hsc

পাঠ-১: বাণিজ্যের প্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটন

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Nature of trade and International trade)

যখন কোনো দেশ তার ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে অবস্থিত এক বা একাধিক দেশের সাথে দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকার্যের আদান প্রদান করে তখন তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাগ (যেমন- শ্রমের যোগানের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প) ও ভৌগোলিক বিশেষীকরণই (Geographic factors) হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি। ভৌগোলিক বিশেষীকরণের (ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, প্রভৃতি পার্থক্যের কারণে কোনো বিশেষ দেশ বা রাষ্ট্র বিশেষ দ্রব্য উৎপাদনে আপেক্ষিক সুবিধা লাভ করে। যেমন- বাংলাদেশে পাটশিল্প) ওপর ভিত্তি করেই মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যের প্রকৃতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকান নেতৃত্বে পুঁজিবাদ এবং চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির যে বিকাশ তার গতিধারা অধুনা একেবারেই পাল্টে গিয়েছে। চীন, রাশিয়া, ভারত এখন বিশ্ববাজারে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফল। বরং বলা হচ্ছে চীন অচিরেই বিশ্ব বাণিজ্যের শীর্ষ স্থান অধিকার করবে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পুঁজি ও বাণিজ্য নতুন যুগের সূচনা করেছে। ইতোমধ্যে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (চীন, জাপান, কানাডা) অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে অধিক গতিশীল অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। এশিয়া এখন বিশ্ববাণিজ্যে ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। ৪। এর বেশ কিছু দেশ (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত) টেলিভিশন, কম্পিউটার, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য কম খরচে তৈরি করা তৈরি করা শুরু করেছে। তারা নতুন সম্প্রসারিত বাজারব্যবস্থা থেকে অধিক লাভ আশা করছে।

ইউরোপের বাণিজ্য প্রকৃতি এশিয়া থেকে ভিন্ন। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো পুনরায় নির্মাণ করা যায় এরূপ পণ্য (যেমন-পোল্যান্ডের ফার্নিচার সামগ্রী; দরজা, জানালা ইত্যাদি) বাইরের দেশগুলোতে রপ্তানি করে থাকে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো মনে করে বিশ্বের অন্যান্য এলাকা থেকে তাদের পণ্য ও সেবাসমূহের মান উন্নত ও চাহিদাসম্পন্ন। ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ইত্যাদি দেশগুলো নতুন ভোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে আধুনিক গৃহসামগ্রী, ভবন ও নির্মাণ উপকরণ এবং তথ্য-প্রযুক্তির ক্রেতা সৃষ্টি করছে। তবে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা বা সুফল নিজের অনুকূলে রাখতে বিভিন্ন সংগঠনে যোগদান করছে, সেই সাথে নিত্য নতুন চুক্তিও সম্পাদন করছে। যেমন-

ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘ (European Free Trade Association or EFTA)

১৯৬০ সালে যুক্তরাজ্য উদ্যোগী হয়ে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পর্তুগাল, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডকে নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য স্টকহোমে ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘ (EFTA) গঠন করে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি দেশ এ সংস্থা ত্যাগ করে। যেমন- ১৯৭২ সালে ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্য এবং ১৯৮৫ সালে পর্তুগাল। ১৯৯৫ সালে অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড (যোগদান ১৯৮৬ সালে) এবং সুইডেন এ সংস্থা ত্যাগ করে। অন্যদিকে ১৯৭০ সালে আইসল্যান্ড এবং ১৯৯১ সালে লিচেনস্টাইন পূর্ণ সদস্যরূপে এই সংঘে যোগদান করে। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্যদেশ ৪টি; যথা- আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইন। ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘের সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত।

EFTA এর উদ্দেশ্য হলো-(১) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্কবিহীন অবাধ বাণিজ্য সম্পাদন করা; (২) পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে একটি বাজারে পরিণত করার জন্য সাহায্য করা; এবং (৩) বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নতিসাধন করা।

উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (North America Free Trade Agreement or NAFTA): কানাডা, মেক্সিকো
ও যুক্তরাষ্ট্র ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সালে বাণিজ্য ও পরিবেশ-সংক্রান্ত যে চুক্তি সম্পাদন করে, তার নাম উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে ১৯৯৪ সালে ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ১৫ বছরের মধ্যে আলোচ্য তিন দেশের মধ্যে পণ্য ও পরিসেবা বিষয়ক যাবতীয় বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। বর্তমানে এ চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আমেরিকা এ চুক্তির ধারাগুলোর সংস্করণে আলোচনার দাবি করে। এমন কী তারা এ চুক্তি থেকে সরেও আসতে পারে।

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন 'ওপেক' (Organization of Petroleum Exporting Countries or OPEC): মূলত আরব' রাষ্ট্রগুলো (ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, ভেনেজুয়েলা) নিয়ে ১৯৬০ সালে এই সংগঠন গঠিত হয়। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা-১৪। যথা- সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইকুয়েডর, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কাতার, অ্যাঙ্গোলা, নিরক্ষীয় গিনি ও গ্যাবন।
এই সংস্থার উদ্দেশ্য হলো: (ক) খনিজ তেল সংক্রান্ত বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন; (খ) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে খনিজ তেল উত্তোলন নীতির সমন্বয় সাধন; এবং (গ) তৈল সংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষা।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সংগঠন বা আসিয়ান (Association of South East Asian Countries or Asean): দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশ সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক উন্নতির স্বার্থে ১৯৬৭ সালে ব্যাংককে এই আঞ্চলিক সংস্থা গঠন করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা দশটি। যথা- বুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটন: অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কারণে আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে বাণিজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো দেশই সম্পূর্ণভাবে স্বনির্ভর নয় এবং অন্যান্য দেশের ওপর বিভিন্ন পণ্য প্রাপ্তির জন্য নির্ভর করতে হয়। উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটে এবং এতে ভোক্তাও তার পছন্দের পণ্য ও সেবা পেয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটনের প্রকৃতি নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. প্রাকৃতিক সম্পদের বিভিন্নতা: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে কোনো দেশ কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদনে বেশি দক্ষ। আবার কোনো দেশ শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদনে বেশি দক্ষ। ফলে উভয় দেশের পণ্যের বিনিময় ঘটে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
২. বাণিজ্যের ক্ষেত্র: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভিন্ন সার্বভৌম দেশের মধ্যে সংঘটিত হয়। আর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংঘটিত হয়। তাই বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত।
৩. উপাদানের গতিশীলতা: উৎপাদনের উপাদানসমূহ; যেমন- শ্রম, মূলধন, উদ্যোক্তা ইত্যাদি বাণিজ্য সংঘটনে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষাগত পার্থক্য, সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য, যাতায়াত ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের উপাদানসমূহের গতিশীলতা ভিন্ন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
৪. পৃথক বাজার ব্যবস্থা: বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের রুচি, পছন্দ, অভ্যাস, ভাষা ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য থাকায় বিভিন্ন দেশের বাজারের মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়। ফলে একে অপরের বাজারব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্ভব হয়।
৫. পৃথক মুদ্রা ও ব্যাংক ব্যবস্থা: পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই পৃথক মুদ্রা ও ব্যাংক ব্যবস্থা রয়েছে। সকল দেশে একই মুদ্রা ব্যবহৃত হয় না। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ অধিক লাভের আশায় বাণিজ্য শর্ত প্রয়োগ করে এবং তা নিজের অনুকূলে রাখতে চায়। যখন উভয় দেশ একটি শর্তে রাজি হয় তখনই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
৬. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: প্রত্যেক দেশে কর ব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি, আর্থিক নীতি, শ্রম নীতির আওতায় উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের কর ব্যবস্থা, আর্থিক নীতি ইত্যাদির পার্থক্যের কারণে আন্তর্জাতিক
বাণিজ্যে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য নীতি, পৃথক বাজার ব্যবস্থা, পৃথক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদির কারণে ভিন্ন প্রকৃতির হয়।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...