Atmosphere and Air Pollution
যে গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীকে বেষ্টন করে রেখেছে তাকে বায়ুমণ্ডল বলে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আকর্ষণে এ পুরু গ্যাসের আবরণ ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন হয়ে আছে এবং পৃথিবীর আবর্তনের সাথে সাথে ঘুরছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা বায়ুমণ্ডলের বয়স প্রায় ৩৫ কোটি বছর। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০,০০০ কি.মি. ঊর্ধ্বাকাশব্যাপী বায়ুমণ্ডল বিস্তৃত। তবে এর ৯৭ শতাংশই ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩০ কি.মি. এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক অবস্থা প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়ক।

বায়ুমণ্ডলের মূল উপাদান নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও সামান্য পরিমাণে অন্যান্য যৌগ ও গ্যাসসমূহ। তবে কোনো কারণে উপাদানসমূহে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলে তা বিরাজমান প্রাণিজগতের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং তা বায়ু দূষণ নামে অভিহিত হবে। বর্তমানে মানবসৃষ্ট উৎস হতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডসহ কয়েকটি কার্বন যৌগ, নাইট্রোজেনের অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন ও সালফার যৌগের বৃদ্ধির কারণে অব্যাহতভাবে দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রধান প্রধান শব্দ
- বায়ুর উপাদান
- বায়ুমণ্ডল
- বায়ুমণ্ডলীয় স্তর
- বায়ু দূষণ
- দূষক
- স্বল্পস্থায়ী প্রভাব
- বিকল্প জ্বালানি
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ - খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
লঞ্চে করে জারিফ মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার পথে নদীর এক পাশে দেখে অনেক ইটের ভাটা ।
নয়ন তার গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে দেখে সেখানে কলকারখানা, যানবাহন সবই বেশি। এ কারণে ঢাকায় বায়ু বেশি দূষিত। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।
মনির ও দিপু ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। তারা একাদশ শ্রেণির ছাত্র। হঠাৎ 1 পাশ দিয়ে যাওয়া একটি বাস তাদের নাকে মুখে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে গেল। দিপুর ভীষণ কাশি শুরু হলো।
(Elements of Air)
সাধারণভাবে বায়ুমণ্ডল গ্যাসীয় উপাদান দ্বারা গঠিত। এছাড়াও বায়ুর আরও কিছু উপাদান (জলীয়বাষ্প) রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বায়ু তথা বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. গ্যাসীয় উপাদান (composition of gases), ২. জলীয়বাষ্প (water vapour) এবং ৩. জৈব ও অজৈব কণিকা (organic and inorganic dust particles)
১. গ্যাসীয় উপাদান (composition of gases):
বায়ুমণ্ডলের গ্যাসগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেনের (N2) পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৭৮.০২%)। এর পরই রয়েছে অক্সিজেন (O2); এর পরিমাণ ২০.৭১%। সুতরাং, বায়ুমণ্ডলের শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগই এ দু'টি গ্যাস নিয়ে গঠিত। আর বাকি ১% এর মধ্যে রয়েছে অন্যান্য উপাদান, যা নিচের সারণিতে দেখানো হয়েছে।

সারণি-৪.১: বায়ুর বিভিন্ন উপাদানের তালিকা
| উপাদান | পরিমাণ (%) | |
| নাইট্রোজেন | ৭৮.০২ | |
| অক্সিজেন | ২০.৭১ | |
| আরগন (Ar) | ০.৮০ | |
| কার্বন ডাইঅক্সাইড | ০.০৩ | |
| অন্যান্য গ্যাসসমূহ (নিয়ন, হিলিয়াম, ক্রিপটন, জেনন, ওজোন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড) | ০.০২ | |
| জলীয়বাষ্প | ০.৪১ | |
| সর্বমোট | ০.০১ | |
| ১০০ | ||
প্রধান গ্যাসীয় উপাদান (Major composition of gases)
ক. নাইট্রোজেন : বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের পরিমাণ সর্বাধিক (৭৮.০২%)। এই গ্যাস বায়ুর আয়তন বৃদ্ধি ও পাতলা (light) করতে সহায়তা করে। কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া (সায়ানো ব্যাকটেরিয়া) বায়ু থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে। পৃথিবীতে তাপমাত্রার সুষম বণ্টনে নাইট্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খ. অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলের সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় গ্যাস অক্সিজেন। ব্যাপকভিত্তিক ব্যবহারের পরও বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ প্রায় একই থাকে। কারণ উদ্ভিদ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে (সমগ্র জীবজগৎ কর্তৃক) ব্যয়িত অক্সিজেনের প্রায় সমপরিমাণ বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে।
গ. কার্বন ডাইঅক্সাইড উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ (photosynthesis) প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক গ্যাস হচ্ছে কার্বন ডাইঅক্সাইড (০.০৩%)। এ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তি (solar energy) উদ্ভিদের দেহে সঞ্চিত হয়। উৎপাদিত এ শক্তি বিভিন্ন প্রাণী (গরু) সরাসরি সবুজ উদ্ভিদ (ঘাস) থেকে সংগ্রহ করে, যা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে সম্ভব নয়।
ঘ. ওজোন এটি বায়ুমণ্ডলের একটি অস্থায়ী গ্যাস। এই গ্যাস অক্সিজেন অণুর সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় । বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর সূর্যের মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি (ultra-violet ray) শোষণ করে পৃথিবীর জীবজগতকে রক্ষা করে। ঊর্ধ্ব বায়ুস্তরে ৩০-৬০ কি. মি. এর মধ্যে এই গ্যাসের স্তর দেখা যায়।

বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য গ্যাসগুলো মধ্যে আর্গন, রেডন, নিয়ন, হিলিয়াম, ক্রিপটন, জেনন প্রভৃতি নিষ্ক্রিয় গ্যাস উল্লেখযোগ্য। এরা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না।
২. জলীয়বাষ্প (Water vapour): এটি বায়ুমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জলীয়বাষ্প প্রধানত বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অবস্থান করে। এর পরিমাণ স্থান ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। বায়ুতে এর পরিমাণ ০.৪১%।
জলীয়বাষ্প জলাধার (নদী, সমুদ্র) থেকে বাষ্পীভবনের (evaporation) মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে অবস্থান নেয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বাতাসে জলীয়বাষ্পের ধারণ ক্ষমতা বাড়ে; আর কম হলে তা কমে যায়। বায়ুর এ উপাদানটি সৌরতাপ শোষণ করে আবার ভূপৃষ্ঠ থেকে তাপ বিকিরণে বাধা দেয়। বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিতে ঘনীভবন (condensation) প্রক্রিয়া চলে এবং বর্ষণ (precipitation), মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা, তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি সৃষ্টি হয়।
৩. জৈব ও অজৈব কণিকা বা ধুলিকণা (Organic and inorganic dust particles): বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন জৈব ও অজৈব উপাদান রয়েছে। যেমন- ধুলিকণা, লবণ কণিকা, পলেন কণা (Pollen particle), কয়লার গুঁড়া ও ধোঁয়া, আগ্নেয়গিরির ছাই, উল্কা ভস্ম ইত্যাদি। এগুলো সূর্যরশ্মি হতে তাপ শোষণ করে এবং বায়ুকে উত্তপ্ত করতে সাহায্য করে। এগুলোকে আশ্রয় করে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বারিপাত (Precipitation) ঘটায়।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Layers of Atmosphere)
উপাদানের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে দু'টি ভাগে ভাগ করা যায়। উপরের দিকে যথা- (ক) সমমণ্ডল ও (খ) বিষমমণ্ডল।
ক. সমমণ্ডল (Homosphere): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ কি.মি. পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বিশেষ করে গ্যাসের অনুপাত প্রায় সমান থাকে বলে এ অংশকে সমমণ্ডল বলে।
খ. বিষমমণ্ডল (Heterosphere): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে ৮৫-১০,০০০ কি.মি. পর্যন্ত এই অঞ্চল বিস্তৃত।
বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাতের ভিন্নতা এবং উচ্চতাভেদে সমজাতীয় গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরগুলোর দূরত্ব পৃথক হবার দরুন এ মণ্ডলকে বিষমমণ্ডল বলে। এ মন্ডলে নিচের দিকে তাপমাত্রা উচ্চতার সাথে সাথে বৃদ্ধি পেলেও উপরে বিপরীত অবস্থা ঘটে। এই মণ্ডলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম সম্পন্ন চারটি স্তরের অস্তিত্ব দেখা যায়। যেমন-
(১) আণবিক নাইট্রোজেন, (২) পারমাণবিক অক্সিজেন, (৩) হিলিয়াম ও (৪) হাইড্রোজেন স্তর।
তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ ও ঘনত্বের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস ও বৈশিষ্ট্য
আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রার পার্থক্যের ভিত্তিতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস করেছেন। উল্লম্বভাবে (Vertically) বায়ুর তাপমাত্রার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা: ১. ট্রপোস্ফিয়ার, ২. স্ট্রাটোস্ফিয়ার, ৩. মেসোস্ফিয়ার, ৪. আয়োনোস্ফিয়ার ও ৫. এক্সোস্ফিয়ার।

