদের উপনিবেশ।
ii. স্বশাসিত ও কমনওয়েলথ (Self Governing and Commonwealth): আয়তনে বড় ও জনবহুল
উপনিবেশগুলো ইদানিংকালে স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ; ফ্রান্সের বৈদেশিক প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ এবং মার্কিন কমনওয়েলথভুক্ত এলাকাগুলো।
iii. অধিরাজ্য বা ডোমিনিয়ন (Dominion): ডোমিনিয়নসমূহে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা
ন্যূনতম। প্রকৃতপক্ষে এগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে শাসনতন্ত্র অনুযায়ী এগুলো সার্বভৌম নয়। ডোমিনিয়নগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে প্রধান ৩টি ডোমিনিয়ন রাষ্ট্র রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।
iv. বাফার রাষ্ট্র (Buffer State): দুইটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সীমান্তে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে বাফার বা সংঘর্ষরোধক রাষ্ট্র বলা হয়। ঔপনিবেশিক যুগে উপনিবেশ স্থাপনকারী ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ রোধকল্পে বাফার অঞ্চল সৃষ্টি হয়। যেমন- ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যবর্তী লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভারত ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী আফগানিস্তান এবং ফরাসি ইন্দোচীন ও ব্রিটিশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মধ্যবর্তী থাইল্যান্ড ছিল এ জাতীয় রাষ্ট্র।
V. কনফেডারেশন (Confedaration) বা রাষ্ট্রীয় মিত্রসংঘ: কয়েকটি স্বাধীন রাজনৈতিক অঞ্চলের এক শিথিল বন্ধনাবদ্ধ রাষ্ট্রকে কনফেডারেশন বলা হয়। বর্তমানকালে একমাত্র সুইজারল্যান্ডই কনফেডারেশন রাষ্ট্র হিসেবে ক্রিয়াশীল রয়েছে।
মানব ভূগোল - মোহা: আনিছুর রহমান ও মোঃ আব্দুর রাজ্জাক-স্যারে লেখা বই
Read more