(Land Erosion)
ভূমিক্ষয় বলতে সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাকৃতিক নিয়মে ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের ক্ষয়সাধন বোঝায়। বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, জলস্রোত, হিমবাহের গতি প্রভৃতির প্রভাবে ভূমির উপরিভাগের মাটি ক্ষয় হওয়াকে ভূমি বা মৃত্তিকা ক্ষয় বলে। ভূতাত্ত্বিক কারণে অতি ধীরে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়ে উপত্যকা, বদ্বীপ, সমতলভূমি ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত চাষাবাদ, পশুচারণ, বনভূমি ধ্বংস ও অনুপযোগী জমিতে চাষাবাদ এবং ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয়।
ভূমিক্ষয়ের নিয়ামক: কৃষিকাজ, বসতি স্থাপন, শহরায়ণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ ভূমিক্ষয়কে প্রভাবিত করে। এর নিয়ামকগুলো হলো- (ক) মাটির বৈশিষ্ট্য, (খ) উদ্ভিদের আবরণ, (গ) বায়ুপ্রবাহ, (ঘ) বৃষ্টিপাত, (ঙ) পানি এবং (চ) ঢেউয়ের আঘাত (নদী তীরে)।
বাংলাদেশের ভূমিক্ষয়ের কারণ; অতিরিক্ত শস্য উৎপাদন, অনুপযুক্ত জমি কর্ষণ, অতিরিক্ত পশুচারণ বা বনাঞ্চল ধ্বংস ইত্যাদি অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় ঘটে থাকে। অধিক মাত্রায় শস্য ফলানোর জন্য মাটিস্থ হিউমাসের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাটির সংশক্তি প্রবণতা (cohesiveness) ও ভেদ্যতা কমে যায়। ফলে ভূমিক্ষয় ঘটে। বর্ষার ফলে মাটির উপরিতল পানির প্রত্যক্ষ প্রভাবে উন্মুক্ত হওয়ায় মাটির কণার দ্রুত চলাচলের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এ কারণটি বেশি ঘটে থাকে। শুষ্ক অঞ্চলে (উত্তরাঞ্চল) ধুলা-ঝড় এবং বালু-ঝড়ের মাধ্যমেও বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়।
ভূমিক্ষয়ের ফলাফল: ভূমিক্ষয়ের ফলে ইতিবাচক প্রভাব-এর চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে;
i. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষিনির্ভর এদেশের কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ii. ভূমিক্ষয়ের ফলে অনেক স্থানে বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে নদীভাঙন বৃদ্ধি পায়। ফলে কোটি কোটি টাকার ফসল, ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট হয়;
iii. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হয় বলে কৃষিনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন হ্রাস পায়;
iv. ভূমিক্ষয়ের ফলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়; এবং
v. ভূমিক্ষয়ের কারণে চারণভূমি বিনষ্ট ও পশুপালন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভূমিক্ষয় রোধে করণীয়/প্রতিকার: অতিমাত্রায় ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে এদেশে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পেয়ে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করার জন্য বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ (যেমন- শস্যাবর্তন) গ্রহণ করা আবশ্যক। ভূমিক্ষয় প্রতিকারের উপায়গুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-
(ক) পাড় চাষ বা আড়াআড়ি চাষ: অত্যন্ত খাড়া ঢালে পানির অতি দ্রুত নিম্নগতির জন্য প্রচুর মাটি অপসারিত হওয়ার ফলে খাদ সৃষ্টি হয়। চাষাবাদের মাধ্যমেও মাটিক্ষয় হয়ে থাকে। আড়াআড়ি চাষ (contour tillage) পদ্ধতিতে ঢালের উপর ও তলদেশ ব্যতীত অন্যান্য স্থানে আড়াআড়িভাবে চাষাবাদ, বীজতলা প্রস্তুত ও ফসল সংরক্ষণ করা হয়।
(খ) সোপান চাষ: সাধারণত সোপান চাষাবাদ দ্বারা দুটি পদ্ধতি বোঝানো হয়। যুগ যুগ ধরে চীন, কোরিয়া ও পেরুতে পাহাড় ও পর্বতের ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপবিশিষ্ট সমতল ভূমি প্রস্তুত করে তাতে কোথাও শুষ্ক (কৃত্রিম পানিসেচ ব্যতীত) চাষাবাদ আবার কোথাও প্লাবন (সেচের মাধ্যমে) চাষাবাদ করা হয়। প্লাবন চাষের ক্ষেত্রে একটি ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে নালার মাধ্যমে পানি স্থানান্তরিত করা হয়।
সোপান চাষের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে বড় মাটির বেদী বা বাঁধ তৈরি, যা আধুনিক চাষাবাদে বহুল প্রচলিত। এক্ষেত্রে পানি গড়িয়ে যাওয়ার গতিমাত্রা ও ভূমিক্ষয়ের পরিধি নিয়ন্ত্রণের উপযোগী করে ঢালের প্রতিকূলে বাঁধ তৈরি করা হয়। এতে পরস্পর বাঁধের দূরত্ব এমনভাবে নির্ণয় করা হয় যাতে বাঁধ দুটির মধ্যে মাটি ক্ষয়ের ক্ষমতাবিশিষ্ট পানির উচ্চগতি অর্জিত না হতে পারে (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ মিটার)। বাঁধের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও উচ্চতা ইত্যাদি ভূমির আয়তন, ঢালের (slope) মাত্রা, প্রয়োজনীয় পানি ধারণক্ষমতা, নিষ্কাশন নালা এবং ভূমি কর্ষণের সুবিধা অনযায়ী করা হয়।
