বাণিজ্য (Trade) (অষ্টম অধ্যায়)

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

Trade

চাহিদামতো দ্রব্য ভোক্তার নিকট পৌছার প্রয়োজনেই বাণিজ্যের উদ্ভব। বৈচিত্র্যময় এ পৃথিবীর বুকে ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে সর্বত্র সকল পণ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই পণ্য বণ্টনের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর তখনই বাণিজ্যের প্রয়োজন হয়। কোনো দেশের সাথে এক বা একাধিক স্বাধীন দেশের যে বাণিজ্য সংঘটিত হয় তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ খুব দাপুটে নয়। তবে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা থাকায় দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে খুবই সক্রিয়। বাংলাদেশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রচলিত, অপ্রচলিত পণ্য এবং জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে। জনবহুল দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জনশক্তি রপ্তানি অত্যন্ত সুফলদায়ক। আমদানিকারক দেশগুলোও বাংলাদেশ থেকে সহজে জনশক্তি আমদানি করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

(Nature of trade and International trade)

যখন কোনো দেশ তার ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে অবস্থিত এক বা একাধিক দেশের সাথে দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকার্যের আদান প্রদান করে তখন তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাগ (যেমন- শ্রমের যোগানের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প) ও ভৌগোলিক বিশেষীকরণই (Geographic factors) হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি। ভৌগোলিক বিশেষীকরণের (ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, প্রভৃতি পার্থক্যের কারণে কোনো বিশেষ দেশ বা রাষ্ট্র বিশেষ দ্রব্য উৎপাদনে আপেক্ষিক সুবিধা লাভ করে। যেমন- বাংলাদেশে পাটশিল্প) ওপর ভিত্তি করেই মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যের প্রকৃতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকান নেতৃত্বে পুঁজিবাদ এবং চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির যে বিকাশ তার গতিধারা অধুনা একেবারেই পাল্টে গিয়েছে। চীন, রাশিয়া, ভারত এখন বিশ্ববাজারে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফল। বরং বলা হচ্ছে চীন অচিরেই বিশ্ব বাণিজ্যের শীর্ষ স্থান অধিকার করবে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পুঁজি ও বাণিজ্য নতুন যুগের সূচনা করেছে। ইতোমধ্যে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (চীন, জাপান, কানাডা) অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে অধিক গতিশীল অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। এশিয়া এখন বিশ্ববাণিজ্যে ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। ৪। এর বেশ কিছু দেশ (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত) টেলিভিশন, কম্পিউটার, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য কম খরচে তৈরি করা তৈরি করা শুরু করেছে। তারা নতুন সম্প্রসারিত বাজারব্যবস্থা থেকে অধিক লাভ আশা করছে।

ইউরোপের বাণিজ্য প্রকৃতি এশিয়া থেকে ভিন্ন। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো পুনরায় নির্মাণ করা যায় এরূপ পণ্য (যেমন-পোল্যান্ডের ফার্নিচার সামগ্রী; দরজা, জানালা ইত্যাদি) বাইরের দেশগুলোতে রপ্তানি করে থাকে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো মনে করে বিশ্বের অন্যান্য এলাকা থেকে তাদের পণ্য ও সেবাসমূহের মান উন্নত ও চাহিদাসম্পন্ন। ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ইত্যাদি দেশগুলো নতুন ভোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে আধুনিক গৃহসামগ্রী, ভবন ও নির্মাণ উপকরণ এবং তথ্য-প্রযুক্তির ক্রেতা সৃষ্টি করছে। তবে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা বা সুফল নিজের অনুকূলে রাখতে বিভিন্ন সংগঠনে যোগদান করছে, সেই সাথে নিত্য নতুন চুক্তিও সম্পাদন করছে। যেমন-

ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘ (European Free Trade Association or EFTA)

১৯৬০ সালে যুক্তরাজ্য উদ্যোগী হয়ে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পর্তুগাল, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডকে নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য স্টকহোমে ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘ (EFTA) গঠন করে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি দেশ এ সংস্থা ত্যাগ করে। যেমন- ১৯৭২ সালে ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্য এবং ১৯৮৫ সালে পর্তুগাল। ১৯৯৫ সালে অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড (যোগদান ১৯৮৬ সালে) এবং সুইডেন এ সংস্থা ত্যাগ করে। অন্যদিকে ১৯৭০ সালে আইসল্যান্ড এবং ১৯৯১ সালে লিচেনস্টাইন পূর্ণ সদস্যরূপে এই সংঘে যোগদান করে। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্যদেশ ৪টি; যথা- আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইন। ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য সংঘের সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত।

EFTA এর উদ্দেশ্য হলো-(১) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্কবিহীন অবাধ বাণিজ্য সম্পাদন করা; (২) পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে একটি বাজারে পরিণত করার জন্য সাহায্য করা; এবং (৩) বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নতিসাধন করা।

উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (North America Free Trade Agreement or NAFTA): কানাডা, মেক্সিকো
ও যুক্তরাষ্ট্র ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সালে বাণিজ্য ও পরিবেশ-সংক্রান্ত যে চুক্তি সম্পাদন করে, তার নাম উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে ১৯৯৪ সালে ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ১৫ বছরের মধ্যে আলোচ্য তিন দেশের মধ্যে পণ্য ও পরিসেবা বিষয়ক যাবতীয় বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। বর্তমানে এ চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আমেরিকা এ চুক্তির ধারাগুলোর সংস্করণে আলোচনার দাবি করে। এমন কী তারা এ চুক্তি থেকে সরেও আসতে পারে।

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন 'ওপেক' (Organization of Petroleum Exporting Countries or OPEC): মূলত আরব' রাষ্ট্রগুলো (ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, ভেনেজুয়েলা) নিয়ে ১৯৬০ সালে এই সংগঠন গঠিত হয়। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা-১৪। যথা- সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইকুয়েডর, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কাতার, অ্যাঙ্গোলা, নিরক্ষীয় গিনি ও গ্যাবন।
এই সংস্থার উদ্দেশ্য হলো: (ক) খনিজ তেল সংক্রান্ত বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন; (খ) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে খনিজ তেল উত্তোলন নীতির সমন্বয় সাধন; এবং (গ) তৈল সংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষা।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সংগঠন বা আসিয়ান (Association of South East Asian Countries or Asean): দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশ সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক উন্নতির স্বার্থে ১৯৬৭ সালে ব্যাংককে এই আঞ্চলিক সংস্থা গঠন করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা দশটি। যথা- বুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটন: অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কারণে আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে বাণিজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো দেশই সম্পূর্ণভাবে স্বনির্ভর নয় এবং অন্যান্য দেশের ওপর বিভিন্ন পণ্য প্রাপ্তির জন্য নির্ভর করতে হয়। উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটে এবং এতে ভোক্তাও তার পছন্দের পণ্য ও সেবা পেয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটনের প্রকৃতি নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. প্রাকৃতিক সম্পদের বিভিন্নতা: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে কোনো দেশ কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদনে বেশি দক্ষ। আবার কোনো দেশ শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদনে বেশি দক্ষ। ফলে উভয় দেশের পণ্যের বিনিময় ঘটে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
২. বাণিজ্যের ক্ষেত্র: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভিন্ন সার্বভৌম দেশের মধ্যে সংঘটিত হয়। আর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংঘটিত হয়। তাই বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত।
৩. উপাদানের গতিশীলতা: উৎপাদনের উপাদানসমূহ; যেমন- শ্রম, মূলধন, উদ্যোক্তা ইত্যাদি বাণিজ্য সংঘটনে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষাগত পার্থক্য, সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য, যাতায়াত ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের উপাদানসমূহের গতিশীলতা ভিন্ন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
৪. পৃথক বাজার ব্যবস্থা: বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের রুচি, পছন্দ, অভ্যাস, ভাষা ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য থাকায় বিভিন্ন দেশের বাজারের মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়। ফলে একে অপরের বাজারব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্ভব হয়।
৫. পৃথক মুদ্রা ও ব্যাংক ব্যবস্থা: পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই পৃথক মুদ্রা ও ব্যাংক ব্যবস্থা রয়েছে। সকল দেশে একই মুদ্রা ব্যবহৃত হয় না। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ অধিক লাভের আশায় বাণিজ্য শর্ত প্রয়োগ করে এবং তা নিজের অনুকূলে রাখতে চায়। যখন উভয় দেশ একটি শর্তে রাজি হয় তখনই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়।
৬. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: প্রত্যেক দেশে কর ব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি, আর্থিক নীতি, শ্রম নীতির আওতায় উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের কর ব্যবস্থা, আর্থিক নীতি ইত্যাদির পার্থক্যের কারণে আন্তর্জাতিক
বাণিজ্যে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য নীতি, পৃথক বাজার ব্যবস্থা, পৃথক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদির কারণে ভিন্ন প্রকৃতির হয়।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Top exporting countries in the world and exported materials)

