hsc

পৃথিবীর আকস্মিক পরিবর্তন (পাঠ-১)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.3k

(Sudden Changes of the Earth)

ভূপৃষ্ঠ সর্বদা পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তির প্রভাবে ভূগর্ভে সর্বদা নানারূপ পরিবর্তন হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূকম্পন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে সংকোচন, ভূগর্ভের তাপ-চাপ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির ফলে ভূপৃষ্ঠে হঠাৎ যে পরিবর্তন হয় তাকে আকস্মিক পরিবর্তন বা দ্রুত পরিবর্তন বলে। এরূপ পরিবর্তন অল্প পরিসরে হয়ে থাকে। আকস্মিক পরিবর্তন মূলত ২ প্রকার। যথা- (i) ভূমিকম্প এবং (ii) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত উভয় প্রক্রিয়াই ভূত্বকের তলদেশে শিলার গঠনে বিকৃতি ঘটায় এবং ভূপৃষ্ঠে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভূমিরূপ গঠন করে।

১. ভূমিকম্প: ভূঅভ্যন্তরে চাপ ও তাপের হ্রাস বৃদ্ধি, তাপীয় পরিচলন স্রোত, প্লেটগতির তারতম্য ও অন্যান্য কারণে মাঝে মাঝে ভূপৃষ্ঠ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। এ কম্পন অত্যন্ত মৃদু থেকে প্রচণ্ড হয়ে থাকে, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ভূপৃষ্ঠের এরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে।
এ ধরনের প্রক্রিয়া ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। ভূমিকম্প সংঘটিত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠে ফাটল, সৃষ্টি হয়। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থান উপরে উঠে যায় বা নিচে নেমে যায়। বিশেষ করে ভূত্বকে বিভিন্ন চ্যুতির সৃষ্টি করে।

২. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: ভূগর্ভস্থ গলিত লাভা, বাষ্প, ভস্ম, কর্দম ও ধূম্র প্রভৃতি পদার্থ ভূপৃষ্ঠের ফাটল বা ছিদ্রপথের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে নির্গত হলে তা অগ্ন্যুৎপাত এবং ঐ সকল পদার্থ জমাট বেঁধে যে পর্বত বা গিরির সৃষ্টি করে তাকে আগ্নেয়গিরি বলে। হাওয়াই দ্বীপের মৌনালোয়া, ইতালির স্ট্রম্বলী এবং আইসল্যান্ডের হ্যাকলা প্রভৃতি পৃথিবীর বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি। ভূঅভ্যন্তরীণ কারণে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হলে এর ফলে ভূমিরূপের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে গভীর সমুদ্রবক্ষে শত শত দ্বীপ ও সমতলভূমিতে সুউচ্চ পর্বত সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেক স্থলভাগ সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে লাভা সঞ্চারণ ও প্রবাহের দ্বারা নানা ধরনের ভূমিরূপ গঠিত হয়। যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি কিংবা ভিসুভিয়াস ও ফুজিয়ামার মতো সুউচ্চ পর্বতসমূহ। আবার ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় ব্যাথোলিথ, ল্যাকোলিথ, ডাইক ও সিল জাতীয় শিলা

ভূমিরুপ পরিবর্তন . খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added || updated By

(Chemical Weathering)

শিলা বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত। এ খনিজগুলোর ওপর বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদানগুলো বিশেষত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয়বাষ্প বিক্রিয়া (reaction) করে। এর ফলে কঠিন শিলা বিয়োজিত হয় এবং খনিজগুলো নতুন গৌণ খনিজে পরিণত হয়ে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এরূপে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন বলা হয়।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে বায়ুর আর্দ্রতার কারণে অধিক পরিমাণ রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন দেখা যায়। রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়-

১. দ্রবণ (Solution): খুব অল্প সংখ্যক শিলা গঠনকারী খনিজ পানিতে দ্রবণীয় বলে দ্রবণ সরাসরি বিচূর্ণীভবন করে না। তবে এটি রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে গঠিত বিভিন্ন দ্রব্যকে পানিতে দ্রবীভূত করে অপসারণ করে এবং পরোক্ষভাবে বিচূর্ণীভবনে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ: ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) যখন ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত হয় তখন তা পানিতে দ্রবীভূত হয়ে অপসারিত হয়।

২. জারণ (Oxidation): বিভিন্ন শিলার মধ্যে লৌহ জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকলে এবং তা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে তাতে ধীরে ধীরে আয়রন অক্সাইড (Iron-oxide) সৃষ্টি হয়। অক্সিজেনের প্রভাবে শিলারাশির এ প্রকার বিচূর্ণীভবনকে জারণ বলে।

উদাহরণ: সাধারণত দেখা যায় লৌহ নির্মিত দ্রব্য মরিচা ধরে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। কারণ বাতাসের অক্সিজেন লৌহের
সাথে যুক্ত হয়ে হলুদ বা বাদামি রঙের লিমোনাইট (2Fe2O3.3H2O) গঠন করে এবং সহজেই তা ভেঙে যায়।

4FeO + 2H2O + O2 2Fe2O3.2H2O

(ফেরাস অক্সাইড + পানি + অক্সিজেন লিমোনাইট)

৩. জলযোজন (Hydration): রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানিযুক্ত হয়ে খনিজের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে জলযোজন (Hydration) বলে। কিছু খনিজ বায়ু হতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানি গ্রহণ করে আকারে বৃদ্ধি লাভ করে। এর ফলে শিলার ভেতর টানের সৃষ্টি হয় এবং শিলা সহজেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়। এছাড়া জলযোজনের ফলে খনিজের আয়তন ও ছিদ্রতলের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে শিলাস্তরের বিয়োজন সহজ হয়।

উদাহরণ: এ প্রক্রিয়ায় অ্যানহাইড্রাইটের (CaSO4) সাথে পানিযুক্ত হয়ে জিপসাম গঠিত হয়।

CaSO4 + 2H2O CaSO4.2H2O

(অ্যানহাইড্রাইট) (পানি) (জিপসাম)

এরূপ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় খনিজের মধ্যে পানি ঢুকলে খনিজের পরিবর্তন ঘটে এবং তা আয়তনে বৃদ্ধি পায়।

৪. অঙ্গারযোজন (Carbonation) : বিভিন্ন খনিজের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক সংযোগকে কার্বনেশন বা অঙ্গারযোজন বলে। বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে পড়ার সময় বায়ুমণ্ডলস্থিত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশ্রিত হয়ে এসিডে পরিণত হয়।

H2O + CO2  H2CO3

(পানি) + (কার্বন ডাইঅক্সাইড) → (কার্বনিক এসিড)

উদাহরণ: চুনাপাথর ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্বারা গঠিত।

৫. হাইড্রোলাইসিস (Hydrolysis): হাইড্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন (H+) ও হাইড্রোক্সিল (OH-) আয়নে পরিণত হয়। এ হাইড্রোক্সিল আয়ন খনিজের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটায়।

উদাহরণ: আগ্নেয় শিলায় প্রাপ্ত দুটি প্রধান খনিজ ফেলসপার ও অভ্রের রাসায়নিক পরিবর্তন প্রধানত এ প্রক্রিয়ায় হয়।

জৈবিক বিচূর্ণীভবন (Biological Weathering)

জৈবিক বিচূর্ণীভবন প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংঘটিত ভৌত ও রাসায়নিক ক্ষয়ীভবন।
মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষলতাদি প্রতিনিয়ত ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধন ও পরিবর্তন সাধন করছে। নানা প্রকার প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্রিয়ার দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বলে এ প্রক্রিয়াকে জৈবিক বিচূর্ণীভবন বলে। এটি তিন ভাবে সংঘটিত হয়। যথা-

