(Layers of Atmosphere)
উপাদানের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে দু'টি ভাগে ভাগ করা যায়। উপরের দিকে যথা- (ক) সমমণ্ডল ও (খ) বিষমমণ্ডল।
ক. সমমণ্ডল (Homosphere): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ কি.মি. পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বিশেষ করে গ্যাসের অনুপাত প্রায় সমান থাকে বলে এ অংশকে সমমণ্ডল বলে।
খ. বিষমমণ্ডল (Heterosphere): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে ৮৫-১০,০০০ কি.মি. পর্যন্ত এই অঞ্চল বিস্তৃত।
বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাতের ভিন্নতা এবং উচ্চতাভেদে সমজাতীয় গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরগুলোর দূরত্ব পৃথক হবার দরুন এ মণ্ডলকে বিষমমণ্ডল বলে। এ মন্ডলে নিচের দিকে তাপমাত্রা উচ্চতার সাথে সাথে বৃদ্ধি পেলেও উপরে বিপরীত অবস্থা ঘটে। এই মণ্ডলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম সম্পন্ন চারটি স্তরের অস্তিত্ব দেখা যায়। যেমন-
(১) আণবিক নাইট্রোজেন, (২) পারমাণবিক অক্সিজেন, (৩) হিলিয়াম ও (৪) হাইড্রোজেন স্তর।
তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ ও ঘনত্বের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস ও বৈশিষ্ট্য
আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রার পার্থক্যের ভিত্তিতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস করেছেন। উল্লম্বভাবে (Vertically) বায়ুর তাপমাত্রার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা: ১. ট্রপোস্ফিয়ার, ২. স্ট্রাটোস্ফিয়ার, ৩. মেসোস্ফিয়ার, ৪. আয়োনোস্ফিয়ার ও ৫. এক্সোস্ফিয়ার।

এই পাঁচটি স্তরের মধ্যে প্রথম তিনটি বায়ুমণ্ডলের নিম্ন অংশে রয়েছে, যা সমমণ্ডলের অন্তর্গত। আর শেষের দু'টি ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলে, যা বিষমমণ্ডলের অন্তর্গত।
১. ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere) : বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তরটি ট্রপোস্ফিয়ার। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্তর। কেননা আবহাওয়ার প্রায় সকল প্রকার উপাদান; যেমন- ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত, মেঘ, তুষারপাত, শিশির, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ প্রভৃতি এই স্তরে বিদ্যমান। এ কারণে একে আবহাওয়ামণ্ডল বলা হয়। কাজেই জীবমণ্ডলের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) জন্য এই স্তর অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই স্তরে প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.৪° সে. তাপমাত্রা কমতে থাকে। তাপমাত্রার এই কমার হারকে বলা হয় স্বাভাবিক তাপ হ্রাস হার (Normal Lapse Rate)। এই মন্ডলের উচ্চতা নিরক্ষরেখা (১৬ কি.মি.) থেকে মেরুর দিকে (৭ কি.মি.) কমতে থাকে। এর গড় গভীরতা ১২ কি.মি.। এই স্তরের ওপরে ১.৫ কি.মি. পুরু অংশকে বলা হয় ট্রপোপজ (Tropopause) বা ট্রপোবিরতি। এই অংশে বায়ু স্থির থাকে। তাপমাত্রার পরিবর্তন হয় না বলে একে সমোষ্ণ অঞ্চল (isothermal zone) বলে। এই অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ থাকে না বলে বিমান বিনা বাধায় চলাচল করে।
