ভূমিকম্প (পাঠ-৩)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Earthquake)

ভূত্বক পরিবর্তনকারী প্রক্রিয়াসমূহ প্রতিনিয়ত ক্রিয়াশীল। বৈচিত্র্যময় ভূপৃষ্ঠের আকস্মিক বা দ্রুত পরিবর্তনকারী শক্তিগুলোর মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। ভূঅভ্যন্তরের বা ভূপৃষ্ঠে ক্রিয়াশীল শক্তিসমূহের কারণে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। ভূমিকম্প স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন আনে, যার ফলে জানমালে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কোনো ধরনের পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।

"An Earthquake is a sudden tremor or movement of the earth's crust, which originates naturally at or below the surface." (coursehero.com)অর্থাৎ ভূমিকম্প হলো ভূত্বকের হঠাৎ কম্পন বা সঞ্চালন যা' প্রাকৃতিকভাবে ভূপৃষ্ঠে বা তার তলদেশে সংঘটিত হয়।

ভূমিকম্পের কারণ: নিম্নলিখিত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক কারণসমূহের জন্য ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।

প্রাকৃতিক কারণ: ভূমিকম্পের কারণ অনুসন্ধানকালে ভূবিদগণ লক্ষ করেন পৃথিবীর কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলে অধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তাদের মতে, নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা, ভূগঠন প্লেটসমূহের সীমান্ত অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। তারা ভূমিকম্পের যে কারণসমূহ সনাক্ত করেছেন সেগুলো হচ্ছে-

i. প্লেটগতির তারতম্যের ফলে ভূত্বকে যে ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয় তা ভূকম্পন ঘটিয়ে থাকে। প্লেটের পার্শ্বীয় সম্প্রসারণ অথবা সংকোচন গতি ভূমিকম্পের প্রধান কারণ।

ii. ভূঅভ্যন্তরে বা ভূত্বকের নিচে ম্যাগমার সঞ্চারণ অথবা চ্যুতিরেখা বরাবর চাপমুক্ত হওয়ার কারণে ভূকম্পন হয়ে থাকে।

iii. প্লেটের পার্শ্বীয় গতির কারণে ভূগর্ভে শিলাচ্যুতি ঘটে থাকে। এ স্থানচ্যুত শিলা নিচের স্থিতিস্থাপক শিলায় ধাক্কা খেয়ে ভূত্বকের নিচে ফিরে এসে প্রচণ্ড আঘাত করে যা স্থিতিস্থাপক প্রতিক্ষেপন নামে পরিচিত। পৃথিবীর বড় বড় ভূমিকম্প ঐ প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়। এ প্রকার ভূমিকম্পে ভূত্বক নতুন অবস্থা পরিগ্রহ করে।

iv. ভূঅভ্যন্তরে স্থানচ্যুত শিলাসমূহের সংঘর্ষের ফলে ভূত্বকে ধাক্কা লেগে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

v. প্লেট সীমানা বরাবর মহাসাগরের জলরাশি অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করলে প্রচন্ড উত্তাপে ঐ বিপুল জলরাশি বাষ্পে পরিণত হয়ে ভূত্বকের নিচে সজোরে আঘাত করে। এ প্রক্রিয়ায় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্প একইসঙ্গে সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান কারণ। এ অগ্ন্যুৎপাতের সময় সন্নিহিত এলাকায় অনিবার্যভাবেই প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয় এবং ভূত্বকে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগ্নেগিরির অগ্ন্যুৎপাত ও তৎসহ ভূমিকম্পের কারণে ইন্দোনেশিয়ার ক্লাকাতোয়া দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়।

vi. উত্তপ্ত পৃথিবী ক্রমশ তাপ বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ভূপৃষ্ঠ যথেষ্ট শীতল হলেও ভূত্বকের উত্তপ্ত নিম্নস্তর এখনও তাপ বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হয়ে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে উভয় স্তরের মধ্যে আয়তনগত সমতা বিনষ্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

vii. ভূঅভ্যন্তরে অধিক তাপে গলিত পদার্থ অথবা প্রবিষ্ট পানির পরিচলন স্রোতের তারতম্যের প্রভাবে ভূত্বক কেঁপে ওঠে।

অপ্রাকৃতিক কারণ: মানুষের নানা ধরনের কর্মকান্ড কিছু ক্ষেত্রে ভূকম্পনের জন্য দায়ী। যেমন-

i. খনি অঞ্চলে খননকার্যের ফলে যে খালি জায়গার সৃষ্টি হয় তথায় দুর্ঘটনাবশত কখনও কখনও ভূমি ধসে পড়ে। ফলে নিকটবর্তী কিছু দূর পর্যন্ত ভূমিকম্প হয়।
ii. ভূগর্ভে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে এর প্রভাবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
iii. ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও মাঝে মাঝে বিস্ফোরণের মাধ্যমে মৃদু ভূমিকম্প ঘটে থাকে।
iv. জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে অবাধে বন উজাড় হচ্ছে এবং মৃত্তিকা ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, মানব বসতি কিংবা নগরায়ণের কারণে অবাধে পাহাড় কাটার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরের চাপ হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘদিন এ ধরনের প্রক্রিয়া চলার কারণে ভূত্বকের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে ভূমিকম্প হতে পারে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...