hsc

প্রাকৃতিক ভূগোলের সংজ্ঞা (পাঠ-১)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.8k

(Definition of Physical Geography)

মানুষের আবাসভূমি হিসেবে পৃথিবীর বর্ণনাকেই বলা হয় ভূগোল। ইংরেজি 'Geography' শব্দ হতে বাংলা 'ভূগোল' শব্দটি এসেছে। 'Geography' শব্দটি মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। 'Geo' অর্থ পৃথিবী আর 'Graphy' অর্থ হলো বর্ণনা। সুতরাং শব্দগত অর্থে 'Geography' বলতে 'পৃথিবীর বর্ণনা' বা 'Description of the Earth' কেই বোঝানো হয়। গ্রিক ভূগোলবিদ ইরাটসথেনিস (Eratosthenes) সর্বপ্রথম 'Geography' শব্দটি ব্যবহার করেন।

Heritage Dictionary (২০০০) অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ভূগোল বা Physical Geography, Geosystem অথবা Physiography নামেও পরিচিত। প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রাথমিক উপক্ষেত্র হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল (আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞান), প্রাণী ও উদ্ভিদ (জীবভূগোল), প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য (ভূমিরূপ বিজ্ঞান), মৃত্তিকা এবং পানি।

বিজ্ঞানের যে শাখা অধ্যয়নে ভূত্বকের উপরিভাগের ভৌত পরিবেশ এবং এতে কার্যরত বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়াসমূহ সম্পর্কে জানা যায় তাই প্রাকৃতিক ভূগোল বা Physical Geography। ভূগোলের সংজ্ঞার আলোকে প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কে বলা যায়, প্রাকৃতিক ভূগোল হলো "প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের (জলবায়ু, উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি) স্থানিক ও কালিক বিশ্লেষণ।” আঞ্চলিক স্কেলের প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, "প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের আঞ্চলিক তারতম্য বিশ্লেষণ করাই প্রাকৃতিক ভূগোল। আরও ব্যাপক অর্থে বলা যায়, “স্বল্প, মধ্যম বা দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চসমূহের বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানিক বিশ্লেষণই প্রাকৃতিক ভূগোল।"

অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোল হলো ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক অবয়ব সম্পর্কিত পাঠ। ভূবিজ্ঞানের শাখা হিসেবে বিবেচিত এ শাস্ত্রটি ভূমি সৃষ্টি ও গঠন ছাড়াও, জলবায়ু এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বণ্টন সম্পর্কে পর্যালোচনা করে।

American Heritage Science Dictionary (2005) অনুযায়ী, “পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক চিত্রাবলির বিশেষত চলতি বিষয়াবলির বিজ্ঞানসম্মত পাঠই হলো প্রাকৃতিক ভূগোল।" -প্রাকৃতিক ভূগোল ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক প্যাটার্ন বা ধরন এবং পদ্ধতি সম্পর্কিত আলোচনাকে অন্তর্ভুক্ত করে। মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়াও এর আওতাভুক্ত এবং এটা ভূগোলের একটি উপক্ষেত্র।

খ্যাতনামা আমেরিকান ভূগোলবিদ রিচার্ড হার্টশোর্ন-এর মতে, "ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের সঠিক, সুবিন্যস্ত ও যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সরবরাহ করা প্রাকৃতিক ভূগোলের কাজ।"

আরেক আমেরিকান ভূগোলবিদ Christine E Michael (2010) তার 'Physical Geography' গ্রন্থে, প্রাকৃতিক ভূগোলের সংজ্ঞার্থে বলেন, "প্রাকৃতিক ভূগোল ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক প্যাটার্ন বা ধরন এবং পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে। মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়াও এর আওতাভুক্ত এবং এটা ভূগোলের একটি উপক্ষেত্র।"

একাডেমিকভাবে ভূগোলের এই উপক্ষেত্র অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূগোলকে 'Human- Land Tradition' বা 'মানবভূমি ধারা' বলা হয়ে থাকে (Pidwirny, 2006)। বিগত কয়েক দশকে মানুষের হস্তক্ষেপে পরিবেশ অবক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়াতে ভূগোলের এই শাখা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভূগোলের পরিধি সাধারণভাবে প্রকৃতির স্থানিক বিশ্লেষণ অপেক্ষা অনেক বৃহত্তর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ বিষয়টি কীভাবে প্রকৃতির ওপর মানুষ প্রভাব বিস্তার করে সে বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করে থাকে। জার্মান ভূগোলবিদ ফ্রেডরিখ র‍্যাটজেল এবং আমেরিকান এলেন চার্চিল সেম্পল এ ধারণাটির ব্যাপক প্রচলন ঘটান।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

