(Physiographic Characteristics of Bangladesh)
ভূপ্রকৃতি যেকোনো দেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বদ্বীপ। দেশটির প্রায় ২০% পাহাড়ি এবং ৮০% এলাকা পলল দ্বারা গঠিত সমভূমি। দেশের উত্তর-পশ্চিম ভাগ প্রাচীন পললযুক্ত সোপান ভূমি এলাকা। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়িয়া অংশ ব্যতীত প্রায় সমগ্র দেশই পলল দ্বারা গঠিত। এদেশের উপর দিয়ে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলীসহ অসংখ্য নদী বয়ে গেছে। দেশের ভূমির স্বাভাবিক ঢাল উত্তর থেকে দক্ষিণে তাই সব নদীই উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে
মিশেছে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি গঠনে এদেশের নদ-নদীগুলোর চিত্র-২.২৪: বাংলাদেশে বিভিন্ন ভূপ্রকৃতির পরিমাপ ভূমিকা ব্যাপক।

ভূপ্রকৃতির শ্রেণিবিভাগ: বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র অঞ্চল এক বিস্তীর্ণ সমভূমি। এর সামান্য পরিমাণ উঁচুভূমিও রয়েছে। ভূমির অবস্থা ও গঠন অনুসারে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে নিম্নলিখিত প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ;
২. প্লাইস্টোসিন যুগের চত্বর বা সোপান এলাকা; এবং
৩. নবীন বা সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি।

১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ: বাংলাদেশের মোট ভূমির ১২% এলাকা নিয়ে টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহের
বিস্তৃতি। টারশিয়ারি যুগে সম্ভবত হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সময় এ পাহাড়গুলো গঠিত হয়েছিল। আজ থেকে ৭০ মিলিয়ন বছর আগে টারশিয়ারি যুগে এ পাহাড়গুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এ পাহাড়গুলো আসামের লুসাই ও বার্মার আরাকান পাহাড়ের সমগোত্রীয় বলে মনে করা হয়। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পূর্বাংশ এবং সিলেট জেলার উত্তর-পূর্বাংশ এ অঞ্চলের অন্তর্গত। টারশিয়ারি যুগের পাহাড়গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ; এবং খ. উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ।

