(BottomTopography of the Bay of Bengal)
ভারতীয় উপদ্বীপের পূর্বদিকে ও বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশের নাম বঙ্গোপসাগর, যার তিন দিকই স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত। শুধু দক্ষিণ দিকে উন্মুক্ত ভারত মহাসাগর। আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর (International Hydrographic Bureau) জরিপ অনুযায়ী এর দক্ষিণ দিকের সীমারেখা নির্ধারিত হয়েছে একটি বিশেষ কাল্পনিক রেখার সাহায্যে, যা শ্রীলঙ্কার সর্ব দক্ষিণ বিন্দু ডড্রা হেডকে (Dondra Head) সুমাত্রা দ্বীপের সর্ব উত্তর বিন্দুতে সংযোজিত করেছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অবস্থিত। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বঙ্গোপসাগরকে পূর্বদিকের আন্দামান সাগর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
আয়তন ও গভীরতার দিক থেকে বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর সাগরগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর আয়তন প্রায় ২.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এবং গড় গভীরতা ২৬০০ মিটার ও সর্বোচ্চ গভীরতা ৫২৫৮ মিটার। বঙ্গোপসাগরের তলদেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ৯০° পূর্ব শৈলশিরা (ninety degree east ridge), বেঙ্গল ডিপ সি ফ্যান (bengal deep sea fan), নিকোবর ফ্যান (nicobar fan), সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (swatch of no ground), বার্মা খাত (burma trench) ও চাগোস পূর্ব-উপকূল খাত (chagos east coast trench) উল্লেখযোগ্য। ৯০° পূর্ব শৈলশিরা বঙ্গোপসাগরের মাঝখান দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর বিস্তৃত। এ শৈলশিরা
জেনে রাখো:
১৪ মার্চ, ২০১২ সালে বাংলাদেশ-মায়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত থেকে বাংলাদেশ ন্যায্যভিত্তিক দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক রায় পায়। এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ প্রায় এক লক্ষ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জলসীমা পেয়েছে। বাংলাদেশ এ রায়ের মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে উপকূলীয় বেজলাইন ধরে ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা (territorial sea) এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল বা একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল (exclusive economic zone) পেয়েছে।
উত্তর অক্ষাংশ থেকে আরম্ভ করে ৩০° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ৯০° পূর্ব শৈলশিরার পশ্চিমে বেঙ্গল ফ্যান ও পূর্বে নিকোবর ফ্যান অবস্থিত। বেঙ্গল ডিপ সি ফ্যান ২০০ উত্তর অক্ষাংশ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০০০ কিলোমিটার প্রশস্ত (curray and moore, 1971)। নিকোবর ফ্যানের পূর্ব প্রান্তে আন্দামান সুন্দা ট্রেন্স (andaman sunda trench) অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূপ্রাকৃতিক ও ভূমিরূপগত বৈশিষ্ট্য হলো গঙ্গা গিরিখাত (ganges canyon), যা সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (swatch of no ground) নামে বিশেষভাবে পরিচিত। এটি একটি অত্যন্ত খাড়া তীরবিশিষ্ট সামুদ্রিক গিরিখাত, যা উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রশস্ত ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উপস্থিতি জোয়ার-ভাটা, পললের গতিবিধি ও অবক্ষেপণ, পানির গতি-প্রকৃতি ও ভূমিরূপের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ ক্যানিয়নের উৎপত্তি ও ভূমিরূপ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীবাহিত পলি সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের মধ্য দিয়ে টারবিডিটি স্রোতের মাধ্যমে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দক্ষিণে পরিবাহিত হয়। এ পলি মিশ্রিত স্রোত বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অগভীর খাতের সৃষ্টি করে শিরা-উপশিরার আকারে জালের বেষ্টন নির্মাণ করেছে, যাকে বেঙ্গল ফ্যান (bengal fan) বা গাঙ্গেয় ফ্যান (ganges fan) বলা হয়। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে আর এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে নদীবাহিত তলানি দ্বারা সমুদ্র তলদেশ বঙ্গোপসাগরের মতো এতটা প্রভাবিত হয়।
বঙ্গোপসাগরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিরূপগত বৈশিষ্ট্য হলো বার্মা খাত। এটি সমুদ্রের তলদেশে লম্বা, কিন্তু সরু ও তুলনামূলকভাবে খাড়া ঢালবিশিষ্ট নিম্নভূমি। এটি বঙ্গোপসাগরের পূর্ব প্রান্তে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বার্মা উপকূল বরাবর অবস্থিত। চাগোস পূর্ব-উপকূল খাত খুলনার পশুর নদীর মোহনার নিকট থেকে আরম্ভ করে শ্রীলংকা অতিক্রম করে আরও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more