hsc

পাঠ-৫: খনিজ তেল উৎপাদন বলয়

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(Mineral Oil Producing Belf)

খনিজ তেল উৎপাদন বা উত্তোলনকারী দেশসমূহকে ৬টি প্রধান বলয়ে ভাগ করা হয়েছে। যেমন-

ক. আমেরিকান তেল বলয়: এ বলয়ভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় ৩০ ভাগ উৎপাদন করে। নিচে দেশগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো

১. যুক্তরাষ্ট্র: ২০১৮ সালে তেল উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান বিশ্বে প্রথম। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা, কানসাস, ওকলাহোমা, আরাকানসাস, উত্তর টেক্সাস, মনটানা প্রভৃতি অধ্যল খনিজ তেল সমৃদ্ধ। দেশটির আনুমানিক মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬১.২ বিলিয়ন ব্যারেল।
২. কানাডা: তেল উৎপাদনে কানাডা বিশ্বে চতুর্থ। এ দেশের আনুমানিক তেলের মজুদ প্রায় ১৬৭.৮ বিলিয়ন ব্যারেল। এখানকার তেলক্ষেত্রগুলো আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল, ভ্যানকুভার, এডমেন্টন, নিউফাউন্ডল্যান্ড এবং আলবার্টায় অবস্থিত।
৩. ব্রাজিল: ২০১৮ সালে বিশ্বের দশম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল। দেশটির দৈনিক উত্তোলনযোগ্য অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ প্রায় ১৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেল।
৪. মেক্সিকো: মেক্সিকো বিশ্বের একাদশতম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। মেক্সিকোর গুয়ানাজুয়াটা, ডুইরিটারো পেপোকেটিপে, ইউকাটন, মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল খনিজ তেলের জন্য বিখ্যাত। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২.০৭ মিলিয়ন ব্যারেল।
৫. ভেনিজুয়েলা: ভেনিজুয়েলা বিশ্বের ১৩তম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। এদেশের ম্যারাকাইবো এবং ওরিনকো নদীর অববাহিকায় প্রচুর খনিজ তেল উত্তোলিত হয়। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১.৫১ মিলিয়ন ব্যারেল।
৬. অন্যান্য দেশ: উপরিউক্ত দেশগুলো ছাড়াও আমেরিকান তেল বলয়ে অবস্থিত কলম্বিয়া (২১ তম), ইকুয়েডর (২৬ তম), আর্জেন্টিনা (২৭ তম), পেরু, প্রভৃতি দেশেও খনিজ তেল উত্তোলন করা হয়।

খ. ইউরোপীয় তেল বলয়:

১. রাশিয়া: বর্তমানে রাশিয়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ইউরোপে প্রথম খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির তাজিক, ওবলং, পশ্চিম সাইবেরিয়া, ইউরাল, কিরঘিজ, আমুর নদীর অববাহিকা প্রভৃতি অঞ্চল খনিজ তেলে সমৃদ্ধ। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক তেল উত্তোলনের পরিমাণ প্রায় ১১.৪৪ মিলিয়ন ব্যারেল।
২. যুক্তরাজ্য: খনিজ তেল উৎপাদনে যুক্তরাজ্যের অবস্থান বিশ্বে ২০তম এবং ইউরোপে দ্বিতীয়। উত্তর সাগর উপকূলীয় এলাকা যুক্তরাজ্যের প্রধান তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১.০৬ মিলিয়ন ব্যারেল।
৩. রুমানিয়া: রুমানিয়া ইউরোপের তৃতীয় প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। এদেশের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো বুজান, পারহোভা, বাকাউ, ডামবোরিজা এবং সিবিটিতে অবস্থিত। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ০.৭৪ মিলিয়ন ব্যারেল।
৪. অন্যান্য: ইউরোপের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ে (১৫ তম), ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

গ. মধ্যপ্রাচ্যের তেল বলয়:

১. সৌদি আরব: তেল উৎপাদনে সৌদি আরবের স্থান বর্তমান বিশ্বে দ্বিতীয়। সৌদি আরবের হাসা, সাকানিয়া, আবকাইক, দাম্মাম, মারজান, বারগান, হুফুফ, দাহবান, কুয়াতিক অঞ্চল খনিজ তেলের জন্য প্রসিদ্ধ।
২. ইরান: এটি বিশ্বের পঞ্চম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ইরানের প্রধান তেল খনিগুলো মসজিদ-ই-সুলাইমান, লালী, নাফট সাফিদ, আঘাজারি, হাফট কেল, হামদান প্রভৃতি অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৪.৭১ মিলিয়ন ব্যারেল।
৩. ইরাক: ২০১৮ সালে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরাক। দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ প্রায় ৪.৬১ মিলিয়ন ব্যারেল। কালফাইয়া, হারমিন, কিরকুক, মাজনুন ইরাকের বিখ্যাত তেলক্ষেত্র।
৪. সংযুক্ত আরব আমিরাত: ২০১৮ সালে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ, যার দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ৩.৯৪ মিলিয়ন ব্যারেল। দেশটির মোট তেলের অধিকাংশই আবুধাবিতে মজুদ রয়েছে।
৫. কুয়েত: বিশ্বের নবম তেল উৎপাদনকারী দেশ হলো মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত। পৃথিবীর মোট সঞ্চিত তেলের প্রায় ৩.৪% এখানে বিদ্যমান। দেশটিতে ২০১৮ সালে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩.০৫ মিলিয়ন ব্যারেল। বারহান, মাগওয়া, আহামাদি এদেশের শ্রেষ্ঠ তেল উৎপাদন কেন্দ্র।

