hsc

পাঠ-১৭: বৈশ্বিক উষ্ণায়ন

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

10

(Global Warming)

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক সভ্যতায় মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়াকে উষ্ণায়ন বলে। মানুষের জীবনযাত্রায় অপরিণামদর্শী কার্যকলাপের অশুভ ফলাফল হিসেবে পরিবেশ, বিশেষ করে জলবায়ু দূষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন- শিল্পকারখানা স্থাপন, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি বিলাস সামগ্রীর ব্যবহার প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার প্রাকৃতিক বিভিন্ন গ্যাস যেমন- কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন গ্যাস ইত্যাদির কারণে বায়ুমণ্ডলের ওপর নেতিবাচক চাপ পড়ছে, যা সরাসরি বিশ্ব উষ্ণায়ন সৃষ্টি করছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ: প্রাকৃতিক বিভিন্ন গ্যাস ও মানবিক কর্মকান্ডের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব (১৭৫০-১৮৫০) শুরু হলে কলকারখানা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন থেকেই বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো হলো কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) (৪৯%), ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) (১৪%), মিথেন (CH1)  (১৮%), নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) (৬%) ও অন্যান্য গ্যাস (CO2) (১৩%)। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার (কয়লা, পেট্রোল ও গ্যাস) ও যথেচ্ছ বন নিধন উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন সংযোজন বাড়াচ্ছে আর বনের শূন্যতা কার্বন অধিগ্রহণ কমাচ্ছে। এছাড়া পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য নিম্নোক্ত কারণগুলোকেই দায়ী করা যায়। যথা:

১. শিল্পায়ন (industrialization); ২. নগরায়ণ (urbanization); ৩. বিলাসসামগ্রীর ব্যবহার (use of luxurious goods); ৪. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার (use of fossil fuels); ৫. সমুদ্রে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপ (nuclear wast released inocean); ৬. যুদ্ধ বিগ্রহ (war); ৭. পারমাণবিক বিস্ফোরণ (nuclear explosion); ৮. বৃক্ষ নিধন (deforestation); ৯. কৃষির আধুনিকীকরণ (modernization of agriculture); ১০. শিল্প বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা; (mismanagement of industrial waste) ১১. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (volcanic eruption); ১২. উদ্ভিদ ও প্রাণির মৃতদেহ (Plants and animals deadbody)।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বর্ণিত কারণগুলি মূলত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ও নাইট্রোজেন যৌগের বৃদ্ধি ঘটিয়ে উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটায়। তন্মধ্যে বৃক্ষ নিধন ও নির্বনায়ন উষ্ণায়নে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে দিনের বেলায় উদ্ভিদকুল সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করত তা কমে যাওয়াতে উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে।
কার্বন ডাইঅক্সাইডের অধিক মাত্রায় উপস্থিতিই বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ। যদিও মিথেন, কার্বন ডাইঅক্সাইডের তুলনায় ২০ গুণ বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করে এবং সিএফসি ২০ হাজার গুণ অধিক তাপ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি নিতান্তই অল্প হওয়াতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের দ্বারাই মূলত উষ্ণায়ন বাড়ছে।

বিজ্ঞানীরা মেরু অঞ্চলের বরফ মুকুট (Ice cap) ও হিমবাহ (Glacier) খনন করে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌছেছেন, বিগত কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে বর্তমান বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ সর্বাধিক।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে অতিমাত্রায় গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা অভিমত ব্যক্ত করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের National Oceanographic & Atmospheric Administration (NOAA) এর মতে, বিগত ১০০ বছরে সামুদ্রিক এবং ভূপৃষ্ঠস্থ তাপমাত্রার তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটেছে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ায় বিগত ১০০ বছরে গড় বায়ুমণ্ডলীয় উত্তাপ ° ফা. বেড়েছে। জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট IPCC (International
Panel on Climate Change) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের হস্তক্ষেপে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন তথা তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষভাবে পর্যবেক্ষিত ঘটনাগুলো হলো বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প, হিমবাহ এবং মেরু হিমমুকুটের গলন, বন্যা ও খরা বৃদ্ধি এবং সমুদ্র তলের উত্থান। প্রাক্কালন অনুযায়ী, ২১০০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রতল ২'-৩' পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব (Effects of Global Warming): বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ভূত্বক যেমন প্রভাবিত হচ্ছে
তেমনি মানুষের জীবন, বাসস্থান অর্থাৎ অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব নিচে আলোচনা করা
হলো-

১. কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, CFC এবং নাইট্রাস অক্সাইড, এসব গ্রিন হাউস গ্যাস আবহাওয়ামণ্ডলের নিচের অংশের তাপ শোষণ করে। এতে করে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ১৮ হাজার বছর আগে সর্বশেষ বরফ যুগের শেষ ভাগ থেকে আজ অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে ২° সেলসিয়াস। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এই বৃদ্ধির হার বেড়ে যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান হার বজায় থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর উষ্ণতা ° থেকে ° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে।

কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব উষ্ণায়নে প্রভাব পড়ছে। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে যেখানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২৮০ থেকে ২৯০ পিপিএম, বর্তমানে তা ৩৫০ পিপিএম এবং ২০৫০ সালে তা দাঁড়াবে ৫০০ থেকে ৭০০ পিপিএম (পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে শ্লথ করতে হলে ২০৭৫ সাল নাগাদ বাতাসে সর্বোচ্চ ৪৬৩ পিপিএম কার্বন ডাইঅক্সাইড সহনীয়)। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে বছরে বর্তমানে ৫ বিলয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড যোগ হয়। ১৯৫০ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ ছিল ২ বিলিয়ন মেট্রিক টনের কম। বর্তমান হারে চলতে থাকলে কার্বন ডাইঅক্সাইড পরবর্তী দু'দশকে বর্তমানের ৮০% বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রাকৃতিক কারণে যোগ হয় ০.৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। বন ধ্বংস ও মাটির বিয়োজনে আরও ২ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে যোগ হয়। বছরে মানুষ সৃষ্ট মোট এই ৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইডের ৫০% সাগর-মহাসাগর শুষে নেয়, বাকি বিরাট অংশ রয়ে যায় বায়ুমণ্ডলে। ১৯৫৮ সাল থেকে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের অনুপাত বেড়ে গেছে ২৫ ভাগ। এই হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী এক শতকের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। ফলে এই একটি গ্যাসই পৃথিবীকে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত করে দিতে পারে।

২. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের পর্বতমালাগুলোর বরফ গলে যাচ্ছে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নদী ও সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গা নদীর উৎসস্থল গাঙ্গোত্রীসহ হিমালয়ের অনেকগুলি হিমবাহের দৈর্ঘ্য ইতোমধ্যে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
৩. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মানুষ ও প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
৪. CFC গ্যাসের কারণে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্রমশ পাতলা হয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও ছিদ্রের (Ozone hole) সৃষ্টি করেছে। ফলে এই ছিদ্র দিয়ে সূর্য ও মহাকাশ হতে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ও কসমিক কণা সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসছে।
৫. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মানুষসহ অন্যান্য জীবের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধের উপায় (Prevention of Global Warming)
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা হলো-
i. উন্নত দেশগুলোকে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে।
ii. উন্নয়নশীল দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ সীমিত রেখে শিল্পোন্নতির জন্য প্রযুক্তি স্থাপন করতে হবে।
iii. বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে।
iv. CFC-র সস্তা বিকল্প আবিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে CFC ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
V. বৃক্ষরোপণ অভিযান সফল ও নতুন বনভূমি সৃষ্টি করতে হবে।
vi. জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প আবিষ্কার করতে হবে।
vii. পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন ও পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
viii. সর্বোপরি বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রতিরোধে সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...