hsc

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন (ষষ্ঠ অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.6k

Climatic Region and Climate Change

ভূপৃষ্ঠের কোনো বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানগুলো, যেমন- বায়ুর তাপ, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্নতা, বারিপাত প্রভৃতি যখন মোটামুটি একই ধরনের হয় তখন ঐ অঞ্চলটিকে জলবায়ু অঞ্চল বলে। জলবায়ুর উপাদানগুলোর বিভিন্নতার জন্য পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন জলবায়ুতে জীবজগতের বৈচিত্র্যতার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রারপ্রণালিতেও বৈসাদৃশ্য রয়েছে। জলবায়ুর আঞ্চলিক তারতম্য স্বাভাবিক হলেও বিগত দশকসমূহে মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর উপাদানসমূহের অস্বাভাবিকতা জলবায়ুতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করেছে। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটছে। অবশ্য সুদূর অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক কারণেও জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন -ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

সাকিব তার পরিবারের সাথে কক্সবাজার বেড়াতে গেল। সাকিবের বাবা আগেই কক্সবাজারের এই সময়কার আবহাওয়া সম্পর্কে জেনে এসেছেন। সময় কক্সবাজারের আবহাওয়া বেড়ানোর জন্য সুবিধাজনক।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও:

মানুষ তার বিলাস জীবনের বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে এমন সব কর্মকাণ্ড করছে যার জন্য বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে দেখা দিচ্ছে মানবজীবনে বিভিন্ন দুর্যোগ। 

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও :

বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বের তাপমাত্রা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে ২১ শতকের শেষে তাপমাত্রা অতিরিক্ত ২.৫° – ৫.৫° সে. যুক্ত হতে পারে। যার পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ ।

(Classification of Climatic Region & Its Calssification)

পৃথিবীর সর্বত্র একই ধরনের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি পরিলক্ষিত হয় না। তবে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে বিস্তীর্ণ অঞ্চলব্যাপী অনেক সময় একই ধরনের জলবায়ু বিরাজ করে। ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত কোনো বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানগুলো, যেমন- বায়ুর তাপ, চাপ, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্নতা, বারিপাত প্রভৃতি যখন মোটামুটি একই ধরনের হয় তখন ঐ অঞ্চলটিকে জলবায়ু অঞ্চল বলে। জলবায়ুর উপাদানগুলোর বিভিন্নতার জন্যই পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চল দেখা যায়। পৃথিবীকে অক্ষাংশভিত্তিক অবস্থান অনুসারে প্রধান ৬টি জলবায়ু অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়। প্রত্যেক অঞ্চলে জলবায়ু স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের। তাই এগুলোকে প্রধান জলবায়ু শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পরবর্তীতে বায়ুর তাপ, চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর আর্দ্রতা, বারিপাত ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে মোট ১৬টি স্বতন্ত্র জলবায়ু অঞ্চল নির্দেশ করা যেতে পারে। তবে স্থানিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জলবায়ুর আরও উপবিভাগ রয়েছে। যেমন-

প্রধান জলবায়ু শাখা-জলবায়ু
১.উষ্ণ জলবায়ু (নিম্ন অক্ষাংশ)

১.১

১.২

১.৩

১.৪

১.৫

নিরক্ষীয় জলবায়ু

মৌসুমি জলবায়ু

ক্রান্তীয় সমুদ্র উপকূলীয় জলবায়ু

ক্রান্তীয় মহাদেশীয় জলবায়ু

ক্রান্তীয় মরুদেশীয় জলবায়ু

২. মৃদু উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (উপক্রান্তীয় জলবায়ু)

২.১

২.২

উপক্রান্তীয় পূর্ব উপকূলীয় আর্দ্র জলবায়ু

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু

৩.মৃদু শীতল নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (মধ্য অক্ষাংশ)

৩.১

৩.২

৩.৩

মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের সামুদ্রিক জলবায়ু

মহাদেশের অভ্যন্তর ও মহাদেশীয় জলবায়ু

নাতিশীতোষ্ণ মরুদেশীয় জলবায়ু

৪.শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু

৪.১

৪.২

শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ সমুদ্র উপকূলীয় জলবায়ু

শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় জলবায়ু

৫.মেরুদেশীয় জলবায়ু

৫.১

৫.২

উপমেরু ও মেরুদেশীয় তুন্দ্রা জলবায়ু

মেরুদেশীয় তুষারাবৃত জলবায়ু

৬. পার্বত্য জলবায়ু

৬.১

৬.২

ক্রান্তীয়-উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ু

নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ু।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(A Brief Description of Climatic Regions)

১. উষ্ণ জলবায়ু (Warm climate)

i. নিরক্ষীয় জলবায়ু (Equatorial climate)
নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ° থেকে ° অক্ষাংশের মধ্যে এ অঞ্চল বিস্তৃত। এ অঞ্চলে বার্ষিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কম। এখানকার গড় তাপমাত্রা ° থেকে ৩৪°C ও গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৭০ থেকে ২৫০ সেমি.। এখানে সারা বছর একটি মাত্র ঋতু গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে ও পরিচলন প্রক্রিয়ায় বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান এবং আফ্রিকার কঙ্গো নদীর অববাহিকা ও গিনি উপকূল, এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, পাপুয়া নিউগিনি প্রভৃতি।

ii. মৌসুমি জলবায়ু (Monsoon climate)

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে বায়ুর দিক পরিবর্তন হয়, তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। আর এ বায়ু প্রবাহিত অঞ্চলের জলবায়ুকে বলে মৌসুমি জলবায়ু। ক্রান্তীয় অঞ্চলে এর প্রভাব সর্বাধিক বলে এ জলবায়ুকে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুও (Tropical Monsoon Climate) বলা হয়। সাধারণভাবে ১৫০-৩০০ উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থিত মহাদেশসমূহের পূর্ব প্রান্তে এ জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়। এ অঞ্চলে প্রায় সারা বছর উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১২৫-২০০ সেমি। মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত ভারতের আসামের চেরাপুঞ্জি এলাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় (প্রায় ১২৫০ সেমি)।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, লাওস,
থাইল্যান্ড প্রভৃতি, পূর্ব চীন, দক্ষিণ জাপান, মেক্সিকো উপসাগরের উপকূল, ক্যারিবিয়ান সাগর, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশ, ব্রাজিলের পূর্ব অংশ, পূর্ব আফ্রিকা ও মাদাগাস্কার দ্বীপ এবং উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া।

iii. ক্রান্তীয় সমুদ্র উপকূলীয় জলবায়ু (Tropical oceanic climate)

মহাদেশসমূহের পূর্ব উপকূলে °-° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে এ জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো এখানেও সারা বছর অধিক তাপমাত্রা বিরাজ করে। তবে শীত-গ্রীষ্মের তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকে। শীত এবং গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা যথাক্রমে ২৫°০ এবং ২৯°০। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১২৭ সেমি। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে প্রবল ঘূর্ণিঝড়, টাইফুন, হারিকেনের সৃষ্টি হয়।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- মধ্য আমেরিকা, ভেনেজুয়েলা, গায়ানা, ব্রাজিলের উপকূল, ফিলিপাইন, উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশ।

iv. ক্রান্তীয় মহাদেশীয় জলবায়ু (Tropical continental climate)
মহাদেশসমূহের নিরক্ষীয় এবং উষ্ণ মরু অঞ্চলের মধ্যভাগে যে জলবায়ু দেখা যায় তাকে ক্রান্তীয় মহাদেশীয় জলবায়ু বলে। আফ্রিকার সুদান অঞ্চলে এ জলবায়ু স্পষ্টরূপে দেখা যায় বলে একে সুদানি জলবায়ুও বলে। সাধারণত নিরক্ষরেখার উত্তরে °-° অক্ষাংশে এ জলবায়ু অঞ্চল অবস্থিত। তবে উষ্ণমণ্ডলে °-° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশেও এ জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- আফ্রিকাঃ সুদান, মালি, সেনেগাল, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, চাঁদ, টোঙ্গা, এঙ্গোলা ইত্যাদি। দক্ষিণ আমেরিকাঃ ভেনেজুয়েলা ও দক্ষিণ ব্রাজিল। অস্ট্রেলিয়াঃ উত্তর কুইন্সল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার অংশ বিশেষ এবং মধ্য আমেরিকার কিছু অংশ।

v. ক্রান্তীয় মরুদেশীয় জলবায়ু (Tropical desert climate)
উভয় গোলার্ধে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি অঞ্চলদ্বয়ের মধ্যে °-° অক্ষাংশের মধ্যে এ জলবায়ু দেখা যায়।
বৃষ্টিহীন মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় যেমন খুব গরম রাত্রিতে তেমনি তীব্র শীত পড়ে। এ জলবায়ু অঞ্চলে গ্রীষ্মের দুপুরে তাপমাত্রা ৪৫°C পর্যন্ত হয়ে থাকে। শীতকালে রাতে তাপমাত্রা প্রায় °C থাকে।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- আফ্রিকার সাহারা ও কালাহারি মরুভূমি, এশিয়ার আরব ও থর মরুভূমি, মেক্সিকোর মরুভূমি, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি, দক্ষিণ আমেরিকার আতাকামা মরুভূমি ইত্যাদি।

২. মৃদু উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু বা উপক্রান্তীয় জলবায়ু

(Mild Hot Temperate Climate or Sub Tropical Climate)

vi. উপক্রান্তীয় পূর্ব উপকূলীয় আর্দ্র জলবায়ু (Sub Tropical eastern humid marine climate)
মহাদেশসমূহের পূর্ব প্রান্তে °-° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে এ জলবায়ু অঞ্চল পরিলক্ষিত হয়। এ অঞ্চলে বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত হয় গ্রীষ্মকালে। পাহাড়-পর্বতের অবস্থান তথা ভূপ্রকৃতিগত কারণে অঞ্চল বিশেষে বৃষ্টিপাতের তারতম্য হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে প্রায় বারোমাসই বৃষ্টিপাত হয়। এ জলবায়ু অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১০০-১৫০ সে.মি.। গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৭°C এবং শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯°C হয়ে থাকে। এ জলবায়ুকে উপসাগরীয় জলবায়ুও বলা হয়।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ, উত্তর ও মধ্যচীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল, ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাংশ ইত্যাদি।

vii. ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু ( Mediterranean climate)

ভূমধ্যসাগর ও এর তীরবর্তী দেশসমূহে এ ধরনের জলবায়ু সৃষ্টি হয় বলে একে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বলে। মহাদেশগুলোর পশ্চিমাংশে °-° অক্ষাংশের কিছু অংশে এই জলবায়ুর অবস্থান। এ জলবায়ু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা °-°C এবং শীতকালীন তাপমাত্রা °-°C এর মধ্যে থাকে। এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- বৃষ্টিবহুল শীতকাল ও বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকাল। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫-৭৫ সেমি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো-ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশসমূহ (যেমন- মরক্কো, ফ্রান্স, পর্তুগাল), সিরিয়া; মধ্যচিলি, ক্যালিফোর্নিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা (কেপ প্রদেশ); পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ইত্যাদি।

৩. মৃদু শীতল নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (Cool Temperate oceanic climate)

viii. মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের সামুদ্রিক জলবায়ু (Oceanic climate of west coast of the continent)

সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তী এলাকা °-° অক্ষাংশের মধ্যে এ ধরনের জলবায়ুর অবস্থান রয়েছে। এ জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এখানে সারা বছর বৃষ্টিপাত হয়। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে এই জলবায়ু অত্যন্ত জোরালো বলে একে ব্রিটিশ টাইপ জলবায়ু (British type climate) বলে। সমুদ্রের প্রভাবে জলবায়ু মৃদু ও সমভাবাপন্ন হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা °-°C এবং শীতকালে গড় উত্তাপ ৪°C। অনেক স্থানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচেও নামে। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৫০-৭০ সে. মি. হয়। উপকূল অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হয় (অনেক স্থানে ২০০ সেমি)।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম অংশ, উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ তাসমানিয়া দ্বীপ এবং চিলির দক্ষিণাংশ।

ix. মহাদেশের অভ্যন্তর ও মহাদেশীয় জলবায়ু (Interior of the continent and continental climate)
উত্তর গোলার্ধে °-° অক্ষাংশে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে °-° অক্ষাংশের দেশগুলোতে এ জলবায়ু দেখা যায়। এ অঞ্চলের জলবায়ু কিছুটা চরমভাবাপন্ন। এখানে দীর্ঘস্থায়ী প্রচণ্ড শীত পড়ে এবং তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নামে। গ্রীষ্মকালে গড় উষ্ণতা °C। গ্রীষ্মকালে মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাত হয়। তবে সেন্টলরেন্স অববাহিকায় সারা বছরই কম-বেশি বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫-১০০ সেমি।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো- উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্বাংশ, জাপান ও কোরিয়ার কিছু অংশ, চীনের মাঞ্জুরিয়া, আমুর নদীর অববাহিকা, সাইবেরিয়া; পোল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানির কিছু অংশ আর্জেন্টিনার পাতাগোনিয়ার মালভূমির দক্ষিণাংশ প্রভৃতি।

X. নাতিশীতোষ্ণ মরুদেশীয় জলবায়ু (Temperate desert climate)
উভয় গোলার্ধে .°-° অক্ষাংশের মধ্যে মহাদেশসমূহের অভ্যন্তরভাগে এ জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়। এখানে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে যেমন প্রচণ্ড গরম শীতকালে তেমনি তীব্র শীত পড়ে। গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা ৩৬°C এবং শীতকালে °C বা তার কম। শীতকালে তুষারপাত হয়। মহাদেশের অভ্যন্তরভাগ তথা বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল হওয়ায় বৃষ্টিপাত ১৩-৩৮ সেমি. এর কম। তবে গ্রীষ্মকালেই অধিকাংশ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো-ইউরেশিয়ার তাকলামাগান, মনখারিখান উপত্যকা, এশিয়ার গোবি মরুভূমি, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ও নেভাদা এবং দক্ষিণ আমেরিকার পাতাগোনিয়া মরুভূমি।

