(Concial Projections)
ভূগোলকের উপর মোচাকৃতির (cone shaped) কাগজ বা এ জাতীয় কোনো বস্তু বসিয়ে গোলকের কেন্দ্র থেকে আলোক বিচ্ছুরণ করলে গোলকপৃষ্ঠের অক্ষ ও দ্রাঘিমারেখাগুলো দেখা যায়। এ অবস্থায় চিত্র অংকন করলে মোচাকৃতি বা শাঙ্কব অভিক্ষেপ পাওয়া যায়।
অঙ্কন পদ্ধতির পার্থক্য অনুসারে শাঙ্কব অভিক্ষেপগুলোকে নিম্নলিখিত ৬ ভাগে ভাগ করা হয়।
১. সরল শাঙ্কব অভিক্ষেপ (এক পরিমিত অক্ষরেখা)
২. সরল শাঙ্কব অভিক্ষেপ (দুই পরিমিত অক্ষরেখা)
৩. ছেদক শাঙ্কব অভিক্ষেপ
৪. বোনের শাঙ্কব অভিক্ষেপ
৫. বহু শাঙ্কব অভিক্ষেপ ও
৬. আন্তর্জাতিক অভিক্ষেপ।
১. সরল শাঙ্কব অভিক্ষেপ (এক পরিমিত অক্ষরেখা) (Simple Conical Projection with one standard parallel): কেবল একটি পরিমিত (Standard) অক্ষরেখার সাহায্যে এই অভিক্ষেপটি অঙ্কন করা হয় বলে একে সরল শাঙ্কব অভিক্ষেপ বলা হয়।
গুণাবলি (Properties):
i. অক্ষরেখাগুলো সমকেন্দ্রীয় বৃত্তচাপ;
ii. দ্রাঘিমারেখাগুলো সরলরেখা;
iii. কেবল পরিমিত (Standard) অক্ষরেখায় দূরত্বের স্কেল নির্ভুল;
iv. পরিমিত অক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে স্বল্প পরিসর স্থানের আকৃতি সঠিক। কিন্তু পরিমিত অক্ষরেখা থেকে দূরবর্তী স্থানের পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃতির বিকৃতি (distortion) লক্ষণীয়। এর ফলে স্থানটির আয়তন সঠিক হয় না।
ব্যবহার (Use): পরিমিত অক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে স্বল্প পরিসর স্থানের আয়তন নির্ভুল বলে এই অভিক্ষেপ পূর্ব-পশ্চিমে অধিক এবং উত্তর-দক্ষিণে স্বল্প বিস্তৃত দেশগুলোর (চীন) মানচিত্র অঙ্কনে ব্যবহৃত হয়। পরিমিত অক্ষরেখা হতে দূরবর্তী স্থানের আকৃতি বিকৃত হয় বলে উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলো অঙ্কন করার জন্য এই অভিক্ষেপ উপযোগী নয়।
২. সরল শাঙ্কব অভিক্ষেপ (দুই পরিমিত অক্ষরেখা) (Simple Conical Projection with two standard parallels): এক্ষেত্রে দুটি পরিমিত (Standard) অক্ষরেখার সাহায্যে অভিক্ষেপ আঁকা হয়।

গুণাবলি (Properties):
i. অক্ষরেখাগুলো সমকেন্দ্রিক বৃত্তচাপ;
ii. কেবল পরিমিত অক্ষরেখাদ্বয়ে স্কেল সঠিক থাকে;
iii. পরিমিত অক্ষরেখাদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে প্রকৃত দূরত্ব অপেক্ষা কম এবং বহির্ভাগে অধিক দূরত্ব বিদ্যমান;
iv. দ্রাঘিমাগুলো সরলরেখা হিসেবে অঙ্কিত এবং এরা একত্রে কেন্দ্র বিন্দু থেকে বিচ্ছুরিত;
v. মূল দ্রাঘিমায় দূরত্বের স্কেল নির্ভুলরূপে দেখানো হয় এবং সকল দ্রাঘিমাই মধ্য দ্রাঘিমার অনুরূপ হওয়ায় এদের দূরত্বের স্কেলও সঠিক;
vi. এই অভিক্ষেপ সম আয়তনিক (equal area) নয়।
ব্যবহার (Use): পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মধ্য অক্ষাংশের দেশগুলোর মানচিত্র অঙ্কন করার জন্য এই অভিক্ষেপ উপযুক্ত। কানাডা, রাশিয়া প্রভৃতি বৃহৎ দেশগুলো এই অভিক্ষেপে সুন্দররূপে অঙ্কন করা যায়। অনেক সময় ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার ন্যায় মহাদেশ অঙ্কন করার জন্য এই অভিক্ষেপ ব্যবহৃত হয়।
৩. ছেদক শাঙ্কব অভিক্ষেপ (Secant Conical Projection): বৃত্তের ছেদক একটি সরলরেখা। এটা বৃত্তের পরিধিকে দুইটি বিন্দুতে ছেদ করে। এ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে এ ধরনের অভিক্ষেপ অঙ্কন করা হয়। প্রকৃত ছেদক শাঙ্কব অভিক্ষেপের জন্য দুটি পরিমিত অক্ষরেখার মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে এদের মধ্যবর্তী ছেদক দূরত্বের সমান।
