hsc

পাঠ-১: কৃষিকার্যের ভৌগোলিক নিয়ামক

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.7k

(Geographical Factors of Agriculture)

কৃষিকাজের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Agriculture. শব্দটি আবার দুটি ল্যাটিন শব্দ 'Agros' এবং 'cultura'-এর সমন্বয়ে গঠিত। 'Agros' অর্থ মাটি বা ভূমি এবং 'Cultura' শব্দের অর্থ চাষ করা। অর্থাৎ ভূমিকর্ষণ বা চাষ করার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করাকেই কৃষি বলে। এটি মানুষের আদিমতম পেশা। এটি উন্নয়নের মূলভিত্তি।
কৃষির সংজ্ঞা: মানুষের প্রাচীনতম পেশাকে বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন-

  • 'কৃষি হলো ভূমি চাষাবাদের বিজ্ঞান ও শিল্প।'- R.L. kohen (2006).
  • 'Agriculture is a science, Industry and Business'. G.O Brrayen.
  • 'কৃষি হলো এক ধরনের সৃষ্টি সম্পর্কিত কর্ম, যা সেচ কৌশলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়'- অধ্যাপক এ. আর. খান।

কৃষিকাজের উপর প্রভাব বিস্তারকারী ভৌগোলিক উপাদানসমূহকে মূলত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

নিচে কৃষিতে প্রভাব বিস্তারকারী ভৌগোলিক নিয়ামকসমূহ বর্ণনা করা হলো:

ক. প্রাকৃতিক নিয়ামক (Physical factors): কৃষিকাজের প্রাকৃতিক নিয়ামকসমূহ হচ্ছে-

১. জলবায়ু: কৃষিকাজ জলবায়ুর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি পদ্ধতি জলবায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ধান ক্রান্তীয় মৌসুমি (বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড) এবং গম নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে (পাকিস্তান, উত্তর আমেরিকার প্রেইরি) ভালো জন্মে।

তাপমাত্রা: প্রতিটি কৃষি ফসলের জন্য একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ছাড়া ফসলের উৎপাদন সম্ভব নয়। তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়।
যেমন- ধান ও গম উৎপাদনের জন্য যথাক্রমে ১৬-২৭ এবং ১০-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন।
বৃষ্টিপাত: কৃষিকাজে বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন অত্যধিক। পানি ছাড়া উদ্ভিদের জন্ম ও বিকাশ লাভ সম্ভব হয় না। আবার সব ধরনের ফসলের জন্য একই পরিমাণ বৃষ্টিপাত প্রযোজ্য নয়। যেমন- ১৫০ থেকে ২৫০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ধান চাষ ভালো হয়।
আর্দ্রতা: আর্দ্রতার উপর ফসলের জন্ম ও বৃদ্ধি নির্ভরশীল। আর্দ্রতাপূর্ণ অঞ্চলে কৃষিকাজের উন্নতি হয়। যেমন- থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ। অন্যদিকে আর্দ্রতাহীন শুষ্ক অঞ্চলে কৃষিকাজ সম্ভব নয়। যেমন- আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি অঞ্চল।
বায়ুপ্রবাহ: বায়ুপ্রবাহ উদ্ভিদের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টিপাত সংঘটনে বায়ুপ্রবাহের ভূমিকা আছে। যেমন- ধান ও গমের পরাগায়ণ বায়ুর মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

২.ভূপ্রকৃতি: ভূমির অবস্থা এবং সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতার ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ফসল জন্মে। সমতল ভূমিতে যত নিবিড়ভাবে কৃষিকাজ করা যায়, পাহাড়ি অঞ্চলে তা সম্ভব হয় না। কৃষির ওপর ভূপ্রকৃতির ভূমিকা তাই অনেক বেশি। যেমন- পাহাড়ি ঢালু জমিতে চা, কফি, রাবার প্রভৃতি এবং সমতল ভূমিতে ধান, পাট, সরিষা ভালো হয়।