৪. শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু (Cold Temperate Climate)

xi. শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ সমুদ্র উপকূলীয় জলবায়ু (Cold Temperate maritime climate)
সুমেরু ও কুমেরু বৃত্তের (৬৬.৫° উত্তর ও দক্ষিণ) আশপোশে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের জলবায়ু লক্ষ করা যায়। এখানে শীতকাল দীর্ঘস্থায়ী ও গ্রীষ্মকাল স্বল্প স্থায়ী হয়ে থাকে। গ্রীষ্মে গড় উষ্ণতা °C এবং শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের (-0°) নিচে থাকে। সাগরের উপকূল হওয়ায় গ্রীষ্মকালে পশ্চিমা বায়ু দ্বারা প্রচুর বৃষ্টিপাত (৩৮-৫৩ সেমি) হয়। কিন্তু এসব এলাকায় শীতকালে তুষারপাত হয়। এ অঞ্চল সর্বদা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো-উত্তর গোলার্ধে উত্তর আমেরিকার আলাস্কা, নিউফাউন্ডল্যান্ড, হাডসন উপসাগর এলাকা ও ব্যাফিন দ্বীপপুঞ্জ এবং ইউরোপের নরওয়ে উপকূল ও আইসল্যান্ড। দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ আমেরিকার চিলি ও আর্জেন্টিনার উপকূল, ফ্যান্ড ও তার পার্শ্ববর্তী দ্বীপসমূহ।

xii. শীতপ্রধান নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় জলবায়ু (Cold Temperate continental climate)
সুমেরু বৃত্তের নিকটবর্তী নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মধ্যভাগে এ জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়। সমুদ্র উপকূল থেকে অনেক ভিতরে অবস্থিত এ অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করে। গ্রীষ্মকালে বেশ গরম (°C) পড়ে এবং শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে। এখানে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি ৫০ সেমি ও শীতকালে তুষারপাত হয়।
এ জলবায়ুর অন্তর্গত অঞ্চলগুলো হলো-কানাডা ও রাশিয়ার উত্তরাংশ এবং ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমাংশ। এছাড়া নিউফাউন্ডল্যান্ড, আলাস্কা, ফিনল্যান্ড এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

৫. মেরুদেশীয় জলবায়ু (Polar climate)

xiii. উপমেরু ও মেরুদেশীয় তুন্দ্রা জলবায়ু (Subpolar and Polar Tundra climate)
উভয় গোলার্ধে °-° অক্ষাংশের মধ্যে মেরু ও উপমেরুদেশীয় তুন্দ্রা জলবায়ু দেখা যায়। হিমশীতল জলবায়ু এ অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে সারা বছর বরফাচ্ছন্ন থাকে। ক্ষণস্থায়ী গ্রীষ্মকালে তুষারের গলন হয় না বললেই চলে। এখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা °C শীতকালে তাপমাত্রা সব সময় হিমাঙ্কের নিচে থাকে। গড় বৃষ্টিপাত ৩০ সেমি হলেও অধিকাংশ সময় তুষারপাত হয় এবং তুষার ঝড় দেখা যায়।

xiv. মেরুদেশীয় তুষারাবৃত জলবায়ু (Polar icecap climate)
সুমেরু ও কুমেরু বৃত্ত থেকে মেরুবিন্দু পর্যন্ত অঞ্চল চির তুষারাবৃত থাকে। এ জলবায়ু অঞ্চল বরফের উঁচু স্তূপে ঢাকা রয়েছে। সমুদ্রের উপরিভাগে বরফ জমে বিশাল সমভূমির রূপ ধারণ করে বলে একে ভাসমান বরফের দেশ বলে। ছয় মাস দিন ও ছয় মাস রাত্রি (অর্থাৎ-১ দিন-রাত্রি) এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে সাধারণভাবে পাউডারের আকারে বরফ পড়ে।

৬. পার্বত্য জলবায়ু (Mountain Climate)

xv. ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ু (Tropical and subtropical humid climate)
দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতের উত্তরাংশ, ব্রাজিলের উচ্চভূমি, মেক্সিকোর উচ্চভূমি, ইথিওপিয়ার মালভূমি, এশিয়ার তিব্বত মালভূমি, ইন্দোনেশিয়ার উচ্চভূমি এ অঞ্চলে অবস্থিত। এ জলবায়ুতে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর তাপ কমতে থাকে। অধিক উচ্চ স্থানে, উচ্চভূমির প্রতিবাত পার্শ্বে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

xvi. নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ু (Temperate humid climate)
পৃথিবীর প্রধান পর্বতমালাগুলো এ অঞ্চলের মধ্যে গণ্য। যেমন- হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ, এ্যাটলাস, তিয়েনশান ইত্যাদি। এ জলবায়ুতে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর তাপ কমতে থাকায় ওপরে শীতল অবস্থা বিরাজ করে। এ অঞ্চলে তুষারপাত, হিমবাহের সৃষ্টি হয়। পর্বতের প্রতিবাত পার্শ্বে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি হয়.।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Equatorial Climatic Region)

অবস্থান: নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে ° থেকে ° অক্ষাংশের মধ্যে যে জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়, তাকে নিরক্ষীয় জলবায়ু বলে। তবে কোনো কোনো স্থানে ° অক্ষাংশ পর্যন্ত এ জলবায়ু দেখা যায়। আমাজান অববাহিকা (দক্ষিণ আমেরিকা), আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকা, এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নিউগিনি, দক্ষিণ ফিলিপাইন প্রভৃতি অঞ্চল নিরক্ষীয় জলবায়ুর অন্তর্ভূক্ত।

নিরক্ষীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যসমূহ: নিরক্ষীয় অঞ্চলের জলবায়ু প্রধানত নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয় বলে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য প্রায় একই থাকে। জানুয়ারি ও জুলাই মাসের তাপমাত্রার পার্থক্য নেই বললেই চলে। তাই ঋতু পরিবর্তন এ অঞ্চলে তেমন দেখা যায় না। সারাবছর অধিক তাপ ও বৃষ্টিপাত এ জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বায়ুর তাপ : নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয়। দিবাভাগের দৈর্ঘ্য সারা বছর প্রায় সমান থাকে বলে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা সারা বছরই অধিক থাকে এবং বিভিন্ন মাসের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কম। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা সাধারণত °-° সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এ অঞ্চলের তাপের দুইটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যথা- (১) সারাবছর সমানভাবে অধিক তাপ; এবং (২) সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপের পার্থক্য কম। পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে (সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন) নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা অনুভূত হয়। কিন্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো সারা বছর অধিক তাপ এবং তাপমাত্রার পার্থক্য এতো কম আর কোথাও দেখা যায় না।

বায়ুরচাপ ও বায়ুপ্রবাহ নিরক্ষীয় অঞ্চলে আনুভূমিকভাবে তাপমাত্রার পরিবর্তনের হার খুব কম বলে বায়ুচাপের
পরিবর্তনের হারও কম। ফলে আনুভূমিকভাবে বায়ুপ্রবাহের বেগও অনেক কম। কেবল প্রান্তভাগে অয়ন বায়ুর প্রবেশজনিত কারণে আনুভূমিক বায়ুপ্রবাহের বেগ অপেক্ষাকৃত অধিক হয় এবং নিরক্ষীয় শান্তবলয়ের দিকে বায়ুর বেগ ক্রমশ কমে যায়। অত্যধিক তাপের জন্য বায়ুতে সর্বদা পরিচলন প্রক্রিয়া (Convectional Process) চলতে থাকে এবং স্থায়ীভাবে নিম্নচাপ বিরাজ করে। ফলে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু এখানে এসে ঊর্ধ্বগামী হয়। এ ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত ওপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের জন্য নিরক্ষীয় শান্তবলয় যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণে কিছুটা সরে যায় বলে এ জলবায়ু অঞ্চলের কোনো কোনো স্থানে শুষ্ক অয়ন বায়ু (কঙ্গো) প্রবেশ করে। এখানকার আবহাওয়া কিছুটা আরামদায়ক।

বৃষ্টিপাত : নিরক্ষীয় অঞ্চলে জলভাগ অধিক হওয়ায় সারাদিনই সূর্যের তাপে পানি বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে উঠতে থাকে। এ বায়ু পরিচলন প্রক্রিয়ায় ঊর্ধ্বে প্রসারিত ও শীতল হয়ে অপরাহ্নে (বিকেলে) ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ থেকে ২৫০ সেন্টিমিটার। এখানে প্রতিদিনই বৃষ্টিপাত হয়। স্থান বিশেষে (ক্যামেরুনের পর্বত পাদদেশীয় অঞ্চলে) ১০০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়।
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য-

উদ্ভিজ্জ: সারাবছর ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং অধিক তাপের জন্য এ অঞ্চলে প্রশস্ত পত্রযুক্ত চিরহরিৎ বৃক্ষের গভীর বনের সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার গাছগুলো খুব উঁচু এবং ঘন হওয়ায় সূর্যের আলো নিচে পৌছায় না। ফলে বনের নিচের অংশে ঝোপঝাড় কম হয়। কোনো কোনো স্থানে (মালয়শিয়ার বনভূমি) এ সব বৃক্ষ ৪৯ মিটারের মতো উঁচু হয়ে থাকে। নিরক্ষীয় বনভূমির গাছগুলোর মধ্যে সেগুন, মেহগনি, আবলুস, রোজউড, রাবার, চন্দন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
মাটি: নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাটি সবসময় নরম ও ভিজা থাকে। তথাপি এ অঞ্চলের মাটি বিশেষ উর্বর নয়। তবে এ অঞ্চলে কোনো কোনো স্থানে লাল মৃত্তিকা, চুন জাতীয় এবং আগ্নেয় মৃত্তিকা দেখা যায়।
জীবজন্তু: এ অঞ্চলের বনে বৃক্ষচারী জীবজন্তুর সংখ্যাই বেশি। কারণ নিবিড় অরণ্যে কোনো পদচারী পশু চলাফেরা করতে পারে না। পাখি, গেছো সাপ, গরিলা, বানর প্রভৃতি বৃক্ষচারী প্রাণী বৃক্ষের শাখায় বিচরণ করে। হিংস্র মাংসাশী প্রাণী (যেমন- বাঘ, সিংহ, হায়েনা প্রভৃতি) এই অঞ্চলে দেখা যায় না।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Mediterranean Climatic Region)

অবস্থান: ভূমধ্যসাগর এবং এর তীরবর্তী দেশসমূহে এ জলবায়ুর বিস্তৃতি ও প্রভাব সর্বাধিক বলে এ জলবায়ুকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বলে। মহাদেশগুলোর পশ্চিমাংশে ° থেকে ৪৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দেখতে পাওয়া যায়। এশিয়ার পশ্চিমে লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, দক্ষিণ তুরস্ক, উত্তর আফ্রিকার মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো; ইউরোপের গ্রিস, বসনিয়া, দক্ষিণ ইতালি, মাল্টা, সিসিলি, দক্ষিণ স্পেন; উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, মধ্য চিলি এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে সারা বছর রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে। শীত-গ্রীষ্ম ও দিন-রাত্রির তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য, মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ, বৃষ্টিবহুল শীতকাল এবং বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকাল প্রভৃতি ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এটি একটি আরামদায়ক জলবায়ু অঞ্চল।

বায়ুর তাপ: এ জলবায়ু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা °-° সেলসিয়াসের মধ্যে এবং শীতকালীন তাপমাত্রা °-° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। শীত-গ্রীষ্মের তাপমাত্রার পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ সেলসিয়াস।

ক. গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা: গ্রীষ্মকালে সূর্যের প্রায় উল্লম্ব অবস্থানের জন্য বায়ুর তাপমাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। এ ঋতুতে গড় তাপমাত্রা ° থেকে ২৭° সেলসিয়াস হলেও কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। গ্রীষ্মকালে আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় রাতে তাপ সহজেই বিকিরিত হয় এবং হ্রাস পায়। ফলে এ ঋতুতে দিনরাত্রির তাপমাত্রার ব্যবধান অনেক বেশি হয়। এমনকি ৪° সেলসিয়াস বা তারও অধিক হয়ে থাকে। সমুদ্র উপকূল হতে যতই দেশের অভ্যন্তরে যাওয়া যায় তাপমাত্রার এ ব্যবধান ততই বৃদ্ধি পায়। যেমন- মোগাডরে ° হলেও মরক্কোতে ° সেলসিয়াস, সানফ্রান্সিসকোতে ° কিন্তু স্যাক্রামেন্টোতে ২° সেলসিয়াস।

খ. শীতকালীন তাপমাত্রা: সূর্য যখন তির্যকভাবে কিরণ দেয় তখন শীতকাল। মৃদুভাবাপন্ন শীত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া শীতকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শীতকালীন গড় তাপমাত্রা ° থেকে ১০° সেলসিয়াস এর মতো হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা কিছু বেশি থাকে।

বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহ: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে শীতকালে আর্দ্র পশ্চিমা বা প্রত্যয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এ সময় বায়ুতে নিম্নচাপ বিরাজ করে। গ্রীষ্মকালে শুষ্ক অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। তাই এ সময় বৃষ্টিপাত হয় না। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সূর্যের উত্তরায়ণ হলে সূর্য কর্কটক্রান্তির নিকটবর্তী হয়। তখন পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলো উত্তর দিকে সরে যায়। চাপ বলয়ের সাথে সাথে বায়ু বলয়গুলোও উত্তরে সরে অবস্থান করে। ফলে এ সময় উত্তর গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের দেশগুলোর উপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে এতে জলীয়বাষ্প থাকে না। ফলে এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় না। এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল থাকায় এবং বায়ু চাপ বলয়গুলো কিছুদূর উত্তরে সরে যাওয়ায় সেখানকার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলোর উপর দিয়ে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু সমুদ্র হতে আসে বলে তাতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে এবং ঐ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
শীতকালে সূর্যের দক্ষিণায়ন হতে সূর্য যখন মকরক্রান্তি রেখার নিকটবর্তী হয় তখন পৃথিবীর চাপ বলয়গুলো দক্ষিণে সরে যায়। এর ফলে উত্তর গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর উপর দিয়ে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু সমুদ্র হতে আসে বলে প্রচুর জলীয়বাষ্প বহন করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলো শুষ্ক অয়ন বায়ুর অধীনে থাকে এবং তথায় বৃষ্টিপাত হয় না।

বৃষ্টিপাত : ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে আর্দ্র পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহের জন্য শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়, গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এ অঞ্চলে বার্ষিক ২৫ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।
শীতকালে বৃষ্টিপাত হলেও আকাশ একেবারে মেঘাচ্ছন্ন থাকে না এবং বায়ু আর্দ্র হলেও স্যাঁতসেঁতে থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘূর্ণিবাত হতে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। অল্প কয়েক দিনে অধিকাংশ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে এবং বর্ষণ দিনগুলো দীর্ঘ শুষ্ককাল দ্বারা বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে বছরের অধিকাংশ দিন আকাশ মেঘমুক্ত থাকে এবং উজ্জ্বল সূর্যকিরণ পাওয়া যায়। এ জলবায়ু অঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চলে অত্যধিক তুষারপাত হয়। যেমন-ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা উচ্চভূমির (২৩৩৩-২৪৩৮ মিটার) পশ্চিম ঢালে বছরে গড়ে ১০০০ সেন্টিমিটারের অধিক তুষারপাত হয়ে থাকে।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য

