(River System of Bangladesh)
বাংলাদেশের নদীগুলো সারাদেশে জালের মতো বিস্তৃত। নদীর চলার পথে কখনও কখনও ছোট ছোট অন্যান্য নদী বা জলধারা এসে মিলিত হয়ে প্রবাহদান করে-এগুলো উপনদী নামে পরিচিত। যেমন- পদ্মার উপনদী মহানন্দা। আবার কোনো নদী থেকে স্রোতধারা ভিন্ন পথে প্রবাহিত হলে তাকে শাখা নদী বলে। যেমন- মধুমতী পদ্মার শাখা নদী। একটি নদী; এর শাখা এবং উপনদী একত্রে একটি নদীপ্রণালি বা নদীব্যবস্থা (river system) গঠন করে।
বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি নদী, শাখা নদী ও উপনদীর সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কি.মি.। নদীব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের নদীমালাকে চারটি প্রধান নদীব্যবস্থা বা নদী প্রণালিতে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন-(১) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা, (২) গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা, (৩) সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা এবং (৪) চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদ-নদীসমূহ।

১. ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা: এ নদীব্যবস্থা প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বাংলাদেশের উত্তরাংশ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের বাইরে এই নদী ব্যবস্থা প্রায় ৫,৮৩,০০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি নিষ্কাশন অঞ্চলসহ ২,৮৫০ কিলোমিটার সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদী তিব্বতের মানস সরোবর থেকে সাংপো নামে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে। প্রবাহপথে পাঁচটি প্রধান উপনদী থেকে ব্রহ্মপুত্র পানি সংগ্রহ করেছে যার মধ্যে আসামের ডিবং (dibang) এবং লোহিত (lohit); বাংলাদেশের তিস্তা প্রখ্যাত। এ ধারা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মাজাহরালীতে দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে নদীর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা। অধিকতর ক্ষেত্রে যমুনা নামেই পরিচিত। এ ধারা দক্ষিণে ২৭৭ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে আরিচার কাছে আলেকদিয়ায় পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ মিলিত ধারা পদ্মা নামে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রায় ২১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।
করতোয়া যমুনার দীর্ঘতম উপনদী। এর মূলধারা ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর জলাভূমিতে উৎপন্ন হয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিটগড়ের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর দিনাজপুর জেলার খানসামার নিকট থেকে এটি আত্রাই নামে পরিচিত। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে সমাধি ঘাট পর্যন্ত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এ ধারা পুনরায় রাজশাহী জেলার দেওয়ানপুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বরেন্দ্রভূমির মধ্য অংশকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। সবশেষে দক্ষিণ-পূর্বে মোড় নিয়ে পাবনার বাঘাবাড়ির কাছে যমুনায় পতিত হয়েছে। আত্রাই নদীর নিম্নাংশ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবহমান। করতোয়ার অন্য একটি অংশ জলপাইগুড়ি জেলায় উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে। করতোয়ার এ অংশ পাবনা-করতোয়া নামে পরিচিত।
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বামতীরে ধলেশ্বরী নদীর পূর্ব পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য শাখা নদী নেই। তবে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র বাহাদুরাবাদের নিকট থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালে আসামে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী বন্যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের বর্তমান যমুনা নদী বরাবর স্থানান্তরের পূর্বে এটিই ছিল ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারা। এ নদীর শাখানদীগুলো হচ্ছে বংশী, বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়া। বংশী নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মিলিত স্রোতধারা ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে। বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়ার মিলিত প্রবাহ শীতলক্ষ্যা নামে প্রবাহিত হয়ে মুন্সিগঞ্জের নিকট ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিলেছে। ধলেশ্বরী যমুনা নদীর দক্ষিণ তীরের বড় শাখানদী। এটি দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে। শীতলক্ষ্যা আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গজারিয়ার নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।
২. গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা: এটি বৃহত্তর গঙ্গা নদী প্রণালির একটি অংশ। হিমালয় পর্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে সৃষ্ট ভাগীরথী এবং মধ্য হিমালয়ের নন্দাদেবী শৃঙ্গের উত্তরে অবস্থিত গুরওয়াল থেকে সৃষ্ট অলোকনন্দা নদীর মিলিত ধারা গঙ্গা নাম ধারণ করে ভারতের হরিদ্বারের কাছে সমভূমিতে পৌঁছেছে। এ ধারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাজমহল পাহাড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। এরপর রাজশাহী জেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় ১১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলার উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদেশে নদীটির নাম পদ্মা। আরিচার কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। চাঁদপুরের কাছে নদীটি মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। পদ্মার মোট দৈর্ঘ্য ৩২৪ কি.মি.।
উত্তর দিক থেকে আগত পদ্মার প্রধান উপনদী মহানন্দা। পশ্চিমবঙ্গের সর্ব উত্তরের দার্জিলিং-এর নিকটবর্তী পাহাড় শ্রেণি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার উপর দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়। এই নদী পঞ্চগড়ের তেতুঁলিয়া সীমান্ত এলাকা হয়ে ভারতের পূর্ণিয়া ও মালদহ জেলা অতিক্রম করে নবাবগঞ্জের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে গোদাবাড়ীর কাছে পদ্মায় পতিত হয়েছে। নাগর, টাঙ্গন ও পুনর্ভবা মহানন্দার উপনদী।
বড়াল পদ্মার বামতীরের শাখানদী। এ নদী চারঘাটের কাছে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে আটঘড়িয়ার কাছে দুভাগে ভাগ হয়ে মূল স্রোত নন্দনকুজা নামে প্রবাহমান। পদ্মার আরেকটি শাখানদী ইছামতি। এটি পাবনা শহরের দক্ষিণে গঙ্গা থেকে বের হয়ে পাবনা শহরকে দুভাগ করে উত্তর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বেড়া থানার পাশ দিয়ে হুরাসাগরে পড়েছে। বর্তমানে এ নদীর উজানে পাবনা শহরের কাছে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সচল ধারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন নিষ্কাশন খাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৩. সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা: বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী হলো মেঘনা। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত সম্পন্ন অঞ্চলের একটি ধারা (drains) মেঘনা নদীর মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয় (মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত প্রায় ১,০০০ সে.মি.)। নদীটির উৎপত্তি ভারতের শিলং ও মেঘালয় পাহাড়ে। এর প্রধান উৎস বরাক নদী। বরাক-মেঘনার মিলিত দৈর্ঘ্য ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে ৩৪০ কিলোমিটার অবস্থিত। সিলেট জেলার অমলশিদে বাংলাদেশ সীমান্তে বরাক নদী দুই ভাগে ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী গঠন করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মধ্যবর্তী এলাকাটি হাওর এলাকা যা বর্ষা মৌসুমে গভীরভাবে প্লাবিত থাকে। সুরমা ও কুশিয়ারা মারকুলির কাছে পুনরায় মিলিত হয় এবং মেঘনা নামে ভৈরব হয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন গোমতী ও খোয়াই নদী মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেঘালয় ও আসাম থেকে উৎপন্ন আরও কতগুলো পাহাড়ি স্রোতধারা মেঘনার সাথে মিশেছে। ভৈরব বাজার পর্যন্ত সুরমা-মেঘনা নদী প্রণালির নিষ্কাশন এলাকার মোট আয়তন প্রায় ৮০২,০০০ বর্গ কি.মি. যার মধ্যে ৩৬,২০০ বর্গ কি.মি. বাংলাদেশে অবস্থিত।
৪. চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীব্যবস্থা: দেশের অন্যান্য নদী প্রণালি থেকে এই নদী প্রণালি বিচ্ছিন্ন। এই অঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এর উৎপত্তিস্থল মিজোরামের (ভারত) লুসাই পাহাড়ে। এটি রাঙামাটি এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। কাপ্তাই নামক স্থানে এই নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এ অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো- ফেনী, মুহুরী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাকখালি এবং নাফ।
এই চারটি বৃহৎ নদী প্রণালির মাধ্যমে প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো তাদের সর্বোচ্চ পরিমাণে প্রবাহিত হয় এবং মোট প্রবাহমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ১৪০,০০০ কিউসেক এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ ৭,০০০ কিউসেক হ্রাস পায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more