hsc

প্রাকৃতিক ভূগোল (প্রথম অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

2.1k
Please, contribute by adding content to প্রাকৃতিক ভূগোল.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

পৃথিবীর গঠন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি মন্ডল দেখা যায় যার বাইরের আবরণের মহাদেশীয় স্তরটি হলো সিয়াল স্তর এবং নিচের দিকে মহাসাগরগুলোর তলদেশ হলো সিমান্তর।

জীবজন্তু, প্রকৃতি ও মানুষ
যন্ত্রপাতি, মানুষ ও সম্পদ
প্রকৃতি, মানুষ ও সম্পদ
প্রকৃতি, মানুষ, শিক্ষা
অর্থনৈতিক ভূগোল
প্রাকৃতিক ভূগোল
বাণিজ্যিক ভূগোল
গাণিতিক ভূগোল
বিশ্ব পরিস্থিতিকে ভালোভাবে জানা
সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার
উপরের সব কয়টি

(Definition of Physical Geography)

মানুষের আবাসভূমি হিসেবে পৃথিবীর বর্ণনাকেই বলা হয় ভূগোল। ইংরেজি 'Geography' শব্দ হতে বাংলা 'ভূগোল' শব্দটি এসেছে। 'Geography' শব্দটি মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। 'Geo' অর্থ পৃথিবী আর 'Graphy' অর্থ হলো বর্ণনা। সুতরাং শব্দগত অর্থে 'Geography' বলতে 'পৃথিবীর বর্ণনা' বা 'Description of the Earth' কেই বোঝানো হয়। গ্রিক ভূগোলবিদ ইরাটসথেনিস (Eratosthenes) সর্বপ্রথম 'Geography' শব্দটি ব্যবহার করেন।

Heritage Dictionary (২০০০) অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ভূগোল বা Physical Geography, Geosystem অথবা Physiography নামেও পরিচিত। প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রাথমিক উপক্ষেত্র হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল (আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞান), প্রাণী ও উদ্ভিদ (জীবভূগোল), প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য (ভূমিরূপ বিজ্ঞান), মৃত্তিকা এবং পানি।

বিজ্ঞানের যে শাখা অধ্যয়নে ভূত্বকের উপরিভাগের ভৌত পরিবেশ এবং এতে কার্যরত বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়াসমূহ সম্পর্কে জানা যায় তাই প্রাকৃতিক ভূগোল বা Physical Geography। ভূগোলের সংজ্ঞার আলোকে প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কে বলা যায়, প্রাকৃতিক ভূগোল হলো "প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের (জলবায়ু, উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি) স্থানিক ও কালিক বিশ্লেষণ।” আঞ্চলিক স্কেলের প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, "প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের আঞ্চলিক তারতম্য বিশ্লেষণ করাই প্রাকৃতিক ভূগোল। আরও ব্যাপক অর্থে বলা যায়, “স্বল্প, মধ্যম বা দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানিক বিশ্লেষণই প্রাকৃতিক ভূগোল।"

অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোল হলো ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক অবয়ব সম্পর্কিত পাঠ। ভূবিজ্ঞানের শাখা হিসেবে বিবেচিত এ শাস্ত্রটি ভূমি সৃষ্টি ও গঠন ছাড়াও, জলবায়ু এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বণ্টন সম্পর্কে পর্যালোচনা করে।

American Heritage Science Dictionary (2005) অনুযায়ী, “পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক চিত্রাবলির বিশেষত চলতি বিষয়াবলির বিজ্ঞানসম্মত পাঠই হলো প্রাকৃতিক ভূগোল।" -প্রাকৃতিক ভূগোল ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক প্যাটার্ন বা ধরন এবং পদ্ধতি সম্পর্কিত আলোচনাকে অন্তর্ভুক্ত করে। মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়াও এর আওতাভুক্ত এবং এটা ভূগোলের একটি উপক্ষেত্র।

খ্যাতনামা আমেরিকান ভূগোলবিদ রিচার্ড হার্টশোর্ন-এর মতে, "ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের সঠিক, সুবিন্যস্ত ও যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সরবরাহ করা প্রাকৃতিক ভূগোলের কাজ।"

