(The Major Mineral Resources of the World)
আকরিক লৌহ
ব্যবহারের দিক থেকে আকরিক লৌহ বিশ্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। আকরিক লৌহ বর্তমান আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ। ঘরের কাজে ব্যবহারের জন্য সামান্য আলপিন থেকে শুরু করে বৃহদায়তনের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এটি অত্যাবশ্যক। লৌহের এই সার্বজনীন ব্যবহারের জন্য আধুনিক যুগকে লৌহ বা ইস্পাতের যুগও বলা হয়ে থাকে।
বিশ্বব্যাপী আকরিক লৌহের উৎপাদন ও বণ্টন
পৃথিবীর সবদেশে কমবেশি আকরিক লৌহ পাওয়া গেলেও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় বিশ্বে মাত্র কয়েকটি দেশ খনি হতে আকরিক লৌহ উত্তোলন করে। US Geological Survey অনুসারে, ২০১৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রায় ২৪৬০ মিলিয়াম মেট্রিক টন আকরিক লৌহ উৎপাদন করে। নিচে পৃথিবীর প্রধান আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশসমূহের মজুদ ও উৎপাদনের পরিমাণ দেখানো হলো-
সারণি-৫.১: পৃথিবীর উৎপাদিত আকরিক লৌহ-২০১৮ (মিলিয়ন মেট্রিক টন)
| দেশের নাম | উৎপাদনের পরিমাণ | মজুদের পরিমাণ | দেশের নাম | উৎপাদনের পরিমাণ | মজুদের পরিমাণ |
| ১. অস্ট্রেলিয়া | ৯০০ | ৪৮,০০০ | ৬. দক্ষিণ আফ্রিকা | ৭৪ | ১,১০০ |
| ২. ব্রাজিল | ৪৬০ | ২৯,০০০ | ৭. ইউক্রেন | ৬০ | ৬,৫০০ |
| ৩. চীন | ৩৩৫ | ২০,০০০ | ৮. কানাডা | ৫২ | ৬,০০০ |
| ৪. ভারত | ২০৫ | ৫,৫০০ | ৯. যুক্তরাষ্ট্র | ৫০ | ৩,০০০ |
| ৫. রাশিয়া | ৯৬ | ২৫,০০০ | ১০. সুইডেন | ৩৬ | ১,৩০০ |
Source: US Geological Survey, Mineral Commodity Summaries, January, 2020
বিশ্বের প্রধান প্রধান আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশসমূহ
১. অস্ট্রেলিয়া: আকরিক লৌহ উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে প্রথম। ২০১৮ সালে এদেশের মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন টন। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও নিউসাউথ ওয়েলসের আয়রন মোনার্ক অঞ্চলে দেশটির প্রধান লৌহ খনিগুলো অবস্থিত।
২. ব্রাজিল: আকরিক লৌহ উৎপাদনে ব্রাজিল বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খনিগুলো থেকে ব্রাজিল প্রচুর পরিমাণে আকরিক লৌহ উত্তোলন করে। ২০১৮ সালে দেশটির উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪৬০ মিলিয়ন টন।
৩. চীন: চীন বিশ্বের তৃতীয় আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশ। ২০১৮ সালে চীনে প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন টন লৌহ উৎপাদিত হয়। দেশটির মাঞ্চুরিয়ার মুকুদেন, সান্টুং উপদ্বীপ, ইয়াংসিকিয়াং নদীর নিম্নাংশ, হোনান, হোপাই, সানটাং, সানবি প্রভৃতি অঞ্চল আকরিক লৌহ উৎপাদনে প্রসিদ্ধ।
৪. ভারত: আকরিক লৌহ উৎপাদনে ভারতের স্থান বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ। ২০১৮ সালে ভারতে প্রায় ২০৫ মিলিয়ন টন আকরিক লৌহ উৎপাদিত হয়। এদেশের লৌহ খনিগুলো উড়িষ্যা, বিহার, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র এবং মধ্য প্রদেশে অবস্থিত।

৫. রাশিয়া: বিশ্বে পঞ্চম প্রধান আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া। ২০১৮ সালে এদেশে প্রায় ৯৬ মিলিয়ন টন আকরিক লৌহ উৎপাদিত হয়। এদেশের ইউরাল পার্বত্য অঞ্চলের ম্যাগনিটোগস্ক, মুরমানস্ক, উরলের ওরস্ক, মস্কোর দক্ষিণে কুরস্ক, টুলা ও মোরকস্ক, লেনিনগ্রাড, বৈকাল হ্রদ প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচুর আকরিক লৌহ উৎপাদিত হয়।
৬. দক্ষিণ আফ্রিকা: বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা আকরিক লৌহ উৎপাদনে ষষ্ঠ। ২০১৮ সালে এখানে প্রায় ৭৪ মিলিয়ন টন লৌহ উৎপাদিত হয়। দেশটির কুম্বা, বিশোক, ম্যাপচ প্রভৃতি অঞ্চলে লৌহের খনি রয়েছে।
৭. ইউক্রেন: আকরিক লৌহ উৎপাদনে ইউক্রেন বিশ্বে সপ্তম। ২০১৮ সালে এদেশের আকরিক লৌহ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন। দেশটির মধ্যভাগের নিকোপল, দক্ষিণের জাপরিঝিয়া এবং পূর্বভাগের মেরিওপল অঞ্চলে আকরিক লৌহের খনিগুলো অবস্থিত।