১. উদ্ভিদের কাজ : ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধনে উদ্ভিদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রকার গাছপালা মূল ও শিকড় দ্বারা
মাটিকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে। গাছের মূল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোটা হয়ে মাটির নিচে বহুদূর পর্যন্ত চলে যায়। ফলে শিলার ফাটলও বড় হয় এবং ঐ সমস্ত ফাটলে পানি প্রবেশ করলে সেখানকার শিলাস্তর দুর্বল হয় ও গলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এছাড়া মস, শৈবাল প্রভৃতি নানা প্রকার ক্ষুদ্র উদ্ভিদের দ্বারা শিলার উপরিভাগে পানি আটকে থাকে। এ সকল উদ্ভিদের দেহ পানি ও উত্তাপের সংযোগে পচে যায়। একে হিউমাস বলে। এ হিউমাস বৃষ্টির পানি পেলেই জৈব 'এসিডে পরিণত হয়ে শিলাকে সহজেই ক্ষয় করে দেয়।

২. জীবজন্তুর কাজ: কেঁচো, ছুঁচো, পিঁপড়া, শিয়াল, কুকুর প্রভৃতি সর্বদা মাটি খুঁড়ে শিলারাশিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। এছাড়া উইপোকা, সজারু, ইঁদুর ইত্যাদিও গর্ত করে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তর হতে মাটি তোলে। এছাড়া মৃত্তিকার অণুজীবসমূহ শিলার প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে যথেষ্ট সক্রিয় হয়। এভাবে জীবজন্তু ও কীটপতঙ্গ দ্বারা ভূত্বক চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে।

৩. মানুষের কাজ: নানাবিধ গঠনমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষ ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক ক্ষয়সাধন করছে। যেমন-রাস্তাঘাট, খাল, গৃহ, শহর বন্দর প্রভৃতি নির্মাণ করার জন্য মানুষ সর্বদা ভূত্বক খণ্ড-বিখণ্ড করছে। এভাবে মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জৈবিক বিচুণীভবনে সহায়তা করছে।

নগ্নীভবন (Denudation)

নগ্নীভবন অর্থ উন্মুক্ত করা। ভূঅভ্যন্তরস্থ শক্তি ভূত্বকে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গড়ে তোলে। অপরদিকে, নগ্নীভবন এ সমস্ত ভূমিরূপকে ক্ষয় করে সমুদ্র সমতলে নিয়ে আসার কাজে লিপ্ত থাকে এবং ভূত্বকের ক্ষয় সাধনের মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা কমায়। তাই সাধারণভাবে বলা যায়, যে প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা অন্যত্র অপসারিত হয় তাই নগ্নীভবন। নগ্নীভবন চার ধরনের প্রক্রিয়ায় কাজ করে। যথা: (ক) বিচূর্ণীভবন, (খ) স্তূপ অপসারণ, (গ) ক্ষয়সাধন ও (ঘ) পরিবহন।

ক. বিচূর্ণীভবন: নগ্নীভবনের যে চারটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে তন্মধ্যে বিচূর্ণীভবন শিলার ক্ষয়সাধনে প্রথম পর্যায় হিসেবে কাজ করে। বিচূর্ণীভবনের ফলে ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে শিথিল হয়ে পড়ে। কিন্তু অপসারিত হয় না। এটি একটি স্থির প্রক্রিয়া।

খ. স্তূপ অপসারণ: বিচূর্ণীত শিলা উচ্চ ঢালে অবস্থিত হলে তা অবশ্যই মাধ্যাকর্ষণের টানে নিম্নঢালে নেমে আসবে। শিলার এ নিম্নঢাল অভিমুখী যাত্রাকে স্তূপ অপসারণ বলে। বিচূর্ণীত শিলার কিয়দংশ পানি বা বায়ুর মাধ্যমে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

গ. ক্ষয়সাধন: বিচূর্ণীভবনের সময় ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে প্রস্তরখণ্ড, কঙ্কর, নুড়ি, বালুকা ও কাদা প্রভৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু অপসৃত হয় না। এদের শিলাবরণী বলা হয়। এসব আলগা পদার্থ নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা অপসারিত হলে তাকে ক্ষয়ীভবন বলে। যে সব প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ক্ষয়ীভবন সংঘটিত হয় তাদের মধ্যে বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ এবং সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রধান।

ঘ. পরিবহন: নগ্নীভবনের চারটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হলো পরিবহন। বিচূর্ণীভূত পদার্থসমূহ ক্ষয়সাধিত হয়ে পরিবাহিত হলে নিচের অবিকৃত শিলা দৃষ্টিগোচর বা নগ্ন হয়। বিচূণীভূত শিলা বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা অপসারিত হয়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(Effect of Slow and Sudden Changes on Living World)

ভূপৃষ্ঠ বা ভূত্বক সর্বদা পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনো ধীরে ধীরে, কখনো দ্রুত ও আকস্মিকভাবে। বিভিন্ন প্রকার ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধন করে। এ পরিবর্তন কখনো ভূত্বকের অভ্যন্তরে আবার কখনো ভূত্বকের বাহিরে ঘটছে। যেহেতু জীবজগৎ ভূত্বকে বিচরণশীল সেহেতু এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবজগতের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে এটাই স্বাভাবিক।

ধীর পরিবর্তনসমূহের প্রভাব: সূর্যতাপ, বায়ুপ্রবাহ, নদীপ্রবাহ, হিমবাহ, সমুদ্রস্রোত, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি বাহ্যিক শক্তির প্রভাবে
ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাকে ধীর পরিবর্তন বলে। এই ধীর পরিবর্তন বিশাল এলাকা জুড়ে হয়ে থাকে। ভূত্বকের ধীর পরিবর্তনের ফলে ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকার ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। এসকল ভূমিরূপের উপর মানুষের বসতি, কৃষি, ব্যবসা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, জলবায়ু, জীবিকা প্রভৃতি নির্ভর করে। এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইহা মানুষের, জীবজগতের অকল্যাণ সাধন করে থাকে। যেমন- নদীর অস্বাভাবিক প্রবাহ বন্যা সৃষ্টি করে মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। ধীর পরিবর্তনসমূহ মানুষের বসতির উপরও প্রভাব বিস্তার করে। যেমন- পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৯৫ জন লোক সমভূমিতে বাস করে। অধিকাংশ সমভূমি সমুদ্র উপকূলে, নদী অববাহিকায় এবং বদ্বীপে অবস্থিত। সমভূমিগুলো সমতল এবং উর্বর পলিগঠিত বলে চাষাবাদসহ যাতায়াত, শিল্পকার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি কাজের জন্য সুবিধাজনক এবং এর ফলে মানুষ জীবিকা অর্জনের সুযোগ পায়।

আকস্মিক পরিবর্তনসমূহের প্রভাব: বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তির প্রভাবে ভূগর্ভে সর্বদা নানারূপ পরিবর্তন হচ্ছে।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূকম্পন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে সংকোচন, ভূগর্ভের তাপ ও অন্যান্য শক্তির ফলে ভূপৃষ্ঠে হঠাৎ যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাকে আকস্মিক পরিবর্তন বলে। এরূপ পরিবর্তন খুব বেশি স্থান জুড়ে হয় না। আকস্মিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় প্রধানত ভূমিকম্প, সুনামি ও আগ্নেয়গিরি দ্বারা। ইহা জীবজগতের উপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করে। ভূমিকম্প জীবজগতের ব্যাপক ক্ষতি ও পরিবর্তন সাধন করে। ভূমিকম্প কোনো জনবহুল এলাকায় হলে তা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পানি, গ্যাস সরবরাহ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষতিসাধন করে। আগ্নেয়গিরি থেকে গলিত লাভা, ভস্ম প্রভৃতি প্রবলবেগে ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এর পার্শ্ববর্তী জনপদ, শস্যক্ষেত্র সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইহা নতুন ভূমিরূপ ও খনিজ সম্পদ সৃষ্টি করে যা মানুষের অনেক উপকারে আসে।