আরেক আমেরিকান ভূগোলবিদ Christine E Michael (2010) তার 'Physical Geography' গ্রন্থে, প্রাকৃতিক ভূগোলের সংজ্ঞার্থে বলেন, "প্রাকৃতিক ভূগোল ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক প্যাটার্ন বা ধরন এবং পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে। মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়াও এর আওতাভুক্ত এবং এটা ভূগোলের একটি উপক্ষেত্র।"

একাডেমিকভাবে ভূগোলের এই উপক্ষেত্র অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোলকে 'Human- Land Tradition' বা 'মানবভূমি ধারা' বলা হয়ে থাকে (Pidwirny, 2006)। বিগত কয়েক দশকে মানুষের হস্তক্ষেপে পরিবেশ অবক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়াতে ভূগোলের এই শাখা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভূগোলের পরিধি সাধারণভাবে প্রকৃতির স্থানিক বিশ্লেষণ অপেক্ষা অনেক বৃহত্তর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ বিষয়টি কীভাবে প্রকৃতির ওপর মানুষ প্রভাব বিস্তার করে সে বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করে থাকে। জার্মান ভূগোলবিদ ফ্রেডরিখ র‍্যাটজেল এবং আমেরিকান এলেন চার্চিল সেম্পল এ ধারণাটির ব্যাপক প্রচলন ঘটান।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Nature of Physical Geography)

প্রাকৃতিক ভূগোল স্থানিকভাবে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ পরীক্ষা ও অনুসন্ধান করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রাকৃতিক ভূগোল আবহাওয়া ও জলবায়ু, মৃত্তিকা, উদ্ভিদ, প্রাণী, পানি ও এর বিভিন্ন রূপ এবং ভূমিরূপের স্থানিক বিন্যাস অধ্যয়ন করে থাকে। প্রাকৃতিক ভূগোলবিদগণ উপরিউক্ত প্রপঞ্চসমূহের আন্তঃসম্পর্ক এবং মানুষের কার্যকলাপের সাথে তাদের সম্পর্ক অর্থাৎ মানুষের হস্তক্ষেপে তাদের পরিবর্তন নিয়েও পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ দিয়ে থাকেন। সুতরাং দেখা যায় বর্তমানে প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রকৃতি কিছুটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচ্য বিষয়গুলো হলো:

১. পৃথিবীপৃষ্ঠ এবং এর অন্তর্ভুক্ত অজীব ও সজীব উপাদান নিয়ে আলোচনা করা।
২. বিশ্বপ্রকৃতিতে তথা মহাবিশ্বে সৌরজগতের উৎপত্তি ও বিকাশ অধ্যয়ন।
৩. পৃথিবীর উৎপত্তি এবং আকার, আয়তনসহ সকল প্রপঞ্চের বর্ণনা দান।
৪. পৃথিবীতে শক্তির উৎস, ব্যবহার এবং পুনঃব্যবহার আলোচনা করা।
৫. ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তিসমূহ আলোচনা করা।
৬. প্রাকৃতিক নিয়ম-বিধি আলোচনা করা।
৭. প্রকৃতির সক্রিয় উপাদান হিসেবে মানুষের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রাকৃতিক ভূগোল মূলত বর্ণনাভিত্তিক। অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়বস্তুর বর্ণনায় প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনা প্রাণবন্ত হয়। যেমন- পৃথিবীব্যাপী বনভূমির বিস্তরণ আলোচনা করা ভূগোলের এ শাখাটির কাজ। কিন্তু সেই সাথে এ বিস্তরণের ব্যাখ্যা এবং মানবীয় কার্যাবলির উপর বনভূমির বিস্তরণের প্রভাব বর্ণনা করাও প্রাকৃতিক ভূগোলের কাজ। এ প্রেক্ষিতে কখনও কখনও প্রাকৃতিক ভূগোল বর্ণনার সাথে সাথে রীতিবন্ধ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।

