(Causes of Variation of Population Density in Bangladesh)
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ঘনত্বের তারতম্য লক্ষ করা যায়। ভূপ্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়িয়া অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অন্যদিকে, উর্বর সমতল ভূভাগ ও অর্থনৈতিক কারণে ঢাকা বিভাগে জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক পরিলক্ষিত হয়।
সারণি-২.১৬: বিভাগ অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব, ২০১১
| বিভাগ | জনসংখ্যার ঘনত্ব (বর্গকিলোমিটার) |
| ঢাকা | ১৫২৩ |
| রাজশাহী | ১,০১৫ |
| চট্টগ্রাম | ৮৪১ |
| খুলনা | ৭০৪ |
| সিলেট | ৭৮০ |
| বরিশাল | ৬২৬ |
| রংপুর | ৯৬০ |
| ময়মনসিংহ | ১০৭৪* |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো: Population and Housing Census 2011
(*wikipedia-2018)
নিচে বাংলাদেশের লোকবসতি ঘনত্বের তারতম্যের কারণসমূহ বর্ণনা করা হলো-
১. ভূপ্রকৃতি: ভূভাগের গঠন প্রকৃতির ওপর জনসংখ্যার বণ্টন বহুলাংশে নির্ভরশীল। উচ্চ পার্বত্য এলাকা অপেক্ষা সমভূমিতে মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সহজ বলে সমভূমি অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশের সমতল ভূমি অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক। পক্ষান্তরে, পার্বত্য চট্টগ্রামে লোকবসতি অনেক কম।
২. জলবায়ু : জনসংখ্যা বণ্টনের ওপর জলবায়ুর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। অনুকূল সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করায় বাংলাদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার অধিক ঘনত্ব লক্ষণীয়।
৩. মৃত্তিকার উর্বরতা: মৃত্তিকার উর্বরতা জনসংখ্যার বণ্টনকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় কৃষিই এদেশের মানুষের প্রধান উপজীবিকা। কৃষিকাজের জন্য উর্বর মৃত্তিকা অত্যন্ত উপযোগী। ফলে বাংলাদেশের যে সকল অঞ্চলের মৃত্তিকা অত্যন্ত উর্বর সে সকল অঞ্চলের লোকবসতি অত্যন্ত ঘন। অপরদিকে, পাহাড়ি এলাকা, প্রাচীন পাললিক সমভূমি অঞ্চল, ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় এবং রংপুর ও দিনাজপুরের অনুর্বর মৃত্তিকা গঠিত অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।
৪. বৃষ্টিপাত: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিকাজের জন্য সময়মতো ও পরিমিত বৃষ্টিপাত একান্ত প্রয়োজন। যে সকল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত পরিমিত তথায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। যেমন- বাংলাদেশের পদ্মা ও যমুনা নদীর পশ্চিম তীর অপেক্ষা পূর্ব তীরে পরিমিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষিকার্য সহজভাবে সম্পাদন করা যায়। ফলে এ পাড়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি।
৫. সেচ ব্যবস্থা: কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। বাংলাদেশের যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম কিন্তু সেচ কার্যের সুবিধা রয়েছে সেসব এলাকায় লোকবসতির ঘনত্ব বেশি। যেমন: চাঁদপুর জেলা।
৬. নদী অববাহিকা: নদী অববাহিকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি হয়। কারণ-
ক. পানির উৎস ও সহজে মৎস্য পাওয়া যায়।
খ. জীবনধারণের জন্য সহজেই চাষাবাদ করা যায়।
গ. যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক।
এসব কারণে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক।
৭. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: জনসংখ্যা বণ্টনে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব অপরিসীম। যে সকল অঞ্চলে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত তথায় লোকবসতি বেশি। সড়ক, রেল ও নৌপথে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়িয়া এলাকা এবং সুন্দরবন ব্যতীত বাংলাদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি।
৮. শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য: শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি বা অবনতির ওপর জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে। যে সকল অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানায় উন্নত তথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্বও বেশি। শিক্ষা মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন আনে।
৯. নগরায়ণ: নগরায়ণের ওপর জনসংখ্যার ঘনত্ব নির্ভরশীল। শহরে মানুষের জীবনধারণের উপযোগী সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকায় লোকবসতি অধিক ঘন হয়। যেমন- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় লোকবসতি সর্বাধিক।
১০. খনিজ সম্পদ: বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় সেসব অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। যেমন- সিলেট, কৈলাশটিলা, তিতাস গ্যাস অঞ্চলে লোকবসতি ঘন।
১১. বনভূমির অবস্থান: দুর্গম বনাঞ্চল থাকায় দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। পার্বত্য রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও ঐ কারণে জনবসতি কম।
বাংলাদেশের সমতল উর্বর মৃত্তিকা, সমভাবাপন্ন জলবায়ু ইত্যাদি প্রাকৃতিক নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ বহুবিধ অর্থনৈতিক কারণে জনসংখ্যার ঘনত্বের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more