পৃথিবীর গঠন (দ্বিতীয় অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

2.2k
Please, contribute by adding content to পৃথিবীর গঠন.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

নয়ন ও সাইদুল দুইজন একই শ্রেণিতে পড়ে। তারা সমুন্নতি রেখার বিভিন্ন ধরনের ভূমির ঢাল আলোচনা করল। নয়ন বলল ঢালকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সাইদুল একটি ঢাল সম্বন্ধে বলল যেটি ঢালের উপরের অংশ স্ফীত অথচ ঢালের পরিমাণ কম এবং উভয় দিকে ভূমিভাগের নিকট ঢাল বেশি।

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

হাছান শ্রেণিতে তার স্যারের কাছে পর্বত সম্পর্কে জানতে চাইল। স্যার বললেন আশেপাশের এলাকার চেয়ে ৩,০০০ ফুট বা তারও বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট বিস্তৃত ভূভাগকে পর্বত বলে।

ক্রমশ ভেতরের দিকে বৃদ্ধি পায়
ক্রমশ ভেতরের দিকে হ্রাস পায়
বাইরের দিকে হ্রাস পায়
বাইরের দিকে বৃদ্ধি পায়
উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

শরিফুল তার বন্ধু আফজালের সাথে সমোন্নতি রেখার সাহায্যে অঙ্কিত কতিপয় ভূমিরূপ এবং তাদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করলেন। শরিফুল সেখান থেকেও মাটির বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ভালোভাবে আফজালকে বুঝালো শ্রেণিবদ্ধ পাহাড় বা দীর্ঘায়ত উচ্চ পাহাড়

(Crust and Internal Structure of the Earth)

আদিতে পৃথিবী একটি উত্তপ্ত বাষ্পপিণ্ড ছিল। ক্রমান্বয়ে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে প্রথমে তরল ও পরে জমাট বেঁধে পৃথিবীর উপরিভাগে একটি কঠিন পাতলা আবরণের সৃষ্টি হয়। আর ভূপৃষ্ঠের এ কঠিন বহিরাবরণই ভূত্বক বা অশ্মমণ্ডল নামে পরিচিত। ভূত্বকের উপরাংশে গ্রানাইট নামক শিলার পরিমাণ বেশি। অপরদিকে, মধ্যবর্তী স্তরটি ব্যাসল্ট জাতীয় শিলা দ্বারা গঠিত ও নিম্নস্তরে অলিভিন নামক খনিজ অধিক পরিমাণ দেখা যায়।

ভূত্বক: ভূত্বক অশ্মমণ্ডলের উপরের স্তর। এর গভীরতা মহাদেশের নিচে সর্বোচ্চ এবং মহাসাগরের নিচে সর্বনিম্ন। গড় গভীরতা ২০কিলোমিটার। ভূত্বকের ঘনত্ব ২.২-২.৯ কি.গ্রা/ঘনমিটার, আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩ এর মধ্যে এবং তাপমাত্রা গভীরতা ভেদে °-° সেন্টিগ্রেড (স্থানভেদে কমবেশি হতে পারে)। মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় ভূত্বকের সাধারণ অবস্থা নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা যায়-

মহাদেশীয় ভূত্বক: এটি সমগ্র ভূমণ্ডলের ০.৩৭৪% এবং এর গভীরতা ৭০ কিলোমিটার (৪৩ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে। অশ্মমন্ডলের উপরাংশের কঠিন ভূত্বক নানাপ্রকার খনিজ ও শিলা দ্বারা গঠিত। এর মধ্যে কোয়ার্টজ (SiO2) ও ফেলসপার (সিলিকেট) প্রধান খনিজ উপাদান।

মহাদেশীয় ভূত্বক যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিবর্তনশীল। জার্মান ভূগোলবিদ আলফ্রেড ওয়েগনারের মতে, মহাদেশগুলো অতীতে একটিমাত্র 'প্যানজিয়া' নামক ভূখণ্ড বা মহাদেশ হিসেবে ছিল যা পরবর্তীতে উষ্ণ গুরুমণ্ডল থেকে সঞ্চায়িত পরিচলন স্রোতের প্রভাবে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমান অবস্থাপ্রাপ্ত হয়েছে। প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব অনুযায়ী, সমগ্র ভূপৃষ্ঠে (মহাসাগরসহ) ৭টি বৃহদাকার প্লেট এবং কমপক্ষে ২০টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লেট আছে যা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসছে।

উপাদান: নানাপ্রকার আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ খনিজ সম্ভার মহাদেশীয় ভূ-ত্বকের প্রধান উপাদান। ভূত্বকের উপরিভাগে রয়েছে অত্যন্ত পাতলা হিউমাস সমৃদ্ধ মৃত্তিকাস্তর যাতে উদ্ভিদরাজি ও প্রাণিকুল বসবাস করছে। এই পাতলা স্তরটির প্রধান প্রধান উপাদান হলো: অক্সিজেন (O )৪২.৮%, সিলিকন (Si) ২৭.৮%, অ্যালুমিনিয়াম (Al) ৮%, লৌহ (Fe) ৫%, ক্যালসিয়াম (Ca) ৩.৭%, সোডিয়াম (Na) ২.৮%, পটাসিয়াম (K) ২.৬%, ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ২.১%, নাইট্রোজেন, জিংক, তামা ও ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে অক্সিজেন (O)
ও সিলিকনের (Si) সাথে অন্যান্য উপাদান মিলে সিলিকেট ও অক্সাইড তৈরি করে যা শিলা হিসেবে আখ্যায়িত।

শিলার স্তর: ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবেগের ওপর নির্ভর করে ভূত্বকের শিলাস্তরকে নিম্নের তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:

১. গ্রানাইট জাতীয় আম্লিক শিলাস্তর: এখানে ভূমিকম্পের P তরঙ্গ প্রতি সেকেন্ডে ৬.২ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত
হয়। অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদান দ্বারা এই স্তরটি গঠিত। তবে এদের মধ্যে সিলিকা (Si) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al) বেশি থাকায় স্তরটি সিয়াল (SiAl) নামে পরিচিত। স্তরটির আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৭-২.৯। গ্রানাইট স্তরে কোয়ার্টজ ও ফেলসপার বেশি থাকায় একে ফেলসিক স্তরও বলা হয়।

২. ব্যাসল্ট জাতীয় ক্ষারকীয় শিলাস্তর: ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবেগ এখানে প্রতি সেকেন্ডে ৭ কিলোমিটার। গ্রানাইট
স্তরের ঠিক নিচে এই শিলাস্তরের আপেক্ষিক গুরুত্ব গড়ে ৩.২। এখানে সিলিকার পরিমাণ গ্রানাইট স্তর অপেক্ষা কম (৪৫%-৫৫% যেখানে গ্রানাইট ৭০%)। অপর প্রধান উপাদান ম্যাগনেসিয়ামও সিলিকার প্রায় সমপরিমাণে (৫৫%-৪৫%) থাকে। প্রধান দুই উপাদানের ভিত্তিতে স্তরটির নামকরণ করা হয়েছে Sima (সিমা)।
কনরাড বিযুক্তি: গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট জাতীয় শিলাস্তরের সীমারেখা কনরাড বিযুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত।

৩. অলিভিন জাতীয় অতিক্ষারকীয় শিলাস্তর: এই শিলাস্তরে P তরঙ্গের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৮ কিলোমিটার হয়। অনেকে একে গুরুমণ্ডলের অংশ বলে থাকেন। কারণ এর অবস্থান 'মোহো' বিযুক্তির পর যেখান থেকে গুরুমণ্ডলের শুরু। তবে এই কঠিন স্তরসহ ভূত্বক অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসছে বিধায় অনেকে একে ভূত্বকের অংশ হিসেবে ধরাকে যুক্তিযুক্ত মনে করেন। মোহো বিযুক্তি হচ্ছে ভূত্বকের ব্যাসল্ট জাতীয় শিলাস্তর ও অলিভিন শিলাস্তরের সীমানা।

মহাসাগরীয় ভূত্বক: এটি সমগ্র ভূমন্ডলের ০.০৯৯%; গভীরতা ০-১০ কি.মি. (০-৬ মাইল)। মহাসাগরীয় ভূত্বকের অধিকাংশ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট। মহাসাগরীয় শৈলশিরাগুলো ৪০,০০০ কিলোমিটার (২৫,০০০ মাইল) বিস্তৃত আগ্নেয় নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে; প্রতিবছর সমুদ্রের তলদেশে ১৭ কিউবিক কিলোমিটার আগ্নেয় (ব্যাসল্ট) ভূত্বক সৃষ্টি হয় যা ক্রমেই উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ (প্রশান্ত মহাসাগর) ও আইসল্যান্ড (উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর) সমুদ্রতল হতে ক্রমোচ্চতাপ্রাপ্ত আগ্নেয়দ্বীপের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মহাসাগরীয় ভূত্বক মূলত থোলেইটিক জাতীয় ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত। এই জাতীয় ব্যাসল্টে কোন অলিভিন মিশ্রিত থাকে না। এটি অত্যন্ত গাঢ় রং এর আগ্নেয় পদার্থ যা তরল লাভা শীতলীকরণের ফলে সৃষ্ট। দানাগুলো এত মিহি যা, শুধু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়। মহাসাগরীয় ভূত্বকের গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩ গ্রাম।

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন (Internal Structure of the Earth)

ভূঅভ্যন্তরের গঠন কাঠামো (Internal Structure) সম্পর্কে জানার জন্য ভূবিজ্ঞানীগণ নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মানুষের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে খুব নগণ্য অংশমাত্র (৬,৩৭১ কি. মি. এর মধ্যে মাত্র ৬ কি. মি.)। তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে জানার জন্য ভূকম্পন তরঙ্গ ধারণকৃত জরিপ, জ্যোতি পদার্থ, ভূচুম্বকত্ব ও ভূবিদ্যুৎ প্রভৃতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে তারা এসব পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে তিন ধরনের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন। এগুলো হলো-

i. পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য এবং ঘনত্ব সম্পর্কিত তথ্য
ii. ভূকম্পন তরঙ্গের গতি প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা এবং
iii. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উদগিরিত লাভার নমুনা পরীক্ষা
তাছাড়া সৌরজগতের গঠন প্রক্রিয়া এবং পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা জ্বলন্ত বাষ্পপিণ্ড থেকে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে কালক্রমে পৃথিবী তরল ও কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। সৃষ্টির এমন প্রক্রিয়ায় ভারি উপাদানসমূহ পৃথিবীর কেন্দ্রে এবং অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদানগুলো উপরের দিকে পর্যায়ক্রমে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হয়েছে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added || updated By