প্রাকৃতিক ভূগোল একটি গতিশীল বিজ্ঞান। ভূপৃষ্ঠের প্রকৃতির সজীব ও অজীব উপাদানগুলো ভূগোলের এ শাখার মূল বিষয়। সজীব উপাদান; উদ্ভিদ ও প্রাণিপ্রজাতি সর্বদাই ক্রিয়াশীল। অজীব উপাদানগুলো প্রাণের নিরিখে ক্রিয়াশীল নয়। কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে এ উপাদানগুলোও সর্বদা পরিবর্তনশীল। যেমন- ভূমিরূপবিদ্যা শাখায় দেখা যায়, ভূপৃষ্ঠ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির (ধীর ও আকস্মিক পরিবর্তনকারী) প্রভাবাধীন। ভূআলোড়ন, অগ্ন্যুৎপাত, বিচূণীভবন প্রক্রিয়ায় ভূমিরূপগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং, প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদানসমূহ স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে সর্বদা সক্রিয় এবং পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই গতিশীল এসব উপাদানের আলোচনায় প্রাকৃতিক ভূগোলেও নিত্য নতুন তত্ত্ব, তথ্য, প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে। এভাবে ভূগোলের এ শাখাটি গতিশীল থেকে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌছেছে।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Scope of Physical Geography)

প্রাকৃতিক ভূগোলের ক্ষেত্র বা পরিধি সম্পর্কে সহজভাবে বলা যায়- একে ভূবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা, বৈশ্বিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্যাটার্ন সম্পর্কে জানার জন্য জীববিজ্ঞান এবং পৃথিবীর গতি ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহের সাথে সম্পর্ক জানার জন্য গণিত ও পদার্থবিদ্যা বিষয়ের জ্ঞান ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া এটি বাস্তুবিদ্যা ও পরিবেশবিদ্যাকেও অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। সুতরাং প্রাকৃতিক ভূগোলের সাথে সম্পর্কযুক্ত বা এর আলোচ্য বিষয়গুলোর পরিসর হলো- বায়ুমণ্ডল, মহাদেশ, মরুভূমি, দ্বীপ, ভূমিরূপ, মহাসাগর, নদী, হ্রদ, জলবায়ু, মৃত্তিকা, উদ্ভিদ ও প্রাণী, সময়ানুক্রমিক ভূগোল, প্রত্নজীবাশ্মবিদ্যা, পানিবিদ্যা ইত্যাদি।

সহজভাবে প্রাকৃতিক ভূগোলের সাধারণ ক্ষেত্র বা পরিসর নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হতে পারে:
ভূমিরূপবিদ্যা- যা ভূত্বকের গঠন এবং ভূমিরূপ সম্পর্কে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে;
মৃত্তিকাবিদ্যা- যা মৃত্তিকা অধ্যয়নের সাথে সম্পৃক্ত;
জীবভূগোল- যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্থানিক বিন্যাস ও সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে;
পানিবিদ্যা- যা পানির সার্বিক রূপ সম্পর্কে অধ্যয়ন করে;
আবহাওয়াবিদ্যা- যা বায়ুমণ্ডলের স্বল্পকালীন অবস্থা সম্পর্কে অধ্যয়ন করে;

জলবায়ুবিদ্যা- যা জীবনের ওপর আবহাওয়ার প্রভাব এবং বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘকালীন সঞ্চালন সম্পর্কে অধ্যয়ন করে।'
উপরিউক্ত বিষয়াবলি প্রাথমিকভাবে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা অধ্যয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে সুগভীরভাবে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের জন্য প্রাকৃতিক ভূগোল নিম্নোক্ত বিষয়াবলি হতে তথ্য আহরণ করে থাকে।

ভূতত্ত্ব- যা থেকে ভূপৃষ্ঠ ও এর অভ্যন্তরস্থ অবস্থা ও তাদের গতিশীলতা অধ্যয়ন করা হয়;
রাস্তুবিদ্যা- যেখানে প্রাণ এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যালোচিত হয়;
সমুদ্রবিজ্ঞান- যেখানে সাগর মহাসাগরের অবস্থান ও জোয়ার-ভাটা, তলদেশের ভূপ্রকৃতি, পানিতে বিভিন্ন পদার্থের পরিমাণ ও সামুদ্রিক জীব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা- যেখানে মানচিত্রাঙ্কনের কৌশল বিশ্লেষিত হয় এবং ভৌগোলিক বিষয়াবলির স্থানিক মানচিত্র অত্যাবশ্যক।
জ্যোতির্বিদ্যা- যেখানে মহাকাশ ও মহাজাগতিক বস্তু সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হয়।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Subject Matter of Physical Geography)

ভূগোল শাস্ত্রের শুরু থেকেই ভূগোলের আলোচ্য বিষয় নিয়ে ভূগোলবিদগণ বহু গবেষণা করেছেন। এতে প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনার বিষয়বস্তুরও বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কিছু বিষয় সময়ের সাথে সাথে প্রাকৃতিক ভূগোলে যুক্ত হয়েছে, যা প্রাকৃতিক ভূগোলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তুকে প্রধান কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হয় যার প্রত্যেকটি ভূগোলের একটি স্বতন্ত্র শাখারূপে প্রতিষ্ঠিত। বিষয়বস্তুগুলো হলো-

