(Seas of the World)
সাগর মহাসমুদ্রের অংশ। মহাসমুদ্র হচ্ছে বিশাল লোনা পানির অঞ্চল যা এক মহাদেশের প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকে অন্য মহাদেশের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত গভীর পানির খাত। একটি মহাসাগরে অনেকগুলো সাগর, উপসাগর, অনেক দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ (জাপান) থাকতে পারে। সাগর হচ্ছে মহাদেশের উপকূলভাগে মহাসাগরের প্রান্তে অবস্থিত জলভাগ যা প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি দ্বারা মহাসাগর থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন। যেমন- এশিয়ার মূল ভূভাগ দ্বারা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিচ্ছিন্ন জাপান সাগর বা পূর্ব সাগর। বিভিন্ন সাগরের মধ্যে গভীরতা, আকৃতি ও আয়তনের দিক থেকে ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে। এশিয়ার পূর্ব উপকূলে অনেকগুলো সাগর আছে। যেমন-দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর, জাপান সাগর, ওখটস্ক সাগর, বেরিং সাগর প্রভৃতি। মহাসাগরের প্রান্তে ও মহাদেশের উপকূলে অবস্থিত বিধায় এগুলোকে প্রান্তীয় সাগর (Marginal sea) বলে। যে সকল সাগর মহাদেশের ভূভাগ দ্বারা প্রায় আবদ্ধ ও মহাসাগরের সাথে অগভীর প্রণালি দ্বারা যুক্ত সেগুলোকে ভূমধ্যসাগর বলে (Mediterranean sea)। এগুলোর মধ্যে ভূমধ্যসাগর (ইউরোপ ও আফ্রিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত), আর্কটিক

সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, কৃষ্ণসাগর, বালটিক সাগর প্রভৃতি প্রধান। অধিকাংশ সাগরের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য থাকে, যেমন (১) উন্মুক্ত সাগরের সাথে সীমিত যোগাযোগ, (২) পার্শ্ববর্তী মহাদেশের প্রভাব, যেমন- শুষ্ক শীতল বায়ু বা অতিরিক্ত নদীবাহিত পানির প্রবাহ ইত্যাদি, (৩) অতিরিক্ত বাষ্পীভবন অথবা অধিক বারিপাত।
সাগরের সীমানা নির্ধারিত হয় সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে স্থলভাগের অবস্থান, দ্বীপ বা উপদ্বীপের অবস্থানের দ্বারা বা নিমজ্জিত দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জের দ্বারা। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা কখনও কখনও কাল্পনিক রেখার দ্বারা এক সাগর অঞ্চল থেকে অন্য সাগর অঞ্চলকে বিভক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের উত্তর এবং পশ্চিম সীমা ভূভাগ দ্বারা বেষ্টিত, পূর্ব দিকে আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ দিকে উন্মুক্ত ভারত মহাসাগর। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো কর্তৃক নির্ধারিত একটি কাল্পনিক রেখার দ্বারা। এই রেখা শ্রীলঙ্কার সর্ব দক্ষিণ বিন্দুকে সুমাত্রার সর্ব উত্তর বিন্দুতে যোগ করে বঙ্গোপসাগরকে ভারত মহাসাগর থেকে পৃথক করেছে। তাছাড়া, সমুদ্রের স্রোত, সমুদ্রের পানির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ওপর (যেমন- লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, অক্সিজেন, নাইট্রেট, ফসফেট ইত্যাদির পরিমাণের ওপর) ভিত্তি করে সমুদ্রের সীমা নির্ধারণ করা হয়।