এই পাঁচটি স্তরের মধ্যে প্রথম তিনটি বায়ুমণ্ডলের নিম্ন অংশে রয়েছে, যা সমমণ্ডলের অন্তর্গত। আর শেষের দু'টি ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলে, যা বিষমমণ্ডলের অন্তর্গত।
১. ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere) : বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তরটি ট্রপোস্ফিয়ার। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্তর। কেননা আবহাওয়ার প্রায় সকল প্রকার উপাদান; যেমন- ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত, মেঘ, তুষারপাত, শিশির, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ প্রভৃতি এই স্তরে বিদ্যমান। এ কারণে একে আবহাওয়ামণ্ডল বলা হয়। কাজেই জীবমণ্ডলের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) জন্য এই স্তর অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই স্তরে প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.৪° সে. তাপমাত্রা কমতে থাকে। তাপমাত্রার এই কমার হারকে বলা হয় স্বাভাবিক তাপ হ্রাস হার (Normal Lapse Rate)। এই মন্ডলের উচ্চতা নিরক্ষরেখা (১৬ কি.মি.) থেকে মেরুর দিকে (৭ কি.মি.) কমতে থাকে। এর গড় গভীরতা ১২ কি.মি.। এই স্তরের ওপরে ১.৫ কি.মি. পুরু অংশকে বলা হয় ট্রপোপজ (Tropopause) বা ট্রপোবিরতি। এই অংশে বায়ু স্থির থাকে। তাপমাত্রার পরিবর্তন হয় না বলে একে সমোষ্ণ অঞ্চল (isothermal zone) বলে। এই অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ থাকে না বলে বিমান বিনা বাধায় চলাচল করে।
২. স্ট্রাটোস্ফিয়ার (Stratosphere) : ট্রপোপজ থেকে এই স্তরের বিস্তার প্রায় ৩০ কি.মি.। ট্রপোপজ থেকে ওপরের দিকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রথমত স্থির থাকে; কিন্তু পরে ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে (২০ কি.মি. পর থেকে)। এই স্তরে ধূলিকণা ও জলীয়বাষ্পের পরিমাণ খুবই নগণ্য এবং স্তরটি প্রায় মেঘশূন্য থাকে। বাতাস অত্যন্ত হালকা থাকে। এখানে বাতাসের ঊর্ধ্ব বা নিম্নগতি নেই, কিন্তু সমান্তরাল গতি দেখা যায়। এই স্তরের ঊর্ধ্বসীমাকে স্ট্রাটোপজ (Stratopause) বা স্ট্রাটোবিরতি বলে। এর ওপর থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুতহারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। স্ট্রাটোস্ফিয়ারের নিচের অংশে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ কি.মি. উপরের অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণ ওজোন (O3) গ্যাসের সমাবেশ দেখা যায়। এজন্য এই স্তরকে ওজোনোস্ফিয়ারও বলা হয়। তবে ১৫-১৬ কি.মি. এর মধ্যে গভীর ওজোনস্তর বিদ্যমান। সূর্য হতে আগত অতিবেগুনি রশ্মিকে ওজোন স্তর বা ওজোন পর্দা অতি সহজে শোষণ করে। এই কারণে এখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। এই স্তর না থাকলে অতিবেগুনি রশ্মির দহনে প্রাণীর দেহ পুড়ে যেত এবং সমস্ত প্রাণিকুল অন্ধ হয়ে যেত। তাই বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে 'পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌর পর্দা' বলে।
৩. মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere) : স্ট্রাটোবিরতির উপরে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে মেসোমণ্ডল বলে। মহাকাশ থেকে যে সব উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে সেগুলো এ স্তরে এসে ভস্মীভূত হয়। এ স্তরে তাপমাত্রা উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং -৮৩° সেলসিয়াস পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। মেসোস্ফিয়ারের সর্বোচ্চ সীমাকে মেসোপজ (Mesopause) বলে। এটাই সমমণ্ডলের শেষ সীমা। এ স্তরের উপরে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া থেমে যায়।
৪. আয়োনোস্ফিয়ার/থার্মোস্ফিয়ার (Ionosphere/Thermosphere): এই স্তরের ব্যাপ্তি ৮০ থেকে ৭০০ কি.মি. পর্যন্ত। মেসোপজ-এর পর থেকেই আয়ন স্তরের সীমানা শুরু হয়। বায়ুর তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় বলে একে থার্মোস্ফিয়ার বলে। এই বৃদ্ধি ১০০০° সে. পর্যন্ত পৌছে।
