(Factors of Textile and Weaving Industries Localization)
বস্ত্র ও বয়ন বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। পৃথিবীর প্রায় ৭৭ শতাংশ কাপড় কার্পাস তুলা থেকে উৎপাদন করা হয়। সকল দেশ বা সমাজের জনগণের নিকট বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বস্ত্র ও বয়ন শিল্পের স্থানীয়করণের নিয়ামকসমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (ক) ভৌগোলিক, (খ) অর্থনৈতিক এবং (গ) রাজনৈতিক।
ক. ভৌগোলিক নিয়ামকসমূহ (Geographical factors)
১. কাঁচামালের সহজলভ্যতা: বস্ত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলার সহজলভ্যতা এ শিল্পের সমৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমির কৃষ্ণ মৃত্তিকা অঞ্চলে যে তুলা উৎপাদিত হয় তার ওপর নির্ভর করে মুম্বাই, আহমেদাবাদ, পুনে, সোনাপুর, জলগাঁও প্রভৃতি শহরে এ শিল্প গড়ে উঠেছে।
২. অনুকূল জলবায়ু: বস্ত্র শিল্পের কেন্দ্রীভূতকরণে জলবায়ু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর্দ্র জলবায়ু এ শিল্পের জন্য বিশেষ উপযোগী। যেমন- বাংলাদেশ, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশের আর্দ্র জলবায়ুতে সুতা ছিঁড়ে যায় না। শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ুতে সুতা তৈরির কাজ ব্যাহত হয়। এ পরিবেশে সুতা ছিঁড়ে যায়। যেমন- কানাডা, রাশিয়া। তাই মধ্য এশিয়ার তুলা উৎপাদক অঞ্চলে বস্ত্র ও বয়ন শিল্পের প্রসার ঘটেছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের অবদানে এ শিল্পের কেন্দ্রীকরণে জলবায়ুর প্রভাব বহুগুণে লাঘব করা সম্ভব হয়েছে। কৃত্রিম আর্দ্রতা সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় দেশে এ শিল্পটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেমন- উজবেকিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান।
৩. শক্তি সম্পদ: কার্পাস বয়ন শিল্প প্রতিষ্ঠায় শক্তি সম্পদের সহজলভ্যতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কয়লা, তেল, গ্যাস ও পানি হতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তি যেখানে সহজলভ্য সেখানে এ শিল্প সহজেই গড়ে উঠতে পারে। অনেক সময় শক্তি সরবরাহের ওপর নির্ভর করে আমদানিকৃত তুলার সাহায্যে শিল্পটি প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। যেমন- শক্তি সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় আমদানিকৃত কাঁচামাল দ্বারা জাপানে এ শিল্প গড়ে উঠেছে।
খ. অর্থনৈতিক নিয়ামকসমূহ (Economic factors)
১. শ্রমশক্তির সহজলভ্যতা: শ্রমিক ছাড়া কোনো শিল্প কারখানাই চলতে পারে না। তাই বয়ন শিল্পের কেন্দ্রীকরণেও শ্রমশক্তি মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। দক্ষ ও সুলভ শ্রমিকের কারণে ঘন বসতিপূর্ণ দেশগুলোতে এ শিল্পের প্রসার ঘটেছে। যেমন- ভারত, চীন।
২. পরিবহন ব্যবস্থা: কোনো স্থানে শিল্প প্রতিষ্ঠায় পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের সাথে সাথে নতুন নতুন বয়ন শিল্প এলাকা গড়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাশায়ারে কার্পাস বয়ন শিল্প কেন্দ্রীভূত হওয়ার পিছনে সেখানকার উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ভূমিকা রেখেছে।
৩. বাজারের সান্নিধ্য: বাজার ব্যবস্থা এ শিল্প প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। কাঁচামালের অভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজারের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র) ওপর নির্ভর করে
বয়ন শিল্পের প্রসার ঘটেছে। ৪. উন্নত প্রযুক্তি: উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানের উপর কার্পাস বয়ন শিল্পের উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভর করে। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান প্রভৃতি দেশে এ শিল্পের উন্নতির কারণ প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান।
৫. মূলধন: বৃহদায়তন বয়ন শিল্প গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত মূলধনের প্রয়োজন হয়। কাজেই মূলধনের পর্যাপ্ততা এ শিল্প গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
গ. রাজনৈতিক নিয়ামকসমূহ (Political factors)
১. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: এ শিল্প কেন্দ্রীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। অনেক সময় কোনো স্থানে শিল্প প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সরকার সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। যেমন- সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় মসলিন শিল্প গড়ে উঠেছিল।
২. শিল্পনীতি: সরকারি শিল্পনীতি যেকোনো শিল্পের কেন্দ্রীকরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশ সরকার নির্দিষ্ট স্থানে (রাজশাহী) শিল্পটি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়া সরকার অনেক সময় এ শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঋণ প্রদান করে থাকে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more