(Landforms of Earth, Location and Formation)

ভূমিরূপ বলতে বোঝায় সৌরজগতের যেকোনো গ্রহ, বিশেষত পৃথিবীর পৃষ্ঠে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কঠিন অবয়বসমূহ (solid feature)। অর্থাৎ ভূমিরূপসমূহ পৃথিবীর বাহ্যিক অবয়ব তৈরি করেছে। অন্যভাবে বলা যায়, পৃথিবীর বাহ্যিক গঠন বলতে বুঝায় উপরিভাগের বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপসমূহ। এদের অবস্থান ও গঠন কাঠামো এক নয়। অর্থাৎ অসমতল ভূপৃষ্ঠের যে আকৃতি ও গঠনগত পার্থক্য রয়েছে তাই ভূমিরূপ, যা পৃথিবীর সর্বত্র সমভাবে বিস্তৃত নয়।

প্রধান ভূমিরূপ: ভূপৃষ্ঠ যে বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি দ্বারা গঠিত তাই ভূমিরূপ। এ সমস্ত ভূপ্রকৃতি কোথাও সুউচ্চ পার্বত্যময়, কোথাও মালভূমি, কোথাও পাহাড়, আবার কোথাও সমতল বা কোথাও এ দুইয়ের মাঝামাঝি। পৃথিবীর শতকরা প্রায় ১৮ ভাগ এলাকা পার্বত্যময়, ২৭ ভাগ এলাকা মালভূমি ও পাহাড়ের আওতায় এবং ৫৫ ভাগ এলাকা সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। কতকগুলো সুউচ্চ পার্বত্যভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মালভূমি ও সমতল ভূমির সৃষ্টি করেছে। আবার নিম্নভূমি ভরাট হয়েও সমভূমি গঠিত হতে পারে। ভূত্বকের উত্থান ও ক্ষয় হতেও বিভিন্ন প্রকার ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ভৌগোলিক দিক দিয়ে বিচার করলে পৃথিবীর প্রধান ভূমিরূপগুলোকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-
১. পর্বত (Mountain),
২. মালভূমি (Plateau) ও
৩. সমভূমি (Plains)।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Physiographic Characteristics of Bangladesh)

ভূপ্রকৃতি যেকোনো দেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বদ্বীপ। দেশটির প্রায় ২০% পাহাড়ি এবং ৮০% এলাকা পলল দ্বারা গঠিত সমভূমি। দেশের উত্তর-পশ্চিম ভাগ প্রাচীন পললযুক্ত সোপান ভূমি এলাকা। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়িয়া অংশ ব্যতীত প্রায় সমগ্র দেশই পলল দ্বারা গঠিত। এদেশের উপর দিয়ে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলীসহ অসংখ্য নদী বয়ে গেছে। দেশের ভূমির স্বাভাবিক ঢাল উত্তর থেকে দক্ষিণে তাই সব নদীই উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে

মিশেছে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি গঠনে এদেশের নদ-নদীগুলোর চিত্র-২.২৪: বাংলাদেশে বিভিন্ন ভূপ্রকৃতির পরিমাপ ভূমিকা ব্যাপক।

ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ: বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র অঞ্চল এক বিস্তীর্ণ সমভূমি। এর সামান্য পরিমাণ উঁচুভূমিও রয়েছে। ভূমির অবস্থা ও গঠন অনুসারে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে নিম্নলিখিত প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ;
২. প্লাইস্টোসিন যুগের চত্বর বা সোপান এলাকা; এবং
৩. নবীন বা সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি।

১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ: বাংলাদেশের মোট ভূমির ১২% এলাকা নিয়ে টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহের
বিস্তৃতি। টারশিয়ারি যুগে সম্ভবত হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সময় এ পাহাড়গুলো গঠিত হয়েছিল। আজ থেকে ৭০ মিলিয়ন বছর আগে টারশিয়ারি যুগে এ পাহাড়গুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এ পাহাড়গুলো আসামের লুসাই ও বার্মার আরাকান পাহাড়ের সমগোত্রীয় বলে মনে করা হয়। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পূর্বাংশ এবং সিলেট জেলার উত্তর-পূর্বাংশ এ অঞ্চলের অন্তর্গত। টারশিয়ারি যুগের পাহাড়গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ; এবং খ. উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ।

ক. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার অংশবিশেষ নিয়ে এ
অঞ্চল গঠিত। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা প্রায় ৬১০ মিটার এবং পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে ক্রমশ উচ্চতা বেড়েছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিন ডং (বিজয়) বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। এর উচ্চতা ১২৩১ মিটার। এখানে ধান, চা, আনারস প্রভৃতি জন্মে। স্থানীয় অধিবাসীগণ জুম পদ্ধতিতে চাষ করে থাকে। পাহাড়ের গায়ে রাবার ও তুলা চাষ হয়। এখানকার বনাঞ্চলে গর্জন, সেগুন প্রভৃতি পর্ণমোচী বৃক্ষ ছাড়াও চাপালিশ, তেলসুর, জারুল, চম্পা, চিকরাশি, নাগার্জুন প্রভৃতি চিরহরিৎ ও মিশ্র বৃক্ষের অরণ্য দেখা যায়। এছাড়া এখানে প্রচুর বাঁশ ও বেত জন্মে। এ অঞ্চলের বাঁশের ওপর ভিত্তি করে কর্ণফুলী কাগজকল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময় দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ জুড়ে এ বনভূমি বিরাজ করলেও বর্তমানে অধিকাংশই উজাড় হয়ে গেছে।

খ. উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ প্রভৃতি জেলার ছোট বড় পাহাড়গুলো নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ পার্বত্য ভূমির উচ্চতা ৬০-৯০ মিটারের বেশি নয়। তবে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাংশে পাহাড়গুলোর উচ্চতা ২৪৪ মিটার। এ অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। পাহাড়ের ঢালে প্রচুর চা উৎপন্ন হয়। তা ছাড়া এখানে বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজ সম্পদে এ অঞ্চল সমৃদ্ধ।

২. প্লাইস্টোসিন যুগের চত্বর বা সোপান এলাকা: বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের সুবিশাল বরেন্দ্রভূমি ও মধ্যভাগের
মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং কুমিল্লা জেলার লালমাই উচ্চভূমি এ অঞ্চলের অন্তর্গত। বাংলাদেশের মোট ভূমির ৮% জুড়ে এ অঞ্চল বিস্তৃত। আজ থেকে পাঁচ লক্ষ বছর পূর্বে বরফ যুগের পরোক্ষ প্রভাবের ফলে সোপান ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়েছিল। প্লাইস্টোসিন যুগের সোপান তিন ভাগে বিভক্ত। যথা- ক. বরেন্দ্রভূমি, খ. মধুপুরের গড় এবং গ. লালমাই পাহাড়।

ক. বরেন্দ্রভূমি: নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে বরেন্দ্রভূমি গঠিত। এর আয়তন প্রায় ৯,৩২০ বর্গ কি. মি.। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ৬-১২ মিটার। বরেন্দ্রভূমির মাটির রং অনেকটা হলুদ থেকে লালচে হলুদ। এ অঞ্চলটি পশ্চিমে মহানন্দা ও পূর্বে করতোয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। গভীর খাত বিশিষ্ট আঁকাবাঁকা ছোট ছোট কয়েকটি স্রোতস্বিনী এ, অঞ্চলে রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে এসব স্রোতস্বিনী খাঁড়ি নামে পরিচিত। অঞ্চলটি কৃষিকাজের জন্য বিশেষ উপযোগী। ধান, পাট, ভুট্টা, 'পান প্রভৃতি ফসল এখানে উৎপাদিত হয়।

খ. মধুপুর ও ভাওয়াল গড়: ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার প্রায় ৪,১০৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এ অঞ্চল বিস্তৃত। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল এলাকাকে মধুপুর গড় এবং ঢাকা ও গাজীপুর জেলার অংশকে ভাওয়াল গড় বলে। এখানে শাল ও গজারি বৃক্ষ ছাড়াও হরীতকী, আমলকী, নাগার্জুন, প্রভৃতি বৃক্ষ জন্মে। তবে গজারি বৃক্ষ সবচেয়ে বেশি জন্মে বলে এটি স্থানীয়ভাবে গজারি বন নামে পরিচিত l

গ. লালমাই পাহাড়: লালমাই পাহাড় কুমিল্লা শহরের ৮ কিলোমিটার (৫ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত। এ অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। এই অঞ্চলের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা ২১ মিটার (৭০ ফুট)। স্থান বিশেষে কোনো কোনো চূড়ার উচ্চতা ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) পর্যন্ত দেখা যায়। এখানকার মাটি লাল এবং নুড়ি, বালি ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। এ পাহাড়ের পাদদেশে আলু, তরমুজ ইত্যাদির চাষ হয়।

৩. নবীন বা সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি: পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা প্রভৃতি নদনদী, অসংখ্য উপনদী ও শাখানদীর বাহিত পলিমাটি দ্বারা প্লাবন সমভূমি অঞ্চল গঠিত। বাংলাদেশের ৮০% ভূমি এ অঞ্চলের অন্তর্গত। নবীন ভূতাত্ত্বিক যুগে অর্থাৎ প্রায় ১০-৪০/৫০ হাজার বছর আগে এ সমভূমি গড়ে উঠেছে। এ সমভূমির গড় উচ্চতা ৩০ ফুটের নিচে। প্লাবন সমভূমিকে ৬টি প্রধান শ্রেণিতে ভাগে করা যায়। নিচে এগুলোর বিবরণ দেয়া হলো-