কৃষি (Agriculture) : এ জলবায়ু অঞ্চলের মৃত্তিকা মোটামুটি পলিযুক্ত ও উর্বর। গম চাষের জন্য এ অঞ্চল বিশেষ
উপযুক্ত। অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে পানি সেচের সাহায্যে গম, যব, ভুট্টা, তুলা প্রভৃতি ফসলের চাষ হয়। এছাড়া প্রচুর সূর্যকিরণ ফল পাকার জন্য উপযোগী বলে এ অঞ্চলের জলবায়ু ফল উৎপাদনের অনুকূল। জলপাই ও ডুমুর জাতীয় গাছ এ জলবায়ুবিশিষ্ট দেশগুলোতে সর্বত্রই জন্মে। আঙুর ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশেষত ক্যালিফোর্নিয়া উপত্যকায় প্রচুর ফলের বাগান দেখা যায়। আপেল, কমলালেবু, আখরোট, পীচ, নাসপাতি, আঙ্গুর প্রভৃতি ফল প্রচুর পরিমাণে জন্মে।

উদ্ভিজ্জ (Vegetation): এ জলবায়ু অঞ্চলে সাধারণত আর্দ্র বৃষ্টিবহুল শীতকাল এবং বৃষ্টিহীন দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল বিরাজ
করে। শুষ্ক গ্রীষ্মকাল ও আর্দ্র শীতকাল হওয়ায় এরূপ জলবায়ুর উদ্ভিজ্জসমূহ শুষ্কতার মোকাবেলা করার ক্ষমতাসম্পন্ন। বৃষ্টিবহুল শীতকালে বৃক্ষাদি জন্মে। ছোট ছোট গাছ ও ঝোপঝাড় এ অঞ্চলে বেশি জন্মে। গ্রীষ্মকাল বৃষ্টিহীন ও শুষ্ক হওয়াতে এ ঋতুতে বৃক্ষলতাদির বৃদ্ধি খুব একটা হয় না। জলাপাই এ অঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ। এছাড়াও ওক, কর্ক, মিষ্টি বাদাম, সিডার, পাইন, তুতগাছ প্রভৃতি বৃক্ষও এ জলবায়ু অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।

জীবজন্তু (Animals): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বনভূমি ও তৃণভূমির পরিমাণ কম। ভেড়া, ছাগল, অশ্ব, উট, খচ্চর, গাধা, শুয়োর এ অঞ্চলের প্রধান জীবজন্তু। এ অঞ্চলে তৃণভূমি বা চারণক্ষেত্র কম থাকায় পশু খামার গড়ে উঠেনি। তবে বর্তমানে অনেক স্থানে গো-মহিষাদি প্রতিপালিত হয়।

খনিজ (Minerals): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। যেমন- ইতালিতে গন্ধক ও মর্মর পাথর এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনা ও খনিজ তেল পাওয়া যায়। উত্তর আফ্রিকা খনিজ তেলে সমৃদ্ধ।

শিল্প (Industry): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি সম্পদের বিশেষত কয়লার অভাব থাকায় সেখানে কোনো বৃহৎ যন্ত্রশিল্প
গড়ে ওঠেনি। কৃষিকার্যের ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ বাণিজ্য ও শিল্পে বিশেষ উন্নতি সাধন করেছে। মদ তৈরি, সাবান ও রেশম শিল্প এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শিল্প। সুবিধাজনক জলবায়ু থাকায় পৃথিবীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পকেন্দ্র 'হলিউড' ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস নামক স্থানে গড়ে উঠেছে। ইতালিও সিনেমা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বার্সেলোনা, নেপল্স, মিলান, চিড়িরিন এবং মার্সিলিস বয়ন ও কারিগরি শিল্পের কেন্দ্র।

পরিবহন (Transport): এ অঞ্চলের দেশগুলো বেশ সমৃদ্ধ বলে পরিবহন ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি সম্ভব হয়েছে। রেলপথ ও সড়কপথ এ অঞ্চলের দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান অবলম্বন। এছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিমান ও জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থাও রয়েছে।

বাণিজ্য (Trade): বর্তমানে এ অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ উন্নত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, স্পেন, তুরস্ক, প্রভৃতি দেশ হতে প্রচুর টাটকা বা শুষ্ক আঙুর ও অলিভ অয়েল ব্যাপকভাবে রপ্তানি করা হয়। উত্তর আফ্রিকা হতে রপ্তানি হয় খনিজ তেল। বিভিন্ন প্রকার ফল, মদ, রেশম, জলপাই, তেল, কাঠ প্রভৃতি রপ্তানির জন্য ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল প্রসিদ্ধ।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Monsoon Climatic Region)

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু: আরবি শব্দ 'মওসুম' থেকে মৌসুমি শব্দের উৎপত্তি। 'মওসুম' শব্দের বাংলা অর্থ 'ঋতু'। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যে বায়ুর দিক পরিবর্তন হয় তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। যেসব দেশের উপর দিয়ে এ বায়ু প্রবাহিত হয় সেসব দেশের জলবায়ুকে মৌসুমি জলবায়ু বলা হয়। আবার কর্কট ও মকরক্রান্তির নিকটবর্তী অঞ্চলে এর প্রভাব ও বিস্তৃতি অনেক বেশি বলে এ জলবায়ুকে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুও বলা হয়।

মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের উৎপত্তি: ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ভূগোলবিদ Edmand Halley ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে উষ্ণ প্রকৃতির শীত- গ্রীষ্ম বায়ুপ্রবাহকে বুঝানোর জন্য সর্বপ্রথম মৌসুমি (monsoon) শব্দটি ব্যবহার করেন। মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ সম্পর্কে Halley-এর উক্তি, 'সম্পূর্ণ তাপজনিত কারণে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের উৎপত্তি।' তাঁর মতে, গ্রীষ্মে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পার্শ্ববর্তী সমুদ্র অপেক্ষা উত্তপ্ত হয়ে পড়লে স্থলভাগে নিম্নচাপ এবং পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে উচ্চচাপের উদ্ভব হয়। ফলে সমুদ্র থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। অপরদিকে, শীতকালে উত্তর-পূর্ব এশিয়া তাপ বিকিরণের ফলে পার্শ্ববর্তী সমুদ্র অপেক্ষা শীতল হয়ে পড়লে স্থলভাগে উচ্চচাপ এবং পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। য। ফলে শুষ্কবায়ু স্থলভাগ হয়ে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়।

মৌসুমি জলবায়ুর অবস্থান:

ক. অক্ষাংশগত অবস্থান: উষ্ণমণ্ডলে সাধারণত ° থেকে ৩০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। অর্থাৎ ' মহাদেশসমূহের পূর্বাঞ্চলসমূহ তথা কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তির মধ্যবর্তী অঞ্চলসমূহ মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত।

খ. আঞ্চলিক অবস্থান: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর আঞ্চলিক অবস্থানকে মৌসুমী জলবায়ুর সুস্পষ্টতার ভিত্তিতে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা-

i.প্রধান অঞ্চল: বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, পশ্চিম ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি প্রধান মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
ii. অপ্রধান অঞ্চল: অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড, নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাংশ এবং কার্পেন্টারিয়া উপসাগরের পশ্চিমাংশ, ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ অংশ, জাভা হতে দক্ষিণে মধ্য নিউগিনি পর্যন্ত, দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাংশ, লিসোথো, সোয়াজিল্যান্ড, মোজাম্বিক, মালাগাছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, আলাস্কা, লুসিয়ানা, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা প্রভৃতি অঙ্গরাজ্যসমূহ, মেক্সিকো, জ্যামাইকা, হাইতি, কিউবা, বাহামা, পানামা, কোস্টারিকা, এল সালভেদর, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের পূর্বাংশ, গায়ানা, সুরিনাম, উরুগুয়ের উত্তরাংশ, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলার উত্তরাংশ, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি মৌসুমি জলবায়ুর অপ্রধান অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব: মৌসুমি জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর দিক বা গতিও পরিবর্তিত হয়। এ জলবায়ু গ্রীষ্মকালে জলভাগ হতে স্থলভাগের দিকে এবং শীতকালে স্থলভাগ হতে জলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। এজন্য গ্রীষ্মকাল বৃষ্টিবহুল এবং শীতকাল প্রায় বৃষ্টিহীন অবস্থায় থাকে। সাধারণত বায়ুর তাপ, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের দ্বারা এ জলবায়ুর-বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হয়।

বায়ুর তাপ: মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক শীতকাল। গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ° সেলসিয়াসের অধিক থাকে। গ্রীষ্মকালে যেখানে বৃষ্টিপাত বেশি সেখানে তাপমাত্রা অধিক বৃদ্ধি পেতে পারে না। কিন্তু যেখানে বৃষ্টিপাত কম সেখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি। শীতকালে তাপমাত্রা গড়ে °থেকে ২২° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তবে গ্রীষ্ম ও শীতকালে গড় উষ্ণতার পার্থক্য প্রায় ৫° সেলসিয়াসের মতো হয়ে থাকে।

বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহ: ঋতুভেদে বায়ুর চাপের তারতম্যের জন্য মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তি হয়। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বায়ুপ্রবাহের গতি ও দিকের পরিবর্তন হয় এবং বায়ুর চাপেরও বৈষম্য হয়। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এর ফলে কর্কটক্রান্তি অঞ্চলের অন্তর্গত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর-পশ্চিম ভারত, মধ্য এশিয়া প্রভৃতি স্থানের স্থলভাগ অতিশয় উত্তপ্ত হয়। ফলে এ সকল স্থানে বায়ুর চাপ কমে যায় এবং একটি সুবৃহৎ নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ গোলার্ধের ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় হতে আগত দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে এশিয়া মহাদেশের নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবলবেগে ছুটে যায়। এ বায়ুকে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের মৌসুমি বায়ু বলে।

নিরক্ষরেখা অতিক্রম করলে ফেরেলের সূত্র অনুসারে দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর গতি বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। এ জন্য গ্রীষ্মের এ মৌসুমি বায়ুকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বলা হয়। শীতকালে সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে মকরক্রান্তি রেখার নিকট অবস্থান করায় সেখানে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এ সময় উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগ অত্যন্ত শীতল হওয়ায় সেখানে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়। ফলে স্থলভাগের উচ্চচাপ অঞ্চল হতে বায়ু দক্ষিণের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। এ বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসে বলে একে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু বলে। স্থলভাগের উপর দিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আসে বলে এ বায়ু শুষ্ক থাকে।

বৃষ্টিপাত : মৌসুমি অঞ্চলের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত গ্রীষ্মকালেই হয়ে থাকে। শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১২৫ থেকে ২০০ সেন্টিমিটার। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগে অধিক উত্তাপের ফলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণে সমুদ্র হতে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু পর্বতে প্রতিহত হয়ে ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

ঋতু: সাধারণত মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে তিনটি ঋতু সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়; যেমন- শীতল ও শুষ্ক শীতকাল, উষ্ণ ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল এবং আর্দ্র বর্ষাকাল। উত্তর গোলার্ধে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল দেখা যায়। সকল ঋতুতেই কম-বেশি বৃষ্টিপাত হয়। তবে বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। মৌসুমি অঞ্চলের বৃষ্টিপাত এল নিনো (EL Nino) ও লা নিনা (La Nina) দ্বারা প্রভাবিত এবং পরিবর্তনশীল।

সারণি-৬.১: মাসভিত্তিক মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত।

মাসের নামতাপমাত্রা (০° সে.)বৃষ্টিপাত (সে.মি.)
জানুয়ারি১৭.৪০১.৮০
ফেব্রুয়ারি২১.২৫২.৯০
মার্চ২৮.১০২.৭০
এপ্রিল৩০.৬৫৩.৫০
মে৩২.৭০৯.৪০
জুন২৯.৭৫২৫.৮০
জুলাই২৯.১০৩৩.৬০
আগস্ট৩১.১০৩১.৯০
সেপ্টেম্বর২৭.৯০১৯.৭০
অক্টোবর২৬.৯৫৮.৮০
নভেম্বর২৬.৯৫৮.৮০
ডিসেম্বর২০.১০০.80
গড় তাপমাত্রা/মোট বৃষ্টিপাত২৬.৪৮১৪২.৩০

উৎস: স্নাতক ব্যবহারিক ভূগোল, দুলাল দাস ও ড. যুধিষ্ঠির হাজরা, কোলকাতা, ২০০৮

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Characteristics of Climate of Bangladesh)

বাংলাদেশের জলবায়ু মোটামুটি উষ্ণ, আর্দ্র ও সমভাবাপন্ন। দেশের মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করায় এবং মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবজনিত কারণে এদেশের জলবায়ু 'ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু' নামে পরিচিত। উষ্ণ গ্রীষ্মকাল, মৃদু ও শুষ্ক শীতকাল, সারা বছর উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট আর্দ্র বর্ষাকাল বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের জলবায়ুর বর্ণনা: মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাব থাকায় এদেশে বছরে চক্রাকারে বিভিন্ন ঋতুর আবির্ভাব হয় এবং প্রত্যেক ঋতুতে জলবায়ুর কিছুটা তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। বার্ষিক বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে বাংলাদেশের জলবায়ুকে প্রধানত তিনটি ঋতুতে ভাগ করা যায়। যদিও আবহমান অবিভক্ত বাংলা ষড়ঋতুর দেশ নামে পরিচিত।

প্রধান ঝতুঃ

ক. শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি)
খ. গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে)
গ. বর্ষাকাল (জুন-অক্টোবর)

ক. শীতকাল: নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে শীতকাল বিরাজ করে। এ সময় সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে থাকায় সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ে এবং উত্তাপের পরিমাণ কমে যায়। তাই শীতকালে এদেশে তাপমাত্রা যথেষ্ট কম থাকে। এ ঋতুতে আবহাওয়া মোটামুটি শুষ্ক, শীতল ও আরামদায়ক থাকে।

