(Effects of Green House Effect)
বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির ফলে পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থার উপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি মানব স্বাস্থ্য ও শস্যের উপর এটি নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
১. সমুদ্রগর্ভে তলানো: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া চলতে থাকলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫০ থেকে ৪.৫° সেলসিয়াস
পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। ফলে মেরু অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়বে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উপকূলীয় এলাকার এক বিরাট অংশ তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, সিউল, বেইজিং ইত্যাদি শহরের জন্য এটা হয়ে দাঁড়াবে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সার্কভুক্ত দেশ বাংলাদেশ ও মালদ্বীপসহ পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী বিরাট জনপদ ধ্বংসের মুখোমুখি হবে; এ আশঙ্কা আজ আর কল্পনাপ্রসূত নয়। জাপানের বিজ্ঞানীরা এক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন যে, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার দরুন সমুদ্রের পানির উচ্চতা যদি ১ মিটারও বেড়ে যায়, তবে টোকিও শহরের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রের পানির উচ্চতা ১.৫ মিটার বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী বিরাট এলাকা পানির নিচে চলে যাবে, যেখানে বাস করে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের চেয়েও বেশি।
২. আবহাওয়ার পরিবর্তন: বিজ্ঞানীদের ধারণা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমণ্ডল ১০০-১৫০ কিলোমিটার উত্তরে ও দক্ষিণে সরে যাবে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর অর্ধেক এলাকা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি অন্যদিকে সমপরিমাণ এলাকা এর দ্বারা উপকৃত হবে। বর্তমানে খরা কবলিত আফ্রিকা মহাদেশের সুদান, চাঁদ, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা দেশে পরিণত হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তনে উত্তর-পূর্ব চীন শুষ্ক হবে এবং ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া আরও বর্ষাসিক্ত হয়ে উঠবে। শীতপ্রধান দেশ কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় শীত আর তত থাকবে না। এভাবে ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের চেহারাই বদলে যাবে।
৩. শস্যের ক্ষতি: কৃষিজাত ফসল উৎপাদনের জন্য বাতাসে প্রতি ১০ লক্ষ ভাগে ২৮০ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড থাকা প্রয়োজন। এর কম হলে ফসলের ফলন হ্রাস পাবে। আবার এর পরিমাণ ২০ ভাগ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে কোনো কোনো ফসলের গুণগত মান হ্রাস পায়। এতে ধান ও সয়াবিনের মতো যাবতীয় লতাগুল্ম ও শস্যে সালোকসংশ্লেষণ হ্রাস পাবে। এতে শর্করা উৎপাদন কমে যাবে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে যে হারে কার্বন ডাইঅক্সাইড বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৭৫ সালে বাতাসে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রতি ১০ লক্ষ ঘন সেন্টিমিটারে ১০০০ ঘন সেন্টিমিটার। এতে শস্যের পর্যাপ্ত ক্ষতি হবে।
৪. জলজ প্রাণী সম্পদ ধ্বংস: ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পৃথিবীপৃষ্ঠে অতিবেগুনি রশ্মি পতিত হবে। ওজোন ১% হ্রাস
পেলে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব বেড়ে যাবে। এভাবে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব বেড়ে গিয়ে ৫%-এ উন্নীত হলে অণুজীবের জীবনচক্র অর্ধেক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে। পশ্চিম জার্মানির মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডোনার হেবার এর গবেষণায় দেখা গেছে, অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব এরই মধ্যে ৫% ছাড়িয়ে গিয়েছে।
গ্রিন হাউস প্রভাব প্রতিরোধের উপায়: গ্রিন হাউস প্রভাব নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে এর প্রভাব কমানোর জন্য কয়েকটি উপায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো
১। কয়লা, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালে কার্বন ডাইঅক্সাইডের বৃদ্ধি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হবে।
২। সৌর ও বায়ুশুক্তি, জোয়ার ভাটা শক্তি, ভূতাপীয় শক্তির ব্যবহার বাড়ালে গ্রিন হাউস প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হবে।
৩। ইচ্ছামতো বনভূমি ধ্বংস বন্ধ করতে হবে এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বন সৃজন করলে প্রকৃতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের বৃদ্ধি প্রতিহত হবে।
৪। ক্লোরোফ্লুরো কার্বনের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে আইন প্রণয়ন ও তার যতাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এস.ডি.জি (Sustainable Development Goal- SDG) লক্ষ্যমাত্রা সবাই যাতে মেনে চলে, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more