hsc

পৃথিবীর প্রধান প্রধান ইকোসিস্টেম (পাঠ-৫)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(Major Ecosystems of the World)

পৃথিবীব্যাপী ইকোসিস্টেম বিভিন্ন আকারের হতে পারে। যেমন- পুকুর, হ্রদ, নদী, সাগর, মরুভূমি, বন ইত্যাদি স্থানে নির্দিষ্ট ধরনের ইকোসিস্টেম রয়েছে।

সমুদ্রের ইকোসিস্টেম (Ecosystem of Ocean/Sea)

সাগর সবচেয়ে বৃহৎ ও সর্বাপেক্ষা স্থিতিশীল ইকোসিস্টেম। ভূপৃষ্ঠে প্রায় ৭০ ভাগ স্থান দখল করে রয়েছে সাগর। এই জলভাগে স্থলভাগ হতে জীবদেহের জন্য প্রায় ৩০০ গুণ বেশি স্থান রয়েছে। অন্যান্য ইকোসিস্টেমের ন্যায় সাগরের জীবকুলও আলোর ওপর নির্ভরশীল।
একটি সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমে বিভিন্ন ধরনের সজীব উপাদান রয়েছে। যেমন:

ক. উৎপাদক (Producer): উৎপাদকগুলো সকলই স্বভোজী এবং অধিকাংশই ফাইটোপ্লাঙ্কটন। এরা সাগরের পানিতে ততটুকু গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত যতটুকু পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায়। সাগরে প্রাথমিক উৎপাদনকারীদের মধ্যে প্লাঙ্কটন উদ্ভিদই প্রধান এবং নীলাভ সবুজ, সবুজ, ধূসর ও লাল শৈবাল ইত্যাদি অন্যতম।

খ. খাদক (Consumer): এগুলো পরভোজী এবং জীবন ধারণের জন্য উৎপাদকের ওপর নির্ভরশীল। প্রাথমিক খাদকগুলো তৃণভোজী। যেমন-ক্রাস্টেশিয়ান, মোলাক্স (ঝিনুক, শামুক), শাকাশী মাছ। গৌণ খাদকের মধ্যে রয়েছে মাংসভোজী মাছ। টারশিয়ারি খাদকের মধ্যে মাংসভোজী মাছ হলো Cod, Haddock, Halibut \

গ. বিয়োজক (Decomposer): সাগরের মৃত জীবের একমাত্র বিয়োজক হলো ব্যাকটেরিয়া ও কিছু ছত্রাক। সাগরের ১ লিটার পানিতে ৫০,০০,০০০ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া জীবের বর্জ্য দ্রব্য ও মৃতদেহের ওপর ক্রিয়া করে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় অজৈব দ্রব্য বিমুক্ত করে।

শস্যক্ষেত্রের ইকোসিস্টেম (Ecosystem of Cropland)

শস্যক্ষেত্রের ইকোসিস্টেম মানবসৃষ্ট। একটি শস্যক্ষেত্রের বাস্তুতন্ত্রের পরিবেশ পদ্ধতির উপাদানগুলো হলো:
জড় উপাদান: যে অঞ্চলে শস্যক্ষেত্রটি আছে সেখানকার জলবায়ুগত অবস্থা ও মাটির খনিজ পদার্থ (C, H, O, N, P, K) ও পরিবেশ নিয়ে জড় উপাদান। এরূপ জমিতে মানুষ সার দিয়ে শস্য চাষ করে।
সজীব উপাদান : শস্যক্ষেত্রে নানান ধরনের সজীব উপাদান রয়েছে। এগুলোর বর্ণনা নিম্নরূপ-

ক. উৎপাদক: যে শস্যের চাষ করা হয় সেই উদ্ভিদই শস্যক্ষেত্রের প্রাথমিক উৎপাদক। এছাড়াও অনেক গুল্ম জন্মে। কাজেই শস্য ও এসব আগাছাগুলো শস্যক্ষেত্রের প্রাথমিক উৎপাদক।

খ. খাদক: খাদকের মধ্যে বড় ছোট তৃণভোজী প্রাণীও আছে। তৃণভোজীরা হলো- এফিড, থ্রিপস, বিটল ইত্যাদি এবং বড় তৃণভোজীর মধ্যে রয়েছে ইঁদুর, পাখি, গবাদিপশু ও মানুষ। এগুলো প্রাথমিক খাদক। গৌণ খাদকের মধ্যে রয়েছে প্রথম স্তরের মাংসাশী প্রাণী যেমন- ব্যাঙ, পাখি যারা পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে।