আকস্মিক ও ধীর পরিবর্তনের ফলে ভূত্বকের ভূমিরূপের পরিবর্তন হয়। আর ভূত্বকের সাথেই জীবজগতের সম্পর্ক। ভূত্বক মানুষ, অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদের সৃষ্টি, বর্ধন ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতির সহিত সম্পর্কিত। তাই বলা যায়, আকস্মিক ও ধীর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবজগতের উপর প্রভাব বিস্তার করে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(Land Erosion)

ভূমিক্ষয় বলতে সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাকৃতিক নিয়মে ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের ক্ষয়সাধন বোঝায়। বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, জলস্রোত, হিমবাহের গতি প্রভৃতির প্রভাবে ভূমির উপরিভাগের মাটি ক্ষয় হওয়াকে ভূমি বা মৃত্তিকা ক্ষয় বলে। ভূতাত্ত্বিক কারণে অতি ধীরে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়ে উপত্যকা, বদ্বীপ, সমতলভূমি ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত চাষাবাদ, পশুচারণ, বনভূমি ধ্বংস ও অনুপযোগী জমিতে চাষাবাদ এবং ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয়।
ভূমিক্ষয়ের নিয়ামক: কৃষিকাজ, বসতি স্থাপন, শহরায়ণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ ভূমিক্ষয়কে প্রভাবিত করে। এর নিয়ামকগুলো হলো- (ক) মাটির বৈশিষ্ট্য, (খ) উদ্ভিদের আবরণ, (গ) বায়ুপ্রবাহ, (ঘ) বৃষ্টিপাত, (ঙ) পানি এবং (চ) ঢেউয়ের আঘাত (নদী তীরে)।

বাংলাদেশের ভূমিক্ষয়ের কারণ; অতিরিক্ত শস্য উৎপাদন, অনুপযুক্ত জমি কর্ষণ, অতিরিক্ত পশুচারণ বা বনাঞ্চল ধ্বংস ইত্যাদি অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় ঘটে থাকে। অধিক মাত্রায় শস্য ফলানোর জন্য মাটিস্থ হিউমাসের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাটির সংশক্তি প্রবণতা (cohesiveness) ও ভেদ্যতা কমে যায়। ফলে ভূমিক্ষয় ঘটে। বর্ষার ফলে মাটির উপরিতল পানির প্রত্যক্ষ প্রভাবে উন্মুক্ত হওয়ায় মাটির কণার দ্রুত চলাচলের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এ কারণটি বেশি ঘটে থাকে। শুষ্ক অঞ্চলে (উত্তরাঞ্চল) ধুলা-ঝড় এবং বালু-ঝড়ের মাধ্যমেও বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়।

ভূমিক্ষয়ের ফলাফল: ভূমিক্ষয়ের ফলে ইতিবাচক প্রভাব-এর চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে;
i. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষিনির্ভর এদেশের কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ii. ভূমিক্ষয়ের ফলে অনেক স্থানে বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে নদীভাঙন বৃদ্ধি পায়। ফলে কোটি কোটি টাকার ফসল, ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট হয়;
iii. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হয় বলে কৃষিনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন হ্রাস পায়;
iv. ভূমিক্ষয়ের ফলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়; এবং
v. ভূমিক্ষয়ের কারণে চারণভূমি বিনষ্ট ও পশুপালন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভূমিক্ষয় রোধে করণীয়/প্রতিকার: অতিমাত্রায় ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে এদেশে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পেয়ে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করার জন্য বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ (যেমন- শস্যাবর্তন) গ্রহণ করা আবশ্যক। ভূমিক্ষয় প্রতিকারের উপায়গুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(ক) পাড় চাষ বা আড়াআড়ি চাষ: অত্যন্ত খাড়া ঢালে পানির অতি দ্রুত নিম্নগতির জন্য প্রচুর মাটি অপসারিত হওয়ার ফলে খাদ সৃষ্টি হয়। চাষাবাদের মাধ্যমেও মাটিক্ষয় হয়ে থাকে। আড়াআড়ি চাষ (contour tillage) পদ্ধতিতে ঢালের উপর ও তলদেশ ব্যতীত অন্যান্য স্থানে আড়াআড়িভাবে চাষাবাদ, বীজতলা প্রস্তুত ও ফসল সংরক্ষণ করা হয়।
(খ) সোপান চাষ: সাধারণত সোপান চাষাবাদ দ্বারা দুটি পদ্ধতি বোঝানো হয়। যুগ যুগ ধরে চীন, কোরিয়া ও পেরুতে পাহাড় ও পর্বতের ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপবিশিষ্ট সমতল ভূমি প্রস্তুত করে তাতে কোথাও শুষ্ক (কৃত্রিম পানিসেচ ব্যতীত) চাষাবাদ আবার কোথাও প্লাবন (সেচের মাধ্যমে) চাষাবাদ করা হয়। প্লাবন চাষের ক্ষেত্রে একটি ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে নালার মাধ্যমে পানি স্থানান্তরিত করা হয়।
সোপান চাষের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে বড় মাটির বেদী বা বাঁধ তৈরি, যা আধুনিক চাষাবাদে বহুল প্রচলিত। এক্ষেত্রে পানি গড়িয়ে যাওয়ার গতিমাত্রা ও ভূমিক্ষয়ের পরিধি নিয়ন্ত্রণের উপযোগী করে ঢালের প্রতিকূলে বাঁধ তৈরি করা হয়। এতে পরস্পর বাঁধের দূরত্ব এমনভাবে নির্ণয় করা হয় যাতে বাঁধ দুটির মধ্যে মাটি ক্ষয়ের ক্ষমতাবিশিষ্ট পানির উচ্চগতি অর্জিত না হতে পারে (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ মিটার)। বাঁধের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও উচ্চতা ইত্যাদি ভূমির আয়তন, ঢালের (slope) মাত্রা, প্রয়োজনীয় পানি ধারণক্ষমতা, নিষ্কাশন নালা এবং ভূমি কর্ষণের সুবিধা অনযায়ী করা হয়।

(গ) নালা পুনরুদ্ধার: বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমিতে সৃষ্ট খাদ বা নালা পুনরুদ্ধার করা যায়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পানি স্রোত হ্রাস করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম করণীয়। প্রাথমিকভাবে খাদ বরাবর ছোট ছোট বাঁধ তৈরি করে পানির স্রোত প্রতিহত করা হয় (ঢালের মাত্রা অনুযায়ী ৬-৮ মিটার ঘন বাঁধ)। খড়কুটা, কাঠের খন্ড, ঘাসের চাপড়া (soda), তারের জাল বা মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা যায়। ক্রমশ, তলানি জমে খাদ ভরে ওঠে। এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে খাদের উপরদিক থেকে পানি স্রোতকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করে মাটি আটকে রাখা হয়।

(ঘ) খন্ড চাষ বা ফালা চাষ: পানি ও বায়ুস্রোতজনিত ক্ষয়রোধ এবং শস্যাবর্তন পদ্ধতির সুবিধার্থে খণ্ডচাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ভূমির ঢাল বেশি হলে যৌথভাবে খন্ড চাষ ও পাড় চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে অথবা ভূমি পরিত্যক্ত রেখেও শস্যাবর্তন পদ্ধতিতে পাড় চাষ করা যায়।খণ্ড চাষ পদ্ধতিতে একটানা বিস্তৃত কোনো ভূমিতে বায়ুস্রোত উন্মুক্ত থাকে না এবং বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ বায়ু প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করায় ভূমিক্ষয় হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে প্রবল বেগে বায়ুপ্রবাহের ঋতুতে বায়ুস্রোতের প্রতিকূলে আড়াআড়ি বা খণ্ডচাষ করা হয়। মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিলতে চাষের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অভ্যন্তরীণ নদী, তীরবর্তী বিস্তীর্ণ ভূমি বাঁধের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করে অধিক উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে।

