(Relationship between Natural Resources and Population)
সম্পদ বলতে বুঝায় যার উপযোগ আছে। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনে যা ব্যবহৃত হয় এবং যার অর্থমূল্য আছে তাই সম্পদ। প্রকৃতি অবারিতভাবে মানুষের জন্য যা কিছু দান করেছে তা সম্পদ হিসাবে বিবেচিত। বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, পশু সম্পদ, পানি সম্পদ, মৃত্তিকা সম্পদ ইত্যাদি সবকিছুই প্রকৃতি প্রদত্ত। তবে জনসংখ্যা না থাকলে এগুলো অব্যবহৃত থাকে এবং সেক্ষেত্রে তা সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হবে না। দক্ষ জনশক্তিও একটা সম্পদ। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা অন্যতম খাত হলো বৈদেশিক শ্রমবাজার। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশই জনবিরল উন্নত দেশে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। শিল্প শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর থেকে শুরু করে কম্পিউটার বিশারদ, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সবই 'জনসম্পদের' পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ জনসংখ্যা ও সম্পদের সম্পর্ক সরাসরি। প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ নিজে যেমন সম্পদ তেমনি প্রকৃতির দানকে সরাসরি ব্যবহার করে কিংবা ব্যবহার উপযোগী করে তাকে সম্পদ রূপান্তর করে থাকে। যেমন: মৃত্তিকাকে কর্ষণ করে ফসল না ফলানো পর্যন্ত তা সম্পদ নয়। আবার বনের কাঠ থেকে আসবাবপত্র ও শিল্পজাতদ্রব্য তৈরি না করলে কিংবা তা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার না করলে তা সম্পদের পর্যায়ভুক্ত হবে না। এ ছাড়া প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বনের ফলমূল আহরণ, পশু শিকার, মধু সংগ্রহ, বাঁশ, বেত ও ছনঘাসের ব্যবহারের মাধ্যমে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করেছে। তেমনিভাবে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ মাটির নিচ থেকে কয়লা, লৌহ, তামা, স্বর্ণ, রৌপ্য, তেল, গ্যাস প্রভৃতি আহরণ ও ব্যবহার করে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করেছে। বহমান পানি থেকে পানি বিদ্যুৎ কিংবা সূর্যালোক থেকে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন মানুষেরই কীর্তি এবং মানুষের প্রয়োজনেই তা ব্যবহার হচ্ছে।
উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, জনসংখ্যা ও সম্পদ নিবিড় সম্পর্কযুক্ত। কোনো ভূখণ্ডে জনবসতি না থাকলে সেখানে প্রাকৃতিক ও মানবিক সম্পদ সৃষ্টি হবে না। আবার সম্পদে রূপান্তর উপযোগী প্রকৃতির দানসমূহ না থাকলে সেখানে জনবসতি সৃষ্টি কিংবা জনসম্পদও গড়ে উঠবে না। প্রাচীনকাল থেকে উর্বর মৃত্তিকাযুক্ত নদী তীরবর্তী এলাকায় কৃষিভিত্তিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। আবার নদী ও সমুদ্রপথকে কাজে লাগিয়ে আন্তঃদেশীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। পরবর্তীতে খনি এলাকায় খনিজ উত্তোলনভিত্তিক আবাসন সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ জনসংখ্যা বিকাশের অপরিহার্য উপাদান। কোনো অঞ্চলের সম্পদ যখন জনগণের চাহিদাকে যথাযথভাবে পূরণ করতে পারে না তখন তা অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ হিসাবে গণ্য হয়। জনসংখ্যা তত্ত্ববিদ ম্যালথাসের মতে, ঐ সময় যুদ্ধ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিরিক্ত জনসংখ্যা গ্রাস করে। তবে পৃথিবীতে জনবহুল দেশের পাশাপাশি সম্পদ পরিপূর্ণ জনবিরল দেশও থাকে। সেক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকে সম্পদপূর্ণ অঞ্চল বা দেশের দিকে অভিগমন একটা সাধারণ ঘটনা।
এ অধ্যায়ের প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ
| জনমিতিক উপাদান | জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদানগুলো হলো- আকার, ঘনত্ব, বয়স কাঠামো, প্রজননশীলতা, জন্ম ও মৃত্যুহার, লিঙ্গ অনুপাত। উপাদানগুলোর মধ্যে আকারগত বৈশিষ্ট্য জনসংখ্যার মোট বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রভাবিত করে। ঘনত্বের দ্বারা ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপের তীব্রতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। জনসংখ্যার বয়স কাঠামো কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রকাশ ঘটায়। প্রজনন ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে জনসংখ্যার বয়স কাঠামোকে শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক ও বৃদ্ধ এই তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। কোনো দেশের উন্নতিতে প্রজননশীলতা বা বংশবৃদ্ধির গুরুত্ব রয়েছে। সামাজিক ও জনমিতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রজননশীলতার ভূমিকা রয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুহার জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকে। |
