(Consequence of Volcanic Eruption)
অগ্ন্যুৎপাতের অনিবার্য ফল হিসেবে সন্নিহিত এলাকায় ভূমিকম্প হয়। তাই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যুগপৎ ভূপৃষ্ঠের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ কোনো কোনো স্থানে এর দ্বারা সামান্য সুফলও পাওয়া যায়। নিচে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলাফল বর্ণনা করা হলো-
সুফল (মঙ্গলকর প্রভাব):
(i) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভস্থ লাভা ভূপৃষ্ঠে সঞ্চিত হয়ে পর্বতের সৃষ্টি করে। এরূপে সৃষ্ট পর্বতকে আগ্নেয় পর্বত বলে। যেমন- ইতালির ভিসুভিয়াস পর্বত।
(ii) আগ্নেয়গিরির ফলে ভূপৃষ্ঠের বিস্তৃত অঞ্চলে লাভা সঞ্চিত হয়ে মালভূমির সৃষ্টি করে। যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি।
(iii) সাগরের তলদেশে আগ্নেয়গিরির লাভা সঞ্চিত হয়ে অনেক সময় দ্বীপের সৃষ্টি করে। যেমন- প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপ।
(iv) মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বৃষ্টির পানি সঞ্চিত হয়ে হ্রদের সৃষ্টি করে। যেমন- আলাস্কার মাউন্টকার্টমা হ্রদ।
(v) আগ্নেয়গিরির লাভা কোনো নিম্নভূমিতে সঞ্চিত হয়ে সমভূমির নদীতে লাভা সঞ্চিত হয়ে সমভূমির সৃষ্টি করেছে।
(vi) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভস্থ লাভা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ ভূপৃষ্ঠে সঞ্চিত হয়ে জমির উর্বরতা শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। যেমন- দাক্ষিণাত্যের উর্বর মালভূমি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
(vii) কখনও কখনও কোনো নিম্নাঞ্চলে লাভা সঞ্চিত হয়ে সমভূমির সৃষ্টি করে এবং এতে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়।
(viii) বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মৃত আগ্নেয়গিরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
(ix) ভূগর্ভ বিভিন্ন প্রকার খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। অগ্ন্যুৎপাতের সময় এসব খনিজ সম্পদ লাভার সাথে মিশ্রিত অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে এসে উপনীত হয়। মানুষ তা সংগ্রহ করে তার কল্যাণে ব্যবহার করে।
কুফল (ক্ষতিকর প্রভাব):
(i) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় তা ভূপৃষ্ঠের বরফ গলিয়ে নিকটবর্তী নিচু এলাকায় অতি দ্রুত ব্যাপক কর্দম প্রবাহ ও বন্যার সৃষ্টি করে।
(ii) অনেক সময় আগ্নেয়গিরির লাভা, ভস্ম, ছাই ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যায়, এর ফলে সূর্য রশ্মির আপতন মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পায় এবং শীত বেড়ে যায়।
(iii) বিস্ফোরক আগ্নেয়গিরি যখন প্রচণ্ড বেগে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায় তখন তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
(iv) কখনও কখনও লোকালয়ে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হয়। এতে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ১০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল।
(v) আগ্নেয়গিরির লাভার চাপে কখনও কখনও ভূত্বকের অংশবিশেষ নিচে নেমে যায় এবং গভীর খাতের সৃষ্টি করে। সুমাত্রা ও জাভার মধ্যবর্তী অংশে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নদীগর্ভে লাভা জমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।
জেনে রাখো:
১৮৭৯ খ্রীষ্টপূর্বে ইতালির পম্পেই নগরীর মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ২০০ লোক লাভা ও ছাই ভস্মের নিচে চাপা পড়ে এবং নগরটি সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাতাসে উৎক্ষিপ্ত অতিরিক্ত ছাই ভস্ম আকাশে বিমান চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। ২০১১ সালে আইসল্যান্ডে সংঘটিত অগ্ন্যুৎপাতে বায়ুমণ্ডলে ভস্মের পরিমাণ এত বেড়ে গিয়েছিল যে, গোটা ইউরোপের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিল।
প্রকৃতির সৃষ্ট আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূপৃষ্ঠের যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাতে সুফল ও কুফল উভয়ই পরিলক্ষিত হয়। মোটকথা, প্রকৃতির ইচ্ছাই এখানে বড় কথা। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীর প্রাণিজগতের যে পরিমাণ উপকার হয় তার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি। প্রকৃতির এ ভয়াবহ রূপকে আধুনিক মানবসভ্যতা এখনও জয় করতে পারেনি।
আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয়দ্বীপ (Volcano and volcanic island)
আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয় দ্বীপ সমুদ্রের তলদেশের সাধারণ ভূমিরূপ এবং এটি সাধারণত সমুদ্র তলদেশ থেকে এক কিলোমিটার (০.৬ মাইল) বা তারও অধিক উচ্চে অবস্থান করে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে দশ হাজারেরও বেশি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ভূভাগের অধিকাংশ আগ্নেয়গিরির ক্রিয়া সমুদ্র খাতের প্রান্তের নিকটে বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকে সংঘটিত হয়ে থাকে।
অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্যসামুদ্রিক শৈলশিরায় বা দ্বীপ বলয় থেকে বাইরে সমুদ্র খাতের মধ্যস্থলে দেখা যায়। সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরি কখনো আলাদাভাবে আবার কখনো অনেকগুলো একসাথে দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের তলদেশে যত আগ্নেয়গিরি আছে এগুলোর অধিকাংশই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। সবচেয়ে বড়গুলোর চূড়া পানির ওপরে এসে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। হাওয়াই দ্বীপ এমনি ধরনের আগ্নেয় দ্বীপ। পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ৯ কি.মি. (প্রায় ৫.৬ মাইল) উচ্চতাবিশিষ্ট হাওয়াই আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ মহাদেশের সর্ববৃহৎ পর্বতের চেয়েও বড়।
বক্রাকারে সজ্জিত দ্বীপপুঞ্জ ও তার ভেতরের দিকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিগুলো গিরিখাতের সাথে সম্পৃক্ত বলে এগুলোকে দ্বীপ বলয় (island arc) বলে। এ ধরনের মহাদেশ ও মহাসাগরের সীমানা হচ্ছে সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূআন্দোলনের ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। দ্বীপ বলয় প্রশান্ত মহাসাগরে খুব বেশি দেখা যায়। আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে এগুলোর সংখ্যা কম। মহাদেশ ও কিছু কিছু বড় দ্বীপ বলয় গোষ্ঠীর (island arc system) মধ্যে অগভীর উপকূলীয় সাগর রয়েছে; যেমন জাপান ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের প্রান্তে আছে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই