(Volcano and Volcanic Islands)
আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয় দ্বীপ সমুদ্রের তলদেশের সাধারণ ভূমিরূপ এবং এটি সাধারণত সমুদ্র তলদেশ থেকে এক কিলোমিটার (০.৬ মাইল) বা তারও অধিক উচ্চে অবস্থান করে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে দশ হাজারেরও বেশি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ভূভাগের অধিকাংশ আগ্নেয়গিরির ক্রিয়া সমুদ্রখাতের প্রান্তের নিকটে বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকে সংঘটিত হয়ে থাকে।
অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরায় বা দ্বীপ বলয় থেকে বাইরে সমুদ্রখাতের মধ্যস্থলে দেখা যায়। সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরি কখনও আলাদাভাবে আবার কখনও অনেকগুলো এক সাথে দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১০,০০০ আগ্নেয়গিরি আছে এবং এগুলোর অধিকাংশই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। সবচেয়ে বড়গুলোর চূড়া পানির ওপরে এসে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। হাওয়াই দ্বীপ এমনি ধরনের আগ্নেয় দ্বীপ। পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ৯ কি.মি. (প্রায় ৫.৬ মাইল) উচ্চতাবিশিষ্ট হাওয়াই আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ মহাদেশীয় ভূখণ্ডের সর্ববৃহৎ পর্বতের চেয়েও বড়।
বক্রাকারে সজ্জিত দ্বীপপুঞ্জ ও তার ভেতরের দিকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিগুলো গিরিখাতের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোকে দ্বীপ বলয় (island arc) বলে। এ ধরনের মহাদেশ-মহাসাগর সীমানা হচ্ছে সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূআন্দোলনের ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। দ্বীপ বলয় প্রশান্ত মহাসাগরে খুব বেশি দেখা যায়, কিন্তু আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে এগুলোর সংখ্যা কম। মহাদেশ ও কিছু কিছু বড় দ্বীপ বলয় গোষ্ঠীর (island arc system) মধ্যে অগভীর উপকূলীয় সাগর রয়েছে; যেমন আছে জাপান ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের প্রান্তে।
সমুদ্রের তলদেশের অনেক পর্বত ও বৃহৎ উঁচু টিলা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিনের মৃত আগ্নেয়গিরি। অনেক প্রাচীন মৃত আগ্নেয়গিরি 'বর্তমানে নিমজ্জিত এবং এগুলো প্রবাল শৈল ও প্রবালজনিত পলি দ্বারা আবৃত। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বারমুডা চুনাপাথর দ্বারা আবৃত একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরি।
সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি হয় যখন ভূত্বকের দুর্বল অংশের ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ ধূম্র, গ্যাস, গলিত শিলা, ভস্ম এবং বিবিধ তরল ও কঠিন ধাতব পদার্থ নির্গত হয়। দীর্ঘকাল ধরে লাভা ও ভস্ম অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জমা হয়ে তলদেশে পাহাড়, পর্বত বা উঁচু টিলার সৃষ্টি করে। প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ২০টি প্রধান আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে থাকে সমুদ্রে। সমুদ্রের পানিতে লুক্কায়িত এবং ভূভাগ অথবা বাণিজ্যিক নৌপথ থেকে দূরে অবস্থিত বলে এ ধরনের অগ্ন্যুৎপাত অদৃশ্যত ও অনথিভুক্ত থেকে যায়। শুধু অগভীর সমুদ্রে ও স্থলভাগে অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে তাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করা হয়।
জেনে রাখো:
প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ২০টি প্রধান অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে থাকে সমুদ্রে।
আইসল্যান্ডের দক্ষিণে মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরায় সামুদ্রিক অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সারটসে (Surtsey) নামক দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছিল। আগ্নেয় ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে এবং ৪ বছরেরও অধিককাল ধরে চলেছিল। তিনটি দ্বীপ গঠিত হয়েছিল কিন্তু ক্ষুদ্রাকার দ্বীপটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ হওয়ার খুব কম সময়ের মধ্যেই ঢেউ এর ধাক্কায় ধুয়ে ক্ষয়প্রায় হয়ে যায়। বৃহৎ দ্বীপটি সমুদ্র সমতল থেকে ১০০ মিটারেরও (৩০০ ফুট) বেশি উঁচু হয়ে গঠিত হয়েছিল। অধিকাংশ দ্বীপের ওপর অত্যধিক লাভা প্রবাহের ফলে তার সর্বমোট আয়তন ছিল প্রায় তিন বর্গ কি.মি. (প্রায় ১ বর্গ মাইল)।