৮. কানাডা: আকরিক লৌহ উৎপাদনে কানাডা বর্তমান বিশ্বে অষ্টম। ২০১৮ সালে এদেশে প্রায় ৫২ মিলিয়ন টন আকরিক লৌহ উৎপাদিত হয়। মন্ট্রিল, কুইবেক, ল্যাব্রাডর প্রভৃতি অঞ্চলে দেশটির প্রধান আকরিক খনিগুলো অবস্থিত।
৯. যুক্তরাষ্ট্র: আকরিক লৌহ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে নবম স্থানের অধিকারী। ২০১৮ সালে এদেশে প্রায় ৫০ মিলিয়ন টন আকরিক লৌহ উৎপাদিত হয়। এদেশের প্রধান লৌহ খনিগুলো বৃহৎ হ্রদ অঞ্চল, আলাবামা রাজ্য, উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।
১০. সুইডেন: সুইডেন বিশ্বের দশম আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশ। ২০১৮ সালে এদেশে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন টন লৌহ উৎপাদিত হয়। দেশটির নরভিক, কিরোনা, লোলিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আকরিক লৌহ পাওয়া যায়।
১১. অন্যান্য দেশ: উপরিউক্ত দেশগুলো ছাড়াও তুরস্ক, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা, মেক্সিকো, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জাপান, স্পেন, বেলজিয়াম, ইতালি, নরওয়ে, গ্রিস, অস্ট্রিয়া, ফিলিপাইন, লাইবেরিয়া, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, মরক্কো প্রভৃতি দেশ আকরিক লৌহ উৎপাদন করে থাকে।
আকরিক লৌহের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
আকরিক লৌহের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খুবই ব্যাপক ও বিস্তৃত। যে সকল দেশ আকরিক লৌহ রপ্তানি করে এবং পৃথিবীর লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে উন্নত সে দেশগুলোর মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ব্রাজিল, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বেলজিয়াম প্রধান। আর যে সকল দেশ আকরিক লৌহ আমদানি করে এবং লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে অনুন্নত সে দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স, সুইডেন, স্পেন, লুক্সেমবার্গ, লাইবেরিয়া, আলজেরিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি প্রধান।
আকরিক লৌহের ব্যবহার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার ভিত্তি হলো আকরিক লৌহ। কোনো দেশের কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক উন্নতি আকরিক লৌহের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে আকরিক লৌহ উৎপাদনে প্রসিদ্ধ দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট উন্নত (যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য)। আকরিক লৌহের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো-
১. লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো আকরিক লৌহ।
২. মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা নির্বাহের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দা, কান্তে, কোদাল, খুন্তি, কুড়াল ইত্যাদি প্রস্তুত করতে লৌহ ব্যবহৃত হয়।
৩. কৃষিক্ষেত্রে লাঙলের ফলা হতে শুরু করে নানা প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতি, ট্রাক্টর, রিপার, হারভেস্টার, ঝাড়াই ও মাড়াইকল ইত্যাদি নির্মাণে লৌহ ব্যবহৃত হয়।
৪. পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রেও আকরিক লৌহের প্রয়োজন হয়। যেমন- রেলগাড়ির ইঞ্জিন, জাহাজ, মোটরগাড়ি, বিমান, সাইকেল ইত্যাদি নির্মাণে অধিক পরিমাণে লৌহের প্রয়োজন হয়। এছাড়া রেলপথ, সেতু ইত্যাদি নির্মাণেও লৌহ ব্যবহৃত হয়।
৫. লৌহ দ্বারা তৈজসপত্রাদি, বাসনপত্র, ঘরের দরজা, জানালা ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়।
তাই যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নতিতে আকরিক লৌহের ব্যবহার ও গুরুত্ব অপরিসীম।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more