(Factors of Climate)
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জলবায়ুর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এই ভিন্নতার পেছনে জলবায়ুর কতগুলো নিয়ামক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে। এই নিয়ামকগুলো হলো- ১. অক্ষাংশ ও সূর্যের কৌণিক অবস্থান, ২. সমুদ্র সমতল থেকে উচ্চতা, ৩. পাহাড়-পর্বতের অবস্থান, ৪. জল ও স্থলভাগের অবস্থান, ৫. সমুদ্রস্রোত, ৬. ভৌগোলিক অবসান, ৭. মৃত্তিকা প্রভৃতি, ৮. বনভূমি, ৯. ভূমির ঢাল ও ১০. পৃথিবীর ঘূর্ণন।

১. অক্ষাংশ ও সূর্যরশ্মির পতন কোণ (Latitudes and Angle of sunlight fall): পৃথিবীর আহ্নিক গতির ফলে দিবারাত্রি সংঘটিত হয় আর বার্ষিক গতির ফলে ঋতু পরিবর্তন হয়। সূর্যের অবস্থান ও অক্ষাংশভেদে বায়ুমণ্ডলে সূর্যতাপের তারতম্য ঘটে। নিরক্ষরেখার উত্তরেকর্কটক্রান্তি (২৩.৫° উত্তর অক্ষরেখা) ও দক্ষিণে মকরক্রান্তি (২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষরেখা) এর মধ্যে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয়। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণের সময় এই দুই সীমানার
মধ্যে প্রতিটি স্থানে বছরে সূর্য দুইবার লম্বভাবে কিরণ দেয়। ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে যতই মেরু অঞ্চলের দিকে যাওয়া যায় সূর্যের তির্যকভাবে কিরণ ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর তাপমাত্রাও তত কমতে থাকে। লম্বভাবে পতিত সূর্যকিরণ স্বল্প গভীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে স্বল্প পরিসরে ভূমণ্ডলে পতিত হয়, এতে উত্তাপের প্রখরতা অধিক থাকে। আর সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়লে অধিক পরিমাণে বায়ুমণ্ডলের গভীরতা ভেদ করে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে যায়। এতে তাপমাত্রার প্রখরতা কমে যায়। এ সব অবস্থার ওপর নির্ভর করে সৃষ্টি হয়েছে উষ্ণমণ্ডল, নাতিশীতোষ্ণমণ্ডল ও হিমমণ্ডল।
২. সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা (Altitude from sea level):
উচ্চতা কোন অঞ্চলের জলবায়ুর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে যত ঊর্ধ্বে যাওয়া যায়, বায়ুর তাপমাত্রা তত কমতে থাকে (ট্রপোস্ফিয়ারের মধ্যে)।
ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা, জলকণা, লবণকণা প্রভৃতি তাপ শোষণ করে। এসব কারণে নিচের স্তরের বায়ু ওপরের স্তর অপেক্ষা অধিক উষ্ণ থাকে। গাঙ্গেয় সমভূমিতে মি. উচ্চতায় নতুন দিল্লির জুন মাসের গড় উষ্ণতা ৩৩.৩০°সে. কিন্তু নিকটবর্তী অধিক উচ্চতায় অবস্থিত সিমলায় ঐ মাসের গড় উত্তাপ ১৯.৫° সে.।

৩. পাহাড়-পর্বতের অবস্থান (Location of hills and mountains) : জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুপ্রবাহের পথে পাহাড় পর্বতে বাধা পেলে প্রতিবাত পার্শ্বে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু বিপরীত পার্শ্ব বৃষ্টিহীন থাকে। 'একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। ভারতের আসাম, মেঘালয়, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