ক. পাদদেশীয় পলল সমভূমি: বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। তিস্তা, আত্রাই ও করতোয়া প্রভৃতি নদীবাহিত পলি জমা হয়ে এ সমভূমি গঠিত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার।

খ. গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা প্লাবন সমভূমি: এটিই বাংলাদেশের মূল প্লাবন সমভূমি। বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা,
ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এ প্লাবন সমভূমি গঠিত। বর্ষায় এ সমভূমি প্লাবিত হয়। প্রাকৃতিক বাঁধ, পশ্চাৎ ঢাল (back swamp), অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (ox-bow lake), অগভীর জলাভূমি বা বিল, চর (bar) প্রভৃতি এ সমভূমির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

গ. সিলেট অববাহিকা: সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এলাকা এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার পূর্বাংশ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। এ অঞ্চলে বড় ধরনের পাঁচটি হাওর রয়েছে। সুনামগঞ্জের 'টাঙ্গুয়ার হাওর', ছাতকের 'দেখার', জগন্নাথপুরের 'নলোয়ার', ফেঞ্চুগঞ্জের 'হাকালুকি' এবং শ্রীমঙ্গলের 'হাইল' হাওর প্রসিদ্ধ।

ঘ. ত্রিপুরার (কুমিল্লার) সমভূমি: চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার অধিকাংশ এবং লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৩.৬-৬ মিটার। বর্ষাকালে এটি প্লাবিত হয়।

ঙ. বদ্বীপ সমভূমি: বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সমভূমিকে বদ্বীপ সমভূমি বলা হয়। এ অঞ্চলটি পদ্মার শাখা নদীগুলো দ্বারা বিধৌত। এ সমভূমি অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগে করা যায়। যথা- (i) সক্রিয় বদ্বীপ (ii) মৃতপ্রায় বদ্বীপ; এবং (iii) স্রোতজ বদ্বীপ।

i. সক্রিয় বদ্বীপ: পূর্বে মেঘনা হতে পশ্চিমে গড়াই-মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় বদ্বীপ বলা হয়। বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর জেলা এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
ii. মৃতপ্রায় বদ্বীপ: গড়াই মধুমতি নদীর পশ্চিমাংশকে মৃতপ্রায় বদ্বীপ বলা হয়। এটি বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত।
iii. স্রোতজ বদ্বীপ: বাংলাদেশের বদ্বীপ অঞ্চলের দক্ষিণাংশ জোয়ার-ভাটার দ্বারা প্রভাবিত বলে এ অংশকে স্রোতজ বদ্বীপ বলে।

চ. উপকূলীয় সমভূমি: এ সমভূমি ফেনী নদী হতে কক্সবাজারের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি গড়ে প্রায় ৯.৬ কিলোমিটার প্রশস্ত। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এ সমভূমি ২৫ কিলোমিটারের মতো প্রশস্ত। এ এলাকার পতেঙ্গা ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্ববিখ্যাত।

এছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে প্রবাল দ্বীপপুঞ্জ সেন্ট মার্টিন এবং কক্সবাজার সন্নিকটবর্তী মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। মহেশখালী দ্বীপটি ভূমিকম্পের কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Representation of Relief Features with the help of Contour Lines)

সমুদ্র সমতল থেকে সমান উচ্চতাবিশিষ্ট পাশাপাশি অবস্থিত বিভিন্ন স্থান সংযোজক কাল্পনিক রেখাকে সমোন্নতি রেখা বলে। সমতল কাগজের উপর অঙ্কিত মানচিত্রে ভূ-পৃষ্ঠের বন্ধুরতা দেখবার জন্য সমোন্নতি রেখা ব্যবহার করা হয়। সমোন্নতি রেখা সংবলিত মানচিত্র থেকে ভূমির বন্ধুরতা প্রদর্শনের জন্য বন্ধুর ভূমির পার্শ্বচিত্র বা পরিলেখ অঙ্কন করতে হয়।

সমোন্নতি রেখা থেকে পার্শ্বচিত্র বা পরিলেখ অঙ্কন পদ্ধতি: যে কাগজে সমোন্নতি রেখার চিত্র অংকন করা হয়েছে তার
নীচের দিকে সমব্যবধানে 'কখ'-এর সমান প্রয়োজনানুযায়ী কতিপয় সরলরেখা অঙ্কন করে এদের উচ্চতা (১০০, ২০০ ফুট প্রভৃতি) পার্শ্বে লিখতে হবে। অতঃপর 'কখ' রেখাকে সমোন্নতি রেখাগুলো যে বিন্দুতে ছেদ করেছে সেই বিন্দুগুলো থেকে সমকোণে নীচের দিকে রেখা বর্ধিত করে উচ্চতানুসারে বিভিন্ন রেখায় মিলিত করতে হবে। এখন উলম্ব ব্যবধানের স্কেল অনুযায়ী প্রত্যেক লম্ব থেকে সেই সব স্থানের সমোন্নতির পরিমাণ কেটে নিয়ে ঐ লম্বগুলোর শীর্ষবিন্দুগুলো যোগ করে যে বক্ররেখাটি পাওয়া যাবে এটিই ঐ স্থানের প্রস্থচ্ছেদ।

প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করার সময় স্কেলের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। অনুভূমিক পরিমাণ মানচিত্রের স্কেল অনুযায়ী হবে এবং উলম্ব স্কেলও ঐ মাপে হবে। অবশ্য উলম্ব স্কেলকে প্রয়োজনবোধে সামঞ্জস্য রেখে ছোট বড় করা যায়।

(ক) চিত্রের 'কখ' রেখার সমান করে (খ) চিত্রে 'কখ' রেখা টানা হলো এবং এটি সমোচ্চতা রেখাসমূহ ও নদীকে যেসব বিন্দুতে ছেদ করেছে তাও নিচের চিত্রের 'কখ' রেখায় সংস্থাপন করা হলো।
ভূমিস্থ ছেদ বিন্দুগুলো হতে সেগুলোর উচ্চতায় অনুভূমিক রেখা পর্যন্ত লম্ব টানা হলো। এসব উলম্ব রেখা সেগুলোর উচ্চতাবোধক অনুভূমিক রেখাসমূহকে যেসব বিন্দুতে ছেদ করে সেগুলোকে একটি রেখা দ্বারা যুক্ত করলে পরিলেখ পাওয়া যায়।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Layers of Earth Interior)

ভূকম্পন তরঙ্গ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, ভূপৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্রের দিকে পৃথিবীর তাপ, চাপ এবং গঠন উপাদানসমূহের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা ভূঅভ্যন্তরকে ৩টি মণ্ডলে বা স্তরে বিভক্ত করেছেন। যথা-

১. অশ্মমণ্ডল: গোলাকার পৃথিবীর একেবারে বাইরের অংশকে বলা হয় অশ্মমণ্ডল। এর গভীরতা ৭০ কি.মি. পর্যন্ত, ঘনত্ব ২.৯ কি.গ্রা/ঘনমিটার এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১০০০° সেঃ। সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম এর প্রধান উপাদান। প্রকৃতপক্ষে এটা ভূমন্ডলের খাড়া অংশ যা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এর বহিরাবরণকে বলা হয় ভূত্বক।

২. গুরুমণ্ডল: ভূত্বকের নিচ থেকে কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃভাগ পর্যন্ত গুরুমণ্ডল বিস্তৃত। এ মন্ডল গঠনকারী উপাদানগুলোর মধ্যে সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়ামের প্রাধান্য থাকায় ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী অস্ট্রিয়ান ভূবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড সুয়েস (১৮৩১-১৯১৪) একে 'সিমা' (SiMa) নামে অভিহিত করেন। আবার ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ ড. হ্যারল্ড জেফরিজ উপরের ক্ষারকীয় অংশটিকে মধ্যস্তর এবং নিচের অতি ক্ষারকীয় অংশটিকে নিম্নস্তর নামে আখ্যায়িত করেন।
গুরুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য: ভূবিজ্ঞানীদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ মন্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-এ স্তরের গভীরতা ১৫ কি. মি. থেকে ২৯০০ কি. মি. পর্যন্ত। এ স্তরটি প্রায় ২,৮৮৫ কি. মি. পুরু। এর ঊর্ধ্বাংশের শিলা কঠিন ও ভঙ্গুর যা ১০০ কি মি পর্যন্ত বিস্তৃত। গুরুমণ্ডলের উপরের অংশ প্রধানত ব্যাসল্ট জাতীয় পদার্থ দ্বারা গঠিত। তবে এ স্তরটি সিলিকন (Si), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), লোহা (Fe), কার্বন (C) প্রভৃতি উপাদানে গঠিত। এগুলোর মধ্যে প্রধান উপাদান সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৮২.২৫ শতাংশ দখল করে আছে এবং এর ওজন পৃথিবীর মোট ওজনের শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ। এ স্তরের ঘনত্ব ৪.৩ থেকে ১০ কি.গ্রা/ঘনমিটার।

এই স্তরের ১০০ কি. মি. গভীরতায় ১১০০° সেলসিয়াস, ৭০০ কি. মি. গভীরতায় ১৯০০° সেলসিয়াস এবং কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃসীমানায় ৩০০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হয়। এ স্তরের নিচের দিকে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ১৪০০ টন চাপ রয়েছে। তবে এ স্তরের উপরের অংশের চাপ ২৬০ কি. গ্রা. এবং গড় চাপ ৮৮৫ কি. গ্রা.। এ স্তরে P তরঙ্গের গতিবেগ ৬.৯-১০.৭ কি. মি./সে.।

ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলের মাঝে একটি পাতলা স্তর রয়েছে যাকে মোহোবিচ্ছেদ বলা হয়। গুরুমণ্ডলটি যথেষ্ট উত্তপ্ত হলেও প্রচণ্ড চাপের প্রভাবে এ স্তরের উপাদানগুলো কঠিন ও চটচটে বা অর্ধতরল অবস্থায় রয়েছে। ভূত্বকের নিচে গুরুমণ্ডলের এরূপ অর্ধতরল স্তর নমনীয়মণ্ডল নামে পরিচিত, যা সাধারণত ৩০০ কি.মি. গভীরতায় দেখা যায়। গঠন উপাদানের গুরুত্বের তারতম্য অনুসারে এ মণ্ডলকে দুটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