একটি দেশের বাইরে পণ্য ও সেবাসমূহের স্থানান্তরকে রপ্তানি বলে। বিক্রয়কারী যখন তার দেশের পণ্য অর্থের বিনিময়ে বিদেশে প্রেরণ করে তখন সেটিকে রপ্তানিকারী বা রপ্তানিকারক দেশ বলে। অর্থাৎ একটি দেশ তার অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য বিদেশি চাহিদার কারণে এবং অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সেখানে প্রেরণ করলে তাকে রপ্তানি বলে। বর্তমানে (২০১৮) সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে প্রথম হচ্ছে চীন, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে জার্মানি। ২০০৮ সালে জার্মানি সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ১ম এবং চীন ছিল ২য় অবস্থানে কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বর্তমানে (২০১৮) চীন সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ। নিচে সর্বোচ্চ ১০টি রপ্তানিকারক দেশ ও রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দেখানো হলো;

সারণি-৮.১: বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ (২০১৮)

দেশরপ্তানি আয় (বিলিয়ন ডলার)দেশরপ্তানি আয় (বিলিয়ন ডলার)
১. চীন২৪৯৪৬. নেদারল্যান্ড৫৮৫.৬
২. যুক্তরাষ্ট্র১৬৬৬৭. ফ্রান্স৫৬৮.৪
৩. জার্মানি১৫৫৭৮. ইতালি৫৪৩.৬
৪. জাপান৭৩৮.২৯. যুক্তরাজ্য৪৮৭.১
৫. দ: কোরিয়া৬০৫.২১০. বেলজিয়াম৪৬৬.৭

উৎস: www.worldtopexports.com, 2019

চীনের রপ্তানি পণ্যসমূহ

চীন বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।
২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে চীনের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১,২০১.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৮ তে দাঁড়িয়েছে ২৪৯৪ বিলিয়ন ডলারে। চীন যেসব পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে সেগুলো হলো খেলনা, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, গৃহসামগ্রী, জুতা, কাপড়, খাদ্যদ্রব্য, সামুদ্রিক খাদ্য, জুয়েলারি, রান্নাঘরের সামগ্রী, ব্যাগ ইত্যাদি।

ক. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি: চীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে। ২০১৮ সালে এ খাত থেকে ৬৬৪.৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রপ্তানির ২৬.৬ শতাংশ।

খ. কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ: এ খাত থেকে চীন স্বতন্ত্রভাবে ২০১৮ সালে ৪৩০ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ১৭.২ শতাংশ।

গ. ফার্নিচার সামগ্রী (গৃহস্থালির টেক্সাইল, আলোকসজ্জাসহ): এ খাতে থেকে চীন ৯৬.৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ৩.৯ শতাংশ।

ঘ. প্লাস্টিক সামগ্রী: প্লাস্টিক সামগ্রীর মধ্যে বিভিন্ন খেলনা পণ্য রয়েছে। এ খাতটি চীনে সর্বাধিক দ্রুত বর্ধনশীল। চীন প্লাস্টিক সামগ্রী রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম। ২০১৮ সালে চীন ৮০.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের প্লাস্টিক সামগ্রী রপ্তানি করে, যা মোট রপ্তানির ৩.২ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যসমূহ

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। ২০১৮ সালে দেশটির বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ১৬৬৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

ক. মেশিনারিজ ও কম্পিউটার: ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণে মেশিনারিজ (কম্পিউটারসহ) বিদেশে রপ্তানি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মেশিনারিজের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। এ খাত থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২১৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ১২.৮%।

খ. খনিজ জ্বালানি: ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৯.৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজ জ্বালানি (তেলসহ) রপ্তানি করে, যা মোট রপ্তানির ১১.৪ শতাংশ।
গ. ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি: সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রিক পণ্য বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করে। ২০১৮ সালে এসব যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে দেশটি মোট রপ্তানি আয়ের ১০.৬ শতাংশ অর্জন করে, যার মূল্যমান ছিল ১৭৬.১ বিলিয়ন ডলার।
ঘ. বিমান ও নভোযান পণ্য: যুক্তরাষ্ট্র বিমান ও নভোযানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর
অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে এই শিল্পের কাঁচামালের বৃহৎ কারখানা গড়ে উঠেছে। এ সব কারখানায় উৎপাদিত বিমান প্রস্তুত ও মেরামতের পণ্যসমূহ সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। ২০১৮ সালে এ খাতে রপ্তানি ছিল ১৩৯.১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৮.৪ শতাংশ।
ঙ. পরিবহন যান: ২০১৮ সালে পরিবহন যান (Vehicle) রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্র ১৩০.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ৭.৮ শতাংশ।

জার্মানির রপ্তানি পণ্যসমূহ

জার্মানি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ইউরোপে প্রথম রপ্তানিকারক দেশ। ২০১৮ সালে জার্মানির মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জার্মানির প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, খাদ্য সামগ্রী, মোটর গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পদার্থ, কম্পিউটার ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, বৈদ্যুতিক সরাঞ্জাম, ওষুধপত্র, ধাতুর যন্ত্রাংশ, পরিবহন যন্ত্রপাতি, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদি।

ক. কম্পিউটার হার্ডওয়‍্যার এবং ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস: জার্মানির বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে কম্পিউটার
হার্ডওয়‍্যার এবং ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস উল্লেখযোগ্য। হার্ডওয়্যার এর মধ্যে কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ, রেডিও ও টিভির যন্ত্রপাতি রয়েছে। ২০১৮ সালে এ খাতে মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭১.৭ বিলিয়ন ডলার যা মোট রপ্তানির ১৭.৫%।

খ. পরিবহন যান: জার্মানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করে তার মধ্যে মোটর গাড়ি ও পরিবহন যান (Vehicle) ও এর যন্ত্রাংশ রপ্তানি অন্যতম। দেশটির রপ্তানি পণ্যের মোট ১৬.৯ শতাংশই হচ্ছে মোটর গাড়ি। মোটর গাড়ি জার্মানির প্রধান রপ্তানি পণ্য। ২০১৮ সালে এ খাত থেকে জার্মান ২৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে।

গ. মেশিনারিজ: জার্মানির রপ্তানিকৃত মেশিনারিজ পণ্যের মধ্যে রয়েছে মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি, ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, সাউন্ড রেকর্ডার, টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ ইত্যাদি। জার্মানির মোট রপ্তানির ১০.৫% ই হচ্ছে মেশিনারিজ পণ্য, যার মোট পরিমাণ ১৬৩.৮ বিলিয়ন ডলার।

ঘ. ফার্মাসিউটিক্যালস: জার্মান ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প ২০১৮ সালে ৯৬.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানি করে, যা মোট রপ্তানির ৬.২%।

ঙ. অপটিক্যাল, মেডিক্যাল সামগ্রী: জার্মানি ২০১৮ সালে ৮০ বিলিয়ন ডলার মেডিক্যাল সামগ্রী রপ্তানি করে, যা মোট রপ্তানির ৫.১ শতাংশ।

উৎস: www.worldtopexports.com

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Top Exporting countries in the world and Exported materials: Japan, South Koria, France & Netherlands)

বর্তমানে জাপান বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ৪র্থ বৃহত্তম দেশ। ২০১৮ সালে জাপানের মোট রপ্তানির পরিমাণ ৭৩৮.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপানের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে সড়ক ও রেলগাড়ির যন্ত্রপাতি, মেশিনারিজ, ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি; টেকনিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি; লৌহ ও ইস্পাত, প্লাস্টিক সামগ্রী, ভেষজ রাসায়নিক (Organic Chemical) ইত্যাদি। জাপানের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্প কারখানাগুলো পণ্য রপ্তানিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

ক. রেল ও মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ: জাপানের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক পণ্য রেল ও মোটরগাড়ির যন্ত্রপাতি। জাপান নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার করে রেলগাড়ি ও মোটরগাড়ি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করে। নিজস্ব চাহিদা মেটাবার পর এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিবছর রেল ও মোটরগাড়ির যন্ত্রপাতি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। ২০১৮ সালে জাপান তার দেশের মোট রপ্তানির মধ্যে রেল ও মোটর যন্ত্রাংশ থেকে আয় করে ১৫৪.১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ২০.৯%।