(ক) ভূমিরূপবিদ্যা

(খ) বারিতত্ত্ব

(গ) হিমবাহতত্ত্ব

(ঘ) জলবায়ুবিদ্যা

(ঙ) জীবভূগোল

(চ) সমুদ্রবিজ্ঞান

(ছ) উপকূলীয় ভূগোল

(জ) পরিবেশ ভূগোল

প্রাকৃতিক ভূগোলের এ বিষয়বস্তুসমূহ মূলত প্রাকৃতিক বিভিন্ন প্রপঞ্চ বা উপাদানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদান হচ্ছে সেইসব প্রাকৃতিক উপাদান যার স্থানিক ও কালিক বিশ্লেষণ শাস্ত্রটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বিষয়বস্তুগত প্রাকৃতিক ভূগোলের শাখার বর্ণনায় তাই প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন উপাদানও বর্ণিত হবে। যেমন-

(ক) ভূমিরূপবিদ্যা (Geomorphology): প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভূমিরূপবিদ্যা। ভূপৃষ্ঠের সব স্থান সমান নয়, কোথাও উঁচু পর্বত, কোথাও মালভূমি আবার কোথাও বিস্তৃত সমতলভূমি বিদ্যমান। ভূমিরূপবিদ্যায় এগুলোর উৎপত্তি, গঠন ও বিন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। ভূমিরূপবিদ্যায় ভূত্বকের এ বৈচিত্র্যের ইতিহাস ও গঠন অনুসন্ধান করা হয়। ভূত্বকগঠনকারী শক্তি নদী, বায়ু প্রভৃতির কার্যাবলিও এখানে আলোচনা করা হয়। মাঠ পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক পরীক্ষণ এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক ভূজ্যামিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে পৃথিবীর ভূমিরূপের পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়। প্রাকৃতিক ভূগোলের এই অংশে প্লেট সঞ্চালন, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, সুনামি, শিলা ও খনিজ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

(খ ) বারিতত্ত্ব (Hydrology): পৃথিবীপৃষ্ঠের শতকরা ৭১ ভাগ পানি। প্রাকৃতিক ভূগোলের বারিতত্ত্বে পানি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পৃথিবীর মোট পানি সম্পদের আয়তন ১৩৮৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার। সাধারণভাবে বারিতত্ত্বে পানির উৎস ও বণ্টন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। পৃথিবীর মোট পানির বেশির ভাগই বিরাজ করছে সাগর ও মহাসাগরগুলোতে। বারিতত্ত্বে সমগ্র পৃথিবীতে চলমান পানিচক্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। পানিচক্র বলতে পানির রূপান্তরের মাধ্যমে স্থানান্তর এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার স্বস্থানে ফিরে আসাকে বোঝায়। বারিতত্ত্বে কীভাবে নদী ও হ্রদ সৃষ্টি হয় এবং নদী সৃষ্টির সময় ক্ষয় ও সঞ্চয়কার্যের সময় যেসব ভূমিরূপ সৃষ্টি হয় তা প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনার বিষয়।

( গ) হিমবাহতত্ত্ব (Glaciology): প্রাকৃতিক ভূগোলের হিমবাহতত্ত্ব হিমবাহ, বরফখণ্ড, সামুদ্রিক শৈলশিরা নিয়ে
আলোচনা করে। হিমবাহের কার্যের ফলে ক্ষয়জাত ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গঠিত হয়। হৈমবাহিক অঞ্চলের হিমবাহের ক্ষয়সাধনের ফলে যেসব ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তা হলো হৈমবাহিক উপত্যকা, ঝুলন্ত উপত্যকা, সার্ক বা কোরি, হিমসিঁড়ি, শৈলময় পর্বত, ফিয়র্ড প্রভৃতি।

হিমবাহের সঞ্চয়জাত ভূমিরূপের মধ্যে গ্রাবরেখা, বোল্ডার ক্লে, ড্রামলিন, অনিয়মিত শিলাপিণ্ড, হিমবাহ সমভূমি, এস্কার বা ওসার, কেইম, ভার্ব, উপত্যকা সঞ্চয়ন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয় হিমবাহ তত্ত্বে।