ঘ. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেল বলয়:

১ চীন: খনিজ তেল উৎপাদনে চীন-এই অঞ্চলে প্রথম এবং বিশ্বে অষ্টম। চীনের কারমাই, সাইডাম অববাহিকা, কানসু প্রদেশের ইউসেন, নানচুং প্রভৃতি অঞ্চল খনিজ তেল সমৃদ্ধ। ২০১৮ সালে দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৮০ মিলিয়ন ব্যারেল।

২.ইন্দোনেশিয়া: খনিজ তেল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ২২ তম দেশ। এদেশের সুমাত্রা, জাভা ও কালিমান্তান দ্বীপে প্রচুর তেল পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ০.৮০ মিলিয়ন ব্যারেল।

৩. অন্যান্য দেশ: উপরিউক্ত দেশগুলো ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাজাকিস্তান (১৬ তম), জাপান, ভারত (২৪ তম), মায়ানমার, মালয়েশিয়া (২৫ তম) পাকিস্তান (৪৩ তম), তুর্কমেনিস্তান প্রভৃতি দেশেও খনিজ তেল উত্তোলিত হয়।

ঙ. আফ্রিকান তেল বলয়:

১. নাইজেরিয়া: খনিজ তেল উৎপাদনে নাইজেরিয়ার অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম এবং বিশ্বে বারতম। দেশটির ল্যাগোস এবং নাইজার নদীর অববাহিকা অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল উত্তোলন করা হয়। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ২.০৫ মিলিয়ন ব্যারেল।
২. অ্যাঙ্গোলা: বর্তমান বিশ্বের ১৪ তম এবং আফ্রিকার ২য় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ অ্যাঙ্গোলা। দেশটির হোম্বো, 'কুইটো প্রভৃতি স্থানে খনিজ তেল পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ১.৫৩ মিলিয়ন ব্যারেল।
৩. আলজেরিয়া: এটি আফ্রিকার অন্যতম খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বে এর স্থান ১৮ তম এবং আফ্রিকায় ৩য়। আলজেরিয়ার পূর্ব সীমান্তের হাসিমাসাউদ এবং ইজেলি তেল উত্তোলনে প্রসিদ্ধ। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ১.৫১ মিলিয়ন ব্যারেল।
৪. লিবিয়া: লিবিয়া বিশ্বের ২৯ তম এবং আফ্রিকার চতুর্থ খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ। লিবিয়ার প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো দাহারান, জেলটেন এবং হমস অঞ্চলে অবস্থিত। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ১.০১ মিলিয়ন ব্যারেল।
৫. অন্যান্য দেশ: আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে সুদান, দক্ষিণ সুদান, চাঁদ, ঘানা, ক্যামেরুন প্রভৃতি দেশগুলোও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ তেল উত্তোলন করে থাকে।

চ.ওশেনিয়ার তেল বলয়: এ অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া (৩২ তম) ও নিউজিল্যান্ডে (৫৭ তম) খনিজ তেল পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে দেশ দুটিতে দৈনিক যথাক্রমে ০.৩৫ এবং ৩.৫৬ মিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেল উত্তোলিত হয়।

খনিজ তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য

খনি হতে উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ইরান, ভেনিজুয়েলা, ইরাক, আলজেরিয়া, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ। এছাড়া আমদানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কলম্বিয়া, পেরু, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, জাপান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে রপ্তানিতে সৌদি আরব প্রথম, রাশিয়া দ্বিতীয়, নরওয়ে তৃতীয় এবং আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম, জাপান দ্বিতীয় এবং চীন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

খনিজ তেলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

খনিজ তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। বিশ্বের খনিজ তেলে সমৃদ্ধ দেশগুলো যথেষ্ট উন্নত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে খনিজ তেল 'তরল সোনা' হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলের খনিজ তেল বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে খনিজ তেলের গুরুত্ব অপরিসীম। খনিজ তেলের বহুমুখী ব্যবহার আধুনিক যুগে মানুষকে এর ওপর এত বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে যে, এটি ছাড়া মানুষ এক মুহূর্ত চলতে পারে না। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, গৃহস্থালির কাজ, শক্তি উৎপাদনসহ উন্নয়নের নানাবিধ ক্ষেত্রে খনিজ তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...