খ. মেশিনারিজ ও কম্পিউটার: জাপানের বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে মেশিনারিজ (কম্পিউটারসহ) দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। বিভিন্ন পণ্যের মেশিনারি যন্ত্রাংশ বিদেশে রপ্তানি করে জাপান ২০১৮ সালে ১৪৮.০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এটা মোট রপ্তানি আয়ের ২০.১%।

গ. ইলেক্ট্রনিক্স উপকরণ: ইলেক্ট্রনিক্স উপকরণ উৎপাদনে জাপান বিশ্বে সমাদৃত। বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ২০১৮ সালে জাপান ১০৯.৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে ইলেক্ট্রনিক্স উপকরণ রপ্তানির মাধ্যমে। এই রপ্তানি আয় জাপানের মোট রপ্তানি আয়ের ১৪.৮%। জাপান ইলেক্ট্রনিক্স উপকরণ উৎপাদনে বিশ্বের সকল দেশে সুপরিচিত বলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে জাপানে এর উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঘ . অপটিক্যাল, টেকনিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি: জাপান অপটিক্যাল, টেকনিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি উৎপাদনে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। ২০১৮ সালে জাপানের সকল রপ্তানি পণ্যের মধ্যে অপটিক্যাল, টেকনিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। এ খাতে পণ্য রপ্তানি করে জাপানের ৪১.৩ বিলিয়ন ডলার আয় হয়, যা মোট রপ্তানির ৫.৬%।

ঙ. লৌহ ও ইস্পাত: লৌহ থেকে লৌহ শলাকা, বিভিন্ন ইস্পাত দ্রব্য উৎপাদনে জাপান বেশ এগিয়ে গেছে। জাপান লৌহ ও ইস্পাত দ্রব্য রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। ২০১৮ সালে লৌহ ও ইস্পাত দ্রব্য রপ্তানি করে জাপানের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ২৯.৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৪.১%।

দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি পণ্যসমূহ

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রপ্তানির পরিমাণ ৬০৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে খনিজ জ্বালানি, প্রযুক্তির কাঁচামাল, মেশিনারি, অটোমোবাইলস, জাহাজ, এলসিডি ডিভাইস, লৌহ ও ইস্পাত, প্লাস্টিক সামগ্রী ইত্যাদি।

ক. ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি: সারা বিশ্বে দক্ষিণ কোরিয়া ইলেকট্রিক মেশিনারিজ পণ্য বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করে। ২০১৮ সালে ইলেকট্রিক মেশিনারিজ রপ্তানি করে দেশটি মোট রপ্তানি আয়ের ৩০.৫ শতাংশ অর্জন করে, যার মূল্যমান ছিল ১৮৪.৬ বিলিয়ন ডলার।

খ. মেশিনারিজ ও কম্পিউটার: ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া বিপুল পরিমাণে মেশিনারিজ (কম্পিউটারসহ) বিদেশে রপ্তানি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোরিয়ার মেশিনারিজের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। এ খাত থেকে ২০১৮ সালে দেশটি ৭৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ১২.৮%।

গ. পরিবহন যান: ২০১৮ সালে পরিবহন যান (Vehicle) রপ্তানি করে দক্ষিণ কোরিয়া ৬১.২ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ১০.১ শতাংশ।

ঘ. খনিজ জ্বালানি খনিজ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি রপ্তানি করে দক্ষিণ কোরিয়া ২০১৮ সলে ৪৮.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ৮ শতাংশ।

নেদারল্যান্ডের রপ্তানি পণ্যসমূহ

বর্তমানে নেদারল্যান্ড বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৮৫.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নেদারল্যান্ডের প্রধান প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে মেশিনারি এবং পরিবহন যন্ত্রপাতি, খনিজ জ্বালানি, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপত্র, কাপড় এবং জুতামোজা ইত্যাদি অন্যতম। নেদারল্যান্ড মোট রপ্তানির ৬০% রপ্তানি করে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে।

ক. মেশিনারিজ ও কম্পিউটার নেদারল্যান্ডের বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে মেশিনারিজ (কম্পিউটারসহ) শীর্ষস্থানীয় রপ্তানি পণ্য। বিভিন্ন পণ্যের মেশিনারি যন্ত্রাংশ বিদেশে রপ্তানি করে নেদারল্যান্ড ২০১৮ সালে ৯৯.৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এটা মোট রপ্তানি আয়ের ১৩.৮%।

খ. খনিজ জ্বালানি খনিজ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি নেদারল্যান্ডের রপ্তানি আয়ে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী। ২০১৮ সালে দেশটি খনিজ তেল রপ্তানি করে ৯৭.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ১৩.৪ শতাংশ।

গ. ইলেকট্রনিক্স উপকরণ: ইলেকট্রনিক্স উপকরণ উৎপাদনে নেদারল্যান্ড সমাদৃত। বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ড ৯৪.৩ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে ইলেকট্রনিক্স উপকরণ রপ্তানির মাধ্যমে। এই রপ্তানি আয় নেদারল্যান্ডের মোট রপ্তানি আয়ের ১৩%।

ঘ. ফার্মাসিউটিক্যালস: নেদারল্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প থেকে ২০১৮ সালে ৪৩.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানি আয় করে যা মোট রপ্তানির ৬%।

ফ্রান্সের রপ্তানি পণ্যসমূহ

বর্তমানে ফ্রান্স বিশ্বের রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। ফ্রান্স বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে ১৯৯৫ সালে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেই দেশটির অধিক বাণিজ্য ঘটে। এর বাইরেও এ দেশ আফ্রিকা ও এশিয়াতে অধিক পণ্য রপ্তানি করে।

ফ্রান্সের যেসব পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মেশিনারি এবং পরিবহন যন্ত্রপাতি, বিমান পণ্যাদি, প্লাস্টিক সামগ্রী, রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধপত্র, লোহা, ইস্পাত, ভোগ্যপণ্য, পেট্রোলিয়াম এবং মোটরগাড়ি ও যন্ত্রাংশ। এসব পণ্য রপ্তানিতে ফ্রান্সের অংশীদার নিকটতম সহযোগী দেশ জার্মানি। ফ্রান্সের ২০১৮ - সালে মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৫৬৮.৪ বিলিয়ন ডলার।

ক. ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি ও কম্পিউটার: শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফ্রান্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি উৎপাদন
বৃদ্ধি করেছে। দেশটির রপ্তানি আয় ফ্রান্সের মোট রপ্তানি আয়ের অনেকখানি পূরণ করেছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের মোট রপ্তানি আয়ের ১১.৯% ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি ও কম্পিউটার রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত হয়, যার মোট পরিমাণ ৬৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
খ. মোটরযান ও যন্ত্রপাতি: ফ্রান্সের রপ্তানিযোগ্য একটি উল্লেখযোগ্য পণ্য হচ্ছে মোটরগাড়ি (Vehicles) নির্মাণ ও এর যন্ত্রাংশ। ২০১৮ সালে এ খাতে ৫৬.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মোটর যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে ফ্রান্স, যা মোট রপ্তানিতে ৯.৯% যোগ করে।
গ. বিমান ও নভোযান: ফ্রান্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করে তার মধ্যে বিমান ও নভোযানের যন্ত্রাংশ অন্যতম। ২০১৮ সালে দেশটিতে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার ৯.১ শতাংশ আসে বিমান ও নভোযান যন্ত্রাংশ রপ্তানি থেকে, যার পরিমাণ ৫১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ঘ. ইলেক্ট্রনিক্স: ফ্রান্স বিশ্ব রপ্তানির শীর্ষে অবস্থানের জন্য বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য রপ্তানিতেও বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফ্রান্স ২০১৮ সালে মোট রপ্তানির ৭.৯% ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় করে, যার পরিমাণ ৪৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় বিশ্ব বাণিজ্যের বাজার বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এক দেশ আরেক দেশকে পিছনে ফেলে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বিভিন্ন দেশে রপ্তানি পণ্যের বিভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বিশ্বের শীর্ষ দশ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে উপরে বর্ণিত দেশগুলো ছাড়াও রয়েছে-

