(Weathering)
নানাবিধ শক্তির প্রভাবে শিলারাশির চূর্ণবিচূর্ণ ও বিশ্লিষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়াকে বিচূর্ণীভবন বলে। বিচূর্ণীভবনের ফলে ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে শিথিল হয়ে পড়ে, কিন্তু অপসারিত হয় না। আবহাওয়ার উপাদানসমূহের ক্রিয়ায় বিচূর্ণীভবন হয়ে থাকে। বিচূণীভবন প্রক্রিয়া প্রধানত তিনটি- যান্ত্রিক, রাসায়নিক ও জৈবিক।
যান্ত্রিক বিচূণীভবন (Physical Weathering)
বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের দ্বারা শিলাস্তর ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন বলে। এটি মূলত উত্তাপের দ্রুত পরিবর্তন (তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও হ্রাস) প্রক্রিয়া দ্বারা সংঘটিত হয়। মরু অঞ্চল ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল এবং উচ্চ অক্ষাংশে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন লক্ষ করা যায়। নিচে বিভিন্ন যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন প্রক্রিয়া আলোচিত হলো-
ক. উত্তাপের তারতম্যের কারণে বিচূর্ণীভবন: দিনরাতের উষ্ণতা এবং ঋতুভেদে উত্তাপের পার্থক্যের জন্য শিলাগুলো অসমানভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এ সংকোচন বা প্রসারণ ক্রমাগত চলার ফলে শিলারাশি এক সময় খন্ড খন্ড হয়ে যায়। একে সংকোচন-প্রসারণজাত বিচূর্ণীভবন বা তাপীয় বিচূর্ণীভবন বলে।

উত্তাপের ভিত্তিতে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন আবার চার প্রকারে সংঘটিত হয়। যেমন-
১. স্তর মোচন: অনেক সময় শিলা উত্তপ্ত হলে নিচে বা পাশে প্রসারিত হতে না পেরে উপরের দিকে প্রসারিত হয়। এর ফলে শিলার উপরের স্তরটি অভ্যন্তরের শীতল শিলাস্তর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পেয়াজের খোসার ন্যায় খুলে যায়। শিলার এরূপ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে বল্কল মোচন বা স্তর মোচন (exfoliation) বলা হয়। স্তর মোচন-পদ্ধতিতে কখনও বৃহৎ শিলার উপরের স্তর সরে গেলে কিছুটা গোলাকৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। একে স্তর মোচন গম্বুজ (exfoliation dome) বলে।

২. প্রস্তর চাঁই-এর বিচ্ছিন্নকরণ: দিনের বেলায় সূর্যতাপে শিলারাশির উপরের স্তর নিচের স্তর অপেক্ষা অধিক উত্তপ্ত হয়। ফলে শিলার মধ্যে পীড়নের (stress) সৃষ্টি হয়। এ পীড়ন একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করলে শিলার মধ্যে সমান্তরাল ও উল্লম্ব ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং এ ফাটলের স্থান হতে শিলারাশি কোনো এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে প্রস্তর চাঁই-এর বিচ্ছিন্নকরণ (block disintegration) বলা হয়। পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত অঞ্চলে এ ধরনের বিচূর্ণীভবন দেখা যায়। যেমন- ভারতের মধ্যপ্রদেশ।

৩.খণ্ডীকরণ: মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভূত হয়। কিন্তু হঠাৎ এ সময় বৃষ্টিপাত হলে শিলারাশি দ্রুত শীতল ও সংকুচিত হওয়ার সময় ফেটে যায় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে খন্ডীকরণ বলা হয়।