(ঘ) জলবায়ুবিদ্যা (Climatology): প্রাকৃতিক ভূগোলে জলবায়ুবিদ্যার বিষয়বস্তু ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়।
কোনো স্থানের বা কোনো অঞ্চলের দীর্ঘকালের (৩০ থেকে ৪০ বছর) দৈনন্দিন আবহাওয়া পর্যালোচনা করে বায়ুমণ্ডলের ভৌত উপাদানগুলোর যে সাধারণ অবস্থা পরিলক্ষিত হয় তাকে ঐ স্থানের বা অঞ্চলের জলবায়ু বলে। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন আকার-আয়তনে সঞ্চালন এবং তার কারণ ও প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা হলো জলবায়ুবিদ্যার বিষয়বস্তু। জলবায়ুবিদ্যায় জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বায়ুর তাপ, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর আর্দ্রতা, বারিপাত ইত্যাদি জলবায়ুর উপাদান। যেসব উপাদান এগুলোকে প্রভাবিত করে জলবায়ুর পরিবর্তন সাধন করে তাদেরকে জলবায়ুর নিয়ামক বলে। প্রাকৃতিক ভূগোলে জলবায়ুর নিয়ামক হিসেবে যেসব উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হয় সেগুলো হলো- অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র হতে দূরত্ব, বায়ুপ্রবাহের দিক, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্রোত, পর্বতের অবস্থান, বনভূমি, ভূমির ঢাল ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু বিরাজ করছে। কোথাও সমভাবাপন্ন, কোথাও চরমভাবাপন্ন আবার কোথাও বা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু। জলবায়ুবিদ্যায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যসমূহও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

(ঙ) জীবভূগোল (Biogeography): যেহেতু ভূগোল মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করে তাই জীবমণ্ডলও
প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম বিষয়বস্তু। জীবমণ্ডল প্রধানত বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও অশ্মমণ্ডল নিয়ে গঠিত। উদ্ভিদ, জীবজন মানমসহ পকতির সকল জীব উপাদানই জীবভূগোলের আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রাকৃতিক ভূগোলের এই বিষয়বস্তুর আওতায় যেসব উপাদান বা নিয়ামক নিয়ে আলোচনা করা হয় সেগুলো হলো- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বায়োম অঞ্চল সম্পর্কে বর্ণনা করা যার মধ্যে ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান, প্রাকৃতিক উপাদানের (নাইট্রোজেন, অক্সিজেন প্রভৃতি) চক্র ইত্যাদি আলোচনা করা হয়। এছাড়া জীবভূগোলেই প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন- মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ এবং দূষণের কারণ ও প্রতিরোধের উপায় বর্ণনা করা হয়।

(চ) সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography): প্রাকৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়বস্তু হলো সমুদ্রবিজ্ঞান।
পৃথিবীর অধিকাংশ পানির অবস্থান সমুদ্রে। সমুদ্রবিজ্ঞানে পানিচক্র, সাগর ও মহাসাগরের জলরাশি, সমুদ্র তলদেশের বয়স, সমুদ্রস্রোত, সমুদ্রের পানির ভৌত বৈশিষ্ট্য, সমুদ্র তরঙ্গ ও জোয়ার ভাটা, সমুদ্র তলদেশের ভূপ্রকৃতি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করে। সমুদ্রবিজ্ঞান একটি অত্যন্ত আধুনিক ও জটিল বিষয়। সমুদ্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে আলোচনার সুবিধার্থে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- ১. ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞান, ২. রাসায়নিক সমুদ্রবিজ্ঞান এবং ৩. জৈবিক সমুদ্রবিজ্ঞান। ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের প্রাকৃতিক বিষয়ের বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা হয়। রাসায়নিক সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের পানির রাসায়নিক গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যেমন- পানি এবং এর হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। জৈবিক সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রের পানিতে অবস্থিত উদ্ভিদ ও প্রাণী বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। সমুদ্রের তলদেশে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে যেগুলোর ভৌগোলিক বণ্টন ও জীবন চক্র সমুদ্রবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়বস্তু।