ক. বহিঃগুরুমণ্ডল: এ স্তরটি ১০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ক্রোমিয়াম, লোহা, সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা গঠিত বলে একে ক্রোফেসিমা (Cr-Fe-Si-Ma) বলা হয়। এ স্তরেই নমনীয় মণ্ডল (asthenosphere) অবস্থিত।

খ. অন্তঃগুরুমণ্ডল: এ স্তরটি ৭০০ কি. মি. থেকে ২,৯০০ কি. মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। নিকেল (Ni), লোহা (Fe), সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দ্বারা গঠিত বলে একে নিফেসিমা (Ni-Fe-Si-Ma) বলা হয়।

৩. কেন্দ্রমণ্ডল: ভূকম্পন তরঙ্গ এবং অন্যান্য তথ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভূবিজ্ঞানীগণ কেন্দ্রমণ্ডলের বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। তাদের মতে, এ মণ্ডলটি গুরুমণ্ডল (২,৮৮৫ কি. মি.) থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র (৬,৩৭১ কি. মি.) পর্যন্ত বিস্তৃত। এ মণ্ডলের গঠন উপাদানের মধ্যে নিকেল (Ni) এবং লোহা (Fe) প্রধান বলে ভূবিজ্ঞানী সুয়েস এর নাম দেন 'নিফে' (NiFe)। আবার ইংল্যান্ডের ভূবিদ আর্থার হোমস (১৮৯০-১৯৬৫) একে 'অন্তঃস্থল' নামে অভিহিত করেন।

কেন্দ্রমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য: ভূবিদগণ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রমণ্ডলের যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন তা নিচে দেওয়া হলো- এ স্তরটি গুরুমণ্ডলের নিচে অবস্থিত। অর্থাৎ ২,৮৮৫ থেকে ৬,৩৭১ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা (গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের সংযোগস্থলকে গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা বলে) থেকে এর গভীরতা ৩,৪৮৬ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীদের ধারণা এ মন্ডলটি লৌহ, নিকেল, পারদ, সীসা প্রভৃতি কঠিন ও ভারী পদার্থ দ্বারা গঠিত। এ মণ্ডলটি পৃথিবীর মোট আয়তনের শতকরা প্রায় ১৬.২ ভাগ স্থান দখল করলেও এর ওজন পৃথিবীর মোট ওজনের শতকরা ৩১.৫ ভাগ। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ। এই স্তরের ঘনত্ব ১১.৮-১৩.৬ কি.গ্রা/ঘনমিটার। এ স্তরের বহিঃকেন্দ্র তরল ও চটচটে আঠালো অবস্থায় রয়েছে বলে S তরঙ্গ (transverse wave) প্রবেশ করতে পারে না। কারণ S তরঙ্গ তরল পদার্থের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে না। P তরঙ্গের (longitudinal wave) গতিবেগ বহিঃকেন্দ্রে ১০.৩ কি.মি./সে. থাকলেও অন্তঃকেন্দ্রে এ গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে ১১.২ কি.মি./সে. পর্যন্ত হয়।

কেন্দ্রমণ্ডলের শুরুতে তাপমাত্রা ৩০০০° সেলসিয়াস এবং অন্তঃকেন্দ্রে এ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ৫০০০০ সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ভূপৃষ্ঠের তুলনায় কেন্দ্রমণ্ডলের চাপ অনেক বেশি। গড় চাপ ৩,৬৮০ কিলোবার। উপরের অংশে ৩৩৪০ কিলোবার এবং নিচের অংশে প্রায় ৩৭০০ কিলোবার। এ প্রবল চাপের কারণে কেন্দ্রমণ্ডলের ভিতরের উপাদানগুলো কঠিন অবস্থায় রয়েছে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Geologic Components of Earth Interior)

আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ভূঅভ্যন্তরকে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা যায়:
১. ভূত্বকঃ মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় ভূত্বক;
২. মোহরোভিসিক বিচ্ছিন্নতা: অশ্মমণ্ডল এবং গুরুমণ্ডলের সীমানা;
৩. ম্যান্টেল বা গুরুমণ্ডল: চারটি স্তরে বিভক্ত; যথা-

i. ঊর্ধ্বগুরুমণ্ডল (ঠান্ডা এবং স্থির)
ii. অ্যাসথেনোস্ফিয়ার (উষ্ণ এবং আংশিক গলিত) গড় পুরুত্ব ১৫০ কি. মি.
iii. মেসোস্ফিয়ার (মধ্য গুরুমণ্ডল বা গভীর ম্যান্টেল বা অন্তবর্তী অঞ্চল) এবং
iv. নিম্ন গুরুমণ্ডল

৪. "ডি" স্তর: এটি সবচেয়ে গতিশীল এবং সক্রিয় এলাকা; অত্যন্ত পাতলা এবং পুরুত্ব পরিবর্তনশীল
৫. কেন্দ্রমণ্ডল: কেন্দ্রমণ্ডল দুটি অংশে বিভক্ত। যথা-
i. তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল এবং
ii. কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল
সারণি-২.১: ভূঅভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক স্তরসমূহের সাধারণ চিত্র

স্তরগভীরতা (কি.মি.)ঘনত্বআপেক্ষিক গুরুত্বতাপমাত্রাচাপ (কি.বা.)উপাদান
ভূত্বক ও অশ্মমণ্ডল০-৩৫ ও ০-৬০ স্থিতিস্থাপক পার্থক্য আছে২.২-২.৯২-৩° অক্সাইড ও সিলিকেট
মোহোপরিবর্তনশীল
ঊর্ধ্বগুরুমণ্ডল<১৭০০ কি.মি.৩.৪-৪৪৩.৭°-°২৬০পেরিভসকাইট, পেরিডোরাইট অলিভিন, গানেট, স্পাইনেল, পাইরক্সিন
নিম্ন গুরুমণ্ডল৭০০-২৯০০৪.৪-৫.৬৫.৮°-°৩৮২ম্যাগনেসিয়াম ও সিলিকন
'ডি'স্তর২৭০০-২৮৯০__ পেরিভসকাইট
বহিঃকেন্দ্র মণ্ডল২৮৯০-৫১৫০৯.৯-১২.২১০°+৩৩৪০তরল লৌহ, নিকেল ও সালফার
আন্তঃকেন্দ্র মণ্ডল৫১৫০-৬৩৭১১২.৮-১৩.১১০-১৩.৬°৩৭০০কার্বন, লৌহ, নিকেল ও সালফার

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Mountain)

ভূপৃষ্ঠের অতি উচ্চ, সুবিস্তৃত এবং খাড়া ঢালবিশিষ্ট শিলাস্তূপকে পর্বত বলে। পর্বত সাধারণত ২০০০ ফুট বা ৬০০ মিটারের অধিক উচ্চ হয়। পর্বত হচ্ছে ভূমির সবচেয়ে উঁচু শিলাস্তর। গঠন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে এই পর্বতকে আবার বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তন্মধ্যে প্রধান প্রধান পর্বতগুলো নিম্নরূপ-

১. ভঙ্গিল বা ভাঁজ পর্বত (Fold mountain): ভঙ্গিল পর্বতেরগঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। প্রকৃতপক্ষে গিরিজনি আলোড়নের ফলে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। ভূঅভ্যন্তরের উত্তপ্ত ও গলিত পদার্থসমূহ প্রতিনিয়ত শীতল ও সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু ভূত্বক অনেক আগেই শীতল ও কঠিন হয়ে আছে। ফলে এ (শীতল ও কঠিন) ভূত্বক ভূঅভ্যন্তরের সাথে সমানতালে সংকুচিত হতে না পারায় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের

শিলাসমূহের মধ্যে চাপের পার্থক্য হয় এবং ভূত্বকের কোনো কোনো স্থানে ভাঁজের সৃষ্টি হয়। এ ভাঁজের উচ্চ অংশই ভঙ্গিল বা ভাঁজ পর্বত নামে পরিচিত। ভূবিজ্ঞানী ওয়েগনার তার মহীসঞ্চারণ মতবাদে বলেছেন, ভূভাগের স্থান 'পরিবর্তনের ফলেই তাদের প্রান্তভাগের অংশবিশেষে ভাঁজের অর্থাৎ ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। যথা- রকি ও আন্দিজ পর্বত। কোনো বৃহৎ জলরাশির অববাহিকায় পলি এসে জমা হলে এ অববাহিকা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হতে দুর্বল হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ চাপ, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চাপ এবং ভূআন্দোলনের ফলে অববাহিকার তলানীসমূহ কুঁচকে গিয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত পর্বতশ্রেণি এই ধরনের ভঙ্গিল পর্বত। যেমন- এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের আল্লস, উত্তর আমেরিকার রকি, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ।

পর্বত উৎপত্তির কারণ কী?

আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, সুদূর অতীতে পৃথিবী পৃষ্ঠে একটি মাত্র বিশাল ভূখণ্ড ছিল। ওয়েগনার এ স্থলভাগকে প্যানজিয়া (Pangea) নামে অভিহিত করেন। পরবর্তীতে প্যানজিয়া খন্ড খন্ড হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। মহাদেশীয় সঞ্চারণ হয়েছিল দু'দিকে- নিরক্ষরেখার দিকে ও পশ্চিম দিকে। নিরক্ষরেখার দিকে সঞ্চারণের ফল হিসাবে আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া নিকটতর হয় এবং উভয়ের মধ্যবর্তী টেথিস সাগরের সঞ্চয়গুলি উত্থিত হয়ে হিমালয়, আল্লস, ককেশাস, হিন্দুকুশ, কুয়েনলুন, পীরেনীজ এবং জাগারাজ প্রভৃতি ভাঁজ পর্বতগুলো সৃষ্টি হয়। এছাড়া অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সুউচ্চ আগ্নেয় পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে।

২. চ্যুতি-স্তূপ পর্বত (Fault-block mountain): ভূআন্দোলনে বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে ভূত্বক কখনও কখনও খাড়াভাবে ফেটে যায় বা চ্যুতির সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে আরও একটি ভূআন্দোলনের ফলে দুটি চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী স্থান ঊর্ধ্বচাপে উত্থিত হলে অথবা দুটি চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী স্থান যথাস্থানে থেকে উভয়পার্শ্বের ভূভাগ অবনত হলে মধ্যবর্তী অংশ পর্বতের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে গঠিত পর্বতকে স্তূপ পর্বত বলে। ভারতের বিন্ধ্য, জার্মানির ব্ল‍্যাকফরেস্ট, ফ্রান্সের ভোজ, পাঞ্জাবের লবণ পবর্ত এ ধরনের পর্বতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৩. ল্যাকোলিথ পর্বত (Laccolith mountain): ভূগর্ভস্থ গলিত ম্যাগমা ভূআন্দোলন বা অন্য কোনো নৈসর্গিক কারণে ভূত্বকের দুর্বল অংশ দিয়ে প্রবল বেগে ভূপৃষ্ঠে বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু প্রায়ই তা ওপরে আসার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ভূত্বকের নিচেই সঞ্চিত হয় এবং ঊর্ধ্ব চাপের কারণে ওপরের শিলাস্তর স্ফীত হয়ে গম্বুজ আকার ধারণ করে। জমাট ম্যাগমা দ্বারা গঠিত এরূপ পর্বতকে গম্বুজ বা ল্যাকোলিথ পর্বত বলে। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি পর্বত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৪. ক্ষয়জাত পর্বত (Residual mountain): ভূত্বক নানা প্রকার কঠিন ও নরম শিলা দ্বারা গঠিত। অনুরূপভাবে ভঙ্গিল পর্বতসমূহও নানা প্রকার নরম ও কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত। কালক্রমে এর নরম শিলাসমূহ যান্ত্রিক উপায়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় কিন্তু কঠিন শিলাসমূহ পূর্বাবস্থায়ই থেকে যায়। অর্থাৎ উচ্চ পর্বতটি ক্ষয় হয়ে একটি নিচু পর্বতে পরিণত হয়। এ জন্য একে ক্ষয়জাত পর্বত বলে। যেমন-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল‍্যাকহিলস, কলোরাডোর ফ্রন্টরেঞ্জ এবং বিগহর্ন এ পর্বতের উদাহরণ।

৫. আগ্নেয় পর্বত (Volcanic mountain): ভূত্বকের ফাটল বা ছিদ্র পথের মাধ্যমে ভূঅভ্যন্তরে গলিত লাভা, ধূম, ভস্ম প্রবল বেগে ভূপৃষ্ঠে এসে উপনীত হয় এবং ফাটল বা ছিদ্রপথের চারদিকে সঞ্চিত হয়ে পর্বত গঠন করে। একে আগ্নেয় বা সঞ্চয়জাত পর্বত বলে। মূলতঃ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে এ পর্বতের সৃষ্টি হয় বলে একে আগ্নেয় পর্বত বলে। জাপানের ফুজিয়ামা, ইতালির ভিসুভিয়াস, হাওয়াই দ্বীপের মৌনলোয়া এ পর্বতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Plains)

প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ সমতল ভূভাগকে সমভূমি বলা হয়। এটি সাধারণত সমুদ্র সমতলের চেয়ে সামান্য উঁচু হয় তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েকশ মিটার উঁচুও হয়ে থাকে। যেমন: কানাডার দক্ষিণ আলবার্টা। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে সমভূমি এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০% এরও বেশি লোক সমভূমি অঞ্চলে বাস করে।

সমভূমির বৈশিষ্ট্য: সমভূমির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন: এটি কখনও খাড়া ঢালবিশিষ্ট হয় না; অবস্থানের দিক থেকে কোনো বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না; যেমন: কোনো কোনো সমভূমি মহাদেশের সীমান্তে মহাসাগরের তীরে (গাজোয় সমভূমি) অবস্থিত; আবার কোনো কোনো সমভূমি (তুর্কিস্তানের সমভূমি) মহাদেশীয় ভূভাগের একেবারে অভ্যন্তরে অবস্থিত।
সমভূমির শ্রেণিবিন্যাস ও বিবরণসমভূমি প্রধানত তিন প্রকার। যথা-

১. সঞ্চয়জাত সমভূমি (Depositional plains);
২. ক্ষয়জাত সমভূমি (Residual plains); এবং
৩. ভূআন্দোলনের ফলে গঠিত সমভূমি (Tectonic plains)।

১. সঞ্চয়জাত সমভূমি: নদী, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি শক্তি দ্বারা ক্ষয়ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি কোনো নিম্নভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত হয়ে সঞ্চয়জাত সমভূমির সৃষ্টি করে। আবার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উৎক্ষিপ্ত লাভা ও ভস্ম কোনো নিম্নভূমিতে সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকেও সঞ্চয়জাত সমভূমি বলে। সঞ্চয়জাত সমভূমিকে আবার নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

ক. পলল পাখা: পর্বত বা পাহাড়ের পাদদেশে বা নিম্ন ঢালে নদী দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে পাখা সদৃশ যে ভূভাগ গড়ে তোলে তাকে পলল পাখা (alluvial fan) বলা হয়। যেমন- ভারতের উত্তর প্রদেশের তরাই অঞ্চল।

খ. প্লাবন সমভূমি: নদীর উভয় তীরে বন্যার পানির দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে প্লাবন সমভূমি বলে। যেমন- যমুনার প্লাবন সমভূমি।

গ. বদ্বীপ (Delta): নদী মোহনায় পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তা মাত্রাহীন বাংলা 'Δ' বা গ্রীক (ডেন্টা) অক্ষরের ন্যায় বলে একে বদ্বীপ সমভূমি বলে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, নীল, মিসিসিপি প্রভৃতি নদীর মোহনায় বদ্বীপ সমভূমি রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত গাঙ্গেয় অঞ্চল বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ।

ঘ. লোয়েস সমভূমি: বায়ু দ্বারা বাহিত ধূলিকণা নির্দিষ্ট স্থানে সঞ্চিত হওয়ার ফলে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে লোয়েস সমভূমি বলে। যেমন- চীনের হোয়াংহো অববাহিকায় গঠিত লোয়েস সমভূমি।

৫. হ্রদ সমভূমি: নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি কোনো হ্রদে পতিত হলে কালক্রমে উক্ত হ্রদ ভরাট হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে হ্রদ সমভূমি বলে। যেমন- আমেরিকার ইরি হ্রদের দক্ষিণ তীরবর্তী সমভূমি।

চ. লাভা সমভূমি: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের লাভা সঞ্চয়ের ফলে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে লাভা সমভূমি বলে। ভারতের দাক্ষিণাত্যের উত্তরাংশের কিছু অংশ এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

ছ. হিমবাহ সমভূমি: হিমবাহ স্থলভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় যখন সম্পূর্ণভাবে গলে যায় তখন বাহিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয়, তাকে হিমবাহ সমভূমি বলে। কানাডা ও ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে অনেক হিমবাহ সমভূমি দেখা যায়। যেমন- উত্তর আমেরিকার প্রেইরি সমভূমি

জ. পর্বত পাদদেশীয় সমভূমি: প্রাথমিক পর্যায়েচ বাহিত নুড়ি, কাকর, বালি প্রভৃতি নদী দ্বারা অবক্ষেপণের ফলে পর্বতের পাদদেশে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে পর্বত পাদদেশীয় সমভূমি বলে। যেমন- রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ এলাকাই পাদদেশীয় সমভূমির অন্তর্ভুক্ত।

২. ক্ষয়জাত সমভূমি: রোদ, বৃষ্টি, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির কারণে কোনো উচ্চভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকে ক্ষয়জাত সমভূমি বলে। এরূপ সমভূমিকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. সমপ্রায় ভূমি নদীর ক্ষয়কাজের ফলে উচ্চভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্রমশ সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়। যেমন-ফিনল্যান্ড।.

.

খ. পেনিপ্লেন: শুষ্ক ও শুষ্কপ্রায় এলাকাগুলোতে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবনের ফলে পাহাড়ের ঢালগুলো ক্ষয়ীভূত হয়ে স্বাভাবিক ঢালবিশিষ্ট যে ভূভাগ সৃষ্টি করে তাকে পেনিপ্লেন বলে। উদাহরণ: কানাডার Belcher Inlands.

গ. মরু সমভূমি: মরু অঞ্চলের বায়ু বালুকারাশি উড়িয়ে নিয়ে যে প্রস্তরময় সমপ্রায় ভূমির সৃষ্টি করে তাকে মরু সমভূমি বলে। যেমন- সাহারার হামাদা, লিবিয়ার মেরি, আলজেরিয়ার রেগ।

ঘ. হিমবাহ ক্ষয়জাত সমভূমি: পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ঘর্ষণে অসমতল ভূভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন সমতল ভূভাগে পরিণত হয়। যেমন- কানাডার শিল্ড এ জাতীয় সমভূমি।

৬. নদীর ক্ষয়জাত সমভূমি: পানি স্রোতের ক্ষয়কাজের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষয়িত সমভূমি গঠিত হয়।
উদাহরণ: ক্যালিফোর্নিয়ার রেড রক ক্যানিয়ন।

৩. ভূআলোড়নজাত সমভূমি: ভূআলোড়নের প্রভাবে ভূত্বকের দুর্বল স্থানে, বিশেষ করে মহাদেশীয় প্রান্তভাগ, মহীসোপান কিংবা মহীঢাল উত্থিত হয়ে এবং মহাদেশের অভ্যন্তরে নিচু ভূমি উত্থিত হয়ে সমভূমি গঠন করে। নিম্নলিখিত ভূমিরূপগুলো ভূআলোড়নের প্রভাবে উৎপত্তি লাভ করেছে।

ক. উন্নত সমভূমি: ভূমিকম্পের ফলে ভূপৃষ্ঠের নিম্নভূমি উঁচু হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকে উন্নত সমভূমি * বলে। যেমন- ইউরেশিয়ার স্টেপ অঞ্চল এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

