(Distribution & Production of Major Industries)
বর্তমান যুগ বৃহদায়তন শিল্পের যুগ। বৃহৎ শিল্পের উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে যেসব শিল্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, বস্তু ও বয়ন শিল্প উল্লেখযোগ্য।
লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন ও বণ্টন
আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার ভিত্তি লৌহ ও ইস্পাত। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্যান্য অনেক শিল্পের ভিত্তি এই শিল্পের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সামান্য আলপিন বা সেফটিপিন থেকে শুরু করে বৃহদাকার জাহাজের যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সব দ্রব্যই লৌহ শিল্পকেন্দ্রে প্রস্তুত করা হয়। বিশ্বের যেসব দেশ লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে উন্নতি লাভ করেছে সেসব দেশে এই শিল্প গড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। এই শিল্প সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে বিকাশ লাভ করেছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতা, শক্তিসম্পদের প্রাচুর্যতা, জলবায়ু, মূলধন, শ্রমিক প্রাপ্তি, উন্নত বাজার ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা, কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি কারণে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠেছে।
সারণি-৬.১: লৌহ ও ইস্পাতের উৎপাদন ও বণ্টন (মিলিয়ন মেট্রিক টন)-২০১৮
| অবস্থান | লৌহ | অবস্থান | ইস্পাত | ||
| দেশ | পরিমাণ | দেশ | পরিমাণ | ||
| ১ | চীন | ৭২১ | ১ | চীন | ৯২৮ |
| ২ | জাপান | ৭৭ | ২ | ভারত | ১০৬ |
| ৩ | ভারত | ৭১ | ৩ | জাপান | ১০৪ |
| ৪ | রাশিয়া | ৫২ | ৪ | যুক্তরাষ্ট্র | ৮৭ |
| ৫ | দক্ষিণ কোরিয়া | ৪৭ | ৫ | দক্ষিণ কোরিয়া | ৭২ |
| ৬ | ব্রাজিল | ২৯ | ৬ | রাশিয়া | ৭২ |
| ৭ | জার্মানি | ২৭ | ৭ | জার্মানি | ৪২ |
| ৮ | যুক্তরাষ্ট্র | ২৪ | ৮ | তুরস্ক | ৩৭ |
| ৯ | ইউক্রেন | ২১ | ৯ | ব্রাজিল | ৩৫ |
| ১০ | তাইওয়ান | ১৫ | ১০ | তাইওয়ান | ২৩ |
| সমগ্র বিশ্ব | ১২৫০ | সমগ্র বিশ্ব | ১৮১০ | ||
Source: US Geological survey, Mineral Commodity Summaries, January, 2020
১. চীন: চীন বর্তমানে লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। আনশান চীনের সর্ববৃহৎ ইস্পাত কেন্দ্র। এছাড়া সাংহাই, নানকিং, উহান প্রভৃতি রাজ্যও ইস্পাত শিল্পে উন্নত। লৌহ ও ইস্পাত শিল্প ব্যবহার করে ভারি যন্ত্রপাতি, রেলগাড়ি, জাহাজ প্রভৃতি তৈরি করে চীন বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। ইয়াংসি নদীর তীরে হ্যাখ্যাও এবং লায়োনিং এর আনশান অঞ্চলে চীনের অধিকাংশ লৌহ ও ইস্পাত কারখানাগুলো অবস্থিত।
২. জাপান: জাপান বর্তমানে লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে যথাক্রমে ২য় ও ৩য় অবস্থানে রয়েছে। জাপানের প্রধান প্রধান লৌহ-ইস্পাত উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো হলো- ওসাকা-কোবে অঞ্চল, টোকিও ইয়োকোহামা অঞ্চল, ডাইডো-মুরোরান অঞ্চল। জাপানে এই শিল্পের মাধ্যমে বড় বড় জাহাজ, মোটরগাড়ি, ট্রাক্টর, সাইকেল, বৈদ্যুতিক পাখা, রেডিও, টেলিভিশন, ক্যামেরা ইত্যাদি তৈরি করা হয়।
৩. ভারত: ভারত লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে বর্তমানে বিশ্বে যথাক্রমে তৃতীয় ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী দেশ। বিহারের সিংভূম, উড়িষ্যার কেওনঝাড়, কর্নাটকের বাবাবুদান প্রভৃতি অঞ্চলে আকরিক লৌহ এবং বিহারের ঝরিয়া ও বোকারা, পশ্চিমগঞ্জের রানীগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চলে কয়লার আধিক্য থাকায় লৌহ ও ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠেছে। দেশটির বিহারের সিংভূম জেলার জামশেদপুরে বৃহত্তম লৌহ ও ইস্পাত কারখানা গড়ে উঠেছে।

৪. যুক্তরাষ্ট্র: দেশটি ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং লৌহ উৎপাদনে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, স্প্যারোজ পয়েন্ট; পিটার্সবার্গের ইয়াংস্টাউন অঞ্চল; বৃহৎ পঞ্চ হ্রদ অঞ্চলের শিকাগো, গ্যারি, ব্যাফেলো, ক্লিভল্যান্ড, লোরেন, ইরি হ্রদের পশ্চিমে ডেট্রয়েট ইত্যাদি অঞ্চলে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লৌহ ও ইস্পাত দিয়ে মোটরগাড়ি, রেল ইঞ্জিন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি তৈরি করা হয়।
৫. ব্রাজিল: ব্রাজিল লৌহ উৎপাদনে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকলেও ইস্পাত উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে নবম। ব্রাজিলের ভোল্টা রেডোন্ডা, মনলিভাডা, বেলো ইরিজোন্টে প্রভৃতি স্থানে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প বিকাশ লাভ করেছে।
৬. দক্ষিণ কোরিয়া: বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। দেশটির ইনচন, ইয়েওংসান, গোয়াংজু, বুসান, সিউল প্রভৃতি অঞ্চলে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প প্রসার লাভ করেছে।
৭. ইউক্রেন: লৌহ উৎপাদনে এদেশ বর্তমান বিশ্বে নবম এবং ইস্পাত উৎপাদনে ১১তম অবস্থানে রয়েছে। কয়লা, আকরিক লৌহ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পজাত দ্রব্যের স্থানীয় বৃহৎ বাজার ইত্যাদি অনুকূল অবস্থার কারণে ইউক্রেনের ক্রিভয়রগ, জাপোরেজি, খারকভ ও নেপ্রোপোট্রোভস্ক অঞ্চলে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প উন্নতি লাভ করেছে।
৮. রাশিয়া: রাশিয়া বর্তমান বিশ্বে লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে যথাক্রমে চতুর্থ ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। রাশিয়ার ইউরাল অঞ্চলের ম্যাগনিটোগরস্ক রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম লৌহ ও ইস্পাত শিল্প উৎপাদনকারী কারখানা। রাশিয়ার কুজনেটস্ক অঞ্চলের গোরনারিয়া-শোরিয়া, নভোকুজনেস্ক, নভোসিবিরিস্ক ও বারনল, মস্কো ও টুলা অঞ্চলও লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে প্রসিদ্ধ।
৯. জার্মানি: জার্মানি লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে বেশ অগ্রগামী। বর্তমানে দেশটি লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনে সপ্তম স্থানে রয়েছে। দেশটির শিল্প কেন্দ্রগুলো রুয়, এসেন, গর্টমন্ড, বোচম, জোসেলডর্ফ প্রভৃতি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।
উপরিউক্ত দেশগুলো ছাড়াও লৌহ শিল্পে তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য এবং ইস্পাত শিল্পে তুরস্ক, ইরান প্রভৃতি দেশ সমৃদ্ধি লাভকরেছে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more