hsc

পাঠ-১৫: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

(Green House Effect)

'গ্রিন হাউস' বা 'সবুজ ঘর' কথাটি প্রকৃতপক্ষে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শীতপ্রধান দেশে তাপমাত্রার অপ্রতুলতার কারণে কাচ নির্মিত ঘরে সূর্যের তাপ ধরে রেখে সবজি উৎপাদন করা হয়। এক্ষেত্রে মাটিতে প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি এবং উত্তপ্ত মাটি হতে পরিচলন প্রক্রিয়ায় তাপ বাইরে যেতে না পারায় তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে ঘর গরম থাকে। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে 'গ্রিন হাউস' বা 'সবুজ ঘর' প্রতিক্রিয়া বলতে বায়ুমণ্ডলে কিছু সংখ্যক গ্যাসের অতিমাত্রায় বৃদ্ধিজনিত কারণে সৌরতাপের অতিরিক্ত শোষণ ও পরবর্তীতে নিষ্ক্রমণে বাধা প্রদানকে বোঝায়। এই ঘটনার অনিবার্য ফল হিসাবে ভূমণ্ডল অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে স্বাভাবিক জীব ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে, যাকে 'গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া' (Green house effect) বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার সংঘটন প্রক্রিয়া (Process of Green House Effect)

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা বায়ুমণ্ডলের উষ্ণায়ন ঘটায়। সূর্যরশ্মি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায় এবং অবশিষ্টাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস কর্তৃক শোষিত ও পুনরায় বিকিরিত হয়ে বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বর্তমানে বিঘ্নিত হচ্ছে মূলত মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে। বিশেষ করে বর্তমান প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতায় ব্যাপকহারে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো হচ্ছে, কৃষির প্রয়োজনে বন উজাড় করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিণতিতে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যাকে বলা হচ্ছে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া। সুতরাং, গ্রিস হাউস প্রতিক্রিয়া সংঘটনে আমরা নিচের ধাপগুলো উল্লেখ করতে পারি

ধাপ-১: সূর্যরশ্মির বিকিরণ ভূপৃষ্ঠস্থ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে; এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায়।
ধাপ-২: অবশিষ্ট সৌরশক্তি, স্থলভাগ এবং সমুদ্রভাগে শোষিত হয়, পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে।
ধাপ-৩: ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিফলিত দীর্ঘ তাপ রশ্মি মহাশূন্যে ফিরে যায়।
ধাপ-৪:গ্রিন হাউস গ্যাস (যেমন- কার্বন ডাইঅক্সাইড) কিছু তাপশক্তি সংরক্ষণ করে। ভূপৃষ্ঠ উষ্ণ রাখে এবং জীবজগতকে বাঁচিয়ে রাখে।
ধাপ-৫: মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড যেমন- জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড়করণ প্রভৃতি বায়ুতে গ্রিন ** হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে।
ধাপ-৬: অতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ও ভূপৃষ্ঠে অতিরিক্ত তাপ ধরে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটায়; আর এটাই গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া।
সংক্ষেপে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলা যায়, এটা বায়ুমণ্ডলে মানবসৃষ্ট কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অপরাপর কার্বন যৌগের (মিথেন, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, পারফ্লোরোমিথেন ইত্যাদি) আবরণের জন্য অতিরিক্ত উষ্ণায়ন।

সারণি-৬.৩: গ্রিন হাউস গ্যাসের মানবসৃষ্ট উৎসসমূহ:

গ্রিন হাউস গ্যাসমানবসৃষ্ট উৎসসমূহ
কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2)জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ পোড়ানো, সিমেন্ট উৎপাদন, বনভূমি নিধন ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন।
মিথেন  (CH4)গ্যাস, খনিজ তৈল অথবা কয়লা উত্তোলনকালীন নির্গমন, জীবজগতের ধ্বংস অথবা প্রাণী পোড়ানো, আর্দ্রভূমির ধানচাষ, বর্জ্য বা আবর্জনার স্তূপ, জবেহকৃত পশুর অবশিষ্টাংশ পচন।
কার্বন মনোক্সাইড (CO)জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, জীব বা প্রাণী পোড়ানো।
ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC).রেফ্রিজারেটর, এরোসল স্প্রে, ফোম প্যাকেজিং, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি।
মিথেন হাইড্রোকার্বনজ্বালানি থেকে বাষ্পীভবন (তরল অথবা অন্যবিধ জ্বালানি)।
পারফ্লোরো মিথেন (CF4)অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন।
নাইট্রাস অক্সাইড (N2O)সার, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, ক্রান্তীয় নির্বনায়ন ও দাবানল, বনভূমি বা পতিত ভূমির কৃষি ভূমিতে রূপান্তর।
নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ (NOx)জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ পোড়ানো।
সালফার হেক্সা ফ্লোরাইড (SF4)অপরিবাহী ফ্লুইড।

উৎস: Santro, S.C. 2005, শহীদ, ২০১৪

পৃথিবীতে তাপ ও শক্তির মূল উৎস সূর্যের আলো। সূর্যরশ্মি পৃথিবীতে আসে ক্ষুদ্র তরঙ্গের আকারে মূলত দৃশ্যমান স্বচ্ছ আলো হিসেবে। এর সবটাই পৃথিবী শোষণ করে না। ইনফ্রারেড রেডিয়েশনের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ থেকে অতিরিক্ত তাপ মহাশূন্যে ফিরে যায়। বায়ুমণ্ডলে কিছু গ্যাস আছে, যাদের অণু দৃশ্যমান আলোর জন্য স্বচ্ছ এবং তা ভূপৃষ্ঠে পড়তে কোনো বাধা পায় না। কিন্তু এরা ইনফ্রারেড রশ্মি বা অবলোহিত রশ্মি (Infrared ray) শোষণ করে। ফলে বিকিরিত তাপের সবটুকু মহাশূন্যে চলে যাবার বদলে একাংশ আবহাওয়ামণ্ডলে থেকে যায়। কতটা তাপ এভাবে থেকে যাবে তা নির্ভর করে কী পরিমাণ এই ধরনের গ্যাস বায়ুমণ্ডলে রয়েছে তার ওপর।

বায়ুমণ্ডলে এ ধরনের গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে ততই বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখার মতো একটি ঢাকনি সৃষ্টি হবে। এটি গ্রিন হাউসের কাঁচের ঢাকনির মতো কাজ করবে এবং পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টি করবে।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...