hsc

পাঠ-১৪: জীবজগতে জলবায়ুর ভিন্নতার প্রভাব

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

12

(Effects of Different Types of Climate on Living World)

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর ভিন্নতা বা পরিবর্তন জীবজগতের ওপর নানাধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে। অতীতকালের স্বাভাবিক জলবায়ু ছিল মৃদুভাবাপন্ন। এ সময় মেরু অঞ্চলে বরফাবরণ ছিল না বলে মেরু অঞ্চলে শৈত্যতাপ জনিত চাপ ছিল না। সে সঙ্গে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াও ছিল অনুপস্থিত। কিন্তু হিমযুগে মধ্য ও নিম্ন অক্ষাংশের চাপ বলয়গুলো সংকুচিত হয় এবং সেখানে ঝড়ো আবহাওয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
জলবায়ু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল বিষয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। জলবায়ুর উপাদানগুলো একক বা সম্মিলিতভাবে কাজ করে। নিচে বিশেষ বিশেষ কতিপয় ক্ষেত্র আলোচনা করা হলো

১. কৃষিকাজ: কৃষিকাজ প্রধানত জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। হাজার হাজার বছর ধরে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপন্ন হয়। যেমন-উষ্ণমণ্ডলের বৃষ্টিবহুল এলাকায় ধান, পাট, চা, ইক্ষু, বিভিন্ন রসাল ফল ইত্যাদি জন্মায় (উদাহরণ-বাংলাদেশ)। অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাত যুক্ত নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে গম, যব, ভুট্টা ইত্যাদি খাদ্যশস্য জন্মায়। যে অঞ্চলে মানুষ বসবাস করে সেসব অঞ্চলের জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খেয়ে যে ফসল উৎপাদন হয় তার ওপর মানুষের জীবন-জীবিকা বা খাদ্যাভ্যাস নির্ভর করে। তাই ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত এবং গম উৎপাদনকারী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য রুটি। আর একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, অধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত সমভূমি অঞ্চলে বন্যার প্রভাবে পলিময় মৃত্তিকার সৃষ্টি হয় এবং মৃত্তিকার উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়, যা ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

২. পশুপালন: পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মহাদেশীয় জলবায়ুর প্রভাবে বিশাল আয়তনের তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে। পশুপালনের জন্য তৃণভূমির প্রয়োজন। এ কারণে উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, দক্ষিণ আমেরিকার পাম্পাস, অস্ট্রেলিয়ার ডাউন্স, ইউরেশিয়ার স্টেপ প্রভৃতি তৃণভূমি অঞ্চলে পশুপালনের পাশাপাশি পশুসম্পদ ভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে অঞ্চলবিশেষে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের তৃণভূমি এলাকায় লাভজনকভাবে পশুপালন করা হয়।

৩. মৎস্য শিল্প: পৃথিবীর প্রধান মৎস্য শিকার কেন্দ্রগুলো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। এই জলবায়ুতে মাছের প্রিয় খাদ্য প্লাঙ্কটন (plankton) ভালো জন্মায়। এছাড়া মাছ সংরক্ষণের সুবিধাও বেশি। উষ্ণমণ্ডলে মাছ সংরক্ষণ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু বৃষ্টিবহুল এলাকায় নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, দীঘি মিঠাপানির মাছে ভরপুর। এটা যেমন মানুষের খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তেমনি কর্মসংস্থানেরও ক্ষেত্র।

৪. শিল্প: যন্ত্র শিল্প, কুটির শিল্প, হস্ত শিল্পের ওপর জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ব্যাপক। এসব শিল্প বিকাশে কাঁচামাল, শ্রমিক, মূলধন ও সংগঠন প্রধান সহায়ক শক্তি। এছাড়া রয়েছে সুষ্ঠু পরিবহন ও স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা। যেমন- নৌ পরিবহন বাণিজ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শিল্প বিকাশের এসব নিয়ামক জলবায়ুর আনুকূল্যেই গড়ে ওঠে। তাই এক এক জলবায়ু অঞ্চলে এক এক ধরনের শিল্প গড়ে ওঠে। যেমন- আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চল বস্ত্রশিল্প বিকাশের অনুকূল।

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য: অনুকূল জলবায়ু অঞ্চলের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষিকার্য, খনিজ উত্তোলন, কাঠ আহরণ প্রভৃতি সহজসাধ্য হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। এজন্য নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নত। যেমন- ইউরোপের বাণিজ্য।

৬. বসতি স্থাপন: উষ্ণতা, প্রচণ্ড গরম বা স্বাভাবিক গরম, প্রচণ্ড শীত বা স্বাভাবিক শীত জনসংখ্যা বণ্টনে প্রভাব ফেলে। খুবই উষ্ণ বা খুবই শীতল এলাকায় মানুষের বসবাস করা কষ্টসাধ্য। উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে বা শীতল তুন্দ্রা অঞ্চলে জনবসতি বিরল। জলবায়ুর বিভিন্নতার জন্য বাসগৃহের আকৃতি বা নির্মাণ কৌশলও ভিন্নতর হয়। অত্যধিক বৃষ্টিবহুল বা তুষারপাত এলাকায় ঘরের ছাদ ঢালু হয়। জলবায়ুর পরোক্ষ প্রভাবে বনভূমি প্রাধান্য এলাকায় কাঠের ঘর-বাড়ি, পলিযুক্ত মৃত্তিকা অঞ্চলে মাটির ঘর না হয়ে টিন ও বেড়ার ঘর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

৭. পোশাক-পরিচ্ছদ: শীতল এলাকার জনসাধারণ পশম, চামড়া ইত্যাদি দ্বারা তৈরি পোশাক পরিধান করে। শুষ্ক-গরম অঞ্চলের অধিবাসীগণ সাদা কাপড় পরে (আরব দেশ), আর্দ্র-গরম অঞ্চলে মানুষ সাধারণত সুতি বস্ত্র পরিধান করে (উপমহাদেশ)।

৮. সভ্যতার বিকাশ: মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জলবায়ুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে নদী উপত্যকায় সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। যেমন- সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা। বসবাস উপযোগী আবহাওয়া, উর্বর মৃত্তিকায় চাষাবাদ, সুপেয় পানি, নদীপথে চলাচল, মৎস্য শিকার, বৃক্ষরাজির সমাহার প্রভৃতি সেক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। জলবায়ুর আনুকুল্যেই বিশ্বের ঘনবসতি অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছে নদী অববাহিকাগুলো।

প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আবহাওয়া তথা জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানগুলোর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় জীবজগৎ আজ হুমকির সম্মুখীন। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবে মানব সমাজ আজ নানা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন। তবে আশার কথা, এ ব্যাপারে বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...