(ছ ) উপকূলীয় ভূগোল (Coastal Geography): সমুদ্র এবং ভূমির মধ্যে গতিশীল আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ক বিদ্যাই হলো উপকূলীয় ভূগোল। এই ভূগোল উপকূলীয় বিচূণীভূত প্রক্রিয়া বিশেষ করে উপকূলীয় তরঙ্গ, পলি, তরঙ্গ গতি, উপকূলীয় আবহাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। উপকূলীয় ভূগোল উপকূলের ভূদৃশ্য বা ভূমিরূপের সাথে উপকূলীয় মানুষের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আলাচনা করে। উপকূলীয় ভূগোলে স্থলভাগ সংলগ্ন উপকূলের অগভীর অঞ্চল বিশেষ করে মহীসোপান অঞ্চল সম্পর্কে তথা এর বৈশিষ্ট্য, এর সম্পদ ও সেগুলোর যথার্থ রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। উপকূলীয় ভূগোলে সমুদ্র আইন, একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, সামুদ্রিক পরিবেশ বিষয়েও আলোচনা করা হয়।

(জ) পরিবেশ ভূগোল (Environmental Geography): পরিবেশ ভূগোল পরিবেশের সার্বিক অবস্থা, পরিবেশ দূষণের কারণ, দূষণের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা ও অন্যান্য ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইন প্রণয়ন ও চুক্তি সম্পাদনও পরিবেশ ভূগোলের বিষয়বস্তু। পরিবেশ দূষণে মনুষ্য সৃষ্ট কারণ প্রধান হলেও প্রাকৃতিক কারণও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।. মোটকথা পরিবেশের সার্বিক অবস্থা আলোচনা করা হয় পরিবেশ ভূগোলে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু গড়ে উঠেছে। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যয়ন করলে প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্কের যোগসূত্র জানা যায়। ভূগোলের জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূগোলের ব্যবহারিক উপযোগিতা দৃঢ়তা পায়।

গ্রুপ 'ক'গ্রুপ 'খ'

হিমবাহ

ভূমিকম্প

মহাকাশ

মালভূমি

পরিবেশ দূষণ

ভূমিরূপবিদ্যা

হিমবাহতত্ত্ব

পরিবেশ ভূগোল

জ্যোতির্বিদ্যা

  • গ্রুপ 'খ' এর উপাদানগুলো কোন ভূগোলের অন্তর্গত? ব্যাখ্যা করো।
  • গ্রুপ 'ক' এর উপাদানগুলো, গ্রুপ 'খ' এর কোন কোন উপাদানের সাথে সম্পর্কিত? বিশ্লেষণ করো।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Elements of Physical Geography)

প্রাকৃতিক ভূগোলের বিষয়বস্তু বিবেচনায় দেখা যায়, এর পরিসর অশ্মমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও জীবমণ্ডলে বিস্তৃত।
অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোল যেসব উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত তা হলো-

অশ্মমণ্ডল:

i. ভূঅভ্যন্তর: ভূ-অভ্যন্তরের গঠন উপাদান ও স্তরসমূহ।
ii. ভূত্বক: খনিজ ও শিলার গঠন উপাদান, বৈশিষ্ট্য এবং শিলার শ্রেণিবিভাগ।
iii. ভূ-প্রক্রিয়া: ভূ-আলোড়নের শ্রেণিবিভাগ, সৃষ্ট ভূমিরূপ, পর্বত, মালভূমি ও সমভূমির গঠন ও বৈশিষ্ট্য।
iv. আকস্মিক ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন: ভূমিকম্পের কারণ, ফলাফল, সৃষ্ট ভূমিরূপ এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল; আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কারণ, সৃষ্ট ভূমিরূপ, সুফল, কুফল, আগ্নেয়গিরিপ্রবণ অঞ্চল।
V. ধীর পরিবর্তন: বিচূর্ণীভবন ও নগ্নীভবন, বিচূর্ণীভবন ও নগ্নীভবনের মধ্যে পার্থক্য, বিচূর্ণীভবন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়।
vi. ভূপৃষ্ঠ পরিবর্তনে নদী: নদীর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, নিষ্কাশন, ধরন, ক্ষয় ও ক্ষয়জাত ভূমিরূপ, পরিবহন, সঞ্চয় ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ।

বায়ুমণ্ডল

i. বায়ুর উপাদান ও বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস, বায়ুর গঠন উপাদান, বায়ুর ধর্ম, বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস ও বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য।
ii. জলবায়ু, আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে পার্থক্য, আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান এবং নিয়ামকসমূহ।
iii. জলবায়ু অঞ্চল, জলবায়ু অঞ্চলের শ্রেণিবিভাগ এবং বিভিন্ন জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য।