ভূমিক্ষয় রোধের অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, নিয়ন্ত্রিত পশুপালন, ঘাস জন্মানো, আবরণ, শস্য রোপণ, নদী তীর ও বদ্বীপের তীরে জলজ, উদ্ভিদ জন্মানো ইত্যাদি। সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ভূমিক্ষয় রোধের জন্য বিশেষ উপযোগী।

ভূমিধস (Land slide)
অপেক্ষাকৃত শুষ্ক মাটি বা শিলার ভগ্নস্তূপ মাধ্যাকর্ষণ, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো কারণে বৃহৎ পরিসরে ধসে পড়তে পারে। একে ভূমিধস বলে। সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিধসকে আশংকাজনকরূপে বিবেচনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট ইত্যাদি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলসমূহে দিন দিন ভূমিধসের কারণে প্রাণহানি বাড়ছে।
বাংলাদেশে ভূমিধসের কারণ: বাংলাদেশে ভূমিধসের প্রাকৃতিক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত,
পার্বত্য নদীগুলোর পার্শ্বক্ষয় শিলার গঠন এবং ভগ্নস্তূপের ঢাল বিচলন। কিন্তু এদেশে ভূমিধস মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেমন- পাহাড় কাটা, কৃত্রিমভাবে পাহাড়ে স্তূপ সৃষ্টি, বৃক্ষনিধন, ভবনাদি ও অন্যান্য কাঠামো তৈরি, পয়ঃপ্রণালি, জলাধার নির্মাণ এবং জুমচাষ ভূমিধসের আশংকা বাড়াচ্ছে।
ভূমিধসের ফলাফল: ভূমিধস বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করে। বিশেষ করে এসব স্থাপনা যদি পর্বতের ঢালে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে প্রায়ই ভূমিধস ঘটছে। প্রায় প্রতিবছরই ভূমিধসের কারণে পার্বত্য জেলাগুলোর সাথে দেশের অন্যান্য অংশের সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

ভূমিধসের ফলস্বরূপ বহু প্রাণ ও সম্পদ বিলীন হয়। বাংলাদেশেও প্রায় প্রতিবছরেই ভূমিধসের কারণে বহুলোক ঘরবাড়িশূন্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে। খাড়া ঢালে যখন কোনো স্থাপনা বা সম্পদের অবস্থান থাকে ভূমিধসে তা ধ্বংস হয়। বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় ঢালে (slope) বাড়িঘর দেখা যায়। আবার জুম চাষ পাহাড়ি ঢালেই হয়ে থাকে। ফলে দেখা যায় ভূমিধস ঘটলে বহু জানমালের ক্ষতিসাধন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে এ জাতীয় ঘটনা ইদানিং অহরহ ঘটে। যেমন- ১১ আগস্ট, ১৯৯০ এ বান্দরবান জেলায় দুটি বড় ভূমিধসে ১৭ জন ব্যক্তি নিহত হয়। ২৪ জুন, ২০০০ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে অন্তত ১৩ জন ব্যক্তি নিহত ও ১০ জন আহত হয়। ১১ জুন, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে ৫৯ জন শিশুসহ ১২৮ জনের মৃত্যু ঘটে, ১৫০ জনের বেশি আহত হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সর্বশেষ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ২০১৭ সালে ১২ই জুন রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে ভূমিধস ঘটে যাতে ১৫২ জন লোক মারা যায়।
ভূমিধস রোধে করণীয় : বাংলাদেশে ভূমিধস যতটা না প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি হয় মানবসৃষ্ট কারণে। তাই ভূমিধস রোধে মানুষকে তার অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড থেকে সচেতন হতে হবে। এ লক্ষ্যে করণীয়-
i. ভবনাদি ও ভৌত কাঠামো নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ; ii. বৃষ্টির পানির কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; iii. পাহাড়ি ঢালের বক্ষনিধন বন্ধ করা; এবং iv. ভূমি ব্যবহারে মৃত্তিকা ক্ষয়রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(River)

ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধনকারী প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের মধ্যে নদীর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। নদী কোনো উঁচু স্থান থেকে উৎপত্তি লাভ করে একটি সুনির্দিষ্ট খাতে নিম্নঢাল অভিমুখে পানি প্রবাহিত করে। সাধারণত উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে নিম্নঢালে প্রবাহিত হয়ে হ্রদ বা সমুদ্রে পতিত হলে তাকে নদী বলে। যেমন- গঙ্গা নদী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপত্তি লাভ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এছাড়া মালভূমি বা পার্বত্য ভূমিরূপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝরণাধারা (যেমন- বৃষ্টির পানি থেকে সৃষ্ট) মিলিত হয়ে নিম্ন ঢালে নদীরূপে প্রবাহিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের কর্ণফুলী, সাঙ্গু, নাফ, হালদা প্রভৃতি।

নদী উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ক্ষয়সাধন, পরিবহন ও সঞ্চয় কাজ করে থাকে। নদীর ক্ষয়কাজের দ্বারা গিরিখাত, বর্তুলাকার গর্ত, সর্পিল বাঁক ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। আবার সঞ্চয় কাজের ফলে প্লাবন সমভূমি, বদ্বীপ, বাঁকবিশিষ্ট নদী, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মত ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক গতিতে পার্বত্য ভূমিরূপের খাড়া ঢালের জন্য নদীতে খরস্রোত থাকে। ফলে এ গতিতে নদীর ক্ষয়সাধনের ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে।

নদীর পর্যায় (Stages of river)

উৎস হতে মোহনায় পতিত হওয়া পর্যন্ত নদীর গতিপথকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। যেমনঃ (১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি, (২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি এবং (৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি।

(১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি (Mountain Phase): ঊর্ধ্বগতি হলো নদীর প্রাথমিক অবস্থা। পর্বতের যে স্থান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়েছে সেখান থেকে সমভূমিতে পৌছানো পর্যন্ত অংশকে নদীর ঊর্ধ্বগতি বলে। ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদী ভূমি ক্ষয় করে এবং ক্ষয়িত পদার্থ পরিবহন করে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিভাগ ঢালু ও উঁচুনিচু থাকে বলে নদীর গতিবেগ ঘণ্টায় ২৪-৩২ কি.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রবল স্রোতের আঘাতে ভূত্বক হতে শিলা ভেঙে পড়ে এবং তা নিম্নদিকে গড়িয়ে অগ্রসর হয়। পার্বত্য অবস্থায় নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয়ই বেশি হয়ে থাকে। ফলে গিরিখাত, ক্যানিয়ন, খরস্রোত, জলপ্রপাত প্রভৃতির সৃষ্টি হয়।

পার্বত্য অবস্থায় নদীর প্রধান কাজ ক্ষয়সাধন হলেও অনেক সময় নদীর ঢাল কমে নদীর গতি হ্রাস পেলে অথবা হঠাৎ অধিক পরিমাণ প্রস্তরখণ্ড আসলে নদী তা সম্পূর্ণরূপে বহন করতে না পেরে সামান্য কিছু সঞ্চয় করে। এ প্রকারে নদীবাহিত বিভিন্ন পদার্থগুলো অল্প ঢালযুক্ত অঞ্চলে সঞ্চিত হয়। নদী হঠাৎ উচ্চভূমি হতে নিম্নভূমিতে পতিত হলে সেখানে পলি জমা হয়ে পলল পাখা বা পলল কোণ গঠিত হয়। কখনও কখনও পাহাড়ের পাদদেশে প্রস্তরখণ্ড, নুড়ি, বালি প্রভৃতি জমা হয়ে একটি বিস্তীর্ণ সমভূমির সৃষ্টি করে। ভারতের শিবালিক পর্বতের পাদদেশে এরূপ সমভূমি গঠিত হতে দেখা যায়।