শীতকালীন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন উষ্ণতার পরিমাণ যথাক্রমে °  ° সে.। জানুয়ারি মাস শীতলতম মাস। এ মাসের গড় তাপমাত্রা প্রায় .° সে.। এ সময় সমুদ্র উপকূল হতে উত্তর দিকে তাপমাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে।

শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিক হতে আগত শীতল মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে এ সময় বায়ুর সর্বনিম্ন আর্দ্রতা (৩৬%) বিরাজ করে।

শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে বয়ে যায় বলে বাংলাদেশে এ সময় বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। তবে এ বায়ু দেশের পূর্বাঞ্চলের পর্বতসমূহে বাধা পেয়ে সামান্য বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ ছাড়া শীতকালে দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক হতে আগত নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চল ও পূর্বদিকের পার্বত্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থানভেদে ৫-১৫ সে.মি.। এ ঋতুতে সিলেট, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার উত্তর-পূর্বাংশে এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে ১৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে এ সময় মাত্র ৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়।

খ. গ্রীষ্মকাল: মার্চ হতে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল। এ ঋতুতে সূর্যের উত্তরায়ণের দরুন উত্তাপের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ বৃদ্ধির পরিমাণ দক্ষিণ হতে উত্তর দিকে ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে উষ্ণতম ঋতু গ্রীষ্মকাল। এ ঋতুতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৮° সে ও ° সে. মি.। গ্রীষ্মকালের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস এপ্রিল। এ মাসের গড় উষ্ণতা প্রায় ২৮° সে.। এ সময় সামুদ্রিক বায়ুর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ হতে উত্তর দিকে তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে উষ্ণ ও আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। কিন্তু এ সময় পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক হতে শুষ্ক ও শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়। এ দুই বায়ুর সংঘর্ষে এ ঋতুতে প্রায়ই ঝড় ও বৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ঝড়কে কালবৈশাখী ঝড় বলে। এ বঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৮০ কি.মি. হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাত সাধারণত কালবৈশাখী ঝড়ের ফলে সংঘটিত হয়। মার্চ হতে মে মাস পর্যন্ত এ ঝড় প্রায়ই সংঘটিত হয়। গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোর মধ্যে মে মাস সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল। বাংলাদেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রীষ্মকালেই হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৫১ সে.মি.।

গ. বর্ষাকাল: জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে বর্ষাকাল। বর্ষাকালে সূর্য বাংলাদেশের প্রায় মধ্যভাগে লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানে তাপমাত্রা বেশি হবার কথা। কিন্তু এ ঋতুতে অধিক বৃষ্টিপাত হয় বলে তাপমাত্রা খুব বেশি বৃদ্ধি পায় না।
বর্ষাকালীন গড় উষ্ণতা প্রায় ২৭° সে.।

জুন মাসে সূর্য বাংলাদেশের ওপর অবস্থান করায় এ অঞ্চলে বায়ুচাপের পরিবর্তন হয়। এ সময় দেশের উপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এ বায়ু দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর সম্প্রসারণ মাত্র। দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করার পর ফেরেলের সূত্রানুসারে, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুতে পরিণত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বর্ষাকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে বলে এতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। ফলে এ সময় বাংলাদেশে পরিচলন প্রক্রিয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এ ছাড়া জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতগাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, বান্দরবান প্রভৃতি জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ সময় গড় সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যথাক্রমে ১১৯ এবং ৩৪০ সে.মি.।

ঋতু পরিবর্তন এদেশের জলবায়ুকে সমভাবাপন্ন করেছে। বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগত দিক হচ্ছে শুষ্ক ও আরামদায়ক শীতকাল, উষ্ণ গ্রীষ্মকাল এবং উষ্ণ ও আর্দ্র বর্ষাকাল। এ জলবায়ু দ্বারা আমাদের কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রণালি .সরাসরি প্রভাবিত। বাংলাদেশের অপ্রধান তিনটি ঋতু হলো- শরৎ (ভাদ্র-আশ্বিন), হেমন্ত (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) ও বসন্ত (ফাল্গুন-চৈত্র)। মৌসুমি বায়ুর পশ্চাদগমন ও আঘাতজনিত উপকূলীয় ঝড় দ্বারা শরৎকাল, শিশিরের আগমন দ্বারা হেমন্ত এবং গাছে নতুন পাতার আগমন দ্বারা বসন্ত নির্ধারিত হয়।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Practical: Rain Gauge)

বৃষ্টিপাত (Rainfall): মেঘ অধিক শীতল হলে ভাসমান জলকণার কিছু অংশ বরফ কণায় পরিণত হয়। এরপর জলকণা বরফকণার চারদিকে জমে বরফকণার আকৃতি ও ভর বৃদ্ধি করে। পরবর্তীতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে বরফকণাগুলো পৃথিবীর দিকে নেমে আসে। এগুলো পৃথিবীর নিকটবর্তী উচ্চ বায়ুচাপে পৌছে জলবিন্দুতে পরিণত হয়ে বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। এরূপ এক সাথে বহু জলকণার ভূপৃষ্ঠে পতনকে বৃষ্টিপাত বলে।

বৃষ্টিমাপক যন্ত্র (Rain Gauge): যে যন্ত্রের সাহায্যে বৃষ্টির পানি মাপা হয় তাকে বৃষ্টিমাপক যন্ত্র বলে। এ যন্ত্রের
সাহায্যে সহজেই বৃষ্টির পরিমাণ জানা যায়। বৃষ্টিমাপক যন্ত্রে সাধারণত ১২.৫ সেন্টিমিটার ব্যাসযুক্ত একটা বেলনাকার পাত্রের (Cylinder) মুখে একই ব্যাসযুক্ত একটি ফানেল বসানো থাকে। ফানেলটি পাত্রের ভিতরে এমনভাবে বসানো থাকে যে, বৃষ্টির পানি ফানেলের মধ্য দিয়ে এক বিন্দুও নষ্ট না হয়ে বেলনাকার পাত্রের ভেতরে রক্ষিত বোতলের মধ্যে গিয়ে সঞ্চিত হয়। নির্দিষ্ট সময় পরে বোতলটিতে যে পরিমাণ পানি সঞ্চিত হয় তা একটি দাগ কাটা কাঁচের পরিমাপক পাত্রে ঢেলে মাপা হয় এবং তা হতেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়।

ফানেলের মুখের ক্ষেত্রফল যদি বৃষ্টিমাপক যন্ত্রের ক্ষেত্রফলের ৫ গুণ হয়, তা হলে কাচপাত্রে ১২.৫ সেন্টিমিটার পরিমাণ উঁচুতে পানি উঠলে বুঝতে হবে ঐ স্থানে ১২.৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। কোনো কোনো বৃষ্টিমাপক যন্ত্রের বেলনাকার পাত্রের ও ফানেলের ব্যাস ২০.৩২ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। সাধারণত অধিকাংশ বৃষ্টিমাপক যন্ত্রের বেলনাকার পাত্র ও ফানেলের ব্যাস সমান হয়ে থাকে। এ জাতীয় যন্ত্রকে সাইমনের বৃষ্টিমাপক যন্ত্র (Symon's Rain Guage) বলা হয়।

বৃষ্টিমাপক যন্ত্রটি সাধারণত সমতল ভূমিতে ফাঁকা জায়গায় বসাতে হয়। কারণ বৃক্ষ বা কোনো বাড়ি থাকলে পাত্রে স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টির পানি জমতে পারে না। ফানেলের মুখে বৃষ্টির পানি যাতে অন্য কোনো উপায়ে প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য ভূমি হতে ফানেলের মুখটি প্রায় ৩০ মিটার উঁচুতে স্থাপন করা হয়। ভূমিতে গর্ত করে পাকা গাঁথুনি করে যন্ত্রটি বসানো হয়ে থাকে।

বৃষ্টি মাপার প্রক্রিয়া (Process of measuring Rain): বৃষ্টি মাপার জন্য অতি সাবধানে ফানেলটি উঠিয়ে ভিতরের
বোতলটি বের করতে হয়। তারপর দাগ কাটা পরিমাপক পাত্রটি একটি বেসিনের (basin) ভেতর রেখে বোতলের পানি আস্তে আস্তে তার মধ্যে ঢালতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে এক বিন্দু পানিও যাতে নষ্ট না হয়। এছাড়া পরিমাপক পাত্রটি প্রথমেই পরিষ্কার করে নিতে হয়। কারণ অপরিষ্কার থাকলে তার গায়ে দুই এক বিন্দু পানি লেগে থাকতে পারে। পরিমাপক যন্ত্রে পানি ঢালার পর তা বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে খাড়াভাবে ধরে খাঁজ বরাবর রেখে পাঠ নিতে হয়।
সতকর্ততা: বৃষ্টি মাপায় যাতে ভুল না হয় সে জন্য একবার বৃষ্টি মাপার পর ঐ পানি ফেলে না দিয়ে যত্ন করে রেখে দিতে হয় এবং প্রয়োজন হলে তা পুনরায় মেপে ভুল সংশোধন করা যায়।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Thermometer)

বায়ুমণ্ডলের তাপের তীব্রতাকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বলে। বায়ুর গরম বা ঠাণ্ডা অবস্থার মাত্রাই তাপমাত্রা। এই তাপমাত্রা মাপক যন্ত্রের নাম থার্মোমিটার (Thermometer) বা তাপমান যন্ত্র।

তাপমাত্রা নির্ণয় (Determination of Temperature):
তাপমাত্রার পরিমাণ নির্ণয় করার যন্ত্রকে থার্মোমিটার বা তাপমান যন্ত্র বলে। এ যন্ত্রে সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত কাচের নলের একদিকে একটি কুন্ড (Bulb) থাকে। ঐ নল হতে বায়ু বের করে কিছু অংশ পারদ ভর্তি করার পর খোলা মুখ বন্ধ করা হয়। ফুটন্ত পানির বাষ্পে কুণ্ডটি রাখলে পারদ যে পর্যন্ত প্রসারিত হয় তাকে স্ফুটনাঙ্ক (Boiling point) বলে। আবার বরফের গুঁড়ার মধ্যে কুণ্ডটি রাখলে পারদ যে পর্যন্ত সংকুচিত হয় তাকে হিমাঙ্ক (Freezing point) বলে। উভয় দিকে এ দুই পরিমাপে দাগ কাটা হয়। অতঃপর এ দূরত্বকে দুই প্রকারের স্কেলে ভাগ করা হয়।

১. ফারেনহাইট তাপমান যন্ত্র (Fahrenheit Thermometer): এ যন্ত্রে হিমাঙ্ক ° হতে স্ফুটনাঙ্ক ° ধরা
হয়। সুতরাং হিমাঙ্ক হতে স্ফুটনাঙ্ক পর্যন্ত ১৮০° কে ১৮০ ভাগে ভাগ করা হয় এবং এর প্রত্যেক ভাগকে এক ডিগ্রি বলা হয়।

২. সেন্টিগ্রেড তাপমান যন্ত্র (Centigrade Thermometer): সেন্টিগ্রেড থার্মোমিটারের স্কেলে হিমাঙ্ক ° হতে স্ফুটনাঙ্ক ° ধরে ১০০ ভাগে ভাগ করা হয় এবং এর প্রত্যেক ভাগকে এক ডিগ্রি বলা হয়।

গরিষ্ঠ ও লঘিষ্ঠ তাপমান যন্ত্র (Maximum and Minimum Thermometer): এরূপ তাপমান যন্ত্রে লঘিষ্ঠ
(minimum) ও গরিষ্ঠ (maximum) তাপমাত্রা নির্ণয়ের ব্যবস্থা আছে। এর দুইটি বাহু এবং প্রত্যেক বাহুতেই একটি করে কাঁটা (indicator) আছে। এক বাহুর কাঁটার পরিমাপ তাপমাত্রা কমলে আর নিচে নামে না। তখন সেটা দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নির্দেশ করে। অপর বাহুর কাঁটা উত্তাপ কমলে নিচে নামে কিন্তু উত্তাপ বাড়লে আর ওপরে উঠে না। এ কাঁটাটি দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্দেশ করে। বায়ুর তাপমাত্রা সাধারণত সেলসিয়াস তাপমানে (measure) ধরা হয়। প্রতিদিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপকে যোগ করে তাকে ২ দিয়ে ভাগ করলে দৈনিক গড় তাপমাত্রা পাওয়া যায়। কোনো মাসের প্রতিদিনের গড় তাপমাত্রা যোগ করে উক্ত মাসের দিন সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাসিক গড় তাপমাত্রা পাওয়া যায়।
অনুরূপভাবে বছরের ১২ মাসের গড় তাপমাত্রাকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা পাওয়া যায়।
কোনো অঞ্চলের উষ্ণতম ও শীতলতম মাসের গড় উত্তাপকে বিয়োগ করলে উত্তাপের যে পার্থক্য হয় তাকে উষ্ণতার প্রসার (Range of temperature) বলে। সাধারণত জানুয়ারি ও জুলাই মাসের গড় উত্তাপ থেকে উষ্ণতার প্রসার নির্ণয় করা হয়। নিচে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের সারা বছরের তাপের একটি গড় চিত্র দেওয়া হলো।

মাসজা.ফে.মা.এ.মে.জু.জুলা.আ.সে.অ.ন.ডি.মোট

বার্ষিক

গড়

উষ্ণতার প্রসার

উত্তাপ

(°সে.)