আগ্নেয় দ্বীপে সার্বক্ষণিক অগ্ন্যুৎপাতের দ্বারা ভূপৃষ্ঠ নবায়িত না হলে বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ও ঢেউ দ্বারা দ্বীপ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমুদ্র সমতলের নিচে চলে যায়। কখনও কখনও সবিরাম আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত দ্বীপকেও পুনঃগঠিত করে।
দীর্ঘস্থায়ী আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রকে উত্তপ্ত বিন্দু (hot spots) বলা হয় যেগুলো সারিবদ্ধভাবে আগ্নেয়গিরির লাইন বা রেখা তৈরি করে এবং সেই বরাবর প্লেটগুলো চলাচল করে। পৃথিবীর অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরার ওপর অথবা নিকটে দেখা যায়; যেমন- আইসল্যান্ড, আজোরস অথবা আটলান্টিক মহাসাগরে অ্যাসেনসন দ্বীপ।
প্লেটের মধ্যে আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রের ওপরেও আগ্নেয়গিরি গঠিত হতে পারে। যখন একটি প্লেট আগ্নেয়গিরি কেন্দ্রের ওপর দিয়ে চলে তখন পুরোনো আগ্নেয়গিরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং নতুন একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরির উদ্ভব হয়। আগ্নেয় দ্বীপের শিকল (chain) অথবা নিমজ্জিত মৃত আগ্নেয়গিরি চূড়া এভাবে গঠিত হয়। দ্বীপের সারিবদ্ধতা প্লেট চলাচলের পথ নির্দেশ করে, যেমন- হাওয়াই দ্বীপের দ্বীপ শিকলের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পশ্চিম দিক অপেক্ষাকৃত প্রাচীন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মিডওয়ে দ্বীপ শেষবার জীবন্ত বা সক্রিয় ছিল প্রায় ১৮ মিলিয়ন বছর পূর্বে। উত্তর দিকে প্রসারিত, নিমজ্জিত ও মৃত আগ্নেয়গিরিমালা ৪০ মিলিয়ন বছরেরও অধিক পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট স্থানান্তরের চিহ্ন রক্ষা করছে যখন এটি তার দিক পরিবর্তন করেছিল।
সমুদ্র তলদেশ অথবা দ্বীপে বিরাট অগ্ন্যুৎপাত পর্বতের অংশবিশেষ উড়িয়ে নিতে পারে। পানি গলিত শিলার সংস্পর্শে এসে বিরাট উদগিরণ ঘটাতে পারে। ১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রার মধ্যে অবস্থিত ক্লাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির উদগিরণ জানা অগ্ন্যুৎপাতের মধ্যে অন্যতম ঘটনা। দুইশত বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর আগ্নেয়গিরি কয়েক সপ্তাহের জন্য মধ্যম আকারের সক্রিয়তা পেয়েছিল। ২৬ আগস্ট এক প্রলয়ঙ্করী উদগিরণের শব্দ ১০০ মাইল দূর থেকে শোনা গিয়েছিল এবং পৃথিবীব্যাপী এর ব্যাপকতা নির্ণয় আরম্ভ হয়েছিল। দুই দিনের উদগিরণে দ্বীপের তিনভাগের দুই ভাগই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। উদগিরণের ফলে সৃষ্ট বৃহদাকারের ঢেউ 'সুনামি' উপকূলীয় দ্বীপসমূহের নিচু অঞ্চল প্লাবিত ও ধ্বংস করে প্রায় ৩৬,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। জাভা দ্বীপে ঢেউয়ের উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) উঁচুতে উঠেছিল এবং অভ্যন্তরে প্রায় ১৬ কি.মি. (১০ মাইল) পর্যন্ত বিধৌত করেছিল। আগ্নেয় ভস্ম বায়ুমণ্ডলে ৫০ কি.মি. (৩০ মাইল) উপরে উঠেছিল এবং ৭৭০,০০০ বর্গ কি.মি. (৩০০,০০০ বর্গ মাইল) জুড়ে পুরু আস্তরণের এবং ৩.৮ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. (১.৫ মিলিয়ন বর্গ মাইল) জুড়ে পাতলা আস্তরণের সৃষ্টি করেছিল। মোট ভস্মের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছিল ১৬ ঘন কি.মি. (৩.৮ ঘন মাইল) এবং নিকটবর্তী দ্বীপসমূহের ওপর ভস্ম স্তরের পুরুত্ব ছিল ১৫ মিটার (৫০ ফুট)। উদগিরণের শব্দ ৫০০০ কি.মি. (৩০০০ মাইল) এর বেশি দূরত্ব থেকে শোনা গিয়েছিল। মিহি ভস্ম কণা স্ট্রাটোস্ফিয়ারে (stratosphere) ঢুকে পড়েছিল এবং পৃথিবীব্যাপী কমপক্ষে তিন বার প্রদক্ষিণ করেছিল। ফলে কয়েক বছর ধরে সুন্দর রঙিন সূর্যাস্তের দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। অধিকাংশ আগ্নেয় ভস্ম উত্তর ভারত মহাসাগরে অবঃক্ষেপিত হয়েছিল।
কখনও কখনও আগ্নেয়গিরির আংশিকভাবে পতন বা ধ্বংস হয়। উদাহরণস্বরূপ- যখন আগ্নেয় উদগিরণ নিমজ্জিত হয় তখন নিচের থেকে উপরের দিকে ধাবিত গলিত শিলাও নিমজ্জিত হতে পারে। যখন এরূপ অবস্থা সংঘটিত হয় তখন আগ্নেয়গিরির ওপরের স্তর ধসে পড়ে শুধু ডুবে যাওয়া জ্বালামুখ (crater) অথবা ক্যালডেরা (caldera) থেকে যায়; যেমন অরিগনের জ্বালামুখ হ্রদ (Oregon crater lake)। যখন ক্যালডেরা উপকূল বরাবর গঠিত হয় তখন এগুলো প্রায়ই গভীর ও গোলাকার উপসাগরের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপে ক্যালডেরা ভরাট হয়ে আগ্নেয়গিরির উপরিভাগ প্রায় সমতল হয়ে যায়।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more