(২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি (Plain or Middle Phase): পার্বত্য অঞ্চল পার হয়ে নদী যখন সমভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এর প্রবাহকে সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি বলে। মধ্যগতিতে নদীর বিস্তার ঊর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি হয় কিন্তু গভীরতা উর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক কমে যায়। নদী উপত্যকার গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে বর্ষাকালে নদী স্ফীত হয়ে মধ্যগতিতে নদীর দুই দিকের নিম্নভূমিসমূহকে বন্যায় প্লাবিত করে এবং পলি দ্বারা ভরাট হয়ে সমভূমির আকার ধারণ করে। একে প্লাবন সমভূমি বলে। এ প্রবাহে নদী ক্রমশ ধীরগতি সম্পন্ন হয় এবং বাধা এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে থাকে। সমভূমি অবস্থায় নদীর ক্ষয় ও পরিবহন কার্য তত প্রবল নয়। এ অবস্থায় নদীর সঞ্চয়কার্য শুরু হয়।

(৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি (Delta or Lower Phase): নদীর জীবনচক্রের শেষ পর্যায় হলো নিম্নগতি। এ অবস্থায় স্রোত একেবারে কমে যায়। নদীর নিম্নক্ষয় বন্ধ হলেও পার্শ্বক্ষয় হয় যথেষ্ট পরিমাণে। ফলে নদী উপত্যকা খুব চওড়া ও অগভীর হয়। নিম্নগতিতে স্রোতের বেগ কমে যাওয়ায় পানিবাহিত বালুকণা, কাদা নদীগর্ভে ও মোহনায় সঞ্চিত হয়ে নদীর গতিপথে বাধার সৃষ্টি করে। নদীর গতি বাধা পেয়ে তা দুই দিক দিয়ে চলে যায়। কালক্রমে নদীমুখে পলি সঞ্চিত হয়। ফলে নদীতলে ভূভাগ উঁচু হয়ে মাত্রাহীন গ্রিক ডেল্টা 'A' কিংবা বাংলা 'ব' এর আকার ধারণ করে ত্রিকোণাকার দ্বীপের সৃষ্টি করে। একে বদ্বীপ (delta) বলে। বদ্বীপ গঠন ব্যতীত এ অংশে নদীর খাত পরিবর্তন, নদীর অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, প্লাবন সমভূমি প্রভৃতি বিভিন্ন ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(Erosional Landforms of River)

নদীর গতিবেগের দ্বারা যে ক্ষয় সাধন হয় এবং এর ফলে যে ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তাকে নদীর ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে।
নদীর এ ক্ষয়কাজ প্রধানত প্রাথমিক গতিতে অধিক, মধ্যগতিতে মধ্যম এবং নিম্নগতিতে নেই বললেই চলে।
নিচে নদীর প্রতিটি গতিতে যে ক্ষয়জাত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তার বিবরণ দেওয়া হলো-

ক. প্রাথমিক গতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ:

১. 'V' আকৃতির উপত্যকা: প্রাথমিক গতিতে নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় অধিক হয়। এজন্য নদীখাত অধিক গভীর হয়ে ইংরেজি 'V' অক্ষরের রূপ ধারণ করে। এজন্য নদীর এরূপ উপত্যকাকে 'V' আকৃতির উপত্যকা বলে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীর উপত্যকা।

২. স্পার: উৎস থেকে নিম্নঢালে যাওয়ার সময় নদী এক পাড় (তীর) থেকে অন্য পাড়ে আঘাত করে অগ্রসর হয়। অবশ্য এ অবস্থায় তলদেশেরও ক্ষয় চলতে থাকে। নদীর এ ধরনের গতিধারার ফলে পর্বতগাত্রসমূহ ক্ষয় হয়ে এমনভাবে অবস্থান করে যেন দুটি করাতের দাঁতসমূহ মুখোমুখি পরস্পরের সাথে লেগে আছে। পাহাড়ের পার্শ্বদেশগুলো এভাবে পরস্পরের দিকে ঝুঁকে থাকা ভূমিরূপকে স্পার বলে। যেমন: হিমালয় পর্বতের জেনেভা স্পার (Geneva spur)।

৩. গিরিখাত: নদীর প্রবল স্রোতধারা খাড়া পর্বতগাত্র বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হলে নদীখাত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ক্ষয়িত পদার্থ স্রোতের সাথে বহুদূর চলে যায়। এমতাবস্থায় বড় বড় পাথরসমূহ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পতিত হলে গভীর ও সংকীর্ণ নদীখাতের সৃষ্টি হয়। এরূপে সৃষ্ট খাতকে গিরিখাত বলে। সিন্ধু নদে অনেক গিরিখাত আছে।

৪. ক্যানিয়ন: গিরিখাতগুলো অধিক গভীর ও খাড়া ঢালবিশিষ্ট হলে এদেরকে ক্যানিয়ন বলে। উত্তর আমেরিকার কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবী বিখ্যাত।

৫. জলপ্রপাত: পার্বত্য অবস্থায় নদীস্রোত কোনো কঠিন শিলাস্তর থেকে কোমল শিলাস্তরে উপনীত হলে কোমল স্তরটি অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে কঠিন শিলাস্তরটি কোমল শিলাস্তর অপেক্ষা অধিক উচ্চে অবস্থান করে এবং জলধারা খাড়াভাবে নিচের দিকে পতিত হয়। জলের এরূপ পতনকে জলপ্রপাত বলে। বাংলাদেশের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এর উদাহরণ।

৬. খরস্রোত: পাহাড়ের ঢালু জায়গায় মাটি পর্যায়ক্রমে কঠিন ও কোমল থাকতে পারে। এমতাবস্থায় নদীস্রোত কোমল শিলাকে আস্তে আস্তে ক্ষয় করে কিন্তু কঠিন শিলা পূর্বাবস্থায় থেকে যায়। এতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়। এসব জলপ্রপাত সারিবদ্ধভাবে উপর থেকে নিচের দিকে অবস্থান করে বলে এখানে নদীর স্রোত লাফাতে লাফাতে নিচের দিকে পড়ে। এরূপ প্রবাহমান সারিবদ্ধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাতকে খরস্রোত বলে। যেমন: জর্জিয়ার ইনগুড়ি (Inguri) নদীতে এরূপ খরস্রোত দেখা যায়।

৭. কাসকেড : নদীপ্রবাহ সুষম ঢালপথে নিচের দিকে প্রবাহিত হলে তাকে কাসকেড বলে। মিশরের নীলনদে এ ধরনের কাসকেড রয়েছে।

৮. সুড়ঙ্গপথ বা প্রাকৃতিক সেতু: অনেক সময় নদীপথ নিচের চুন জাতীয় মৃত্তিকা ক্ষয় করলে উপরের কঠিন শিলা পূর্বাবস্থায়ই থেকে যায়। এতে কঠিন শিলাটি সেতুর ন্যায় অবস্থান করে, যা প্রাকৃতিক সেতু নামে পরিচিত। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ (Utah) রাজ্যের কলোরাডো নদীর প্রাকৃতিক সেতু।

৯. বর্তুলাকার গর্ত: বর্ষাকালে নদীর গতিবেগ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে নদীর পানি অনেক সময় ক্ষুদ্র পরিসরে গোলাকার ঘূর্ণিপ্রবাহ সৃষ্টি করে। এ ঘূর্ণন অনেক সময় নদীগর্ভে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করে যা বর্তুলাকার গর্ত নামে আখ্যায়িত। বাংলাদেশে প্রবল বর্ষার সময় পানি প্রবাহ বেশি থাকায় পদ্মা ও মেঘনার মিলিত স্থানে এ ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়।

