(Subject Matter of Physical Geography)
ভূগোল শাস্ত্রের শুরু থেকেই ভূগোলের আলোচ্য বিষয় নিয়ে ভূগোলবিদগণ বহু গবেষণা করেছেন। এতে প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনার বিষয়বস্তুরও বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কিছু বিষয় সময়ের সাথে সাথে প্রাকৃতিক ভূগোলে যুক্ত হয়েছে, যা প্রাকৃতিক ভূগোলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তুকে প্রধান কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হয় যার প্রত্যেকটি ভূগোলের একটি স্বতন্ত্র শাখারূপে প্রতিষ্ঠিত। বিষয়বস্তুগুলো হলো-

(ক) ভূমিরূপবিদ্যা
(খ) বারিতত্ত্ব
(গ) হিমবাহতত্ত্ব
(ঘ) জলবায়ুবিদ্যা
(ঙ) জীবভূগোল
(চ) সমুদ্রবিজ্ঞান
(ছ) উপকূলীয় ভূগোল
(জ) পরিবেশ ভূগোল

প্রাকৃতিক ভূগোলের এ বিষয়বস্তুসমূহ মূলত প্রাকৃতিক বিভিন্ন প্রপঞ্চ বা উপাদানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদান হচ্ছে সেইসব প্রাকৃতিক উপাদান যার স্থানিক ও কালিক বিশ্লেষণ শাস্ত্রটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বিষয়বস্তুগত প্রাকৃতিক ভূগোলের শাখার বর্ণনায় তাই প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন উপাদানও বর্ণিত হবে। যেমন-
(ক) ভূমিরূপবিদ্যা (Geomorphology): প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভূমিরূপবিদ্যা। ভূপৃষ্ঠের সব স্থান সমান নয়, কোথাও উঁচু পর্বত, কোথাও মালভূমি আবার কোথাও বিস্তৃত সমতলভূমি বিদ্যমান। ভূমিরূপবিদ্যায় এগুলোর উৎপত্তি, গঠন ও বিন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। ভূমিরূপবিদ্যায় ভূত্বকের এ বৈচিত্র্যের ইতিহাস ও গঠন অনুসন্ধান করা হয়। ভূত্বকগঠনকারী শক্তি নদী, বায়ু প্রভৃতির কার্যাবলিও এখানে আলোচনা করা হয়। মাঠ পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক পরীক্ষণ এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক ভূজ্যামিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে পৃথিবীর ভূমিরূপের পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়। প্রাকৃতিক ভূগোলের এই অংশে প্লেট সঞ্চালন, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, সুনামি, শিলা ও খনিজ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
(খ ) বারিতত্ত্ব (Hydrology): পৃথিবীপৃষ্ঠের শতকরা ৭১ ভাগ পানি। প্রাকৃতিক ভূগোলের বারিতত্ত্বে পানি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পৃথিবীর মোট পানি সম্পদের আয়তন ১৩৮৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার। সাধারণভাবে বারিতত্ত্বে পানির উৎস ও বণ্টন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। পৃথিবীর মোট পানির বেশির ভাগই বিরাজ করছে সাগর ও মহাসাগরগুলোতে। বারিতত্ত্বে সমগ্র পৃথিবীতে চলমান পানিচক্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। পানিচক্র বলতে পানির রূপান্তরের মাধ্যমে স্থানান্তর এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার স্বস্থানে ফিরে আসাকে বোঝায়। বারিতত্ত্বে কীভাবে নদী ও হ্রদ সৃষ্টি হয় এবং নদী সৃষ্টির সময় ক্ষয় ও সঞ্চয়কার্যের সময় যেসব ভূমিরূপ সৃষ্টি হয় তা প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনার বিষয়।
( গ) হিমবাহতত্ত্ব (Glaciology): প্রাকৃতিক ভূগোলের হিমবাহতত্ত্ব হিমবাহ, বরফখণ্ড, সামুদ্রিক শৈলশিরা নিয়ে
আলোচনা করে। হিমবাহের কার্যের ফলে ক্ষয়জাত ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গঠিত হয়। হৈমবাহিক অঞ্চলের হিমবাহের ক্ষয়সাধনের ফলে যেসব ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তা হলো হৈমবাহিক উপত্যকা, ঝুলন্ত উপত্যকা, সার্ক বা কোরি, হিমসিঁড়ি, শৈলময় পর্বত, ফিয়র্ড প্রভৃতি।

হিমবাহের সঞ্চয়জাত ভূমিরূপের মধ্যে গ্রাবরেখা, বোল্ডার ক্লে, ড্রামলিন, অনিয়মিত শিলাপিণ্ড, হিমবাহ সমভূমি, এস্কার বা ওসার, কেইম, ভার্ব, উপত্যকা সঞ্চয়ন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয় হিমবাহ তত্ত্বে।

