hsc

পাঠ-১: শিল্প গড়ে ওঠার নিয়ামকসমূহ

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.6k

(The Factors of Industrial Development)

শিল্প সভ্যতার বাহন। আদিকাল থেকে মানুষ তার প্রয়োজনে প্রকৃতি থেকে আহরিত দ্রব্য অধিকতর ব্যবহার উপযোগী করার জন্য শিল্পের গোড়াপত্তন করে। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে শিল্পের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। হাতে কাটা চরকা শিল্পের স্থানে বৃহৎ কাপড়ের কল, কামারের পেটা লৌহের জায়গায় বৃহৎ লৌহ-ইস্পাত কারখানা হলো শিল্পে অগ্রগতির ফল। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক দিয়েও শক্তিশালী।

বাংলাদেশ শিল্পে একটি অনুন্নত দেশ। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত শিল্পকারখানাসমূহ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে আসে। তাছাড়া সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যেও বেশ কিছু শিল্পকারখানা জাতীয়করণ কর হয়। অতঃপর বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার্থে ১৯৮২ সাল হতে অলাভজনক কতিপয় শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরকে শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহ প্রদান করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে এবং গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
কোনো একটি স্থানে শিল্প স্থাপনের পিছনে কিছু প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নিচে নিয়ামকসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো

১. জলবায়ু (Climate): শিল্পের স্থানীয়করণে জলবায়ুর প্রভাব অত্যধিক। জলবায়ুর উপাদানগুলোর (তাপ, চাপ, আর্দ্রতা) বিচিত্রতার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু দেখা যায়। জলবায়ুর উপাদানগুলো শিল্পের অবস্থানের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যেমন: যেসব অঞ্চলে তাপমাত্রা অধিক সেখানে কারখানা সচল রাখার জন্য যন্ত্রের মাধ্যমে তাপ সহনীয় করার ব্যবস্থা করতে হয়। এর ফলে শিল্পজাত দ্রব্যের খরচ অধিক হয়। আবার তাপমাত্রা অধিক হওয়ায় শ্রমিকেরা কারখানায় বেশি সময় কাজ করতে না পারায় উৎপাদন কম হয়। এ কারণে উষ্ণমণ্ডলের দেশগুলোতে শিল্প প্রসার লাভ করেনি। যেমন-মালদ্বীপ। পশ্চিম ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি; উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা; এশিয়ার জাপান প্রভৃতি দেশ শিল্পোন্নত হওয়ার প্রধান কারণ শ্রমিকরা বেশি সময় কাজ করতে পারে। এ কারণে পৃথিবীর মোট শিল্পের অধিকাংশই নাতিশীতোষ৷ অঞ্চলের দেশসমূহে গড়ে উঠেছে।

২. কাঁচামাল (Raw material): শিল্প কারখানার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় কাঁচামালের। কারণ শিল্প উৎপাদন মানেই হলো কাঁচামালের রূপান্তর। পাট, আখ, চা ইত্যাদির উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাংলাদেশের পাট, চিনি ও চা শিল্প প্রসার লাভকরেছে। আবার রাঙামাটি জেলার চন্দ্রঘোনায় বাঁশ ও বেত প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় বলে সেখানে কাগজ শিল্প গড়ে উঠেছে। প্রচুর তুলা উৎপাদনের কারণে চীনের সাংহাইতে গড়ে উঠেছে কার্পাস বয়ন শিল্প। আবার মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে স্থানীয় রাবারের ওপর ভিত্তি করে প্রচুর রাবার শিল্প গড়ে উঠেছে

৩. শক্তি সম্পদ (Energy resources): শক্তি সম্পদের উপরও শিল্পের অবস্থান অনেকাংশে নির্ভরশীল। সাধারণত যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত শক্তি সম্পদ সরবরাহের সুযোগ রয়েছে সেসব স্থানে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। যেমন-লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের জন্য শক্তি সম্পদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। শক্তি সম্পদের অন্যতম উৎস কয়লা। তাই কয়লা খনির নিকটে হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পিটার্সবার্গ অঞ্চলে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সার কারখানা গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে। খনিজ তেল, কয়লা দূরবর্তী স্থানে বহন করে শিল্প স্থাপন ব্যয়বহুল বলে অনেক শিল্প খনি এলাকাতেই গড়ে ওঠে। এজন্য যুক্তরাজ্য ও জার্মানির কার্পাস শিল্প কয়লা খনি অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে।

৪. পানি সম্পদ (Water resources): সাধারণত নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ পানি প্রভৃতির নিকটবর্তী স্থানে শিল্প কারখানাগুলো গড়ে উঠতে দেখা যায়। কারণ প্রতিটি শিল্পের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে পানি। তাছাড়া শিল্পের উৎপাদিত পণ্য স্থানান্তরেও নদী ও সমুদ্র পথের প্রয়োজন হয়। এ কারণেই বৈদেশিক বাণিজ্যের চাহিদার জন্য বড় বড় শিল্প কারখানাগুলো নদী ও সমুদ্র বন্দরের সন্নিকটে গড়ে ওঠেছে। যেমন- চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় টিএসপি প্রজেক্ট, মেঘনা নদীর তীরে সিমেন্ট কারখানা ইত্যাদি।

৫. ডগ্ন উপকূল রেখা (Broken Coast line): ভগ্ন উপকূলরেখা বৃহৎ বন্দর স্থাপন ও আমদানি-রপ্তানি নির্ভর শিল্প স্থাপনে সহায়ক। অনেক সময় কাঁচামাল না থাকলেও ভগ্ন উপকূলরেখার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৃহৎ শিল্পের সমাবেশ লক্ষ করা যায়। জাপান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আকরিক লৌহ ও কয়লার পর্যাপ্ততা না থাকলেও বন্দরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে সুলভে আমদানির মাধ্যমে জাপান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় লৌহ ও ইস্পাত শিল্প উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...