বারিমণ্ডল:

i.মহাসাগর: সাগর, মহাসাগর, উপসাগর, আকৃতি, আয়তন, গভীরতা।
ii.মহাসাগরের তলদেশ: মহীসোপান, মাহীঢাল, গভীর সমুদ্রের সমভূমি, গভীর সমুদ্রখাত।
iii. সমুদ্রস্রোত: সমুদ্রস্রোতের কারণ, আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় স্রোত, সমুদ্রস্রোতের প্রভাব।
iv. জোয়ার-ভাটা: জোয়ার ভাটার কারণ ও ফলাফল, শ্রেণিবিভাগ।

জীবমণ্ডল: এ মন্ডলের আশ্রয় মূলত বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও অশ্মমণ্ডল। এর প্রতিটি কোনো না কোনোভাবে পরস্পরকে সহায়তা করে জীবজগৎ টিকিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ বায়ু, বারি ও অশ্মমণ্ডলে জীবজগৎ অভিযোজিত হয়েছে।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Content updated By

(Importance of Studying Physical Geography)

পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়েছে। প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণেই রচিত হয়েছে মানবসভ্যতার ভিত্তি। এসব প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে জানতে এবং তার ব্যবহার উপযোগিতা নির্ণয়ে প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব রয়েছে। যেমন-

ক. পৃথিবীর জন্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর জন্ম। কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হলো, কী প্রকারে বাষ্পীয় ও তরল অবস্থার মধ্যে দিয়ে পৃথিবী বর্তমান অবস্থায় পৌছেছে অর্থাৎ পৃথিবীর জলভাগ, স্থলভাগ ও বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তি, তা আমরা প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জানতে পারি। এছাড়াও ভূপৃষ্ঠের আজ যেখানে পাহাড়-পর্বত, কয়েক হাজার বছর বিবর্তনের ফলে সেসব স্থানে সমুদ্র অথবা সমভূমির সৃষ্টি হতে পারে; সাগর পরিবর্তন হয়ে সমভূমি বা পাহাড় পর্বতের সৃষ্টি হতে পারে; অথবা সমভূমি পরিবর্তিত হয়ে পাহাড় বা সমুদ্রে রূপান্তরিত হতে পারে; এবং ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাতের ফলে কোনো কোনো স্থান উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এসবই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জানা যায়।। এছাড়াও প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞানার্জন অতি গুরুত্বপূর্ণ।

উনবিংশ শতাব্দীর ভৌগোলিক চিন্তা বিশ্লেষণ করে ভূগোলবিদগণ দেখেছেন প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব এ সময়ে বেশি ছিল। আর এ সময়েই প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু ভূমিরূপবিদ্যাকে ভূগোলবিদগণ গুরুত্বের সাথে গবেষণা শুরু করেন। ভূগোলে বৈজ্ঞানিক নিমিত্তবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ধারক জার্মান ভূগোলবিদ ফ্রেডরিখ র‍্যাটজেল (Friedrich Ratzel) এবং আমেরিকান ভূগোলবিদ এলেন চার্চিল সেম্পলও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক ভূগোলের ভূমিকার ওপর অধিক গুরুত্ব দেন। পরবর্তীতে আচরণবাদ মানুষের কার্যক্ষমতাকে প্রাধান্য দিলেও তা সীমিত এবং প্রকৃতিকে আশ্রয় করেই প্রকাশ পায়। তাই মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক বিশ্লেষণে প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব অপরিসীম।

খ. ভূমিরূপ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভূমিরূপবিদ্যা। এ বিষয়ের প্রধান বিষয়বস্তু হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা, শিলা ও খনিজের উৎপত্তি, ভূআলোড়ন ও তার ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ; সূর্য হতে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর প্রাকৃতিক কোন কোন শক্তি দ্বারা কীভাবে পৃথিবীর পদার্থসমূহ নিজেদের ঘনত্ব অনুসারে তার কেন্দ্র হতে ভূত্বক পর্যন্ত স্তরে স্তরে সজ্জিত হলো; আবার ভূঅভ্যন্তর এবং তার উপরিভাগের কি কি প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের দ্বারা ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন জলভাগ ও স্থলভাগের সৃষ্টি হলো; এবং বর্তমানে এসব প্রাকৃতিক শক্তি কী প্রকারে ভূপৃষ্ঠের সর্বদা পরিবর্তন করে যাচ্ছে, কীভাবে পাহাড় থেকে নদীগুলো উৎপত্তি হয়ে সমুদ্রে পড়েছে। প্রাকৃতিক ভূগোলের এ শাখা ভূত্বক ও ভূ-অভ্যন্তরস্থ শক্তি ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারে মানবসভ্যতাকে নির্দেশনা দেয়। তাই ভূমিরূপবিদ্যা পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।