আয়নোস্ফিয়ারকে থার্মোস্ফিয়ারের অন্যরূপ বলা যেতে পারে। এ স্তরে বায়ু আয়নিত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ এ অঞ্চলটি বিদ্যুৎযুক্ত কণা তথা আয়ন ও ইলেকট্রনে পূর্ণ হয়ে আছে। তড়িতযুক্ত কণার উপস্থিতির জন্যই একে আয়নোস্ফিয়ার বলা হয়। এই স্তরের প্রধান উপাদান হলো আণবিক নাইট্রোজেন ও পারমাণবিক অক্সিজেন। এই দু'টি উপাদান সৌরশক্তির অতি শক্তিশালী গামা ও এক্স-রে (x-ray) রশ্মিকে খুব সহজে শোষণ করে। এই স্তর থেকে বেতার তরঙ্গ (ক্ষুদ্র ও দীর্ঘ) প্রতিফলিত হয়; যার দরুন বেতার যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।
৫. এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere): বায়ুমণ্ডলে ৮০-১০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে এক্সোস্ফিয়ার বলে। এটি প্রধানত অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দ্বারা গঠিত। এখানে আয়নের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই স্তরের ঊর্ধ্বে ২০০০-৪০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (magnetosphere) বলে। এই অঞ্চলকে বিভিন্ন গ্যাসের উপস্থিতির কারণে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ক. আণবিক নাইট্রোজেন স্তর, খ. পারমাণবিক অক্সিজেন স্তর, গ. হিলিয়াম স্তর এবং ঘ. হাইড্রোজেন স্তর।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Pollution and Air Pollution)
রাসায়নিক, ভৌত ও জৈবিক কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের যে কোনো পরিবর্তনই হলো দূষণ। দূষণকারী উপাদানকে বলা হয় দূষক (pollutant)। দূষণকে প্রধানত বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ এ তিন ভাগে বর্ণনা করা যেতে পারে। বায়ু দূষণ
(Air pollution): বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন ভূপৃষ্ঠস্থ বায়ুস্তর শতকরা ২১ ভাগ অক্সিজেন ও ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন, ০.০৩ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড, একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ওজোন (O3), হাইড্রোজেন ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। যদি কোনো কারণে এ বায়ুতে অক্সিজেন ছাড়া অন্যান্য গ্যাসের ঘনত্বের পরিবর্তন অথবা ধুলিকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তখনই বায়ু দূষিত হয়। মূলত বায়ুতে এক বা একাধিক দূষকের উপস্থিতি ও স্থায়িত্ব সেখানকার জীব, উদ্ভিদ ও অন্যান্য সম্পদের জন্য ক্ষতিকর হলে তাকে বায়ু দূষণ বলে।

বায়ু দূষণের কারণ (Causes of Air Pollution)
বায়ুতে দূষক পদার্থের উপস্থিতি বায়ু দূষণের কারণ। যেসব দূষক পদার্থের উপস্থিতি বায়ু দূষণ ঘটায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. কার্বন ডাইঅক্সাইড এটি একটি গ্রিন হাউস গ্যাস। বাতাসে এর পরিমাণ ০.০৩ ভাগ। সকল জীব শ্বসন
ক্রিয়াকালে ত্যাগ করে এবং সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের সময় এ গ্যাস গ্রহণ করে। ফলে বায়ুমণ্ডলে এ গ্যাসের ভারসাম্য বজায় থাকে। বনভূমি ধ্বংস ও নির্বিচারে গাছপালা কাটার ফলে জীবকুলের ত্যাগ করা সবটুকুসবুজ উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে না। কলকারখানার চিমনি ও যানবাহন হতেওবাতাসে যোগ হয়। তাই বাতাসে এর পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে।
২. ধোঁয়া (Smoke): এটি এক ধরনের এরোসল (aerosol)। দহনকৃত (combustion) বস্তু নির্গত ও বাতাসে ভাসমান কলয়ডাল (colloidal) কণা এবং বাষ্পীভূত গ্যাস নিয়ে গঠিত হয় ধোঁয়া। ধোঁয়ার প্রকোপ মূলত শহর ও শিল্প এলাকাতেই বেশি দেখা যায়।
৩. ধোঁয়াশা (Smog): মোটরযান নির্গত নাইট্রোজেন অক্সাইডসমূহ ও বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন সূর্যালোকের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে ওজোন ও পারঅক্সি অ্যাসিটাইল নাইট্রেট নামের জৈব যৌগ উৎপন্ন করে। আর্দ্র পরিবেশে এগুলো বায়ুমণ্ডলে ভাসমান থেকে ঝাপসা অবস্থার সৃষ্টি করলে তাকে ধোঁয়াশা বা স্মগ বলে।
৪. এগ্জস্ট গ্যাস (Exhaust Gases) : এগুলো তেল জাতীয় জ্বালানিসমূহের দহন ক্রিয়ার ফল এবং সাধারণত অদৃশ্যমান। এ জাতীয় গ্যাস ধোঁয়ার সাথে কারখানার চিমনি ও অটোরিকশা, বাস, ট্রাক হতে নির্গত হয়। এ গ্যাসে সীসা, তামা, জিংক, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি ভারি ধাতু ও কার্বন মনোক্সাইড (CO), সালফার ডাইঅক্সাইড হাইড্রোজেন সালফাইড (), হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (HCl) ও নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ ইত্যাদি থাকে। দিন দিন শহরাঞ্চলের বায়ুতে এ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৫. সালফার ডাইঅক্সাইড : সাধারণত শিল্পকারখানার ধোঁয়া হতে এই গ্যাস বায়ুতে মিশে। বিভিন্ন জ্বালানি দহনের ফলেই সৃষ্টি হয়। বায়ুর সাথে মিশে এই গ্যাস সালফিউরিক এসিড সৃষ্টি করে এবং এসিড বৃষ্টির (Acid rain) মাধ্যমে জীবকুলের ক্ষতি করে।