ইতালির রপ্তানি পণ্যসমূহ: ২০১৮ সালে ইতালির রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৫৪৩.৬ বিলিয়ন ডলার। ইতালি বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। ইতালি বর্তমানে মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ১৯.৫% আয় করেছে মেশিনারি (কম্পিউটারসহ) থেকে, যার মোট পরিমাণ ১০৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এদেশের অন্যান্য প্রধান রপ্তানি দ্রব্যগুলোর মধ্যে ধাতব পণ্য, কাপড়, মোটর যন্ত্রপাতি, বিলাস সামগ্রী, মোটরসাইকেল, স্কুটার, ওষুধপত্র, রাসায়নিক দ্রব্যাদি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাজ্যের রপ্তানি পণ্যসমূহ: যুক্তরাজ্য বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে নবম স্থানে
অবস্থান করছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রধান প্রধান রপ্তানিপণ্যের মধ্যে মেশিনারি, মোটরযন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ সালে দেশটির রপ্তানি পণ্যের শীর্ষে ছিল মেশিনারি (কম্পিউটারসহ)। দেশটি এখাত থেকে মোট ৭২.৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়, যা মোট রপ্তানির ১৫ শতাংশ। এছাড়া পরিবহন খাত থেকে আসে ৫৫.৪ বিলিয়ন ডলার।

বেলজিয়াম রপ্তানি পণ্যসমূহ: বেলজিয়াম বর্তমানে বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। প্রধান প্রধান রপ্তানি
পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তেল, মোটর গাড়ি, কম্পিউটার, মূল্যবান ধাতু, কাঠ গাড়ি, ফার্মাসিউটিক্যাল, জৈব রাসায়নিক, প্লাস্টিক সামগ্রী, লৌহ-ইস্পাত, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। ২০১৮ সালে দেশটির মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৬৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালে রপ্তানি আয়ের শতকরা ১১.১ শতাংশ তেল ও খনিজ তেল রপ্তানির মাধ্যমে এসেছে। এর মোট পরিমাণ ছিল ৫১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, দেশটির রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ।

পরিশেষে বলা যায়, উপরিউক্ত দেশগুলো তাদের স্ব-স্ব দেশে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে বর্তমানে সর্বোচ্চ অবস্থানে এসেছে এবং ঐসব পণ্য রপ্তানি করে প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(The Trading Aspects of Bangladesh)

মানুষের অভাব ও চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় এবং এর সাথে জড়িত কার্যাবলিই হচ্ছে বাণিজ্য। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুই ধরনের বাণিজ্যই সংঘটিত হয়। যখন একই দেশের দুটি অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালিত হয় তখন তাকে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বলে। আবার যখন দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে পণ্য বিনিময় হয় তখন তাকে বৈদেশিক বাণিজ্য বলে। পৃথিবীর কোনো দেশই প্রয়োজনীয় সবকিছু দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন করতে পারে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যে পণ্য বাংলাদেশে অধিক উৎপাদন সম্ভব হয় তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। যেমন- তৈরি পোশাক। আবার যে পণ্য এখানে উৎপাদিত হলেও দেশের চাহিদা মেটে না তা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। যেমন: চাল, গম ইত্যাদি। এভাবে লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃতি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. প্রারম্ভিক ধারা: ১৯৭১ এবং ১৯৯১ সনের মধ্যে রপ্তানি মূল্যের তুলনায় আমদানি মূল্য। প্রায় দ্বিগুণ ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে রপ্তানি পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সদস্যপদ লাভ করে। এরপর থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে বাংলাদেশ গভীরভাবে যুক্ত হয়। বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বাংলাদেশের বাণিজ্যে পাট অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। ১৯৯৭ সালে প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট। পরবর্তীতে নিটওয়‍্যার, প্লাস্টিক সামগ্রী, ওষুধ ইত্যাদি পণ্য বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয়।

২. কাঁচামালের আমদানিতে অগ্রাধিকার: বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে মেশিনারি দ্রব্যাদি, রাসায়নিক, লৌহ ও ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্যদ্রব্য, পেট্রোলিয়াম দ্রব্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির একটি নতুন সংযোজন হচ্ছে কাঁচামাল আমদানিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অধিক কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

৩. জনশক্তি রপ্তানি: বাংলাদেশ মানব সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই বিপুল জনশক্তি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে বোঝা মনে করা হতো কিন্তু বর্তমানে জনশক্তি রপ্তানি করায় বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে।

৪. রপ্তানির বৈচিত্র্যকরণ: বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানি
পণ্যে কিছু অপ্রচলিত পণ্য যুক্ত হওয়ায় বাণিজ্য প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। ৯০ দশক থেকে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার রপ্তানি করায় রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলো হলো-গার্মেন্টস বা পোশাকশিল্প, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া ইত্যাদি। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে।

৫. ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় আমদানি: স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় আমদানি হতো না। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রকৃতিতে আরেকটি পরিবর্তন হলো ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় প্রচুর পরিমাণ পণ্যসামগ্রী আমদানি করা। এটা জনশক্তি রপ্তানি বাণিজ্যকে আরো উৎসাহিত করে।

৬. অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি: বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারায় কাঁচামালের পরিবর্তে অপ্রচলিত
পণ্যের রপ্তানি দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যের বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশ্যে প্রচলিত পণ্য ছাড়া অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানির সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য অপ্রচলিত পণ্যগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, কুটির শিল্পজাত দ্রব্য, শুকনো মাছ, হিমায়িত চিংড়ি, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রীর চিপস (গুঁড়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

৭. আমদানি নীতিতে একচেটিয়া প্রভাব হ্রাস: বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতিতে অতীতে বাণিজ্যিক আমদানিকারক নামে এক শ্রেণিপ্রথা ছিল। বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারায় এই শ্রেণিপ্রথা বিলোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল মুষ্টিমেয় বণিক শ্রেণির একচেটিয়া প্রভাব হ্রাস।

৮. রপ্তানি শিল্পের উন্নয়ন: বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি হলো রপ্তানি শিল্পের উন্নয়ন। গত শতাব্দীর তুলনায় একবিংশ শতাব্দীতে রপ্তানি শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার অভাব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত উন্নতি লাভ করায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৯. বিলাস দ্রব্যাদির আমদানি: বাংলাদেশের একটি নেতিবাচক বাণিজ্য প্রকৃতি হচ্ছে বিলাস দ্রব্যাদি আমদানি। এসব বিলাস দ্রব্যাদি আমদানির কারণে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। এই অপচয় রোধ করার জন্য বিলাস দ্রব্যাদির আমদানি হ্রাস করে অধিক মাত্রায় উন্নয়ন সামগ্রী আমদানি করা প্রয়োজন।

১০. সমাজতান্ত্রিক ও মুসলিম দেশের সাথে বাণিজ্য: বাংলাদেশের বাণিজ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠা। যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সাথে সমাজতান্ত্রিক ও মুসলিম দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে।

১১. বাণিজ্য বৃদ্ধি: ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার বাণিজ্য বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সে সময় থেকে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চিংড়ি রপ্তানি বৃদ্ধি পেতে থাকে যা থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উন্নতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো শ্রমিক প্রাপ্তির সহজলভ্যতা। এই শিল্পে ৩ মিলিয়ন বা ৯০% মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। পোশাক শিল্পের রপ্তানির সর্বোচ্চ গন্তব্যস্থল হলো যুক্তরাষ্ট্র। সরকার এই শিল্পের বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে EPZ স্থাপন করেছে।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতি স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। সে সময়ে আমদানির তুলনায় রপ্তানি পণ্য খুব কম ছিল। বর্তমানে দেশে বাণিজ্য পরিকল্পনার ফলে রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Trade Relation of Bangladesh with Selected Importing and Exporting Countries)

বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাথে চমৎকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশ প্রথম থেকেই (১ জানুয়ারি ১৯৯৫) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সদস্য। এছাড়া দেশটি দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (SAFTA), এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তি (APTA), বিমস্টেক (BIMSTEC) এবং ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC) এর সদস্য। এসব সংস্থায় মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেও রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ সুবিধা লাভকরে। যেমন- APTA এর মাধ্যমে চীনের সাথে বাণিজ্যে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুবিধার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা জিএসপি (Generalized System of Preference) যা কোটা এবং শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশের অধিকার দেয়। বাংলাদেশ ৩৭টি দেশে এ সুবিধা ভোগ করে যার মধ্যে ২৭টি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত এবং অন্য দশটির মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি।

বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য ও খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ১৮৬টি দেশে ১৬৮ ধরনের (broad catagories) পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তৈরি পোশাক, নিটওয়‍্যার, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া এ চামড়াজাত পণ্য এবং পাটজাত দ্রব্যাদি। বাংলাদেশি পণ্যের উল্লেখযোগ্য রপ্তানিস্থল (export destination) হলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, 'জার্মানি, ফ্রান্স, ইতাদি, সুইডেন প্রভৃত দেশ। উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশ ৯৩ শতাংশ রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন করে।