খ. অবনত সমভূমি: ভূমিকম্পের ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো উঁচু স্থান বসে গিয়ে যে নিম্নভূমির সৃষ্টি করে তাকে অবনত সমভূমি বলে। যেমন- তুরানের নিম্নসমভূমি।

গ. ভূগাঠনিক সমভূমি: যেখানে ভূত্বকের শিলাস্তর প্রায় সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত, প্রাকৃতিক কারণেই সেখানে সমভূমি গঠিত হয়। যেমন- সোভিয়েত ইউনিয়নের উচ্চভূমি।

ঘ. উপকূলীয় সমভূমি বা সৈকত সমভূমি: ভূগর্ভের উচ্চ চাপের ফলে সৃষ্ট ভূআলোড়নের প্রভাবে মহীসোপান বা মহীঢাল ধীরে ধীরে উত্থিত হয়ে সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় সৈকত সমভূমির সৃষ্টি করে। যেমন- ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার সৈকত সমভূমি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Plateau)

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচু (প্রায় ৫০০ ফুট) বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিকে মালভূমি বলে। এ ধরনের ভূমিরূপ স্থলভাগের প্রায় ৩ শতাংশ এলাকা দখল করে আছে। এর উপরিভাগ প্রায় সমতল, বন্ধুর, তরঙ্গায়িত অথবা নদী বা হিমবাহ দ্বারা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। ভূঅভ্যন্তরস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে মালভূমি সৃষ্টি হয়ে থাকে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মালভূমির উচ্চতা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মিটার হতে পারে। ভারতের দাক্ষিণাত্য ও তিব্বতের পামির মালভূমি এর উদাহরণ।

বৈশিষ্ট্য: আমরা মালভূমির যে বৈশিষ্ট্যাবলি দেখতে পাই-
(i) এটা বিস্তীর্ণ উচ্চভূমি; (ii) এর উপরিভাগ প্রায় সমতল; (iii) এটা চারদিক হতে খাড়াভাবে নিম্নভূমিতে নেমে যায়
এবং (iv) এর উচ্চতা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
মালভূমি গঠনের প্রক্রিয়াসমূহ: মালভূমি গঠনের সাথে নিম্নলিখিত প্রক্রিয়াসমূহ জড়িত। যথা:

ক. ভূআলোড়ন: পর্বত গঠনের সময় ভূআলোড়নের ফলে বিস্তীর্ণ ভূভাগ উঁচু হয়ে মালভূমির সৃষ্টি করে। যেমন-স্পেনের মেসেটা মালভূমি।

খ. ভূপৃষ্ঠের ক্ষয় প্রক্রিয়া: উঁচু ভূভাগ প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মালভূমিতে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাম্বারল্যান্ড, কলোরাডো এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

গ. লাভা সঞ্চয়ের মাধ্যমে গঠিত: মহাদেশীয় উঁচু ভূমিতে লাভা সঞ্চিত হয়ে মালভূমি গঠিত হয়ে থাকে। যেমন-ভারতের দাক্ষিণাত্য।

মালভূমির শ্রেণিবিন্যাস

প্রায় একই ধরনের মালভূমিকে বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন নামে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকে। যেমন- পামির একদিকে ভূআলোড়নজনিত, অপরদিকে পর্বতবেষ্টিত মালভূমি। নিচে মালভূমির একটি সাধারণ শ্রেণিবিন্যাস আলোচনা করা
হলো

১. মহাদেশীয় শিল্ডস (Shield): বিস্তৃত এলাকাব্যাপী প্রাচীন শিলাস্তূপ বিচূর্ণীভবন ও নগ্নীভবনের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এ ধরনের মালভূমি গঠন করে। মূলত উপরের শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এসব শিল্ড উন্মুক্ত হয়।
উদাহরণ: কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার শিল্ড।

২. চ্যুতিবিশিষ্ট মালভূমি: বিস্তৃত এলাকা কোনো চ্যুতি বরাবর অসমানভাবে উপরে উঠে গেলে এ ধরনের মালভূমির সৃষ্টি হয়। যেমন- স্পেনের মেসেটা মালভূমি, ভারতের মধ্য প্রদেশের মালভূমি ইত্যাদি।
ভূপৃষ্ঠের বাহির ও অভ্যন্তর ভাগে ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করলে এবং ভূআলোড়নজনিত শক্তি ক্রিয়াশীল থাকলে প্রথমে চ্যুতির সৃষ্টি হয় এবং পরে একটি অংশ অসমানভাবে উপরে উঠে যায়। এ মালভূমি খাড়াভাবে উপরে উঠে যায় বিধায় খাড়া ঢালবিশিষ্ট হয়। এর উপরিভাগ অসমান হতে পারে। এ ধরনের মালভূমির প্রান্তে পর্বতের অবস্থান দেখা যায়।

৩. পর্বতমধ্যবর্তী মালভূমি: ভঙ্গিল পর্বত গঠিত হওয়ার সময় সংকোচনজনিত চাপের কারণে পর্বতসমূহের মাঝখানের
নিম্নভূমি উঁচু হয়ে যে মালভূমি গঠিত হয় তাকে পর্বতমধ্যবর্তী মালভূমি বলে। যেমন- তিব্বতের মালভূমি। তিব্বতের মালভূমির উত্তরে কুনলুন এবং দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালার অবস্থান। সংকোচনজনিত চাপের ফলে অথবা পাত সঞ্চালন ও ভূআলোড়নের সময় ভাঁজ পর্বতের মাঝখানে এ ধরনের মালভূমি গঠিত হয়।

৪. ক্ষয়জাত মালভূমি: প্রাচীন উঁচু ভূমিসমূহের উপরিভাগ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন- তাপমাত্রা, তুষারপাত, বৃষ্টিপাত, পানি, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে মালভূমি সৃষ্টি হয় তাকে ক্ষয়জাত মালভূমি বলে। যেমন-যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো।

৫. আগ্নেয়জাত মালভূমি: আগ্নেয়গিরি থেকে উদগিরিত লাভা সঞ্চিত হয়ে যে মালভূমি গঠিত হয় তাকে আগ্নেয়জাত মালভূমি বলা হয়। যেমন: ইন্দোনেশিয়া জাভা মালভূমি।

উল্লিখিত কয়েকটি শ্রেণি ছাড়াও তির্যক (ব্রাজিল), পাদদেশীয় (যেমন: দক্ষিণ আমেরিকার পাতগোনিয়া), ব্যবচ্ছিন্ন (যেমন: ভারতের কর্নাটক) এবং উন্নীত (যেমন: তিব্বত) মালভূমিও রয়েছে। মালভূমির উপরিতলে কোথাও কোথাও কৃষিকাজ হয়ে থাকে (যেমন: । তবে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রতিকূল জলবায়ুর কারণে এ অঞ্চলে জনবসতি কম।
কেনিয়া

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

(Landform from Contours)

পর্বত (Mountain): সমুদ্রতল থেকে অন্তত ১০০০ মিটারের বেশি উঁচু সুবিস্তৃত ও খাড়া ঢালবিশিষ্ট শিলাস্তূপকে পর্বত বলে। পর্বতের সমোন্নতি রেখাগুলোর মান ক্রমশ ভিতর দিকে বর্ধিত হয়। চিত্রে সমোন্নতি রেখার প্রকৃতি দেখে পর্বতটি কিরূপ অর্থাৎ এটি দীর্ঘ সংকীর্ণ, বিস্তৃত প্রশস্ত বা সমতল শীর্ষবিশিষ্ট কি না তা বুঝতে পারা যায়।

শাঙ্কব আকৃতির পাহাড় (Conical hill): চারিদিক থেকে ভূমি প্রায় সমান হারে উঁচু হয়ে উঠে যে পাহাড়ের সৃষ্টি করে
তাকে শাঙ্কব আকৃতির পাহাড় বলে। যদি ঢাল সব দিকে সমান হয় তবে সমোন্নতি রেখাগুলো বৃত্তাকার হবে। এইরূপ বৃত্তাকার সমোন্নতি রেখাগুলোর কেন্দ্রে যদি একটি বিন্দু থাকে ও এর উচ্চতা লেখা থাকে তা হলে পাহাড়ের চূড়া শাঙ্কব আকৃতির হয়।

আগ্নেয়গিরি (Volcano): ভূপৃষ্ঠের কোনো দুর্বল অংশ দিয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ উত্তপ্ত গলিত পদার্থ নির্গত ও তা সঞ্চিত হয়ে যে পাহাড়ের সৃষ্টি করে তাকে আগ্নেয়গিরি বলে। সাধারণ শাঙ্কব আকৃতির পাহাড় থেকে এর পার্থক্য এই যে, আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রস্থলে একটি গহ্বর বা মুখ থাকে, এই মুখ জ্বালামুখ নামে পরিচিত। শাঙ্কব আকৃতির আগ্নেয়গিরির সমোন্নতি রেখা অঙ্কন করার সময় সাবলীল হাতে একটির মধ্যে অন্য বৃত্তগুলো অঙ্কন করতে হয়। মধ্যস্থলে জ্বালামুখের অবস্থান দেখাবার জন্য মধ্যের বৃত্তটির পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে কতিপয় রেখা অঙ্কন করতে হয়, অবশ্য এই রেখাগুলো পরস্পর মিলিত হবে না।

দুই শৃঙ্গবিশিষ্ট পাহাড় (Double peak hill): এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কয়েকটি সমোন্নতি রেখা বৃত্তাকারে অবস্থিত
হলে এবং তারপর এর দুই অংশে স্বতন্ত্রভাবে রেখা অঙ্কিত থাকলে বুঝতে হবে যে, এক বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলের ঐ স্থানে দুইটি শৃঙ্গ রয়েছে। দুই শৃঙ্গবিশিষ্ট এইরূপ বৃহৎ পাহাড়কে ম্যাসিফ (Massif) নামেও অভিহিত করা হয়। যেমন- হিমালয়ে K-2 শৃঙ্গ।