খ. মধ্যগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ:
১. সর্পিল বাঁক: মধ্যগতিতে নদী অববাহিকায় শিলা নরম থাকায় পানির স্রোতের আঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এমতাবস্থায় নদী এঁকেবেঁকে অগ্রসর হয়। নদীর গতিপথে এ ধরনের ভূমিরূপকে সর্পিল বাঁক বলা হয়। বাংলাদেশে বহু সর্পিল বাঁক বিশিষ্ট নদী রয়েছে। যেমন: সুরমা নদী।

২. নদীছেদন: নদী আঁকাবাঁকা অবস্থায় চলতে থাকলে এবং বাঁকের বৃদ্ধি ঘটলে নদী আঁকাবাঁকা পথ ছেড়ে কোনো এক সময় হঠাৎ সোজা পথ বেছে নেয়। এ সোজা পথকেই নদীছেদন বলে। যেমন: পদ্মার শাখা মধুমতি নদী।

৩. নদীমঞ্চ: মধ্যগতিতে নদীর পানি অসমানভাবে হ্রাস বৃদ্ধির ফলে নদী অসমানভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সিঁড়ির ন্যায় ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি করে। এরূপ ভূপ্রকৃতিকে নদীমঞ্চ বলে। যেমন: মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকা।

গ. নিম্নগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ: নদীর নিম্নগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ হয় না বললেই চলে। তবে বদ্বীপ অঞ্চলের চরসমূহ বন্যা, জোয়ার, নদীর গতি পরিবর্তন বা অন্য কোনো নৈসর্গিক কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করতে পারে।
নদীর ক্ষয়কার্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। বস্তুত ভূত্বকের পরিবর্তনকারী শক্তিসমূহের মধ্যে নদীর দ্বারাই ভূত্বকের সর্বাধিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(Depositional Landforms of River)

মধ্য এবং নিম্নগতিতে নদীবাহিত পাথরখণ্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি, পলি প্রভৃতি নদীখাতে সঞ্চিত হতে থাকে। নদীর উচ্চ প্রবাহে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ভারি পদার্থ যেমন- পাথর এবং নিম্নপ্রবাহে অর্থাৎ মোহনার নিকটবর্তী স্থানে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পদার্থ যেমন- বালি, নুড়ি ধীরে ধীরে সঞ্চিত হতে থাকে। একে নদীর অবক্ষেপণ কাজ বলে। নদীর অবক্ষেপণ কাজের ফলে নদী অববাহিকা ভরাট হয় এবং নদীর মধ্যে চর ও মোহনার কাছে বদ্বীপ গঠিত হয়। নদী দ্বারা সৃষ্ট সঞ্চয়জাত ভূমিরূপকে নিম্নলিখিত তিন ভাগে ভাগ করা যায়; যথা-

ক. প্রাথমিক গতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ :

১.পললপাখা: পার্বত্য অঞ্চলে নদী খাড়া ঢাল বেয়ে সমভূমিতে পতিত হলে নদীর স্রোতবেগ অনেক কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর, নুড়ি, প্রভৃতি পাহাড়ের পাদদেশে সঞ্চিত হয়ে হাতপাখার ন্যায় যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পললপাখা বলে। চীনের জিনজিয়াং-এ কুনলুন পর্বতের পাদদেশে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

২. পললকোণ: পলিজকোণ স্বল্প দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা পাদদেশের মৃত্তিকার কাঠিন্যের ওপর নির্ভর করে। নদীববাহিত অপেক্ষাকৃত বৃহৎ শিলাখণ্ড (coarse material) দ্বারা পললকোণ সৃষ্টি হয়। যেমন- নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে দেখা যায়।

৩. পাদদেশীয় পলল সমভূমি: পার্বত্য গতি নদীর পললকোণের বিস্তার বাড়তে বাড়তে পাদদেশের অব্যবহৃত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পাদদেশীয় পলল সমভূমি বলে। বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে পাদদেশীয় সমভূমি দেখা যায়।

খ. মধ্যগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:

১. প্লাবন সমভূমি: বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে নদী দুকূল উপচে বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যা শেষে বন্যাকবলিত এলাকায় পলির স্তর লক্ষ করা যায়। এভাবে বহুকাল অতীত হলে বন্যাকবলিত এলাকায় এক সমভূমির সৃষ্টি হয়। একে প্লাবন সমভূমি বলে। যেমন- যমুনার প্লাবন সমভূমি।

২. প্রাকৃতিক বাঁধ : বন্যার সময় নদীর উভয়কূল প্লাবিত হলে নদীবাহিত ভারি পদার্থসমূহ নদীর তীরে সঞ্চিত হয়। এতে নদী তীরে উঁচু বাঁধের ন্যায় ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ ভূমিরূপকে প্রাকৃতিক বাঁধ বলে। যেমন-মহানন্দা নদীর তীরে দেখা যায়।

৩. পশ্চাৎ ঢাল: প্রাকৃতিক বাঁধের পরে এক ধীর ও শান্ত ঢাল লক্ষ করা যায়। এ ঢালকে পশ্চাৎ ঢাল বলে। যেমন-মৌলভীবাজারের মনু নদীর ঢাল।

৪. পশ্চাৎ জলাভূমি: প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে নদীর পলি সঞ্চয় ক্রমশ কম হওয়ায় তা নিম্নভূমিরূপে অবস্থান করে। বর্ষার পরে বন্যার পানি সরে গেলে এ নিম্নভূমিতে জল আবদ্ধ অবস্থায় থেকে যায়। প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে অবস্থিত এরূপ জলাবদ্ধ ভূমিকে পশ্চাৎ জলাভূমি বলে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর স্বাভাবিক বাঁধের পশ্চাৎ জলাভূমি রয়েছে। যেমন-ঢাকা জেলার ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম প্রান্তের প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাৎ দিকে এক 'বৃহৎ পশ্চাৎ জলাভূমি দেখতে পাওয়া যায়।

৫. বাঁকের চর: আঁকাবাঁকা নদীর যে তীরে স্রোত আঘাত হানে ঠিক তার বিপরীত দিকে পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে এক চরভূমির সৃষ্টি করে। একে বাঁকের চর বলে। মহানন্দা নদীতে এরূপ চর রয়েছে।
বালুচর: নদীর তলদেশে বালি, নুড়ি, কাদা ইত্যাদি জমা হয়ে যে নতুন চর সৃষ্টি হয় তাকে বালুচর বলে। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই বালুচর রয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর কামরঙ্গীর চর, পদ্মা নদীর চিলমারী চর ও চর ভদ্রাসন, যমুনার চর কাজলা, মেঘনার চর দীঘলন্দ্র, চর আড়ালিয়া প্রভৃতি বৃহৎ চরের উদাহরণ।

৬. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ: আঁকাবাঁকা নদীর মধ্যবর্তী সংকীর্ণ স্থানে কোনো এক প্লাবনের সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ঐ নদী তার পুরাতন বাঁকা পথটি পরিত্যাগ করে নতুন এক সোজাপথে প্রবাহিত হয়। ফলে পুরাতন খাতটি একটি হ্রদে পরিণত হয়। এরূপ হ্রদের আকৃতি অনেকটা অশ্বের ক্ষুরের ন্যায় বলে একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। মিসিসিপি নদীতে এরূপ হ্রদ রয়েছে।

৭. কর্দম ছিপি: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মুখে প্রতিবছর পলি জমে জমে কোনো সময়ে হ্রদের উভয় মুখই বন্ধ হয়ে যায়। এ বন্ধ মুখকেই কর্দম ছিপি বলে। যেমন- মিসিসিপি নদীতে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

৮. নদীমঞ্চ : শুষ্ক থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত নদীর পানির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। ফলে নদীর পলিসমূহও ধাপে ধাপে সঞ্চিত হয়। একেই নদীধাপ বা নদীমঞ্চ বলে। যেমন- বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি নদী।

গ. নিম্নগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:

বদ্বীপ : নিম্নগতিতে নদীর স্রোতবেগ খুবই কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি তলানিরূপে নদীতে সঞ্চিত হতে থাকে। এ তলানি প্রথমে নদীর মোহনায় বিভিন্ন চরের সৃষ্টি করে। পরে চরসমূহের মধ্য দিয়ে নদীর স্রোতধারা বিচ্ছিন্ন হলে ত্রিকোণাকার এক নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ নতুন ভূমিরূপ মাত্রাহীন বাংলা 'Δ' অক্ষরের ন্যায় বলে একে বদ্বীপ বলে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(River Bank Erosion)

সংজ্ঞা: পানি প্রবাহের কারণে নদীখাতে সৃষ্ট পার্শ্বক্ষয়কে নদীভাঙণ বলে। নদীভাঙনের কারণ: নদী ভাঙন বহুবিধ কারণে সংঘটিত হতে পারে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে বন্যা, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, নদী ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, অববাহিকাতে অতিরিক্ত বৃক্ষ কর্তন, নদীখাত থেকে অপরিকল্পিত বালু ও পাথর উত্তোলন প্রভৃতি ভাঙন ত্বরান্বিত করে। নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বাংলাদেশের নদী ভাঙনের প্রভাবক হিসাবে চিহ্নিত করা যায়-

১. নদীখাত অতিরিক্ত নিম্ন কিংবা পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া-এক্ষেত্রে অতিশয় খাড়া পাড় মাধ্যাকর্ষণজনিত টানে ভেঙে পড়ে। পরিপূর্ণ খাতের ক্ষেত্রে স্রোতের তোড়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়।

২. প্লাবনের সময়ে নদী পাড়ের মৃত্তিকাতে দ্রুত পানি প্রবাহিত হয়ে তা আলগা হয়ে যায় এবং স্রোতের সাথে বহুদূর প্রবাহিত হয়।

৩. পাহাড়ি ঢলে নদীতীরের মৃত্তিকা সম্পৃক্ত ও আলগা হয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়।

৪. নদীখাতের মধ্যে স্রোতের দিক ও বেগ পরিবর্তনের ফলে সম্মুখভাগে ভগ্নতট এবং অপর পাড়ে ঢালু ভূমির সৃষ্টি হয়।

৫. নদীর তরঙ্গের আঘাতও ভাঙনের অন্যতম কারণ।

৬. অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে অববাহিকার পানি দ্রুত নদীখাতের দিকে ধাবিত হবার সময় তীর ভাঙনের সূচনা হয়।

৭. নদী উপত্যকা থেকে অপরিকল্পিত এবং অতিমাত্রায় বালু ও পাথর উত্তোলন ভাঙনের একটি কারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন- সুরমা।

নদীভাঙন প্রতিকার (Remedies of River Bank Erosion)

১. নদীর দু'তীরে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ সাধারণভাবে ভাঙন প্রতিরোধের একটি প্রধান উপায়।
২. বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে পানি অপসারণ করে (যেমন- খাল কেটে) স্রোতপ্রবাহ স্বাভাবিক খাত বরাবর রাখতে পারলে ভাঙন নিয়ন্ত্রিত হয়।
৩. বেড়িবাঁধের উপর গাছপালা লাগালেও মৃত্তিকার বাঁধন শক্ত থাকে।
৪. বাঁকের মুখে তলদেশ থেকে তীরভূমি পর্যন্ত পাথর বা সিমেন্টের বার ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নদীভাঙন নদীমাতৃক দেশের স্বাভাবিক চিত্র। এটি নদীশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধ সম্ভবপর নয়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(River System of Bangladesh)

বাংলাদেশের নদীগুলো সারাদেশে জালের মতো বিস্তৃত। নদীর চলার পথে কখনও কখনও ছোট ছোট অন্যান্য নদী বা জলধারা এসে মিলিত হয়ে প্রবাহদান করে-এগুলো উপনদী নামে পরিচিত। যেমন- পদ্মার উপনদী মহানন্দা। আবার কোনো নদী থেকে স্রোতধারা ভিন্ন পথে প্রবাহিত হলে তাকে শাখা নদী বলে। যেমন- মধুমতী পদ্মার শাখা নদী। একটি নদী; এর শাখা এবং উপনদী একত্রে একটি নদীপ্রণালি বা নদীব্যবস্থা (river system) গঠন করে।

বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি নদী, শাখা নদী ও উপনদীর সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কি.মি.। নদীব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের নদীমালাকে চারটি প্রধান নদীব্যবস্থা বা নদী প্রণালিতে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন-(১) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা, (২) গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা, (৩) সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা এবং (৪) চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদ-নদীসমূহ।

১. ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা: এ নদীব্যবস্থা প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বাংলাদেশের উত্তরাংশ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের বাইরে এই নদী ব্যবস্থা প্রায় ৫,৮৩,০০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি নিষ্কাশন অঞ্চলসহ ২,৮৫০ কিলোমিটার সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদী তিব্বতের মানস সরোবর থেকে সাংপো নামে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে। প্রবাহপথে পাঁচটি প্রধান উপনদী থেকে ব্রহ্মপুত্র পানি সংগ্রহ করেছে যার মধ্যে আসামের ডিবং (dibang) এবং লোহিত (lohit); বাংলাদেশের তিস্তা প্রখ্যাত। এ ধারা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মাজাহরালীতে দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে নদীর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা। অধিকতর ক্ষেত্রে যমুনা নামেই পরিচিত। এ ধারা দক্ষিণে ২৭৭ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে আরিচার কাছে আলেকদিয়ায় পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ মিলিত ধারা পদ্মা নামে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রায় ২১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।

করতোয়া যমুনার দীর্ঘতম উপনদী। এর মূলধারা ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর জলাভূমিতে উৎপন্ন হয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিটগড়ের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর দিনাজপুর জেলার খানসামার নিকট থেকে এটি আত্রাই নামে পরিচিত। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে সমাধি ঘাট পর্যন্ত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এ ধারা পুনরায় রাজশাহী জেলার দেওয়ানপুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বরেন্দ্রভূমির মধ্য অংশকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। সবশেষে দক্ষিণ-পূর্বে মোড় নিয়ে পাবনার বাঘাবাড়ির কাছে যমুনায় পতিত হয়েছে। আত্রাই নদীর নিম্নাংশ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবহমান। করতোয়ার অন্য একটি অংশ জলপাইগুড়ি জেলায় উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে। করতোয়ার এ অংশ পাবনা-করতোয়া নামে পরিচিত।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বামতীরে ধলেশ্বরী নদীর পূর্ব পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য শাখা নদী নেই। তবে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র বাহাদুরাবাদের নিকট থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালে আসামে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী বন্যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের বর্তমান যমুনা নদী বরাবর স্থানান্তরের পূর্বে এটিই ছিল ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারা। এ নদীর শাখানদীগুলো হচ্ছে বংশী, বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়া। বংশী নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মিলিত স্রোতধারা ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে। বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়ার মিলিত প্রবাহ শীতলক্ষ্যা নামে প্রবাহিত হয়ে মুন্সিগঞ্জের নিকট ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিলেছে। ধলেশ্বরী যমুনা নদীর দক্ষিণ তীরের বড় শাখানদী। এটি দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে। শীতলক্ষ্যা আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গজারিয়ার নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।

২. গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা: এটি বৃহত্তর গঙ্গা নদী প্রণালির একটি অংশ। হিমালয় পর্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে সৃষ্ট ভাগীরথী এবং মধ্য হিমালয়ের নন্দাদেবী শৃঙ্গের উত্তরে অবস্থিত গুরওয়াল থেকে সৃষ্ট অলোকনন্দা নদীর মিলিত ধারা গঙ্গা নাম ধারণ করে ভারতের হরিদ্বারের কাছে সমভূমিতে পৌঁছেছে। এ ধারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাজমহল পাহাড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। এরপর রাজশাহী জেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় ১১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলার উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদেশে নদীটির নাম পদ্মা। আরিচার কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। চাঁদপুরের কাছে নদীটি মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। পদ্মার মোট দৈর্ঘ্য ৩২৪ কি.মি.।