৪. ক্ষুদ্রকণা বিশরণ: যেসব শিলা বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত সেসব শিলার খনিজসমূহ সূর্যতাপে অসমানভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। এর ফলে শিলার মধ্যে টান পড়ে এবং এগুলো ভেঙে কোনো এক সময় চূর্ণবিচূর্ণ হয়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (granular disintegration) বলা হয়। মরু অঞ্চলে সন্ধ্যার সময় পিস্তলের গুলির ন্যায় যে শব্দ শোনা যায় তা ক্ষুদ্রকণা বিশরণের শব্দ।
মরু অঞ্চলে দিন ও রাতের তাপের ব্যাপক পার্থক্য হয়ে থাকে। ফলে শিলাসমূহে প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে প্রথমে স্তর মোচন, তারপর খন্ডীকরণ এবং অবশেষে ক্ষুদ্রকণা বিশরণের মাধ্যমে বালি, ধূলিকণায় পরিণত হয়। একে শিলার বিচূর্ণীকরণ বলে। এ প্রক্রিয়া মৃত্তিকা গঠনের সাথে সম্পৃক্ত।
খ . তুষারের দ্বারা বিচূর্ণীভবন: উচ্চ অক্ষাংশ বা পার্বত্য অঞ্চলে দিনের বেলায় বরফগলা পানি ভূত্বকের ফাটল বা
ছিদ্রপথে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু রাতের বেলায় প্রচণ্ড শীতে এ বরফগলা পানি পুনরায় বরফে পরিণত হয় এবং আয়তনে ১০% বৃদ্ধি পায়। ফাটলের পার্শ্বদেশে এতে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। ফলে শিলারাশি ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হয় এবং বিচূর্ণীভবনে সহায়তা করে। পর্বতগাত্রের কোণাকৃতিতে এরূপ প্রস্তরখণ্ড সঞ্চিত হলে তাকে স্ত্রী (scree) বা ট্যালাস (tallus) বলা হয়।

গ. পানির দ্বারা বিচূর্ণীভবন: পানির দ্বারা সাধারণত তিনটি প্রক্রিয়ায় শিলার বিচুণীভবন সংঘটিত হয়। যথা-
i. বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে শিলার উপরের অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সাধারণত বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে এ ধরনের ক্ষয় হয়ে থাকে। সাধারণত পাললিক শিলায় এ ধরনের প্রক্রিয়া বেশি কাজ করে।
ii. কোনো কোনো সময় বৃষ্টির পানি পাললিক শিলার ফাটল ও রূপান্তরিত শিলার ছিদ্র দিয়ে শিলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সূর্যের তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হলে শিলা পুনরায় শুকিয়ে যায়। এরূপে ক্রমাগতভাবে আর্দ্র ও শুষ্ক হওয়ার ফলে শিলা দুর্বল হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। শিলার পর্যায়ক্রমিক ভেজা ও শুকনো অবস্থার মাধ্যমেও শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
iii. উপকূল এলাকায় জোয়ার-ভাটার কারণে শিলা পর্যায়ক্রমে পানি শোষণ করে ফুলে যায় এবং পরে শুকিয়ে যায়। আবার ওপরের শুষ্ক অংশ যখন সংকোচিত হয় ভেতরের অংশ তখন অপেক্ষাকৃত আর্দ্র থেকে যায়। এ অবস্থায় শিলার গঠন দুর্বল হয়ে ভেঙে যায়। পর্যায়ক্রমে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকায় শিলারাশি চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
ঘ. চাপমুক্ত হওয়া: ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্ট আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা ওপরের পাললিক শিলা স্তরের চাপে সঙ্কুচিত অবস্থায় থাকে। উপরের শিলাস্তর অপসারিত হলে ভূঅভ্যন্তরের শিলার ওপর চাপ হ্রাস পায়। ফলে এ সমস্ত শিলা কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। এ অবস্থায় শিলার ওপরের স্তর নিচের মূল শিলা থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়। গ্রানাইট জাতীয় শিলায় এ ধরনের বিচূণীভবন দেখা যায়।
ঙ. লবণ কেলাস গঠনের মাধ্যমে: দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমে শিলার ফাটল বরাবর ভেতরের পানি কৈশিক শক্তির (capillary force) টানে উপরে উঠে আসে। এ পানিতে লবণ দ্রবীভূত থাকায় পানি বাষ্পীভূত হওয়ার পর ফাটলে লবণ থেকে যায়। ক্রমান্বয়ে এ লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে শিলার বহির্ভাগ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানাকৃতিতে ভেঙে যায়। আমাদের দেশে ইটের দালানে এ ধরনের প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল দেখা যায় যাকে সাধারণভাবে 'লোনা ধরা' বলে। শুষ্ক অঞ্চলে এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে শিলা বিচূর্ণীভূত হয়।
চ. মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব: উচ্চ পর্বতের খাড়া ঢালে কোনো শিলাখণ্ড আলগা হলে তা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে নিচে পতিত হয় এবং ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়। আবার পতিত এ শিলার আঘাতেও পর্বতের পাদদেশের শিলাসমূহ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং বিচূণীভবন সংঘটিত হয়।