সারণি-৮.২: বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী শীর্ষ দশটি দেশ (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯)

অবস্থানদেশের নামবিনিয়োগের পরিমাণ (মিলিয়ন ডলারে)অবস্থানদেশের নামবিনিয়োগের পরিমাণ (মিলিয়ন ডলারে)
১.যুক্তরাজ্য৯৭.৩৪৭.যুক্তরাষ্ট্র৪৮.৯৪
২.সিঙ্গাপুর৭৯.৩০৮.সংযুক্ত আরব আমিরাত৪৮.৮০
৩.হংকং৫৯.৮৭৯.ভারত৪২.৭৭
৪.চীন৫৮.৩৫১০.নেদারল্যান্ড৩৫.২৮
৫.নরওয়ে৫০.৪১১১.জাপান৩০.৩৩
৬.দক্ষিণ কোরিয়া৪৯.৪৪ সর্বমোট৭১৬.৪৮

সূত্র: Foreign Direct Investment (FDI), Statistics Department, Bangladesh Bank FDI: (FY-2019: July-September)

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Trade Relation of Bangladesh with China)

বাংলাদেশের সাথে চীনের পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয় ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তখন থেকেই এই দু'টি দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে আসছে। এর ভিত আরো মজবুত হয় ১৯৭৬ সালে পারস্পরিক একটি চুক্তি সই করার মাধ্যমে। চীনের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণে বাংলাদেশ চীন থেকে সামরিক সাহায্য, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতি গ্রহণ করে থাকে। ২০০২ সালে এই দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগী চুক্তি সই করে এবং ২০০৫ সালকে 'চীন বাংলাদেশ মৈত্রী' বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় চীন বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে যাত্রা করে। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১২৫৮২ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে; ২০১৮-১৯ সালে যার পরিমাণ ১৩৬৩৮.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চীনে রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৮৩১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুদেশের মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক মুক্ত বাজার চুক্তির (APTA) মাধ্যমে। চীন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট এর প্রাথমিক উন্নয়নে সাহায্য করছে। চীনের ইউনান প্রদেশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার সাথে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ চীনের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে 'Agreement on Economic and Technical Cooperation' এবং 'Frame Work Agreement' এই দুটি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সারণি-৮.৩: বাংলাদেশ-চীন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

২০১৮-২০১৯২০১৭-২০১৮২০১৬-২০১৭২০১৫-২০১৬
রপ্তানি৮৩১.২৫৬৩০৭৫০৭৫০
আমদানি১৩৬৩৮.৮১১৭০৬১০১৯৩.৮-

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

চীনে রপ্তানিকৃত পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রপ্তানি করে সেগুলো হলো-

সারণি ৮.৪ : চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যসমূহ (২০১৮-২০১৯)

পণ্যের বিবরণরপ্তানির পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
১. নীট ওয়‍্যার২২৪
২. পাট ও পাটজাত দ্রব্য১০৬.৫৬
৩. চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য৫২.৭২
৪. পাদুকা ও প্লাস্টিক সামগ্রী২০.১০
৫. হোম টেক্সটাইল৯.৩৯

চীন হতে আমদানিকৃত পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ চীন হতে যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলো হলো-

সারণি ৮.৫: চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যসমূহ (২০১৮-২০১৯)

পণ্যের বিবরণআমদানির পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
১. পারমাণবিক, মেশিনারিজ ও খুচরা যন্ত্রপাতি২৯২৪.১
২. তুলা, তন্ত্র ও সুতা২১৯৮.৬
৩. ইলেকট্রনিক সামগ্রি১৬৩৬.৯
৪. কৃত্রিম তন্তু৭৫৬.৩
৫. বুনন বস্ত্র৭৪৪.০

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Trade Relation of Bangladesh with Japan)

জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। জাপানের আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ২৬% পণ্য আমদানি করে। জাপান বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক এবং চিংড়ি। ২০১৮-২০১৯ সালে বাংলাদেশ জাপান থেকে ১৮৪৬.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি এবং ১৩৬৫.২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে।২৯ জুন, ২০১৬ তারিখে জাপান বাংলাদেশকে ৬টি বৃহৎ প্রকল্পে (যোগাযোগ খাতসহ) ১.৫ বিলিয়ন ডলার (১১,৬০০ কোটি টাকা) ঋণ সহায়তা প্রদানে চুক্তিবদ্ধ হয়, যা ১৯৭৬ সালের পর সর্বোচ্চ ঋণ সহায়তা চুক্তি। এ ঋণ বাৎসরিক ০.০১% হারে ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য। এ ধরনের ঋণ নির্দিষ্ট প্রকল্প ভিত্তিক হলেও তা বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।

জাপান পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশটি ২০১৮-২০১৯ সালে ১১৪২.২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক ও ১১৩.২৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের চামড়াজাত সামগ্রী বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে এবং বাংলাদেশে ১৩৬৫.৭৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য (পরিবহন যন্ত্রপাতি, লৌহ ও ইস্পাত) রপ্তানি করে।

সারণি-৮.৬: বাংলাদেশ-জাপান আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

২০১৮-২০১৯২০১৭-২০১৮২০১৬-২০১৭২০১৫-২০১৬
রপ্তানি১৩৬৫.৭৪৭১৬৬৭০৬৭০
রপ্তানি১৮৪৬.৩১৮৭০১৭৩৫.২-

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

জাপানে রপ্তানিকৃত পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ জাপানে যেসব পণ্যসমূহ রপ্তানি করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
সারণি-৮.৭: জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যসমূহ (২০১৭-২০১৮)

পণ্যের বিবরণরপ্তানির পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
১. নীট ওয়‍্যার৬০৩.৭১
২. ওভেন গার্মেন্টস৪৮৭.৭২
৩. চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য১১৩.১৪
৪. হোম টেক্সটাইল৫০.৭২
৫. পাদুকা৪৯.৯৮

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

জাপান হতে আমদানিকৃত পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ জাপান হতে যেসব পণ্য আমদানি করে তার একটি ছক দেওয়া হলো-

সারণি-৮.৮: জাপান থেকে আমদানিকৃত পণ্যসমূহ (২০১৮-২০১৯)

পণ্যের বিবরণআমদানির পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
১. নৌকা, জাহাজ ও ভাসমান কাঠামো৫৮৭.৩
২. পারমাণবিক, মেশিনারিজ ও খুচরা যন্ত্রপাতি৩৪১.৭
৩. লৌহ ও ইস্পাততি৩২৫.৩
৪. যানবাহন ও খুচরা যন্ত্রপাতি৩১১.৬
৫. আলোক, সিনেমাটোগ্রাফি এবং মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি৬২.০

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By

(Trade relation of Bangladesh with South Korea)

১৯৭২ সালে মে মাস থেকে বাংলাদেশের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সে সময় থেকে ধীরে ধীরে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সরকারি উদ্যোগের কারণে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পারস্পরিক দক্ষতা ও প্রযুক্তির বিনিময়, শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের জন্য গভীর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সম্প্রতি কোরিয়া সরকার কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (KOICA)-র মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে একটি সহযোগী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার জন্য কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক সফটলোন এর ব্যবস্থা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ) এর বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটি ২০০৭ সালে ২৭৯টি সরাসরি এবং যৌথভাবে বিনিয়োগ প্রকল্পে ৬১৯.৩৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। এগুলোর মধ্যে প্রধান খাত হলো কৃষি, খাদ্য, টেক্সটাইল, রাসায়নিক, প্রকৌশল ও সেবাশিল্প। শিল্পে ৭২,০০০ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকার EDCF (Economic Development Coopeeration Fund) বাংলাদেশে কার্যকর করার জন্য চুক্তি সই করে। এর আওতায় বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের উপর অর্থ সহায়তা পাবে। এর সাহায্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার (কর্ণফুলি নদীর উপর রেল ও সেতু নির্মাণ) এবং ICT শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটবে যা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া একে অপরের খুব গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ১৯৭৩ সালে একটি বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এই দুই দেশে বিনিয়োগ শুরু হয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিবছর নবায়ন হচ্ছে। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৯০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে রপ্তানি করে ৩৭০.৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুই দেশের বাণিজ্য সমতা নিচে প্রদান করা হলো:

সারণি-৮.৯: বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য (মিলিয়ন টাকা)

২০১৮-২০১৯২০১৫-২০১৬২০১৪-২০১৫২০১৩-২০১৪
রপ্তানি৩১,৬৪৩২১৬১৬২১৬১৬২১৬১৬
আমদানিআমদানি--৯,৩১০৮

বাংলাদেশ থেকে কোরিয়াতে রপ্তানিকৃত দ্রব্য: বাংলাদেশ কোরিয়াতে যেসব পণ্য রপ্তানি করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে
চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, তৈরি পোশাক ও নিটওয়‍্যার, টুপি, জুতা, হোম টেক্সটাইল, ফার্নেস তেল, তামার তার, হিমায়িত খাদ্য, তামাক, ওষুধ ইত্যাদি। বাংলাদেশ এই অল্প কিছু পণ্য রপ্তানি, যা আয় করে নিচের সারণিতে তা দেখানো হলো-

সারণি-৮.১০: কোরিয়াতে বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত কয়েকটি পণ্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

পণ্যরপ্তানি
১. ভোগ্যপণ্য২০৫.০৮৩
২. বস্ত্র১৮৭.৪৪৩
৩. চামড়া৫৪.৫০৮
৪. জুতা২০.৭৮৭
৫. কাঁচামাল১০.০৬৪

উৎস: WITS (World Integrated Trade Solution)-২০১৮

কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানিকৃত প্রধান দ্রব্যসমূহ: কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলো হলো যন্ত্রপাতি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক সামগ্রী, টেক্সটাইল পণ্য, খনিজ পণ্য, অটোমোবাইলস, খাদ্যদ্রব্য, চশমা ও ক্যামেরা, জুতা, বৈদ্যুতিক ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, রাসায়নিক ও পেপার পণ্য ইত্যাদি। নিচে বাংলাদেশের কোরিয়া থেকে আমদানি পণ্যের ব্যয় দেখানো হলো:

সারণি-৮.১১: কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানিকৃত কয়েকটি পণ্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

পণ্যআমদানি
১. নৌকা, জাহাজ ও ভাসমান কাঠামো৩৫১.০
২. পারমাণবিক, মেশিনারিজ ও খুচরা যন্ত্রপাতি১৬০.২
৩. প্লাস্টিক সামগ্রী১৩২.৭
৪. লৌহ ও ইস্পাত১২৩.৬
৫. কাজ ও পেপার বোর্ড৭৯.৪

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

। বর্তমানে বাংলাদেশে বিপুল বিপুল পরিমাণ মানব সম্পদ রয়েছে। বাংলাদেশ কোরিয়াতে মানব সম্পদ রপ্তানি করছে। কোরিয়াতে প্রায় ১০,০০০ এর অধিক বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Trade relations of Bangladesh with UK)

বাংলাদেশ যেসব দেশে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাজের অবস্থান তৃতীয়। যুক্তরাজ্যে রপ্তানিকৃত প্রধান পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে যেসব পণ্য রপ্তানি করে সেগুলোর মধ্যে ওভেন, গার্মেন্টস সামগ্রী, নিটওয়্যার, হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্য প্রধান।

সারণি-৮.১২: যুক্তরাজ্যে রপ্তানিকৃত পণ্য ২০১৮-২০১৯ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

পণ্যরপ্তানি আয়
১. নীট ওয়‍্যার১২৩২.৩৪
২. ওভেন গার্মেন্টস৮৩৪.২৫
৩. হোম টেক্সটাইল৬১.২৩
৪. চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য৪৩.২৪

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত প্রধান পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে
খনিজ দ্রব্যাদি, পরিবহন যন্ত্রাংশ, জাহাজ, বোট, মেশিন ও মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি, সার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি অন্যতম। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ যেসব পণ্যদ্রব্য রপ্তানি করে তা থেকে সংগৃহীত আয়, অপেক্ষা পণ্য আমদানিতে যে ব্যয় হয় তা তুলনামূলক কম। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কম।

সারণি-৮.১৩: যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত পণ্য ও ব্যয় ২০১৭-২০১৮ (মিলিয়ন ডলারে)

পণ্যআমদানি ব্যয়
১. চর্বি ও তৈল৭৫৪.০
২. খনিজ দ্রব্যাদি১২৯.৪
৩. প্লাস্টিক সামগ্রী৮৩.৩
৪. সার৫৭.৬

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic Data)

বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানির মাধ্যমে ৪১৬৯.৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। যুক্তরাজ্যের সাথে সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির একটি তুলনামূলক অবস্থা দেখানো হলো:

সারণি-৮.১৪: বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য (মিলিয়ন টাকা)

২০১৮-২০১৯২০১৫-২০১৬২০১৪-২০১৫২০১৩-২০১৪
রপ্তানি৩৫৫৯৪৪২৯৬৪০২২৪৮৯৩৫১৬৮৬৫৭
আমদানি১০৪৩৭৬২১৫৬৮২৪৯৩৩১৮০৬৭-

সূত্র: পরিংখ্যান ইয়ারবুক, বাংলাদেশ: ২০২০, বিবিএস

বিগত অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেশি এবং আমদানি ব্যয় কম। সুতরাং, উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Trade relation of Bangladesh with USA)

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্স (GSP) সুবিধার আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশের যেসব পণ্য ও দ্রব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে GSP-র সুবিধায় প্রবেশ করে সেগুলো হলো-তামাক, প্লাস্টিক ব্যাগ, গলফ দ্রব্যাদি, নিদ্রা ব্যাগ, রান্নার সরঞ্জামাদি ও টেবিলওয়্যার, তৈরি খাদ্য, হ্যান্ডলুম, সুতি কার্পেট, টুপি, রাবার এবং প্লাস্টিক ইত্যাদি।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যসমূহ: বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রচুর পণ্য আমদানি করে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেসব পণ্য রপ্তানি করা হয় তার মধ্যে টেক্সটাইল এবং পোশাক পণ্য, চিংড়ি, চা, টুপি, গলফ উপকরণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১৮-২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮৭৬.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয় (সূত্র: EPB-2020)।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানিকৃত পণ্যসমূহ: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী দেশ। তাই
যুক্তরাষ্ট্র হতে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে বাণিজ্য পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুতা, রাসায়নিক, মেশিনারি এবং আনুষঙ্গিক উপকরণ, ওষুধ পণ্য ইত্যাদি। ২০১৮-২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৭৭৬.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়। (সূত্র: EPB-2020)। নিচে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কয়েকটি রপ্তানিভিত্তিক দেশ ও বাংলাদেশের অবস্থান দেওয়া হলো:

সারণি-৮.১৫: যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান কয়েকটি পোশাক রপ্তানিভিত্তিক দেশ ও বাংলাদেশের অবস্থান-২০১৯

দেশপরিমাণ (বিলিয়ন ডলারে)শতকরা (%)
১. চীন৪০,৮৭৮,১৪৮৩৫.৮০
২. ভিয়েতনাম১২,২৬৭,৩৮৯১০.৭৪
৩. ভারত৮,১৯৪,৬৯৭৭.১৮
৪. মেক্সিকো৫,৪৯৩,৭৭৯৪.৮১
৫. বাংলাদেশ৫,৩২৩,১০৬৪.৬৬

উৎস: WITS (World Integrated Trade Solution)-2019

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ আমদানি শুল্ক রয়েছে তবুও বাংলাদেশ থেকে বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফলতার সাথে বাংলাদেশি পোশাকজাত শিল্প পণ্য আমদানি করে। নিচে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য দেখানো হলো:

সারণি-৮.১৬: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

২০১৮-২০১৯২০১৭-২০১৮২০১৬-২০১৭২০১৫-২০১৬
রপ্তানি৬৮৭৬.২৯৩৯৬৫-৩৮৩৮৪০৮০
আমদানি১৭৭৬.৬১৭০৪.৭১১৩০.৬ -

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০ (Economic data)

উপরিউক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্য সমতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পাচ্ছে

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Non-traditional goods of Bangladesh in earning foreign currency and man-power export)

বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রচলিত ও অপ্রচলিত উভয় পণ্য রপ্তানি করে আসছে। বাংলাদেশ যেসব অপ্রচলিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে সেগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক চামড়া ও হস্ত শিল্পজাত দ্রব্য উল্লেখযোগ্য। এসব অপ্রচলিত পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। দ্বিতীয় অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানিতে রয়েছে চামড়াজাত দ্রব্য। উল্লেখ্য তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত দ্রব্য দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় এগুলো বর্তমানে প্রচলিত পণ্যের তালিকায় চলে এসেছে।