৬. ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC-Chloro-Fluoro Carbon): CFC হচ্ছে ক্লোরিন, ফ্লোরিন ও কার্বনের একটি উদ্বায়ী (volatile) যৌগ। এটি একটি গ্যাস। এটি রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার, প্লাস্টিক ও রং তৈরির কারখানা হতে-নির্গত হয়। CFC বায়ুমণ্ডলের ওজোন (ozone) স্তরকে ক্রমশ ধ্বংস করছে। এক অণু CFC গ্যাস অবস্থাভেদে ২০০০ ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। ইতোমধ্যেই ওজোনস্তর অনেক জায়গায় পাতলা হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও ছিদ্র (hole) হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ওজোনস্তর ছিদ্র হলে সূর্যের অতিবেগুনি ও কসমিক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও পরে অন্যান্য গাছপালাকে ধ্বংস করে দেবে। সেই সাথে প্রাণিকুলেরও প্রচুর ক্ষতি হবে। ক্যানসার ও অন্যান্য রোগের প্রকোপও বেড়ে যাবে।
৭. পরাগরেণু: অনেক পরাগরেণু বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। উদ্ভিদের পরাগরেণু বায়ুতে ভেসে বেড়াতে পারে। এসব পরাগরেণু জ্বর, সর্দি, কাশি এমনকি আরও মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করতে পারে।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Sources of Air Pollution)
বর্তমানে বায়ু দূষণকে মানবসৃষ্ট (Man made) বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বৃহৎ নগরভাবে অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় এ দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পেট্রোল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের জন্য বায়ু দূষণ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বায়ু দূষণের প্রধান দুটি উৎস হচ্ছে যানবাহনের ধোঁয়া এবং কলকারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়া।
মানুষের কার্যকলাপ (শিল্পোৎপাদন) এবং ধুলাবালিযুক্ত বায়ু এই উভয় কারণে বায়ুর গুণগত মান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বায়ু দূষণের উৎসগুলো হচ্ছে: (ক) নগরায়ণ, (খ) শিল্পাঞ্চলের দূষণ, (গ) যানবাহনের ধোঁয়া, (ঘ) ইটভাটা, (ঙ) বহুতল ভবন নির্মাণ, (চ) খোলা স্থানে আবর্জনা নিক্ষেপ, (ছ) গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো, (জ) তেজস্ক্রিয় বস্তু, (ঝ) কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার ইত্যাদি।
ক. নগরায়ণ: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে নগরায়ণ। নগর বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮১ সালে নগর জনসংখ্যা ছিল ১৪.০৮ মিলিয়ন, যা ১৯৯১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৫ মিলিয়নে। ২০১৯ এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২.৫৭ মিলিয়নে যা মোট জনসংখ্যার ৩৭.২%। বাংলাদেশের বৃহৎ নগর কেন্দ্র যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ইত্যাদি শহরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। এর সাথে মোটরযানের সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ধোঁয়া, অধিক ধুলাবালি বায়ুকে দূষিত করছে। বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা, রেলওয়ে ইঞ্জিন, পাওয়ার প্লান্ট, খোলা স্থানে আবর্জনা পোড়ানো, ধুলাবালি ইত্যাদি কারণে এসব নগরে বায়ু দূষিত হচ্ছে।
খ. শিল্পাঞ্চলের দূষণ : শিল্পকারখানা অধিক গড়ে ওঠার কারণে বায়ু দূষিত হয়। কারণ শিল্প কারখানাগুলো জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসাবে যে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, গ্যাস) ব্যবহার করে তা বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এ কারখানাগুলো সাধারণত বড় বড় শহরে (যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলে) গড়ে উঠেছে। তাই এসব শহরে বায়ু দূষণের মাত্রাও বেশি। বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা ৪ বছরের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ১১%।

টেক্সটাইল এবং ডায়িং, ট্যানারি ও কাগজ শিল্প, সিমেন্ট, মেটাল সার এবং রাসায়নিক কারখানা বিশেষ করে সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড ও অ্যামোনিয়া ইত্যাদি বায়ু দূষণের জন্য দায়ী।