টারশিয়ারি খাদকের মধ্যে সেসব মাংসাশী প্রাণীকে বোঝায়, যারা প্রথম স্তরের মাংসাশী প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল যেমন- সাপ, বাজপাখি, ব্যাঙ ও ছোট পাখি।

গ. বিয়োজক: মাটি ও বায়ুর অণুজীব যারা মৃতদেহ বিয়োজিত করে জৈব পদার্থে পরিণত করে তাদেরকে বিয়োজক বলে। এরা প্রধানত ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অ্যাকটিনোমাইসেটিস। এরা মৃত জীবদেহ পচিয়ে বিজারিত করে।

অরণ্যের ইকোসিস্টেম (Ecosystem of Forest)

পৃথিবীর ৪০ ভাগ এলাকা জুড়ে বন বা অরণ্য রয়েছে। যেসব এলাকার বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি কিন্তু তাপমাত্রা বেশি নয় সেই ধরনের এলাকা অরণ্য দ্বারা আবৃত। পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রত্যেক অরণ্যে নির্দিষ্ট ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। নিম্নে একটি অরণ্যের ইকোসিস্টেমের বর্ণনা দেওয়া হলো:

অজীব উপাদান: অজীব উপাদান বলতে প্রধানত আলো, বাতাস, উত্তাপ, পানি ও মাটিকে বোঝায়। বনাঞ্চলের অবস্থাভেদে আলো ও তাপের প্রাপ্যতার মধ্যে লক্ষণীয় পার্থক্য ঘটে। তবে মাটিতে পর্যাপ্ত হিউমাস রয়েছে বলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহজে ঘটে এবং বন সৃষ্টিও সহজতর হয়। বায়ু ও পানির মাধ্যমেও উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি ঘটে থাকে।
জীব উপাদান : জীব উপাদান তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- উৎপাদক, খাদক ও বিয়োজক।

ক. উৎপাদক: উদ্ভিদই বনের উৎপাদনকারী। বনাঞ্চলের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদরাজি ভিন্নতর হয়। যেমন-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলের উদ্ভিদগুলোর (গর্জন) পাতা বড় হয়। আবার নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চলের পাতাগুলো সুঁচের মতো হয় এবং শুকনো মৌসুমে পাতা (গামার) ঝরে যায়। যেহেতু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদের পাতা বড় বড় হয় সেহেতু এদের নিচে বাঁশ, ফার্ন এবং গুল্ম জাতীয় ছায়া উদ্ভিদ জন্মে।

খ. খাদক: এদের সবাই শাকাশী এবং এরা উৎপাদকের পাতা খেয়ে বাঁচে।

i. প্রাথমিক খাদক: পিঁপড়া, মাছি, গুবরে পোকা, মাকড়সা,
ছারপোকা, পাতা ফড়িং ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য প্রাণী যেমন- হাতি, হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি।
ii. গৌণ খাদক: শৃগাল, সাপ, পাখি ও অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী।
iii. টারশিয়ারি খাদক: সিংহ, বাঘ, হায়েনা ইত্যাদি।

গ. বিয়োজক: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক প্রধান বিয়োজক হিসেবে পচন ঘটিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করে এবং সাথে সাথে উৎপাদক ও খাদকের মৃতদেহের জটিল জৈব পদার্থ সরল অজৈব পদার্থে রূপান্তরের মাধ্যমে পুনরায় মাটিতে ফিরিয়ে দেয়। বিয়োজক ছত্রাকের মধ্যে রয়েছে Aspergillus, Coprinus, Polyporus, Fusarium । কতিপয় প্রাণীও পরোক্ষভাবে পচনে সাহায্য করে এবং এদের মধ্যে রয়েছে প্রোটোজোয়া, নেমাটোডা, এনেলিডা, মিলিপেড, সেন্টিপেড ইত্যাদি।

তৃণক্ষেত্রের ইকোসিস্টেম (Ecosystem of Grassland)

