(Role of Nitrogen Cycle for Environmental sustainability)
যে চক্রাকার পদ্ধতি বায়ু থেকে নাইট্রোজেন প্রথমে মাটিতে এবং সেখান থেকে জীবদেহে, আবার জীবদেহ থেকে মাটিতে এবং মাটি থেকে বায়ুতে ফিরিয়ে দেয় তাকে নাইট্রোজেন চক্র বলে।
নাইট্রোজেন চক্রের ব্যাখ্যা: নাইট্রোজেন চক্রে মোট পাঁচটি ধাপ রয়েছে।

১. নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Nitrogen fixation): বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন গ্যাসকে ব্যবহার উপযোগী (উদ্ভিদ ও প্রাণী কর্তৃক) উপাদান বা যৌগে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন বলে। এ ধাপটি আবার দুটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। যথা-
ক. ভৌত রাসায়নিক প্রক্রিয়া: ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংঘটিত নাইট্রোজেন স্থিতিকরণকে ভৌত রাসায়নিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন বলে।
এর ভৌত সংবন্ধন বজ্রপাত, বিদ্যুৎবীক্ষণ ও বৃষ্টিপাতের সময় ঘটে। বজ্রপাত, বিদ্যুৎবীক্ষণ ও বৃষ্টিপাতের সময় বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের সাথে মিলিত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড সৃষ্টি করে। নাইট্রিক অক্সাইড পরবর্তী পর্যায়ে আবার অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে নাইট্রোজেন পারঅক্সাইড সৃষ্টি করে। নাইট্রোজেন পারঅক্সাইড এরপর বৃষ্টির পানির সাথে নাইট্রিক ও নাইট্রাস এসিডে পরিণত হয়ে মাটিতে পতিত হয়। মৃত্তিকার ক্ষারীয় মূলকের উপস্থিতিতে (নাইট্রিক এসিড) নাইট্রেট ও নাইট্রাইটে পরিণত হয় এবং উদ্ভিদ কর্তৃক শোষিত হয়। ফটোলাইসিস প্রক্রিয়ায় নাইট্রাস অক্সাইডগুলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন বা নাইট্রিক অক্সাইড ও নাইট্রোজেনে পরিবর্তিত হয়। ওজোনাইজেশন প্রক্রিয়ায় বায়ুস্থ নাইট্রোজেন জারিত হয়ে নাইট্রাস অক্সাইড বা নাইট্রিক অক্সাইড জারিত হয়ে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হয়। হ্যাবার পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন ৫০০° সে. তাপমাত্রায় এবং অধিক চাপে হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে অ্যামোনিয়াতে রূপান্তরিত হয়।
খ. জীবজ প্রক্রিয়া: কতকগুলো শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়া এক বিশেষ পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে নাইট্রেটে পরিণত করে মৃত্তিকায় আবদ্ধ করতে পারে। এই বিশেষ পদ্ধতিকে বায়োলজিক্যাল নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Biological fixation of nitrogen) এবং ব্যাকটেরিয়া ও শৈবালগুলোকে যথাক্রমে নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া এবং নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী শৈবাল বলে। নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী এরূপ ব্যাকটেরিয়ার উদাহরণ হলো Azotobacter, Clostridium ইত্যাদি। Nostoc, Anabaena প্রভৃতি নীলাভ সবুজ শৈবাল হলো নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী শৈবালের উদাহরণ। এসব ব্যাকটেরিয়া ও শৈবাল বায়ুর নাইট্রোজেনকে নাইট্রেটে রূপান্তরিত করে।
ছোলা, মটর, ধৈঞ্চা প্রভৃতি শিমগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে (Leguminosae গোত্র) এক প্রকার গুটি থাকে, এদের অর্বুদ (nodule) বলে। অর্বুদের মধ্যে রাইজোবিয়াম (rhizobium) নামক মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এরাও মৃত্তিকাস্থিত বায়ুর নাইট্রোজেনকে নাইট্রেট লবণে পরিণত করে।
২. নাইট্রোজেন আত্তীকরণ (Nitrogen Assimilation): সবুজ উদ্ভিদ মাটি থেকে নাইট্রাইট, নাইট্রেট এবং কোনো
ক্ষেত্রে অ্যামোনিয়াম আকারে অজৈব নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। এই নাইট্রোজেন পরবর্তীতে নাইট্রোজেন জাতীয় জৈব যৌগে রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে নাইট্রেট প্রথমে অ্যামোনিয়াতে পরিণত হয় বা জৈব এসিডের সাথে মিলিত হয়ে অ্যামিনো এসিড গঠন করে। এই অ্যামিনো এসিড প্রোটিন, এনজাইম, নিউক্লিক এসিড ইত্যাদি সংশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। উদ্ভিদ থেকে গৃহীত খাদ্যের মাধ্যমে নাইট্রোজেন প্রাণিদেহে আসে।