গ. যানবাহনের ধোঁয়া: দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের অধিকাংশ মানুষ কার, বাস, অটোরিক্সা, মোটরসাইকেলে যাতায়াত করে, যা বায়ু দূষণের কারণ। এগুলোর ধোঁয়া বায়ুর গুণগত মানকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। BBS এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন যানবাহন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এগুলোর ধোঁয়া শহরকে দূষিত করে মানুষের জীবন বিপন্ন করছে।পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি কিউবিক মিটারে ৪৬৩ মাইক্রোগ্রাম বায়ুবাহিত পার্টিকেল ঢাকার বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হচ্ছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। মহাখালী বক্ষব্যধি ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭ মিলিয়ন লোক ব্রংকাইটিস জাতীয় রোগে ভুগছে, যা মূলত যানবাহনের দূষণ থেকে হয়।
ঘ. ইটভাটা : ইটভাটায় যে কয়লা ও কাঠ পোড়ানো হয় তা প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, যা বায়ুর সাথে মিশে বায়ু দূষণ ঘটায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানে ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণে কাঠ এবং নিম্নমানের কয়লা ব্যবহৃত হয়। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ কালো ধোয়া উৎপন্ন হয় এবং বায়ু দূষণ ঘটে থাকে। নতুন চিমনিগুলোতে যেসব জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তা থেকেই শুধু যে বায়ু দূষণ ঘটে তা নয়, পুরোনো চিমনি ও ইটভাটায় নিষ্ফল তাপীয় অবস্থার জন্যও বায়ু দূষণ ঘটে। সালফার অক্সাইড, কার্বন উপাদান, বিভিন্ন জৈব উপাদান বায়ুর গুণকে ধ্বংস করে। বর্তমানে বড় বড় শহরগুলোর চারপাশে পুঞ্জীভূতভাবে (agglomerated) ইটভাটা গড়ে উঠছে, যা শহরগুলোর বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। যেমন : সাভারের আমিনবাজারে ইটভাটার কারণে সাভার এলাকাসহ রাজধানী ঢাকা বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে।
ঙ. বহুতল ভবন নির্মাণ: বহুতলভবন নির্মানের সময় শহর এলাকায় যে পরিমাণ ধুলা বাতাসে ওড়ে তাতে শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট হয়। উপরন্তু নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কালো ধোঁয়া বাতাসে নির্গমনের অন্যতম উৎস। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে নির্মিত ইটের বাড়িঘরও এরূপ বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছে।
চ. খোলা অবস্থানে আবর্জনা নিক্ষেপ: শহর এলাকায় যত্রতত্র আবর্জনা নিক্ষেপ করার ফলে দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এছাড়া এসব আবর্জনা পচে মিথেন গ্যাসের সৃষ্টি হয় যা বায়ু দূষণ ঘটায়। বিশেষ করে বদ্ধ জলাশয় বায়ু দূষনের অন্যতম উৎস।
ছ. গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি (লাকড়ি) হিসেবে কাঠের (গাছের ডাল) ব্যবহার ব্যাপক। এসব জবলানির অপূর্ণ দহনে প্রচুর পরিমাণ নির্গত হয় এবং বায়ু দূষণ ঘটায়। এছাড়া বনাঞ্চলে কৃষিভূমি তৈরি করার জন্য বনের গাছপালা পোড়ানো হয়। এতে করেও বায়ু দূষণ ঘটে।
জ. তেজস্ক্রিয় বস্তু: তেজস্ক্রিয় বস্তু বাতাসে ভেসে বেড়ালে তা মারাত্মক দূয়ষণ ঘটায় এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র (যেমন- পারমাণবিক বিদ্যুৎ) এরূপ বায়ুদূষণের উৎস।
ঝ. কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার: অধিক ফসল পাওয়ার আশায় কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপকহারে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কীটনাশক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্প্রে করে ছিটানো হয়। ফলে সরাসরি বায়ুর দূষণ ঘটে
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Living World and Air Pollution)
প্রতিটি জীব তথা মানুষের জীবন ধারণ ও বেঁচে থাকার জন্য বায়ু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান। কিন্তু মানুষের কার্যকলাপ ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে প্রতিনিয়ত বায়ু দূষণ সংঘটিত হচ্ছে, যার ফলে আমাদের জীবন আজ হুমকির মুখে। বায়ু দূষণের ফলে মানব স্বাস্থ্য বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
মানব স্বাস্থ্যের ওপর বায়ু দূষণের প্রভাব: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, 'স্বাস্থ্য শুধু অসুখের অনুপস্থিতিই নয় বরং সম্পূর্ণ দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাও।' বায়ু শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসই নয় বরং এর মাধ্যমে জীবনও বিপন্ন করতে পারে। মূলত বায়ুর উপাদানগুলো যখন নিজেদের মধ্যে সমতা আনতে ব্যর্থ হয় তখনই বায়ু দূষণ ঘটে। দূষকের প্রকৃতি মানব স্বাস্থ্য তথা সমগ্র জীবকুলের ক্ষতির প্রধান নিয়ামক। বায়ু দূষণের ফলে মানব স্বাস্থ্যের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