| জন্মহার | কোনো বছরের জন্মিত সন্তানের মোট সংখ্যাকে উক্ত বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে স্থূল জন্মহার পাওয়া যায়। স্থূল জন্মহার (CBR) =কোনো বছরে জন্মিত সন্তানের মোট সংখ্যা/বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা × ১০০০ |
| স্থূল মৃত্যুহার | স্থূল মৃত্যুহার মরণশীলতা পরিমাপের বহুল প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। নির্দিষ্ট কোনো বছরে মৃত্যুবরণকারীদের মোট সংখ্যাকে উক্ত বছরের মধ্যবর্তী সময়ের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে স্কুল মৃত্যুহার পাওয়া যায়। অর্থাৎ স্কুল মৃত্যুহার (CDR) = কোনো বছরে মৃত্যুবরণকারীদের মোট সংখ্যা/ঐ বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা × ১০০০ |
| লিঙ্গ অনুপাত | জনসংখ্যার লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো বলতে একটি দেশে মোট জনসংখ্যার কতজন নারী ও পুরুষ আছে তার পরিসংখ্যানকে বোঝায়। সাধারণত নারী-পুরুষ অনুপাত দ্বারা এরূপ লিজাভিত্তিক বৈশিষ্ট্যের গঠন নির্দেশ করা হয়। লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো নিম্নোক্ত সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। লিঙ্গানুপাত = মোট মহিলার সংখ্যা/মোট পুরুষের সংখ্যা × ১০০। |
| অভিগমন | মানুষ তার নিজের চাহিদা পূরণের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে গমন করাকে অভিগমন বলে। সাধারণত দুই ধরনের অভিগমন দেখা যায়; ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক অভিগমন। স্থানের উপর ভিত্তি করে অভিগমনকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিগমনে ভাগ করা যায়। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের ক্ষেত্রে দেশের সীমা অতিক্রম করতে হয় না। জনমিতিতে আন্তর্জাতিক অভিগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে দেশের জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটে। |
| ট্রানজিশনাল মডেল | জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল জনসংখ্যা বৃদ্ধির আধুনিক মডেল নামে পরিচিত। বিখ্যাত আমেরিকান ভূগোলবিদ ওয়ারেন থমসন ১৯২৯ সালে প্রথম জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল এর ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি একে চারটি ধাপে ভাগ করেন। যেমন- উচ্চ জন্মহার ও মৃত্যুহার, অধিক জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস পায়, মৃত্যুহার ও জন্মহার উভয়ই হ্রাস পায় এবং মৃত্যুহারের তুলনায় কম জন্মহার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ১৯৭৪ সালে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই অধিক ছিল, যা. এই মডেলের প্রথম পর্যায়। এর পরে মৃত্যুহার জন্মহারের তুলনায় কমতে শুরু করে এবং ২০০৮ সালের পর জন্মহার ও মৃত্যুহারের পার্থক্য কমে যাচ্ছে। এক সময় এদেশের জনসংখ্যা জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের চতুর্থ ধাপে পৌছাবে। |
| জনসংখ্যা পিরামিড | জনসংখ্যা পিরামিড হচ্ছে কোনো স্থানের জনমিতিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশক গ্রাফচিত্র। নারী পুরুষের বয়সভিত্তিক বিন্যাস গ্রাফে প্রকাশ করলে ত্রিভুজ বা পিরামিড সদৃশ যে নকশা তৈরি হয় তাকে জনসংখ্যা পিরামিড বলে। এক্ষেত্রে উল্লম্ব অক্ষে (Vertical line) বয়স এবং অনুভূমিক অক্ষের (Horizontal line) বামে পুরুষ ও ডানে নারীর সংখ্যা বা শতকরা হার স্তম্ভে (Bar) স্থাপন করে দেখানো হয়। |
| কাম্য জনসংখ্যা | কোনো দেশের কাম্য জনসংখ্যা বলতে উক্ত দেশের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদসমূহকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জনসংখ্যাকে বোঝানো হয়। কাম্য জনসংখ্যা দ্বারা কোনো দেশের সম্পদসমূহকে পরিকল্পনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা যায় এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব হয়। |
| জনসংখ্যার বিস্ফোরণ | যখন কোনো দেশ বা অঞ্চলে জনসংখ্যার হার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন তাকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বলে। জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে দেশ বা জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাঁধার সৃষ্টি হয়। এর ফলে এমন সব সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা দেশ বা জাতিকে চরম অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য একে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বলা হয়। |
| জনসংখ্যা নীতি | জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত নীতি ও কার্যক্রমের টেকসই (Sustainable) প্রায়োগিক কৌশলই জনসংখ্যা নীতি। জনসংখ্যা নীতি হলো এমন কতগুলো গঠনমূলক ও বাস্তবধর্মী আইনানুগ ব্যবস্থা, যা প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সরকারি পদক্ষেপের সমষ্টি ও সমন্বয় সাধন করে। এই নীতির মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। |
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more