hsc

ধীর পরিবর্তনকারী আলোড়ন (পাঠ-৮)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.4k

(Slow Altering Movement)

আকস্মিক পরিবর্তনকারী শক্তি ছাড়াও ভূপৃষ্ঠের উপর আর এক ধরনের শক্তি কাজ করে যার ফলে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভূপৃষ্ঠ তার রূপ পরিবর্তন করে থাকে। অত্যন্ত ধীরে পরিবর্তন করে বলে এই শক্তিকে বলা হয় ধীর পরিবর্তনকারী শক্তি বা আলোড়ন। যেমন- মহাদেশ ও পর্বত গঠনকারী আলোড়ন। এ ধরনের আলোড়ন উল্লম্ব কিংবা আনুভূমিকভাবে কাজ করে তবে এতে ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

১. মহীভাবক আলোড়ন, যা উল্লম্বভাবে কাজ করে; এবং
২. গিরিজনি আলোড়ন, যা আনুভূমিকভাবে কাজ করে।

১.মহীভাবক আলোড়ন: মহীভাবক আলোড়ন উল্লম্বভাবে ক্রিয়াশীল। ফলে ভূপৃষ্ঠ খাড়াভাবে উপর ও নিচে উঠা-নামা করে। ব্যাপক আকারে মহাদেশজুড়ে সাধারণত এরূপ আলোড়ন হয় বলে একে মহীভাবক আলোড়ন বলা হয়। মহীভাবক অর্থ মহাদেশ গঠনকারী।
মহীভাবক আলোড়নের ফলে বিশালায়তন ভূমি ও অন্যান্য মালভূমি, চ্যুতি, স্রস্ত উপত্যকা, স্তূপ পর্বত প্রভৃতি সৃষ্টি হয়। এ আলোড়নের ফলে পূর্ব আফ্রিকা ও জর্ডানের স্রস্ত উপত্যকাসমূহ, রাইন নদীর স্রস্ত উপত্যকা ইত্যাদি গঠিত হয়েছে।

২. গিরিজনি আলোড়ন: গিরিজনি আলোড়ন আনুভূমিকভাবে হয়। ভূঅভ্যন্তরীণ তাপীয় পরিচলন স্রোতের ফলে ভূগর্ভে সঞ্চিত বাষ্পের চাপে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের শিলাসমূহের ওপর চাপের বিভিন্নতার ফলে পার্শ্বদিকে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এর ফলে আনুভূমিকভাবে অবস্থিত স্তরসমূহ উভয়দিক থেকে চাপের সম্মুখীন হয় এবং আস্তে আস্তে কিছু অংশ কুঁচকে যায়, কোনো অংশবিশেষ উঁচু হয়ে উঠে অথবা নিচে নেমে যায়। পার্শ্বদিকে প্রবাহমান এ প্রকার আলোড়নকে আনুভূমিক আলোড়ন বলে। এ আলোড়ন বিশালায়তনের ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে বলে একে গিরিজনি আলোড়ন বলে। এ আলোড়নের ফলে এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের জুরা এবং আফ্রিকার আটলাস পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে। এ আলোড়নের সাথে প্লেটসঞ্চালন ও পরিচলন স্রোত জড়িত।

পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগে উত্তপ্ত বস্তুর মধ্যে তাপ ও চাপের পার্থক্যজনিত কারণে ভূআলোড়নের সৃষ্টি হয়। এটি আকস্মিক অথবা ধীরগতিসম্পন্ন হতে পারে এবং ভূপৃষ্ঠের ওপর আনুভূমিক অথবা উল্লম্বভাবে হতে পারে। ভূআন্দোলনের আকস্মিক পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে যেমন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি ক্রিয়াশীল তেমনি ধীর পরিবর্তনের ফলে পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, হ্রদ, সাগর ও গভীর খাতের সৃষ্টি হয়ে থাকে। সুতরাং ভূপৃষ্ঠে বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ সৃষ্টিতে অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলোর সাথে ভূআলোড়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

পৃথিবীর ধীর পরিবর্তনকারী নিয়ামকসমূহ (Factors of Slow Changes of the Earth)