স্বল্পস্থায়ী প্রভাব: বায়ু দূষণের ফলে মানুষ চলার পথে হঠাৎ মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখ জ্বালাপোড়া ইত্যাদি অবস্থার সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে নগর অঞ্চলে যেখানে যানবাহনের আধিক্য রয়েছে সেখানে এ অবস্থা বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: মানব স্বাস্থের উপর বায়ু দূষণের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এর প্রভাবে নানা ধরনের রোগ-
ব্যাধি হয়ে থাকে। যেমন,
i. যানবাহন হতে নির্গত নানা ধরনের গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড উল্লেখযোগ্য। এ গ্যাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে রক্তের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা হ্রাস পায়।
ii. তেল ও কয়লা দহনের ফলে সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়। এতে শ্বাসকষ্ট, মাথাধরা, বমি বমি ভাব হয়ে থাকে।
iii. রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় উৎপন্ন হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস চোখ ও গলার বিশেষ ক্ষতি করে।
iv. তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে নির্গত সূক্ষ্ম ধূলিকণা ক্যান্সার রোগ সৃষ্টি করে।
v. বিস্ফোরক দ্রব্য, রঙ, সার প্রভৃতি উৎপাদনের সময় যে অ্যামোনিয়া নির্গত হয় তা মানুষের শ্বাসনালীর ক্ষতি করে।
উদ্ভিদের ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ দীর্ঘসময় ধরে উদ্ভিদের ক্ষতি করে থাকে। বেশ কিছু বায়ু দূষক উদ্ভিদের ক্ষতি করে। এগুলোর মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, এবং এ্যামোনিয়া দূষণের জন্য দায়ী। কার্বন মনোক্সাইড উদ্ভিদের নাইট্রোজেন সংবন্ধন প্রক্রিয়া বিঘ্ন ঘটায়। সালফার ডাইঅক্সাইড সালোকসংশ্লেষণে বাঁধা প্রদান করে। নাইট্রোজেন অক্সাইড ফসল উৎপাদন হ্রাস করে থাকে। তাপমাত্রা, শিকড়ের আর্দ্রতা সরবরাহ ও আলোর ওপর নির্ভর করে দূষক উদ্ভিদকে ক্ষতি করে।
বাস্তুসংস্থানের ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ বাস্তুসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যেমন- এসিড বৃষ্টির ফলে যেকোনো বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। বায়ু দূষণ শুধু স্থলজ বাস্তুসংস্থানকেই প্রভাবিত করে না এটি জলজ বাস্তুসংস্থান এমনকি পানি প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলে।
পশুপাখির ওপর প্রভাব: বায়ু দূষণ মানব স্বাস্থ্যের মতোই পশুপাখিরও ক্ষতি করে। পশুপাখি দুটি প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রথমত, বায়ুর পুঞ্জীভূত দূষিত পদার্থ উদ্ভিদ ও গৃহপালিত পশুপাখির খাদ্যকে দূষিত করে। দ্বিতীয়ত, যখন তারা এই দূষিত উদ্ভিদ ও খাদ্য গ্রহণ করে তখন বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Prevention of Air Pollution)
বায়ু দূষণ জীবজন্তু ও মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। তাই বিভিন্ন সময়ে বায়ু দূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বায়ু দূষণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫; পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি, ১৯৯৭; এবং পরিবেশ পরিষদ আইন, ২০০০ ইত্যাদি আইন করেছে। বায়ু দূষণ প্রতিরোধে করণীয়সমূহ-
(ক) যানবাহনের জ্বালানি পরিবর্তন/রূপান্তর: বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ১৯৮৫-৮৬ সালে প্রথম যানবাহনে গ্যাসোলিনের পরিবর্তে কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) ব্যবহার করে। ব্যবহারের পর দেখা গেছে গ্যাসোলিনের চেয়ে সিএনজিতে বায়ু দূষণের পরিমাণ অনেক কম। বায়ু দূষণ রোধে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বিভিন্ন যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে।
(খ) বায়ুর গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন: বায়ু দূষণ প্রতিরোধে সরকার বায়ুর গুণগত মান মনিটরিং ও মূল্যায়ন করতে পারে। মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নে সরকার কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, যা বায়ু দূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