(ঘ) জলবায়ুবিদ্যা (Climatology): প্রাকৃতিক ভূগোলে জলবায়ুবিদ্যার বিষয়বস্তু ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়।
কোনো স্থানের বা কোনো অঞ্চলের দীর্ঘকালের (৩০ থেকে ৪০ বছর) দৈনন্দিন আবহাওয়া পর্যালোচনা করে বায়ুমণ্ডলের ভৌত উপাদানগুলোর যে সাধারণ অবস্থা পরিলক্ষিত হয় তাকে ঐ স্থানের বা অঞ্চলের জলবায়ু বলে। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন আকার-আয়তনে সঞ্চালন এবং তার কারণ ও প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা হলো জলবায়ুবিদ্যার বিষয়বস্তু। জলবায়ুবিদ্যায় জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বায়ুর তাপ, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর আর্দ্রতা, বারিপাত ইত্যাদি জলবায়ুর উপাদান। যেসব উপাদান এগুলোকে প্রভাবিত করে জলবায়ুর পরিবর্তন সাধন করে তাদেরকে জলবায়ুর নিয়ামক বলে। প্রাকৃতিক ভূগোলে জলবায়ুর নিয়ামক হিসেবে যেসব উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হয় সেগুলো হলো- অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র হতে দূরত্ব, বায়ুপ্রবাহের দিক, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্রোত, পর্বতের অবস্থান, বনভূমি, ভূমির ঢাল ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু বিরাজ করছে। কোথাও সমভাবাপন্ন, কোথাও চরমভাবাপন্ন আবার কোথাও বা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু। জলবায়ুবিদ্যায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যসমূহও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
(ঙ) জীবভূগোল (Biogeography): যেহেতু ভূগোল মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করে তাই জীবমণ্ডলও
প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম বিষয়বস্তু। জীবমণ্ডল প্রধানত বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও অশ্মমণ্ডল নিয়ে গঠিত। উদ্ভিদ, জীবজন মানমসহ পকতির সকল জীব উপাদানই জীবভূগোলের আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রাকৃতিক ভূগোলের এই বিষয়বস্তুর আওতায় যেসব উপাদান বা নিয়ামক নিয়ে আলোচনা করা হয় সেগুলো হলো- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বায়োম অঞ্চল সম্পর্কে বর্ণনা করা যার মধ্যে ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান, প্রাকৃতিক উপাদানের (নাইট্রোজেন, অক্সিজেন প্রভৃতি) চক্র ইত্যাদি আলোচনা করা হয়। এছাড়া জীবভূগোলেই প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন- মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ এবং দূষণের কারণ ও প্রতিরোধের উপায় বর্ণনা করা হয়।
(চ) সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography): প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়বস্তু হলো সমুদ্রবিজ্ঞান।
পৃথিবীর অধিকাংশ পানির অবস্থান সমুদ্রে। সমুদ্রবিজ্ঞানে পানিচক্র, সাগর ও মহাসাগরের জলরাশি, সমুদ্র তলদেশের বয়স, সমুদ্রস্রোত, সমুদ্রের পানির ভৌত বৈশিষ্ট্য, সমুদ্র তরঙ্গ ও জোয়ার ভাটা, সমুদ্র তলদেশের ভূপ্রকৃতি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করে। সমুদ্রবিজ্ঞান একটি অত্যন্ত আধুনিক ও জটিল বিষয়। সমুদ্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে আলোচনার সুবিধার্থে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- ১. ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞান, ২. রাসায়নিক সমুদ্রবিজ্ঞান এবং ৩. জৈবিক সমুদ্রবিজ্ঞান। ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের প্রাকৃতিক বিষয়ের বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা হয়। রাসায়নিক সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের পানির রাসায়নিক গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যেমন- পানি এবং এর হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। জৈবিক সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের পানিতে অবস্থিত উদ্ভিদ ও প্রাণী বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। সমুদ্রের তলদেশে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে যেগুলোর ভৌগোলিক বণ্টন ও জীবন চক্র সমুদ্রবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়বস্তু।
(ছ ) উপকূলীয় ভূগোল (Coastal Geography): সমুদ্র এবং ভূমির মধ্যে গতিশীল আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ক বিদ্যাই হলো উপকূলীয় ভূগোল। এই ভূগোল উপকূলীয় বিচূণীভূত প্রক্রিয়া বিশেষ করে উপকূলীয় তরঙ্গ, পলি, তরঙ্গ গতি, উপকূলীয় আবহাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। উপকূলীয় ভূগোল উপকূলের ভূদৃশ্য বা ভূমিরূপের সাথে উপকূলীয় মানুষের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আলাচনা করে। উপকূলীয় ভূগোলে স্থলভাগ সংলগ্ন উপকূলের অগভীর অঞ্চল বিশেষ করে মহীসোপান অঞ্চল সম্পর্কে তথা এর বৈশিষ্ট্য, এর সম্পদ ও সেগুলোর যথার্থ রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। উপকূলীয় ভূগোলে সমুদ্র আইন, একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, সামুদ্রিক পরিবেশ বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
(জ) পরিবেশ ভূগোল (Environmental Geography): পরিবেশ ভূগোল পরিবেশের সার্বিক অবস্থা, পরিবেশ দূষণের কারণ, দূষণের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা ও অন্যান্য ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইন প্রণয়ন ও চুক্তি সম্পাদনও পরিবেশ ভূগোলের বিষয়বস্তু। পরিবেশ দূষণে মনুষ্য সৃষ্ট কারণ প্রধান হলেও প্রাকৃতিক কারণও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।. মোটকথা পরিবেশের সার্বিক অবস্থা আলোচনা করা হয় পরিবেশ ভূগোলে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু গড়ে উঠেছে। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যয়ন করলে প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্কের যোগসূত্র জানা যায়। ভূগোলের জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূগোলের ব্যবহারিক উপযোগিতা দৃঢ়তা পায়।
| গ্রুপ 'ক' | গ্রুপ 'খ' |
হিমবাহ ভূমিকম্প মহাকাশ মালভূমি পরিবেশ দূষণ | ভূমিরূপবিদ্যা হিমবাহতত্ত্ব পরিবেশ ভূগোল জ্যোতির্বিদ্যা |
- গ্রুপ 'খ' এর উপাদানগুলো কোন ভূগোলের অন্তর্গত? ব্যাখ্যা করো।
- গ্রুপ 'ক' এর উপাদানগুলো, গ্রুপ 'খ' এর কোন কোন উপাদানের সাথে সম্পর্কিত? বিশ্লেষণ করো।
প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more