আংশিক বিচ্ছিন্ন প্রান্তীয় সাগরসমূহের মধ্যে আর্কটিক সাগর সর্ববৃহৎ। এটি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তরের বর্ধিতাংশ। এই উত্তরের অংশ যা মেরু অতিক্রম করে অগভীর বেরিং প্রণালিতে ৬৬° উত্তর অক্ষাংশে পৌছে। আর্কটিক সাগরে এশিয়ার অনেকগুলো বড় নদী (যেমন- লেনা, ইনিসি, ওব) এসে পতিত হয়েছে। এর ফলে এ সাগরের উপরিভাগের পানির লবণাক্ততা আটলান্টিক মহাসাগরের লবণাক্ততাযুক্ত পানি থেকে অনেক কম। আর্কটিক সাগরের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ অঞ্চল সারা বছরই বরফে আবৃত থাকে। উত্তর গোলার্ধের শীত ঋতুতে আর্কটিক 'সাগরের অধিকাংশ এলাকা সামুদ্রিক বরফে আচ্ছন্ন থাকে।
আয়তনের দিক থেকে পরবর্তী সাগর হচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগর ও মেক্সিকো উপসাগর, যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সংযোগ স্থলে অবস্থিত। অন্যটি হলো ভূমধ্যসাগর, যা আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যস্থলে অবস্থিত। উভয় সাগর ৩০০ উত্তর অক্ষাংশের উষ্ণ উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে এবং পৃথিবীর বৃহৎ মরুভূমির সন্নিকটে অবস্থিত। উভয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাষ্পীভবনের আধিক্য। তার অর্থ এখানে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে স্বাদু পানি উড়ে যাওয়ার পরিমাণ বারিপাত বা নদীবাহিত পানির সংযোজনের চেয়ে বেশি। এমনকি মিসিসিপি নদী উত্তর মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হলেও এর স্বাদু পানি এ অঞ্চলের অত্যধিক বাষ্পীভবনের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। ফলে উপরের স্তরের পানি উভয় সাগরেই অত্যধিক লবণাক্ত। নিচের স্তরের পানির লবণাক্ততা অপেক্ষাকৃত কম। বাংলাদেশের উপকূলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরে ঠিক বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এখানে পানির লবণাক্ততা সমুদ্রের স্বাভাবিক লবণাক্ততার চেয়ে বেশ কম।
কৃষ্ণসাগর ভূমধ্যসাগরের সাথে বসফরাস প্রণালির দ্বারা সংযুক্ত। এই প্রণালি খুব সরু যার গড় গভীরতা ৭০০ মিটার (২২৭৫ ফুট) এবং সর্বনিম্ন গভীরতা ৪০ মিটারের মতো (১৩০ ফুট)। এমন নিয়ন্ত্রিত প্রণালি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের সাথে মুক্ত যোগাযোগ রক্ষা প্রায় অসম্ভব। অতীতে এই অপ্রশস্ত খাল দিয়েই বিশ্ব সমুদ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। কৃষ্ণ সাগরের পূর্ব দিকে কাস্পিয়ান সাগর বিশ্ব সমুদ্রের সাথে একদা সংযুক্ত থেকে যোগাযোগ রক্ষা করেছে।
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাগরের কিছু তথ্য ছকে দেখান হলো:
সারণি-৭.২: পৃথিবীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাগর
| সাগরের নাম | আয়তন (বর্গ কি.মি.) | গড় গভীরতা (মিটার) |
| দক্ষিণ চীন সাগর | ২,৯৭৪,৬০০ | ১,৬৫২ |
| ক্যারিবীয় সাগর | ২,৫১৫,৯০০ | ২,৬৪৭ |
| ভূমধ্যসাগর | ২,৫১০,০০০ | ১,৪২৯ |
| বেরিং সাগার | ২,২৬১,০০০ | ১,৫৪৭ |
| মেক্সিকো উপসাগর | ১,৫০৭,৬০০ | ১,৪৮৬ |
| ওখটস্ক সাগর | ১,৩৯২,১০০ | ৯৭৩ |
| জাপান সাগর | ৯৭৮,০০০ | ১,৩৫০ |
| পূর্ব চীন সাগর | ৬৬৪,৬০০ | ১৮৯ |
| আন্দামান সাগর | ৫৬৪,৯০০ | ১,১১৮ |
| বঙ্গোপসাগর | ২২,০০,০০০ | ২৬০০ |
Source: www.the travelalmanac.com
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more