ভূপৃষ্ঠ সর্বদা পরিবর্তনশীল। আর এ পরিবর্তন আকস্মিক ও ধীর উভয় রকমের হয়ে থাকে। নানা প্রকার বাহ্যিক ও প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যে ব্যাপক পরিবর্তন হয় তাকে ধীর পরিবর্তন বলে। আর এ ধীর পরিবর্তনে যে নিয়ামকগুলো প্রভাব রাখে তা হলো বায়ুর কার্য, বৃষ্টির কার্য, নদীর কার্য, হিমবাহের কার্য, সমুদ্রের কার্য ইত্যাদি। নিম্নে ধীর পরিবর্তনকারী নিয়ামকগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. বায়ুর কাজ: বায়ুতে থাকা অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার বিচ্ছেদ ও ক্ষয়সাধন করে থাকে। বায়ুর ক্ষয়কার্য মরুভূমিতে অধিক দেখা যায়। মরু এলাকা শুষ্ক, প্রায় বৃষ্টিহীন এবং গাছপালা শূন্য হয়ে থাকে। গাছপালা কম থাকার কারণে মরু এলাকার মৃত্তিকা সুদৃঢ় হয় না। এছাড়া দিনের বেলায় সূর্যের তাপে এবং রাতের শীতলতায় শিলার সংকোচন ও প্রসারণের ফলেও মাটির সংবদ্ধতা শিথিল হয়ে যায়। ফলে বায়ুপ্রবাহের দ্বারা এ অঞ্চলের শিলা সহজেই বাহিত হয়ে ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষয়সাধন করে।

২. বৃষ্টির কাজ: বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ভূপৃষ্ঠকে ব্যাপকভাবে ক্ষয় করে থাকে। প্রবাহিত হওয়ার সময় পানি শিলাকে আংশিকভাবে ক্ষয় ও আলগা করে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাকে অপসারিত করে। বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে কর্ষিত জমির মাটি বৃষ্টির পানির দ্বারা অপসারিত হয়। আবার পর্বতের মধ্যে কর্দম স্তরের উপর অনেক ভারি শিলা হেলানো অবস্থায় থাকে। পর্বতের ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে কাদার স্তরকে গলিয়ে দেয়। এতে বড় শিলাস্তর কাদার উপর থাকতে না পেরে নিচে ধসে পড়ে। একে মৃত্তিকাপাত বলে। এভাবে অনেকদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ধীর পরিবর্তন হয়। ..

৩. হিমবাহের কাজ: হিমবাহের দ্বারাও ভূপৃষ্ঠের কোনো কোনো অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষয় হয়ে থাকে। হিমবাহ নিচে নামার সময় এর নিচের প্রস্তরখণ্ড পর্বতগাত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে পতিত হয়। পর্বতগাত্রের মধ্যে যদি ছিদ্র থাকে তাহলে তার ভিতর পানি প্রবেশ করে বরফে পরিণত হয়ে প্রস্তরগুলোকে আলগা করে দেয়। ফলে হিমবাহের চাপে এটি পর্বতগাত্র থেকে সহজেই পৃথক হয়ে যায়। এই কার্য হিমবাহ দ্বারা অনেকদিন ধরে ধীরে ধীরে হয় বলে এটি ভূপৃষ্ঠের ধীর পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

৪. নদীর কাজ: যেসব প্রাকৃতিক শক্তি ভূপৃষ্ঠের প্রতি নিয়ত ধীর পরিবর্তন করছে তাদের মধ্যে নদীর কাজ অন্যতম।
নদী যখন পর্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন স্রোতের আঘাতে বাহিত নুড়ি, কর্দম প্রভৃতির ঘর্ষণে নদীগর্ভ ও পার্শ্বক্ষয় হয়। পার্বত্য অবস্থায় নদীর স্রোতের বেগ বেশি থাকে। এতে নদী নিম্ন ভূমির দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং কোনো সঞ্চয় হতে পারে না। যখন নদী সমভূমিতে আসে তখন নদী ক্ষয় এবং সঞ্চয় দুটোই করে। নদীর চলার পথে যেখানে নরম শিলা পাবে নদী ঠিক সেদিক দিয়ে ক্ষয় করে অগ্রসর হয়। ক্ষয়কৃত নরম শিলা অবক্ষেপণ করে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠন করে। এভাবে নদী ক্ষয় ও সঞ্চয় করতে করতে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। অনেকদিন ধরে এভাবে ক্ষয় ও সঞ্চয় কাজ চলে বলে একে নদীর দ্বারা সৃষ্ট ধীর পরিবর্তন বলে।

৫. সমুদ্রের কাজ: মাঝে মাঝে সমুদ্র উপকূলের পাহাড় থেকে বড় বড় প্রস্তরখণ্ড সমুদ্রে এসে পড়ে। পরবর্তীতে এসব প্রস্তরখণ্ড সমুদ্রস্রোত, সমুদ্রতরঙ্গ ও জোয়ার-ভাটার ফলে নুড়ি ও বালুকাতে পরিণত হয়। সমুদ্র উপকূলের জোয়ার-ভাটা, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতিও প্রতিনিয়ত শিলাকে ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড করছে। সমুদ্রতরঙ্গ যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করে তখন তার ধাক্কায় উপকূলের শিলা ভেঙে পড়ে। এছাড়া জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্রস্রোতের প্রভাবেও উপকূলের শিলা ভেঙে যায়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...