১৯.৬২২.০২৭.১৩০.১৩০.৪২৯.৯২৮.৯২৮.৭২৮.৯২৭.৬২৩.৪১৯.৭৩১৬.৩২৬.৩৯.৩

এ থেকে দেখা যায় সেখানকার মোট তাপ হলো ৩১৬.৩° সেলসিয়াস। একে বারো দিয়ে ভাগ করলে বার্ষিক গড় তাপ হার

২৬.৩° সেলসিয়াস। এখানে উষ্ণতার প্রসার হয় .°-.° = .° সেলসিয়াস।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Air Humidity)

বায়ুতে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিকে বায়ুর আর্দ্রতা বলে। যে বায়ুতে জলীয়বাষ্প থাকে না তাকে শুষ্ক (dry) বায়ু বলে। বায়ু নির্দিষ্ট পরিমাণ জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। কিন্তু বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে তার জলীয়বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বায়ু যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, সে পরিমাণ জলীয়বাষ্প বায়ুতে থাকলে বায়ু আর অধিক জলীয়বাষ্প গ্রহণ করতে পারে না। তখন তাকে পরিপৃক্ত বা সম্পৃক্ত বায়ু (saturated air) বলে।

পরিপৃক্ত বায়ু যদি এক স্থানে স্থির হয়ে থাকত তাহলে বাষ্পীভবন বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু এ বায়ু নানা কারণে স্থান পরিবর্তন করে এবং অন্য স্থান হতে শুষ্ক বায়ু এসে তার স্থান দখল করে। শুষ্ক বায়ু জলীয়বাষ্প ধারণ করতে সমর্থ বলে বাষ্পীভবন চলতে থাকে।

আর্দ্রতা নির্ণয়ের যন্ত্র: শুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ডযুক্ত হাইগ্রোমিটার (hygrometer) এর সাহায্যে বায়ুর আর্দ্রতা মাপা হয়। এ যন্ত্রে এক শ্রেণির দু'টি থার্মোমিটার একটি ফ্রেমে পাশাপাশি আটকানো থাকে। একটির প্রান্তে কুন্ড খোলা থাকে এবং অন্যটির প্রান্তে কুণ্ডটি একখণ্ড মসলিন কাপড়ে আবৃত থাকে। মসলিনে আবৃত এ কুণ্ডটি একটি পাত্রে রাখা পানিতে শলতের মতো সংযুক্ত করে ভিজানো করে থাকে।

আর্দ্রতা নির্ণয়: পরীক্ষা করার সময় মসলিন কাপড় এবং পাত্রে রাখা শলতেটাকে পানিতে ভিজানো হয়। পানিসিক্ত বাতাসের মতো কাপড় থেকে পানি যতই বাষ্পে পরিণত হতে থাকে ততই বাতাসের আর্দ্রতা অনুযায়ী থার্মোমিটারের পারদ সূত্রটি নিচে নামতে থাকে এবং পরিশেষে স্থির হয়।

পর্যবেক্ষণ: যদি বায়ুতে জলীয়বাষ্প (আর্দ্রতা) অধিক থাকে তবে থার্মোমিটার দু'টির তাপমাত্রার পার্থক্য সামান্য হয়। পক্ষান্তরে, বায়ুতে যদি জলীয়বাষ্প কম থাকে তাহলে থার্মোমিটারদ্বয়ের তাপমাত্রার পার্থক্য বেশি হয়।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Air Flow)

বায়ুপ্রবাহ: বায়ুর একদিক থেকে অন্যদিকের গতিকে বায়ুপ্রবাহ বলে। বায়ু সর্বদা একস্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। বায়ুর তাপ ও চাপের তারতম্যের কারণেই বায়ু তার স্থান পরিবর্তন করে। ভূপৃষ্ঠের সমান্তরাল অর্থাৎ আনুভূমিকভাবে (Horizontally) বায়ুর এ স্থানান্তরকে বায়ুপ্রবাহ বলে।
বাত পতাকা (Wind vane): বায়ু কখন কোন দিক থেকে প্রবাহিত হয় তা জানার জন্য যে যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয় তাকে বাত
পতাকা বা বাত মোরগ (wind cock) নামে অভিহিত করা হয়। এই যন্ত্রে একটি দন্ড লম্বভাবে থাকে। আর এর মাথায় একটি হালকা তীর বা মোরগ এমনভাবে বসানো থাকে যে সামান্য বাতাসেই এটি স্বাভাবিকভাবে ঘুরতে পারে। যখন যে দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় তীরের ফলকটি তখন ঘুরে সেই দিকে মুখ করে অবস্থান করে। উঁচু জায়গায়, সাধারণত বাড়ির ছাদে, যেখানে বায়ু অবাধে প্রবাহিত হয় সেখানে এই যন্ত্রটি বসানো থাকে। বাত পতাকায় উ. (N), উ. পূ. (N. E), দ. পূ. (S. E), দ. প. (S. W), প. (W), উ. প. (N. W) প্রভৃতি অক্ষর দ্বারা ৮টি প্রধান দিক দেখানো হয়। বাত পতাকার সাহায্যে কম্পাসের ১৬টি দিকের (Point) যতদূর সম্ভব কাছাকাছি হিসাবে বায়ুপ্রবাহের দিক ঠিক করতে হয়।

বায়ুমান যন্ত্র বা অ্যানিমোমিটার (Anemometer)

বায়ু কোন দিক থেকে আসছে তা বাত পতাকা দ্বারা নিরূপণ করা গেলেও বায়ু কখন কীরূপ বেগে প্রবাহিত হয় তা বাত পতাকা দ্বারা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তাকে এ্যানিমোমিটার বলে। এই যন্ত্রে লম্বভাবে দণ্ডায়মান একটি শলাকার মাথায় তিনটি বা চারটি সরু দণ্ডের প্রান্তভাগে বাটি থাকে। ঐ বাটিগুলোর উত্তল (convex) দিক অপেক্ষা অবতল (concave) দিকে বায়ু বেশি বাধা পায়। বায়ুর বেগ কম হলে বাটিগুলো ধীরে ধীরে এবং বেগ বেশি হলে বাটিগুলো দ্রুত ঘুরতে থাকে। উল্লম্ব দণ্ডের পাদদেশে রক্ষিত যন্ত্রের মধ্যে ক্রমবর্ধনশীল বায়ুর বেগ নির্দেশক সংখ্যা দেখতে পাওয়া যায়।

বায়ুর বেগ বেশি হলে বাটিগুলো দ্রুত ঘুরবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঐ যন্ত্রের একের পর এক সংখ্যা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে বেগ নির্দেশ করবে। পক্ষান্তরে, বাটি ধীরে ধীরে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় যন্ত্রের সংখ্যাগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। বায়ুপ্রবাহের দিক ও গতি নিরূপণ করার জন্য থার্মোগ্রাফ (Thermograph), ব্যারোগ্রাফ (Barograph), উইন্ডরোজ (windrose) প্রভৃতি স্বয়ংক্রিয় (automatic) যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সাধারণত আবহ-মানচিত্রে (Weather map) তীর ও পালকের সাহায্যে বায়ুর গতি ও দিক নির্দেশ করা হয়।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Determining Nature of Weather & climate of Any Locality)

কোনো স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ণয় করতে হলে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা পরিমাপ আবশ্যক। বর্ণিত আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান পরিমাপক যন্ত্র বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি উপাদানের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক বার্ষিক গড় মাত্রা নির্ণয় করে। যথাযথভাবে আবহাওয়ার এসব উপাদান পরিমাপ করতে পারলে তা থেকে কোনো স্থানের আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ণয় করা যায়। অর্থাৎ আবহাওয়ার উপাদানগুলোর ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে কোনো স্থানের আবহাওয়ার ধরণ তথা আর্দ্র নাকি শুষ্ক, উষ্ণ নাকি শীতল প্রভৃতি নির্ণয় করা সম্ভব।

কোনো স্থান বৃষ্টিবহুল হলে বছরের অধিকাংশ মাস বা দিন সেখানে বৃষ্টিপাত হবে। স্বাভাবিকভাবে সেখানে তাপমাত্রা তুলনামূলক উষ্ণ হবে, বায়ু আর্দ্র হবে এবং বায়ুপ্রবাহ থাকবে। আবার বৃষ্টিহীন দিন বা মাসগুলোতে বায়ুর আর্দ্রতা কম হবে। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা অধিক বা স্থির বায়ুপ্রবাহ মরুময়তা নির্দেশ করতে পারে। মোট কথা বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ; আবহাওয়ার এ চারটি উপাদানের সমন্বয়ের ভিত্তিতে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন প্রকৃতির জলবায়ু নির্ণয় করা হয়। এটি জলবায়ুর শ্রেণিবিভাজনের সুস্পষ্ট ধারণা ও চারটি উপাদান থেকে কোনো স্থানের জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারণে সাহায্যে করবে। আর আবহাওয়া যেহেতু একটি স্বল্পকালীন অবস্থা তাই এর উপাদানগুলো পরিমাপ করতে পারলে খুব সহজেই উক্ত স্থানের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা যাবে।

উদাহরণ: ময়মনসিংহের 'A' অঞ্চল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা গেল-

জানুয়ারি মাসে গড় তাপমাত্রা: ১৫°C; জানুয়ারি মাসে গড় বৃষ্টিপাত: ০ সেমি.

জুলাই মাসে গড় তাপমাত্রা: ২৯°C; জুলাই মাসে গড় বৃষ্টিপাত: ৩৫ সেমি

জানুয়ারি মাসে বায়ুপ্রবাহ: উত্তর-পূর্বদিক হতে; জানুয়ারি মাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা ১০%

জুলাই মাসে বায়ুপ্রবাহ: দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে; জুলাই মাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫%

উপরের উপাত্ত থেকে আমরা স্পষ্টতই ময়মনসিংহের আবহাওয়ার সার্বিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারব। আর বাংলাদেশের জলবায়ু তথা মৌসুমি জলবায়ু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে আমরা বুঝতে পারব ময়মনসিংহের 'A' অখালে জলবায়ুগত অবস্থার কিছু পরিবর্তন আসছে বা হচ্ছে। জানুয়ারি ও জুলাই মাসের গড় তাপমাত্রার ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণের পার্থক্য মৌসুমি জলবায়ু থেকে কিছুটা চরমভাবাপন্ন অবস্থা নির্দেশ করছে। সার্বিকভাবে জুলাই ও জানুয়ারি মাসের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ, আপেক্ষিক আর্দ্রতা প্রভৃতি আবহাওয়ার উপাদানগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে বলা যায়, বাংলাদেশের এ অঞ্চলের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উষ্ণ, আর্দ্র ও বৃষ্টিসংবলিত গ্রীষ্মকাল এবং, মৃদু শীতল ও শুষ্ক শীতকাল। অর্থাৎ বাংলাদেশে মোটামুটি উষ্ণ, আর্দ্র ও সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজমান।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Interpolation of Isotherm and Isohyte)

মানচিত্রে সমমান রেখা অঙ্কনে ইন্টারপোলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে সমতাপ ও সমবর্ষণ রেখা অঙ্কন পদ্ধতি একই ধরনের। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশের প্রত্যেক আবহাওয়া কেন্দ্রের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পাওয়া গেল। এখন মানচিত্রের নির্দিষ্ট স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ লিখতে হবে। অতঃপর নির্দেশনা অথবা উদ্দেশ্য অনুযায়ী ১০"ব্যবধানে ৬০", ৭০", ৮০", ৯০", ১০০" প্রভৃতি সমবর্ষণ রেখা আঁকতে হবে। আর এই রেখাগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রের মান থেকে নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। যেমন-৬৭.৯" এবং ৭৫.১" বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট স্থানের মধ্য দিয়ে ৭০" সমবর্ষণ রেখা অংকন করতে হবে। এক্ষেত্রে ৬৭.৯" এবং ৭৫.১" বৃষ্টিপাতের স্থানদ্বয়কে সরলরেখা দ্বারা যোগ করে ৭০" রেখার জন্য নির্দিষ্ট বিন্দু নির্ণয় করতে হবে। এভাবে ১০" ব্যবধানে বেশ কয়েকটি সমবর্ষণ রেখা আঁকা যাবে।

সতর্কতা: সমতাপ ও সমবর্ষণ রেখা তথা সমমান রেখা অংকনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে-
১. একটি সমমান রেখা কখনও অপর একটি সমমান রেখাকে স্পর্শ বা ছেদ করবে না।
২. সমমান রেখা মানচিত্রের মাঝখানে শেষ হবে না তবে বেষ্টনীবদ্ধ হতে পারে।
৩. সমমান রেখাগুলোর ব্যবধান প্রকৃত মান হতে স্কেল অনুসারে হবে।

সমতাপ রেখা (Isotherm)

ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে বায়ুর তাপমাত্রার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সমগ্র পৃথিবীতে একই সঙ্গে একই তাপমাত্রা বিরাজ করবে এটা কখনোই সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কারণে বায়ুর তাপের পার্থক্য ঘটে থাকে।
কোনো একটি অঞ্চলে দিনের যেকোনো সময় একই তাপমাত্রা উপস্থিত রয়েছে। ঠিক ঐ একই সময়ে উক্ত এলাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমান তাপ থাকতে পারে। এভাবে কাছাকাছি কয়েকটি এলাকার সমান তাপবিশিষ্ট অঞ্চলকে মানচিত্রে একটি রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়। একে সমতাপ রেখা বলে।

জানুয়ারি মাস বাংলাদেশের সবচেয়ে শীতলতম মাস। । এ মাসের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১৭.৪° সেলসিয়াস। এ সময় দক্ষিণে সমুদ্র উপকূল হতে উত্তর দিকে তাপমাত্রা ক্রমশ কম হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ সময় সমতাপ রেখাগুলো অনেকটা সোজা হয়ে পূর্ব-পশ্চিমে অবস্থান করে। জানুয়ারি মাসের গড় তাপমাত্রা চট্টগ্রামে প্রায় ২০° সে. (° ফা.), নোয়াখালিতে .°

সে. (৬৭° ফা.), ঢাকায় ১৮.৩° সে. (৬৫° ফা.), বগুড়ায় .° সে. (৬৪° ফা) এবং দিনাজপুরে .° (৬২° ফা.)। তবে কোনো সময় উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কম হয়ে থাকে। ৬.১৫ মানচিত্রটি লক্ষ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের কোন কোন জেলায় শীতকালে কেমন তাপমাত্রা থাকে অর্থাৎ সমতাপে কোন কোন জেলা রয়েছে।

বাংলাদেশে বর্ষাকালে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানে অতিরিক্ত তাপ অনুভূত হবার কথা। কিন্তু এ ঋতুতে অধিক বৃষ্টিপাত হয় বলে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে। তবে আবহাওয়া সর্বদা উষ্ণ থাকে। এ সময়কার গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৭°সে. (° ফা.)। এ ঋতুতে উপকূলবর্তী এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পাহাড়িয়া অঞ্চলে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ অঞ্চলে তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পায়। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চলে .°সে. (° ফা.), উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় সর্বত্র

২৭.২০° সে. (° ফা.), কুমিল্লায় .° সে. (৮২° ফা.), কুষ্টিয়া ও পাবনায় .° (°ফা) এবং রাজশাহীতে .°সে. (৮৫° ফা.) তাপ অনুভূত হয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে সমতাপরেখা অনেকটা উত্তর-দক্ষিণে খাড়াভাবে এবং দক্ষিণে উপকূল বরাবর অনেকটা পশ্চিমে বেঁকে অবস্থান করে।

কাজ: বাংলাদেশের মানচিত্র এঁকে তাতে এপ্রিল মাসের এই তথ্যগুলোর সাহায্যে একটি সমতাপ রেখা মানচিত্র অঙ্কন করো করো। কক্সবাজার .°সে.; নারায়ণগঞ্জ .° সে.; শ্রীমঙ্গল .°সে.; ব্রাহ্মণবাড়িয়া .° সে.; যশোর ২৯.৫০° সে