(ক) তৈরি পোশাক: তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাত থেকে ৩৪.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে যা মোট রপ্তানির ৮৬.২ শতাংশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান আমদানিকারক দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে দেশটি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এ দেশের তৈরি পোশাকের মধ্যে শার্ট, পাজামা, জিন্স প্যান্ট, জ্যাকেট, ট্রাউজার, গেঞ্জি, সোয়েটার, পুলওভার, ড্রেস, গ্লাভস, খেলাধুলার পোশাক, শীতকালীন পোশাক, নাইট ড্রেস প্রভৃতি বিদেশে যথেষ্ট সমাদৃত। নিচের সারণিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানি আয় দেখানো হলো:

সারণি-৮.১৭: তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

সালআয়
২০১৪-২০১৫২৫৪৯২
২০১৫-২০১৬২৮১৩৯
২০১৬-২০১৭২৮১৪৯
২০১৭-২০১৮৩০১৪৭.৭৬
২০১৮-১৯৩৪৯৮৪,৯৯

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, ২০১৯

(খ) চামড়া: বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য অন্যতম। এসব দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশটি প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এ দেশের চামড়া প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশে রপ্তানি করা হয়। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ এ খাত থেকে ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে (সূত্র: ইপিবি-২০২০)।

(গ) হস্তশিল্পজাত দ্রব্য: বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের হস্তশিল্পজাত দ্রব্যের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন হস্তশিল্পজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে (মার্চ পর্যন্ত) বাংলাদেশ এ খাত থেকে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।
জনশক্তি রপ্তানি: জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় (remittance) প্রায় ১,৬৪২ কোটি মার্কিন ডলার।

সারণি-৮.১৮ : ২০১৭-২০১৮ দেশভিত্তিক প্রবাসী আয় (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

সৌদি আরবসংযুক্ত আরব আমিরাতকাতারওমানকুয়েতযুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্যমালয়েশিয়াসিঙ্গাপুরঅন্যান্যমোট
২৫৯১.৬২৪৩০.০৮৪৪.১৯৫৮.২১১৯৯.৭১৯৯৭.৫১১০৬.০১১০৭.২৩৩০.২১৮৭৫.৭১৪৯৮১.৭

উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯

এছাড়া বাংলাদেশ থেকে আরও কিছু অপ্রচলিত পণ্য যেমন- অশোধিত সার, চিটাগুড়, দিয়াশলাই, পারটেক্স, রেয়ন, নারিকেলের ছোবড়া, গরুর ভুঁড়ি, মসলা, ফুলের ঝাড়ু, ওষুধ প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Importance of increasing the production of exportable goods in Bangladesh)

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক উন্নয়নশীল দেশ আছে যারা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে খুব কম সংখ্যক পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। কিন্তু বাংলাদেশ দিন দিন রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, সিরামিক সামগ্রী, প্রকৌশল দ্রব্যাদি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব আলোচনা করার পূর্বে এর দুটি দিক লক্ষণীয়। যথা-

১. উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি: বাংলাদেশে রপ্তানিযোগ্য বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুদ্ধপরবর্তী
সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের যে পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে তা থেকে বর্তমানে ঐ একই পণ্যের উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে পাট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ মিলিয়ন বেলস, এই উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬-১৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৯.২ মিলিয়ন বেলস। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এভাবে বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ সালে ১০২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে।

২. রপ্তানিযোগ্য পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি: বাংলাদেশ আগে খুব অল্প সংখ্যক পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিল্পের প্রসার ঘটায় কৃষি পণ্যের পাশাপাশি শিল্পদ্রব্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৭০-৮০-র দশকে কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের মধ্যে কিছু পণ্য রপ্তানি করা হতো কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নিটওয়‍্যার, প্লাস্টিক সামগ্রী, জুতা, সিরামিক সামগ্রী, ওষুধ এমনকি ফুলের ঝাড়ু, গরুর ভুঁড়িও বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
এ প্রেক্ষিতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব হলো-

১. জাতীয় আয়ের উৎস: বাংলাদেশের আয়ের অন্যতম উৎস রপ্তানিযোগ্য পণ্য। রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। হিমায়িত মাছ, শুঁটকি, পোশাক শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প ইত্যাদি রপ্তানিযোগ্য পণ্য থেকে প্রতিবছর রপ্তানি শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে জাতীয় আয়ও বৃদ্ধি পায়।

২. কাঁচামালের উৎপাদন বৃদ্ধি: বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়।
পাটজাত পণ্যের কাঁচামাল পাট বাংলাদেশে প্রচুর জন্মে। রপ্তানি দ্রব্যের অধিকাংশেরই কাঁচামাল কৃষি থেকে আসে। তাই সেসব কাঁচামাল উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি পণ্যগুলোর উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পোশাক শিল্পের কাঁচামাল তুলা যশোর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয় আবার রাজশাহী অঞ্চলে রেশম ও গুটি পোকার চাষ করে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়। এভাবে বিভিন্ন রপ্তানি দ্রব্যের কাঁচামালের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে পণ্যসমূহের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৩. রপ্তানি আয়ের উৎস: রপ্তানিযোগ্য পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে আয় করে থাকে।
পোশাক, হোম টেক্সটাইল, রাসায়নিক দ্রব্য, পাটশিল্প রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জিত হয়। অর্থাৎ এসব দ্রব্য রপ্তানি আয়ের একটি অন্যতম উৎস। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ২০২০ তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৪০,৫৩৫.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুতরাং বলা যায়, রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে আর তাই রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

৪. আমদানি হ্রাস: বাংলাদেশ প্রতিবছর খাদ্য ঘাটতি ও পণ্য ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশ থেকে প্রচুর পণ্য ও
খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে। ফলে দেশের অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে চলে যায়। কিন্তু রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারলে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে এবং দেশের খাদ্য ঘাটতি ও দ্রব্য ঘাটতি হ্রাস পাবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশের বিভিন্ন সরকারের আমলে আমদানি হ্রাস করে রপ্তানি দ্রব্য উৎপাদনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কারণে গত ১৫ বছরে পোশাক শিল্পের উৎপাদন অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পোশাক পণ্য ছাড়াও রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করায় এগুলোর আমদানি হ্রাস পেয়েছে।

৫. অধিক বৈদেশিক মুদ্রার্জন: বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। রপ্তানি পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানির জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশ রপ্তানি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে পূর্বের তুলনায় অধিক বৈদেশিক মুদ্রার্জন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সালে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রয়েছে ৩২.৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

৬. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নের সাথে সাথে বেকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু সেভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তাই রপ্তানি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প কারখানায় হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিতে আগে থেকেই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ রয়েছে। এরূপ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় রপ্তানি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে রপ্তানি দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭. কৃষির ওপর জনসংখ্যার চাপ হ্রাস: বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কৃষি জমির উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ক্রমশ জমিগুলো খন্ড বিখন্ড হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ এবং ভূমির অনুপাত অত্যন্ত নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। তবে প্রতিবছর শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে কৃষির উপর জনসংখ্যার চাপ হ্রাস পাচ্ছে। এক সময় শতকরা ৭০ ভাগ লোক কৃষিতে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির শতকরা হার ৪৮.০৪%। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে কৃষির ওপর জনসংখ্যার চাপ বর্তমানে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

৮. শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভকরার পর থেকেই দেশের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু সে সময়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাবে শিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে এবং উদ্যেক্তাগণ উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি পণ্যের ঘাটতি থাকায়। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেকটি শিল্প কারখানায় শ্রমিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া আগে নারীরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঘরের বাইরে বের হয়নি। বর্তমানে শিল্প কারখানায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি করায় দেশের বৃহৎ রপ্তানি পণ্য পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৯০ শতাংশ।

৯. অবাধ বাণিজ্য নীতি: আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে অনেক নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু রপ্তানিজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন দেশে রপ্তানির লক্ষ্যে অবাধ বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। অবাধ বাণিজ্য নীতির কারণে উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, সার্কভুক্ত দেশে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। অবাধ বাণিজ্য নীতির কারণে বাংলাদেশের সাথে চীন, জাপান ও ভারতের সাথে বন্ধুপ্রতীম বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই অবাধ বাণিজ্যের জন্য রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম।