ব্যবহার: পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের জরিপ বিভাগ ১" = ৩২', ৫০', ৬৪', ১২৫' প্রভৃতি ক্ষুদ্র স্কেলবিশিষ্ট মানচিত্র অঙ্কনের জন্য ছেদক শাঙ্কব অভিক্ষেপ ব্যবহার করে (রউফ ও মাহমুদ, ২০১০)।
৪. বোনের শাঙ্কব অভিক্ষেপ (Bonne's Projection): Rigobert Bonne নামক জনৈক ফরাসি মানচিত্র অঙ্কন বিশারদ (cartographer) এই অভিক্ষেপের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন যা এক পরিমিত অক্ষরেখা বিশিষ্ট - শাঙ্কব অভিক্ষেপের সংশোধিত রূপ। এক্ষেত্রে যে দেশের মানচিত্র অঙ্কন করতে হবে তার মধ্যরেখাকে নির্দিষ্ট পরিমিত অক্ষরেখা হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

গুণাবলি (Properties):
i. অক্ষরেখাগুলো সাবলীল এককেন্দ্রিক বৃত্তচাপ;
ii. দ্রাঘিমারেখাগুলো সাবলীল বৃত্তচাপ;
iii. সব অক্ষরেখায় স্কেল নির্ভুল;
iv. মূল মধ্য দ্রাঘিমার স্কেল নির্ভুল; সব দ্রাঘিমায়ও স্কেল নির্ভুল
v. এ অভিক্ষেপে কোনো দেশের আয়তন নির্ভুলরূপে পাওয়া গেলেও দ্রাঘিমার বক্রতার ফলে এর আকৃতি (shape) বিকৃত হয়।
ব্যবহার (Use): আয়তন নির্ভুলরূপে দেখানো সম্ভব বলে রাশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার ন্যায় বৃহৎ দেশ বা মহাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করার জন্য এ অভিক্ষেপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ অভিক্ষেপে এশিয়া মহাদেশকে ভালোভাবে দেখানো যায় না (রউফ ও মাহমুদ, ২০১০)।
৫. বহু শাঙ্কব অভিক্ষেপ (Polyconic Projection): Prof. Ferdinand Hassler মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলভাগ অঙ্কন করার জন্য সর্বপ্রথম এ অভিক্ষেপ ব্যবহার করেন। এ অভিক্ষেপটি অঙ্কন করার জন্য কল্পনা করা হয় যে, কতিপয় শাঙ্কু (cone) একটি গোলকের উপর স্থাপন করা হয়েছে। শঙ্কুগুলোর প্রত্যেকটি গোলকের কোনো না কোনো অক্ষরেখায় স্পর্শক (Tangent) সৃষ্টি করে। সুতরাং এ অক্ষরেখাগুলোর প্রত্যেকটি পরিমিত (standard) অক্ষরেখা, যাদের নিজস্ব কেন্দ্র ও ব্যাসার্ধ বর্তমান।
গুণাবলি (Properties):
i. অক্ষরেখাগুলো বৃত্তের ব্যাস হলেও সমকেন্দ্রিক নয়;
ii. দ্রাঘিমাগুলো সাবলীল বক্ররেখা;
iii. প্রত্যেকটি অক্ষই পরিমিত অক্ষরেখা;
iv. কেবল মধ্যদ্রাঘিমায় উত্তর-দক্ষিণে দূরত্ব নির্ভুলরূপে দেখানো যায়;
V. এটি সম আয়তনিক (caual area) নয়;
ব্যবহার (Use): মধ্য দ্রাঘিমা থেকে ক্রমে স্কেলের ত্রুটি বৃদ্ধি পায় বলে এ অভিক্ষেপটি বৃহৎ আকৃতির দেশ অঙ্কন করার জন্য উপযুক্ত নয়। এ অভিক্ষেপে মধ্য অক্ষাংশের নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলীয় স্থানগুলোকে নগুলোকে (আমেরিকা) সন্তোষজনক ভাবে দেখানো যায়।
৬. আন্তর্জাতিক অভিক্ষেপ (International Projection): সম্পন্ন এই অভিক্ষেপ বহু শাঙ্কব (polyconic) অভিক্ষেপের সামান্য পরিবর্তিত রূপ হিসেবে অঙ্কন করা হয়েছে। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক মানচিত্র কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথিবীর স্থানীয় বৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রের জন্য এই অভিক্ষেপ উপস্থাপিত হয়। ১: ১,০০০,০০০ স্কেলে অঙ্কন করা হয় বলে একে মিলিয়নে একটি (One in a million) মানচিত্র নামে অভিহিত করা হয়।
গুণাবলি (Properties)
i. বিশ্বব্যাপী সকল স্থানের সাধারণ তালিকা তৈরি করে এ অভিক্ষেপ অঙ্কন করা হয়;
ii. দ্রাঘিমাগুলো সরলরেখারূপে অঙ্কন করায় পার্শ্ববর্তী মানচিত্রগুলো (পাশাপাশি অবস্থিত এলাকার মানচিত্র) সঠিক ভাবে যোগ করা সহজসাধ্য।
মানচিত্র অভিক্ষেপ- মোহা: আনিছুর রহমান ও মোঃ আব্দুর রাজ্জাক-স্যারে লেখা বই
Read more