সমবর্ষণ রেখা (Isohyte)

ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কাছাকাছি কয়েকটি এলাকায়। হয় তখন তা যে রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয় তাকে সমবর্ষণ রেখা বলে।

শীতকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে এতে জলীয়বাষ্প থাকে না বললেই চলে। এই বায়ু দেশের পূর্বাঞ্চলের পর্বতসমূহে বাধা পেয়ে সামান্য বৃষ্টিপাত ঘটায়। শীতকালীন বৃষ্টিপাত উপকূল অঞ্চল এবং পূর্বদিকের পার্বত্য অঞ্চলে হয়ে থাকে। এ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থানভেদে ৫ হতে ১৫ সে.মি.। এ ঋতুতে সিলেট, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি জেলার পূর্বাংশে, বান্দরবান জেলার উত্তর-পূর্বাংশে এবং

উপকূলবর্তী অঞ্চলে ১৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়। এ বৃষ্টিপাত দেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে ক্রমশ কম হয়ে থাকে। এ সময় রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে ৫ সে.মি. (২") বৃষ্টিপাত হয়।

কালবৈশাখী ঝড় পূর্বাঞ্চলে সর্বাপেক্ষা বেশি সংঘটিত হয়। এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও অধিক। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ৩৮ সে.মি. (১৫") সমবর্ষণ রেখাটি উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশকে দু'টি অঞ্চলে বিভক্ত করে। এ রেখার পূর্বে ৩৮ (১৫") হতে ৭৫ (৩০'') সে.মি. পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ২৫ (১০'') হতে ৩৮ (১৫") সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোর মধ্যে মে মাস সর্বাপেক্ষা বৃষ্টিবহুল। এখানে গড়ে প্রতি তিন দিনে একদিন বৃষ্টিপাত হয়। বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রীষ্মকালেই হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন গড় বৃষ্টিপাত ৫১ সে.মি. (২০")। অবশ্য কোনো কোনো বছর এর তারতম্য হয়ে থাকে। সিলেট জেলাতেই এ সময় সর্বাপেক্ষা বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭৫ সে.মি. (৩০")-এর অধিক। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে এ সময় ৩৮ সে.মি. (১৫") এর কম বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টিপাত সবচেয়ে কম। এখানে ২৫ সে.মি. (১০") এর কম বৃষ্টিপাত হয়।

বর্ষাকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসে বলে এতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। এ সময় বাংলাদেশের সর্বত্র পানি থাকে। অধিক তাপে এ পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে জলীয়বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ুর সাথে মিলিত হয়। ফলে প্রায় প্রতিদিন পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়। এছাড়া জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বত গাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উত্থিত হয় এবং ঠান্ডা হয়ে ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ কারণে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, বান্দরবান প্রভৃতি জেলার পাহাড়িয়া অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এ সময় দেশের কোথাও ৮০ সে.মি. (৩১") এর কম বৃষ্টিপাত হয় না।

বাংলাদেশের মোট বৃষ্টিপাতের পাঁচ ভাগের চার ভাগ বৃষ্টিপাত বর্ষাকালেই হয়ে থাকে। এ সময়কার গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বনিম্ন ১১৯ সে.মি. (৪৭.৬") এবং সর্বোচ্চ ৩৪০ সে.মি. (১৩৬")। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে বৃষ্টিপাত ক্রমেই বেশি হয়ে থাকে। যেমন- পাবনায় প্রায় ১১৪ সে.মি. (৪৫"), ঢাকায় ১২০ সে.মি. (৪৭.২৪"), কুমিল্লায় ১৪০ সে.মি. (৫৫.১৫"), শ্রীমঙ্গলে ১৮০ সে.মি. (৭") এবং রাঙ্গামাটিতে ১৯০ সে.মি. (৭৪.৫") বৃষ্টিপাত হয়। এরূপ হওয়ার কারণ হচ্ছে প্রধানত জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস পূর্ব দিকের পাহাড়িয়া অঞ্চলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দিক পরিবর্তনের সময় পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত কম চাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এ বাতাস যতই পশ্চিমে যায় ততই আর্দ্রতা কমতে থাকে। কারণ, পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে যাওয়ায় এ বায়ু অনেকটা জলীয়বাষ্পহীন

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Line Graph Using Rainfall Data)

বৃষ্টিপাতের উপাত্ত ব্যবহার করে রেখাচিত্র অঙ্কন করার জন্য কোনো একটি মাসের প্রতিদিনের বৃষ্টিপাত বা বছরের প্রতি মাসের গড় বৃষ্টিপাতের উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। তারপর একটি গ্রাফ পেপারে বা সাদা কাগজের 'X' কলামে দিন বা মাস এবং 'Y' কলামে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেখাতে হবে। নিচে ঢাকা শহরের কোনো এক বছরের প্রতি মাসের গড় বৃষ্টিপাতের উপাত্ত থেকে একটি রেখাচিত্র অঙ্কন করে দেখানো হলো-

মাসগড় বৃষ্টিপাত (সে.মি.)
জানুয়ারি০.৮
ফেব্রুয়ারি৩.২
মার্চ৬.১
এপ্রিল১৩.৭
মে২৪.৫
জুন৩১.৫
জুলাই৩২.৯
আগস্ট৩৩.৭
সেপ্টেম্বর২৪.৮
অক্টোবর১৩.৪
নভেম্বর২.৪
ডিসেম্বর০.৫

বিশ্লেষণ: উপরের লেখচিত্রটি লক্ষ করলে দেখা যায় যে, X অক্ষে মাস এবং Y অক্ষে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেখানো হয়েছে। X অক্ষে উল্লিখিত আগস্ট মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৩৩.৭ সেমি.) এবং ডিসেম্বর মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবচেয়ে কম (০.৫ সে.মি.)। এ কারণে ডিসেম্বর মাসের উপর অঙ্কিত বিন্দুটি সবার নিচে এবং আগস্ট মাসের উপর অঙ্কিত বিন্দুটি সবার উপরে লক্ষণীয়। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল হওয়ায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অন্য মাসগুলো অপেক্ষা বেশি থাকায় মান অনুযায়ী বিন্দুগুলোও উপরের দিকে রয়েছে। অন্যদিকে নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারি এই চার মাস শীতকাল থাকায় মান অনুযায়ী অঙ্কিত বিন্দুগুলো নিচের দিকে অবস্থান করে। কারণ শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল থাকায় বর্ষাকালের তুলনায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম এবং শীতকালের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এসময় বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এর ফলে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের ওপর অঙ্কিত বিন্দুগুলো মান অনুযায়ী পাশাপাশি উচ্চতায় দেখা যাচ্ছে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Variability of Climate)

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই এর পরিবেশে এসেছে নানারূপ পরিবর্তন। কখনও একাধারে বৃষ্টিপাত হয়েছে বহুদিন। বরফে আবৃত হয়েছে পৃথিবীর বিরাট অংশ। আবার কখনও তাপমাত্রার পরিবর্তনে সূচিত হয়েছে আন্তঃবরফ যুগের। ভূমিরূপ বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ুর এই বিরাট পরিবর্তনের ফলেই পৃথিবী পৃষ্ঠের ভূমিরূপগত পরিবর্তন, গঠন ও বৈচিত্র্য সাধিত হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে ভূমিরূপের পরিবর্তন বিষয়টি একটি জটিল বিষয়, তবে সমসাময়িককালের ভূমিরূপ বিজ্ঞানীদের নিকট তা গ্রহণযোগ্য আলোচ্য বিষয়।

বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের দিকগুলো হলো-

১. সময় ও পরিসরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীর ঐতিহাসিকতার প্রেক্ষিতে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে।
২. জলবায়ুর পরিবর্তন প্রক্রিয়া হয়েছিল মূলত মহাজাগতিক, বিশ্বব্যাপী, আঞ্চলিক এবং স্থানিকভাবে।
৩. জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটতে পারে ঋতুগত পার্থক্যের ফলে সৃষ্ট বারিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও জলীয়বাষ্পাকারে উদ্ভিদরাজি থেকে পানি নির্গমনের তারতম্যের কারণে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ (Causes of climatic change)

জলবায়ু গঠনের ক্ষেত্রে জলবায়ু শক্তি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু শক্তি বলতে বিকিরণ, পৃথিবীর কক্ষপথের বিচ্যুতি, পবর্ত গঠন ও মহীসঞ্চারণ এবং গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিবর্তনকে বোঝায়। এই অবস্থাগুলো প্রাথমিক জলবায়ু গঠনকারী নিয়ামকগুলোর কার্যকারিতা ত্বরান্বিত অথবা হ্রাসপ্রাপ্ত করে। মেরু এলাকার বরফাচ্ছাদন ও মহাসাগরগুলো ধীরগতিতে জলবায়ু গঠনকারী শক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে জলবায়ু বহিঃশক্তির দ্বারা প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হতে শত শত বছর বা অধিক সময় নিয়ে থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা মানবীয় কারণসমূহ দায়ী-

১. প্লেট টেকটনিক (Plate tectonic);
২. সৌর শক্তি উৎপাদন (Solar energy output);
৩. কক্ষপথের তারতম্য (Orbital variation)
৪. ক্রমিক ধাক্কা ও আকস্মিক স্থানান্তর (Gradual push and sudden shift)
৫. আগ্নেগিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism)
৬. সামুদ্রিক পরিবর্তনশীলতা (Oceanic variability)
৭. প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ (Unexpected human interference on nature)

প্লেট টেকটনিক (Plate tectonic)

লক্ষ লক্ষ বছর যাবৎ প্লেট গতির তারতম্যজনিত কারণে ভূত্বক ও মহাসাগরের বিন্যাসে পরিবর্তন হয়ে আসছে এবং নতুন ভূপ্রকৃতি সৃষ্টি অথবা বিলুপ্ত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া স্থানীয় এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর ধরন বদলাতেও ভূমিকা রেখে চলছে (Forest, et.al 1999)।

ভূতাত্ত্বিক কালপঞ্জি (Geological Time Scale) অনুযায়ী, প্যানজিয়া মহাদেশে অবিরত মৌসুমি জলবায়ু প্যাটার্ন (megamonsoonal climatic pattern) বিরাজিত ছিল। প্যানজিয়া সুপার মহাদেশেই (super continent) মৌসুমি জলবায়ুর সূত্রপাত (Judith, ১৯৯৩)। পরবর্তীতে প্লেট বিভাজনে তৎকালীন প্যানজিয়া আজ বিভিন্ন অক্ষাংশগত অবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের ধারক।

সৌরশক্তি উৎপাদন (Solar energy output)

বিভিন্ন শতাব্দীতে সৌরতাপের কার্যকারিতার তারতম্য জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। সৌরকলঙ্ক (Sunspot) এবং বেরিলিয়াম আইসোটোপ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা সৌরশক্তির তারতম্য ব্যাখ্যা করে থাকেন। সূর্য পৃথিবীর শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। সৌরজগতের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি তারতম্য বৈশ্বিক জলবায়ুর ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিন থেকে চারশ কোটি বছর আগে সূর্য বর্তমান সময়ে যে তাপ প্রদান করে তার মাত্র ৭০% করত। যদি ঐ সময় বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলোর মিশ্রণ বর্তমানের মতো হতো তাহলে কোনো তরল পদার্থ
থাকত না (Marts 2006, Wastan and Harrison. 2005, Hegemann et.al. 1994) 1

কক্ষপথের পরিবর্তনশীলতা (Orbital variation)

পৃথিবীর কক্ষপথের সামান্য পরিবর্তন বিভিন্ন ঋতুতে সূর্যালোকের তারতম্য নিশ্চিত করে। স্থানিক ও বার্ষিক গড় সূর্যকিরণের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন থাকলেও ভৌগোলিক ও ঋতুগত বণ্টনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পৃথিবীর কক্ষপথের তিন ধরনের পরিবর্তনশীলতা শনাক্ত করা যায়-

১. পৃথিবীর উৎকেন্দ্রিকতার পরিবর্তনশীলতা (Variation in earth's ecentricity)
২. আবর্তনকালীন পৃথিবীর অক্ষের তির্যক কোণ (Tilt angle of earth's axis of rotation) এবং
৩. পৃথিবীর অক্ষের পূর্বগামীতা (Precession of earth's axis)
এই নিয়ামকগুলো একত্রে মিলাঙ্কোভিচ চক্র (Milankovitch cycle- 1920) সৃষ্টি করে, যা জলবায়ুর উপরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ফেলে থাকে। বরফ যুগে ও আন্তঃবরফ যুগে এই চক্রের কার্যকর ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। সাহারা মরুভূমির অগ্রগমন ও পশ্চাদপসরণের ক্ষেত্রেও এই চক্রের ভূমিকা ছিল।

ক্রমিক ধাক্কা ও আকস্মিক স্থানান্তর (Gradual Push and Sudden Shift)

ক্রমিক জলবায়ু পরিবর্তনকে আবহাওয়াবিদগন Gradual push বলে অভিহিত করেন। পরিবর্তনশীল শক্তির ক্রমাগত ক্রিয়ার ফলস্বরূপ হঠাৎ জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ১৯৯৭ সালে এল-নিনোর দীর্ঘস্থায়ীত্বের কারণে আমাজান বেসিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরক্ষীয় অরণ্যে দাবানলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞে বায়ুমণ্ডলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চিত হয় এবং সারা বিশ্বে চরম আবহাওয়া অনুভূত হয়।

কখনো কখনো আকস্মিকভাবে জলবায়ু স্থানান্তর ঘটে থাকে। মহাসাগরীয় স্রোতচক্রের মাধ্যমে শেষ বরফ যুগে উত্তর আটলান্টিকের স্রোতচক্র সারা বিশ্বের জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলেছিল (Calvin.2004)। ১৯৭৬-৭৭ সালে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তীবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের জলবায়ু স্থানান্তর লক্ষ করা যায়-

১৯৫০ সাল থেকে এল-নিনোর স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী হলেও লা-নিনো ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ১৯৫০-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক তাপমাত্রায় তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। যদিও এসময় জীবাশ্ম জ্বালানির (কাঠ কয়লা) ব্যবহার বৃদ্ধিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড ৩১০ থেকে ৩৩২ পিপিএম-এ উন্নীত হয়। ১৯৭৭ সালে আকস্মিকভাবে পৃথিবীর ভূভাগের তাপমাত্রা গড়ে ২০ সে. বেশি রেকর্ড করা হয় (Miller.1994)।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism)