১০. বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হ্রাস: বাংলাদেশকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পণ্য আমদানি এবং দেশের খনি থেকে বিভিন্ন খনিজ পণ্য উত্তোলন করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব মুদ্রা ব্যয় হ্রাস করার জন্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

১১. আধুনিক পদ্ধতির প্রবর্তন: আগে বাংলাদেশের মানুষ প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং শিল্পের পণ্য উৎপাদন করত
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন ও কৃষিজাত রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আধুনিক পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছে। ধান থেকে চাল তৈরিতে এখন কম্পিউটারাইজড পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। একইভাবে রপ্তানিযোগ্য পণ্যগুলো উন্নত প্রযুক্তি ও মেশিনারিজ দিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে ফলে পণ্যগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশের শুরুর দিকে পণ্য উৎপাদন যে পরিমাণ ছিল তা থেকে উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আধুনিক পদ্ধতির প্রবর্তনে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব রয়েছে।

১২. দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন: বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পই নয় হিমায়িত মাছ, প্লাস্টিক সামগ্রী, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়াজাত পণ্য ইত্যাদি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দ্রুত রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী জিডিপিতে নীট রপ্তানির অবদান- ৮০৬৬৩ কোটি টাকা। তাই দেখা যাচ্ছে রপ্তানি পণ্য বা আয় বৃদ্ধির দ্বারা দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংঘটিত হচ্ছে।

১৩. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি: বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হয়েছে। সড়ক ও রেলপথের উন্নয়নের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানের উৎপাদিত রপ্তানি পণ্য সমুদ্র বন্দরে পৌছাতে তা সাহায্য করে। আবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিমানবন্দরের সার্বিক উন্নয়ন পণ্য রপ্তানিতে সহায়তা করে। সুতরাং, রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির গুরুত্ব অপরিসীম।

১৪. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রমিক ও অন্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত। গত শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিচু ছিল, কিন্তু শিল্প স্থাপন ও রপ্তানি দ্রব্য উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটেছে।

১৫. মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি: কোনো দেশ কতখানি উন্নত তা নির্ণয় করা যায় সে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় 'কী পরিমাণ তা দেখে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান (২০১৮-২০১৯) মাথাপিছু জাতীয় আয় ১,৯০৯ মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছর থেকে ১৫৮ ডলার বেশি। মাথাপিছু আয় দিন দিন বৃদ্ধি, রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব নির্দেশ করে।

১৬. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষির ওপর অধিক নির্ভরশীল। কিন্তু রপ্তানি
পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পের উপরও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করছে। কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। কারণ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন এখনো অনিশ্চয়তায় ভুগছে। কিন্তু শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা যায়। এ কারণে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশেও রপ্তানি দ্রব্য উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম।

উপরিউক্ত বর্ণনার আলোকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে লেনদেনের অনুকূল ভারসাম্য ও দেশের প্রবৃদ্ধির হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Advantages of Bangladesh Trade in Foreign Countries)

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সাথে বেশ কিছু সুবিধা ভোগ করে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে দেশটি বর্তমান স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে। এর মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। নিচে বৈদেশিক বাণিজ্যভুক্ত দেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যের সুবিধাগুলো আলোচনা করা হলো

১. মোট উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি: বৈদেশিক বাণিজ্যের ফলে দেশের মোট উৎপাদন ও ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। যে অঞ্চলে যে কৃষি পণ্য ভালো উৎপাদন হয় সে অঞ্চলে সেই পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন-রংপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ইত্যাদি জেলায় অধিক পাট উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এরূপ বিভিন্ন কৃষি ও শিল্প পণ্য উৎপাদনের ফলে আমদানি-রপ্তানিতে বাংলাদেশ সুবিধা ভোগ করে। এর ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যভুক্ত দেশে বাংলাদেশি পণ্যের ভোগ বৃদ্ধি পায়। তাই বাংলাদেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুবিধাও ভোগ করে।

২. প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার: বাণিজ্যের দ্বারা বৈদেশিক বাজারের সুযোগ গ্রহণ করা যায় বলে দেশের রপ্তানি দ্রব্যের বিস্তৃতি ঘটে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে (যেমন- কাঁচা পাট থেকে ব্যাগ তৈরি) আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রব্য রপ্তানি করা সম্ভব হয়।

৩. অনুৎপাদিত দ্রব্য ভোগের সুবিধা: কোনো দেশই তার প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্য উৎপাদন করতে পারে না। বাংলাদেশ যেসব দ্রব্য উৎপাদন করতে পারে না সেগুলো আমদানি করে ভোগ করে। যেমন- বাংলাদেশ চাল, গম, তেলবীজ, ভোজ্যতেল, সার ইত্যাদি পণ্য ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে প্রতিবছর আমদানি করে ভোগের সুবিধা নেয়।

৪. সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নতি: বাণিজ্য প্রসারের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নতি ঘটে। বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগের ফলে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয় এবং ঐসব দেশের যা ভালো তা গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৫. আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য ও শাস্তি বৃদ্ধি: বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সাথে যখন বাণিজ্য করে তখন ঐসব দেশের সাথে অর্থনৈতিক আদান-প্রদান ঘটে। ফলে ঐসব দেশের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন-বাংলাদেশের সাথে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে বাণিজ্য সংঘটিত হওয়ায় এসব দেশের সাথে সৌহার্দ্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে এসব দেশ বাংলাদেশকে বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

৬. উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং কম দামে ক্রয়-বিক্রয়: বৈদেশিক বাণিজ্যভুক্ত দেশে বাংলাদেশ বাণিজ্যের দ্বারা বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনে সুবিধা লাভ করতে পারে। যেমন- ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন, এতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায় এবং কম দামে দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করা সম্ভব হয়।

৭. অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন ঘটে। যেমন- জাপানের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক থাকায় সরকারিভাবে এবং অনেক বেসরকারি জাপানি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার মূলধনী দ্রব্য, দক্ষ কারিগর, উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল প্রভৃতির অভাব আছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের কারণে উন্নত দেশ হতে এগুলো আমদানি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। আবার উন্নত দেশসমূহও বাংলাদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত দ্রব্য রপ্তানি করে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে।

৮. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রচুর খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। এসব খাদ্যশস্য নষ্ট হলে এবং খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের ঘাটতি দেখা দিলে বৈদেশিক বাণিজ্যের সাহায্যে খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করা হয় এবং দুর্ভিক্ষজনিত পরিস্থিতি হতে দেশকে রক্ষা করা যায়। বাংলাদেশে সিডর, আইলা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো পর্যন্ত বিদেশ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়। এটা বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্কের কারণেই সম্ভব ব হয়েছে।

৯. সম্পদের বণ্টন ও বিনিয়োগ প্রতিটি দেশে সম্পদের অপর্যাপ্ততার কারণে সব সম্পদ সমভাবে বণ্টন করা যায় না। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে এবং অন্য যেকোনো দেশ বাংলাদেশ থেকে সম্পদের আদান প্রদানের মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশ বাণিজ্যের ফলে সম্পদ বিনিয়োগেও সুবিধা লাভ করে।

১০. উৎপাদনকারীর দক্ষতা: বৈদেশিক বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশের উৎপাদনকারীদের দক্ষতা বাড়ে। কারণ
আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য দ্রব্যের মান উন্নত ও দাম কম করা প্রয়োজন হয়। প্রত্যেক উৎপাদনকারী নতুন নতুন কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রব্যের মান উন্নত ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে। এতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

১১. উদ্বৃত্ত দ্রব্যের ব্যবহার: প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সুবিধার জন্য কোনো দেশ তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত দ্রব্য উৎপাদন করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করা যায়। যেমন- বাংলাদেশে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে পাট অধিক উৎপাদিত হয়। এ কারণে পাট ও পাটজাতদ্রব্য দ্বারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত অংশ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।।

সুতরাং বলা যায়, বৈদেশিক বাণিজ্যভুক্ত দেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন রপ্তানি দ্রব্যের চাহিদা থাকায় বাংলাদেশ সেসব দেশে পণ্যদ্রব্য রপ্তানি করে বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে। আবার বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেও বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By
Please, contribute by adding content to পাঠ-১৪: বৈদেশিক বাণিজ্যভুক্ত দেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অসুবিধা.
Content
Please, contribute by adding content to পাঠ-১৫: বাংলাদেশি জনশক্তি আমদানিকারক প্রধান দেশসমূহের জনশক্তি চাহিদার বিবেচ্য বিষয়সমূহ.
Content
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...