(Necessity of Studying Human Geography)
মানুষ প্রতিনিয়ত পৃথিবীর সম্পদ ও ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। মানব ভূগোল মানুষ, তার কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের স্থানিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে থাকে। বর্তমানে মানব ভূগোল পাঠ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানব ভূগোল পাঠের প্রয়োজনীয়তা নিচে দেওয়া হলো:
১. মানব সমাজের স্থানিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানলাভ: মানব ভূগোলে মানবীয় কর্মকাণ্ডের স্থানিক বিশ্লেষণ করা হয় যা এর স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। মানব ভূগোলে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে (স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে) বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে।
২. বাস্তব সম্বন্ধীয় জ্ঞান লাভ: মানব ভূগোলের গবেষণায় মানবজীবনের বাস্তব বিষয়াদির গুণগত ও পরিমাণগত বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা যেমন: দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসমতা, কুসংস্কার ইত্যাদি সম্পর্কে বাস্তবধর্মী জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব এবং সে অনুযায়ী সমাধান দেওয়া যায়।
৩. বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সময়ের প্রেক্ষিতে নানা ধরনের জনগোষ্ঠী আবাস গড়ে তুলেছে। এদের ভাষা, ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। মানব ভূগোল তথা সাংস্কৃতিক ভূগোলে স্থানিক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক উৎস, বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। মানব ভূগোলে শুধু এলাকাভিত্তিক বা আঞ্চলিক সংস্কৃতিই নয় আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়ে থাকে।
৪. ঐতিহাসিক পরিবেশ সম্বন্দ্বে জ্ঞান লাভ: মানব ভূগোলবিদগণ অতীতের বিভিন্ন ঘটনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বই-পুস্তক, নথিপত্র ছাড়াও মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। ফলে অতীতের বিভিন্ন ঘটনা সঠিকভাবে বর্ণনা করা সম্ভব হয়। এছাড়া অতীতের বিভিন্ন ভূগোলবিদদের মতবাদ গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়।
৫. পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল সম্বন্দ্বে জ্ঞানলাভ: ভূগোলবিদগণ গবেষণাকার্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন। যেমন: দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ অথবা এশিয়া বা অন্য কোনো দেশ। যেহেতু বিভিন্ন দেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে হয়, সেহেতু ঐ সকল স্থানের সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়।
৬. পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্ক সম্বন্দ্বে জ্ঞানলাভ: মানব ভূগোলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সাংস্কৃতিক ভূগোল ওসাংস্কৃতিক বাস্তুবিদ্যা। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে কীভাবে তার প্রতিকার করা যায়, তা মানব ভূগোলে আলোচনা করা হয়। মানব ভূগোল পাঠের মাধ্যমে আমরা পরিবেশের সঙ্গে মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণা পেতে পারি।
৭. মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ: মানুষ তার জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে। মানুষ তার জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নানামুখী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে। মানুষ জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে তার কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে থাকে। কোনটি টেকসই আবার কোনটি ধ্বংসাত্মক তা বুঝতে পারে। মানব ভূগোলে সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে বলে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি। এছাড়াও মানুষের বাসস্থান ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যাকেও মানবভূগোলে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৮. অর্থনীতি সম্বন্দ্বে জ্ঞান লাভ: মানব ভূগোলের একটি অন্যতম শাখা হচ্ছে অর্থনৈতিক ভূগোল। মানুষ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাজের মাধ্যমে টিকে থাকে। মানুষের সকল ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনো না কোনো সমাজব্যবস্থার মধ্যে সংঘটিত হয়। অর্থনৈতিক ভূগোল পাঠের মাধ্যমে আমরা আমরা বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্পের বণ্টন, গ্রামভিত্তিক ও নগরভিত্তিক অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা পাই।
৯. মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ: মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও মানসিক চিত্রপটকে মানব ভূগোলে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে মানুষের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি স্থানভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করে। মানব ভূগোল পাঠে আমরা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারি।
১০. অভিগমনের প্রকৃতি ও ধরন সম্পর্কে জ্ঞানলাভ: উন্নত জীবনযাপন, আর্থিক সচ্ছলতা, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা সুবিধা, প্রাকৃতিক বা সামাজক বিকর্ষণমূলক কারণে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে, এক শহর থেকে অন্য শহরে আবার এক দেশ থেকে অন্য দেশে অভিগমন করে থাকে। অভিগমনের ধরন, প্রকারভেদ ও প্রভাব নিয়েও মানব ভূগোলে আলোচনা করা হয়।
১১. জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে: জন্মহার, মৃত্যুহার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, বয়স, লিঙ্গ, পেশা ইত্যাদি মানব ভূগোলের জনমিতিক ভূগোলে আলোচিত হয়। এছাড়া নারী ও শিশুর অধিকার এবং উন্নয়ন সম্পর্কিত গবেষণাও করা হয় মানব ভূগোলে। কোনো দেশের জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হলে জনমিতিক ভূগোলের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মানব ভূগোল - মোহা: আনিছুর রহমান ও মোঃ আব্দুর রাজ্জাক-স্যারে লেখা বই
Read more