অগ্ন্যুৎপাত হলো ভূগর্ভ থেকে উত্তপ্ত গলিত ছাই, ভস্ম অথবা বায়বীয় পদার্থ ভূপৃষ্ঠে উৎক্ষেপনের প্রক্রিয়া। সরাসরি অগ্ন্যুৎপাত, উষ্ণ প্রস্রবণ বা গেইসার আগ্নেয় কর্মকাণ্ডের উদাহরণ। অগ্ন্যুৎপাত বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ, জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা, ভস্ম ইত্যাদি নিক্ষেপ করে থাকে। অগ্ন্যুৎপাতের সময় নিক্ষিপ্ত পদার্থের প্রায় ৯০% জলীয়বাষ্প। এ কারণে ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতের সময় সন্নিহিত অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। প্রতি শতাব্দীতেই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জলবায়ু ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত গ্যাসীয় পদার্থ ও ভস্মাদি তাপ বিকিরণে বাধার সৃষ্টি করে। ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতে পরবর্তী কয়েক বছর এ অবস্থা বিরাজ করে। ১৯৯১ সালে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফিলিপাইনে অবস্থিত মাউন্ট পিনাটুবো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে জলবায়ুর ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ঐ অগ্ন্যুৎপাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ০.৫° সে. হ্রাসপ্রাপ্ত হয় (Adams.2006)। ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট টামবোরা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর একটি বছর গ্রীষ্মকাল অনুভূত হয়নি (Oppenheimer.2003)। মাঝে মধ্যে আগ্নেয়গিরি অঞ্চলসমূহে সৃষ্ট অগ্ন্যুৎপাত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ হয়ে দ্বাড়ায় (Wignall-2001)।

মহাসাগরে পরিবর্তনশীলতা (Oceanic variability)

মহাসাগরগুলো জলবায়ুর অন্যতম নিয়ন্ত্রক বা মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বল্প মেয়াদি সামুদ্রিক প্রবাহের তারতম্য জলবায়ুর আঞ্চলিক প্রভেদ সৃষ্টি করে, পরিবর্তন ঘটায়। দীর্ঘমেয়াদি তাপজলীয় প্রবাহ এক অক্ষাংশ থেকে আরেক অক্ষাংশে তাপ পরিবহনের কাজ করে থাকে। উষ্ণ স্রোত বরফাচ্ছাদিত উচ্চ অক্ষাংশ বরফমুক্ত রাখে ও বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার শীতল স্রোত নিম্ন অক্ষাংশে শীতলতা আনয়ন করে।

প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ (Unexpected human interference)

মানুষের কার্যকলাপে বর্তমানে বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন সৃষ্টি হচ্ছে। বিগত ও বর্তমান শতাব্দীতে চলমান বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কার্যকলাপ সরাসরি আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাপক পরিসরে সেচকার্য কোনো অঞ্চলের 'বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের হস্তক্ষেপে জলবায়ুর পরিবর্তন প্রসঙ্গে যুক্তি-তর্কের অবতারণা হচ্ছে। বিগত দশকসমূহের তুলনায় বর্তমানে মানুষের কর্মকান্ডে উষ্ণায়নের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে (IPCC.2007)। ফলাফল পর্যবেক্ষণ সৃষ্ট বিতর্কে অবিলম্বে উষ্ণায়ন কমানোর পন্থা নির্ধারণ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজনের (Adaptation) বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানবীয় কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ক্ষতিকর বিষয়গুলো হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড সংযোজন, CFC., মিথেন ও সালফার ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ, ইত্যাদি। উপরিউক্ত বিষয়গুলো পৃথকভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে জলবায়ু, ক্ষুদ্রায়তন জলবায়ু অথবা জলবায়ুর নিয়ামকসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Green House Effect)

'গ্রিন হাউস' বা 'সবুজ ঘর' কথাটি প্রকৃতপক্ষে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শীতপ্রধান দেশে তাপমাত্রার অপ্রতুলতার কারণে কাচ নির্মিত ঘরে সূর্যের তাপ ধরে রেখে সবজি উৎপাদন করা হয়। এক্ষেত্রে মাটিতে প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি এবং উত্তপ্ত মাটি হতে পরিচলন প্রক্রিয়ায় তাপ বাইরে যেতে না পারায় তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে ঘর গরম থাকে। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে 'গ্রিন হাউস' বা 'সবুজ ঘর' প্রতিক্রিয়া বলতে বায়ুমণ্ডলে কিছু সংখ্যক গ্যাসের অতিমাত্রায় বৃদ্ধিজনিত কারণে সৌরতাপের অতিরিক্ত শোষণ ও পরবর্তীতে নিষ্ক্রমণে বাধা প্রদানকে বোঝায়। এই ঘটনার অনিবার্য ফল হিসাবে ভূমণ্ডল অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে স্বাভাবিক জীব ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে, যাকে 'গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া' (Green house effect) বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার সংঘটন প্রক্রিয়া (Process of Green House Effect)

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা বায়ুমণ্ডলের উষ্ণায়ন ঘটায়। সূর্যরশ্মি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায় এবং অবশিষ্টাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস কর্তৃক শোষিত ও পুনরায় বিকিরিত হয়ে বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বর্তমানে বিঘ্নিত হচ্ছে মূলত মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে। বিশেষ করে বর্তমান প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতায় ব্যাপকহারে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো হচ্ছে, কৃষির প্রয়োজনে বন উজাড় করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিণতিতে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যাকে বলা হচ্ছে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া। সুতরাং, গ্রিস হাউস প্রতিক্রিয়া সংঘটনে আমরা নিচের ধাপগুলো উল্লেখ করতে পারি

ধাপ-১: সূর্যরশ্মির বিকিরণ ভূপৃষ্ঠস্থ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে; এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায়।
ধাপ-২: অবশিষ্ট সৌরশক্তি, স্থলভাগ এবং সমুদ্রভাগে শোষিত হয়, পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে।
ধাপ-৩: ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিফলিত দীর্ঘ তাপ রশ্মি মহাশূন্যে ফিরে যায়।
ধাপ-৪:গ্রিন হাউস গ্যাস (যেমন- কার্বন ডাইঅক্সাইড) কিছু তাপশক্তি সংরক্ষণ করে। ভূপৃষ্ঠ উষ্ণ রাখে এবং জীবজগতকে বাঁচিয়ে রাখে।
ধাপ-৫: মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড যেমন- জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড়করণ প্রভৃতি বায়ুতে গ্রিন ** হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে।
ধাপ-৬: অতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ও ভূপৃষ্ঠে অতিরিক্ত তাপ ধরে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটায়; আর এটাই গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া।
সংক্ষেপে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলা যায়, এটা বায়ুমণ্ডলে মানবসৃষ্ট কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অপরাপর কার্বন যৌগের (মিথেন, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, পারফ্লোরোমিথেন ইত্যাদি) আবরণের জন্য অতিরিক্ত উষ্ণায়ন।

সারণি-৬.৩: গ্রিন হাউস গ্যাসের মানবসৃষ্ট উৎসসমূহ:

গ্রিন হাউস গ্যাসমানবসৃষ্ট উৎসসমূহ
কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2)জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ পোড়ানো, সিমেন্ট উৎপাদন, বনভূমি নিধন ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন।
মিথেন  (CH4)গ্যাস, খনিজ তৈল অথবা কয়লা উত্তোলনকালীন নির্গমন, জীবজগতের ধ্বংস অথবা প্রাণী পোড়ানো, আর্দ্রভূমির ধানচাষ, বর্জ্য বা আবর্জনার স্তূপ, জবেহকৃত পশুর অবশিষ্টাংশ পচন।
কার্বন মনোক্সাইড (CO)জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, জীব বা প্রাণী পোড়ানো।
ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC).রেফ্রিজারেটর, এরোসল স্প্রে, ফোম প্যাকেজিং, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি।
মিথেন হাইড্রোকার্বনজ্বালানি থেকে বাষ্পীভবন (তরল অথবা অন্যবিধ জ্বালানি)।
পারফ্লোরো মিথেন (CF4)অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন।
নাইট্রাস অক্সাইড (N2O)সার, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, ক্রান্তীয় নির্বনায়ন ও দাবানল, বনভূমি বা পতিত ভূমির কৃষি ভূমিতে রূপান্তর।
নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ (NOx)জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ পোড়ানো।
সালফার হেক্সা ফ্লোরাইড (SF4)অপরিবাহী ফ্লুইড।

উৎস: Santro, S.C. 2005, শহীদ, ২০১৪

পৃথিবীতে তাপ ও শক্তির মূল উৎস সূর্যের আলো। সূর্যরশ্মি পৃথিবীতে আসে ক্ষুদ্র তরঙ্গের আকারে মূলত দৃশ্যমান স্বচ্ছ আলো হিসেবে। এর সবটাই পৃথিবী শোষণ করে না। ইনফ্রারেড রেডিয়েশনের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ থেকে অতিরিক্ত তাপ মহাশূন্যে ফিরে যায়। বায়ুমণ্ডলে কিছু গ্যাস আছে, যাদের অণু দৃশ্যমান আলোর জন্য স্বচ্ছ এবং তা ভূপৃষ্ঠে পড়তে কোনো বাধা পায় না। কিন্তু এরা ইনফ্রারেড রশ্মি বা অবলোহিত রশ্মি (Infrared ray) শোষণ করে। ফলে বিকিরিত তাপের সবটুকু মহাশূন্যে চলে যাবার বদলে একাংশ আবহাওয়ামণ্ডলে থেকে যায়। কতটা তাপ এভাবে থেকে যাবে তা নির্ভর করে কী পরিমাণ এই ধরনের গ্যাস বায়ুমণ্ডলে রয়েছে তার ওপর।

বায়ুমণ্ডলে এ ধরনের গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে ততই বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখার মতো একটি ঢাকনি সৃষ্টি হবে। এটি গ্রিন হাউসের কাঁচের ঢাকনির মতো কাজ করবে এবং পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টি করবে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Effects of Green House Effect)

বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির ফলে পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থার উপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি মানব স্বাস্থ্য ও শস্যের উপর এটি নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

১. সমুদ্রগর্ভে তলানো: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া চলতে থাকলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫০ থেকে ৪.৫° সেলসিয়াস
পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। ফলে মেরু অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়বে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উপকূলীয় এলাকার এক বিরাট অংশ তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, সিউল, বেইজিং ইত্যাদি শহরের জন্য এটা হয়ে দাঁড়াবে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সার্কভুক্ত দেশ বাংলাদেশ ও মালদ্বীপসহ পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী বিরাট জনপদ ধ্বংসের মুখোমুখি হবে; এ আশঙ্কা আজ আর কল্পনাপ্রসূত নয়। জাপানের বিজ্ঞানীরা এক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন যে, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার দরুন সমুদ্রের পানির উচ্চতা যদি ১ মিটারও বেড়ে যায়, তবে টোকিও শহরের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রের পানির উচ্চতা ১.৫ মিটার বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী বিরাট এলাকা পানির নিচে চলে যাবে, যেখানে বাস করে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের চেয়েও বেশি।

২. আবহাওয়ার পরিবর্তন: বিজ্ঞানীদের ধারণা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমণ্ডল ১০০-১৫০ কিলোমিটার উত্তরে ও দক্ষিণে সরে যাবে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর অর্ধেক এলাকা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি অন্যদিকে সমপরিমাণ এলাকা এর দ্বারা উপকৃত হবে। বর্তমানে খরা কবলিত আফ্রিকা মহাদেশের সুদান, চাঁদ, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা দেশে পরিণত হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তনে উত্তর-পূর্ব চীন শুষ্ক হবে এবং ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া আরও বর্ষাসিক্ত হয়ে উঠবে। শীতপ্রধান দেশ কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় শীত আর তত থাকবে না। এভাবে ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের চেহারাই বদলে যাবে।

৩. শস্যের ক্ষতি: কৃষিজাত ফসল উৎপাদনের জন্য বাতাসে প্রতি ১০ লক্ষ ভাগে ২৮০ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড থাকা প্রয়োজন। এর কম হলে ফসলের ফলন হ্রাস পাবে। আবার এর পরিমাণ ২০ ভাগ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে কোনো কোনো ফসলের গুণগত মান হ্রাস পায়। এতে ধান ও সয়াবিনের মতো যাবতীয় লতাগুল্ম ও শস্যে সালোকসংশ্লেষণ হ্রাস পাবে। এতে শর্করা উৎপাদন কমে যাবে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে যে হারে কার্বন ডাইঅক্সাইড বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৭৫ সালে বাতাসে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রতি ১০ লক্ষ ঘন সেন্টিমিটারে ১০০০ ঘন সেন্টিমিটার। এতে শস্যের পর্যাপ্ত ক্ষতি হবে।

৪. জলজ প্রাণী সম্পদ ধ্বংস: ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পৃথিবীপৃষ্ঠে অতিবেগুনি রশ্মি পতিত হবে। ওজোন ১% হ্রাস
পেলে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব বেড়ে যাবে। এভাবে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব বেড়ে গিয়ে ৫%-এ উন্নীত হলে অণুজীবের জীবনচক্র অর্ধেক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে। পশ্চিম জার্মানির মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডোনার হেবার এর গবেষণায় দেখা গেছে, অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব এরই মধ্যে ৫% ছাড়িয়ে গিয়েছে।

গ্রিন হাউস প্রভাব প্রতিরোধের উপায়: গ্রিন হাউস প্রভাব নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে এর প্রভাব কমানোর জন্য কয়েকটি উপায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো

১। কয়লা, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালে কার্বন ডাইঅক্সাইডের বৃদ্ধি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হবে।
২। সৌর ও বায়ুশুক্তি, জোয়ার ভাটা শক্তি, ভূতাপীয় শক্তির ব্যবহার বাড়ালে গ্রিন হাউস প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হবে।
৩। ইচ্ছামতো বনভূমি ধ্বংস বন্ধ করতে হবে এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বন সৃজন করলে প্রকৃতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের বৃদ্ধি প্রতিহত হবে।
৪। ক্লোরোফ্লুরো কার্বনের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে আইন প্রণয়ন ও তার যতাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এস.ডি.জি (Sustainable Development Goal- SDG) লক্ষ্যমাত্রা সবাই যাতে মেনে চলে, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Global Warming)