ক. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার অংশবিশেষ নিয়ে এ
অঞ্চল গঠিত। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা প্রায় ৬১০ মিটার এবং পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে ক্রমশ উচ্চতা বেড়েছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিন ডং (বিজয়) বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। এর উচ্চতা ১২৩১ মিটার। এখানে ধান, চা, আনারস প্রভৃতি জন্মে। স্থানীয় অধিবাসীগণ জুম পদ্ধতিতে চাষ করে থাকে। পাহাড়ের গায়ে রাবার ও তুলা চাষ হয়। এখানকার বনাঞ্চলে গর্জন, সেগুন প্রভৃতি পর্ণমোচী বৃক্ষ ছাড়াও চাপালিশ, তেলসুর, জারুল, চম্পা, চিকরাশি, নাগার্জুন প্রভৃতি চিরহরিৎ ও মিশ্র বৃক্ষের অরণ্য দেখা যায়। এছাড়া এখানে প্রচুর বাঁশ ও বেত জন্মে। এ অঞ্চলের বাঁশের ওপর ভিত্তি করে কর্ণফুলী কাগজকল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময় দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ জুড়ে এ বনভূমি বিরাজ করলেও বর্তমানে অধিকাংশই উজাড় হয়ে গেছে।
খ. উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ প্রভৃতি জেলার ছোট বড় পাহাড়গুলো নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ পার্বত্য ভূমির উচ্চতা ৬০-৯০ মিটারের বেশি নয়। তবে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাংশে পাহাড়গুলোর উচ্চতা ২৪৪ মিটার। এ অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। পাহাড়ের ঢালে প্রচুর চা উৎপন্ন হয়। তা ছাড়া এখানে বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজ সম্পদে এ অঞ্চল সমৃদ্ধ।
২. প্লাইস্টোসিন যুগের চত্বর বা সোপান এলাকা: বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের সুবিশাল বরেন্দ্রভূমি ও মধ্যভাগের
মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং কুমিল্লা জেলার লালমাই উচ্চভূমি এ অঞ্চলের অন্তর্গত। বাংলাদেশের মোট ভূমির ৮% জুড়ে এ অঞ্চল বিস্তৃত। আজ থেকে পাঁচ লক্ষ বছর পূর্বে বরফ যুগের পরোক্ষ প্রভাবের ফলে সোপান ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়েছিল। প্লাইস্টোসিন যুগের সোপান তিন ভাগে বিভক্ত। যথা- ক. বরেন্দ্রভূমি, খ. মধুপুরের গড় এবং গ. লালমাই পাহাড়।
ক. বরেন্দ্রভূমি: নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে বরেন্দ্রভূমি গঠিত। এর আয়তন প্রায় ৯,৩২০ বর্গ কি. মি.। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ৬-১২ মিটার। বরেন্দ্রভূমির মাটির রং অনেকটা হলুদ থেকে লালচে হলুদ। এ অঞ্চলটি পশ্চিমে মহানন্দা ও পূর্বে করতোয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। গভীর খাত বিশিষ্ট আঁকাবাঁকা ছোট ছোট কয়েকটি স্রোতস্বিনী এ, অঞ্চলে রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে এসব স্রোতস্বিনী খাঁড়ি নামে পরিচিত। অঞ্চলটি কৃষিকাজের জন্য বিশেষ উপযোগী। ধান, পাট, ভুট্টা, 'পান প্রভৃতি ফসল এখানে উৎপাদিত হয়।
খ. মধুপুর ও ভাওয়াল গড়: ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার প্রায় ৪,১০৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এ অঞ্চল বিস্তৃত। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল এলাকাকে মধুপুর গড় এবং ঢাকা ও গাজীপুর জেলার অংশকে ভাওয়াল গড় বলে। এখানে শাল ও গজারি বৃক্ষ ছাড়াও হরীতকী, আমলকী, নাগার্জুন, প্রভৃতি বৃক্ষ জন্মে। তবে গজারি বৃক্ষ সবচেয়ে বেশি জন্মে বলে এটি স্থানীয়ভাবে গজারি বন নামে পরিচিত l
গ. লালমাই পাহাড়: লালমাই পাহাড় কুমিল্লা শহরের ৮ কিলোমিটার (৫ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত। এ অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। এই অঞ্চলের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা ২১ মিটার (৭০ ফুট)। স্থান বিশেষে কোনো কোনো চূড়ার উচ্চতা ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) পর্যন্ত দেখা যায়। এখানকার মাটি লাল এবং নুড়ি, বালি ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। এ পাহাড়ের পাদদেশে আলু, তরমুজ ইত্যাদির চাষ হয়।
৩. নবীন বা সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি: পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা প্রভৃতি নদনদী, অসংখ্য উপনদী ও শাখানদীর বাহিত পলিমাটি দ্বারা প্লাবন সমভূমি অঞ্চল গঠিত। বাংলাদেশের ৮০% ভূমি এ অঞ্চলের অন্তর্গত। নবীন ভূতাত্ত্বিক যুগে অর্থাৎ প্রায় ১০-৪০/৫০ হাজার বছর আগে এ সমভূমি গড়ে উঠেছে। এ সমভূমির গড় উচ্চতা ৩০ ফুটের নিচে। প্লাবন সমভূমিকে ৬টি প্রধান শ্রেণিতে ভাগে করা যায়। নিচে এগুলোর বিবরণ দেয়া হলো-
ক. পাদদেশীয় পলল সমভূমি: বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। তিস্তা, আত্রাই ও করতোয়া প্রভৃতি নদীবাহিত পলি জমা হয়ে এ সমভূমি গঠিত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার।
খ. গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা প্লাবন সমভূমি: এটিই বাংলাদেশের মূল প্লাবন সমভূমি। বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা,
ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এ প্লাবন সমভূমি গঠিত। বর্ষায় এ সমভূমি প্লাবিত হয়। প্রাকৃতিক বাঁধ, পশ্চাৎ ঢাল (back swamp), অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (ox-bow lake), অগভীর জলাভূমি বা বিল, চর (bar) প্রভৃতি এ সমভূমির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
গ. সিলেট অববাহিকা: সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এলাকা এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার পূর্বাংশ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। এ অঞ্চলে বড় ধরনের পাঁচটি হাওর রয়েছে। সুনামগঞ্জের 'টাঙ্গুয়ার হাওর', ছাতকের 'দেখার', জগন্নাথপুরের 'নলোয়ার', ফেঞ্চুগঞ্জের 'হাকালুকি' এবং শ্রীমঙ্গলের 'হাইল' হাওর প্রসিদ্ধ।
ঘ. ত্রিপুরার (কুমিল্লার) সমভূমি: চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার অধিকাংশ এবং লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৩.৬-৬ মিটার। বর্ষাকালে এটি প্লাবিত হয়।
ঙ. বদ্বীপ সমভূমি: বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সমভূমিকে বদ্বীপ সমভূমি বলা হয়। এ অঞ্চলটি পদ্মার শাখা নদীগুলো দ্বারা বিধৌত। এ সমভূমি অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগে করা যায়। যথা- (i) সক্রিয় বদ্বীপ (ii) মৃতপ্রায় বদ্বীপ; এবং (iii) স্রোতজ বদ্বীপ।
i. সক্রিয় বদ্বীপ: পূর্বে মেঘনা হতে পশ্চিমে গড়াই-মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় বদ্বীপ বলা হয়। বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর জেলা এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
ii. মৃতপ্রায় বদ্বীপ: গড়াই মধুমতি নদীর পশ্চিমাংশকে মৃতপ্রায় বদ্বীপ বলা হয়। এটি বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত।
iii. স্রোতজ বদ্বীপ: বাংলাদেশের বদ্বীপ অঞ্চলের দক্ষিণাংশ জোয়ার-ভাটার দ্বারা প্রভাবিত বলে এ অংশকে স্রোতজ বদ্বীপ বলে।
চ. উপকূলীয় সমভূমি: এ সমভূমি ফেনী নদী হতে কক্সবাজারের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি গড়ে প্রায় ৯.৬ কিলোমিটার প্রশস্ত। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এ সমভূমি ২৫ কিলোমিটারের মতো প্রশস্ত। এ এলাকার পতেঙ্গা ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্ববিখ্যাত।
এছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে প্রবাল দ্বীপপুঞ্জ সেন্ট মার্টিন এবং কক্সবাজার সন্নিকটবর্তী মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। মহেশখালী দ্বীপটি ভূমিকম্পের কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়।
পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই
Read more