উত্তর দিক থেকে আগত পদ্মার প্রধান উপনদী মহানন্দা। পশ্চিমবঙ্গের সর্ব উত্তরের দার্জিলিং-এর নিকটবর্তী পাহাড় শ্রেণি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার উপর দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়। এই নদী পঞ্চগড়ের তেতুঁলিয়া সীমান্ত এলাকা হয়ে ভারতের পূর্ণিয়া ও মালদহ জেলা অতিক্রম করে নবাবগঞ্জের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে গোদাবাড়ীর কাছে পদ্মায় পতিত হয়েছে। নাগর, টাঙ্গন ও পুনর্ভবা মহানন্দার উপনদী।
বড়াল পদ্মার বামতীরের শাখানদী। এ নদী চারঘাটের কাছে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে আটঘড়িয়ার কাছে দুভাগে ভাগ হয়ে মূল স্রোত নন্দনকুজা নামে প্রবাহমান। পদ্মার আরেকটি শাখানদী ইছামতি। এটি পাবনা শহরের দক্ষিণে গঙ্গা থেকে বের হয়ে পাবনা শহরকে দুভাগ করে উত্তর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বেড়া থানার পাশ দিয়ে হুরাসাগরে পড়েছে। বর্তমানে এ নদীর উজানে পাবনা শহরের কাছে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সচল ধারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন নিষ্কাশন খাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৩. সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা: বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী হলো মেঘনা। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত সম্পন্ন অঞ্চলের একটি ধারা (drains) মেঘনা নদীর মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয় (মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত প্রায় ১,০০০ সে.মি.)। নদীটির উৎপত্তি ভারতের শিলং ও মেঘালয় পাহাড়ে। এর প্রধান উৎস বরাক নদী। বরাক-মেঘনার মিলিত দৈর্ঘ্য ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে ৩৪০ কিলোমিটার অবস্থিত। সিলেট জেলার অমলশিদে বাংলাদেশ সীমান্তে বরাক নদী দুই ভাগে ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী গঠন করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মধ্যবর্তী এলাকাটি হাওর এলাকা যা বর্ষা মৌসুমে গভীরভাবে প্লাবিত থাকে। সুরমা ও কুশিয়ারা মারকুলির কাছে পুনরায় মিলিত হয় এবং মেঘনা নামে ভৈরব হয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন গোমতী ও খোয়াই নদী মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেঘালয় ও আসাম থেকে উৎপন্ন আরও কতগুলো পাহাড়ি স্রোতধারা মেঘনার সাথে মিশেছে। ভৈরব বাজার পর্যন্ত সুরমা-মেঘনা নদী প্রণালির নিষ্কাশন এলাকার মোট আয়তন প্রায় ৮০২,০০০ বর্গ কি.মি. যার মধ্যে ৩৬,২০০ বর্গ কি.মি. বাংলাদেশে অবস্থিত।

৪. চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীব্যবস্থা: দেশের অন্যান্য নদী প্রণালি থেকে এই নদী প্রণালি বিচ্ছিন্ন। এই অঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এর উৎপত্তিস্থল মিজোরামের (ভারত) লুসাই পাহাড়ে। এটি রাঙামাটি এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। কাপ্তাই নামক স্থানে এই নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এ অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো- ফেনী, মুহুরী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাকখালি এবং নাফ।

এই চারটি বৃহৎ নদী প্রণালির মাধ্যমে প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো তাদের সর্বোচ্চ পরিমাণে প্রবাহিত হয় এবং মোট প্রবাহমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ১৪০,০০০ কিউসেক এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ ৭,০০০ কিউসেক হ্রাস পায়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By

(River Made Landforms in Bangladesh)

বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদী দ্বারা যেসব ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১। ক্ষয়জাত ভূমিরূপ: বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যেও নিম্নগতি দেখা যায়। এ পর্যায়ে ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ কম হয়ে থাকে। তথাপি এখানে কিছু ক্ষয়জাত ভূমিরূপ দেখা যায়। যেমন-
ক) নদীসোপান : বাংলাদেশের অনেক নদীতে নদীসোপান ভূমিরূপ দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। যেমন- ধলেশ্বরী, বানার, বংশী প্রভৃতি নদীতে এ ভূমিরূপ দেখা যায়।
খ) জলপ্রপাত: বাংলাদেশের বান্দরবান শহরের নিকটে শৈলপ্রপাত নামক স্থানে এবং মৌলভীবাজার জেলার মাধবকুন্ড এলাকায় জলপ্রপাত লক্ষ করা যায়।
গ) নদীছেদন: নদী যখন বাঁক সৃষ্টি করে প্রবাহিত হয় তখন নদী চলার পথে নরম শিলা কেটে প্রবাহিত হয়। ফলে অনেক সময় নদী বাঁকা পথ পরিহার করে সোজা পথে প্রবাহিত হয়। নদীর এ অবস্থাকে নদীছেদন বলে। বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা প্রভৃতি নদীতে এ ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়।

২। সঞ্চয়জাতের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ: বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো ব্যাপকভাবে সঞ্চয়কার্যের ফলে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। যেমন-
ক) পাদদেশীয় পলল সমভূমি: বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর জেলার নদীসমূহ দ্বারা এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়।
খ) প্লাবন সমভূমি: বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী দ্বারা সঞ্চয়কাজের ফলে প্লাবন সমভূমি লক্ষ করা যায়। নদী যখন শেষ পর্যায়ে উপনীত হয় তখন এর বহন ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে বর্ষাকালে দুপাড় উপচে পানি প্রবাহিত হয়ে পলি সঞ্চিত হয়ে প্লাবন সমভূমির সৃষ্টি করে।
গ) নদীর বাঁক : বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা প্রভৃতি নদীতে এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়।
ঘ) অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ : বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ক্ষেত্রে এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশের নদীব্যবস্থায় সৃষ্ট ভূমিরূপের মধ্যে প্রাকৃতিক বাঁধ, পশ্চাৎ জলাভূমি, বদ্বীপ প্রভৃতি অন্যতম।

নদী শাসন (River Training)

নদীর উপর মানুষ তার প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থাপনা সৃষ্টি করে। এভাবে নদীর উপর বাঁধ বা সেতু নির্মাণ করে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে নদী প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করা হলে একে নদীশাসন বলে। বাংলাদেশে নদীশাসন বলতে যেসব বাঁধ দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তিস্তা বাঁধ। এই বাঁধ কৃষিকাজের সুফলের জন্য তৈরি করা হলেও এর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিঘ্নিত হচ্ছে। তেমনি গঙ্গার উপর ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে যে নদীশাসন করছে তাতে বাংলাদেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বর্ষাকালে বাংলাদেশের পানির প্রয়োজন না হলেও ভারত থেকে নদী শাসিত এই ফারাক্কা বাঁধ বন্যার সৃষ্টি করে।
নদীশাসনের লক্ষ্য-

i. নদীর তরলদেশ ও তীরকে ক্ষয় বা ভাঙন থেকে রক্ষা করা।
ii. নদী প্রবাহকে নির্দিষ্ট খাতে ও দিকে রাখা।
iii. আশেপাশের ভূমি বা জমিকে বন্যামুক্ত রাখা।
iv. হাইড্রোলিক কাঠামো (স্রোতের গতি পানির পরিমাণ) ইত্যাদি ঠিক রাখা।
নদীশাসন কাজের যেসব ধরণ সাধারণত লক্ষ করা যায় সেগুলো হলো-
i. বাঁধ তৈরি, ii. নদী তীর রক্ষা, iii. গ্রোয়েন (groynes) নির্মাণ, vi. নদী খনন, v. তলদেশ রক্ষা।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...