(Nature of Physical Geography)

প্রাকৃতিক ভূগোল স্থানিকভাবে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ পরীক্ষা ও অনুসন্ধান করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রাকৃতিক ভূগোল আবহাওয়া ও জলবায়ু, মৃত্তিকা, উদ্ভিদ, প্রাণী, পানি ও এর বিভিন্ন রূপ এবং ভূমিরূপের স্থানিক বিন্যাস অধ্যয়ন করে থাকে। প্রাকৃতিক ভূগোলবিদগণ উপরিউক্ত প্রপঞ্চসমূহের আন্তঃসম্পর্ক এবং মানুষের কার্যকলাপের সাথে তাদের সম্পর্ক অর্থাৎ মানুষের হস্তক্ষেপে তাদের পরিবর্তন নিয়েও পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ দিয়ে থাকেন। সুতরাং দেখা যায় বর্তমানে প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রকৃতি কিছুটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচ্য বিষয়গুলো হলো:

১. পৃথিবীপৃষ্ঠ এবং এর অন্তর্ভুক্ত অজীব ও সজীব উপাদান নিয়ে আলোচনা করা।
২. বিশ্বপ্রকৃতিতে তথা মহাবিশ্বে সৌরজগতের উৎপত্তি ও বিকাশ অধ্যয়ন।
৩. পৃথিবীর উৎপত্তি এবং আকার, আয়তনসহ সকল প্রপঞ্চের বর্ণনা দান।
৪. পৃথিবীতে শক্তির উৎস, ব্যবহার এবং পুনঃব্যবহার আলোচনা করা।
৫. ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তিসমূহ আলোচনা করা।
৬. প্রাকৃতিক নিয়ম-বিধি আলোচনা করা।
৭. প্রকৃতির সক্রিয় উপাদান হিসেবে মানুষের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রাকৃতিক ভূগোল মূলত বর্ণনাভিত্তিক। অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়বস্তুর বর্ণনায় প্রাকৃতিক ভূগোলের আলোচনা প্রাণবন্ত হয়। যেমন- পৃথিবীব্যাপী বনভূমির বিস্তরণ আলোচনা করা ভূগোলের এ শাখাটির কাজ। কিন্তু সেই সাথে এ বিস্তরণের ব্যাখ্যা এবং মানবীয় কার্যাবলির উপর বনভূমির বিস্তরণের প্রভাব বর্ণনা করাও প্রাকৃতিক ভূগোলের কাজ। এ প্রেক্ষিতে কখনও কখনও প্রাকৃতিক ভূগোল বর্ণনার সাথে সাথে রীতিবন্ধ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।

প্রাকৃতিক ভূগোল একটি গতিশীল বিজ্ঞান। ভূপৃষ্ঠের প্রকৃতির সজীব ও অজীব উপাদানগুলো ভূগোলের এ শাখার মূল বিষয়। সজীব উপাদান; উদ্ভিদ ও প্রাণিপ্রজাতি সর্বদাই ক্রিয়াশীল। অজীব উপাদানগুলো প্রাণের নিরিখে ক্রিয়াশীল নয়। কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে এ উপাদানগুলোও সর্বদা পরিবর্তনশীল। যেমন- ভূমিরূপবিদ্যা শাখায় দেখা যায়, ভূপৃষ্ঠ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির (ধীর ও আকস্মিক পরিবর্তনকারী) প্রভাবাধীন। ভূআলোড়ন, অগ্ন্যুৎপাত, বিচূণীভবন প্রক্রিয়ায় ভূমিরূপগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং, প্রাকৃতিক ভূগোলের উপাদানসমূহ স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে সর্বদা সক্রিয় এবং পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই গতিশীল এসব উপাদানের আলোচনায় প্রাকৃতিক ভূগোলেও নিত্য নতুন তত্ত্ব, তথ্য, প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে। এভাবে ভূগোলের এ শাখাটি গতিশীল থেকে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌছেছে।

প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...