৩. মৃত্তিকা: মৃত্তিকা কৃষির মূল্যবান উপাদান। উর্বর মৃত্তিকায় ভালো ফসল জন্মে, আবার অনুর্বর মৃত্তিকায় তা সম্ভব হয় না। মৃত্তিকার ধরন ভেদেও ফসল উৎপাদনে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন- বাংলাদেশের উর্বর পলি-দোআঁশ মৃত্তিকায় ধান ভালো জন্মে l

৪. নদ-নদী: নদ-নদী পানির অন্যতম প্রধান উৎস। তাছাড়া পলি সখ্যয়ের কারণে নদীর দুই তীরের মৃত্তিকা উর্বর হয়ে ওঠে। ফলে নদী অববাহিকা অঞ্চলে ব্যাপক কৃষিকাজ হয়ে থাকে।

খ. অর্থনৈতিক নিয়ামক (Economic factors): কৃষিকাজের ওপর অর্থনৈতিক নিয়ামকের প্রভাব অপরিসীম।
১. মূলধন: চাষের জন্য ট্রাক্টর, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ক্রয়, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় প্রভৃতি বাবদ অনেক অর্থ প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত মূলধন ছাড়া তাই কৃষিকাজ সম্ভব নয়।
২. শ্রমিক: বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহ কৃষিকাজের জন্য এখনো শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে থাকে। জমি চাষ, সেচ প্রদান, ফসল সংগ্রহ, মাড়াই করা প্রভৃতি কাজের জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। তাই সময়মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া গেলে কৃষিকাজ ভালো হয়।
৩. পরিবহন: উৎপাদিত পচনশীল ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণের জন্য উন্নত ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সময়মতো ফসল বাজারজাতকরণ করা না গেলে উৎপাদনের কোনো মূল্য থাকে না।
৪. বাজার: আধুনিক বাজারব্যবস্থা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর যে অঞ্চলে যে পণ্যের চাহিদা বা বাজার থাকে, সে অঞ্চলে সেই ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। যেমন- শ্রীলংকায় চা, মালয়শিয়ায় রাবার চাষ।

গ. সাংস্কৃতিক নিয়ামক (Cultural factors): কতিপয় সাংস্কৃতিক উপাদানের উপরও কৃষিকাজ নির্ভর করে। যেমন-

১. জনসংখ্যা: কোনো স্থানে জনসংখ্যা বেশি হলে কৃষিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে পণ্য উৎপাদনের তাগিদ বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে, জনসংখ্যা কম থাকলে কম চাহিদার কারণে কৃষিপণ্য কম উৎপাদিত হয়।
২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: আধুনিক কৃষি অনেকাংশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশসমূহ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় তারা কৃষিতে অনগ্রসর। যেমন- মালদ্বীপ, বাংলাদেশ। অপরপক্ষে, ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন, যন্ত্রের সাহায্যে চাষাবাদ ও সেচ প্রদান, ফসল মাড়াই করা প্রভৃতি কাজে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নত দেশসমূহ কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করছে। যেমন- চীন, জাপান।
৩. দৃষ্টিভঙ্গি: মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কৃষিজ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে থাকে। যেমন- উন্নত দেশের কৃষকদের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে সমৃদ্ধি লাভ। তারা সেই অনুযায়ী ফসল চাষ করে থাকে। পক্ষান্তরে, দরিদ্র দেশসমূহের কৃষকেরা সর্বাগ্রে নিজেদের জীবনধারণের জন্য পণ্য উৎপাদন করে থাকে।
৪. সরকারি নীতি: একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন ও প্রসার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। যেমন: বাংলাদেশ সরকার সারের উপর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। আবার অনেক সময় দেশীয় উৎপাদন রক্ষা করতে বিদেশে কম মূল্যে পেলেও কৃষিপণ্য আমদানি করা হয় না।

কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...