hsc

নদীর সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ (পাঠ-১৫)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

15

(Depositional Landforms of River)

মধ্য এবং নিম্নগতিতে নদীবাহিত পাথরখণ্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি, পলি প্রভৃতি নদীখাতে সঞ্চিত হতে থাকে। নদীর উচ্চ প্রবাহে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ভারি পদার্থ যেমন- পাথর এবং নিম্নপ্রবাহে অর্থাৎ মোহনার নিকটবর্তী স্থানে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পদার্থ যেমন- বালি, নুড়ি ধীরে ধীরে সঞ্চিত হতে থাকে। একে নদীর অবক্ষেপণ কাজ বলে। নদীর অবক্ষেপণ কাজের ফলে নদী অববাহিকা ভরাট হয় এবং নদীর মধ্যে চর ও মোহনার কাছে বদ্বীপ গঠিত হয়। নদী দ্বারা সৃষ্ট সঞ্চয়জাত ভূমিরূপকে নিম্নলিখিত তিন ভাগে ভাগ করা যায়; যথা-

ক. প্রাথমিক গতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ :

১.পললপাখা: পার্বত্য অঞ্চলে নদী খাড়া ঢাল বেয়ে সমভূমিতে পতিত হলে নদীর স্রোতবেগ অনেক কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর, নুড়ি, প্রভৃতি পাহাড়ের পাদদেশে সঞ্চিত হয়ে হাতপাখার ন্যায় যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পললপাখা বলে। চীনের জিনজিয়াং-এ কুনলুন পর্বতের পাদদেশে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

২. পললকোণ: পলিজকোণ স্বল্প দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা পাদদেশের মৃত্তিকার কাঠিন্যের ওপর নির্ভর করে। নদীববাহিত অপেক্ষাকৃত বৃহৎ শিলাখণ্ড (coarse material) দ্বারা পললকোণ সৃষ্টি হয়। যেমন- নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে দেখা যায়।

৩. পাদদেশীয় পলল সমভূমি: পার্বত্য গতি নদীর পললকোণের বিস্তার বাড়তে বাড়তে পাদদেশের অব্যবহৃত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পাদদেশীয় পলল সমভূমি বলে। বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে পাদদেশীয় সমভূমি দেখা যায়।

খ. মধ্যগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:

১. প্লাবন সমভূমি: বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে নদী দুকূল উপচে বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যা শেষে বন্যাকবলিত এলাকায় পলির স্তর লক্ষ করা যায়। এভাবে বহুকাল অতীত হলে বন্যাকবলিত এলাকায় এক সমভূমির সৃষ্টি হয়। একে প্লাবন সমভূমি বলে। যেমন- যমুনার প্লাবন সমভূমি।

২. প্রাকৃতিক বাঁধ : বন্যার সময় নদীর উভয়কূল প্লাবিত হলে নদীবাহিত ভারি পদার্থসমূহ নদীর তীরে সঞ্চিত হয়। এতে নদী তীরে উঁচু বাঁধের ন্যায় ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ ভূমিরূপকে প্রাকৃতিক বাঁধ বলে। যেমন-মহানন্দা নদীর তীরে দেখা যায়।

৩. পশ্চাৎ ঢাল: প্রাকৃতিক বাঁধের পরে এক ধীর ও শান্ত ঢাল লক্ষ করা যায়। এ ঢালকে পশ্চাৎ ঢাল বলে। যেমন-মৌলভীবাজারের মনু নদীর ঢাল।

৪. পশ্চাৎ জলাভূমি: প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে নদীর পলি সঞ্চয় ক্রমশ কম হওয়ায় তা নিম্নভূমিরূপে অবস্থান করে। বর্ষার পরে বন্যার পানি সরে গেলে এ নিম্নভূমিতে জল আবদ্ধ অবস্থায় থেকে যায়। প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে অবস্থিত এরূপ জলাবদ্ধ ভূমিকে পশ্চাৎ জলাভূমি বলে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর স্বাভাবিক বাঁধের পশ্চাৎ জলাভূমি রয়েছে। যেমন-ঢাকা জেলার ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম প্রান্তের প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাৎ দিকে এক 'বৃহৎ পশ্চাৎ জলাভূমি দেখতে পাওয়া যায়।

৫. বাঁকের চর: আঁকাবাঁকা নদীর যে তীরে স্রোত আঘাত হানে ঠিক তার বিপরীত দিকে পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে এক চরভূমির সৃষ্টি করে। একে বাঁকের চর বলে। মহানন্দা নদীতে এরূপ চর রয়েছে।
বালুচর: নদীর তলদেশে বালি, নুড়ি, কাদা ইত্যাদি জমা হয়ে যে নতুন চর সৃষ্টি হয় তাকে বালুচর বলে। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই বালুচর রয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর কামরঙ্গীর চর, পদ্মা নদীর চিলমারী চর ও চর ভদ্রাসন, যমুনার চর কাজলা, মেঘনার চর দীঘলন্দ্র, চর আড়ালিয়া প্রভৃতি বৃহৎ চরের উদাহরণ।

৬. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ: আঁকাবাঁকা নদীর মধ্যবর্তী সংকীর্ণ স্থানে কোনো এক প্লাবনের সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ঐ নদী তার পুরাতন বাঁকা পথটি পরিত্যাগ করে নতুন এক সোজাপথে প্রবাহিত হয়। ফলে পুরাতন খাতটি একটি হ্রদে পরিণত হয়। এরূপ হ্রদের আকৃতি অনেকটা অশ্বের ক্ষুরের ন্যায় বলে একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। মিসিসিপি নদীতে এরূপ হ্রদ রয়েছে।

৭. কর্দম ছিপি: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মুখে প্রতিবছর পলি জমে জমে কোনো সময়ে হ্রদের উভয় মুখই বন্ধ হয়ে যায়। এ বন্ধ মুখকেই কর্দম ছিপি বলে। যেমন- মিসিসিপি নদীতে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

৮. নদীমঞ্চ : শুষ্ক থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত নদীর পানির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। ফলে নদীর পলিসমূহও ধাপে ধাপে সঞ্চিত হয়। একেই নদীধাপ বা নদীমঞ্চ বলে। যেমন- বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি নদী।

গ. নিম্নগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:

বদ্বীপ : নিম্নগতিতে নদীর স্রোতবেগ খুবই কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি তলানিরূপে নদীতে সঞ্চিত হতে থাকে। এ তলানি প্রথমে নদীর মোহনায় বিভিন্ন চরের সৃষ্টি করে। পরে চরসমূহের মধ্য দিয়ে নদীর স্রোতধারা বিচ্ছিন্ন হলে ত্রিকোণাকার এক নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ নতুন ভূমিরূপ মাত্রাহীন বাংলা 'Δ' অক্ষরের ন্যায় বলে একে বদ্বীপ বলে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...