২. স্ট্রাটোস্ফিয়ার (Stratosphere) : ট্রপোপজ থেকে এই স্তরের বিস্তার প্রায় ৩০ কি.মি.। ট্রপোপজ থেকে ওপরের দিকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রথমত স্থির থাকে; কিন্তু পরে ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে (২০ কি.মি. পর থেকে)। এই স্তরে ধূলিকণা ও জলীয়বাষ্পের পরিমাণ খুবই নগণ্য এবং স্তরটি প্রায় মেঘশূন্য থাকে। বাতাস অত্যন্ত হালকা থাকে। এখানে বাতাসের ঊর্ধ্ব বা নিম্নগতি নেই, কিন্তু সমান্তরাল গতি দেখা যায়। এই স্তরের ঊর্ধ্বসীমাকে স্ট্রাটোপজ (Stratopause) বা স্ট্রাটোবিরতি বলে। এর ওপর থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুতহারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। স্ট্রাটোস্ফিয়ারের নিচের অংশে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ কি.মি. উপরের অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণ ওজোন (O3) গ্যাসের সমাবেশ দেখা যায়। এজন্য এই স্তরকে ওজোনোস্ফিয়ারও বলা হয়। তবে ১৫-১৬ কি.মি. এর মধ্যে গভীর ওজোনস্তর বিদ্যমান। সূর্য হতে আগত অতিবেগুনি রশ্মিকে ওজোন স্তর বা ওজোন পর্দা অতি সহজে শোষণ করে। এই কারণে এখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। এই স্তর না থাকলে অতিবেগুনি রশ্মির দহনে প্রাণীর দেহ পুড়ে যেত এবং সমস্ত প্রাণিকুল অন্ধ হয়ে যেত। তাই বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে 'পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌর পর্দা' বলে।
৩. মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere) : স্ট্রাটোবিরতির উপরে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে মেসোমণ্ডল বলে। মহাকাশ থেকে যে সব উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে সেগুলো এ স্তরে এসে ভস্মীভূত হয়। এ স্তরে তাপমাত্রা উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং -৮৩° সেলসিয়াস পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। মেসোস্ফিয়ারের সর্বোচ্চ সীমাকে মেসোপজ (Mesopause) বলে। এটাই সমমণ্ডলের শেষ সীমা। এ স্তরের উপরে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া থেমে যায়।
৪. আয়োনোস্ফিয়ার/থার্মোস্ফিয়ার (Ionosphere/Thermosphere): এই স্তরের ব্যাপ্তি ৮০ থেকে ৭০০ কি.মি. পর্যন্ত। মেসোপজ-এর পর থেকেই আয়ন স্তরের সীমানা শুরু হয়। বায়ুর তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় বলে একে থার্মোস্ফিয়ার বলে। এই বৃদ্ধি ১০০০° সে. পর্যন্ত পৌছে।
আয়নোস্ফিয়ারকে থার্মোস্ফিয়ারের অন্যরূপ বলা যেতে পারে। এ স্তরে বায়ু আয়নিত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ এ অঞ্চলটি বিদ্যুৎযুক্ত কণা তথা আয়ন ও ইলেকট্রনে পূর্ণ হয়ে আছে। তড়িতযুক্ত কণার উপস্থিতির জন্যই একে আয়নোস্ফিয়ার বলা হয়। এই স্তরের প্রধান উপাদান হলো আণবিক নাইট্রোজেন ও পারমাণবিক অক্সিজেন। এই দু'টি উপাদান সৌরশক্তির অতি শক্তিশালী গামা ও এক্স-রে (x-ray) রশ্মিকে খুব সহজে শোষণ করে। এই স্তর থেকে বেতার তরঙ্গ (ক্ষুদ্র ও দীর্ঘ) প্রতিফলিত হয়; যার দরুন বেতার যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।
৫. এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere): বায়ুমণ্ডলে ৮০-১০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে এক্সোস্ফিয়ার বলে। এটি প্রধানত অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দ্বারা গঠিত। এখানে আয়নের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই স্তরের ঊর্ধ্বে ২০০০-৪০০০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (magnetosphere) বলে। এই অঞ্চলকে বিভিন্ন গ্যাসের উপস্থিতির কারণে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ক. আণবিক নাইট্রোজেন স্তর, খ. পারমাণবিক অক্সিজেন স্তর, গ. হিলিয়াম স্তর এবং ঘ. হাইড্রোজেন স্তর।
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more