(গ) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা: ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারিভাবে বায়ু দূষণ প্রতিরোধ করা যায়। ট্রাফিক জ্যাম প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট রাস্তায় নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচল করলে যানবাহন নির্গত জ্বালানি দূষণ কমানো সম্ভব, যা বায়ু দূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত তা হচ্ছে ট্রাফিক সিগন্যাল, একমুখী সড়ক তৈরি, পার্কিং সুবিধার উন্নতি, বিভিন্ন গতির গাড়ির জন্য ভিন্ন ভিন্ন সড়ক বা লেন তৈরি ও ব্যবহার। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়ু দূষণ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি যানবাহন মালিকদেরও সচেতন হতে হবে।
(ঘ) নির্দিষ্ট স্থানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা: যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে তুললে বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পায়। যেখানে শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে সেখানে আবাসিক ভবন থাকবে না। তাহলে বায়ু দূষণ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
(ঙ) বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার: জ্বালানি হিসেবে কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ু ও তাপশক্তি, জৈব জ্বালানি প্রভৃতির ব্যবহার বৃদ্ধির সাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশে সম্ভব।
(চ) কলকারখানার চিমনি উঁচু করে তৈরি করা এবং কারখানার চারদিকে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা।
(ছ) আবাদী জমিতে সীমিত পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করা।
(জ) রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র প্রভৃতি মাধ্যমে জনগণকে বায়ু দূষণের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা।
(ঝ) পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও এসবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা।
| বায়ুর উপাদান | বায়ুর উপাদানগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- গ্যাসীয় উপাদান, জলীয়বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা। বায়ুর প্রধান দুটি গ্যাসীয় উপাদান হলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। বায়ুতে ৭৮.০২% নাইট্রোজেন এবং ২০.৭১% অক্সিজেন বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়াও আর্গন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নিয়ন, হিলিয়াম, ক্রিপটন, ইত্যাদি বায়ুর গ্যাসীয় উপাদান। |
| বায়ুমণ্ডল | ভূপৃষ্ঠকে বেষ্টনকারী যে গ্যাসীয় আবরণ রয়েছে তাকে বায়ুমণ্ডল বলে। এটি পৃথিবীর সাথে অবিচ্ছেদ্য। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে লেগে থাকে এবং সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয়। |
| বায়ুমণ্ডলীয় স্তর | বায়ুমণ্ডলকে প্রধান দুটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, যেমন- (ক) সমমণ্ডল ও (খ) বিষমমণ্ডল। ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, ওজোনোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং সমতাপ অঞ্চল নিয়ে সমমণ্ডল গঠিত। নাইট্রোজেন পারমাণবিক স্তর, অক্সিজেন পারমাণবিক স্তর, হিলিয়াম ও হাইড্রোজেন স্তর নিয়ে বিষমমণ্ডল বিস্তৃত। ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তরটিকে ট্রপোস্ফিয়ার বলা হয়। এ স্তরের গড় গভীরতা প্রায় ১২ কি.মি.। মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। |
| বায়ু দূষণ | বায়ুতে এক বা একাধিক দূষকের উপস্থিতি ও স্থায়িত্ব সেখানকার জীব সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের জন্য ক্ষতিকর হলে তাকে বায়ু দূষণ বলে। |
| দূষক | যেসব উপাদান বায়ুকে দূষিত করে তাকে দূষক বলে। শিল্পকারখানার চিমনি হতে ধোঁয়া ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ, নির্গত CFC গ্যাস, জীবের নিঃশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ইগজস্ট গ্যাস, সালফার ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি বায়ু দূষক। |
| স্বল্পস্থায়ী প্রভাব | বায়ুদূষণের স্বল্পস্থায়ী প্রভাব প্রতিনিয়ত জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। মানুষ চলার পথে দূষণের কারণে হঠাৎ করেই মাথা ব্যাথা, বমি, চোখ জ্বালাপোড়া করা, শ্বাসকষ্টে ভুগছে। |
| বিকল্প জ্বালানি | বায়ুদূষণ প্রতিরোধে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সৌরশক্তি, বায়ু ও তাপশক্তি এবং জৈব জ্বালানির ব্যবহার বায়ুদূষণ প্রতেিরাধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা। |
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ - খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more