৪. জল ও স্থলভাগের অবস্থান (Location of ground and waterbodies): ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭১% জলভাগ এবং ২৯% স্থলভাগ। এদের বিপরীতধর্মী প্রকৃতির জন্য স্থান ও সময়ভেদে সৌরতাপ বণ্টনের বিভিন্নতা লক্ষনীয়। সূর্যরশ্মি স্থলভাগে ৩ ফুট গভীরতায় আর জলভাগে ৬০০ ফুট গভীরতায় পৌছতে পারে। দিনের বেলায় ভূমি দ্রুত সৌরতাপ গ্রহণ করে ও দিন শেষে দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হতে থাকে। অন্যদিকে, চলনশীল পানির উপরিস্তর সূর্যকিরণে উত্তপ্ত হয়ে হালকা হয় এবং নিম্ন ঢালে ধাবিত হয়। তখন আবার নিচের উন্মুক্ত পানি উত্তপ্ত হতে থাকে। এই উত্তপ্তকরণ প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকে। সে সঙ্গে সমুদ্রস্রোত, তরঙ্গ, জোয়ার-ভাটা দ্বারা তাপমাত্রা পুনঃবণ্টিত হয়। হিসেবে দেখা গেছে, ১ ঘনফুট পরিমিত পানিকে ১°সে. তাপমাত্রায় আনতে যে উত্তাপ লাগে ঐ পরিমাণ শিলারাশিকে ঐ তাপমাত্রায় আনতে দ্বিগুণ তাপ দরকার। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ু প্রবাহের ফলে মনোরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। বিপরীতক্রমে সমুদ্র উপকূল থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, শীত ও গরমের পার্থক্য তত বেশি অনুভূত হয়। বাংলাদেশের কক্সবাজার বা কুয়াকাটা এলাকায় এটা সহজেই অনুভব করা যায়।
৫. সমুদ্রস্রোত (Ocean currents): কোনো অঞ্চলের জলবায়ুর ওপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
উপকূল অঞ্চলে উষ্ণস্রোত উষ্ণতা ও শীতল স্রোত শৈত্য নিয়ে আসে। যেমন: আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের জলবায়ু অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং উপকূল বরফমুক্ত থাকে। আবার শীতল ল্যাব্রাডার স্রোতের প্রভাবে কানাডার পূর্ব উপকূলের জলবায়ু শীতল থাকে।
৬. ভৌগোলিক অবস্থান (Geographic location): ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। যেমন: ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশের জলবায়ু উষ্ণ প্রকৃতির কিন্তু মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে নাতিশীতোষ্ণ অবস্থা বিজার করে। এতে করে গ্রীষ্মে বায়ু থাকে উষ্ণ ও আর্দ্র। আবার শীতকালে উত্তর দিক থেকে আগত শৈত্যপ্রবাহের ফলে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আবার হঠাৎ ঝড় কোনো অঞ্চলের উষ্ণতার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকা রাখে যেমন-বাংলাদেশের কালবৈশাখী ও উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়।
৭. শিলা অথবা মৃত্তিকার প্রকৃতি (Nature of rocks or soils): শিলা বা মৃত্তিকার গঠনপ্রকৃতি ও বর্ণ তাপধারণ ও
বিকিরণকে প্রভাবিত করে। প্রস্তর শিলা ও বালু মাটি অতি সহজে উত্তপ্ত ও শীতল হয়। এ কারণেই পার্বত্য ও মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় উষ্ণতা ও রাত্রিকালে শীতলতা উভয়ই খুব বেশি থাকে।
৮. উদ্ভিদের আচ্ছাদন (Vegetation cover): স্বাভাবিক উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে। যেমন- নিবিড় বনভূমির ভেতর সূর্যের আলো পৌঁছে না। ফলে উত্তাপ কম হয় ও স্যাঁতসেতে অবস্থা বিরাজ করে। বৃক্ষ প্রস্বেদনের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়; বনভূমি এলাকার জলবায়ু আর্দ্রভাবাপন্ন ও বৃষ্টিবহুল হয়। পক্ষান্তরে, বৃক্ষহীন অঞ্চল হয় রুক্ষ, শুষ্ক ও উষ্ণ।
৯.ভূমির ঢাল (Slope of landmass): ভূমির ঢালের সাথে সূর্যরশ্মির তির্যক ও লম্ব পতন জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। সাধারণভাবে বলা যায়, ভূমির সম্মুখ ঢাল বরাবর সূর্যকিরণ পড়লে উত্তাপ বেড়ে যাবে আর বিপরীত দিকে (অনুবাত পার্শ্ব) ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে।

১০. পৃথিবীর ঘূর্ণন (Rotation of earth): পৃথিবী নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণনের কারণে ঋতুচক্র সংঘটন ও দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের তারতম্য হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতার পার্থক্য ঘটে এবং জলবায়ুতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক - কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Read more