পৃথিবীর প্রায় শতকরা নয় ভাগ এলাকা তৃণ দ্বারা আবৃত। যেসব এলাকায় বার্ষিক ২৫-৭৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয় সেসব স্থানে প্রচুর ঘাস জন্মে। পৃথিবীর প্রধান প্রধান তৃণক্ষেত্রের ইকোসিস্টেমের মধ্যে কানাডার বিস্তৃত সমতলভূমি, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আর্জেন্টিনা হতে ব্রাজিল এবং দক্ষিণ এশিয়া হতে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত এলাকা ইত্যাদি প্রধান।
তৃণক্ষেত্রের ইকোসিস্টেমের উপাদানগুলোকে নিম্নলিখিতভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে:
জড় উপাদান: এর মধ্যে রয়েছে কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, সালফার ইত্যাদি, যা উদ্ভিদের জৈবিক ক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড, পানি, নাইট্রেট, ফসফেট ইত্যাদি। এছাড়া উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পটাসিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, লৌহ ইত্যাদি সব ধরনের খনিজ পদার্থ মাটিতে বিদ্যমান থাকে।

সজীব উপাদান: একটি তৃণক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সজীব উপাদান থাকে। এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

ক. প্রাথমিক উৎপাদক: এদের মধ্যে Gramineae, Cyperaceae গোত্রের উদ্ভিদই প্রধান; যেমন-Dichanthium, Cynodon, Desmodium, Setaria ইত্যাদি। তাছাড়া কিছু গুল্ম ও বীরুৎ প্রাথমিক উৎপাদক হিসেবে দেখা যায়।

খ. খাদক: মুখ্য খাদক বলতে তৃণভোজী জীবজন্তুকে বোঝায়। যেমন- গরু, বাছুর, ছাগল, ভেড়া, হরিণ, মেষ, শুশুক, ইঁদুর ইত্যাদি।
গৌণ খাদকের মধ্যে সেসব মাংসাশী প্রাণীকে বোঝায় যারা মুখ্য খাদকের ওপর নির্ভরশীল, যেমন- শিয়াল, সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখি ইত্যাদি।

গ. বিয়োজক: বিভিন্ন প্রকার পরভোজী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অ্যাকটিনোমাইসেটিস বিয়োজক হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ছত্রাকের মধ্যে রয়েছে Mucor, Penicillium, Aspergillus, Rhizopus ইত্যাদি। এরা মৃত উৎপাদক ও খাদকের দেহের জটিল জৈব পদার্থের পচন ঘটিয়ে সরল পদার্থে পরিণত করে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ মাটিতে ফিরে আসে এবং উৎপাদকের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়।

মরুভূমির ইকোসিস্টেম (Ecosystem of Desert)

পৃথিবীর শতকরা ১৭ ভাগ এলাকা মরুভূমির অন্তর্গত। এসব এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৫ সে.মি. এর কম।
এরূপ ইকোসিস্টেমেও প্রজাতিবৈচিত্র্য রয়েছে। এখানে প্রচণ্ড গরম ও পানির অভাব লক্ষণীয়। মরুভূমির ইকোসিস্টেমকে
নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা যায়: মরুভূমির ইকোসিস্টেমে বিভিন্ন রকমের সজীব উপাদান রয়েছে।

ক.. উৎপাদক: গুল্ম, ঝোপ, ক্যাকটাস, মস, লাইকেন, কিছু সায়ানোব্যাকটেরিয়া, ব্রিটল বুস ইত্যাদি অন্যতম। এসব উদ্ভিদের মূল বহু শাখা-প্রশাখাযুক্ত এবং মাটির সামান্য নিচে থাকে। যার ফলে এরা কিছু বৃষ্টিপাত হলেই পানি গ্রহণ করতে পারে। অল্প কিছু মরুজ উদ্ভিদের পাতাগুলো সুঁচের আকার হয়, এতে এদের প্রস্বেদনের হার হ্রাস পায়। এছাড়া ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদের কাণ্ড রসালো থাকে যাতে এরা পর্যাপ্ত পানি জমা রাখে এবং প্রয়োজনের সময় এই পানি দ্বারা জৈবিক ক্রিয়া চালিয়ে যায়।

খ. খাদক: এই পরিবেশে উৎপাদকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে এদের ওপর নির্ভরশীল খাদকের সংখ্যাও কম হয়। মরু খাদকের মধ্যে রয়েছে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী, কীট-পতঙ্গ, নৈশ রোডেন্ট, উট। গাছপালার কচি অংশ খেয়ে জীবন ধারণ করে, এরূপ প্রাণী এ অঞ্চলে দেখা যায়।

গ. বিয়োজক: মরুভূমিতে বিয়োজকের সংখ্যা খুবই অল্প থাকে। সেজন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ পচে হিউমাস তৈরি না হয়ে অত্যধিক তাপে এগুলো শুকিয়ে যায়। এজন্য মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পেতে পারে না।

জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...