৩. অ্যামোনিয়া তৈরি বা অ্যামোনিফিকেশন (Ammonification): উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু হলে মৃতদেহের উপর কতকগুলো অণুজীব বিশেষ করে Bacillus জাতীয় ব্যাকটেরিয়া এবং একটিনোমাইসিটিস কাজ করে জৈব যৌগসমূহ বিপাকে ব্যবহার করে এবং অ্যামোনিয়া মুক্ত করে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে অ্যামোনিফাইং ব্যাকটেরিয়া এবং এ প্রক্রিয়াকে অ্যামোনিফিকেশন বলে। প্রাণীর নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থও অ্যামোনিফাইং ব্যাকটেরিয়া দিয়ে শোষিত হয়ে দেহজ উপাদানে পরিণত হয়। প্রাণিকুল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদ থেকে এ নাইট্রোজেন গ্রহণ করে।
৪. নাইট্রেট তৈরি বা নাইট্রিফিকেশন (Nitrification): বিমুক্ত অ্যামোনিয়া Nitrosomonas ও Nitrosococcus
নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা প্রথমে নাইট্রাইটে পরিণত হয়। এসব ব্যাকটেরিয়াকে নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে। Penicillium, Nitrobacter এবং Nitrocystis ইত্যাদির ন্যায় কিছু অণুজীবের কার্যকারিতায় নাইট্রাইট নাইট্রেটে পরিণত হয়। নাইট্রেট উৎপাদনের এই পদ্ধতিকে নাইট্রিফিকেশন বলে। নাইট্রিফিকেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু শক্তি নির্গত হয়, যা ব্যাকটেরিয়ার কাজে লাগে।
শক্তি শক্তি
৫. ডিনাইট্রিফিকেশন (Denitrification): অ্যামোনিয়া ও নাইট্রেট নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার (যেমন- Thiobacillus denitrificans, Pseudomonus, Micrococcus denitrificans) কার্যকারিতায় মুক্ত নাইট্রোজেনে পরিণত হয়। এসব ব্যাকটেরিয়াকে ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে। মাটি ও পানিতে অবস্থিত ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতার ফলে নাইট্রেট প্রথমে নাইট্রাইটে রূপান্তরিত হয় এবং তা থেকে শেষে নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায়। এ প্রক্রিয়াকে ডিনাইট্রিফিকেশন বলে। এতে মাটি ও পানির নাইট্রেট থেকে নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে পরিবেশে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য রক্ষা করে।
নাইট্রোজেন চক্রের গুরুত্ব (Importance of Nitrogen cycle)
প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন চক্রে নাইট্রোজেন মৌল বিভিন্ন আকারে বায়ু থেকে মাটি, মাটি থেকে উদ্ভিদ ও উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে সঞ্চারিত হয়। অবশেষে জীবজগৎ থেকে মাটি এবং বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। এভাবে প্রকৃতিতে নাইট্রোজেন চক্র অবিরাম চলতে থাকে, কখনও থেমে যায় না। বর্তমানে যান্ত্রিক কৃষিপদ্ধতির ফলে প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন চক্র ভীষণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। যেমন কতিপয় দানাশস্য যথা ভুট্টা মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন শোষণ করে। প্রতি বছর যদি মাটির নাইট্রোজেনের ভারসাম্য অবস্থা ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে মাটি অনুৎপাদী হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে নাইট্রোজেন

স্থায়ীকরণকারী উদ্ভিদের (Leguminosae) চাষাবাদের মাধ্যমে বা জৈব নাইট্রোজেনঘটিত সারের মাধ্যমে মাটির নাইট্রোজেনের অভাব পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু ফলশ্রুতিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফল হিসেবে বেশি নাইট্রেট মাটি থেকে নদী, খাল ও পুকুরের পানিতে মিশে পানিকে দূষিত করছে। সুতরাং নাইট্রোজেন চক্রের স্বাভাবিকতা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more