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক সভ্যতায় মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়াকে উষ্ণায়ন বলে। মানুষের জীবনযাত্রায় অপরিণামদর্শী কার্যকলাপের অশুভ ফলাফল হিসেবে পরিবেশ, বিশেষ করে জলবায়ু দূষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন- শিল্পকারখানা স্থাপন, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি বিলাস সামগ্রীর ব্যবহার প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার প্রাকৃতিক বিভিন্ন গ্যাস যেমন- কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন গ্যাস ইত্যাদির কারণে বায়ুমণ্ডলের ওপর নেতিবাচক চাপ পড়ছে, যা সরাসরি বিশ্ব উষ্ণায়ন সৃষ্টি করছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ: প্রাকৃতিক বিভিন্ন গ্যাস ও মানবিক কর্মকান্ডের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব (১৭৫০-১৮৫০) শুরু হলে কলকারখানা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন থেকেই বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো হলো কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) (৪৯%), ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) (১৪%), মিথেন (CH1)  (১৮%), নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) (৬%) ও অন্যান্য গ্যাস (CO2) (১৩%)। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার (কয়লা, পেট্রোল ও গ্যাস) ও যথেচ্ছ বন নিধন উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন সংযোজন বাড়াচ্ছে আর বনের শূন্যতা কার্বন অধিগ্রহণ কমাচ্ছে। এছাড়া পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য নিম্নোক্ত কারণগুলোকেই দায়ী করা যায়। যথা:

১. শিল্পায়ন (industrialization); ২. নগরায়ণ (urbanization); ৩. বিলাসসামগ্রীর ব্যবহার (use of luxurious goods); ৪. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার (use of fossil fuels); ৫. সমুদ্রে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপ (nuclear wast released inocean); ৬. যুদ্ধ বিগ্রহ (war); ৭. পারমাণবিক বিস্ফোরণ (nuclear explosion); ৮. বৃক্ষ নিধন (deforestation); ৯. কৃষির আধুনিকীকরণ (modernization of agriculture); ১০. শিল্প বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা; (mismanagement of industrial waste) ১১. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (volcanic eruption); ১২. উদ্ভিদ ও প্রাণির মৃতদেহ (Plants and animals deadbody)।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বর্ণিত কারণগুলি মূলত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ও নাইট্রোজেন যৌগের বৃদ্ধি ঘটিয়ে উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটায়। তন্মধ্যে বৃক্ষ নিধন ও নির্বনায়ন উষ্ণায়নে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে দিনের বেলায় উদ্ভিদকুল সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করত তা কমে যাওয়াতে উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে।
কার্বন ডাইঅক্সাইডের অধিক মাত্রায় উপস্থিতিই বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ। যদিও মিথেন, কার্বন ডাইঅক্সাইডের তুলনায় ২০ গুণ বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করে এবং সিএফসি ২০ হাজার গুণ অধিক তাপ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি নিতান্তই অল্প হওয়াতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের দ্বারাই মূলত উষ্ণায়ন বাড়ছে।

বিজ্ঞানীরা মেরু অঞ্চলের বরফ মুকুট (Ice cap) ও হিমবাহ (Glacier) খনন করে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌছেছেন, বিগত কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে বর্তমান বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ সর্বাধিক।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে অতিমাত্রায় গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা অভিমত ব্যক্ত করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের National Oceanographic & Atmospheric Administration (NOAA) এর মতে, বিগত ১০০ বছরে সামুদ্রিক এবং ভূপৃষ্ঠস্থ তাপমাত্রার তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটেছে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ায় বিগত ১০০ বছরে গড় বায়ুমণ্ডলীয় উত্তাপ ° ফা. বেড়েছে। জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট IPCC (International
Panel on Climate Change) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের হস্তক্ষেপে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন তথা তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষভাবে পর্যবেক্ষিত ঘটনাগুলো হলো বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প, হিমবাহ এবং মেরু হিমমুকুটের গলন, বন্যা ও খরা বৃদ্ধি এবং সমুদ্র তলের উত্থান। প্রাক্কালন অনুযায়ী, ২১০০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রতল ২'-৩' পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব (Effects of Global Warming): বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ভূত্বক যেমন প্রভাবিত হচ্ছে
তেমনি মানুষের জীবন, বাসস্থান অর্থাৎ অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব নিচে আলোচনা করা
হলো-

১. কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, CFC এবং নাইট্রাস অক্সাইড, এসব গ্রিন হাউস গ্যাস আবহাওয়ামণ্ডলের নিচের অংশের তাপ শোষণ করে। এতে করে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ১৮ হাজার বছর আগে সর্বশেষ বরফ যুগের শেষ ভাগ থেকে আজ অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে ২° সেলসিয়াস। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এই বৃদ্ধির হার বেড়ে যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান হার বজায় থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর উষ্ণতা ° থেকে ° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে।

কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব উষ্ণায়নে প্রভাব পড়ছে। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে যেখানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২৮০ থেকে ২৯০ পিপিএম, বর্তমানে তা ৩৫০ পিপিএম এবং ২০৫০ সালে তা দাঁড়াবে ৫০০ থেকে ৭০০ পিপিএম (পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে শ্লথ করতে হলে ২০৭৫ সাল নাগাদ বাতাসে সর্বোচ্চ ৪৬৩ পিপিএম কার্বন ডাইঅক্সাইড সহনীয়)। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে বছরে বর্তমানে ৫ বিলয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড যোগ হয়। ১৯৫০ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ ছিল ২ বিলিয়ন মেট্রিক টনের কম। বর্তমান হারে চলতে থাকলে কার্বন ডাইঅক্সাইড পরবর্তী দু'দশকে বর্তমানের ৮০% বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রাকৃতিক কারণে যোগ হয় ০.৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। বন ধ্বংস ও মাটির বিয়োজনে আরও ২ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে যোগ হয়। বছরে মানুষ সৃষ্ট মোট এই ৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইডের ৫০% সাগর-মহাসাগর শুষে নেয়, বাকি বিরাট অংশ রয়ে যায় বায়ুমণ্ডলে। ১৯৫৮ সাল থেকে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের অনুপাত বেড়ে গেছে ২৫ ভাগ। এই হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী এক শতকের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। ফলে এই একটি গ্যাসই পৃথিবীকে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত করে দিতে পারে।

২. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের পর্বতমালাগুলোর বরফ গলে যাচ্ছে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নদী ও সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গা নদীর উৎসস্থল গাঙ্গোত্রীসহ হিমালয়ের অনেকগুলি হিমবাহের দৈর্ঘ্য ইতোমধ্যে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
৩. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মানুষ ও প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
৪. CFC গ্যাসের কারণে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্রমশ পাতলা হয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও ছিদ্রের (Ozone hole) সৃষ্টি করেছে। ফলে এই ছিদ্র দিয়ে সূর্য ও মহাকাশ হতে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ও কসমিক কণা সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসছে।
৫. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মানুষসহ অন্যান্য জীবের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধের উপায় (Prevention of Global Warming)
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা হলো-
i. উন্নত দেশগুলোকে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে।
ii. উন্নয়নশীল দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ সীমিত রেখে শিল্পোন্নতির জন্য প্রযুক্তি স্থাপন করতে হবে।
iii. বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে।
iv. CFC-র সস্তা বিকল্প আবিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে CFC ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
V. বৃক্ষরোপণ অভিযান সফল ও নতুন বনভূমি সৃষ্টি করতে হবে।
vi. জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প আবিষ্কার করতে হবে।
vii. পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন ও পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
viii. সর্বোপরি বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রতিরোধে সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Climate Change: Bangladesh Perspective)

বাংলাদেশের জলবায়ু প্রায় সমভাবাপন্ন। এখানে শীতকাল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ক্রান্তীয় অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় ঋতুভিত্তিক জলবায়ুর বৈচিত্র্য থাকলেও সার্বিক জলবায়ুর তেমন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। তবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের জলবায়ুর যে পরিবর্তন হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ থেকে ১৮ হাজার বছর পূর্বে বর্তমান বাংলাদেশসহ সংলগ্ন এলাকার জলবায়ু ছিল শুষ্ক মহাদেশীয় (dry continental)। তারপর বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তন ধারায় পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে উষ্ণ আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ুতে রূপান্তরিত হয়েছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের জলবায়ুতে কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ দেশে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। ভূবিদরা দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে মরুময়তার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে যদি মরু বিস্তার ঘটে তাহলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে মরু এলাকার ভূমিরূপ (land form) সৃষ্টি হবে।

মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন সম্পদ ব্যবহারের কারণে মাত্রাতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস অর্থাৎ কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) প্রভৃতি গ্যাস নির্গমনের ফলে বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে তাতে বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। আর এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। অন্যান্য দেশ এ ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার আগেই বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে এর মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘ তার সতর্কীকরণে বলেছে, পরবর্তী ৫০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩ ফুট বাড়লে তাতে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী একটি অংশ প্লাবিত হবে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে চলে যাবে। আনুমানিক ৩ কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC) এর তথ্য অনুসারে, ২০৩০ সালের পর নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। ফলে এশিয়ায় পানির স্বল্পতা দেখা দেবে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে ঘন ঘন বন্যা, ঝড়, অনাবৃষ্টি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, যা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে অনুভূত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- মরুকরণ, বন্যা, ঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কৃষিক্ষেত্রে অধিকতর অনিশ্চয়তা। এগুলোর মধ্যে মরুকরণ ও কৃষিক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ ততটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে বন্যায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম, ঝড়ে দ্বিতীয় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে দশম। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ।

জলবায়ু অঞ্চলবিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী সমরূপী একই বৈশিষ্ট্যের জলবায়ু পরিলক্ষিত হলে তা জলবায়ু অঞ্চল গঠন করে। ভৌগোলিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে পৃথিবীর তিনটি প্রধান জলবায়ু অঞ্চল হলো- নিরক্ষীয়, ভূমধ্যসাগরীয় ও মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল।
বাংলাদেশের জলবায়ুবাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। এ দেশের জলবায়ু মোটামোটি আর্দ্র, উষ্ণ ও সমভাবাপন্ন। বাংলাদেশের জলবায়ুকে গ্রীষ্মকাল, শীতকাল ও বর্ষাকাল এই তিন ঋতুতে ভাগ করে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়। গ্রীষ্মকালে কালবৈশাখী নামে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ দেখা দেয়। শীতকালে তাপমাত্রা খুবই কম থাকে। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের কোথাও কোথাও বন্যাও দেখা দেয়।
বৃষ্টিমাপক যন্ত্রযে যন্ত্রের সাহায্যে বৃষ্টির পানি মাপা হয় তাকে বৃষ্টিমাপক যন্ত্র বলে। এ যন্ত্রের সাহায্যে সহজেই বৃষ্টির পরিমাণ জানা যায়।
তাপমান যন্ত্রবায়ুমণ্ডলের তাপের তীব্রতাকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বলে। বায়ুর গরম বা ঠান্ডা অবস্থার মাত্রাই তাপমাত্রা। এই তাপমাত্রা মাপক যন্ত্রের নাম থার্মোমিটার (Thermometer) বা তাপমান যন্ত্র।
হাইগ্রোমিটারশুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ডযুক্ত হাইগ্রোমিটার (hygrometer) এর সাহায্যে বায়ুর আর্দ্রতা মাপা হয়। এ যন্ত্রে এক শ্রেণির দু'টি থার্মোমিটার একটি ফ্রেমে পাশাপাশি আটকানো থাকে। একটির প্রান্তে কুন্ড খোলা থাকে এবং অন্যটির প্রান্তে কুণ্ডটি একখণ্ড মসলিন কাপড়ে আবৃত থাকে। মসলিনে আবৃত এ কুণ্ডটি একটি পাত্রে রাখা পানিতে শলতের মতো সংযুক্ত করে ভিজানো করে থাকে।
এ্যানিমোমিটারবায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তাকে এ্যানিমোমিটার বলে। এই যন্ত্রে লম্বভাবে দণ্ডায়মান একটি শলাকার মাথায় তিনটি বা চারটি সরু দণ্ডের প্রান্তভাগে বাটি থাকে।
সমতাপ রেখাভূপৃষ্ঠের একই তাপমাত্রাবিশিষ্ট অঞ্চলকে মানচিত্রে যখন একটি রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয় তখন তাকে সমতাপ রেখা বলে।
সমবর্ষণ রেখাবৃষ্টিপাতের ভিন্নতা থাকলেও একই বা সমপরিমাণ বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চল রেখা দ্বারা যুক্ত করে মানচিত্রে উপস্থাপন করা হয়- একে সমবর্ষণ রেখা বলে।
জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতাজলবায়ুর পরিবর্তন সর্বদাই বারিপাত ও তাপমাত্রার তারতম্যের পারস্পরিক জটিল ক্রিয়ায় সংঘটিত হয়। বারিপাতের ফলে আর্দ্র মরুতে ভূমিরূপগত পরিবর্তন বেশি হয়। তাপমাত্রার পরিবর্তনে পৃথিবীপৃষ্ঠের ভূমিরূপে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণের মধ্যে প্লেটের গতি, সৌর শক্তির উৎপাদন, কক্ষপথের পরিবর্তন, অগ্ন্যুৎপাত, সামুদ্রিক পরিবর্তনশীলতা, প্রকৃতির উপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রভৃতি অনেকাংশেই দায়ী।
গ্রিন হাউসশীতপ্রধান দেশে যেখানে সাধারণ তাপ ও আলোতে সবুজ উদ্ভিদ জন্মানো সম্ভব নয় সেখানে এক বিশেষ ধরনের কাঁচের ঘরে উদ্ভিদ জন্মানো হয়; একে গ্রিন হাউস বলে। প্রতিনিয়ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গ্রিণ হাউস

প্রতিক্রিয়া

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা ভূপৃষ্ঠের উষ্ণায়ন ঘটায়। সূর্যরশ্মি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায় এবং অবশিষ্টাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস কর্তৃক শোষিত ও। পুনরায় বিকিরিত হয়ে বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সমস্যাসংকুল হয়ে উঠেছে মূলত মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের ফলে। বিশেষ করে বর্তমান প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতায় ব্যাপকহারে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো হচ্ছে, কৃষির প্রয়োজনে বন উজাড় করা হচ্ছে। ফলে বিশ্ব গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বায়ুতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিণতিতে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যাকে বলা হচ্ছে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান সভ্যতায় মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন- শিল্পকারখানা স্থাপন, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যবহার, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি বিলাস সামগ্রীর ব্যবহার প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফুরা কার্বন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...