hsc

পাঠ-৪: বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃতি

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

938

(The Trading Aspects of Bangladesh)

মানুষের অভাব ও চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় এবং এর সাথে জড়িত কার্যাবলিই হচ্ছে বাণিজ্য। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুই ধরনের বাণিজ্যই সংঘটিত হয়। যখন একই দেশের দুটি অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালিত হয় তখন তাকে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বলে। আবার যখন দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে পণ্য বিনিময় হয় তখন তাকে বৈদেশিক বাণিজ্য বলে। পৃথিবীর কোনো দেশই প্রয়োজনীয় সবকিছু দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন করতে পারে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যে পণ্য বাংলাদেশে অধিক উৎপাদন সম্ভব হয় তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। যেমন- তৈরি পোশাক। আবার যে পণ্য এখানে উৎপাদিত হলেও দেশের চাহিদা মেটে না তা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। যেমন: চাল, গম ইত্যাদি। এভাবে লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃতি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. প্রারম্ভিক ধারা: ১৯৭১ এবং ১৯৯১ সনের মধ্যে রপ্তানি মূল্যের তুলনায় আমদানি মূল্য। প্রায় দ্বিগুণ ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে রপ্তানি পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সদস্যপদ লাভ করে। এরপর থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে বাংলাদেশ গভীরভাবে যুক্ত হয়। বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বাংলাদেশের বাণিজ্যে পাট অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। ১৯৯৭ সালে প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট। পরবর্তীতে নিটওয়‍্যার, প্লাস্টিক সামগ্রী, ওষুধ ইত্যাদি পণ্য বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয়।

২. কাঁচামালের আমদানিতে অগ্রাধিকার: বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর মধ্যে মেশিনারি দ্রব্যাদি, রাসায়নিক, লৌহ ও ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্যদ্রব্য, পেট্রোলিয়াম দ্রব্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির একটি নতুন সংযোজন হচ্ছে কাঁচামাল আমদানিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অধিক কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

৩. জনশক্তি রপ্তানি: বাংলাদেশ মানব সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই বিপুল জনশক্তি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে বোঝা মনে করা হতো কিন্তু বর্তমানে জনশক্তি রপ্তানি করায় বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে।

৪. রপ্তানির বৈচিত্র্যকরণ: বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানি
পণ্যে কিছু অপ্রচলিত পণ্য যুক্ত হওয়ায় বাণিজ্য প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। ৯০ দশক থেকে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার রপ্তানি করায় রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলো হলো-গার্মেন্টস বা পোশাকশিল্প, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া ইত্যাদি। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে।

৫. ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় আমদানি: স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় আমদানি হতো না। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রকৃতিতে আরেকটি পরিবর্তন হলো ওয়েজ আর্নার্স স্কিমের আওতায় প্রচুর পরিমাণ পণ্যসামগ্রী আমদানি করা। এটা জনশক্তি রপ্তানি বাণিজ্যকে আরো উৎসাহিত করে।

৬. অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি: বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারায় কাঁচামালের পরিবর্তে অপ্রচলিত
পণ্যের রপ্তানি দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যের বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশ্যে প্রচলিত পণ্য ছাড়া অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানির সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য অপ্রচলিত পণ্যগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, কুটির শিল্পজাত দ্রব্য, শুকনো মাছ, হিমায়িত চিংড়ি, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রীর চিপস (গুঁড়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

৭. আমদানি নীতিতে একচেটিয়া প্রভাব হ্রাস: বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতিতে অতীতে বাণিজ্যিক আমদানিকারক নামে এক শ্রেণিপ্রথা ছিল। বাণিজ্য প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারায় এই শ্রেণিপ্রথা বিলোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল মুষ্টিমেয় বণিক শ্রেণির একচেটিয়া প্রভাব হ্রাস।

৮. রপ্তানি শিল্পের উন্নয়ন: বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি হলো রপ্তানি শিল্পের উন্নয়ন। গত শতাব্দীর তুলনায় একবিংশ শতাব্দীতে রপ্তানি শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার অভাব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত উন্নতি লাভ করায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৯. বিলাস দ্রব্যাদির আমদানি: বাংলাদেশের একটি নেতিবাচক বাণিজ্য প্রকৃতি হচ্ছে বিলাস দ্রব্যাদি আমদানি। এসব বিলাস দ্রব্যাদি আমদানির কারণে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। এই অপচয় রোধ করার জন্য বিলাস দ্রব্যাদির আমদানি হ্রাস করে অধিক মাত্রায় উন্নয়ন সামগ্রী আমদানি করা প্রয়োজন।

১০. সমাজতান্ত্রিক ও মুসলিম দেশের সাথে বাণিজ্য: বাংলাদেশের বাণিজ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠা। যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সাথে সমাজতান্ত্রিক ও মুসলিম দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে।

১১. বাণিজ্য বৃদ্ধি: ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার বাণিজ্য বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সে সময় থেকে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চিংড়ি রপ্তানি বৃদ্ধি পেতে থাকে যা থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উন্নতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো শ্রমিক প্রাপ্তির সহজলভ্যতা। এই শিল্পে ৩ মিলিয়ন বা ৯০% মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। পোশাক শিল্পের রপ্তানির সর্বোচ্চ গন্তব্যস্থল হলো যুক্তরাষ্ট্র। সরকার এই শিল্পের বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে EPZ স্থাপন করেছে।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রকৃতি স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। সে সময়ে আমদানির তুলনায় রপ্তানি পণ্য খুব কম ছিল। বর্তমানে দেশে বাণিজ্য পরিকল্পনার ফলে রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাণিজ্য (Trade) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...