মালভূমি (Plateau): মালভূমি বলতে সাধারণভাবে উন্নত সমতলভূমিকে বোঝানো হয়। এর পার্শ্বদেশ অত্যন্ত খাড়া এবং বিভিন্ন নদী দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত। অনেক সময় বিভিন্ন নদী দ্বারা মালভূমি ব্যবচ্ছেদিত হয়। পার্শ্বের চিত্রের পশ্চিম সীমা কিছু অংশ সামান্য উঁচু হয়ে যাবার পর বহুদূর পর্যন্ত প্রায় সমতল, কিন্তু তা পূর্ব সীমায় আবার নিচু হয়েছে। এইরূপ ভূমিরূপকে মালভূমি বলা হয়।

শৈলশিরা (Ridge): দূরে দূরে বিন্যস্ত সমোন্নতি রেখার মধ্যে যদি কোথাও ঘন ঘন দুই একটি সমোন্নতি রেখা থাকে তবে তা একটি উচ্চভূমি নির্দেশ করে। এইরূপ নাতি উচ্চভূমিকে শৈলশিরা বলে। পাশের চিত্রে শৈলশিরা দেখানো হয়েছে। এর স্বল্প ব্যবধান বিশিষ্ট ১০০' ও ২০০' ফুট সমোন্নতি রেখা একটি স্থানকে ঘিরে রয়েছে। এর মধ্যস্থলের অতি দীর্ঘ অংশটির উচ্চতা সর্বত্র প্রায় সমান অর্থাৎ কোথাও ৩০০' ফুট পর্যন্ত উচ্চ নয়। এইরূপ সমোন্নতি রেখার প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করলে দেখতে পাওয়া যায় যে স্থানটি দুই পার্শ্বে প্রায় সমানভাবে উঁচু হয়েছে কিন্তু মধ্যের বিস্তীর্ণ অংশের উচ্চতা প্রায় সমান।

নল বা ক্ষুদ্র টিলা (Knoll): পাহাড় ও টিলা অপেক্ষা নিম্ন ইতস্তত বিচ্ছিন্ন নাতি উচ্চ ঢিবি জাতীয় সাধারণত গোলাকৃতি স্বতন্ত্র উচ্চ ভূমিকে নল বা গোলাকার ক্ষুদ্র - টিলা নামে অভিহিত করা হয়।
আর যদি সেই ভূমি অপেক্ষাকৃত উঁচু হয় তা হলে একে ছোট পাহাড় বলা হয়। সমভূমি
অন্যলে প্রায়ই শিলারাশি সঞ্চিত হয়ে ক্ষুদ্র টিলা আকৃতির নলের সৃষ্টি করে। ক্রমে এইরূপ ভূভাগে লোক বসতি গড়ে উঠে। পাহাড়ের গায়ে ভূভাগ হঠাৎ অভিক্ষিপ্ত হয়েও নলের সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

পল্যয়ন (Saddle):

দুইটি নাতি উচ্চ শৈলশিরার মধ্যে অনুচ্চ ভূভাগ বিশিষ্ট বিস্তৃত ভূমিকে পল্যয়ন বলে। কিন্তু দুইটি শৈলশিরার মধ্যবর্তী অনুচ্চভূমি স্বল্প প্রশস্ত হলে একে গিরিপথ (pass) বলে। পাকিস্তানের খাইবার গিরিপথ এর উদাহরণ। সুউচ্চ এলাকার অপ্রশস্ত গিরিপথকে কল (col) বলে। সাধারণত বিস্তৃত শিলার মধ্যে ক্ষুদ্র চূড়াগুলো গিরিপথ দ্বারা পৃথক থাকে। স্থানে স্থানে গিরিপথগুলো গভীর পল্যয়নে পরিণত হয়। লোকবসতি বিশিষ্ট অঞ্চলে এইরূপ পল্যয়নের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়।

উপত্যকা শীর্ষ অত্যন্ত খাড়া হলে রাস্তাগুলো অনেক সময় বহিঃপ্রসূত অংশের ওপর দিয়ে অগ্রসর হয়। পাহাড় বা পর্বতমালা বিশিষ্ট অঞ্চলে পল্যয়নের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট এইরূপ দীর্ঘ অপ্রশস্ত গিরিপথকে গিরিসঙ্কট (defile) বলে। যে শৈলশিরা দুইটি নিষ্কাশন প্রণালিকে পৃথক করে তাকে পানি বিভাজিকা (watershed) বলে।

অভিক্ষিপ্ত উচ্চভূমি (Spur): নিম্নভূমির দিকে অভিক্ষিপ্ত উচ্চভূমি' (বহিঃপ্রসূত অংশ) স্পার নামে পরিচিত। এতে সমোন্নতি রেখাগুলো নিম্ন সমোন্নতি রেখার দিকে বেঁকে উত্তল ঢালের সৃষ্টি করে। এর সমোন্নতি রেখাগুলোর মান ভিতর দিকে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করলে উৎপন্ন ভূভাগ উন্নত দেখায়।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

প্রণবভূমি (Escarpment): যেসব পানি বিভাজিকা উপকূলের সন্নিকটে উপকূলের সাথে সমান্তরালভাবে অবস্থিত থাকে, উপকূলের দিকে ভূমি অপেক্ষাকৃত অপ্রশস্ত ও খাড়া হয় এবং বিপরীত দিকের অংশ প্রশস্ত ও ক্রম নিম্ন হয়, পানি বিভাজিকার এরূপ অপ্রশস্ত খাড়া অংশকে প্রণবভূমি বলে। চিত্রের বামদিকের সমোন্নতি রেখাগুলো প্রায় গায়ে লেগে রয়েছে অর্থাৎ তথায় ভূমি যথেষ্ট খাড়া ঢালবিশিষ্ট। অতঃপর মধ্যস্থলের বিস্তৃত অংশের উচ্চতা প্রায় সমান। কিন্তু ডানদিকের সমোন্নতি রেখাগুলোর মধ্যে। ব্যবধান বেশি তথায় ভূমি মৃদু ঢালবিশিষ্ট।

গিরিখাত (Gorge): পার্বত্য অঞ্চলে যদি উত্তল ঢাল খুব খাড়া হয়ে পাহাড়ের মধ্যে প্রবেশ করে তা হলে গিরিখাতের সৃষ্টি হয়। এইরূপ ভূমিরূপের সমোন্নতি রেখাগুলো খুব ঘন ঘন সন্নিবেশিত হয়ে অগ্রসর হয়। অনেক সময় গিরিখাতের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়।

জলপ্রপাত (Waterfall): পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি খুব খাড়া হওয়ায় সমোন্নতি রেখাগুলো খুব ঘন ঘন সন্নিবেশিত হয়। অনেক সময় নদী দ্বারা ভূমি ক্ষয়ের ফলে এইরূপ ভূভাগ এতো খাড়া হয় যে এর সমোন্নতি রেখাগুলো একটির সাথে অপর একটি মিলিত হয়। ফলে এইরূপ স্থানের নদীর পানি বহু নিচে পতিত হয়ে প্রপাতের সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

প্লাবন ভূমি (Flood plain) :

সাধারণত পরিণত অবস্থায় সমভূমির নদীতে পার্শ্বক্ষয় প্রাধান্য লাভ করে। অর্থাৎ পানি ধারা নদী উপত্যকার পার্শ্বক্ষয় করতে থাকে। ফলে বাঁকগুলো যথেষ্ট প্রশস্ত ও খাড়া ঢাল বিশিষ্ট হয়।
মাঝে মাঝে নদীর দিকে অভিক্ষিপ্ত বহিঃপ্রসূতি উচ্চভূমি (spur) দেখা যায়। বাঁকগুলো আকৃতিতে বড় এবং ভাটির দিকে অগ্রসর হতে থাকায় একটি বিপরীত ধর্মী ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। কর্তিত তীর অভিক্ষিপ্ত উচ্চভূমির স্থান এবং অভিক্ষিপ্ত উচ্চভূমি কর্তিত তীরের স্থান দখল করে। ফলে যে প্রশস্ত সমভূমি গঠিত হয় তার তলদেশের সর্বত্র নদী সঞ্চয় দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ সমভূমির পার্শ্বদেশে ক্ষয়ের প্রভাব এবং তলদেশে সঞ্চয়ের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠে। সাধারণত বাঁক সম্পন্ন এই সমভূমির মধ্য দিয়ে নদী অগ্রসর হয় এবং এর উত্তর পার্শ্ব খাড়াই ঢাল বিশিষ্ট হয়। বন্যার সময় সমগ্র সমভূমি পানি দ্বারা আবৃত হয় বলে একে 'প্লাবন সমভূমি' বলা হয়। এই সমভূমিতে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, প্রাকৃতিক বাঁধ থাকে। মানচিত্রে এই ধরনের ভূমিরূপ দেখাবার জন্য মাঝে মাঝে সমভূমিটি সমতল বা স্বর তরঙ্গায়িত বলে প্রতীয়মান অঙ্কন করে খাড়াই ঢাল চিহ্নিত করা হয়। প্লাবন ভূমির উভয় পার্শ্বের ব্যবচ্ছেদিত অঞ্চল দেখাবার জন্য আঁকাবাঁকা সমোন্নতি রেখাগুলোর সমাবেশ ঘটানো হয়।

বাঁকবিশিষ্ট নদী (Meandering river): সমভূমি অঞ্চলগুলোতে নদী উপত্যকা প্রশস্ত ও বাঁকবিশিষ্ট হয় এবং মাঝে
মাঝে অশ্বক্ষুরাকৃতির হ্রদ দেখা যায়। এই প্রকার ভূমিরূপ দেখাবার জন্য প্রথমে বিস্তীর্ণ অঞ্চল আঁকাবাঁকা নদী ও অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ অঙ্কন করা হয় এবং পরে দূরে দূরে সমোন্নতি রেখাগুলো নদী অতিক্রম করে। ফলে উপত্যকার ঢাল স্বাভাবিক দেখা যায়। নদীর পার্শ্ববর্তী স্থানে সমোন্নতি রেখাগুলোও বেশ দূরে দূরে অঙ্কন করা হয়।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake)