(গ) নালা পুনরুদ্ধার: বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমিতে সৃষ্ট খাদ বা নালা পুনরুদ্ধার করা যায়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পানি স্রোত হ্রাস করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম করণীয়। প্রাথমিকভাবে খাদ বরাবর ছোট ছোট বাঁধ তৈরি করে পানির স্রোত প্রতিহত করা হয় (ঢালের মাত্রা অনুযায়ী ৬-৮ মিটার ঘন বাঁধ)। খড়কুটা, কাঠের খন্ড, ঘাসের চাপড়া (soda), তারের জাল বা মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা যায়। ক্রমশ, তলানি জমে খাদ ভরে ওঠে। এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে খাদের উপরদিক থেকে পানি স্রোতকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করে মাটি আটকে রাখা হয়।

(ঘ) খন্ড চাষ বা ফালা চাষ: পানি ও বায়ুস্রোতজনিত ক্ষয়রোধ এবং শস্যাবর্তন পদ্ধতির সুবিধার্থে খণ্ডচাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ভূমির ঢাল বেশি হলে যৌথভাবে খন্ড চাষ ও পাড় চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে অথবা ভূমি পরিত্যক্ত রেখেও শস্যাবর্তন পদ্ধতিতে পাড় চাষ করা যায়।খণ্ড চাষ পদ্ধতিতে একটানা বিস্তৃত কোনো ভূমিতে বায়ুস্রোত উন্মুক্ত থাকে না এবং বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ বায়ু প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করায় ভূমিক্ষয় হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে প্রবল বেগে বায়ুপ্রবাহের ঋতুতে বায়ুস্রোতের প্রতিকূলে আড়াআড়ি বা খণ্ডচাষ করা হয়। মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিলতে চাষের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অভ্যন্তরীণ নদী, তীরবর্তী বিস্তীর্ণ ভূমি বাঁধের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করে অধিক উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে।

ভূমিক্ষয় রোধের অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, নিয়ন্ত্রিত পশুপালন, ঘাস জন্মানো, আবরণ, শস্য রোপণ, নদী তীর ও বদ্বীপের তীরে জলজ, উদ্ভিদ জন্মানো ইত্যাদি। সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ভূমিক্ষয় রোধের জন্য বিশেষ উপযোগী।
ভূমিধস (Land slide)
অপেক্ষাকৃত শুষ্ক মাটি বা শিলার ভগ্নস্তূপ মাধ্যাকর্ষণ, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো কারণে বৃহৎ পরিসরে ধসে পড়তে পারে। একে ভূমিধস বলে। সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিধসকে আশংকাজনকরূপে বিবেচনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট ইত্যাদি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলসমূহে দিন দিন ভূমিধসের কারণে প্রাণহানি বাড়ছে।
বাংলাদেশে ভূমিধসের কারণ: বাংলাদেশে ভূমিধসের প্রাকৃতিক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত,
পার্বত্য নদীগুলোর পার্শ্বক্ষয় শিলার গঠন এবং ভগ্নস্তূপের ঢাল বিচলন। কিন্তু এদেশে ভূমিধস মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেমন- পাহাড় কাটা, কৃত্রিমভাবে পাহাড়ে স্তূপ সৃষ্টি, বৃক্ষনিধন, ভবনাদি ও অন্যান্য কাঠামো তৈরি, পয়ঃপ্রণালি, জলাধার নির্মাণ এবং জুমচাষ ভূমিধসের আশংকা বাড়াচ্ছে।
ভূমিধসের ফলাফল: ভূমিধস বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করে। বিশেষ করে এসব স্থাপনা যদি পর্বতের ঢালে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে প্রায়ই ভূমিধস ঘটছে। প্রায় প্রতিবছরই ভূমিধসের কারণে পার্বত্য জেলাগুলোর সাথে দেশের অন্যান্য অংশের সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
ভূমিধসের ফলস্বরূপ বহু প্রাণ ও সম্পদ বিলীন হয়। বাংলাদেশেও প্রায় প্রতিবছরেই ভূমিধসের কারণে বহুলোক ঘরবাড়িশূন্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে। খাড়া ঢালে যখন কোনো স্থাপনা বা সম্পদের অবস্থান থাকে ভূমিধসে তা ধ্বংস হয়। বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় ঢালে (slope) বাড়িঘর দেখা যায়। আবার জুম চাষ পাহাড়ি ঢালেই হয়ে থাকে। ফলে দেখা যায় ভূমিধস ঘটলে বহু জানমালের ক্ষতিসাধন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে এ জাতীয় ঘটনা ইদানিং অহরহ ঘটে। যেমন- ১১ আগস্ট, ১৯৯০ এ বান্দরবান জেলায় দুটি বড় ভূমিধসে ১৭ জন ব্যক্তি নিহত হয়। ২৪ জুন, ২০০০ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে অন্তত ১৩ জন ব্যক্তি নিহত ও ১০ জন আহত হয়। ১১ জুন, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে ৫৯ জন শিশুসহ ১২৮ জনের মৃত্যু ঘটে, ১৫০ জনের বেশি আহত হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সর্বশেষ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ২০১৭ সালে ১২ই জুন রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে ভূমিধস ঘটে যাতে ১৫২ জন লোক মারা যায়।
ভূমিধস রোধে করণীয় : বাংলাদেশে ভূমিধস যতটা না প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি হয় মানবসৃষ্ট কারণে। তাই ভূমিধস রোধে মানুষকে তার অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড থেকে সচেতন হতে হবে। এ লক্ষ্যে করণীয়-
i. ভবনাদি ও ভৌত কাঠামো নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ; ii. বৃষ্টির পানির কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; iii. পাহাড়ি ঢালের বক্ষনিধন বন্ধ করা; এবং iv. ভূমি ব্যবহারে মৃত্তিকা ক্ষয়রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more