পর্বত (পাঠ-৫)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

2

(Mountain)

ভূপৃষ্ঠের অতি উচ্চ, সুবিস্তৃত এবং খাড়া ঢালবিশিষ্ট শিলাস্তূপকে পর্বত বলে। পর্বত সাধারণত ২০০০ ফুট বা ৬০০ মিটারের অধিক উচ্চ হয়। পর্বত হচ্ছে ভূমির সবচেয়ে উঁচু শিলাস্তর। গঠন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে এই পর্বতকে আবার বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তন্মধ্যে প্রধান প্রধান পর্বতগুলো নিম্নরূপ-

১. ভঙ্গিল বা ভাঁজ পর্বত (Fold mountain): ভঙ্গিল পর্বতেরগঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। প্রকৃতপক্ষে গিরিজনি আলোড়নের ফলে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। ভূঅভ্যন্তরের উত্তপ্ত ও গলিত পদার্থসমূহ প্রতিনিয়ত শীতল ও সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু ভূত্বক অনেক আগেই শীতল ও কঠিন হয়ে আছে। ফলে এ (শীতল ও কঠিন) ভূত্বক ভূঅভ্যন্তরের সাথে সমানতালে সংকুচিত হতে না পারায় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের

শিলাসমূহের মধ্যে চাপের পার্থক্য হয় এবং ভূত্বকের কোনো কোনো স্থানে ভাঁজের সৃষ্টি হয়। এ ভাঁজের উচ্চ অংশই ভঙ্গিল বা ভাঁজ পর্বত নামে পরিচিত। ভূবিজ্ঞানী ওয়েগনার তার মহীসঞ্চারণ মতবাদে বলেছেন, ভূভাগের স্থান 'পরিবর্তনের ফলেই তাদের প্রান্তভাগের অংশবিশেষে ভাঁজের অর্থাৎ ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। যথা- রকি ও আন্দিজ পর্বত। কোনো বৃহৎ জলরাশির অববাহিকায় পলি এসে জমা হলে এ অববাহিকা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হতে দুর্বল হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ চাপ, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চাপ এবং ভূআন্দোলনের ফলে অববাহিকার তলানীসমূহ কুঁচকে গিয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত পর্বতশ্রেণি এই ধরনের ভঙ্গিল পর্বত। যেমন- এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের আল্লস, উত্তর আমেরিকার রকি, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ।

পর্বত উৎপত্তির কারণ কী?

আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, সুদূর অতীতে পৃথিবী পৃষ্ঠে একটি মাত্র বিশাল ভূখণ্ড ছিল। ওয়েগনার এ স্থলভাগকে প্যানজিয়া (Pangea) নামে অভিহিত করেন। পরবর্তীতে প্যানজিয়া খন্ড খন্ড হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। মহাদেশীয় সঞ্চারণ হয়েছিল দু'দিকে- নিরক্ষরেখার দিকে ও পশ্চিম দিকে। নিরক্ষরেখার দিকে সঞ্চারণের ফল হিসাবে আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া নিকটতর হয় এবং উভয়ের মধ্যবর্তী টেথিস সাগরের সঞ্চয়গুলি উত্থিত হয়ে হিমালয়, আল্লস, ককেশাস, হিন্দুকুশ, কুয়েনলুন, পীরেনীজ এবং জাগারাজ প্রভৃতি ভাঁজ পর্বতগুলো সৃষ্টি হয়। এছাড়া অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সুউচ্চ আগ্নেয় পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে।

২. চ্যুতি-স্তূপ পর্বত (Fault-block mountain): ভূআন্দোলনে বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে ভূত্বক কখনও কখনও খাড়াভাবে ফেটে যায় বা চ্যুতির সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে আরও একটি ভূআন্দোলনের ফলে দুটি চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী স্থান ঊর্ধ্বচাপে উত্থিত হলে অথবা দুটি চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী স্থান যথাস্থানে থেকে উভয়পার্শ্বের ভূভাগ অবনত হলে মধ্যবর্তী অংশ পর্বতের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে গঠিত পর্বতকে স্তূপ পর্বত বলে। ভারতের বিন্ধ্য, জার্মানির ব্ল‍্যাকফরেস্ট, ফ্রান্সের ভোজ, পাঞ্জাবের লবণ পবর্ত এ ধরনের পর্বতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৩. ল্যাকোলিথ পর্বত (Laccolith mountain): ভূগর্ভস্থ গলিত ম্যাগমা ভূআন্দোলন বা অন্য কোনো নৈসর্গিক কারণে ভূত্বকের দুর্বল অংশ দিয়ে প্রবল বেগে ভূপৃষ্ঠে বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু প্রায়ই তা ওপরে আসার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ভূত্বকের নিচেই সঞ্চিত হয় এবং ঊর্ধ্ব চাপের কারণে ওপরের শিলাস্তর স্ফীত হয়ে গম্বুজ আকার ধারণ করে। জমাট ম্যাগমা দ্বারা গঠিত এরূপ পর্বতকে গম্বুজ বা ল্যাকোলিথ পর্বত বলে। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি পর্বত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৪. ক্ষয়জাত পর্বত (Residual mountain): ভূত্বক নানা প্রকার কঠিন ও নরম শিলা দ্বারা গঠিত। অনুরূপভাবে ভঙ্গিল পর্বতসমূহও নানা প্রকার নরম ও কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত। কালক্রমে এর নরম শিলাসমূহ যান্ত্রিক উপায়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় কিন্তু কঠিন শিলাসমূহ পূর্বাবস্থায়ই থেকে যায়। অর্থাৎ উচ্চ পর্বতটি ক্ষয় হয়ে একটি নিচু পর্বতে পরিণত হয়। এ জন্য একে ক্ষয়জাত পর্বত বলে। যেমন-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল‍্যাকহিলস, কলোরাডোর ফ্রন্টরেঞ্জ এবং বিগহর্ন এ পর্বতের উদাহরণ।

৫. আগ্নেয় পর্বত (Volcanic mountain): ভূত্বকের ফাটল বা ছিদ্র পথের মাধ্যমে ভূঅভ্যন্তরে গলিত লাভা, ধূম, ভস্ম প্রবল বেগে ভূপৃষ্ঠে এসে উপনীত হয় এবং ফাটল বা ছিদ্রপথের চারদিকে সঞ্চিত হয়ে পর্বত গঠন করে। একে আগ্নেয় বা সঞ্চয়জাত পর্বত বলে। মূলতঃ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে এ পর্বতের সৃষ্টি হয় বলে একে আগ্নেয় পর্বত বলে। জাপানের ফুজিয়ামা, ইতালির ভিসুভিয়াস, হাওয়াই দ্বীপের মৌনলোয়া এ পর্বতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...