পরিণত প্লাবন ভূমিতে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ দেখতে পাওয়া যায়। নদী বাঁকগুলো ক্রমশ আকারে বৃদ্ধি পায়। বন্যার সময় নদী বক্ষ দিয়ে দ্রুত প্রচুর পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু বাঁকা পথে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। ফলে অতিরিক্ত পানির ধারা নুতন পথ সৃষ্টি করে এবং এটি ক্রমশ গভীর হয়। পানি স্রোত সোজা পথ অবলম্বন করায় বালি ও পলি জমে বাঁকের উভয় মুখ মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে পূর্বের বাঁকা পথটি একটি বন্ধ জলাশয় বা হ্রদে পরিণত হয়। এটি 'অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ' নামে পরিচিত। গভীরতা কম হওয়ায় মানচিত্রে এটি দেখানোর জন্য মাত্র কয়েকটি সমোন্নতি রেখা এর চারদিকে অঙ্কন করতে হয়। এইরূপে বিচ্ছিন্ন অবনত অংশগুলোসহ প্লাবনভূমির তরঙ্গায়িত বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা যায়।

কর্তিত নদী বাঁক (Incised meander): ভূআলোড়ন বা অন্য কোনো কারণে নদী পুনর্জীবিত হলে পানির ধারা খাদটিকে পুনরায় গভীর করে কাটতে থাকে এবং কর্তিত হওয়ার ফলে নদী বাঁকের উভয় তীর খাড়াই হয়। এরূপ উপত্যকাকে কর্তিত নদীর উপত্যকা বলে। কখনো কখনো স্থানীয় বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট, সহজে ক্ষয়শীল শিলা দ্বারা গঠিত মালভূমি অঞ্চলে এরূপ উপত্যকা দেখতে পাওয়া যায়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় উপত্যকা প্রশস্ত হয় না কিন্তু গভীর হয়। মানচিত্রে এইরূপ উপত্যকা দেখাবার জন্য সমোন্নতি রেখাগুলো নদী বাঁকের অতি কাছে ঘন সন্নিবিষ্ট হয় এবং এরা অল্প দূরে দূরে নদী অতিক্রম করে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

অববাহিকা (Basin): কোনো স্থানের সমোন্নতি রেখাগুলোর মান যদি ক্রমশ বাইরে থেকে ভিতর দিকে হ্রাস পায় তা হলে বুঝতে হবে যে ঐরূপ ভূমির পার্শ্বদিকে উঁচু ও মধ্যবর্তী অংশ নিচু। এই প্রকার ভূমিরূপকে অববাহিকা বলে।

উপত্যকা (Valley): দুটি উন্নত ভূমির মধ্যস্থিত নিম্নভূমিকে উপত্যকা বলে। উপত্যকার সমোন্নতি রেখা উন্নত ভূমির দিকে বেঁকে যায় এবং এর মধ্যে প্রায়ই নদী দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলে উপত্যকা বেশি প্রশস্ত নয়। কিন্তু সমভূমি অঞ্চলের নদী উপত্যকা প্রশস্ত। নদী প্রবাহিত অঞ্চলে উপত্যকা "V" আকৃতি এবং হিমবাহ প্রভাবিত অঞ্চলে উপত্যকা "U" আকৃতিবিশিষ্ট হয়। অনেক সময় উপত্যকার মধ্য দিয়ে রাস্তা অগ্রসর হয়।

V-আকৃতির উপত্যকা (V-shaped valley): উপত্যকার পার্শ্বদেশের ঢাল বেশি খাড়া ও নিচের ভূভাগ সংকীর্ণ হলে ঐরূপ উপত্যকা V-এর ন্যায় দেখায়। এতে ঢাল সাধারণত উত্তল হয়। ফলে যে স্থানে সমোন্নতি রেখার মান কম সেখানে ঐ রেখাগুলো ঘন সন্নিবিষ্ট ও উপত্যকার গায়ে দূরে দূরে বিন্যস্ত হয়। নদী উপত্যকার সমোন্নতি রেখাগুলোর পরস্পরের মধ্যে ফাঁক বেশি। সেজন্য ঐরূপ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রেখা বরাবর প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ভূমি বেশ ধীরে ধীরে ঢালু হয়েছে।

U-আকৃতির উপত্যকা (U-shaped valley): হিমবাহ প্রভাবিত অঞ্চলে উপত্যকার সমোন্নতি রেখার উপর প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করলে উপত্যকার আকৃতি U-এর ন্যায় দেখায়। কাছাকাছি বিন্যস্ত দুই প্রস্থ সমোন্নতি রেখার মধ্যে উপত্যকা তল বেশ প্রশস্ত থাকে, আবার উপত্যকার ঢাল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ক্রমশ উপরের দিকে ঢাল যত বৃদ্ধি পায় সমোন্নতি রেখাগুলোও ততই ঘন সন্নিবিষ্ট হয়। হিমবাহ প্রভাবিত অঞ্চলে কোনো উপ হৈমউপত্যকা যদি খাড়াভাবে মূল হৈম উপত্যকার সাথে এসে মিলিত হয় তা হলে উপ-হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট উপত্যকাকে ঝুলন্ত উপত্যকা (hanging valley) বলে। এর আকৃতিও U-এর ন্যায়। কিন্তু ঝুলন্ত উপত্যকার সর্বনিম্ন সমোন্নতি রেখা মূল উপত্যকাকে লম্বভাবে ছেদ করে এবং মূল হিমবাহের সমান্তরালভাবে বিস্তৃত হয়।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By

ভৃগু বা খাড়া উঁচু পাড় (Cliff):

ভূমি ভাগ খাড়া হয়ে প্রায় উলম্বভাবে কোনো সমভূমি, নদী, হ্রদ বা সমুদ্রের উপর ঝুঁকে অবস্থান করলে তাকে ভৃগু বলে। পানিপ্রপাতের ন্যায় 'ভৃগু' উচ্চতাবিশিষ্ট।

উলম্ব উচ্চতা সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন উচ্চতাবিশিষ্ট সমোন্নতি রেখাগুলো পরস্পর একই রেখায় মিলিত করতে হয়। দেখতে একরূপ হলেও পানিপ্রপাত ও ভৃগুর সমোন্নতি রেখাগুলোর মান বিন্যাস স্বতন্ত্র। স্মরণ রাখতে হবে যে কেবল উলম্ব ভৃগু ও পানি প্রপাতের ক্ষেত্রেই সমোন্নতি রেখাগুলো মিলিত হয়, অন্যত্র নয়। ভৃগু সমুদ্র উপকূলে পক্ষান্তরে, প্রণবভূমি দেশের অভ্যন্তরের খাড়াই ভূভাগ।

উলম্ব নিম্ন ভূভাগের উপর দিয়ে বহির্দিকে প্রক্ষিপ্ত উপরের ভৃগু 'ঊর্ধ্বে ঝুলন্ত ভৃগ' (over hanging cliff) নামে পরিচিত। এ ভূমিরূপ অঙ্কন করার জন্য অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের সমোন্নতি রেখাগুলোকে অধিক মানবিশিষ্ট সমোন্নতি রেখাগুলোর উপর দিয়ে অতিক্রম করিয়ে বাইরের দিকে প্রসারিত করতে হয়। কেবল এ ক্ষেত্রেই সমোন্নতি রেখাগুলো পরস্পর ছেদ করে প্রসারিত করতে হয়। কোনো ভৃগু সমুদ্রের মধ্যে প্রসারিত হলে তাকে শৈলান্তরীপ (promontory বা head Land) বলে।

নদীমঞ্চ (River terrace): যদি সমোন্নতি রেখাগুলো নদী থেকে কিছুটা দূরে খুব ঘন সন্নিবিষ্ট হয় এবং দুটি সমোন্নতি রেখা কাছাকাছি থাকার পর কিছুটা স্থান বেশ ফাঁক এবং পরে দুটি সমোন্নতি রেখা আবার কাছাকাছি সন্নিবিষ্ট থাকে তা হলে একে নদীমঞ্চ বলা হয়। এর প্রস্থচ্ছেদ অঙ্কন করলে নদীর দুই পার্শ্বে বড় বড় মঞ্চের বা প্রশস্ত সিঁড়ির ন্যায় দেখা যায়।

একটি নদীমণ্ড প্রায় সমতল, এর উপরিভাগ স্বল্প তরঙ্গায়িত ও পার্শ্বদেশ খুব খাড়াই ঢালবিশিষ্ট, কখনো কখনো তা উলম্ব ঢালবিশিষ্ট হয়ে থাকে। সাধারণত মঞ্চের প্রান্তভাগের দিকে অধিক মাত্রায় ক্ষয়ীভবন হয়, ফলে তথায় গভীর ও সংকীর্ণ ভূভাগের সৃষ্টি হয়। পাশের চিত্রে ৩৫০ থেকে ৩২৫ ফুট সমোন্নতি রেখার মধ্যবর্তী স্বাভাবিক ঢাল বিশিষ্ট তরঙ্গায়িত এলাকা বর্তমান থাকলেও নদীর কাছে হঠাৎ ৩০০ ফুট গভীর হয়েছে। ফলে মঞ্চটি ২৫ ফুট উঁচু হয়। মঞ্চের প্রান্তভাগে অনেকগুলো সংকীর্ণ গভীর স্থান বর্তমান থাকে। মঞ্চের এক পার্শ্বে হঠাৎ উঁচু এবং অন্য পার্শ্বে হঠাৎ নিচু দেখাবার জন্য সমোন্নতি রেখাগুলোকে খুব কাছাকাছি অঙ্কন করতে হয়।

বালিয়াড়ি (Sand dunes): বায়ুর গতির সাথে সমকোণে বালু দ্বারা গঠিত ঢেউয়ের মতো যেসব উন্নত ভূমি গঠিত হয় সেগুলোকে বালিয়াড়ি বলে। মানচিত্রের উপর বালিয়াড়ির অবস্থান দেখাবার জন্য মোটামুটি সমান্তরালভাবে দীর্ঘায়িত সম্প্রসারিত বিচ্ছিন্ন সমোন্নতি রেখাগুলো অঙ্কন করা হয়।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...