গ. বারিতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: বারিতত্ত্বে সাধারণভাবে পৃথিবীর পানির উৎস ও বণ্টন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। এটি প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই বিষয়টি পাঠ করলে আমরা জানতে পারি পৃথিবীতে কতগুলো সাগর, মহাসাগর আছে এবং এগুলোর গভীরতা, আয়তন ইত্যাদি। পৃথিবীর সমগ্র পানিরাশি কীভাবে রূপান্তরের মাধ্যমে স্থানান্তর হয় এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার স্বস্থানে ফিরে আসে তা বারিতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায়। যেহেতু পানি মানবজাতির জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান এবং সম্পদ হিসেবে সভ্যতা বিনির্মাণে প্রভাব বিস্তারকারী; আর বারিতত্ত্ব এসব নিয়ে আলোচনা করে তাই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের গুরুত্বও অপরিসীম।

ঘ. সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৃথিবী গ্যাসীয় অবস্থা হতে কঠিন অবস্থায় উপনীত হওয়ার সময় ভূপৃষ্ঠ অসমানভাবে সংকুচিত হয়েছিল। এর ফলে পাহাড়-পর্বত ও বারিমণ্ডলের সৃষ্টি হয়েছে।
পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য চাই আরও খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের। পৃথিবীর স্থলভাগের সামান্য এলাকা (মোট আয়তনের এক চতুর্থাংশেরও কম) বর্তমানের জনসংখ্যার বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। স্থলভাগের বহু অঞ্চলের অনবায়নযোগ্য অনেক জ্বালানি ও শক্তি সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া মানুষের আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে পূর্বের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণ জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের। তাই বাধ্য হয়েই মানুষকে হাত বাড়াতে হচ্ছে সমুদ্র সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণের দিকে। প্রাকৃতিক ভূগোলের সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও অনুসন্ধান বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এসব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

৬. জলবায়ুতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: জলবায়ুতত্ত্ব পাঠে আমরা প্রথমে বায়ুমণ্ডলের গভীরতা, বায়ুর স্তরবিন্যাস, বায়ুর উপাদান, বায়ুর তাপ ও চাপ প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারি। আবার বায়ুপ্রবাহের কারণ, দিক, বায়ুর শ্রেণিবিভাগ ইত্যাদি বিষয়ও জলবায়ুতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায়। এমনকি বায়ুর আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাতের কারণ, বৃষ্টিপাতের প্রকারভেদ প্রভৃতি বিষয়ও জানা যায়। এছাড়া আবহাওয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রকার জলবায়ুর বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা যায়। আর জলবায়ু সমগ্র পৃথিবীর পরিবেশ ও মানবজীবনযাত্রাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জলবায়ুতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

চ. বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ঊর্ধ্বদিকে যে বায়বীয় আবরণ সমগ্র পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তাকে বায়ুমণ্ডল বলে। বায়ুমণ্ডল ঊর্ধ্বাকাশে প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাকৃতিক ভূগোলে বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। বায়ুমণ্ডল নানাপ্রকার গ্যাসীয় উপাদান, যেমন: নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বায়ু আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু স্পর্শ দ্বারা অনুভব করতে পারি। মাধ্যাকর্ষণের ফলে বায়ুরাশি পৃথিবীর গায়ে লেগে আছে এবং পৃথিবীর সাথে আবর্তন করছে। মানুষসহ সমগ্র জীবজগৎ এবং ভৌত পরিবেশ বায়ু সমুদ্রে নিমজ্জিত। বায়ুমণ্ডলীয় বিভিন্ন অবস্থা পৃথিবীর সমগ্র জীবজগতের ওপর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। তাই এসব বিষয়কে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হলে প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...